আইন-আদালত
 |
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার
ঐতিহাসিক রায়
ফারিহা জামান ইভা
এটিএম মোরশেদ আলম |
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। জাতি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার পায় প্রায় ৩৪ বছর ২ মাস ২৭ দিন পরে বাঙালি জাতি মুক্তি পায় ৩৪ বছরের কলঙ্ক, গ্লানি ও দায়বদ্ধতার হাত থেকে। কিন্তু এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতেই সময় নেয় দীর্ঘ ২১ বছর। ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর সর্বপ্রথম ধানমণ্ডি থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এভাবে নিম্ন আদালত, উচ্চ আদালত এবং সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ বিভাগ আপিল বিভাগে আপিলের আবেদন খারিজ এবং হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়।
হত্যার পটভূমি
‘বাঙালী আমাকে কখনোই মারবে না’ শেখ মুজিবুর রহমান তার সামরিক সচিবকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় এমন কথাটি বলেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই পাক হানাদার বাহিনীর ছোবল থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ২২ জন। জার্মানিতে অবস্থানের কারণে বঙ্গবন্ধুর দুই তনয়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। আর এরই সাথে শুরু হয় ইতিহাসের এক কলঙ্কযুক্ত অন্ধকার অধ্যায়। যারা সেদিন হত্যার শিকার হন, তারা হচ্ছেন- বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, স্ত্রী আরজু মণি, আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, বেবী সেরনিয়াবাত, সুকান্ত, আব্দুল্লাহ বাবু, মঈন খান, রিন্টু, শহীদ সেরনিয়াবাত।
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তার বিদ্রোহ বলে অনেকে চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এটা যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র ছিল তার প্রথম প্রমাণ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশ। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এই অধ্যাদেশ জারি করেন। এই অধ্যাদেশের মূল কথা হলো, ১৫ আগস্ট ভোরে আইন পরিপন্থী যাই ঘটুক না কেন- এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না এবং রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করলেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা-অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। পরবর্তীকালে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত চার বছরের মধ্যে সামরিক আইনের আওতায় সবকিছু পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দেয়া হয়। এভাবেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে শুরু হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা এসব খুনিকে সূর্যসন্তান হিসেবে ঘোষণা করেছে, তাদের বিদেশে চাকরিসহ নানাভাবে পুরস্কৃত করেছে। যেমন- জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেন। ১৯৮৬ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ.এম.এরশাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করার মতো সাহস পান। আবার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনে আরেক খুনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি লে.কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশীদ এবং মেজর (অব.) বজলুল হুদা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। লে. কর্নেল রশীদকে পরবর্তীকালে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাও বানানো হয়। বিএনপি জোট সরকারের সময় ফাঁসির আসামি আজিজ পাশার স্ত্রী মাহফুজা পাশাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সুবিধাও দিয়েছিলেন।
বিচার প্রক্রিয়ার ইতিবৃত্ত
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পূর্ব পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল ছিল। ১৯৯৬ সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হলে ২১ বছর পর হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়ার দরজা উন্মোচিত হয়। এরপর ঐ বছরই ১৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোট ৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ধানমণ্ডি থানায় তিনটি এবং মোহাম্মদপুর থানায় একটি। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাসভবনে বঙ্গবন্ধুসহ মোট ১১ জনকে হত্যার দায়ে ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর পিএ মহিতুল ইসলাম বাদি হয়ে ধানমণ্ডি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলাটিই বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নামে পরিচিত এবং শেষ পর্যন্ত শুধু এই মামলাটিই বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়।
দ্বিতীয় মামলাটিও দায়ের হয় ধানমণ্ডি থানায়। আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনে হত্যাকাণ্ডের দায়ে এই মামলাটি দায়ের করেন তার পুত্রবধূ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর স্ত্রী শাহানা বেগম। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের কয়েকদিন পরেই এই মামলায় অভিযোগপত্র দেয়া হয়। তবে মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত আছে।
তৃতীয় মামলাটিও দায়ের হয় ধানমণ্ডি থানায়। নিহত শেখ ফজলুল হক মণির বাসভবনে হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগে এই মামলাটি দায়ের করেন তার দেহরক্ষী শাহাবুদ্দিন। এই মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রদান করা হয়। সর্বশেষ মামলাটি হয় মোহাম্মদপুর থানায়। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণের সময় লে. কর্নেল মহিউদ্দিন (আর্টিলারি) যে কামানের গোলাবর্ষণ করে তাতে মোহাম্মদপুরের এক বাড়িতে ৬ জন নিহত হয়। নিহতদের পরিবারের সদস্য মোহাম্মদ আলী এই মামলাটি দায়ের করেন। বাদি অসুস্থ থাকায় দীর্ঘদিন মামলার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তবে বর্তমানে মামলাটি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ায় আছে।
নিম্ন আদালত এবং হাইকোর্টের রায়
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫১ কার্যদিবসে ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ১৯ জন আসামির মধ্যে ১৫ জনকে প্রকাশ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে রায় কার্যকরের আদেশ দেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নিয়ে প্রথম বিতর্কের সূত্রপাত হয় এখান থেকেই। কারণ প্রচলিত আইনে মৃত্যুদণ্ড বলতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুকে বোঝানো হয়। ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নজির রায় ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে ছিল না। যাই হোক, পরে হাইকোর্টে এই বিতর্কের অবসান হয়।
