ফলোআপ
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার
এটিএম মোরশেদ আলম
২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। শুরুতে এই ঘটনার বিচার কোন্ আইনে হবে তা নিয়ে বিস্তর বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৯ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সেনা আইনে সম্ভব নয় বলে মত দেয় (বিস্তারিত দেখুন প্রচ্ছদ কাহিনী, বুলেটিন ২০০৯, সেপ্টেম্বর সংখ্যা, পৃষ্ঠা-২)। আপিল বিভাগের মতামতের ওপর ভিত্তি করে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে দুই আইনে। প্রথমত, বিদ্রোহ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিচার করা হবে বিডিআরের নিজস্ব আইনে এবং দ্বিতীয়ত, হত্যা, লুটসহ অন্যান্য অপরাধের বিচার করা হবে সাধারণ ফৌজদারি আইনে।
বিশেষ আদালত গঠন ও কার্যক্রম শুরু
বিদ্রোহ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিচার করার জন্য সরকার ১৯৭২ সালের বিডিআর আইন অনুসারে ছয়টি বিশেষ আদালত স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিডিআর সদর দপ্তর থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়, ঢাকায় দুটি এবং ঢাকার বাইরে চারটি বিশেষ আদালতে কেবল বিদ্রোহের বিচার করা হবে। প্রতিটি বিশেষ আদালত গঠিত হবে তিনজন সদস্যের সমন্বয়ে। মহাপরিচালক পদাধিকার বলে প্রতিটি আদালতে সভাপতিত্ব করবেন। প্রতিটি আদালতে একজন লে. কর্নেল ও একজন মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।
বিডিআর আইনের আওতায় খুলনা, রাজশাহী এবং কুষ্টিয়া সেক্টর ও অধীনস্থ ব্যাটালিয়নের জওয়ানদের বিচার হবে ১নং বিশেষ আদালতে। ২নং বিশেষ আদালতে বিচার হবে দিনাজপুর এবং রংপুর সেক্টরের জওয়ানদের। অনুরূপভাবে ৩নং আদালতে সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সেক্টরের জওয়ানদের, ৪নং আদালতে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি সেক্টরের জওয়ানদের, ৫নং আদালতে ঢাকা সেক্টরের জওয়ানদের এবং ৬নং বিশেষ আদালতে সদর দপ্তরের অধীনস্থ স্থাপনাগুলো, সিগন্যাল সেক্টর, সদর রাইফেল ব্যাটালিয়ন, বিডিআর হাসপাতাল এবং রাইফেলস্ সিকিউরিটি ইউনিটে কর্মরত সিপাহি ও জওয়ানদের। এসব আদালতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিডিআর সদস্যদের বিচার করা হবে। তারা বিডিআর আইনানুসারে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবে। প্রয়োজনে তারা বাহিনীর কোনো কর্মকর্তা অথবা আইনজীবীর সহায়তা নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বিডিআর আইনের বিধান অনুসারে সহায়তাকারী কর্মকর্তা বা আইনজীবী সরাসরি আদালতে কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারবেন না, যা বলার অভিযুক্তকে নিজেই উপস্থাপন করতে হবে। বিশেষ আদালতকে সহায়তা করার জন্য সরকার ইতোমধ্যে ১০জন পাবলিক প্রসিকিউটরও হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে। পাবলিক প্রসিকিউটরের কাজ শুধু আদালতকে আইনি বিষয়ে সহায়তা দেয়া, কোনো অভিযুক্তকে নয়।
প্রথম আদালত হিসাবে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেছে ৪নং বিশেষ আদালত। বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম, লে. কর্নেল মোঃ আব্দুর রউফ ও মেজর গোলাম মোস্তফা আল মুনের সমন্বয়ে গঠিত এই আদালত বিচার কাজ শুরু করে ২৪ নভেম্বর। রাঙামাটি সেক্টরের ১২ ব্যাটালিয়নের একটি ভবনে স্থাপিত এই আদালতে প্রথম দিন ৫ জন এবং পরের দিন আরো ৯ জন জওয়ানকে উপস্থাপন করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। এরপর শুনানি ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।
ভবিষ্যতে বিডিআরের বিচার সেনা আইনে
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এই ঘটনার বিচার সেনা আইনে করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সচেতন জনগণের দাবির মুখে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পর সেনা আইনে বিচারের চিন্তা বাদ দেয়া হলেও ৩০ অক্টোবর ২০০৯ মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, সেনা আইনের ৫ধারা অনুসারে প্রজ্ঞাপন করে বিডিআরকে সেনা আইনের আওতায় আনা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার বিচার সেনা আইনে করা সম্ভব হয়। বর্তমানে এ প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত।
