- ASK Bulletin 2009
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   বিশেষ রচনা
   পরিবেশ
   ফলোআপ
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন-তথ্য
   মত-অভিমত

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

প্রচ্ছদ-কাহিনী

সাক্ষাৎকার মালেকা খান

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র

কুর্‌রাতুল আইন তাহ্‌মিনা

আসক পরিচালিত কথ্য ইতিহাস প্রকল্পটির (১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ পর্যন-) অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নারীর অভিজ্ঞতার বয়ান লিপিবদ্ধ করা এবং প্রাপ্ত তথ্যগুলোকে পাকিস-ানি সেনাবাহিনী ও দেশীয় সহযোগীদের সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে হাজির করা। তা থেকে ২০০১-এর ফেব্রুয়ারির অমর একুশে বইমেলায় ঊনিশ জন ক্ষতিগ্রস- নারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘নারীর ৭১ ও যুদ্ধপরবর্তী কথ্যকাহিনী’ বইটি প্রকাশিত হয়। সেসময় প্রকল্পের গবেষকেরা তথ্য সংগ্রহের জন্য কয়েকজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম শিক্ষক ও সমাজকর্মী মালেকা খানের সাক্ষাৎকারটি। প্রকল্পের পক্ষ থেকে ১৯৯৭-এর ২৬ নভেম্বর, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক কুর্‌রাতুল আইন তাহ্‌মিনার গ্রহণ করা মালেকা খানের এ সাক্ষাৎকারটি প্রথমবারের মতো আসক বুলেটিনে মুদ্রিত হলো।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসেই ঢাকায় বেগম সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে সমাজসেবী কয়েকজন মহিলা যুদ্ধে নির্যাতিতা মেয়েদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন। উদ্যোগটি ছিল তাৎক্ষণিক, স্বতঃস্ফূর্ত এবং বেসরকারি। এঁরাই ’৭২-এর জানুয়ারিতে গঠন করেন ‘কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থা’- স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে নির্যাতিত মেয়েদের সাহায্য ও সহযোগিতা করার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা। মালেকা খান এই উদ্যোগের সাথে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে জড়িত ছিলেন প্রথম থেকেই। পরবর্তীকালে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সংস্থার পরিচালিকার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সাথেও জড়িত ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৯ ও ৩০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা নেয়ার জন্য যে বাঙালি সেনাকর্মীদের হত্যা করা হয়, তাঁদের মধ্যে মালেকা খানের ছোট ভাই লেফটেন্যান্ট আতিক ও জ্ঞাতিভাই লেফটেন্যান্ট কর্নেল আনোয়ারও ছিলেন। মালেকা খান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর বেগম বদরুন্নেসা আহমেদের সহযোগিতায় স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে মেয়েদের ফার্স্ট এইড ও সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং দেয়া শুরু করেন।

১৯৭১ সালে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের পুনর্বাসনের জন্য যে সোনারগাঁ (Crafts village) প্রকল্প করা হয়, সেখানেও মালেকা খানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে নির্যাতিত মেয়েদের কথা বলতে গিয়ে মালেকা খান যুদ্ধকালীন একটি ঘটনার কথা বললেন: “৭১-এর ঠিক মাঝামাঝি সময়ে, আমি তখন গার্ল গাইডের সেক্রেটারি ছিলাম।... ঐ সময় আমরা তো মনে করেন একবার গ্রামে চলে যাচ্ছি, আবার শহরে আসছি, আবার গ্রামে যাচ্ছি। এইভাবেই কাজ করেছি। এই সময়ে গার্ল গাইডের ওপর দায়িত্ব এলো (পাকিস্তানের প্রশাসকদের নির্দেশ) যে, যেন ঢাকাতে মেয়েদের একটি সমাবেশের আয়োজন করি। কিন্তু সেক্রেটারি হিসেবে আমি জানালাম, কোথাও কোনো কলেজ, স্কুল, পাঠশালা চলছে না, আমরা কী করে গাইডদের সমাবেশ করতে পারি?’ এরকম সময় আমাদের কাছে খবর এলো যে, বেশ কিছু মেয়ে ঢাকা সেনানিবাসেই বন্দি আছে। আজকে যেটা এমপি হোস্টেল নাখালপাড়ায়, সেখানেও মেয়েরা বন্দি রয়েছে। এ খবর শুনে আমরা যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি, তখন একটা সুযোগ হলো, সেনা কর্মকর্তাদের মুখ থেকে কিছু শোনার। গার্ল গাইডের প্রধান ছিলেন মিসেস তাহেরা কবীর, তাঁকে পাক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার বশির ডেকে পাঠালেন। তাহেরা আপা একা যাবেন না, বললেন সেক্রেটারি হিসেবে আমাকেও তার সাথে যেতে হবে। আর সাথে নিলেন মিসেস আফিফা হককে। আমি আপাদের সাথে গেলাম নাখালপাড়ায় এমপি হোস্টেলে। আমি ভাবছি অন্য কথা- কীভাবে ঐ বন্দি মেয়েদের সাথে দেখা হবে। কেমন করে তাদের উদ্ধার করা যায়। জানতে চাচ্ছি চারদিকে কী ঘটছে। ওখানে আলাপ-আলোচনা যা হচ্ছে, সেখান থেকেই আমি জানতে পারলাম যে, ৩০০ মেয়ে নাকি ওখানেই বন্দি আছে।”

মালেকা খান আরো বলছিলেন: “ঐ নাখালপাড়ার এমপি হোস্টেলটা একটা ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারের মতো ছিল। যে ঘরটাতে ব্রিগেডিয়ার বশির বসেছিলেন, সেখানে আরো অনেক ধরনের লোকজন ছিল। কেউ চুপচাপ বসে আছেন, কেউ তর্ক করছেন। আমরা যখন চলে আসছি তখন দেখেছি একটা ঘরের মেঝে, দেয়ালে ছড়ানো-ছিটানো রক্তের ছোপ ছোপ ছাপ। মনে হয় যেন রক্ত ছিটকে ঐ দেয়ালের মধ্যে লেগেছে।” মেয়েদের আটক রাখার কথা সেদিন সেখানে উপস্থিত পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা স্বীকার করেননি।

ব্রিগেডিয়ার বশির গার্ল গাইড নেত্রীদের ডেকেছিলেন সমাবেশ করার নির্দেশ দিতে। গার্ল গাইড নেত্রীরা সেদিন বলেছিলেন, ‘আপনারাও জানেন, আমরাও জানি যে দেশের এই অবস্থায় সমাবেশ করা সম্ভব নয়।’ ব্রিগেডিয়ার বশির যখন বারবার বলছিলেন দেশের অবস্থা খুব ভালো। তখন মিসেস আফিফা হক (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান গার্ল গাইড অ্যাসোসিয়েশনের ডেপুটি কমিশনার) প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ঢাকা শহরেই কেউ ঘর থেকে বেরুতে পারছে না, অনিশ্চিত, ভাসমান একটা অবস্থা, আত্মীয়-স্বজনরা বেঁচে আছে না মারা গেছে জানা নেই, সেখানে দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হয় কীভাবে?