আইনানুযায়ী মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত করার জন্য মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগে যায় ‘ডেথ রেফারেন্স’ আকারে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ জন আসামি আপিলও করে। আসামিদের আপিল এবং ডেথ রেফারেন্সগুলো হাইকোর্টে একত্রে শুনানি করা হয়। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৯৮ সালে নিম্ন আদালতের রায় হলেও হাইকোর্টের একাধিক বিচারপতি মামলাটি শুনানি করতে বিব্রতবোধ করার কারণে বিচার কিছুটা বিলম্বিত হয় (বিব্রত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন বুলেটিন সেপ্টেম্বর সংখ্যা ২০০৭, পৃষ্ঠা ১৪)। অবশেষে ২০০০ সালের ২৮ জুন বিচারপতি মোঃ রুহুল আমীন এবং এবিএম খায়রুল হকের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ দ্বিধাবিভক্ত রায় ঘোষণা করেন। বিচারপতি খায়রুল হক নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে ১৫ জনকেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। অন্যদিকে বিচারপতি মোঃ রুহুল আমীন ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ৫ জনকে খালাস দেন। ফয়সালার জন্য বিচারপতি ফজলুল করিমের সমন্বয়ে তৃতীয় একটি বেঞ্চ গঠন করা হয়। ৩০ এপ্রিল ২০০১ এই বেঞ্চ ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ৩ জনকে খালাস প্রদানের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
হাইকোর্ট বিভাগে যাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখা হয় তাদের মধ্যে ৫ জন বর্তমানে কারাগারে আটক আছে। তারা হলো- লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, লে. কর্নেল (অব.) মুহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি), লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার), মেজর (অব.) বজলুর হুদা। একেএম মহিউদ্দিনকে ১৬ জুন ২০০৭ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আনা হয়। লে. কর্নেল আজিজ পাশা বিদেশে মারা গেছে। লে. কর্নেল রশিদ, লে. কর্নেল ডালিম, লে. কর্নেল নূর চৌধুরী এবং রিসালদার মুসলেম উদ্দিনসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাকি ৬ জন আসামি এখনো পলাতক।
আপিল বিভাগের চূড়ান্ত আদেশ
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করে। পরে মহিউদ্দিনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আনার পর সেও জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। সবগুলো আপিল একসাথে শুনানি করার পর ২৪ আগস্ট ২০০৭ পাঁচ আসামির লিভ টু আপিল মঞ্জুর হয় এবং নিয়মিত আপিল দায়েরের আদেশ দেয়া হয়। লিভ মঞ্জুর করার সময় আপিল বিভাগ ৫টি যুক্তিকে আমলে আনে এবং পরে আপিল শুনানির সময় এই পাঁচটি বিষয়েই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। এগুলো হলো-
১. হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের দুই বিচারক দুটি আলাদা এবং বিভক্ত রায় দিয়েছেন, তৃতীয় বিচারপতি দণ্ডপ্রাপ্ত সব আসামির বিষয় এবং পুরো রায়টি বিবেচনা না করে কেবল দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামির মামলা বিবেচনা করে আইনগতভাবে মৌলিক ভুল করেছেন।
২. মামলা দায়েরে ২১ বছরের অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে। এই অযৌক্তিক বিলম্ব আপিলকারীদের মিথ্যাভাবে জড়ানোর অসৎ উদ্দেশ্য এবং পরিকল্পনার বানোয়াট গল্পই বলে। হাইকোর্ট বিভাগ এই বিষয়টি বিবেচনায় না এনে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আইনগতভাবে ভুল করেছেন।
৩. সাক্ষ্য প্রমাণে দেখা গেছে, একটি বিদ্রোহের পরিণতিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে। এটা সাধারণ হত্যাকাণ্ডের মামলা নয়। তাই আপিলকারীদের সাধারণ ফৌজদারি আদালতে যে বিচার হয়েছে তা বাতিলযোগ্য।
৪. সাক্ষ্য-প্রমাণে একথা বলা যায় না যে, এটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা সংঘটনের মামলা। এটা তৎকালীন মুজিব সরকারকে পরিবর্তনের জন্য বিদ্রোহ সংঘটনের ষড়যন্ত্রের মামলা। তাই আসামিদের দণ্ড বেআইনি।
৫. রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে আপিলকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারার হত্যা ও অভিন্ন উদ্দেশ্যে হত্যার অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। তাই গুরুতরভাবে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়েছে।
লিভ গৃহীত হওয়ার পর আপিল বিভাগের মামলাটি প্রায় সাত বছর শুনানিহীন থাকে। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পরিবর্তিত হয়ে আওয়ামী মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি শুনানি করার উদ্যোগ নেয়। প্রধান বিচারপতি মামলাটির শুনানির জন্য ৭ আগস্ট ২০০৯ বিচারপতি মোঃ তোফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি বেঞ্চ গঠন করা হয়। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মোঃ আব্দুল আজিজ, বিচারপতি বিজন কুমার দাস, বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন ও বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। ২৯ দিনের শুনানি শেষে ১৯ নভেম্বর এই বেঞ্চ মামলার চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করে।
আপিল বিভাগের রায়
যে ৫টি বিষয় বিবেচনায় এনে লিভ গ্রহণ করা হয়েছিল মূলত সেই ৫টি বিষয়ের ওপর পর্যবেক্ষণ করেই আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে। আপিল বিভাগ রায় ঘোষণাকালে বলে, “উপরের যুক্তিগুলোতে আমাদের মতামত হলো:
১. ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৮ ও ৪২৯ ধারার বিধানমতে তৃতীয় বিচারপতি কোন কোন পয়েন্টে যুক্তিতর্ক শুনানি করবেন তা তার একক এখতিয়ার। এটা বলা যায় যে, তিনি (তৃতীয় বিচারপতি) মতভিন্নতার অংশটুকু নিষ্পত্তি করতে সম্পূর্ণ স্বাধীন। হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের দুই বিচারপতি ছয় আসামির বিষয়ে মতভিন্নতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা রয়েছে তৃতীয় বিচারপতির। দ্বৈত বেঞ্চের দুই বিচারপতি যে ৯ আসামির বিষয়ে কোনো দ্বিমত পোষণ করেননি, সেই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তৃতীয় বিচারপতি একমত ছিলেন।