সাধারণ আইনে মামলা
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নবজ্যোতি খীসা বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। পরে ঘটনাস্থল অনুসারে মামলাটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত করা হয়। মামলার তদন্তভার ন্যস্ত হয় সিআইডির ওপর। ঘটনার এক মাসের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিলের অঙ্গীকার করা হলেও ঘটনার ব্যাপকতা এত বেশি যে ৯ মাস অতিক্রান্ত হলেও অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হয়নি। আদালতে প্রদত্ত তথ্য অনুসারে এই মামলায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ১৪ জন বিডিআর সদস্য এবং ২৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৭ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে দোষ স্বীকার করেছে।
জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪শ’ বিডিআর সদস্য স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। জবানবন্দি আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই উদ্বেগ জানালেও তা আমলে নেয়া হয়নি। সংগঠনগুলোর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, সঠিক আইনি পদ্ধতি অনুসরণ না করেই জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। আসক-এর নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, জবানবন্দি আদায়ের জন্য রিমান্ডে নিয়ে বন্দিদের ওপর প্রচণ্ড শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। সামপ্রতিক সময়ে প্রায় ৮৪ জন বিডিআর সদস্য তাদের জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সেই উদ্বেগকেই সত্য প্রমাণিত করেছে। জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদনকারী বন্দিদের সাধারণ বক্তব্য হলো- জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের নির্যাতন করে জোরপূর্বক জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে। এমনকি ‘ক্রসফায়ারের’ ভয় দেখিয়েও জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে বলে অনেকে আবেদনপত্রে উল্লেখ করেছেন।
হেফাজতে মৃত্যু অব্যাহত
হেফাজতে থাকা অবস্থায় বিডিআর সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনা এখনো অব্যাহত আছে। বিডিআর সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৪৭ জন (পত্রিকা অনুসারে ৪৮ জন)। এর মধ্যে ঢাকায় ২৬ জন এবং ঢাকার বাইরে ২১ জন। সদর দপ্তরের দাবিমতে, ঢাকায় মারা যাওয়া ২৬ জনের মধ্যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ১০ জন, আত্মহত্যায় পাঁচজন, লিভার সিরোসিস রোগে চারজন, কিডনি রোগে তিনজন, উচ্চ রক্তচাপে দুইজন এবং ক্যান্সারে দুইজন মারা যায়। অনুরূপভাবে, ঢাকার বাইরে যারা মারা গেছে তারাও প্রায় সবাই অসুস্থতার কারণে মারা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পত্রপত্রিকা ও আসক-এর নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এদের প্রায় সবাই মারা গেছে নির্যাতনের কারণে। যেসব অসুখের কথা বলা হয়েছে নিহত ব্যক্তিদের এসব রোগ কোনোদিনই ছিল না বলে নিহতের আত্মীয়দের দাবি ( আসক বুলেটিন ২০০৯ জুন ও সেপ্টেম্বর সংখ্যা)। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে সরকার অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলোর বিষয়ে তদন্ত করার জন্য ১৪ মে ২০০৯ উপসচিব (সমপ্রতি সচিব হয়েছেন) মোঃ জাকির হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটিকে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয় তদন্ত শেষ করার জন্য। কিন্তু ৬ মাস অতিক্রান্ত হলেও এই কমিটি কোনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি।
নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর বিষয়ে সম্প্রতি আরো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিডিআরের দুই সদস্য হাবিলদার মহিউদ্দিন ও নায়েক মোবারক হোসেনকে নির্যাতনের মাধ্যমে খুন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এই দুই ব্যক্তির ময়না তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাজধানীর নিউমার্কেট থানায় দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নায়েক মোবারক হোসেন মারা যান ২২ মার্চ। তিনি কক্সবাজারে কর্মরত ছিলেন। হাবিলদার মহিউদ্দিন মারা যান ৬ মে। তিনি চট্টগ্রামের ২৮ রাইফেলস ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। দায়েরকৃত মামলা দুটিতে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। বর্তমানে মামলা দুটি তদন্তধীন।