মালেকা খান বলছিলেন: “এমন কথাও সেদিন মিসেস আফিফা হক বলেছিলেন, ‘আমাদের গায়ে আপনারা দোররা মারেন, তবু ঐ বন্দি মেয়েগুলিকে ছেড়ে দিন।’ এই যে এ ধরনের কথাবার্তা তাতে বোঝা যায়, ৩০০ না হোক অনেক মেয়েই ওখানে বন্দি ছিল। তারপর গ্রামেগঞ্জে যখন ছিলাম, আমার নিজের জানা এলাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি মেয়ে আমাকে বললো যে, জানেন আমার শ্বশুরবাড়িতে আমি জানালা দিয়ে দূরে চুপিচুপি তাকিয়ে দেখেছি যে, একটা এলাকায় মেয়েদের এক জায়গায় করে মেরে ফেলেছে, বন্দি করেও নিয়ে গেছে। তার মধ্যে কতজনকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছে। এক বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তা এ ধরনের ঘটনা তো একেবারে কানে শুনে চোখে দেখে ’৭১ পার করেছি। তা এ মেয়েগুলো গেল কোথায়?” গার্ল গাইডের যোগাযোগের মাধ্যমে ১৯৭১ সালেই খুলনা, যশোর, কুমিল্লা, নরসিংদী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গা থেকে মেয়েদের ওপর নির্যাতনের নানান ঘটনা শুনেছেন মালেকা খান।

মালেকা খানের মনে আছে, “তাঁরা যখন এমপি হোস্টেলের গেট দিয়ে বের হচ্ছেন সেখানে অনেক ধরনের লোকজন অপেক্ষমাণ। তারা জানালেন- আমরা অনেকের খোঁজ পাচ্ছি না। এক মহিলা তো চিৎকার করে বলছিলেন- আমার ছেলে কই? তারে আইন্যা দেও। সে একটা নিদারুণ কষ্টের দৃশ্য। সেই গেটের মধ্যে যে লোকজন ছিল, আমি পরে তাদের কাছে জানতে পারি, এর ভেতরেই অনেক লোকজন আটক আছে।”

‘কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থা’ আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত হয় ৭ জানুয়ারি, ১৯৭২। কিন্তু কাজ শুরু হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। মালেকা খান গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। নিজেরই তখন ছোট ভাই নেই, আরো আত্মীয়স্বজন হারিয়েছেন। চেনাজানা পরস্পরের খোঁজখবর করতে গিয়ে দেখা গেল, অন্যদের অবস্থা তাঁর চেয়েও আরো খারাপ। তখনই মনে প্রশ্ন জাগলো- নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলে বন্দি যে মেয়েদের কথা শুনেছিলেন, তাদের কী হলো। উথালপাথাল মনের অবস্থা তখন।

তখন একেবারে সেই প্রথমদিনগুলোতে মুক্তিযোদ্ধা ছেলেরা দেশের নানা জায়গা থেকে খবর আনছিল কোথায় কোন বাড়িতে, কোন বাঙ্কারে নির্যাতিত মেয়েরা বন্দি হয়ে আছে। নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর করার মধ্যেই কয়েকজন মহিলা এগিয়ে এলেন এই মেয়েদের উদ্ধার করার কাজে। বেগম সুফিয়া কামাল তো সবার আগে ছিলেনই, তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন বদরুন্নেসা আহমেদ। আরো ছিলেন সাথে মেহের কবীর, আয়েশা নোমান, লুৎফুন্নেসা হক, সাহেরা আহমেদ, হাস্‌না হাজারী, ড. হালিমা খাতুন, শিল্পী সুফিয়া শহীদ, ফিরোজা খাতুন, বেগম শামসুন্নাহারসহ আরো অনেকে। সমাজকল্যাণ বিভাগের পরিচালক বজলুর মজিদ, তার অফিসের মহিলা স্টাফদের নির্দেশ দিলেন বেগম সুফিয়া কামালকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করতে। এভাবে স্বাধীনতার পরপরই মেয়েদেরই উদ্যোগে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের কাজ বেসরকারিভাবে শুরু হয়।

প্রথম প্রয়োজন একটি বাড়ি, যেখানে উদ্ধারকৃতদের এনে রাখা হবে। তাঁরা ইস্কাটনে ইস্পাহানি কলোনির উল্টোদিকে একটি পরিত্যক্ত সরকারি কোয়ার্টারে প্রথম মেয়েদের নিয়ে তোলেন। তারপর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের ২০ নং ইস্কাটনের বাড়িটি খালি থাকার খবর পাওয়া গেল। বেগম সুফিয়া কামাল, বদরুন্নেসা আহমেদ, মেহের কবীর এবং আরো কয়েকজন গেলেন ঐ বাড়িটি নেয়ার ব্যবস্থা করতে। মালেকা খানও তাঁদের সাথে ছিলেন।

সেখানে তখন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসে আশ্রয় নিয়েছেন এবং তাঁরা তখন ভাত খেতে বসেছেন। বেগম সুফিয়া কামাল এবং মেহের কবীর তাঁদের অনেক করে বুঝিয়ে বললেন যেন তাঁরা উদ্ধারকৃত নির্যাতিত মেয়েদের জন্য ঐ বাড়িটি ছেড়ে দেন। পরদিন খোঁজ নিয়ে দেখা গেল তাঁরা বাড়িটি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। এটা মালেকা খানের স্মৃতি অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। উদ্ধার করার কাজে তাঁর প্রথম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন মালেকা খান: “বদরুন্নেসা আহমেদ (বদরুন আপা) আমাকে খবর পাঠালেন। গার্ল গাইড অফিসে আমার কাজ সেরে ওনার বাসায় গেলাম। গিয়ে দেখি দুটি জিপ দাঁড়িয়ে আছে। ক্যান্টনমেন্ট তখন ছিল ভারতীয় সেনাদের অধীনে। তো ঐ জিপে করে, আমাকে বললেন যে কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে যাও- আমি কিছু কাপড়-চোপড় নিয়ে গেলাম। দুটি জিপের একটিতে আমি বসলাম, আরেকটিতে ঐ ছেলেরা, যারা খবর এনেছিল। সেনানিবাসের ভেতরের একটি বাড়ি থেকে মেয়েদের আনা হয়েছিল। সেটাই আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা। তখন ওখান থেকে ৪ জন মেয়েকে মগবাজার মোড়ের কাছে অবাঙালিদের পরিত্যক্ত বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। অপেক্ষারত বদরুন আপা নিজে ঐ মেয়েদের জিপ থেকে নামিয়ে নিয়ে যান। ততোক্ষণে রাত হয়ে গেছে বলে আমাকে বাড়ি চলে যেতে বলেন। আজও আমার মনে আছে, ঐ মেয়েদের যখন উদ্ধার করতে গেলাম মনে হয়েছে যেন কতদিন ওরা ধুলোর মধ্যে গড়াগড়ি করেছে, চুলগুলো দু’একজনের সামান্য বড় ছিল কিন্তু বেশিরভাগেরই চুল কদমছাঁট, গায়ে কাপড় আছে কি নেই। সে যে কী বীভৎস অবস্থা। তাড়াতাড়ি কিছু কাপড় ওদের গায়ে পরিয়ে দিলাম, ঠিক পরানো নয় যেন পেঁচানো হলো, তারপর গাড়িতে উঠানো হলো। তারপর বলা হয়েছিল ইস্কাটনে একটি বাড়িতে এনে ওদের নামিয়ে দিতে। তারপর ওদের চিকিৎসার জন্য বদরুন আপা কী করেছিলেন বলতে পারব না। আমার দায়িত্ব ছিল শুধু এনে পৌঁছে দেয়া । তা এরকম ৩-৪ দিন, ৫-৬ জায়গা থেকে উদ্ধারের কাজ করলাম।” নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলেও বিভিন্ন বাঙ্কার থেকে উদ্ধার করে মেয়েদের রাখা হয়েছিল। সেখান থেকেও মালেকা খান তাঁদের নিয়ে আসেন। মালেকা খানকে বলা হয়েছিল এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে যেন বাড়িতে এবং বাড়ির বাইরে কারও সাথে আলোচনা করা না হয়, তাহলে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে।