২. মামলা দায়েরের বিলম্বের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে দায়রা আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগ সেটা গ্রহণ করেছেন। এই বিষয়ে দুই আদালতের অভিমত একই হওয়ায় এতে আমাদের হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই।
৩. হত্যার অপরাধ সেনা আইনের ৫৯(২) ধারায় করা প্রসঙ্গে আমাদের অভিমত হলো, হত্যাকারী দায়িত্বরত (অ্যাকটিভ সার্ভিস) অবস্থায় অপরাধ করলে এই ধারা প্রযোজ্য হবে। কিন্তু আপিলকারী সেনা আইনের ৮(২) ধারা অনুযায়ী অ্যাকটিভ সার্ভিসে ছিলেন না, তাই সাধারণ ফৌজদারি আদালতে বিচারে কোনো বাধা নেই। এমনকি সেনা আইনের ৮(২) ধারার সংজ্ঞায় এটাকে বেসামরিক অপরাধ ধরে নেয়া হলেও ওই আইনের ৯৪ ধারামতে এই অপরাধের বিচার সাধারণ আইনে করতে কোনো বাধা নেই।
৪. এমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই যে, বিদ্রোহের ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারের অন্য সদস্য ও তিন নিরাপত্তা কর্মীর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। আমাদের মতে, এটি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্রোহ সংঘটনের মামলা নয়। বরং এটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার মামলা।
৫. হাইকোর্ট বিভাগ বিশ্বাস করেছেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে আপিলকারী এবং অন্য দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আসামিপক্ষ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে যে, হাইকোর্ট বিভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন না করে আপিলকারীদের ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ করে কার্যত অবিচার করেছেন। তাই আমরা হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখতে পাই না। 
বিশেষ অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কমানোর পক্ষে আপিলকারীরা তাদের যথাযথ যুক্তি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমরা হাইকোর্টের বহাল রাখা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করতে চাই না। এই প্রেক্ষিতে আপিলকারীর আপিল, জেল আপিল ও ফৌজদারি রিভিউ আবেদন খারিজ করা হলো।”
পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া
আপিল বিভাগের রায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ৩৪ বছরের পথপরিক্রমা। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ আপিল বিভাগে বহাল রেখে রায় ঘোষণা করার ২১ দিন থেকে ২৭ দিনের মধ্যে যে কোনো সময় ফাঁসি কার্যকর করা যায়। আইনানুযায়ী এখন দণ্ডপ্রাপ্তদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, তারা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারে। রায় ঘোষিত হওয়ার সাত দিনের মধ্যে এরূপ প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে হয়। তবে, সাত দিন অতিক্রান্ত হলেও তারা কেউ প্রাণভিক্ষার আবেদন করেনি। অন্যপন্থাটি হলো, তারা আপিল বিভাগের কাছে রায়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারে। রায়ে আইনগত কোনো ভুল থাকলে এরূপ পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যায়। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হবে বলে ইতোমধ্যে জেল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পুনর্বিবেচনার আবেদন দাখিল করার সময়সীমা হলো ৩০ দিন। জানা মতে, এখন পর্যন্ত এই আবেদন দাখিল করা হয়নি।
আমাদের দাবি- আইনানুযায়ী রায়টি কার্যকর করা হোক। সেই সাথে এই হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় অন্য যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল সেসবও যেন অতিসত্বর বিচারের আওতায় আনা হয়। যাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশ থেকে অবলুপ্ত হয়।
আইনের সালতামামি
সেলিনা আক্তার
শ্রাবন্তী শেগুফ্তা
২০০৬ সালে বাংলাদেশের আইনসভা জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়ার প্রায় আড়াই বছর পর সংসদ গঠিত হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এই আড়াই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকার জারি করে শতাধিক অধ্যাদেশ। ২০০৯ সালে সংসদ এ সকল অধ্যাদেশের মধ্যে বেশ কিছু অধ্যাদেশকে প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ অনুমোদন করেছে আবার কিছু অধ্যাদেশকে বাতিলও করেছে। এ সময়ে সংসদ নতুন কিছু আইনও প্রণয়ন করেছে। বর্তমান আলোচনায় ঐসব নতুন আইন এবং যেসব অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয়া হয়েছে সেগুলোর পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মানবাধিকারের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে এমন কিছু আইনকেই প্রাধ্যান্য দেয়া হয়েছে।
তথ্য অধিকার আইন ২০০৯
জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ৫ এপ্রিল তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। এই আইনে ‘তথ্য অধিকার’ বলতে কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট হতে তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে বোঝান হয়েছে। আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম কিংবা সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকান্ডের সকল তথ্য নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য করবে এবং এই তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য গোপন করতে বা এর সহজলভ্যতাকে সঙ্কুচিত করতে পারবে না। কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত প্রতিবেদন বিনামূল্যে সর্বসাধারণের জন্য সহজলভ্য হতে হবে। ধারা-৯(১) তে বলা হয়েছে, তথ্য প্রাপ্তির আবেদনের ২০ দিনের মধ্যে তা সরবরাহ করতে হবে। আইনে ‘তথ্য কমিশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি তথ্য না পেলে বা ভুল তথ্য পেলে, তথ্য কমিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উক্তরূপ কার্যের তারিখ হতে তথ্য সরবরাহের তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিনের জন্য ৫০(পঞ্চাশ) টাকা হারে সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করতে পারবে।
জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির ফলস্বরূপ আইনটি প্রণীত হলেও এখন পর্যন্ত এটা আশানুরূপভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অধিকন্তু, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যে নিয়োজিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন
ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধন ছিল বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। মাসদার হোসেন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিলেও বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক হতে সময় লাগলো স্বাধীনতার পর প্রায় ৩৬ বছর। ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০০৭ জারি করে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১ নভেম্বর ২০০৭ থেকে বিচার বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করে। সংশোধনের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধি আইন ১৮৯৮-এর বেশ কিছু বিধানকে পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন- ৬ ধারাকে সংশোধন করার মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট নামে দুই ধরনের ম্যাজিস্ট্রেট সৃষ্টি করা হয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের এবং বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে। অন্যান্য আরো কিছু ধারাকে সংশোধন করে মূলত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটগণের ক্ষমতা ও কার্যাবলী নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং বলাই বাহুল্য বাংলাদেশের আইন প্রণয়নের ইতিহাসে এই আইনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে থাকবে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে, ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের মূল লক্ষ্যই ছিল বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনতা প্রদান করা। এ জন্য বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ উভয়েরই মানসিকতা পরিবর্তনসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
উপজেলা পরিষদ আইন ২০০৯
উপজেলা পরিষদের উপর সাংসদদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করে ২০০৯ সালের এপ্রিলে উপজেলা পরিষদ (রহিত আইন পুন:প্রচলন ও সংশোধন) আইন ২০০৯ পাস করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করার কথা বললেও এই আইনে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে যা সংবিধানের উক্ত বিধানের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেমন ২৫(১) ধারার অধীনে জাতীয় সংসদের সাংসদদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য থাকবে, এমন বিধান রাখা হয়েছে। আবার ২৫(২) ধারাতে বলা হয়েছে সরকারের সঙ্গে কোনো বিষয়ে পরিষদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিষদকে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যকে অবহিত করতে হবে। ২৭(খ)(৪) ধারায় সংশোধনী এনে বলা হয়েছে, উপজেলা পরিষদের প্রতিটি বৈঠকের পর পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে বৈঠকের কার্যবিবরণী স্থানীয় সদস্যদের কাছে পাঠাতে হবে। এই কার্যবিবরণী আগে শুধু সরকারের কাছে পাঠানোর বিধান ছিল। এ আইনের অধীনে উপজেলা পরিষদে স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা ৭ থেকে বাড়িয়ে ১৪ করা হয়েছে। ৩৩ ধারা সংশোধন করার ফলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এখন থেকে উপজেলা পরিষদের সচিব হিসেবে বিবেচিত হবেন।
সংবিধানের ৯ এবং ১১ অনুচ্ছেদ দ্বারা যথাক্রমে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎসাহ প্রদান এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে এই আইনে প্রদত্ত উপদেষ্টা হিসেবে কোন সাংসদের দেয়া সিদ্ধান্ত উপজেলা পরিষদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করার বিধান সংবিধানের উদ্দেশ্যের সাথে চলনসই নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। আবার এই আইনের মাধ্যমে সাংসদদের স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত করার যে বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে, তাও সংবিধানের ৫৯ (১) ও ৬৫ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। তাছাড়া এই আইনে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদদের প্রতি বৈষম্যও পরিলক্ষিত হয়। ২৫ ধারামতে শুধু নির্বাচিত ৩০০ জন সাংসদকেই উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে এবং সংরক্ষিত আসনের ৪৫ জন নারী সাংসদকে এর আওতায় আনা হয়নি যা চরমভাবে বৈষম্যমূলক।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০০৯
২৪ শে ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০০৯। দুর্নীতি ও ঘুষ, মুদ্রা জালকরণ, দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা, অবৈধ মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা, চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা, অপহরণ, খুন, মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি, নারী ও শিশু পাচার, চোরাকারবার এবং দেশী-বিদেশী মুদ্রা পাচার, চুরি বা দস্যুতা বা ডাকাতি, আদম পাচার ও অবৈধ অভিবাসন, যৌতুক এবং এ ধরনের অন্য যে কোনো অপরাধ সংঘটনের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি যদি অর্থ প্রাপ্ত হয় তাহলে তা হবে মানি লন্ডারিং। সম্পত্তির অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করার উদ্দেশ্যে অর্থ হস্তান্তর বা বিদেশে প্রেরণ বা বিদেশ থেকে আনা বা কোনো অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ গোপন করা অথবা গোপন করার চেষ্টা করাও এই আইন অনুসারে মানি লন্ডারিং-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন রোধ করাই মূলত এই আইনের লক্ষ্য, কেউ যাতে তার উপার্জিত অর্থ গোপন বা পাচার করতে না পারে, সে বিষয়েও বিধান আছে এই আইনে। আইনের ৪ থেকে ৮ ধারা পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধ ও তার শাস্তির বিধান করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে মানিলন্ডারিং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তির দেশে বা দেশের বাইরে অবস্থিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ প্রদান করতে পারে।
নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন ২০০৯
নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন ২০০৯, ৫ মার্চ ২০০৯ পাশ করা হয়। সংশোধনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব আইন ১৯৫১-এর ৫ ধারায় 'Father' শব্দটির পরিবর্তে 'Father and mother' শব্দ দুটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সংশোধনীটি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও এর মাধ্যমে জনগণের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হয়েছে। নাগরিকত্ব আইন ১৯৫১-এর ৫ ধারায় বিধান ছিল- সন্তানের পিতা বাংলাদেশী হলেই কেবলমাত্র সন্তান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করত। ফলে বাংলাদেশের যে কোনো নারী বিদেশী পুরুষকে বিয়ে করলে তার সন্তান এই দেশের নাগরিক বলে গণ্য হতো না, যা ছিল বাংলাদেশের নারীদের জন্য একদিকে যেমন অবমাননাকর, অন্যদিকে চরম বৈষম্যমূলক। আইন সংশোধনের মাধ্যমে এখন মায়ের পরিচয়ে সন্তানের নাগরিকত্ব নিধার্রণের বিধান চালু হলো এবং সন্তানের নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত হল। এটি বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের একটি অর্জনও বটে।
