Bulletin_2011
Bulletin_September_2012
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   ফলোআপ
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন-আদালত
   পাঠক পাতা
   সেমিনার
   পরিসংখ্যান চিত্র
 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

আইন-আদালত


অর্পিত সম্পত্তি
আরেকবার ফিরে দেখা

-ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল

 

 

বংলাদেশের সবাই মোটামুটি এক বাক্যে বলবেন যে, ‘বাংলাদেশ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; সব ধর্মের লোক যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে এ দেশে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সমঅধিকার- ’৭২ সাল থেকেই সংবিধানে স্বীকৃত।’ কিন্তু বাস্তবে এই কথাটা কতখানি সত্যি? শুধু অর্পিত সম্পত্তি আইনের নিষ্পেষণেই গত ৪৫ বছরে এই দেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সমপ্রদায়ভুক্ত লাখ লাখ পরিবার অবর্ণনীয় দুঃখকষ্ট, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অগণিত পরিবার বসতভিটা হারিয়ে, সহায়-সম্বলহীন নিঃস্ব হয়েছেন। এই আইনটির পেছনে আছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। সংক্ষেপে বলতে গেলে- এই আইনটি ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক টানাপড়েনের ফসল। ‘দ্য ডিফেন্স অব পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স ১৯৬৫’-এর মাধ্যমে আইনটি করা হয়, যা শত্রু সম্পত্তি আইন নামে পরিচিত। ওই অধ্যাদেশের ১৬৯ উপবিধি অনুযায়ী তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের যেসব নাগরিক ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের আগে থেকে ভারতে ছিল এবং সেই তারিখ থেকে ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারতে চলে গিয়েছিল, তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই সঙ্গে তাদের বাড়িঘর ও জমিজমা শত্রু সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হবে, যার মালিকানা সরকার অস্থায়ীভাবে নিয়ে নিতে পারে।