আরো পরে সরকার থেকে কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থাকে দুটি বাড়ি বরাদ্দ করা হলো: ৮৮ নং ইস্কাটন এবং ২০ নং ইস্কাটন। এখানে নথি করে নির্যাতিত মেয়েদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে, তাঁদের ভর্তি করা হতে লাগলো।

মালেকা খানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম উদ্ধার করার পরপর মেয়েদের মধ্যে কী অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া তিনি লক্ষ্য করতেন: “আমি নির্বাক, ওরাও নির্বাক। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তখন কোনো কথা ছিল না। আর যখন কথা বলেছি তখন মাথায় কোনো বুদ্ধিও খেলতো না। খালি একটা জিনিস মনে হতো- এই ঘটনা তো আমারও ঘটতে পারত, আমার বোনদের ঘটতে পারত বা আমার জানাশোনা অন্য কারো জীবনেও ঘটতে পারত। এটা যেমন আমার তখনো ভয় লাগত, আজও মনে পড়লে তেমনি ভয় লাগে।”

নির্যাতিত মেয়েদের খোঁজখবর দেয়া এবং উদ্ধার কাজে অনেকেই জড়িত ছিলেন। স্থানীয় থানার লোকজন, রাজনৈতিক কর্মী, সরকারি-বেসরকারি মানুষজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের সংস্থাকে জানিয়েছেন যে, এখানে এমন মেয়েরা আছেন, তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। খবর জানিয়ে নানাভাবে সাহায্য করেছেন তখন রাজশাহী থেকে সুলতানা জামান, রাজশাহীর স্কুল পরিদর্শক উম্মে আয়শা চৌধুরী, মৌলভীবাজারের সিরি আপা, চাঁদপুরের প্রতিমাদি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নূরজাহান। এঁদের খোঁজ পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আরো বিশদ জানা যাবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নূরজাহান উর্দু বলতে পারতেন। যুদ্ধকালের অনেক খবরও তিনি মালেকা খানকে জানাতেন। মালেকা খানের অস্পষ্ট মনে আছে, শত্রুসেনাদের হাত থেকে গ্রামবাসীদের বাঁচানোর কোনো একটি পরিকল্পনা করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই নূরজাহান। আজ সে কোথায় আছে জানা নেই।

সংস্থায় আনার পর অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই মেয়েদের নানাভাবে সাহায্য করেছেন, এঁদের মানসিক শান্তি বা সান্ত্বনা দেয়ার কাজ করেছেন। মালেকা খান এ প্রসঙ্গে কবি গোলাম মোস্তফার মেয়ে ফিরোজা খাতুন, মিসেস আয়শা নোমান, মমতাজ, হাজেরা খাতুন- এঁদের নাম করলেন। হাজেরা খাতুন এই মেয়েদের প্রথম মেট্রনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। হাজেরা খাতুন রাতে উদ্ধারকৃত মেয়েদের সাথে ঘুমিয়েছেন। মালেকা খান বলেছিলেন, উদ্ধার কাজ চলছিল প্রায় বছর ধরে তো বটেই তা আরও বেশি হতে পারে। দেশের সব অঞ্চল থেকেই মেয়েরা আসত: “তবে এদের মধ্যে সবাই যে গর্ভবতী ছিল তা নয়। এদের মধ্যে কুমারী মাও ছিল, বিবাহিতরা আবার সন্তানসম্ভবা ছিল এমনো হয়েছে। নানান বয়সের মেয়েরা ছিল। কঠিন অবস্থাটা ছিল অল্প বয়সী মেয়েদের। পাকসেনারা বয়সের বাছ-বিচার করেনি কাউকে। অনেকে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছিল। আবার ঐ সময় একটা অদ্ভুত সুন্দর জিনিস দেখেছিলাম। যাঁরা জানতেন না তাঁদের সন্তান কোথায় আছে, যাঁরা টের পেয়েছেন, খোঁজ পেয়েছেন, এসে দেখেছেন যে এটা তাঁদেরই সন্তান, তাঁরা কিন্তু নিয়ে গেছেন।”

এসব মেয়ে এখন নানাভাবে সমাজে মিশে গেছেন। মালেকা খান বলেন, “এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। এই অন্য মেয়েরা তাদের সবচাইতে দামি সম্পদ সম্ভ্রম জলাঞ্জলি দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার পতাকা এনে দিয়েছেন। সেজন্য এরাও মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু এই মেয়েদের কাছে এখন যেতে হলে একটু অন্যভাবে যেতে হবে। কারণ এখানে কিছুদিন যাবৎ লক্ষ্য করছি, সবাই যেন আবার আমাদের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েরা কে কোথায় আছে তাদের খবর জানার জন্য উদগ্রীব। কিন্তু তাদের কাছে যদি এভাবে বলা যায় যে, অন্য কার কী ক্ষতি হয়েছে, হয়তো তাঁরা কথার ফাঁকে নিজের কথাও বলতে পারে। সরাসরি জিজ্ঞেস করলে তাঁকে কষ্ট দেয়া হবে। আর এতদিন ওরা কী কষ্ট যে করেছে সে খবর তো কেউ নেয়নি। তাই তাদের বুকভরা আছে একরাশ অভিমান। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে।”

মালেকা খানের মনে আছে, তিনি নিজেই প্রায় ৫০০০ মেয়ের কেসহিস্ট্রি পড়েছিলেন, সংস্থায় এর চেয়েও বেশি মেয়ে থেকে থাকা সম্ভব। সরকার পরবর্তী সময়ে নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেয়। কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন সংস্থার কাজের মধ্যে ছিল মেয়েদের হাতেকলমে কাজ শেখানো, চাকরি দেয়া, তাদের পরিবারকে ভাতা দেয়া, তাদের বাচ্চাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। সরকার পরিচালিত নারী পুনর্বাসন বোর্ডের কর্মসূচি হিসেবে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছিল বেইলি রোডের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের নিচতলায়। বছর দুয়েক পরে সরকারের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হলো নারী কল্যাণ ও পুনর্বাসন ফাউন্ডেশন। নারী পুনর্বাসন বোর্ড পরে ফাউন্ডেশনের মধ্যে মার্জ হয়ে যায়, বোর্ডে কার্যক্রম বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ফাউন্ডেশন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। এরশাদ সাহেবের শাসনামলে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বিলুপ্ত করে সরকার ফাউন্ডেশনের ভবনেই পরবর্তীকালে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর করে। মালেকা খান মনে করেন, এভাবে ’৭১-পরবর্তীকালে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের কল্যাণ ও পুনর্বাসনের যে কাজকর্ম হয়েছিল তার ইতিহাস নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, ফাউন্ডেশনের ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন (ফাউন্ডেশনের শেষ Chairperson ছিলেন ফাতেমা সালাম। মালেকা খান ছিলেন একজন বোর্ড সদস্য)। কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন কেন্দ্র স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানই রয়ে গেছে। তবে তার জেলার কর্মকাণ্ডগুলো ফাউন্ডেশনের সাথে মার্জ হয়ে গিয়েছিল।