১৯ আগস্ট ২০০৮, জারিকৃত জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশটি সংসদ কর্তৃক গৃহীত হওয়ার পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ আইনের মর্যাদা লাভ করে। এই আইনে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্য নতুন কিছু অযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক কোন ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী, জনপ্রশাসন, সামরিক বাহিনী বা সরকারী কর্তৃপক্ষ বা সামরিক প্রশাসনের কোনো সাবেক সদস্য অথবা বেসরকারী সংস্থার সাবেক প্রধান, কোনো ঋণখেলাপী ও বিভিন্ন পরিসেবার কোনো বিলখেলাপী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এই আইনে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়াও দলগুলোর গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা এবং ২০২০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এই আইনে ব্যক্তি প্রার্থীর ব্যয় ৫ লাখ থেকে বর্তমানে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ করা হয়েছে এবং দলীয় ব্যয় দেড় কোটি থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চার কোটি টাকা করা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯
একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তৎপরতা এবং জনগণের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৪ জুলাই ২০০৯ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০০৭ জারি করা হয় এবং ২০০৮-এর সেপ্টেম্বর মাসে মানবাধিকার কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। ২০০৭ সালের আইনে বেশ কিছু বিষয় সংশোধন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ পাস করা হয়, যা ১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ থেকে কার্যকর বলে গণ্য করা হয়েছে। আগে দু’জন সদস্য এবং একজন চেয়ারম্যান নিয়ে কমিশন গঠনের বিধান থাকলেও বর্তমান বিধানমতে চেয়ারম্যান এবং অনধিক ছয় সদস্য নিয়ে কমিশন গঠন হবে। এই আইনে সার্বক্ষণিক ও অবৈতনিক দুই ধরনের সদস্য রাখার বিধান করা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও একজন সদস্য সার্বক্ষণিক হিসেবে কর্মরত থেকে বেতনপ্রাপ্ত হবেন এবং অন্যান্য সদস্যগণ অবৈতনিক হবেন। কমিশনের সদস্যগণের মধ্যে কমপক্ষে একজন মহিলা এবং এবং একজন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকতে হবে। [ধারা-৫]
রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা বা ব্যক্তির দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার বিধানের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিনের দাবির ফলে মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হলেও এই কমিশনকে এখন পর্যন্ত পুরোপুরি ক্ষমতাশালী ও কার্যকর করা হয়নি। আইনের উদ্দেশ্যকে সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত করতে হলে আইনটির প্রয়োজনীয় সংশোধনী খুবই জরুরি।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯
যে কোনো দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো সেই দেশে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং স্বনির্ভর নির্বাচন কমিশন থাকবে। আর এজন্য একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থাকা অপরিহার্য। এতদিন বাংলাদেশে স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন সচিবালয় না থাকায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পাদন করতে নানাবিধ সমস্যা পরিলক্ষিত হয়ে আসছিল। ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করার মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হলো।
এই আইন অনুযায়ী নির্বাচন সম্পর্কিত সমগ্র কার্যাবলী নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপর ন্যস্ত থাকবে। সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণে থাকবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। আইনের ৭ ধারায় নির্বাচন কমিশনকে আর্থিক স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা অপরিহার্য হলেও এতোদিন নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতাসীন সরকারের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হতো। একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ফলে সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদে উল্লেখিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষিত হবে বলে আশা করা যায়।
জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা
হাইকোর্টের রুলনিশি জারি
আবু ওবায়দুর রহমান
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল এবং বেঁচে থাকার অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় শ্রম আইন ২০০৬-এর প্রয়োগে ব্যর্থতার জন্য তাদেরকে কেন দায়ী করা হবে না এবং জাহাজ ভাঙা শিল্পে কেন শ্রম আইন ২০০৬ প্রয়োগের জন্য নির্দেশ দেয়া হবে না- এই মর্মে হাইকোর্ট শিল্প মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রধান শিল্প পরিদর্শক, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এবং জাহাজ ভাঙা শিল্প মালিক সমিতির সভাপতিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর দায়ের করা রিট মামলায় (রিট পিটিশন নং- ৭৫২৮/২০০৯) বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী উপরোক্ত আদেশ প্রদান করেন।
বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পের আবির্ভাব হয় নাটকীয়ভাবে। ষাটের দশকে প্রবল ঝড়ে ‘মিগ আলপাইন’ নামের জাহাজ সীতাকুণ্ড উপকূলে আটকা পড়ে। মালিক ঐ জাহাজ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। চট্টগ্রাম স্টিল মিলের ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম ঐ জাহাজ কেটে লোহা ও অন্যান্য মালামাল বিক্রি করে লাভবান হন। কাজটা লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় জনগণ পরবর্তীকালে জাহাজ ভাঙা ব্যবসা শুরু করে। ইতিপূর্বে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে জাহাজ ভাঙা হতো। পরবর্তীকালে পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত আইনের প্রচলন এবং শ্রমিকের উচ্চ মজুরির কারণে জাহাজ ভাঙা শিল্প পরিত্যক্ত ঘোষিত হলে এই শিল্প এশিয়ার কোরিয়া এবং তাইওয়ানে সমপ্রসারিত হতে থাকে। কিন্তু উপরোল্ল্লিখিত কারণে ঐ দুই দেশও জাহাজ ভাঙা শিল্পের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় আস্তে আস্তে বাংলাদেশ ও ভারতে এ শিল্পের প্রসার ঘটতে থাকে। এক পর্যায়ে ভারত সরকার পরিবেশ দূষণ বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করার ফলে জাহাজ ভাঙা শিল্পে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর এ সুযোগটির সদ্ব্যবহার করে বাংলাদেশ। কারণ জাহাজ ভাঙা শিল্প পূর্বে শ্রম আইনের আওতায় না পড়ায় এর কার্যক্রমে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাছাড়া কর্মসংস্থানের অভাব, ক্রমবর্ধমান লোহার চাহিদা, সরকারের রাজস্ব আয় ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশ জাহাজ ভাঙা শিল্প দ্রুত প্রসার লাভ করে। আরও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, বর্তমানে পরিত্যক্ত জাহাজ বিক্রির প্রধান বাজার হচ্ছে সিঙ্গাপুর। ভৌগোলিক কারণে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে জাহাজ আনতে কম খরচ পড়ে। সবকিছু মিলে জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সমুদ্রপাড়ের ১২-১৩ মাইল এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে জাহাজ ভাঙা শিল্প।
দেশের অবকাঠামোগত এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাহাজ ভাঙা শিল্পের অবদান অপরিসীম। দেশের নির্মাণ শিল্পের চাহিদার ৯০% লোহা আসে এ শিল্প থেকে। সরকার প্রতি বছর নয়শ’ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে। ত্রিশ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এবং দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার পরোক্ষভাবে এ শিল্পের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। জাতীয় পর্যায়ে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পরও সরকারের দায়িত্বহীনতার কারণে এ শিল্পে শ্রম আইন প্রয়োগ না করায় শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয় একেবারে অনুপস্থিত। জাহাজের ট্যাঙ্ক ও সিলিন্ডার কাটার সময় বিস্ফোরণ কিংবা ভারী লোহার সিটের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ কিংবা পঙ্গু হয়ে যাওয়া এ শিল্পে নিত্যদিনের ঘটনা। গত এক যুগে দুর্ঘটনায় ২৫০ জন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন এবং ৮০০ জনের অধিক চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রতিনিধি দল সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পায় যে, শ্রমিকরা চোখের নিরাপত্তার জন্য কোনো উপকরণ ব্যবহার ছাড়াই গ্যাসের শিখা দিয়ে জাহাজ কাটছে। গ্যাসমুক্ত করা ছাড়াই জাহাজের ট্যাঙ্ক এবং সিলিন্ডার গ্যাসের শিখা দিয়ে কাটা হচ্ছে। ভারী লোহার সিট শ্রমিকরা কাদামাটির মধ্যে কাঁধে করে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২ (৬১), ৭৪, ৭৫ এবং ৭৮ ধারায় উল্লেখ আছে যে, জাহাজ ভাঙা শিল্প এই আইনের আওতায় আসবে, শ্রমিকের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো ভারী জিনিস উত্তোলন বা বহন করা যাবে না। অতিমাত্রায় আলো এবং উত্তাপের ক্ষেত্রে চোখের জন্য নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোনো আধার বা চৌবাচ্চা গ্যাসমুক্ত না করে ঝালাই বা কাটার কাজ করা যাবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রম আইন ২০০৬ প্রয়োগের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা তাদের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে নিরাপদ কর্মস্থল এবং বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯
ইসরাত জাহান তামান্না
বাজার যখন ভেজালে সয়লাব, ভেজাল মেশানোটা যখন ব্যবসায়িক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, তখন গত ৫ এপ্রিল ২০০৯ দীর্ঘ প্রত্যাশিত এবং অত্যন্ত সময়োপযোগী ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণীত হয়। এ আইনের উদ্দেশ্যে হচ্ছে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ, ভোক্তা-অধিকার বিরোধী কাজ প্রতিরোধ এবং এ সংক্রান্ত যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১৩ অক্টোবর ২০০৮ ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল (অধ্যাদেশ সম্পর্কে বিস্তারিত দেখুন বুলেটিন ২০০৯, মার্চ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ১৪)। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার কিছু পরিবর্তনসাপেক্ষে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ পাস করে।
আইনে ভোক্তা বলতে যে কোনো পণ্য বা সেবা গ্রহণকারীকে বোঝানো হয়েছে। ভোক্তা যদি কোনো পণ্য বা সেবা গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে আইনানুসারে তিনি কারণ উদ্ভূত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে জাতীয় ভোক্তা- অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ২৩ ধারা অনুসারে থানার তদন্তকরী কর্মকর্তার মতো কাজ করবেন। তিনি অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাটি তদন্ত করতে পারবেন, তল্লাশি করতে পারবেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবেন এবং অভিযুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধেরও নির্দেশ দিতে পারবেন। প্রয়োজনে তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও সহায়তা নিতে পারবেন। অভিযোগের গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ৬০ ধারা অনুসারে উপযুক্ত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করবেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তা কর্তৃক অভিযোগ দায়ের করার ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল না হলে মামলা আমলযোগ্য হবে না (ধারা-৬১)। এখানে উল্লেখ্য, বর্তমান আইনানুসারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ফৌজদারি প্রতিকারের জন্য সরাসরি আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে না। তবে দেওয়ানি প্রতিকার অর্থাৎ ক্ষতিপূরণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি উপযুক্ত আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করতে পারবেন।
