মত-অভিমত
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ও নারীর সমঅধিকার
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং বলেছে যে, রাষ্ট্র এমন কোনো আইন প্রণয়ন করবে না যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এ ধরনের কোনো আইন থাকলেও তা বাতিল হয়ে যাবে। এখানে ঘোষিত মৌলিক অধিকারের প্রথমটিই হচ্ছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ দ্বিতীয়ত বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ তৃতীয়ত, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ কিন্তু সমান অধিকার দূরে থাক, বাংলাদেশের হিন্দু আইন অনুযায়ী পিতা-মাতার সম্পত্তিতে পুত্র সন্তানের উপস্থিতিতে কন্যাসন্তানের বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাসন্তান প্রয়াত পিতার সম্পত্তি ভোগ-দখল করতে পারে মাত্র। কিন্তু নিরঙ্কুশ মালিকানা যেমন বিক্রয়, দান কিংবা হস্তান্তরের অধিকার পায় না। সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা চলে যায় প্রয়াত ব্যক্তির পৌত্র, প্রপৌত্র, ভাই, ভাতিজা কিংবা অন্য কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারীর কাছে। শুধু পিতার কেন, স্বামীর সম্পত্তিতেও নিরঙ্কুশ উত্তরাধিকার নেই স্ত্রীর। তাদের অধিকার কেবল ভরণপোষণ লাভ কিংবা সম্পত্তি ভোগ-দখল করার মধ্যে সীমিত। সংবিধান চালু হওয়ার পরও হিন্দু সমাজের প্রথাগত বিধান বহাল রয়েছে এবং এসব বিধানমতেই বিজ্ঞ জজ সাহেবরা রায় প্রদান করছেন। বিচারকরা সংবিধান মানছেন না, মানছেন প্রচলিত প্রথা। এ বিষয়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ড. এম জহির, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুবুদ্দিন আহমাদ, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীসহ অনেক বিশিষ্ট আইনজীবীর সাথে বর্তমান নিবন্ধকারের কথা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই একবাক্যে বলেছেন, বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংবিধানবিরোধী। বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য তার জীবদ্দশায় এই বৈষম্যমূলক হিন্দু আইন সংস্কারের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু কতিপয় রক্ষণশীল হিন্দু নেতার বাধার মুখে তিনি সফল হননি। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক উত্তরাধিকার আইনের পক্ষে সাফাই গাইতে রক্ষণশীল হিন্দুরা সংবিধান প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার যুক্তি তুলে ধরেন। তারা বলতে চান যে, হিন্দু আইন তাদের ধর্মের অঙ্গ। তাই হিন্দু আইনের নিয়ন্ত্রণ তাদের ধর্মের নিয়ন্ত্রণ। আসলে রক্ষণশীলদের এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ হিন্দু আইন কোনো কঠোর ধর্মীয় বিধি নয়। এই আইন কেবল আঞ্চলিক ও সামাজিক প্রথার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাছাড়া সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে ‘নৈতিকতাসাপেক্ষ’ করা হয়েছে। কারও প্রতি বৈষম্য করা কিংবা কাউকে তার সহজাত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কোনোমতেই নৈতিক বলে বিবেচিত হতে পারে না। ধর্মে কাউকে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারার বিধান থাকলেও ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন’ হিসেবে সংবিধান এর প্রতিবিধান করবে- এটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশে সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার পূর্বে এই ভূখণ্ডে হিন্দু আইন প্রচলিত ছিল। সংবিধানের ১৪৯ অনুচ্ছেদে ‘সকল প্রচলিত আইনের কার্যকরতা অব্যাহত থাকিবে’ বলা হলেও তা ‘এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে’ করা হয়েছে। এখানেই সংবিধানে পূর্বোক্ত মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তার প্রশ্নটি জড়িত। কারণ ২৬(১) অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকারের ‘বিধানাবলীর সহিত অসামঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে’ বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ধর্মের কারণে কোনো প্রকার বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে ২৮ অনুচ্ছেদে। সুতরাং সংবিধানের সাথে প্রচলিত হিন্দু আইনের সঙ্গতি নেই। দেশের কোনো নাগরিক এখন পর্যন্ত হাইকোর্টে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেনি এবং হাইকোর্ট থেকেও এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ বা দিকনির্দেশনা আসেনি। ফলে এক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের সঙ্কট রয়েই গেছে। এ অবস্থায় পিতা-মাতার সম্পত্তিতে কন্যার স্বাভাবিক উত্তরাধিকারের স্থানটি দখল করেছে যৌতুকের মতো একটি সামাজিক ব্যাধি। যৌতুক নিবারণে আইন হয়েছে। কিন্তু সম্পত্তিতে মেয়েদের সমঅধিকার দিয়ে এখন পর্যন্ত আইন প্রণয়ন করা হয়নি। স্পষ্টতই বলা যায়, রাষ্ট্র অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণ করছে হিন্দু মেয়েদের প্রতি। এর বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠা সময়ের দাবি। কিন্তু দেখা গেছে, হিন্দু সমাজের কথিত প্রগতিশীলরা এ ব্যাপারে মৃদুস্বরে কথা বলেন। এর কারণ ধর্মীয় নয়, বরং অর্থনৈতিক। আইনের দ্বারা সম্পত্তির বণ্টন ব্যবস্থা পুনর্নিধারণ করলে সমাজের চিত্রটাই পাল্টে যাবে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সাথে সাথে সামাজিক ক্ষমতায়ন ঘটবে। সঙ্গত কারণেই নারী-পুরুষ সমঅধিকারভিত্তিক আইন প্রণীত হলে তা কায়েমি স্বার্থে আঘাত করবে। তাই হিন্দু আইন সংস্কারের প্রশ্নে সমাজের প্রগতিশীল শক্তি সোচ্চার না হলেও প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুরা যথেষ্ট বিরুদ্ধ-সচেতন। ঘরোয়া আলোচনায় কতিপয় হিন্দু নেতা অকপটে স্বীকার করছেন, ‘রাজনীতিতে আমরা প্রগতিশীল, কিন্তু ঘরের ব্যাপারে আমাদের রক্ষণশীল হতেই হবে।’ অপরাধীও তার আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু না কিছু যুক্তি খাড়া করে। হিন্দু মেয়েদের সম্পত্তিতে অধিকার দেয়ার বিপক্ষে যুক্তি দেখানো হচ্ছে যে, বাংলাদেশের হিন্দু মেয়েরা সামপ্রদায়িক আঘাতের বড় টার্গেট। হিন্দু মেয়ে অপহরণ, জোরপূর্বক বিবাহ এবং ধর্মান্তর এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। এ অবস্থায় হিন্দু মেয়েদের হাতে সম্পত্তি দিলে সম্পত্তি আত্মসাতের লোভে তাদের বলপূর্বক কিংবা অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করে ধর্মান্তরিত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।
এ প্রসঙ্গে প্রথমত বলতে হয়, ঘরে সম্পত্তি থাকলে চোর-ডাকাত আসে, আক্রমণের ভয় থাকে, এ কথা সত্য। তাই বলে আমি কোনো ধরনের সম্পত্তির অধিকারী হবো না, চোরের ভয়ে মাটিতে ভাত খাব- এ যুক্তি যারা দেখাচ্ছেন তারা নিজেরা কি এটা মানেন? বরং সম্পত্তি হারানোর ভয়, এমনকি সম্পদের কারণে প্রাণহানির ভয় সত্ত্বেও মানুষ সম্পদের অধিকারী হতে চায়। নিজের নিরাপত্তার জন্যই তার সম্পদের প্রয়োজন হয়। সম্পদের মালিক হলে ব্যক্তি তার জানমাল রক্ষার পদক্ষেপ নিজে থেকে গ্রহণ করে। রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে বাংলাদেশের হিন্দু মেয়েরা নিরাপত্তাহীন এ কথা সত্য। কিন্তু তাদের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বড় কারণ তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা। কর্মজীবী নারীর আর্থিক নিরাপত্তা থাকায় সমাজে ও পরিবারে তারা অনেক বেশি স্বাধীন এবং নিরাপদ। রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে যে কোনো অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়ার সাহস ও শক্তি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী মেয়েরাই রাখে। একটি মেয়ে চাকরি করলে তার ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টি হবে এবং সে ক্ষেত্রে তার প্রতি ভিন্ন সমপ্রদায়ের লোকদের নজর পড়তে পারে- এই ভয়ে কি হিন্দু মেয়েদের চাকরি করতে দেয়া হবে না? হিন্দু ঘরের মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করলে, সঙ্গীত-কলায় সমৃদ্ধ করলে তথা সংস্কৃিত সম্পন্ন করলে সে মানসিক সম্পদে সমৃদ্ধ হবে এবং সে ক্ষেত্রে তার ওপর কোনো ভিন্ন ধর্মীয় যুবকের দৃষ্টি পড়তে পারে। এই কারণে হিন্দু মেয়েদের অশিক্ষিত, রুচিহীন, সংস্কৃতিহীন করে রাখতে হবে- এটা কি যুক্তি হলো?