মালেকা খান জানালেন, ১৯৭২ সালের শেষ দিকে সিদ্ধান্ত হলো যে সোনারগাঁয়ে মহিলাদের জন্য পুনর্বাসন প্রকল্প নেয়া হবে, সেটাকে বলা হলো Crafts village. পরিকল্পনা ছিল যে, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের বিভিন্ন কারুশিল্প শিখিয়ে সেখানে জমি দিয়ে বসানো হবে। রাড্ডা বারনেন অর্থ সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল এবং একবার কি দু’বার তারা এই কাজের জন্য অর্থও দিয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫-এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেসব ভেস্তে গেল। তারপর Crafts village প্রকল্পটি এগোনো সম্ভব নয় বিধায় মালেকা খান সিদ্ধান্ত নেন এই সংস্থার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার। মালেকা খানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন্দ্রে আসার পর উদ্ধারকৃত মেয়েদের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেয়া হতো? এ প্রসঙ্গে তিনি জানান: “...প্রথমেই চিকিৎসা, কারণ অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল। অনেকে শুধুই আত্মীয়-স্বজন হারিয়ে এসেছে, অনেকে এমন একটা অসহায় অবস্থায় যে, আমি এখন কী করব, আমি কাল কী করব? কারণ যে স্বাভাবিক ছিল সে নিজেকে নিয়ে চিন্তা করত।” বয়স অনুযায়ী স্কুলের ব্যবস্থা করা, অসুস্থ মায়ের সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হতো। আর একটু যারা বড় তাদের নানান হাতের কাজ শেখানো হতে লাগলো- বিশেষ করে যেসব কাজ মেয়েদের সহজাত। সেলাই-দর্জিবিদ্যা, রান্না, মসলা গুঁড়া করা ইত্যাদি কাজ শেখানো হতো, যাতে তারা আয় করে খেতে পারে। গর্ভবতী বা যুদ্ধশিশুসহ মা- এমন মেয়েদের নিয়ে তখন সমস্যাটা সবচেয়ে বড় ছিল। মালেকা খান বলছিলেন যে এখনকার মতো তখন মানুষ দত্তক নিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেনি। সে সময় বাংলাদেশ সরকার এই জটিল অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দুটি অর্ডিন্যান্স জারি করে সহজেই কাজ করার ব্যবস্থা করে। প্রথমটি আন্তর্জাতিক দত্তক আইন, দ্বিতীয়টি গর্ভপাত আইন করা হলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে। কেন্দ্র থেকে কত বাচ্চা দত্তক দেয়া হয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাবে মালেকা খান জানান, “সঠিক সংখ্যা মনে নেই। তবে দত্তক দেয়ার জন্য পৃথক প্রতিষ্ঠান ছিল। সেখান থেকে একদিন ৪০ জনকে দত্তক দেয়া হয়েছিল। এটা একদিনের ঘটনা।” মালেকা খানের মনে আছে বিদেশ থেকে বেশ কয়েকজন ডাক্তার গর্ভপাতের ব্যাপারে সাহায্য করতে আসেন। এখানকার ডাক্তারদের মধ্যে, তাঁর মনে আছে ডা. হালিমা খাতুনের কথা। এছাড়া তাঁর আরো মনে আছে, যুদ্ধের পরপর বাংলাদেশে এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার শল্য চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিস। তিনি লন্ডনে ফিরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিত নারীদের কথা জগতের সামনে তুলে ধরেন। মালেকা খানের মনে পড়ে, ডা. ডেভিস ধর্ষিতা-অন্তঃসত্ত্বা মেয়েদের গর্ভপাত করানোর সাথে জড়িত ছিলেন।

এই বিশেষ অবস্থার মেয়েদের পরিবারের সঙ্গে কি যোগাযোগ করা হতো? “আমরা ওদের (মেয়েদের) কাছ থেকে শুনে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছি। যারা একেবারেই জানত না যে তার মেয়ে এই জায়গায় আছে, তারা তখন পাগলের মতো ছুটে এসেছে।... এসব ব্যাপার তখন তারা বড় করে দেখেনি, তাদের আপনজনকে যে তারা ফিরে পেয়েছে, ওটাই তাদের কাছে বড় ছিল। এটা আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেই বেশি দেখেছি।” আবার অনেকের আত্মীয়স্বজনের খোঁজই পাওয়া যায়নি। ফেরত না নেয়ার ঘটনাও কিছু ঘটেছে, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত এবং গ্রামের মানুষের ক্ষেত্রে। হয়তো অল্পবয়সী মেয়েকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আশপাশের অনেকে জানে। সে ক্ষেত্রে বাবা-মা মনে করেছে মেয়েটি সংস্থাতেই থাকুক, তারা এসে দেখে যাবেন।

আত্মীয-স্বজন প্রথম এলে মেয়েটির মনোভাবই-বা কী হতো? এ প্রসঙ্গে মালেকা খান জানান- “স্বভাবতই তারা ফিরে যেতে চাইত। যখন বাবাকে দেখত তখন কান্নাকাটি করতো। বাবা হয়তো বলতেন, না, পরে এসে নিয়ে যাবো- কারণ সমস্যাটা বাবা যেভাবে দেখতেন মেয়ে তো সেভাবে দেখত না। মেয়ে দেখতো যে বাবা এসেছে, আমি বাবার সাথে চলে যাব। সামাজিক, অর্থনৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক দিক বাবারা যেভাবে চিন্তা করতেন, সে শিক্ষিত বা নিরক্ষর বাবাই হোক, ভিকটিম যে সে তো সেভাবে দেখত না। সব মেয়ে স্বভাবতই আপন সংসার-ঘর পেতে চাইত। ‘না আমরা যাব না, আমরা এখানে ভালো আছি’- এমন কথা তারা বলেনি। কিন্তু পরবর্তীকালে ৩-৪ বছর পর কেউ কেউ যখন বুঝেছে যে বাবা তো নিতেই চাচ্ছে না, তখন, ‘কাজ শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াবো, বাবাকে আমিই পালব’- এরকম প্রতিক্রিয়াও দেখেছি।” বাবা-মা যাদের নিতে চায়নি সে মেয়েরা বেশিরভাগই ছিল নিম্ন-মধ্যবিত্ত, কিছু মধ্যবিত্ত পরিবারের। তবে মালেকা খানের মতে, প্রায় ৯০ শতাংশ মেয়েই পরিবারে ফেরত গেছে। যারা রয়ে গিয়েছিল সংস্থা থেকে তাদের চাকরি দেয়া হয়েছে, বিয়েও দেয়া হয়েছে।

