সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   বিশেষ রচনা
   পরিবেশ
   ফলোআপ
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন-তথ্য
   মত-অভিমত

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

বিশেষ রচনা


আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে
বাংলাদেশ

তাবাস্‌সুম মখ্‌দুমা

সমুদ্রের সংবিধান বলে অভিহিত ১৯৮২ সালের ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি-এর আবির্ভাব বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। বাংলাদেশের সমুদ্র তলদেশ নানা রকম প্রাকৃতিক, খনিজ ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ। আর এই কনভেনশন নিঃসনেদহে বাংলাদেশকে সুযোগ করে দিয়েছে এসব সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য। কিন্তু এরপরও বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে অনেক গুণে।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের অপ্রতুলতা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় মূল্যবৃদ্ধি, এর বিকল্প হিসেবে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জৈবজ্বালানির ব্যবহার, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে খাদ্যদ্রব্যের সঙ্কট, সমুদ্র সম্ভাবনার বিষয়টিকে আরো জীবন্ত করে তুলেছে। মাত্রাতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে স্থলভাগের তেল, গ্যাস আর কয়লা প্রায় নিঃশেষ হওয়ার পথে। অর্থাৎ যেসব দেশ জ্বালানির জন্য মূলত আমদানির ওপর নির্ভর করে তাদের সস্তায় তেল-গ্যাস পাওয়ার দিন শেষ হওয়ার পথে। অন্যদিকে সমুদ্র তলদেশে জ্বালানির এক বিশাল ভাণ্ডার মজুদ আছে বলে নানান গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। পৃথিবীর সব দেশই এখন সাগরতলের জ্বালানির দিকে নজর দিচ্ছে।

অন্যদিকে মৎস্য ও অপরাপর জলজ সম্পদ আহরণের একটি বিশাল ক্ষেত্র হচ্ছে সমুদ্র। অথচ প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশ পারছে না এই বিপুল সম্পদ দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করতে। আর এই সচেতনতার অভাব প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারকে সুযোগ করে দিয়েছে এ দেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে বেআইনিভাবে মাছ এবং অপরাপর সমুদ্রজাত সম্পদ আহরণ করতে।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা সুবিধাজনক নয়। তার ওপর বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশেই সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে বিরোধ থাকার কারণে বাংলাদেশ পুরোপুরি তার সমুদ্রসীমার অন্তর্গত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারছে না। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত Territorial Waters and Maritime Zones Act of ১৯৭৪’ অনেক আশা জাগালেও বস্তুত নীতিনির্ধারক মহলে উদাসীনতার দরুন বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা ও সমুদ্র তলদেশে অবস্থিত নানা সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়। এ কারণে দেখা যায় যে, দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম দেশ হিসেবে এরকম যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করলেও বাস্তবে এর তেমন কোনো প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি।

১৯৮২ কনভেনশন সমুদ্র সম্পর্কিত যাবতীয় বিধিবিধানকে একত্র করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এতে সমুদ্রকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। এতে সমুদ্রের নানা সম্পদের ওপর সংশ্লিষ্ট উপকূলীয় রাষ্ট্র ও অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথমত, উপকূলের প্রকৃতি অনুসারে একটি ভিত্তিরেখা স্থির করে তা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ১.১৫ মাইল সমান এক নটিক্যাল মাইল) পর্যন্ত অঞ্চলকে রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা ঘোষণা করা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে। আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে অন্যান্য রাষ্ট্রের পতাকা উত্তোলিত করে পানির ওপর ভেসে থাকতে হবে। রাষ্ট্র যদি তার নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় মনে করে তাহলে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে নির্দোষ অতিক্রমণও নিষিদ্ধ করতে পারে। ভিত্তিরেখার ভেতরের যাবতীয় জলপথ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ জলরাশি। এতে বিদেশি জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে না।

পরবর্তী ১২ নটিক্যাল মাইলকে সংলগ্ন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে উপকূলীয় রাষ্ট্র চোরাচালান ও অবৈধ অভিবাসন রোধ করার জন্য রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ করতে পারবে। কনভেশনের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিকটি হলো ভিত্তিরেখা থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকাকে সংলগ্ন উপকূলীয় রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা। এই সীমারেখার মধ্যে উপকূলীয় রাষ্ট্রের সমুদ্র তলদেশ এবং উপরিস্থিত সব ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করার একচ্ছত্র অধিকার থাকেব।