দ্বিতীয়ত, পৈতৃক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা হলে হিন্দু মেয়েদের ধর্মান্তরিত করা কঠিন হবে। কারণ ধর্মান্তরিত হলে সে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। হিন্দুর ধর্মীয় আইন এবং রাষ্ট্রীয় আইন উভয় বিধানেই এর নিশ্চয়তা দেয়া আছে। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু আইনের বিধান হচ্ছে, একবার কোনো ব্যক্তি ধর্মান্তরিত হলে এরপর সে তার নতুন ধর্মের পারিবারিক আইনের দ্বারা পরিচালিত হবে। এখানে উল্লেখ্য, ১৮৫০ সালে ব্রিটিশ সরকার ঞযব The Caste Disabilities Removal Act নামে একটি আইন পাস করে। এই আইন পাস হওয়ার পর এবং এই আইন রদ হওয়ার পূর্বকাল পর্যন্ত কেউ ধর্মান্তরিত বা জাতিচ্যুত হওয়ার কারণে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতো না। এই আইনকে ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনও বলা হয়। সমালোচনা আছে যে, ধর্মান্তর উৎসাহিত করার জন্য এই আইন করা হয়েছিল। এই আইনটি ১৯৭৩ সালের ৮ নং আইন দ্বারা রদ করা হয়েছে এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে তা কার্যকর দেখানো হয়েছে। ফলে ধর্মান্তরিত হলে এখন কেউ উত্তরাধিকার লাভ করে না। গাজী শামছুর রহমান তার হিন্দু আইনের ভাষ্য গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।
তৃতীয়ত, মেয়েদের সম্পত্তিতে অধিকার দিলে তাতে তার ধর্ম যায় না, সমাজ যায় না এবং পরকালও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কারণ প্রচলিত হিন্দু আইন সনাতন ধর্মের কোনো আবশ্যিক শর্ত নয়। এ আইন সম্পূর্ণ প্রথাগত ও অঞ্চলভিত্তিক। আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হিন্দুরা বসবাস করেন। তারা সেইসব দেশের প্রচলিত আইন ও বণ্টন ব্যবস্থার ভিত্তিতে সম্পত্তির অধিকার লাভ করেন। ভারত উপমহাদেশেও হিন্দু আইন সর্বত্র এক রকম নয়। ভারতের কোনো কোনো স্থানে মাতৃধারাভিত্তিক (ম্যাট্রিলিনিয়াল) সমাজ বিদ্যমান। সেসব ঘরানার প্রথাগত আইন অনুযায়ী মেয়েদেরই সম্পত্তিতে অগ্রাধিকার। অথচ তারাও হিন্দু। নিজ নিজ প্রথা অনুযায়ী তাদের সমাজ চলছে। মাতৃধারাভিত্তিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের কয়েকটি আদিবাসী সমপ্রদায়েও রয়েছে। আমাদের গ্রামের মেয়েরা যেমন বিয়ের পর বিদায়ের সময় বাবা-মায়ের গলা জড়িয়ে কান্নাকাটি করতে করতে শ্বশুরবাড়ি যায়, এসব আদিবাসী সমপ্রদায়ের ছেলেরাও তেমনি বিয়ের পর গলা ছেড়ে কেঁদেকেটে স্ত্রীর সংসারে চলে যায়। তাদের সমাজে সম্পত্তিতে স্বামীর নয়, স্ত্রীরই অধিকার। মজার বিষয় যে, ভারতের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানবিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে সেখানকার মাতৃধারাভিত্তিক সমাজগুলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চেয়ে অগ্রবর্তী।
আদিকাল থেকেই ভারতীয় হিন্দু আইন দুটি প্রধান ঘরানায় বিভক্ত। প্রতিটি ঘরানার পণ্ডিতদের মধ্যে আবার স্থুল, সূক্ষ্ম অনেক মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় বৈদিক সভ্যতার আদি (ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবকাল অর্থাৎ আদিম সাম্যবাদী সমাজের পরবর্তী স্তর) থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সমাজ যেমন ক্রমাগত বদলেছে তেমনি এসব বিধানকে ঘিরেও নানা বিতর্ক জন্ম নিয়েছে। বিধানগুলোর বর্তমান অবস্থা তাই ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের বহুবিধ পরিবর্তনের ফল। এসব বিধানে সময় ও আঞ্চলিকতার প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম প্রদেশ পণ্ডিত জিমুৎবাহন প্রবর্তিত দায়ভাগ বিধানমতে চলে। ভারতের অপরাপর রাজ্য চলে মিতাক্ষরা বিধানে। এসব বিধানের মধ্যেও আবার ঘরানাগত তারতম্য আছে। বাংলাদেশের দায়ভাগ বিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পরে তার সম্পত্তিতে অন্যদের অধিকার (উত্তরাধিকার) জন্মে। কিন্তু মিতাক্ষরার যৌথ পারিবারিক বিধানে একজন শিশু জন্মমাত্র সম্পত্তির অধিকারী হয়। পরিবারের কারও মৃত্যুর জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয় না। চার