খোয়া যাওয়া অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ
পিলখানার ঘটনার সময় সদর দপ্তরের অস্ত্রাগার লুট হয়। বিডিআর জওয়ানরাও বেপরোয়াভাবে গোলাবারুদ ব্যবহার করে। তারা কী পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছিল আজ পর্যন্ত তার কোনো সঠিক হিসাব নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে বিডিআর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও রিমান্ডের জেরাসহ বিভিন্নভাবে প্রাপ্ত তথ্য থেকে ধারণা করা হয়, ওই সময় প্রায় ২১শ’ অস্ত্র ও বিপুলসংখ্যক গোলাবারুদ খোয়া গেছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে সাব-মেশিনগান, চাইনিজ রাইফেল, পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেল, বার বোরের বন্দুক, পিস্তল, রিভলবার, গ্রেনেড ও গোলাবারুদ। গোয়ান্দা সংস্থাগুলোর ধারণা খোয়া যাওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ চলে গেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীদের হাতে। ঘটনার পরপরই অপারেশন ‘রেবেল হান্ট’ নামে দেশব্যাপী একটি বিশেষ অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। কিন্তু এই অভিযানে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বাকি অংশ উদ্ধারে র্যাব ও পুলিশ ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে। আমাদের উদ্বেগ হলো, এমনিতেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জনগণের জীবন ও সম্পদের কোনো নিরাপত্তা নেই। তার ওপর খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলো যদি সত্যি সত্যিই সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যায় তাহলে তা জনগণের জীবন ও সম্পদকে আরো নিরাপত্তাহীন করে ফেলবে।
বিডিআর বাহিনীর আমূল পরিবর্তন
পিলখানার ঘটনার প্রেক্ষিতে বিডিআর বাহিনীর আমূল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পোশাক থেকে শুরু করে চাকরির বয়স পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এমনকি নামও পরিবর্তন করে রাখা হচ্ছে ‘বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডস’।
বিডিআর আইন ১৯৭২ এবং বাংলাদেশ রাইফেলস (স্পেশাল প্রভিশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬কে বাতিল করে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সমপ্রতি এই আইনের একটি খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছে। খসড়া আইনে বিডিআর-এর নাম পরিবর্তন করে পুরো আইনে বর্ডার গার্ড শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। খসড়া আইনটিকে মোট ১৬টি অধ্যায়ে ভাগ করে ১৪৬ টি ধারা সংযোজন করে তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রথমতঃ আগের আইনের যেসব ত্রুটি আছে তা শোধরানো, দ্বিতীয়ত: আইনটিকে যুগোপযোগী করা এবং সর্বশেষ হলো এই আইনে মানবাধিকারের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা। প্রস্তাবিত আইনানুসারে, বর্ডার গার্ডের সদস্যরা রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সাংগঠনিক কাজের সাথে যুক্ত হতে পারবেন না। তারা সংবাদপত্রে কোনো সংবাদ, বই, চিঠি বা অন্য কোনো তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন না। এই বাহিনী সীমান্তরক্ষা, আন্তসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধ এবং যুদ্ধাবস্থায় সেনাবাহিনীকে সহায়তা করবে।