আবার এমনো হয়েছে, অনেক পরিবার তখনই নেয়নি, বলেছে আরেকটু সুস্থ হোক, কাজ শিখুক তারপর নেব। কেউ কেউ পরে আর নিতে আসেনি। এঁদের চাকরি দেয়ার জন্য সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মীরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে বন্দোবস্ত করেছেন। মালেকা খানের মনে আছে, রেডক্রসের কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে সংস্থার আটজন মেয়েকে পরিচারিকার কাজ দেয়ার জন্য তিনি নিজে নিয়ে গিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা গাজী গোলাম দস্তগীরের সহযোগিতায় তারা সে কাজ পেয়েছিল অতি সহজেই।

পুনর্বাসিত এই মেয়েরা পরবর্তীকালে সমাজে কীভাবে গৃহীত হলো? “ওরা নিজেরাই আপন জায়গা করে নিয়েছে। যেমন যে জায়গায় কাজ করেছে ওখানে তাদের আপনজন হয়ে গেছে। তারপর বিয়ে-শাদি হয়ে গেছে, এভাবে সংসারী হয়ে গেছে। কেউ ওদের খোঁচায়নি। এখন যদি আমরা খোঁচাই তাহলে কেউ ভালোভাবে, কেউ খারাপভাবে দেখবে।”

মালেকা খান বলছিলেন, এমন মেয়ে আছে যার হয়তো কাজের জায়গায় কোনো শিক্ষিত ভদ্রলোকের সাথে বিয়ে হয়েছে, মেয়েটির অতীত ইতিহাস নিয়ে টানাটানি করলে এত বছর পর স্বামী বা স্বামীর পরিবার সেটা কতখানি উদারভাবে নেবে ‘সেই জায়গাটায় আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় নেই।’ করা উচিতও হবে না বলে তিনি মনে করেন। এতে একটা আশ্রয়স্থল মেয়েটি হারাতে পারে। সেদিকটা বিবেচনায় রাখতে হবে।

সংস্থার সাথে কাজ করতে গিয়ে অনেক অবস্থার অনেক মানসিক গঠনের মেয়েই দেখেছেন মালেকা খান। একটি মেয়ের বাবা মামলাও করেছিলেন কিশোরগঞ্জে, স্থানীয় প্রশাসনও সাহায্য করতে তৈরি ছিল কিন্তু সাক্ষ্য দিতে কাউকে পাওয়া গেল না। আবার একটি মেয়ে তার বাচ্চা দত্তক দিতে রাজি হয়েছে, ব্যবস্থাও হয়েছে কিন্তু বাচ্চাকে দেয়ার সময় তার আকুল কান্নার কথা মালেকা খানের মনে আছে। অনেক বিবাহিত মহিলার স্বামীরা তাদের ফিরিয়ে নিয়েছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে। এমনি একজনের সাথে পরে একবার মালেকা খানের দেখা হয়েছিল, সেই ভদ্রমহিলা চাননি যে তাদের আর দেখা হোক। কারণ তাঁর অনেক কষ্টকর স্মৃতি মনে পড়ে যায়। হাত ধরে মিনতি করেছিলেন যেন তাদের কথা কাউকে না বলি। সংস্থার হোস্টেলের মেট্রনের মুখে মালেকা খান শুনেছেন, কোনো মেয়ে হয়তো সারারাত পায়চারি করতো। ঘুমালে ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। “এগুলো ডাক্তারকে বলা হলে চিকিৎসা করা হতো যাতে ঘুম হয়, ভুলে যেতে পারে। ... আস্তে আস্তে তারা সংসারের মধ্যে ঢুকে গেছে। কিন্তু মানুষ কি কোনোদিন কোনো কথা ভুলতে পারে? ব্যস্ততার মধ্যে ঢুকলে তা তলিয়ে যায়।”

একটি মেয়ে সাময়িকভাবে একটু অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গিয়েছিল, এক ভদ্রলোক বিয়ে করে স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলেন। জেনেশুনেই তিনি বিয়ে করেছিলেন। এমন নজির খুব কম ছিল না। সংস্থার উদ্যোগে যে বিয়েগুলো দেয়া হতো, সেখানে ছেলেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এগিয়ে আসতো।

১৯৭৪ সালে সংস্থা থেকে এরকম একটি মেয়ের বিয়ে দেয়া হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে মালেকা খান তাঁর খোঁজ করতে গিয়ে জানেন যে, সে ভালো আছে, তার দুটি বাচ্চা হয়েছে। কিন্তু মেয়েটির কষ্ট হতে পারে ভেবে মালেকা খান তার সাথে আর দেখা করেননি।

আবার বিয়ের পর ভালো থাকেনি এমন মেয়েদের কথাও মালেকা খান জানেন। একটি মেয়ের কথা বললেন তিনি: “বিয়ের পর স্বামী জেনেছে যে, স্ত্রী যুদ্ধের সময় শত্রু ছাউনিতে ছিল। স্বামীটি বলেছে- তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন? স্ত্রী বলেছে, আমি তোমাকে আমার কষ্টের কথা জানাতে চেয়েছি, তুমি বলেছিলে শোনার দরকার নেই, তুমি আমার স্ত্রী এটাই বড় কথা।” মালেকা খান পরে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলেন, মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে।

সে সময় সংস্থা যাদের পুনর্বাসিত করেছিল সেই মেয়েদের অনেকেই এখনো মালেকা খানের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন। এঁরা কি পুরনো দিনের কথা মনে করেন? “কোরিয়ার তিনজন মহিলা যখন জাপানিদের যুদ্ধের বিচার চাইল তখন আমি দু’জন মেয়ের সাথে গল্পচ্ছলে বললাম, হায়রে আমাদের কী দুর্ভাগা দেশ যে বিচার চাইতে পারছি না। ... তোরা যদি বলিস ক্ষমা চাইতে হবে, তাহলে কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সহজ হবে এবং সম্ভবপরও হবে। আমরা বললে হবে না। ওরা তখন আমাকে বলেছে, আপনি আমাদের হয়ে বলেন না কেন, তাহলেই তো হবে। আমি বললাম, আমি না হয় বললাম, কিন্তু দেখব আমার পাশে তোমরা নেই, তখন? তবে পাকিস্তানের যে ক্ষমা চাওয়া উচিত এটা মেয়েরা জোর দিয়ে বলেছে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য চেষ্টা করতে বলেছে।”

আরেকটি মেয়ের ঘটনা বলছিলেন মালেকা খান। এখন তিনি সরকারি চাকরি করেন, বিবাহিতা, দুটি বাচ্চা আছে। মালেকা খানের মেয়ের বিয়েতে তিনি সোনার দুল উপহার দিয়েছেন। “বাসায় একদিন হঠাৎ করে এসেছে। ওকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কী রে কী খবর? তখন সে জবাব দিল ‘আপা কাঁনতে আসলাম।’ হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে তাই এসেছে। আমি সেদিন কথা বলতে পারিনি। আমার মেয়ে উপস্থিত ছিল, সে তাকে আপ্যায়ন করল, আপন মনে কতক্ষণ কাঁদলো।” মেয়েটি একটি মাঝারি পর্যায়ের সরকারি চাকরি করেন। সহকর্মী একজনকে পছন্দ করে বিয়ে করেছেন কিন্তু স্বামীকে কিছু জানাননি: “একথা বললে আর মর্যাদা থাকবে? কয়জন আর ভালো মানুষ!” বলেছেন আগত মেয়েটি। সংস্থা থেকে যাঁদের পুনর্বাসিত করা হয়েছে, তাঁদের কেউই প্রায় উচ্চশিক্ষিত নয়। তবে চাকরিতে গিয়ে অনেকে অনেক উন্নতি করেছে।