সদস্যের একটি মিতাক্ষরা যৌথ পরিবারে নতুন শিশু জন্ম নিলে সাথে সাথে ঐ পরিবারের সম্পত্তির ভাগীদার নবাগতসহ পাঁচজনে পরিণত হয়। ফলে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভাগ কমে যায়। শিশুটির জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর সে ঐ সম্পত্তির বাটোয়ারাও দাবি করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো সেখানে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে শুধু ছেলেরা এবং মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে শুধু মেয়েরা সম্পত্তির অধিকার পায়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা হিন্দু সমাজের এসব বিধানের অধিকাংশই সংবিধিবদ্ধ (codify) হয়নি। ফলে জমিজমা ও সম্পত্তির বিচারকার্য পরিচালনায় নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্বতন কোনো আদালতের রায়কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। সমপ্রতি ভারতে এসব ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনেক আইন codify করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পত্তিতে নারী-পুরুষ সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে ভারতীয় হিন্দুদের হিন্দুত্ব ক্ষুণ্ন হয়নি। কাজেই নিতান্ত পশ্চাৎপদ প্রথাগত আইন ও বিধিগুলো সমাজে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। সনাতন ধর্মের প্রগতিশীল বৈশিষ্ট্যের সাথে এ ধরনের আইন সামঞ্জস্য রাখতে পারে না। সনাতন ধর্ম টেকসই, কিন্তু এর সমাজবিধিগুলো মোটেই টেকসই নয়। সমাজে সতীদাহ প্রথা ছিল। আজ চলে গেছে। এতে সনাতন ধর্মের কোনো ক্ষতি হয়নি, বরং ধর্ম মজবুত হয়েছে। বাল্যবিবাহ না হলে একসময় মেয়েরা ‘অরক্ষণীয়া’ হতো। এখনকার শিক্ষিত হিন্দু সমাজ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দেয়া সমীচীন মনে করে না। কুল রক্ষার নামে ‘কুলীন বৃদ্ধের’ শত নারী পরিগ্রহ করার কাহিনী এখন উপন্যাসে খুঁজে পেতে হয়। বিধবা বিবাহের আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সমাজ তাও মেনে নিয়েছে, যদিও সংস্কৃতিটা খুব একটা চালু হয়নি। একসময় ছিল কেবল ‘ছুৎমার্গ’। ধর্ম ছিল, বিবেকানন্দের ভাষায়, ‘ভাতের হাঁড়িতে’। তা থেকেও সমাজ অনেকখানি মুক্ত হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্ম তার সত্যিকারের মর্যাদা ও মহত্ত্ব ধরে রেখেছে। ‘যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে, সহস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে। ...যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়, পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।’ এই মহৎ সত্যের উপলব্ধি সনাতন ধর্মে সব সময় ছিল। নইলে এ ধর্ম টিকত না। আজ যারা হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের বিরোধিতা করছেন, পরিবর্তনশীল পৃথিবীর দাবি মেনে নিতে পারছেন না- তারা প্রকৃতপক্ষে সনাতন ধর্মের অস্তিত্বেরই বিরোধিতা করছেন। বর্তমান যুগে বর্ণাশ্রম ধর্ম বিলুপ্তপ্রায়। ব্রহ্মাচর্য, গার্হস্থ, বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাস- এই চার আশ্রমের ওপর হিন্দু সমাজ আদৌ কি দাঁড়িয়ে আছে? সাথে সাথে বর্ণধর্মের প্রাণ উড়ে গেছে, টিকে আছে খোলসটি।
আজ সমাজের সর্বত্র নারীর ক্ষমতায়নের দাবি। এসব দাবি অর্থহীন হবে যদি নারীকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান করা না হয়। নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক ক্ষমতায়ন কিংবা স্বাধীনতা- সবকিছুর মূল হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল মানুষ সমাজ-জীবনের কোনো স্তরেই ক্ষমতার স্বাদ পায় না। সম্পত্তিতে মানুষের ব্যক্তিমালিকানা স্বীকার করেও একজন নারীকে জন্মসূত্রে প্রাপ্য উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করলে তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই থাকে না। পারিবারিক জীবনে থাকে পরাধীন। সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশের সাহস এবং অভ্যাস কখনোই তার গড়ে ওঠে না। জীবনযাপনে তার অবস্থান হয় প্রান্তিক ও ভঙ্গুর।
পুলক ঘটক