কনভেনশনে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিধান করা হয়েছে মহীসোপান (ভূপৃষ্ঠ থেকে সমুদ্রতল পর্যন্ত সমুদ্রের ঢালই মহীসোপান) সম্পর্কে। যেক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রের মহীসোপান ২০০ নটিক্যাল মাইলের চেয়ে বেশি সেক্ষেত্রে তলদেশস্থ সম্পদ আহরণ করার অধিকার সর্বোচ্চ ১৫০ অর্থাৎ ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে। তবে এই বর্ধিতাংশ একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গণ্য হবে না। তার জলরাশি উন্মুক্ত সমুদ্র হিসেবেই পরিগণিত হবে। অন্যদিকে যেক্ষেত্রে ২০০ মাইলে শেষ হবে সেখানে এর পরবর্তী অংশকে উন্মুক্ত সমুদ্র ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর তলদেশকে ‘মানবজাতির অভিন্ন সম্পদ’ ঘোষণা করে এতে সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চিরতরে খর্ব করা হয়েছে এবং এখানকার যাবতীয় সম্পদরাজি মানবজাতির কল্যাণে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে।

১৯৮২ সালে কনভেনশনের ষষ্ঠ ভাগের তলদেশ সংক্রান্ত বিধানগুলোর বাস্তবায়নের জন্য ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক সমুদ্র তলদেশ কর্তৃপক্ষ সংক্ষেপে আইএসএ গঠিত হয়। কনভেনশনের ১৫৫টি পক্ষরাষ্ট্র এর সদস্য। এটা একটি স্বতন্ত্র ও কর্তৃত্বশালী সংগঠন। যার গঠন ও কার্যক্রম অনেকাংশে জাতিসংঘের মতোই। যেখানে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য একটি ট্রাইব্যুনালও রয়েছে।

২০০১ সালে কনভেনশন অনুসমর্থন করার পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে ৩৫০ নটিক্যাল মাইলের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী জাতিসংঘে দাবি উত্থাপন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইতোমধ্যে সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সমস্যা সমাধানের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে যাবে বলে সরকার থেকেই বলা হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে কাজ শুরুই করতে পারছে না চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে স্থলভাবে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের খুব বেশি সম্ভাবনাও নেই। বর্তমানে যেগুলো চালু আছে সেগুলোর ফুরিয়ে যাওয়ার সঙ্কেত দিচ্ছে ঘনঘন। তার সাথে যোগ হয়েছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সঙ্কট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এর প্রেক্ষিতে গত বছর গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার পর মিয়ানমার ও ভারত সমুদ্রসীমা নিয়ে আপত্তি জানায় এবং বিডিংয়ে অংশ না নিতে বিভিন্ন বৃহৎ তেল কোম্পানিকে চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ জানায়। ফলে তারা অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। সমুদ্রসীমা নির্ধারিত না থাকার জন্যই এটা ঘটেছে। তখনই আসলে সরকারের টনক নড়ে এবং তোড়জোড় শুরু হয়।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অবহেলাই এর জন্য দায়ী। এই দীর্ঘ সময় ধরে এক প্রকার ফেলেই রাখা হয়েছিল সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ব্যাপারটি। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সমুদ্র এলাকাকে যে ২৮টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছিল, তাতে ভারত ৫টি এবং মিয়ানমার ৭টি ব্লক নিয়ে তাদের আপত্তি জানায়, যেগুলো ভূতাত্ত্বিক বিচারে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত হয়ে আসছিল। যেটা সবচেয়ে দুঃখজনক তা হলো, এখনকার আন্তর্জাতিক আইনের বিচারে ভারত ও মিয়ানমারের আপত্তি টিকবে না বলে সরকার থেকেই বলা হচ্ছে, কেবল নির্ধারিত না থাকার কারণেই বাংলাদেশ অনুসন্ধানে নামতে পারছে না। ফলে বঞ্চিত হচ্ছে নিজেদেরই সম্পদ আহরণ থেকে।