জানতে চেয়েছিলাম এই মেয়েরা পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ রাখে কিনা। মালেকা খান বললেন, ওরা নিজেদের মধ্যে একটা যোগাযোগ তো রাখেই, উনি একজনের কাছে থেকে অন্যজনের খবর পান: “আবার একটা ব্যাপার, ওদের আমরা মাঝে মাঝে নিজেদের বাসায় এনে পরিবারের আপনজন হিসেবে রাখার বা পরিচিত করার একটা প্রকল্প নিলাম সংস্থায় কাজ করার সময়। আমাদের মুরব্বি যাঁরা, তাঁরা ঠিক করলেন যে আমরা বাসায় এনে এনে রাখব, তাহলে ওরা অনুভব করবে যে ওরা আমাদেরই পরিবারের একজন সদস্য। কারণ পরে সমাজে মিশে গেলেও যেন তাদের এক জায়গায় আসার একটা ঠিকানা থাকে। যেমন ঐ মেয়েটি বিয়ের পরে স্বামীকে নিয়ে এসে বললো এটা আমার খালাম্মা।” মালেকা খান বলছিলেন, তিনিও যথাযথ আদর-যত্ন করলেন এবং মেয়েটির স্বামীকে বুঝতে দিলেন যে, মেয়েটি একেবারে নিঃসহায় নয়।

মালেকা খান বলছিলেন যে, ’৭২ থেকে ’৭৬ পর্যন্ত যেসব অফিসে এদের চাকরি দেয়া হয়েছিল সেসব অফিসের বড় কর্তাদের সব বলে বুঝিয়ে, এদের দেখাশোনা করার দায়িত্বও দেয়া হয়েছিল। এবং সহানুভূতিশীলতা ছিল, এটা মনে আছে। জানতে চেয়েছিলাম কাজের জায়গায় কি এদের অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা হয়েছে: “না, করেনি। আরেকটা জিনিস কি, নিজেদের সহকর্মীদের মধ্যে একটা দুঃখী ভাব- ওরা তো সবাই বলেছে ‘৭১-এ সব হারিয়ে গেছে, কেউ নেই। খালাম্মারা পেলেছেন এবং তাঁরাই চাকরি দিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা তো আমাদের বংশের কেউ না, তাঁদের আর কত জ্বালাব?’ এরকম এসে আবার গল্প করত। আমি বলতাম, কেন আমরা কি নেই, মিথ্যা বলিস কেন? আবার সহকর্মীদের নিয়েও আসত। তা ওদের সাথে আবার খাতির হতো।”

যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রসঙ্গ উঠলে তো অন্তত, একজনকে সামনে এগিয়ে আসতে হবে, তাঁরা কি তা আসবে? “আমার মনে হয় এঁরা তখনই আসবে, যখন ভাববে সমাজে আর ক’দিনই-বা বাঁচব, কী-বা করার আছে। এমন অবস্থায় আসার আগ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় কেউ বলবে না যে বিচার চাই। কারণ সে পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। যদি তেমন পরিবেশ সৃষ্টি হয় যেখানে তাদের শ্রদ্ধার সাথে দেখা হবে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে কুণ্ঠা হবে না- যেদিন এরকম পরিবেশ তৈরি হবে অবশ্যই তারা এগিয়ে আসবে। একথা বলছি, কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি ওরা দারুণ অভিমান নিয়ে আছে। ওরা সমাজের প্রতি একটা পুঞ্জীভূত অভিমান নিয়ে জীবন-যাপন করছে। আপনারা তাদের জন্য কী করবেন না করবেন, তার জন্য তাঁরা বসে নেই। যদি কোনো বিষয়ে ওদের মধ্যে উপলব্ধি আসে তাহলে বলতে পারে। তা না হলে আমাদেরই তো বলা দরকার যে, আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই।”

এদের ছেলেমেয়েরা যদি এখন জানতে পারে তবে কি তারা অপদস্থ বোধ করবে? “মনে হয় করবে, একজন তার বাচ্চাকে খুব কষ্ট করে স্কুলে পড়াচ্ছে। নিয়ে এসেছিল, আমি বাচ্চাকে বললাম, মাকে খুব শ্রদ্ধা করবে। যে বাচ্চা মাকে শ্রদ্ধা করে না সে ফার্স্ট হয় না। যাওয়ার সময় ওর মা আমাকে বলেছে, ‘আমি তো অসহায়, ও (বাচ্চা) অসহায় না। ওর বাবা-মা সবাই আছে।’ আমার কাছে খুব ভালো লাগল। আমি যদিও ওকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলেছি, তো উল্টো ও আমাকে অনেক কথাই অল্প কথায় বুঝিয়ে দিয়ে গেল।”

১৯৭৬ সালে মালেকা খান যখন সংস্থার চাকরি ছেড়ে দেন তখন তিনি এদের কেসহিস্ট্রিসহ ফরমগুলো যত্ন করে অফিসে রেখে এসেছিলেন। যেগুলো এখন আর নেই।

১৯৭৬-এ সংস্থার কার্যপরিচালনার নতুন কমিটি হলো। বেগম সুফিয়া কামালের অজান্তে কমিটি জবরদখল হয়ে গেল। পরে তিনিও জড়িত থাকলেন না। সোনারগাঁয়ে Crafts village করার পরিকল্পনাও ভেস্তে গেল। তবে সুখের কথা অতি সহজেই সোনারগাঁয়ের সেই জায়গায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে লোকশিল্প ফাউন্ডেশন, জাদুঘর, কারুপল্লী হয়েছে। মালেকা খান ব্যক্তিগতভাবে পরবর্তীকালে শিল্পাচার্যকে সহায়তা দিয়েছেন। সংস্থা ত্যাগ করার পরে নিজে কুটির শিল্পের উৎপাদন ও উন্নয়নের কাজে জড়িয়ে পড়লেন এবং সেখানেও অন্যত্র যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলেন।

১৯৮৬ সালে ২০ নং ইস্কাটনের বাড়ি থেকে সংস্থাকে উচ্ছেদ করা হলো। মালেকা খান শুনেছিলেন বাড়িটা নূরুল আমীনের আত্মীয়-স্বজনদের ফিরিয়ে দিয়েছিল সরকার। তিনি আরো শুনেছেন যে, তখনই ঐ মেয়েদের ইতিহাস লেখা সব নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়। সংস্থার পরবর্তী সময়ের সভানেত্রী শামসুন্নাহার বেগম মালেকা খানকে বলেছিলেন মেয়েদের তথ্য পুড়িয়ে না ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এসব তথ্য যদি কোনোভাবে জানাজানি হয়ে যায় তবে মেয়েদের ক্ষতি হতে পারে।” মালেকা খান আক্ষেপ করে বলেন, এ তথ্যগুলো গোপনে যত্ন করে রক্ষণাবেক্ষণ করার গুরুত্বটা তখন কেউই বুঝতে পারেননি। এ যে আরেক নিদারুণ কষ্ট।

সংস্থার অফিস এখনো আছে ৮৮নং ইস্কাটনে। কমলকলি নামে সংস্থার একটি বিপণি কেন্দ্র এখনো চালু আছে। এক সময় এখান থেকে সচিবালয়ের অনেক কর্মীকেই দুপুরের খাবার সরবরাহ করা হতো।