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
নিউ নেশান
নারীর অধিকার আদায়ে
আরেক ধাপ
গত ৩০ অক্টোবর দৈনিক প্রথম আলোয়
দেখতে পাই ‘মাও হবেন বাবার মতো’ অভিভাবক কলামটি। দেখে খুব ভালো লাগল। আমরা জানি, একটি শিশুর জন্ম, প্রতিপালনসহ সবক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা মুখ্য হলেও রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন আর সামাজিক বাধানিষেধের কারণে আমাদের সমাজে মায়ের তথা নারীর অবস্থান প্রান্তিক। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ হলো সরকারের ঘোষিত একটি সিদ্ধান্ত যে, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় শুধু মায়ের নাম থাকলেও পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে, বাবার নাম থাকতেই হবে এমনটি বাধ্যতামূলক নয়। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি আসে ব্লাস্ট, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও নারীপক্ষের হাইকোর্টের একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে। রিট আবেদনে ২০০৭ সালের ২৮ মার্চে প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘বাবার পরিচয় নেই, বন্ধ হলো মেয়ের লেখাপড়া’ এবং ‘ছেলে জানতে চায় কে তার বাবা’ শিরোনামে দুটি সংবাদের সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়, কেবল বাবার নাম দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সাগরিকা ও জালালের মতো সন্তানদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবিধান পরিপন্থী। কারণ সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হতে হবে। আবার ১৫ অনুচ্ছেদে সবার জন্য শিক্ষা ও ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা উচিত হবে না উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত ঘটনা দুটিতে মা ও সন্তান উভয়েরই সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। কারণ তা মানুষ হিসেবে সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিপন্থী, ১৫ অনুচ্ছেদের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্গত শিক্ষার অধিকার আদায়ের পরিপন্থী এবং ২৮ অনুচ্ছেদের অন্তর্গত নারী-পুরুষভেদে কারও প্রতি বৈষম্য না করার পরিপন্থী।
হাইকোর্ট এই রুলের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীদের যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো তা শুধু এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার নিবন্ধের মধ্যেই সীমিত। কিন্তু সব পর্যায়ের শিক্ষা ও চাকরিসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে বাবার সমান্তরালে অভিভাবক হিসেবে মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, এ বছর সন্তানের নাগরিকত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দাবির কিছুটা পূরণ হয়েছে। ১৯৫১ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে কোনো বাংলাদেশি নারী যদি কোনো বিদেশি পুরুষকে বিয়ে করে তাহলে তাদের সন্তান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাবে না। কিন্তু ২০০৯ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে বিধান করা হয় যে, সন্তানের পিতা বা মাতা যে কেউ যদি বাংলাদেশের নাগরিক হয় তাহলে সন্তানও বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ এই আইনের মাধ্যমে মায়ের মাধ্যমে সন্তানের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিধান সন্নিবেশ করা হয়।
মুনমুন সাহা
তৃতীয় বর্ষ
আইন ও বিচার বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ
এ দেশের মানুষ ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধের
বিচারের দাবিতে সবসময় সোচ্চার। ১৯৯১-৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালত গঠন করে নিজেরাই তাদের বিচার করে এবং বিচারের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানায়। কিন্তু সরকারি তরফ থেকে ‘৭১-এর পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে কিছুটা উদ্যোগ নেয়া হলেও ‘৭৫-এর পরবর্তীকালে এবিষয়টি চাপা পড়ে যায়। উল্লেখ্য যে, সরকারিভাবে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি দালাল আইন নামে একটি আইন প্রণয়ন করে পাকিস্তানিদের সাহায্যকারী এদেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামসের বিচার শুরু করা হয়। এই আইনের আওতায় সারা দেশে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০