প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় অপরাধ সংক্রান্ত মোট ৩০টি ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্রোহ, যুদ্ধকালীন শত্রু সম্পর্কিত অপরাধ, অবাধ্যতা, ছুটি ছাড়া অনুপস্থিত থাকা, পলাতক থাকা, আদেশ অমান্য করা, কর্মকর্তাদের হুমকি দেয়া, অধীনস্ত ব্যক্তিদের আঘাত করা, উৎকোচ নেয়া, মর্যাদাহানী করে এমন আচরণ করা, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করা, অশোভন আচরণ করা ইত্যাদি অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধাবস্থায় এসব অপরাধ করলে শাস্তি দ্বিগুন হবে। খসড়ায় বিভিন্ন অপরাধের জন্য ২ বছর থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, বর্তমানে এই শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছর। বাহিনীর কোনো সদস্য দায়িত্ব পালনের সময় সীমান্ত চৌকি, স্থান বা প্রহরাস্থান শত্রুর কাছে লজ্জাজনকভাবে হস্তান্তর করলে বা কাউকে এই কাজ করতে বাধ্য করলে, শত্রুর উপস্থিতিতে লজ্জাজনকভাবে নিজের অস্ত্র বা গোলাবারুদ পরিত্যাগ করলে বা কাউকে শত্রুর বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে নিরুৎসাহিত করলে বা বিশ্বাসঘাতকতা করে শত্রুপক্ষের সঙ্গে যোগযোগ বা তথ্য সরবরাহ করলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।
খসড়ায় তিন ধরনের আদালত গঠনের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ আদালত, বিশেষ সংক্ষিপ্ত আদালত এবং সংক্ষিপ্ত আদালত। বিশেষ আদালত সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড, বিশেষ সংক্ষিপ্ত আদালত সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড এবং সংক্ষিপ্ত আদালত ২ বছর কারাদণ্ড প্রদান করতে পারবে। এসব আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান রাখা হয়েছে। বাহিনীপ্রধানের সভাপতিত্বে এই আপিল আদালত গঠিত হবে। আপিল আদালত রায় পর্যালোচনা করে শাস্তির পরিমান কম-বেশি করতে পারবে।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা সীমান্ত চোরাকারবারিদের হাতেনাতে গ্রেফতারের পর ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে বিচার করতে পরবেন। এই আদালত সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত শাস্তি প্রদান করতে পারবে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে উপরের আদালতগুলো বাহিনীর সদস্যদের বিচারের জন্য হলেও ভ্রাম্যমান আদালত বিচার করবে সাধারণ জনগণের। সাধারণ জনগণের বিচার কোনো বাহিনীর হাতে দেয়া কতখানি যুক্তিসঙ্গত ও আইনসঙ্গত তা আরেকবার ভেবে দেখা দরকার।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিডিআরকে যুগোপযোগী করার অনেক প্রস্তাব আছে প্রস্তাবিত খসড়া আইনে। কিন্তু একটা বিষয়ে আইনে কোনো আলোকপাত করা হয়নি, সেটা হলো বিডিআরের নিজস্ব কর্মকর্তা। বর্তমানে সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে কর্মকর্তাদের বিডিআরে নিয়োগ দেয়া হয়। সেনা কর্মকর্তারা বিডিআর সদস্যদের সাথে একই পরিবারভুক্ত হতে পারে না বলে যে অভিযোগ আছে, তা খণ্ডাতে হলে বিডিআরের নিজস্ব কমান্ডিং অফিসার গড়ে তোলা প্রয়োজন। অথচ প্রস্তাবিত আইনে বিষয়টিকে একেবারেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারের উচিত বিষয়টিকে পুনর্বিবেচনা করা, যাতে সেনা ও বিডিআরের বিরোধের অবসান হয়।
নৌপথে প্রাণের ঝুঁকি
ভোলার রেশ না যেতেই কিশোরগঞ্জে পুনরাবৃত্তি
শাহ আলম ফারুক
ঈদের পূর্বাপর সংঘটিত দু’দুটি নৌ
দুর্ঘটনায় শতাধিক লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ভোলার লালমোহন উপজেলার নাজিরপুর ঘাটের কাছে ২৭ নভেম্বর ২০০৯ ঈদের পূর্ব রাতে ডুবে যাওয়া কোকো-৪ লঞ্চ থেকে ৮৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ঈদের দিন ও পরবর্তী সপ্তাহ ধরে ভোলায় লঞ্চডুবিতে ব্যাপক প্রাণহানি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই ৫ ডিসেম্বর ২০০৯ কিশোরগঞ্জের দাইরা নদীতে ট্রলারডুবিতে প্রাণ হারালেন অর্ধশতাধিক মানুষ।
এমভি কোকো-৪ লঞ্চটি ২৭ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১১টায় প্রায় দুই সহস্রাধিক যাত্রী নিয়ে ঢাকার সদরঘাট থেকে ভোলার লালমোহনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সদরঘাটে দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট দুই দফা ঘাট থেকে সরিয়ে দিলেও লঞ্চটি পুনরায় ঘাটে গিয়ে যাত্রী তোলে। এছাড়া নৌকা দিয়েও বহু যাত্রী তোলা হয়। লঞ্চের যাত্রীরা সাংবাদিকদের আরও জানান- দেবীচর ঘাট পেরোনোর পর লঞ্চটিতে পানি উঠতে শুরু করে। লঞ্চটি রাত ১১টায় লালমোহনের নাজিরপুর ঘাটে পৌঁছলে যাত্রীরা তাড়াহুড়া করে নামার চেষ্টা করে। এসময় লঞ্চের কেরানি উজ্জ্বল তাদের বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে লঞ্চের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে লঞ্চের বহির্গমনের দরজা বন্ধ করে দেয়। স্টাফদের তাণ্ডবে যাত্রীরা একদিকে সরে গেলে লঞ্চটি কাত হয়ে যায়। সাঁতরিয়ে শত শত যাত্রী তীরে উঠলেও বহু যাত্রী লঞ্চটিতে আটকা পড়ে। নিহত ও আটকা পড়াদের অধিকাংশই ছিল নারী ও শিশু।