অনেক দেরিতে হলেও বাংলাদেশ সমুদ্রসীমার গুরুত্ব অনুধাবন করেছে এবং ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়েছে। বাংলাদেশের এই পদক্ষেপের কথা ভারত ও মিয়ানমারকে জানানো হলে মিয়ানমার এক্ষেত্রে আপত্তি জানায়। তবে আশার কথা, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী দেশ দুটির সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে সমান আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এদিকে বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমারের মহীসোপানের দাবির বিষয়ে বাংলাদেশের আপত্তির মুখে বিরোধ নিষ্পত্তি স্থগিত করেছে জাতিসংঘ। মিয়ানমার তাদের জন্য নির্ধারিত সময়ে জাতিসংঘে সাগরের মহীসোপানের দাবি উত্থাপন করেছিল। কিন্তু এ দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘে আপত্তি জানিয়ে বলেছে, মিয়ানমারের দাবিকৃত মহীসোপানে বাংলাদেশেরও দাবি রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১১ সালের মাঝামাঝি নিজ দেশের এ দাবি জাতিসংঘে উত্থাপন করবে। ফলে বাংলাদেশের দাবি উত্থাপনের আগে যেন মিয়ানমারের দাবির নিষ্পত্তি করা না হয়। বাংলাদেশের এমন আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ মিয়ানমারের দাবির নিষ্পত্তি স্থগিত করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনালে সালিশের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশের নোটিশের জবাব দিয়েছে মিয়ানমার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পাঠানো এ জবাবে মিয়ানমার সালিশে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে ভারতীয় বিচারপতি চন্দ্রশেখর রাওকে আরবিট্রেটর নিযুক্ত করেছে। বাংলাদেশ ৮ অক্টোবর ভারত ও মিয়ানমারের ওপর সালিশের নোটিশ জারি করেছে উপকূল থেকে সাড়ে তিনশ’ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রসীমা নির্ধারণের লক্ষ্যে। তার পরে সাগরের মহীসোপান রয়েছে। সালিশের বাইরে আলাদাভাবে জাতিসংঘে মহীসোপানের দাবির নিষ্পত্তি হবে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ভারতের মহীসোপানের দাবির বিষয়েও জাতিসংঘে আপত্তি জানিয়েছে। এ আপত্তির মধ্যে মিয়ানমারের দাবি স্থগিত করলেও ভারতের দাবির নিষ্পত্তি এখনও স্থগিত করেনি জাতিসংঘ। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের দাবির নিষ্পত্তিও একইভাবে জাতিসংঘ স্থগিত করতে পারে।

সমুদ্রের মহীসোপান ছাড়া অবশিষ্ট অংশ, বিশেষ করে উপকূলের নিকটবর্তী দেড়শ’ নটিক্যাল মাইল এবং তারপরের দুইশ’ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ‘একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (ইইজেড) নিয়ে বিরোধ জাতিসংঘের ১৯৮২ সালের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত আইন আনক্লজের অধীনে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ৮ অক্টোবর ভারত ও মিয়ানমারের ওপর নোটিশ জারি করে। এক মাসের মধ্যেই এ নোটিশের জবাব দেয়ার সময়সীমা নির্ধারিত থাকায় এ সময়ের মধ্যেই ভারত ও মিয়ানমার সালিশে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রস্তাব মেনে নিয়ে নিজ নিজ দেশের আরবিট্রেটর নিয়োগ দিয়েছে। ভারত বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ ড. পি শ্রীনিভাস রাওকে তার দেশের আরবিট্রেটর নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশ আগেই ব্রিটিশ লিগ্যাল কাউন্সেল ভন লুই কিউসিকে নিজ দেশের আরবিট্রেটর নিয়োগ করেছে। সালিশে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পাঁচ সদস্যের সালিশ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার নিজ নিজ দেশের মনোনীত আরবিট্রেটর দেয়ার পাশাপাশি আনক্লস অনুসারে আরও দু’জন আরবিট্রেটর নিয়োগ করবে। এ পাঁচ সদস্যের সালিশ ট্রাইব্যুনাল বিরোধ নিষ্পত্তি করবে। বাংলাদেশ নিজ দেশের পক্ষে শুনানিতে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে মার্কিন একটি ল’ ফার্মকে নিয়োগ দিয়েছে। যদি ১৯৮২ সালের কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশ সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তিতে সক্ষম হয় তাহলে বাংলাদেশের মোট সমুদ্রসীমা হবে ২,০৭,০০০ বর্গকিলোমিটার যা বাংলাদেশের মোট স্থলসীমার চেয়ে ১.৪ গুণ বড়।

বাংলাদেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাসসহ বিপুল পরিমাণ খনিজসম্পদ রয়েছে। কিন্তু এ সম্পদ আহরণের জন্য সমুদ্রসীমা নির্ধারণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমার ‘সমদূরত্ব’কে ভিত্তি ধরে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের দাবি করে আসছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ‘ন্যায়ভিত্তিক নীতি’ অনুযায়ী এই সীমারেখা দাবি করে। ফলে সমুদ্রসীমা নিয়ে চলে আসছে অমীমাংসিত বিরোধ এবং গত ৩৫ বছরে আলোচনা করে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের সালিশ ট্রাইব্যুনালের অধীনে আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব বলে আশা করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে ভারত ও মিয়ানমার বাংলাদেশের জলসীমার বৃহৎ অংশ অন্যায়ভাবে দাবি করেছে এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাধার সৃষ্টি করেছে

