আইন-তথ্য
খতিয়ান ও নামজারি: আইন এবং বাস্তবতা
ফারহানা লোকমান
তারা মিয়া একজন কৃষক। স্ত্রী কাজল রেখা এবং দুই মেয়ে আশা ও লতাকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ৭ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে তিনি সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল যখন তারা মিয়া তার বড় মেয়ে আশাকে বিয়ে দেয়ার টাকার ব্যবস্থা করার জন্য জমি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। যার কাছে তিনি জমি বিক্রি করতে গেলেন তিনি তারা মিয়ার জমির কাগজপত্র দেখে বললেন, উত্তরাধিকার সূত্রে তুমিই জায়গার মালিক কিন্তু খতিয়ানে তো তোমার নাম নেই, আছে তোমার মৃত বাপের নাম, নামজারির মাধ্যমে তোমার নাম খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত না করলে তো জমি রেজিস্ট্রি দিতে পারবা না। তারা মিয়া বুঝতে পারছিলেন না তার এখন কী করতে হবে? এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে খতিয়ান ও নামজারি কী তা জেনে নেয়া প্রয়োজন।
খতিয়ান
কোনো মৌজার দাগ অনুসারে ভূমির মালিকের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, মালিকানার বিবরণ, জমির বিবরণ, তৌজি নাম্বার, মৌজার ক্রমিক নাম্বার (জে এল নাম্বার), সীমানা, জমি শ্রেণী দখলকারীর নাম, অংশ, অংশ মতে পরিমাণ সংবলিত যে তালিকা বা দলিল তাই হলো খতিয়ান। খতিয়ান মানেই এসব বর্ণিত বিষয়ের একটি সুস্পষ্ট হিসাব। একে ভূমিশুমারিও বলা যায়।
সরকার বিভিন্ন সময়ে খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে সারাদেশে জরিপ করে এই খতিয়ান প্রস্তুত করে। সরকারের ভূমি জরিপের মূল উদ্দেশ্য ভূমি দখলকারী হতে খাজনা আদায় করা। সে কারণে ভূমিতে যিনি দখলকার তার নামে ভূমি জরিপ করা হয়। এ দখলকারী ওই সম্পত্তিতে কী মূলে দখলকার তার স্বত্ব নির্ধারণ জরিপ কর্মকর্তার কাজ নয়। তাই খতিয়ান হচ্ছে, দখলের প্রামাণ্য দলিল, স্বত্ব বা মালিকানার দলিল নয়। খতিয়ানে মালিক ছাড়া অন্য কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে উক্ত ভূমিতে যেমন সেই ব্যক্তির কোনোরূপ মালিকানা সৃষ্টি হয় না, তেমনি প্রকৃত মালিকের মালিকানাও নষ্ট হয় না। কিন্তু খতিয়ান একটি সরকারি দলিল, ভূমি হস্তান্তর, খাজনা/রাজস্ব আদায়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
সর্বপ্রথম সার্ভে আইন ১৮৭৫ এবং বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ১৮৮৫-এর অধীনে সরেজমিনে ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা জরিপ করে সিএস (Cadastral Survey) খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। একই আইনের অধীনে আরএস (Revenue Survey) প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের অধীনে যথাক্রমে এসএ (State Acquisition Survey) এবং বিএস (Bangladesh Survey) খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। সিএস খতিয়ানকে বাংলাদেশি ভূমি ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।
নামজারি
ভূমি মালিকানার পরিবর্তনে সর্বশেষ খতিয়ানে নাম ও দাগসহ নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করাকে নামজারি (mutation) বলা হয়। এক কথায় মূল মালিকের নাম খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার আইনানুগ প্রক্রিয়াকে নামজারি বা mutation বলা হয়। খতিয়ান হালনাগাদ করা, সংরক্ষণ ও সংশোধনের মাধ্যম হলো নামজারি করা।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বা এডিসিকে (রেভিনিউ) নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে খতিয়ান সংরক্ষণ ও সংশোধনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে-