ভোলায় লঞ্চডুবিতে ৮৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার কিশোরগঞ্জে ট্রলারডুবিতে আরও অর্ধশতাধিক যাত্রী প্রাণ হারান। সকালে দেড়শতাধিক যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি হবিগঞ্জ থেকে করিমগঞ্জ যাচ্ছিল। মিটামইন উপজেলা সংলগ্ন দাইরা নদীতে এলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহূর্তেই ট্রলারটি ডুবে যায়। খবরে প্রকাশ, ভৈরব থেকে আজমিরি-গঞ্জগামী লঞ্চ এমভি আল হেলাল ও হবিগঞ্জের বানিয়াচং থেকে করিমগঞ্জ উপ-জেলার চামটা বন্দরগামী মেসার্স চান মিয়া ট্রান্সপোর্ট নামক যাত্রীবাহী ট্রলারটি ঘন কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনাকবলিত হয়। দুর্ঘটনার পরপরই উভয়পাড়ের গ্রামবাসী ট্রলার ও লাশ উদ্ধারের কাজে নিয়োজিত হয়। স্থানীয় লোকজন পানিতে ডুব দিয়ে একটি একটি করে লাশ তুলে আনে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই ছিল বেশি (সূত্র: ইত্তেফাক, ০৫.১২.২০০৯)।
মৃত্যু শোকের পুনরাবৃত্তি
স্বাধীনতার পর থেকে এ যাবৎ কতগুলো লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং এতে কতজনের মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। বিআইডব্লিউটি-এর হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তের বছরে নৌ দুর্ঘটনায় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৮ হাজার লঞ্চ বিভিন্ন রুটে যাত্রী নিয়ে নিয়মিত চলাচল করছে। এর মধ্যে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের নিবন্ধনকৃত লঞ্চ মাত্র ২ হাজার ৮২টি (সূত্র: যুগান্তর, ১.১২.২০০৯)। তবে নিবন্ধনকৃত কিংবা নিবন্ধনের বাইরে থাকা অধিকাংশ লঞ্চই সঠিক নিয়মে পরিচালিত হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী যাত্রীবাহী লঞ্চে মালামাল পরিবহন ও অতিরিক্ত যাত্রী বহন নিষিদ্ধ হলেও মুনাফালোভী মালিকরা তা মানছেন না। যথাযথ ফিটনেসবিহীন ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোর লঞ্চ নৌযান যখন অদক্ষ ও প্রশিক্ষণবিহীন চালকের হাতে পরিচালিত হতে থাকে তখন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা এমনিতেই অনেক বেড়ে যায়।
এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবিতে কয়েকশ’ লোকের মৃত্যু হলে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও ব্লাস্ট যৌথভাবে দীর্ঘমেয়াদে তথ্যানুসন্ধানের কাজ করে। এ তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে ব্লাস্ট ২০০৪ সালে ক্ষতিপূরণের দাবিতে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে একটি রিট আবেদন করে। মামলাটি এখনও বিচারাধীন।
এর আগে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) ২০০১ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। আদালত সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শানোর জন্য রুলনিশি জারি করে অবিলম্বে নৌযানে পর্যাপ্তসংখ্যক বয়া ও অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম রাখা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধ এবং গণমাধ্যমসহ লঞ্চে ও টার্মিনালে অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর বিধানগুলোর প্রচার নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। একই আদেশে ছয় মাস পরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এসব ব্যবস্থা কতদূর বাস্তবায়িত হচ্ছে সে সম্পর্কে আদালতে রিপোর্ট প্রদান করার নির্দেশনা দেয়। ক্যাবের কর্মকর্তা জনাব এমদাদ জানান, নির্দেশনা অনুসারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় একবার আদালতে রিপোর্ট দাখিল করেছিল। মামলাটি এখনো বিচারাধীন আছে।