 


প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি ২০০৯: কিছু পর্যালোচনা

বাসবী বড়ুয়া

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রায়শই ভারত ও চীনের শিক্ষার্থীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন। অতি সমপ্রতি তাঁর দেশের এক বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন শুধু তোমাদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভাবলেই হবে না, মনে রাখতে হবে ব্যাঙ্গালোর এবং বেইজিংয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা।’

দেশ দুটির ভৌগোলিক বিশালতা ও ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা বাদই দিলাম, ভারতের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখা যাবে, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ করে সাহিত্য ও সামাজিক বিজ্ঞানে ভারতীয় চিন্তকরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের কথাটিই আবার স্মরণ করি, যেখানে তিনি বলেছেন, অপরিচয়ের সীমানা ভেঙে শিক্ষাই পারে যোগাযোগের সেতু গড়তে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষাই সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তুমুলভাবে পাল্লা দিয়ে বাড়লেও এর সবই কেন্দ্রীভূত ভবিষ্যতে একটি চাকরি লাভের প্রত্যাশায়। মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষকের চিত্রটি নিদারুণ হতাশাব্যঞ্জক। অথচ স্বাধীনতার আগে ও পরে বহু কমিশন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে নতুন নতুন শিক্ষানীতির। কিন্তু কোনো নীতিই সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তাই ছাড়া ছাড়া, অসংলগ্নভাবে শিক্ষার আয়োজন চলছে পুরো দেশে, যার সঙ্গে যোগ নেই একটি মূর্ত দর্শনের অথবা চেতনার/অভীষ্টার। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন সরকারের প্রণীত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯’ (চূড়ান্ত খসড়া) জনগণের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর। ১৬ সদস্যের কমিটিতে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী রয়েছেন এর নেতৃত্বে। কমিটি বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়েছে কুদরত-ই খুদা (১৯৭৪), শামসুল হক (১৯৯৭) কমিটির প্রতিবেদন এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০। কমিটি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে তোলা’কে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়েছে, ‘বৈষম্যহীন সমাজ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে মেধা ও প্রবণতা অনুযায়ী স্থানিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সবার জন্য শিক্ষা লাভের সমান সুযোগ-সুবিধা অবারিত করা।’ একটি বিতর্ক রয়েই গেছে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার বিভিন্ন মাধ্যমকে কেন্দ্র করে, যা মনে করা হয় বৈষম্যহীন সমাজ বিকাশে অন্তরায়। কমিটি বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত কিছু বিষয়ে সব ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যসূচি প্রবর্তনের সুপারিশ করেছে যা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সামগ্রিকভাবে এর ফল হবে ইতিবাচক।

কমিটি প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫ বছর থেকে ৮ বছর অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ঘোষণা করে যথেষ্ট জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো, শিক্ষক সঙ্কট ইত্যাদি বহুমুখী সমালোচনার শিকার হতে হচ্ছে কমিটির এই প্রস্তাবকে। কিন্তু পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ’৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ক্রান্তিলগ্নে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র-ঐক্যের উত্থাপিত দশ দফায় দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার স্তর দাবি করা হয়েছিল। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো প্রয়োজন অনুসারে এই শিক্ষার স্তর স্নাতক পর্যন্ত হওয়া উচিত বলে মনে করে। সুতরাং কমিটির সুপারিশ প্রশংসনীয়, তবে এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত হতে পারে এই কারণে, যেহেতু কমিটিও মনে করে- বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রচুর শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে নাও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাদের মৌল শিক্ষা সমাপন শেষে কর্মবাজারে দক্ষতার সাথে যোগদানের সুযোগ খোলা থাকবে। সুতরাং ন্যূনতম দক্ষতা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই স্তর প্রসারিত করা যেতে পারে। শিক্ষাদর্শনের কথা বলা হয়েছে রিপোর্টের প্রথমভাগে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা মৌল ভিত তৈরি করবে শিক্ষানীতির তাত্ত্বিক অংশে। নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা তাঁর এক লেখায় বিবর্তনবাদ থেকে জীবপ্রযুক্তি বিষয় পড়ানো অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষার নেতিবাচক প্রভাবকে কিছুটা ঠেকানো যেতে পারে।