ক. রেজিস্ট্রিকৃত দলিল মূলে জমি হস্তান্তরিত হলে
খ. ভূমি মালিকের মৃত্যু ঘটলে
গ. সার্টিফিকেট মোকদ্দমা ও কোর্ট মোকদ্দমা কর্তৃক কোনো জমি নিলাম বা স্বত্বাধিকার ঘোষিত হলে
ঘ. সরকার খাস জমি বন্দোবস্ত দিলে
ঙ. পরিত্যক্ত হওয়া বা অধিগ্রহণ করা বা নদী সিকস্তির (ভাঙনের) কারণে খাজনা মওকুফ হলে।
নামজারির আবেদন
কোনো ব্যক্তি তার নামে খতিয়ানে নামজারি করাতে চাইলে তাকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সংক্ষেপে এসি (ল্যান্ড)-এর কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনপত্রের সাথে যে দলিলের মাধ্যমে সে মালিকানা পেয়েছে তার ফটোকপি দিতে হবে। যেমন কবলা বা আদালতের রায়ের কপি। উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হলে ওয়ারিশ সনদপত্র দিতে হবে। অর্থাৎ গল্পের তারা মিয়াকে চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদপত্র নিয়ে এসি (ল্যান্ড)-এর কাছে আবেদন করতে হবে। সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ কোর্ট ফি, ভূমি উন্নয়ন কর ও নতুন খতিয়ানের জন্য ফি দেয়া লাগবে। এসি (ল্যান্ড) তহসিলদারের কাছে আবেদনপত্রসহ পাঠাবেন, তহসিলদার দখল আছে কিনা জরিপ করে এসি (ল্যান্ড)-এর কাছে রিপোর্ট পাঠাবেন। এসি (ল্যান্ড) তার ওপর ভিত্তি করে নামজারি করবেন।
যদিও আইনত শুধু তিন ধরনের ফি দেয়ার বিধান, কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো এর সাথে তহসিলদার এসি (ল্যান্ড)- কে উৎকোচ প্রদান না করলে আবেদনপত্র দেখাই হয় না অর্থাৎ ফাইল খোলাই হয় না।
খতিয়ানে ভুলে অন্যের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে কী করণীয়?
কোনো খতিয়ানে জরিপের সময় মূল মালিকের নামের পরিবর্তে ভুলে অন্য কোনো ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে মূল মালিককে খতিয়ান সংশোধনের জন্য জমির দাম অনুযায়ী উপযুক্ত আদালতে মামলা করতে হবে। আদালত খতিয়ান ভুল, এই মর্মে রায় (ডিক্রি) দিলে সেই ডিক্রি মূলে খতিয়ান সংশোধনের জন্য এসি (ল্যান্ড)-এর কাছে আবেদন করতে হবে, এমনকি সরকারি সম্পত্তি ভুলে খতিয়ানে কোনো ব্যক্তির নামে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে সরকারকেও খতিয়ান সংশোধনের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি আনয়ন করতে হবে। এই বিষয়ে হাইকোর্টের নজির হলো- ‘খতিয়ান সংক্রান্ত স্বত্বের প্রশ্নে একমাত্র দেওয়ানি আদালতই সিদ্ধান্ত প্রদান করতে পারে’ (১৫ ডিএলআর ৪৮৩)। কারণ রাজস্ব কর্মকর্তা এসি (ল্যান্ড)-এর কোনো বিচারিক ক্ষমতা নেই। তিনি জমির স্বত্ব নির্ধারণ করতে পারেন না।
আদালতের রায় বা ডিক্রি মূলে নামজারি করতে গেলে আবেদনকারীর স্বত্ব সম্পর্কিত কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি রাজস্ব কর্মকর্তা করতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ডিক্রি পাওয়ার পরও দখল ও স্বত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে রাজস্ব কর্মকর্তা আবেদনকারীকে হয়রানি করেন ও উৎকোচ প্রদানে বাধ্য করেন।
দরিয়াপুর গ্রামের কলিমুল্লাহর সংসার স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে। তার নিজস্ব ১০ বিঘা জমির খাজনা পরিশোধ করতে তহসিল অফিসে গিয়ে দেখতে পান তার দাগের জায়গার মালিকের নাম লেখা সরকার। অগত্যা তিনি বিধান অনুযায়ী সাথে সাথে সহকারী জজ আদালতে খতিয়ান সংশোধনের মামলা করেন। তিনি বছরের পর বছর মামলা চালানোর পর আদালত কলিমুল্লাহর পক্ষে রায় দেন এবং খতিয়ান সংশোধনের নির্দেশ দেন।