নভেম্বর প্রকৃত অপরাধী ছাড়া অভিযুক্ত অন্য সবার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার ৪৭১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে ২ হাজার ৮৪৮ জনের বিচার সম্পন্ন করে ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। অবশিষ্টরা খালাস পায়। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল হয়ে গেলে এই আইনে দণ্ডপ্রাপ্তরাও আপিলের মাধ্যমে বের হয়ে আসে। পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে দালাল আইন প্রযোজ্য ছিল না বলে ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’ প্রণয়ন করে দেশ নির্বিশেষে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিধান সন্নিবেশ করা হয়। কিন্তু ৭৫ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সব উদ্যোগেরই ইতি ঘটে।
এ বছর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ভাবে পাস করে। ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’ সংশোধনের সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে অনুমোদন করে। একই সাথে যুদ্ধাপরাধ বিচারে ব্যক্তিগত ও দলবদ্ধ ধারা সংযোজন করে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধনের জন্য ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) আইন ২০০৯’ বিল সংসদে উত্থাপন করে এবং বিলটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পুনরায় সংসদে উত্থাপন করে সর্বসম্মতভাবে পাসের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইনি প্রস্তুতির কাজ সম্পন্ন করেছে সরকার। বিচার কাজ পরিচালনার জন্য জাতীয় বাজেটেও ১০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে বিচার কাজ পরিচালনার জন্য সরকার ১৪নং আবদুল গনি রোডে অবস্থিত সরকারি ভবনে তদন্ত সংস্থার অফিস ও বিচার আদালত স্থাপনের পাশাপাশি আইনজীবী প্যানেল নিয়োগের ঘোষণা দেয়। বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে জাতিসংঘের কাছে কৌশলগত সহায়তা চায় সরকার এবং জাতিসংঘ এ সহায়তা প্রদান করতে সম্মতও হয়। তবে কবে বাস্তবিক অর্থে বিচার শুরু হবে তা এখনো অনিশ্চিত। এ বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্য জনগণের মধ্যে আরো বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু সম্পর্কে আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, দ্রুততম সময়ে বিচারের চেয়ে বিচারের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার যে কারণে বিলম্ব হচ্ছে।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মুজিবুর রহমান বলেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বরের আগেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। আবার আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, নতুন বছরের শুরুতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এবং জানুয়ারির প্রথম দিকেই শুরু হবে তদন্ত।
বিচার কাজ শুরু নিয়ে নানা মন্ত্রীর নানা বক্তব্য এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহসহ তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেল নিয়োগে সরকারের দীর্ঘসূত্রতা দেখে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে- আদৌ বিচার শুরু হবে তো? সরকার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি যতটা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছে সময়ের সাথে সাথে সরকারের কাছে কি সে গুরুত্ব কমতে শুরু করেছে?
লুবানা রশীদ
মানবাধিকার কর্মী
ঢাকা-কুষ্টিয়া-পাবনা-সিলেট
ভায়া
ওয়াজ মাহফিল
শের যাতায়াত ব্যবস্থায় সিংহভাগ
জুড়ে আছে বাস। কোথায় যাবেন, টেকনাফ না তেঁতুলিয়া? সিলেট না খুলনা? আপনাকে দিচ্ছে অনাবিল প্রশান্তি!