৮ জুলাই ২০০৩ এমভি নাসরিন ডুবে যাওয়ার পর সরকার তিনটি বিষয়ে কোনো ছাড় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেগুলো হলো- ১. অতিরিক্ত মালামাল ও যাত্রী পরিবহন করতে না দেয়া; ২. লঞ্চে যত্রতত্র মালামাল পরিবহনে বাধা দেয়া; ৩. রেজিস্ট্রেশনবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধ করা (সূত্র: প্রথম আলো ১৪.০৮.২০০৩)। এসব সিদ্ধান্ত কার্যকরের পদক্ষেপ নিতে না নিতেই লঞ্চ মালিকরা ১২ আগস্ট ২০০৩ থেকে লাগাতার ধর্মঘট আহ্বান করে নৌ পরিবহন মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে। চাপের মুখে সরকার সমঝোতায় বাধ্য হয় ও যার ফলশ্রুতিতে ১৮ আগস্ট ২০০৩ মালিকদের ঘোষিত ধর্মঘট কর্মসূচি প্রত্যাহার হয়। তবে এ সমঝোতার ফলে লঞ্চ মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা, মাত্রাতিরিক্ত লোভ, আইন-কানুন না মানা, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতা- সবই অব্যাহত থাকে (আরো দেখুন- আসক বুলেটিন, সেপ্টেম্বর ২০০৩)।
২ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ তারিখে ঢাকায় ‘নৌ দুর্ঘটনা ও আইনগত প্রতিকার’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রয়াত বিচারপতি নইমউদ্দিন আহমেদ বলেন, নৌ যান চলাচল ও দুর্ঘটনা সংক্রান্ত শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য যেসব আইন রয়েছে সেগুলোতে ঘাটতি রয়েছে। তিনি নৌ দুর্ঘটনা ও অনিয়মের জন্য দায়ী সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও নৌযান মালিকসহ সবাইকে দায়িত্ব বহন করার কথা বলেন। এছাড়া তিনি কেউ যাতে অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ না করে সে বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। সেমিনারে আরো বলা হয়, নৌযান দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা নিজে মামলা করতে পারে না। সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষে মামলা করা হয়, যা অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা দোষীদের জন্য সুযোগ করে দেয় (সূত্র: প্রথম আলো ০৩.০২.২০০৮)।
সরকার যায় সরকার আসে। নৌ মালিকদের সিন্ডিকেট থেকে যায়। বড়জোর সিন্ডিকেট পুনর্গঠিত হয়। আমরা মনে করি, যে কোনো দুর্ঘটনার পর কঠোর-কঠিন বক্তব্যের চেয়ে পুরো নৌ পরিবহন ব্যবস্থাকে যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার জন্য মৌলিক কতগুলো পদক্ষেপ নেয়াই বেশি জরুরি।
শান্তি চুক্তির যুগপূর্তি
বাস্তবায়ন, অগ্রগতি ও প্রত্যাশা
মাবরুক মোহাম্মদ
এ বছর ২ ডিসেম্বর পালিত হলো পার্বত্য শান্তি চুক্তির এক যুগ। দীর্ঘ এই ১২ বছরের পুরোটা সময়ই শান্তি চুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে বারবার। আলোচনা-সমালোচনা, চুক্তির পর্যালোচনা, প্রত্যাশা, প্রাপ্তি, হতাশা আর অভিযোগ সবসময়ই ছিল, এখনও আছে। পূর্ববর্তী আওয়ামী সরকারের সময়কালে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির বাস্তবায়ন ও পার্বত্য এলাকার শান্তি রক্ষার প্রচেষ্টা বিগত জোট সরকারের আমলে থমকে গেলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা আবার গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে ২০০৯ সালে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য জরিপ শুরুর ঘোষণা। এ বছর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকায় এ দুটি বিষয়ের ওপর বিশেষ আলোকপাত করা হবে আর যুগপূর্তি উপলক্ষে চুক্তি ও পার্বত্য এলাকায় অন্যান্য সমস্যার ওপরও দৃষ্টিপাত করা হবে।
চুক্তিতে যা আছে
পার্বত্য শান্তি চুক্তি চার অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে বিভিন্ন বিষয়ে উভয়পক্ষ অর্থাৎ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীরা ঐকমত্যের ঘোষণা দিয়েছে এবং চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। চুক্তির দ্বিতীয় অংশে চুক্তিকালীন বিদ্যমান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯-এর বিভিন্ন ধারার সংশোধন বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির তৃতীয় অংশে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও সংযোজনসাপেক্ষে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই অংশে পরিষদের গঠন, পরিচালনা, সদস্য নির্বাচন, মেয়াদ শূন্যপদ পূরণ, তহবিল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রভৃতি বিষয়ের উল্লেখ আছে। ‘পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়াবলী’ শিরোনামে চতুর্থ অংশটি চুক্তিটির প্রাণ বা মূল অংশ। এই অংশ পার্বত্য জমির বন্দোবস্ত, বিরোধ নিষ্পত্তি, ভূমি জরিপ পরিচালনা, জনসংহতি সমিতির সদস্যপদের আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন, আত্মসমর্পণ কারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার, রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদিবাসীদের কোটা সুবিধা ও তাদের সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং বিকাশ, অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার, ঐ অঞ্চল চাকরির ক্ষেত্রে আদিবাসীদের অগ্রাধিকার প্রভৃতি বিষয়ে বলা হয়েছে।
অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার
পার্বত্য শান্তি চুক্তির চতুর্থ অংশের ১৭ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি সই, সম্পাদনের পর এবং সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার সাথে সাথে বিডিআর ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলী কদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সব অস্থায়ী ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে। চুক্তির এই ধারাটি বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ বছর ২৯ জুলাই সরকার ঘোষণা করে, ১ ব্রিগেড ও ৩৫টি অস্থায়ী সেনাক্যাম্প সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে। জনসংহতি সমিতিসহ বিভিন্ন মহল এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় ও ঘোষণা অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়। এ সময় বিএনপি, জামায়াত ও এদের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো এর বিরোধিতা করে। সেনা প্রত্যাহারের বিরোধিতা করে হাইকোর্টে একটি রিটও দায়ের করা হয়। এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সেনা প্রত্যাহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তীকালে সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ এই নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করে। বর্তমানে ঐ অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারে কোনো আইনগত বাধা নেই। পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালিদের পক্ষ থেকেও সেনা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে বিরোধিতা আসে। সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয় এবং বাঙালিদের নিরাপত্তাহীনতার কথা বলা হয়। বিরোধিতাকারীদের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, সেনা প্রত্যাহারের ফলে ঐ অঞ্চলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু চুক্তির ১৭ক অনুচ্ছেদেই বলা আছে, আইন-শৃঙ্খলা অবনতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও এই জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো এই এলাকাতেও বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীনে সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যাবে। এছাড়াও ঐ অঞ্চলে মোট ৬টি স্থায়ী সেনানিবাস রয়েছে। কাজেই এ ধরনের আশঙ্কার কোনো ভিত্তি নেই। 
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জনসংহতি সমিতির সদস্যদের আত্মসমর্পণ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার পর ঐ অঞ্চলের অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু জনসংহতি সমিতির সদস্যরা ইতিমধ্যে আত্মসমর্পণ করলেও সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে বিগত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন ক্ষমতাসীন যে কোনো সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে এটি একটি ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
ভূমি সমস্যা
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে ভূমি সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়। এই অঞ্চলে ভূমি বণ্টনে আদিবাসীদের প্রথা, সরকার প্রণীত আইন ও ১৯৮০ সালে সেটেলারদের সরকার কর্তৃক প্রদত্ত জমির বিধি প্রয়োগ করা হয়। ফলে সেখানে জমির মালিকানা নিয়ে আদিবাসী, স্থানীয় বাঙালি ও সেটেলার- এই তিন পক্ষের ত্রিমুখী বিরোধ বিদ্যমান। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে রাবার বাগান ও হর্টিকালচার করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি ইজারা দেয়া হয়। জেলা প্রশাসন সার্বিকভাবে যাচাই-বাছাই না করায় দেখা গেছে এসব বরাদ্দের অধিকাংশই আদিবাসী ও স্থায়ী বাসিন্দাদের ভোগদখলি জমি। সামপ্রতিককালে ডেসটিনিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঐ অঞ্চলে আদিবাসীদের জমি জোরপূর্বক দখল ও নিজস্ব বাগান করার চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও ভারত থেকে প্রত্যাগত শরণার্থীদের মধ্যে এখনও জমি বণ্টনের কাজ হয়নি।