সংস্থার হোস্টেলে একজন বৃদ্ধা আছেন: “তাঁকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে অসন্তুষ্ট হন। প্রায়ই তিনি অভিযোগ করেন, ‘আপা জানেন মাঝে মাঝে কেউ এসে জিজ্ঞেস করে আপনার কী হয়েছিল। আমার খুব রাগ লাগে। নাতিপুতির মতো বয়স, এমন সবাই জিজ্ঞেস করে কী হয়েছিল, এখানে কতদিন আছেন। আমার এসব ভালো লাগে না।”

জানতে চেয়েছিলাম নির্যাতিত মেয়েরা কি এত বছরেও সত্যিকার পুনর্বাসিত হয়েছে? “কঠিন প্রশ্ন। ’৭১-এ যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের মায়েরাই তো এখনো সমাজ থেকে যে সম্মানটা তাঁদের পাওনা, সেটাই তাঁরা অনেক জায়গা থেকে পাননি। অনেকে জানেও না। এ অবস্থা যেখানে আছে সেখানে আমি যাদের সঙ্গে সরাসরি উঠেছি, বসেছি, সমাজে কতটা কীভাবে তাদের মূল্যায়ন হয়েছে, কতটা প্রতিষ্ঠিত তারা হয়েছে, সেটা বলা খুব কঠিন। তবে এটুকু হয়তো বলতে পারি যে, তারা হয়তো এটা ভেবেছে যে অনেকক্ষেত্রে মেয়েরা আত্মহনন করেছে, সেটুকু তো করতে হয়নি। সেভাবে যদি দেখা যায়, তাহলে এখনো তো ওরা বেঁচে আছে, তাদের সম্মান দেয়ার সময় তো আছে।”

কিন্তু এই মেয়েরা এখনো কাঁদতে আসে, ভুলতে পারেনি, ভোলা যায় না। এ অবস্থায় পাকিস্তান যদি সাধারণ ক্ষমা চায় বা অন্যায় স্বীকার করে তবে কি এই মেয়েরা খুশি হবে নাকি এই ব্যাপারে তারা নিস্পৃহ? “এদের মধ্যে যারা একটু সচেতন তারা তো প্রায়ই বলে, কই আপনারা পারলেন না তো পাকিস্তানকে মাপ চাওয়াতে? আমার নিজের ঘরেই তো আমার ছোট ভাই শহীদ হয়েছে। আমার মা বলেছিলেন তুই প্রধানমন্ত্রীকে বল, কোন্‌ শহীদের মাকে জিজ্ঞেস করে তারা পাকিস্তানিদের ক্ষমা করে দিলো? আমি মায়ের আদেশ পালন করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার মায়ের এই আকুতিটা পৌঁছে দিয়েছিলাম। আর ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েরা তো আসলে একটা ঘোরের মধ্যে আছে। মানে যুদ্ধ করে সমাজে টিকে আছে, বাচ্চাদের বড় করছে, জীবিকা অর্জন করছে। আর কিছু নতুন করে ভাববার বা পেছন দিকে তাকিয়ে ভাববার অবকাশ তাদের নেই। আমার মনে হয় এই কাজটা তাদের না, এই কাজটা আমাদের।”

কিন্তু এই কাজটা যদি আমরা করতে পারি, তবে কি ওদের মানসিক শান্তি হবে বা সামাজিক মঙ্গল হবে? “সামাজিক অবস্থার কতটুকু ভালো হবে আমি জানি না। কারণ আমরা সমাজে নিজেদের কতটা ভালো মানুষ পরিচয় দিচ্ছি, সেটার খবর আমি নিজেই ঠিক বলতে পারছি না। তবে মানসিক অবস্থার পরিবর্তনটা অবশ্য হবে। আমাকে তো প্রায়ই বলে ‘কই কিছুই তো করলেন না এখনো’। আমি ব্যক্তিগতভাবে বলি, ’৭১-এ যারা বর্বরোচিতভাবে বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, লুটতরাজ করেছে, নির্যাতন করেছে, সম্পদ নষ্ট করেছে, তাদের আজ হোক কাল হোক বিচার অবশ্যই হবে। তা আমরা অনেক কিছুতেই সচেতন না। আমার মনে হয়, দু’বেলা খাওয়া-পরার নিশ্চয়তার পর আমরা ঐসব ব্যাপারে চিন্তা করতে পারব। এখন তো আমরা টিকে থাকার এবং খাওয়ার চিন্তায় যুদ্ধ করছি। ’৭১ সালে আমাদের বিরাট একটা অংশ যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের বেলায় আমি আলাদা করে কিছু বলতে পারছি না। আমি মনে করি যে, তাদের একটা মানসিক শান্তি আসবে যদি তারা শোনে যে পাকিস্তানের বর্বরোচিত কাজের জন্য বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। তাহলে ওরা শান্তি পাবে আমার মাও শান্তি পাবে।”



আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধের বিচার

মাবরুক মোহাম্মদ

 

গাজায় যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক গোল্ডস্টোন রিপোর্ট জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে গ্রহণ
১৬ অক্টোবর ২০০৯ জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে গাজা উপত্যকায় হামাস-ইসরায়েলি যুদ্ধের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আইনজীবী বিচারপতি গোল্ডস্টোন ও অন্য তিনজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘গোল্ডস্টোন রিপোর্ট’ খ্যাত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, গত ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে সংঘটিত যুদ্ধে হামাস ও ইসরায়েল দুই পক্ষই যুদ্ধবিষয়ক আন্তর্জাতিক নীতিমালা ভঙ্গ করেছে এবং উভয়ই ঐ যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ করেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে রিপোর্টটি প্রস্তাব আকারে উত্থাপন করা হয় এবং অধিকাংশ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়। ৪৭ সদস্য রাষ্ট্রের ২৫টি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের ছয়টি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

৫৭৫ পৃষ্ঠার রিপোর্টটিতে বলা হয়, যুদ্ধে ইসরায়েল অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে এবং সুচিন্তিত ও সুনির্দিষ্টভাবে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক হত্যা করে। আর হামাস ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর যথেচ্ছ রকেট হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র রিপোর্টটিকে ইসরায়েলের প্রতি বৈষম্যমূলক বলে আখ্যায়িত করেছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত ডগলাস গ্রিফিথ বলেন, গোল্ডস্টোন রিপোর্টটি মানবাধিকার কাউন্সিল প্রস্তাব হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না এবং এতে উল্লিখিত উপাদানগুলো কাউন্সিলের প্রস্তাব হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় বরং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের ওপর অত্যধিক আলোকপাত করেছে এবং হামাসের কর্মকাণ্ডকে লঘুভাবে উপস্থাপন করেছে। জাতিসংঘের ইসরায়েলি দূত লেমনো ইয়ার বলেন, প্রস্তাবটি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে। এটি ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক দাবিকে উপেক্ষা করেছে এবং এর আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপকে ভুলভাবে চিহ্নিত করেছে। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবটির পরবর্তী অগ্রসরতা ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। উল্লেখ্য, প্রস্তাবটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন রোম স্ট্যাটিউটের ৭ নং অনুচ্ছেদে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলতে অন্যান্যের মধ্যে বলা হয়েছে, ‘কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক বা নিয়মতান্ত্রিক আক্রমণের মাধ্যমে হত্যা বা গণহত্যা চালানো মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে গণ্য হবে।’

একই আইনের ৮ নং অনুচ্ছেদে যুদ্ধাপরাধ বলতে অন্যান্যের মধ্যে বলা হয়েছে, ‘বেসামরিক ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে না এমন জনগোষ্ঠী ও বেসামরিক স্থাপনার ওপর ইচ্ছাকৃত আক্রমণের মাধ্যমে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের গুরুতর লঙ্ঘন করা।’

চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন, যা যুদ্ধকালীন সময়ে বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তার জন্য প্রণীত, এর ৪ নং অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত জনগণ বলতে ঐ জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে, যারা যুদ্ধে যে কোনো এক পক্ষের এলাকায় অবস্থান করছে এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে না।

উল্লিখিত আন্তর্জাতিক আইনের নিরিখে বিশ্লেষণ করে গোল্ডস্টোন রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুদ্ধকালীন সময়ে ইসরায়েল ও হামাস দুই পক্ষই বেসামরিক জনগণ এবং স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ঐ এলাকার বেসামরিক জনগোষ্ঠী যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী না হওয়ায় ব্যাপক ভিত্তিতে তাদের ওপর হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।

২০০৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর এই যুদ্ধ শুরুর আগে ইসরায়েল শান্তি চুক্তি ভঙ্গ করে প্রায় ১৮ মাস গাজা অবরুদ্ধ করে রাখে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও দরিদ্রতম এলাকার মধ্যে গাজা অন্যতম। গাজার ১৫ লাখ অধিবাসীর অর্ধেকেরও বেশি শিশু। ফলে যুদ্ধ শুরুর আগেই অবরোধের কারণে গাজায় ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। দিনের পর দিন খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসার অভাবে গাজায় নিরীহ বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর ২৭ ডিসেম্বর ২০০৮ শুরু হওয়া যুদ্ধে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারায়, যার অধিকাংশই বেসামরিক জনগণ। এতে তিনজন ইসরায়েলি বেসামরিক ব্যক্তি ও ১০ জন সৈন্য প্রাণ হারায়।

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদে পাঠানোর কথা জানিয়েছেন। প্রস্তাবটি সেখানে পাস ও সমর্থিত হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে এই যুদ্ধাপরাধের বিচারের পথ অনেক সহজ ও সুগম হবে। প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব ইঙ্গিত দিয়েছেন।

রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত হলেন ডিসেরি মুনইয়ানিসা
ডিসেরি মুনইয়ানিসা ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে এবছর ১৫ সেপ্টেম্বর কানাডার আদালত কর্র্তৃক দণ্ডিত হয়েছেন। তিনি রুয়ান্ডার বুটেরি রাজ্যে একটি রুটির দোকান পরিচালনা করতেন এবং ঐ রাজ্যে গণহত্যায় প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। রুয়ান্ডার এই নাগরিক পরবর্তীকালে কানাডায় আশ্রয় নেন এবং কানাডার আদালত তাকে এই দণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। উল্লেখ্য, ২০০০ সালে কানাডায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ আইন পাস হয়। এই আইনের আওতায় অন্য দেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কানাডায় অবস্থান করলে কানাডাতেই তার বিচার করা যায়। ডিসেরি মুনইয়ানিসা প্রথম ব্যক্তি যাকে এই আইনের আওতায় দণ্ডিত করা হলো।

এই দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে কানাডায় কোনো পূর্ব নজির ছিল না। অপরাধের মাত্রা ও গুরুত্ব বিচারে ডিসেরিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। মামলাটিতে বিচারকের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা (ডিসক্রিশনারি পাওয়ার) প্রয়োগের সুযোগ কম ছিল। আইনটিতে প্যারোলের একটি বিধান আছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, বর্তমান মামলায় ২৫ বছর সাজা ভোগের আগে প্যারোল দেয়ার সুযোগ নেই। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সর্বোচ্চ এই দণ্ডই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে বলে তিনি মত দেন। অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী বলেন, ডিসেরিকে আরও আগেই প্যারোল দেয়া যায়। তার দাবি, ডিসেরিকে কেবল যুদ্ধাপরাধে অংশগ্রহণের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে কিন্তু পরিকল্পনার জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি। এই যুক্তিতে তাকে ২৫ বছর সাজা ভোগের আগেই প্যারোলে মুক্তি দেয়া যেতে পারে।

১৯৯৪ সালের এই গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক দণ্ডিত রুয়ান্ডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তার স্বীকারোক্তিতে বলেন, গণহত্যার পরিকল্পনাটি মন্ত্রিপরিষদে আলোচনা করা হয়। ঐ সভায় রুয়ান্ডার তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য সে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় তুতসিকে দায়ী করা হয়। তুতসি সমপ্রদায়কে সমূলে বিনাশ করাকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বন্ধের একমাত্র উপায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গণহত্যা পরিচালনার জন্য সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্নেল থিওনেস্টি বাগোসোরাকে প্রধান করা হয়। এর সাথে যুক্ত করা হয় অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের। তৃণমূল পর্যায়ে গণহত্যা পরিচালনা ও সহযোগিতার জন্য বাগোসোরার নেতৃত্বে স্থানীয় মেয়র ও পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব দেয়া হয়। ৬ এপ্রিল ১৯৯৪ শুরু হয় এই গণহত্যা। নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিচারে হত্যা করা হয় সবাইকে। অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ও পরিকল্পিতভাবে চালানো হয় এই গণহত্যা। তুতসি সমপ্রদায়ের লোকজনকে যেখানেই পাওয়া যায় সেখানেই মারা হয়। দীর্ঘ ১০০ দিনব্যাপী এই হত্যাযজ্ঞ চলে। তৎকালীন রুয়ান্ডা সরকারের হিসাবে এই ১০০ দিনে প্রায় ১১ লাখ ৭৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। গণহত্যাকালীন সময়ে ব্যাপক ধর্ষণও চালানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল তুতসি সমপ্রদায়ের জৈবিক পরিচয় এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে ধ্বংস করা। তুতসি জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত রুয়ান্ডা প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ) এই হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করে আরপিএফ। এতে প্রেসিডেন্ট নিহত হন। অবশেষে যুদ্ধে আরপিএফ বিজয়ী হয়।

২০০১ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা গঠিত হয়। ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ২০ জনকে দণ্ডিত করেছে। পলাতক দণ্ডিতদের আত্মসমর্পণের বিনিময়ে শাস্তি কমানোর সুযোগ দেয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর ২০০৮ গণহত্যার মূল পরিচালক থিওনেস্টি বাগোসোরাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। জাতিসংঘ কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক এরিখ সোঁসি তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

গণহত্যার সাথে জড়িত সর্বশেষ দণ্ডিত ডিসেরি মুনইয়ানিসা বুটেরি রাজ্যে দোকান পরিচালনা করতেন। তিনি ঐ রাজ্যে তুতসি হত্যাকাণ্ডে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ২১০ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক আন্দ্রে ডেনিস বলেন, ডিসেরি বুটেরি রাজ্যে তুতসি সমপ্রদায়কে সমূলে বিনাশ করতে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। দুই বছরব্যাপী চলা এই বিচারে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।