এই অনাবিল প্রশান্তিতে যখন ভর করে ভোগান্তি তখনই শুরু হয় বিপত্তি। মানুষের মস্তিষ্কে চলে ক্ষোভের, অমর্যাদার, অপমানের স্নায়ু মিছিল।
ঘটনা শুরু যাত্রাপথে। অবশ্যই বাসে, শহরের নয় দূরপাল্লার। যেখানে একজন যাত্রীর একটা দীর্ঘ সময় পার করতে চায় কখনও চিন্তায়, কখনও আবিষ্কারে, প্রকৃতি দর্শনে বা ঘুমের মধ্যে। অভিজ্ঞতার প্রথম পর্বে ঢাকা টু পাবনা, ঢাকা টু কুষ্টিয়া, দ্বিতীয় পর্বে ঢাকা টু মৌলভীবাজার। দামি বাস কোম্পানি- হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী এন্টারপ্রাইজ, এস. বি এন্টারপ্রাইজ, পাবনা এক্সপ্রেস। অফিসের কাজের জন্য এবং নিজ বাসস্থানের জন্য উক্ত জায়গাগুলোতে আমার যাতায়াত।
সময়টা মুখ্য নয়, কেননা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে। গাড়ি ছাড়ার শুরুতে দোয়া-সূরা অডিওতে বাজানো দিয়ে শুরু। এখানে ঘটনা শেষ হতো এতকাল বা গত বছরগুলোতেও হয়েছে। কিন্তু এখন মাস চারেক প্রায়, যাত্রীসাধারণের অনুমতি ব্যতিরেকে ঐ বাসগুলোতে ‘ওয়াজ মাহফিলের’ ক্যাসেট বাজানো হয়। বিষয়টা যেহেতু চাপানো, জানি না ক’জন যাত্রী তা উপভোগ করেন বা আদৌ করেন কিনা। তাছাড়া যাত্রাপথে এ দীর্ঘ সময় বিরামহীন ওয়াজ শোনা কতটা স্বস্তিকর? উচ্চ শব্দে অডিওতে অন্যান্য সঙ্গীত বাজালে বন্ধ করা বা শব্দ কমানোর কথা অনায়াসে বলা যায়। এক্ষেত্রে তা পুরোটাই উল্টো; কারণ মাথার উপর খড়গের মতো ধরা আছে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয়টি। তাই এক্ষেত্রে বাদ-প্রতিবাদের সুযোগ বলতে গেলে থাকেই না।
এদিকে চালক মহোদয় বা সুপারভাইজারকে বিষয়টি বিনয়াবশত অবগত করা হলেও কোনো ভ্রূক্ষেপ করার প্রয়োজন দেখান না, বরঞ্চ বাধ্য করান ওয়াজ শোনানোর ক্ষেত্রে। গ্রাহ্যের মধ্যে আনতেই চান না বাসে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষজনও যে থাকতে পারেন।
কুষ্টিয়া রুটের বাসের সুপারভাইজার ইঙ্গিত করেন- যাত্রীদের মধ্যে দুই-একজন হুজুর আছেন। তাই ওয়াজের ক্যাসেট বন্ধ করা যাচ্ছে না। অথচ পুরো বাসে আরও তো ৩২ জন যাত্রী আছেন। এখানেই প্রশ্ন, নাটাই কি অন্য কোথাও? এটা কিসের ইঙ্গিত?
সিলেট রুটে হানিফ, শ্যামলী বাসে চালকদের সাথে রীতিমতো কথা কাটাকাটি হয়েছে। ওয়াজের ক্যাসেট যেন বন্ধ করা হয় অথবা এর শব্দের মাত্রা কমানো হয়। গত বছর পর্যন্ত পাবনা রুটে শ্যামলী বাসগুলোতে অধিকাংশরই অডিও সিস্টেম নষ্ট থাকার কথা বলা হয়েছে। আর যেগুলোতে ভালো আছে আপনাকে শুনতে হচ্ছে ওয়াজের ক্যাসেট উচচ শব্দে।
‘অনাবিল আনন্দের নামে’ যাত্রীসাধারণের দুর্ভোগ দেয়ার কী মানে সেটা নিশ্চয়ই জানা বা বলার অধিকার আছে আমাদের। নাকি নেই?
জগন্ময় পাল
নাট্যকর্মী
-- * --


* কাজে যোগদানের পর ৫২জন বিডিআর সদস্য মারা গেছে
* পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ৮ জন মারা গেছে (যুগান্তর ১৫/১/০৯, সংবাদ ১৬/৬/০৯,
প্রথম আলো ৩০/৭/০৯, নয়া দিগন্ত ৩১/৭/০৯,
ইনকিলাব ১৬/৮/০৯, সমকাল, ৪/১১/২০০৯, আমার দেশ, ১২/১২/২০০৯)
* র্যাবের অভিযানের সময় ছাদ থেকে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে, (যুগান্তর, ১৪/১২/২০০৯)
সূত্র: প্রথম আলো, সংবাদ, ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, যুগান্তর, ইনকিলাব, সমকাল, নয়া দিগন্ত, আমার দেশ, ডেইলি স্টার ও নিউ এইজ।
আসক-এর তথ্যসংরক্ষণ ইউনিট কর্তৃক সংকলিত।