এই অবস্থায় গত ১৯ জুলাই সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। চেয়ারম্যান ১৫ অক্টোবর থেকে ভূমি জরিপ আরম্ভের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় আদিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন নেতা ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রতিবাদের মুখে জরিপের কাজ পিছিয়ে ১৫ নভেম্বর নির্ধারিত হয়। আদিবাসীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যমান বিরোধ নিষ্পত্তি না করে জরিপ করা হলে ভূমি সমস্যার কোনো সমাধান তো হবেই না উপরন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তাদের পক্ষ থেকে প্রত্যাগত শরণার্থীদের জমির বন্দোবস্ত ও বিরোধ নিষ্পত্তির পরই কেবল জরিপের কাজ করার দাবি জানানো হয়। আবার অনেকে জরিপ চালানোর ক্ষেত্রে কমিশনের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ভূমি কমিশন আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী কমিশন কেবল বিরোধ নিষ্পত্তি, নিয়ম-বহির্ভূত বরাদ্দ বাতিল ও বেদখল হওয়া জমি- প্রকৃত মালিকের কাছে পুনর্বহাল করতে পারে। ফলে জরিপ এই কমিশন করতে পারে না। ভূমি কমিশনের অন্য আরেকটি সমস্যা হলো শান্তি চুক্তির চতুর্থ অংশের ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা যাবে না। এর ফলে সবসময়ই কোনো না কোনো পক্ষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কমিশনের ভুল, গাফিলতি বা অন্যান্য আদেশে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রতিকারের পথ বন্ধ। চুক্তির এই ধারাটি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি
এ বছর পার্বত্য অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতির তেমন অগ্রগতি হয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসীদের জমি ও ঘর দখল করে নেয়া হলেও প্রশাসন ছিল নির্বিকার। গত ৩১ জুলাই শারীরিক প্রতিবন্ধী ২৪ বছর বয়সী মিনা চাকমা গ্রামীণ ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুল হাসান কর্তৃক ধর্ষিত হলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি।১ ৪ সেপ্টেম্বর পার্বত্য ছাত্র পরিষদের সভাপতি রিকো চাকমাসহ ২১ জনকে অবৈধ সমাবেশের অভিযোগে গ্রেফতার করে।২ পরিষদের ১০ সেপ্টেম্বর কাউন্সিল উপলক্ষে ডাকা প্রস্তুতিমূলক সভা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে আদিবাসী নেতা রাং লাই ম্রো এ বছর জামিন পান। জামিন আদেশ পাওয়ার আগে গুরুতর অসুস্থ রাং লাইকে হাসপাতালের প্রিজন সেলে কয়েদি হিসেবে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে এভাবে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখার মতো অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ জানায়। পরবর্তীকালে তার ডাণ্ডাবেড়ি খুলে দেয়া হয়।
চুক্তি চ্যালেঞ্জ করে রিট
পার্বত্য শান্তি চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০০ সালে পার্বত্য এলাকার বাসিন্দা বদিউজ্জামান হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। এছাড়াও ২০০৭ সালে তাজুল ইসলাম নামে এক জামায়াতপন্থি আইনজীবী একই বিষয়ে আরেকটি রিট দায়ের করেন। রিট দুটির পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট শান্তি চুক্তিকে কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক হিসেবে ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করে। সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর টি এইচ খান ও রোকনউদ্দিন মাহমুদকে এই মামলার শুনানিতে সহায়তার জন্য অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মামলা দুটি বর্তমানে বিচারাধীন আছে।য়
১. প্রকাশিতব্য হিউম্যান রাইটস্ রিপোর্ট ২০০৯, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
২. প্রাগুক্ত