সরকার আপিল করে, আপিলে আগের রায় বহাল রাখা হয়। এরপর কলিমুল্লাহ এই রায় মূলে খতিয়ান সংশোধনের জন্য এসি (ল্যান্ড)-এর কাছে আবেদন করেন। এসি (ল্যান্ড) তাকে জানান, ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়েল ১৯৯০ (৩২৪ অনুচ্ছেদ) অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বা এডিসির (রেভিনিউ) অনুমতি লাগবে। অনুমতির জন্য রিপোর্ট গেলে এডিসি (রেভিনিউ) হাইকোর্ট উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ দশ বছর রিভিশন মামলা চলার পর ২০০৯ সালে হাইকোর্টে সহকারী জেলা জজের রায় বহাল রাখেন, অর্থাৎ খতিয়ান ভুল ঘোষণা দেন। এদিকে মামলার খরচ চালাতে গিয়ে কলিমুল্লাহর প্রচুর টাকা ধার হয়ে যায়। এছাড়া তার চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন পড়ে। জমি বিক্রি ছাড়া তিনি আর উপায় খুঁজে পান না। এসি (ল্যান্ড)-এর কাছে পুনরায় নামজারির আবেদন করেন। তিনি জানান, আবার এডিসির (রেভিনিউ) অনুমোদন নেয়ার জন্য তার কাছে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। রিপোর্টের জন্য ফাইল তহসিলদারের কাছে পাঠালে তিনি জানান- আদালতের রায়ে কী হয়, নামজারি হবে কি হবে না তা তো নির্ভর করবে আমার রিপোর্টের ওপর। পনেরো, বিশ হাজার টাকা বকশিশ না দিলে তো হাত চলবে না, তাছাড়া স্যার অনুমতি দেবেন, তাকে খুশি করারও তো ব্যাপার আছে।
কলিমুল্লাহ পড়েছেন অকূল পাথারে। নিজের জায়গা নিজের নামে আদালতের রায় আনতেই তার আয়, স্বাস্থ্য, সঞ্চয় গিয়ে তিনি এখন ধারে জর্জরিত। আবার এত টাকা তিনি কই পাবেন?
ভুলক্রমে কোনো ব্যক্তির জমি ১নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে অর্থাৎ সরকারি খাস জমি হয়ে গেলেও তাকে একই পদ্ধতিতে নাম সংশোধন করতে হয়। এতে ডিক্রিপ্রাপ্ত ব্যক্তি অহেতুক লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হয়, আদালত ও প্রশাসনের কাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরের পর বছর মূল মালিক তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। আদালতের রায় মানা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও এডিসি (রেভিনিউ) অনুমোদনের জন্য অহেতুক সময়ক্ষেপণ করেন। এই সংক্রান্ত হাইকোর্টের নজির হলো-
‘দেওয়ানি আদালতের রায় সরকার মানতে বাধ্য, যদি না তা উপযুক্ত আদালত দ্বারা বাতিল হয়’ (৪৫ ডিএলআর-৫)।
অনেক সময় সমন পাওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে কেউ আদালতে হাজির হয় না। ফলে সরকারের বিপক্ষে একতরফা ডিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু সরকারের বিপক্ষে একতরফা ডিক্রি গ্রহণযোগ্য নয় বলে এডিসি (রেভিনিউ) নামজারি প্রক্রিয়া বন্ধ রেখে আপিল দায়ের করেন। যেসব কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে একতরফা ডিক্রি হয়, তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তো নেয়াই হয় না বরং ডিক্রিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মামলার ডিক্রির ফলভোগ হতে বিরত রাখা হয়। Transparency International Bangladesh কর্তৃক এক জরিপে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে বাংলাদেশের মানুষ ৮৯% ঘুষ দিয়েছে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতায়। সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি দপ্তরের মধ্যে ভূমি অফিসের অবস্থান দ্বিতীয়। এই জরিপই ঘোষণা করে বাংলাদেশের কলিমুল্লাহদের অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। সম্পত্তির অধিকার সুষ্ঠুভাবে ভোগ করার জন্য এসব বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক।