পরিবেশ
জলবায়ু পরিবর্তন
দৃষ্টি সবার কোপেনহেগেনে
সাঈদ আহমেদ
ভূমিকা
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে কোপ-১৫ নামে পরিচিত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলন। শেষ হবে ১৬ ডিসেম্বর। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কাঠামোর (ইউএনএফসিসি) সদস্যভুক্ত ১৯২টি দেশের প্রতিনিধিরা এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। এই শীর্ষ সম্মেলনের লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস তথা বায়ুমণ্ডলে জমা কার্বনের ঘনত্ব কমানোর জন্য একটি বৈশ্বিক চুক্তিতে পৌঁছানো। চারটি মৌলিক বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। ১. শিল্পোন্নত দেশগুলো কতটা বেশি হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে রাজি; ২. চীন, ভারত, ব্রাজিলের মতো নব্য শিল্পোন্নত দেশ কতটা নিঃসরণ কমাবে তা স্থির করা; ৩. ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তার তহবিল আদায়ে কীভাবে উন্নত দেশগুলোকে দায়বদ্ধ করা হবে এবং ৪. কীভাবে এই তহবিল খরচ করা হবে।
ধারালো খড়গের নিচে মানবজাতির অস্তিত্ব
মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এ সম্মেলনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন যে, কার্বনডাই অক্সাইড নির্গমন যদি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনা যায় তাহলে সামনের পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে সবকিছু চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তখন আর কোনো পদক্ষেপেই কাজ হবে না। তারা আরও বলছেন, সম্মেলনে যদি সব দেশ মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারে যে, তারা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন বর্তমানের তুলনায় অন্তত ৪৫-৫০ শতাংশ কমিয়ে আনবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে নির্গমন প্রায় বন্ধ করবে তাহলে পৃথিবী ও মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়। কিন্তু সেরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা যে শূন্য তা ইতোমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে যে, আলোচনার মাধ্যমে অন্তত প্রথম ধাপে ১৫-২৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো। সেটাও শেষ পর্যন্ত সম্ভব হবে কিনা সে ব্যাপারেও যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে।
কোপেনহেগেন এখন বিশ্ববাসীর হোপেনহেগেনকোপেনহেগেন
এখন বিশ্ববাসীর হোপেনহেগেন
মানবজাতির অস্তিত্ব যেহেতু কোপেনহেগেন সম্মেলনর সিদ্ধান্তের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল তাই বিশ্ববাসী গভীর আগ্রহ নিয়ে এ সম্মেলনর দিকে তাকিয়ে আছে। সম্মেলনর উদ্বোধন করতে গিয়ে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী লারস লোক্কে যথার্থই বলেছেন, ‘আগামী প্রজন্মকে রক্ষায় কী ব্যবস্থা নেয়া হয় তা দেখতে বিশ্ববাসী কোপেনহেগেনের দিকে তাকিয়ে আছে। আগামী দুই সপ্তাহের জন্য কোপেনহেগেন হোপেনহেগেনে (আশার শহর) পরিণত হবে। শেষ পর্যন্ত অধিকতর ভালো একটি ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় আমরা অবশ্যই সেই বিশ্বে ফিরে যেতে সক্ষম হবো, যা আমাদের আজকে এখানে আসা নিশ্চিত করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ম্যানুয়েল ডি বারোসা বলেছেন- ‘কোপেনহেগেনে আমরা লিখতে পারি বাঁচার ইতিহাস অথবা আত্মহত্যার দলিল।
জলবায়ু অবিচার এবং বাংলাদেশের দাবি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র পাঁচ শতাংশ। কিন্তু তাদের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার দুই দশমিক পাঁচ শতাংশের বাস হলেও আমাদের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ মাত্র দশমিক এক শতাংশ। কিন্তু হলে কী হবে, নির্মম পরিহাস হচ্ছে জাতিসংঘ ঘোষিত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকার শীর্ষে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশ তাই এ সম্মেলনে হাজির হয়েছে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ান’- এই স্লোগান নিয়ে। সম্মেলনের শুরুর দিনই সম্মেলনস্থলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানো এবং জলবায়ু ক্ষতির শিকার দরিদ্র দেশগুলোর সহায়তায় আরও বেশি সহযোগিতা করতে ধনী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচ
কোপেনহেগেন সম্মেলনের সাফল্য নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচ কাটিয়ে উঠে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর। ১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে গৃহীত হয় ‘কিয়োটো প্রটোকল’, যাতে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বিষয়ে কঠোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০০৫ সালে এটি ১৮৯টি দেশের সম্মতিতে কার্যকর করা হয়। ২০১২ সালে এর মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। অথচ সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এখনও এতে স্বাক্ষর করেনি। তাদের যুক্তি- এই প্রটোকলে শুধু শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর বাধ্যবাধকতা চাপানো হয়েছে, উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে ভারত, চীন, ব্রাজিল, রাশিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলো এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করে বলে- যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আগে নিজের তরফে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া। এসব বিতর্কে কিয়োটো প্রটোকলের বাধ্যবাধকতা মুখ থুবড়ে পড়ে। কোপেনহেগেন সম্মেলনও পড়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই ঘূর্ণিপাকে। ভারত-চীন ইতিমধ্যে তাদের মত ব্যক্ত করেছে যে, তারা নিজে থেকেই কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করবে কিন্তু তাদের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতাপূর্ণ চুক্তি মেনে নেবে না। অন্যদিকে সম্মেলন শুরু হবার পরদিনই ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকা একটি গোপন সরকারী দলিল ফাঁস করে দিয়ে শোরগোল ফেলেছে। ওই দলিলটি তৈরি করেছে স্বাগতিক ডেনমার্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সম্মিলিতভাবে। তাতে দেখা গেছে এসব শিল্পোন্নত দেশও তাদের জন্য বাধ্যকর কোনো চুক্তি চায় না।
কিয়োটো প্রটোকলের ব্যর্থতা সত্ত্বেও কোপেনহেগেন সম্মেলনকে ঘিরে আবার জাল বুনতে শুরু করেছিল বিশ্ববাসী। সম্মেলন শুরুর আগেই ব্রাজিল, চীন, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো নব্য অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনকারী দেশগুলো কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর ঘোষণা দেয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্মেলনের শেষ দিন অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়ায় বিশ্ববাসীর আশার পালে হাওয়া লেগেছে। তবে শেষ পর্যন্ত বাধ্যবাধকতাপূর্ণ কোনো চুক্তিতে আদৌ পৌছানো সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ক্রমশই গভীর হচ্ছে। কারণ শিল্পোন্নত দেশ অথবা উদীয়মান শিল্পোন্নত দেশ সবাই চায় কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর বিষয়টি তাদের সদিচ্ছার (Good will) ওপর ছেড়ে দেয়া হোক। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর যুক্তি শিল্পোন্নত দেশগুলোর সদিচ্ছার ওপর এতকাল নির্ভর করে দেখা গেছে কাজের কাজ কিছুই হয়নি, বরং তথাকথিত উন্নয়নের (প্রকারান্তরে যা আসলে ভোগবাদিতা) সীমাহীন লোভে তারা আরও বেশি বেশি কার্বন নিঃসরণ করে চলেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরও লাগসই যুক্তি- এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার শত শত কোটি মানুষ এখনও বিদ্যুৎ বা গাড়ি কিছুই ব্যবহার করে না, প্লেনে চড়ে না। তাদের ধানক্ষেত কিংবা গোয়ালঘর থেকে যে মিথেন গ্যাস তৈরি হয় জলবায়ু পরিবর্তনে তার ভূমিকা অতি নগণ্য। তাহলে শিল্পোন্নত দেশগুলোর মানুষের অদম্য ভোগের সংস্কৃতির দায় কেন নেবে উন্নয়নশীল দেশের এই হতদরিদ্র মানুষেরা? সম্মেলনের সফলতা নিয়ে সংশয় যতই ঘনীভূত হচ্ছে ততই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে কোপেনহেগেনে উপস্থিত পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার কর্মীরা। মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এই অন্তিম ক্ষণে আন্তর্জাতিক কূটনীতি আর রাজনীতির মারপ্যাঁচ দেখতে তারা নারাজ। মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষায় কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য রাজনীতিকদের ওপর চাপ সৃষ্টিতে তৎপর হয়ে উঠেছে তারা, গ্রেফতার-নির্যাতনেরও শিকার হয়েছে। আশার বেলুন ক্রমশই ছোট হয়ে আসছে জেনেও এই সম্মেলনকে ঘিরে আশাবাদী হওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই আমাদের সামনে। অনেকের মতে- বিশ্বকে রক্ষায় বিশ্ববাসীর সামনে এটাই শেষ সুযোগ।