রাষ্ট্রীয় কোন নীতি কতটুকু উদার ও গণতন্ত্রকামী, তার প্রমাণ মেলে নারী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য অনুসৃত নীতি পর্যালোচনার মাধ্যমে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীরা মাদ্রাসা শিক্ষাকে কেন্দ্র করেই মাঠ গরম করে রেখেছে। এ ফাঁকে বলতেই হয়, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা শিক্ষার পুরোপুরি অবলুপ্তি অচিন্তনীয় বিষয়। এক্ষেত্রে কমিটির মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করে তোলার প্রস্তাবনা বাস্তবসম্মত ও প্রশংসনীয়। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটি নারীবান্ধব বলা চলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কিন্তু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াগুলো যথাযথভাবে স্পষ্ট নয়। তাছাড়া বিশাল এক ফাঁক রয়ে গেছে সিডো সনদের নীতিমালা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না করায়। চুক্তি স্বাক্ষরকারী ও অনুমোদনকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষার পাঠ্যক্রমে অবশ্যই এই সনদ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবগত করানো কর্তব্য। আর আদিবাসীদের শিক্ষার জন্য আলাদাভাবে উল্লেখ করা হলেও এই জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দাবি প্রাথমিক স্তরে বাংলা ও ইংরেজির সাথে স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে নেই। সমপ্রতি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ১.৩% আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্নাতক পাঠ সম্পন্ন করে, এইচএসসি সম্পাদনের হার ২.৩% এবং এসএসসিতে এই হার ১১%। এমন অনেক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অঞ্চল রয়েছে যেখানে শতকরা ১০০ ভাগই স্বাক্ষরহীন। অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলিত জনগোষ্ঠী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তাব এসেছে বিভিন্ন এনজিওর পক্ষ থেকে। তবে এই পৃথক উদ্যোগ হতে হবে সাময়িক, যাতে করে তারা মূল স্রোতের বাইরে থেকে না যান। এক্ষেত্রে পাঠ্যক্রমে অস্পৃশ্যতা এবং জেন্ডার স্টাডিজের বিষয়াদি সহজ ভাষায়, সাবলীলভাবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ হাতে নিতে হবে সমাজে এর সুদূরপ্রসারী ফল লাভের জন্য। ভারতের প্রখ্যাত নারীবাদী নেত্রী কমলা ভাসিনের বই ‘পিতৃতন্ত্র কী’-এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এক কর্মশালায় তিনি অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলছিলেন, শ্রীলঙ্কার এক পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার কথা, যিনি প্রশিক্ষণ শেষে কমলা ভাসিনের প্রায় পা ছুঁয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। সুতরাং সুলিখিত পুস্তক, কঠিন বিষয়েও মানুষের মনে নাড়া দিতে সক্ষম।

শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো উচ্চশিক্ষা। এ স্তরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যে গবেষণাবিহীন শিক্ষার নৈরাজ্য চলছে, তাতে লাগাম টানতে শিক্ষানীতিতে মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষাকে বিশেষায়িত শিক্ষা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে এবং তা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অর্জনের কথা বলা হয়েছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে সামগ্রিক উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে, কেননা কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দৌরাত্ম্যে শিক্ষা এখন সার্টিফিকেট সর্বস্ব পণ্যে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে ইংরেজি শিক্ষার বিষয়টি। আসলে সামগ্রিকভাবে আমাদের ভাষা শিক্ষার মান যারপরনাই অধোগামী হয়েছে, যার প্রভাবে আমাদের বাংলা ও ইংরেজির মান একেবারেই সন্তোষজনক নয়।

এই শিক্ষানীতির ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাস্তবায়িত হবে নয় বছর ধরে। তবে এই টাকার বেশিরভাগ অংশই ব্যয়িত হবে প্রাথমিক শিক্ষায় এবং অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেখানে শিক্ষার জন্য ব্যয় করছে ৪.৫% থেকে ৬%, বাংলাদেশের ব্যয় সেখানে ২ ভাগ মাত্র। সুতরাং অর্থায়নের প্রশ্ন যখন এসেই গেল তখন দেখা যাচ্ছে এই শিক্ষানীতিতেও ক্রমবর্ধমান হারে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নের সঙ্গে শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং ব্যবস্থাপক প্রতিনিধির (পৃষ্ঠা-৪৩) অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে, যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে। সুতরাং শিক্ষার ক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতির সূত্রমালা প্রয়োগ না করে বরং রাষ্ট্রের অধিকতর আর্থিক দায়িত্বের কথা মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। না হলে শিক্ষার সজীব ধারা উপযোগবাদিতার মরুপথে দিশা হারাবে। সবশেষে এই বুলেটিনের পাঠকদের জন্য সুখবর হলো, শিক্ষানীতিতে আইন শিক্ষার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে আইন শিক্ষার মেয়াদ চার বছর বাধ্যতামূলক করার কথা ব্যক্ত হয়েছে।