যেসব অপরাধকে এই আইনে দণ্ডনীয় করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো- পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা, মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা, সেবার মূল্য তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা, ধার্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে বিক্রয় বা সেবা প্রদান করা, ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রয় করা, খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত দ্রব্যের মিশ্রণ দেয়া, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাত করা, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দেয়া, ওজনে কারচুপি করা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয় করা ইত্যাদি। এসব অপরাধের শাস্তিস্বরূপ অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ প্রমাণিত হলে এক বছর থেকে তিন বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারেন। দণ্ড পাওয়ার পর কোনো ব্যক্তি যদি একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করে তাহলে তিনি পূর্বের দণ্ডের দ্বিগুণ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইনের ৬৯ ধারা অনুসারে, এই আইনের অধীনে মহাপরিচালকের যেসব ক্ষমতা ও কার্যাদি রয়েছে ওই সব ক্ষমতা ও কার্যাদি কোনো জেলার স্থানীয় অধিক্ষেত্রে ওই জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োগ করতে পারবেন। এজন্য তার মহাপরিচালকের পূর্বানুমোদনের কোনো প্রয়োজন নেই। এই ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট তার অধীনস্থ কোনো ম্যাজিস্ট্রেটকেও প্রদান করতে পারবেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কোনো কারণে যদি মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো ব্যক্তির অভিযোগ গ্রহণ না করে অথবা অভিযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে তাহলে ওই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
অতএব আপাতভাবে আইনটিকে ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন মনে হলেও আইনে অনেক দুর্বলতাও আছে। তাছাড়া আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা খুবই নেতিবাচক। এ কারণে আইনটি নিয়ে অনেক সমালোচনাও হয়েছে। যেমন-
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে কোনো ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ আইনে সেটা প্রতিকারের কোনো সুযোগই নেই। এর ৭২ ধারায় বলা হয়েছে, ওষুধে ভেজাল মিশ্রণ করা হচ্ছে কিনা বা নকল ওষুধ প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা অনুসন্ধান করে উদ্ঘাটন করার ক্ষমতা ও দায়িত্ব মহাপরিচালকের থাকলেও এ বিষয়ে কোনো বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণ বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ওষুধ সংক্রান্ত আলাদা একাধিক আইন আছে। ওই সব আইনেরই কোনো প্রয়োগ আমাদের চোখে পড়ে না। সুতরাং নতুন করে আরো একটি আইনে ভেজাল ওষুধের বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো অহেতুক জটিলতা তৈরি করা। ওষুধ সংক্রান্ত যেহেতু একটি ভিন্ন কর্তৃপক্ষ আছে, তাই এক্ষেত্রে এই আইনের কর্তৃপক্ষ এবং ওষুধ কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বের সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
আবার, ’৭৩ ধারায় বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে পরিচালিত স্বাস্থ্য পরিসেবা পরিবীক্ষণ করে পরিলক্ষিত ত্রুটি-বিচ্যুতি উদ্ঘাটন করার ক্ষমতা মহাপরিচালকের থাকলেও তিনি কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন না। এক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের জন্য আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত করা এবং এর ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনত ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সুতরাং এক্ষেত্রেও একটা অহেতুক জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
আইনের ৭৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো কাজের সাথে বিক্রেতা যদি জ্ঞাতসারে সংশ্লিষ্ট না থাকেন তাহলে এই আইনের অধীনে তাকে দায়ী করা যাবে না। আবার কোনো পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে যদি কোনো বিক্রেতার সংশ্লিষ্টতা না থাকে তাহলে তাকে ওই পণ্যের জন্য দায়ী করা যাবে না। আমরা জানি, সাধারণত মালিক বা পরিচালক জেনেশুনেই তার বিক্রয় কেন্দ্রে পণ্য রাখেন। সুতরাং অনেকেই মনে করেন, এ বিধানের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ পণ্যের বিক্রেতাকে ধরার ক্ষেত্রে যদি এতসব শর্ত জুড়ে দেয়া হয় তাহলে আর কোনোভাবেই ভোক্তার অধিকার সংরক্ষিত হয় না। কেননা কোনো ভোক্তার পক্ষেই আসল উৎপাদনকারীকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। তবে এক্ষেত্রে আমাদের আরো একটি নীতির কথা মনে রাখতে হবে, সেটা হলো Caveat Emptor বা ক্রেতা সাবধান। এটাও আইনের একটা প্রতিষ্ঠিত নীতি। এই নীতি অনুসারে ক্রেতাকেও পণ্য ক্রয় বা সেবা গ্রহণের সময় যাচাই করতে হবে। পণ্যে বা সেবার এমন কোনো ক্রটি নিয়ে অভিযোগ করা যাবে না যা ক্রেতার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৫ ধারায় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। যেখানে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ভোক্তা সংগঠনের কেবল একজন সদস্যকে নেয়া হবে আর বেশিরভাগ সদস্যই সরাসরি সরকারি কর্মকর্তা। এমন পরিষদ গঠনের মাধ্যমে ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সৃষ্টি করা হয়েছে যেটি এ আইনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আইনটি প্রণীত হলেও এতে থেকে গেছে নানা অসঙ্গতি ও নানা দুর্বলতা। আর এই দুর্বলতার কারণে আইনটি প্রণয়নের পরপরই সংশোধনের দাবি উঠছে। আইনটি তৈরির পূর্বে এ সংক্রান্ত যে অধ্যাদেশ পাস করা হয়েছিল তাতে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণে কিছু ঘাটতি ছিল। বর্তমান আইনে সেই দুর্বলতা দূর না করে বরং এমন কিছু বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে যেটি ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ না করে উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
হাইকোর্টের দুটি রুল
শ্রাবন্তী শেগুফ্তা
কেউ যখন অন্যায়ের শিকার হয়, তখন ন্যায়বিচার লাভের আশায় রাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়।
কিন্তু রক্ষক যদি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় অর্থাৎ রাষ্ট্র যদি নিজেই আইন লঙ্ঘনকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে বিচারপ্রার্থী মানুষজন কীভাবে প্রতিকারের আশা করতে পারে। আইন-শৃঙ্খলার ক্রমাবনতি রোধে বিগত জোট সরকার আমলে ২০০৪ সালে গঠিত হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। র্যাব গঠনের পরপরই দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের অভিধানে যুক্ত হয় আরেকটি শব্দ ’ক্রসফায়ার’। বিভিন্ন সময়ে ’ক্রসফায়ার’ শব্দটি নাম পরিবর্তন করে হয়েছে ’বন্দুকযুদ্ধ’, ’এনকাউন্টার’ অথবা অতি সমপ্রতি ‘আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালানো’। কিন্তু যে নামেই ডাকা হোক না কেন এগুলো সবই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। সন্ত্রাস দমনের নামে যখন থেকে র্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়, তখন থেকেই সচেতন নাগরিক সমাজের সাথে সাথে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগও ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে থাকে। ক্ষমতায় গেলে তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক এরূপ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধেরও ঘোষণা দেয়। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। কিন্তু সরকার গঠনের পর যখন আবারো একই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুরু হয়, তখন খোদ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মুখ থেকেই শোনা যেতে থাকে ক্রসফায়ারের পক্ষে নানা বক্তব্য।
পত্রিকাসূত্রে প্রাপ্ত আসক-এর তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক ক্রসফায়ারে নিহতের সংখ্যা ২০০৪ সালে ছিল ১৩৪ জন, ২০০৫ সালে ৩৫৪ জন, ২০০৬ সালে ২৫৮ জন, ২০০৭ সালে ১১৫ জন, ২০০৮ সালে ১৪১ জন এবং ২০০৯-এর নভেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ১১৩ জন।
সমপ্রতি মাদারীপুরে র্যাবের হাতে ক্রসফায়ারে নিহত হয় দুই ভাই লুৎফর খালাসী ও খায়রুল খালাসী। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ১৭ নভেম্বর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে (ক্রসফায়ার) কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- এই মর্মে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব, র্যাবের মহাপরিচালক, র্যাব-৮-এর অধিনায়ক ও সেনা কর্মকর্তা মেজর ওয়াহিদুজ্জামানকে জবাব প্রদানের জন্য বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান ও বিচারপতি ইমদাদুল হক আজাদের দ্বৈত বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরূদ্ধে আসক শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল, এমতাবস্থায় আদালত এই ইস্যুতে যখন স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে তখন আসক পক্ষভুক্ত হওয়ার আবেদন জানালে আসককেও পক্ষভুক্ত করা হয়। এখানে উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে লুৎফর খালাসী ও খায়রুল খালাসীর আরেক ভাই ওবায়দুল খালাসীকেও র্যাব ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করে।
গত ২৯ জুন ২০০৯ আসক এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও কর্মজীবী নারীর যৌথভাবে করা একটি রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মাহমুদ হুসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ও ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণের আদেশ দেয়া হবে না এই মর্মে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে সরকারের প্রতি একটি রুল জারি করে। এ বিষয়ে সরকার কোনো জবাব প্রদান করেনি, মামলাটি বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় আছে।
প্রত্যেকেরই জীবনের অধিকার আছে- হোক সে চরম দুর্ধর্ষ অপরাধী কিংবা নিষ্পাপ একজন ব্যক্তি। জীবনের অধিকারকে মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশন কিংবা দলিলপত্র, সর্বোপরি বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ ধারা অনুযায়ী মানবাধিকার তথা মৌলিক অধিকার হিসেবে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন কোনো আইনের পরোয়া না করে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যায়, তখন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা কি দুরাশা নয়? রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মৌলিক অধিকারসহ সব মানবাধিকার রক্ষা করা। কিন্তু এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক প্রসারের ফলে রাষ্ট্রের পক্ষে কি মানবাধিকার রক্ষা করা আদৌ সম্ভব? ক্রসফায়ার ইস্যুতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সামপ্রতিক সময়ের কিছু বক্তব্য এখানে উল্লেখ না করলেই নয়- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বলেছেন, বর্তমান সরকারের আমলে দেশে কোনো ক্রসফায়ারই হয়নি [সূত্র: ১৮ নভেম্বর, বিভিন্ন পত্রিকা]। অপরদিকে ক্রসফায়ার বিষয়ে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, “এনকাউন্টারে সন্ত্রাসী নিহত হলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না।” আবার ক্রসফায়ারকে বৈধতা প্রদান করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক বলেছেন- “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এবং আইনের শাসন অব্যাহত রাখতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইনানুযায়ী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। এটাই স্বাভাবিক।” [সূত্র: ৯ অক্টোবর, প্রথম আলো]
এখন প্রশ্ন হলো, ক্রসফায়ার কীভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা হলো? যেহেতু এর পক্ষে কোনো আইন নেই, সেহেতু এটি শুধু আইন বহির্ভূতই নয়, সংবিধানবহির্ভূতও বটে। যেখানে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার, ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার এবং অনুচ্ছেদ ৩৫ ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকার নিশ্চিত করে সেখানে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ যখন এরূপ মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে বক্তব্য প্রদান করেন তখন কি তা, তাদের প্রতি অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব অবমাননারই নামান্তর নয়? বিগত জোট সরকারের আমলেও সময়ে সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আলোচনায় এসেছেন ‘ক্রসফায়ারের’ সপক্ষে বক্তব্য দিয়ে। তখন বিরোধী দলে থেকে আওয়ামী লীগ এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা জ্ঞাপন করলেও বর্তমান সময়ে যখন তাদের মধ্য থেকেই একই ধরনের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি শোনা যায় তখন আসলেই ভয়াবহ এক সামাজিক বিপর্যয়ের শঙ্কায় চিন্তিত হতে হয়। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বর্তমান সরকার ‘ক্রসফায়ারের’ বিরুদ্ধে যেরূপ সোচ্চার ছিল বর্তমানেও ‘ক্রসফায়ার’ ইস্যুতে একই অবস্থানে তারা অবস্থান করবে জনগণ তাই প্রত্যাশা করে। সর্বোপরি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে হাইকোর্টের সামপ্রতিক দুটি রুল সচেতন নাগরিকদেরই চিন্তা- শীলতার প্রতিনিধিত্ব করে।