আশ্চর্যজনকভাবে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ১৯৭৬ সালের দি এনিমি প্রপার্টি (কন্টিন্যুয়ান্স অফ ইমারজেন্সি প্রভিসন) (রিপিল) (এমেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স এবং দি ভেস্টেড অ্যান্ড নন-রেসিডেন্ট প্রপার্টি (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৪, এ আইন দুটির মাধ্যমে ‘শত্রু’ সম্পত্তির ধারণা টিকে গিয়েছিল এবং নতুন করে কোনো সম্পত্তির অধিগ্রহণ বন্ধ হলেও সরকার সম্পত্তিগুলো সত্যিকারের মালিকদের কাছে বা তাদের শরিকদের মাঝে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য ছিল না। বলা যায়, এই দুটি আইনের কারণে আজো এই একবিংশ শতাব্দীতে লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক শত্রু বা এনিমি হিসেবে পরিচিত হচ্ছে এবং তাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় আইনটি অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে পরিচিত। আরো আশ্চর্যের বিষয়- যারা হিন্দু নাগরিক হিসেবে ভারতে অবস্থান করছেন, শুধু তাদের ক্ষেত্রেই এই বৈষম্য করা হচ্ছে (খুশি কবীর, ভূমিবার্তা, জুলাই ২০১২)। বাংলাদেশের বাইরে, এমনকি ভারতে কিংবা পাকিস্তানে অবস্থানরত যে কোনো বাংলাদেশি মুসলিম নাগরিকের সম্পত্তি কিন্তু শত্রু বা অর্পিত সম্পত্তি নয় এবং তাদের জমি হারাবার ভয়ও নেই (বারকাত, জামান, রাহমান এবং পোদ্দার, ১৯৯৭)। সন্দেহাতীতভাবে উল্লিখিত ‘বৈষম্য সৃষ্টিকারী’ আইন দুটি শুধু সংবিধানবিরোধীই নয়, বাংলাদেশ কর্তৃক স্বাক্ষরিত যে কোনো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থীও বটে। আইন দুটি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সাংবিধানিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। যেমন: সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। একইভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, সংবিধানের দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশের অনুচ্ছেদ ১১ (গণতন্ত্র ও মানবাধিকার), তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকার অংশের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টি সমতা) এবং অনুচ্ছেদ ২৮(১) (ধর্ম প্রভৃতির কারণে বৈষম্য)। দু’ভাবে এই অনুচ্ছেদগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে। প্রথমত, শুধু ধর্মের কারণে বাংলাদেশের কিছু নাগরিককে তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং দ্বিতীয়ত, আইন দুটি বাংলাদেশে শান্তি ও সমপ্রীতির মধ্য দিয়ে ধর্ম পালনে বাধার সৃষ্টি করছে। এই ধরনের অসাংবিধানিক আইনের কারণে হিন্দু সমপ্রদায়ের নাগরিকরা ভোগ করতে পারছেন না তাদের ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৩ (গ)) এবং সেই সাথে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের উত্তরাধিকার আইনের প্রয়োগ ও বিক্রয়সহ অন্যান্যভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করার অধিকারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আইন দুটি সংবিধানের ১৪৩ ও ১৪৪ অনুচ্ছেদের সাথেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের সরকার অর্পিত হিসেবে শুধু সেই সম্পত্তিকেই ঘোষণা করতে পারবে যার কোনো মালিক নেই। অথচ বেশিরভাগ অর্পিত বা শত্রু সম্পত্তির ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, তাদের মালিক বা উত্তরাধিকারীরা বা যৌথ সম্পত্তির অংশীদার হিসেবে দাবিদার বাংলাদেশের ভেতরেই অর্পিত সম্পত্তির পাশের জমিতেই অবস্থান করছেন। এই অসাংবিধানিক আইন দুটির কারণে প্রায় ৩৫ লাখ ৯০ হাজার হিন্দু নাগরিক তাদের সম্পত্তি হারিয়েছেন, হয়েছেন বাস্তুহারা, দেশছাড়া, পরিচয়বিহীন। অন্যভাবে বলতে গেলে, প্রতি ৩৪টি হিন্দু পরিবারের মধ্যে ১০টি হিন্দু পরিবার অর্পিত সম্পত্তি আইনের কারণে তাদের সহায়-সম্বল হারিয়েছেন। (বারকাত, জামান, রাহমান এবং পোদ্দার, ১৯৯৭)। এ হয়রানি ও দুর্ভোগের অবসান এবং পূর্বপুরুষের সম্পত্তিতে তাদের বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, অসামপ্রদায়িক ও গণতন্ত্রপ্রিয় কিছুসংখ্যক মানুষ বিগত চার দশক ধরে নানাভাবে সংগ্রাম চালিয়ে এসেছেন। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে অর্পিত সম্পত্তি বিষয়ক দুর্ভোগ-হয়রানির প্রতিবেদন প্রচার এবং ক্রমবর্ধমান নাগরিক আন্দোলন ও জনমতের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বতন আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে ২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ সংসদে পাস করা হয়। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টও নাগরিক আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে রায় দেন যে, ২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর পর থেকে নতুন করে কোনো শত্রু সম্পত্তি মামলা করা যাবে না। কারণ ১৯৬৯ সালের ১নং অর্ডিন্যান্স বাতিল হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে শত্রু সম্পত্তি ধারণাটির মৃত্যু হয়েছে। এর মাধ্যমে আদালত একটি তারিখ নির্দিষ্ট করে দিলেন, যার পর কোনো সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি ঘোষিত হলেও তাকে আর শত্রু সম্পত্তি বলা যাবে না এবং সরকারের পক্ষে সম্পত্তিগুলো ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো সমস্যা থাকল না (আরতি রাণী পাল বনাম এস কে পাল, ৫৬ ডি এল আর (এ ডি) ২০০৪)। কিন্তু তৎকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে তাড়াহুড়োর কারণেই সম্ভবত আইনটিতে কিছুটা অসঙ্গতি বা দুর্বলতা থেকে গিয়েছে, যার কারণে আইনটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিজয়ী চার দলীয় জোট সরকার একটি সংশোধনী এনে আইনটি সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেয়। আবারো চাপা পড়ে যায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু নাগরিকদের অধিকার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা। ২০০১ সালের প্রত্যর্পণ আইনে যেসব দুর্বলতা ধরা পড়েছিল, সেগুলো নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা প্রয়োজন। আইনটির অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিল ‘মালিক’ শব্দটির সংজ্ঞা নিয়ে। ওই আদেশের ২নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা তার পিতা বা পিতামহ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করে থাকলে এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তারিখে ও তারপরেও অব্যাহতভাবে এই ভূখণ্ডে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করে থাকলে অথবা কোনো ব্যক্তি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তারিখে ও তারপরে অব্যাহতভাবে এই ভূখণ্ডে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করে থাকলে, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। এই বিধানগুলো পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, শত্রু সম্পত্তি আইন বা অর্পিত সম্পত্তি আইন ব্যবহার করে যাদের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, তারা বা তাদের উত্তরাধিকারী বা স্বার্থাধিকারীরা পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেও এ আইন অনুযায়ী সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার অধিকারী হবেন না। কার্যত এর মানে দাঁড়ায়, শত্রু সম্পত্তি আইনের বিধান অনুসারে যাদের সম্পত্তি সরকারের হাতে অর্পিত হয়েছিল, তারা কোনোমতেই প্রত্যর্পণের দাবিদার হতে পারছেন না। এমনকি কোন সম্পত্তি তারা ফিরে পাবেন, সেটাও নির্দিষ্ট করা ছিল না। আইনের ২(ঞ) ধারায় বলা হয়েছে, কেবল সেসব সম্পত্তি তারা ফিরে পাওয়ার জন্য দাবি করতে পারবেন, যেগুলো নতুন আইন প্রবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে সরকারের দখলে বা নিয়ন্ত্রণে ছিল। অর্থাৎ যেসব সম্পত্তি সরকারি তালিকাতে রয়েছে, কিন্তু সরকারের দখলে বা নিয়ন্ত্রণে নেই, ইতিমধ্যেই বেদখল হয়ে গেছে, সেসব সম্পত্তি এ আইনের অধীনে প্রত্যর্পণযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে না। সরকারের কাছে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মোট জমির পরিমাণ সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে যে, অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ড হওয়া মোট সম্পত্তির খুব নগণ্য একটি অংশ সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু এ সম্পত্তির সবটুকুও প্রত্যর্পণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হবে না। কারণ, প্রত্যর্পণ আইনের ৬(চ) ধারায় বলা হয়েছে, জনস্বার্থে অধিগ্রহণ করা হয়েছে, এমন কোনো অর্পিত সম্পত্তিও প্রত্যর্পণযোগ্য সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। অথচ জনস্বার্থ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, আইনে তা বলা হয়নি। এ অবস্থায় আশঙ্কা করা অনুচিত ছিল না যে, জনস্বার্থের নামে অনেক প্রত্যর্পণযোগ্য সম্পত্তিও হয়তো বিশেষ বিশেষ কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়বে এবং ভবিষ্যতে কখনো কেউ এসব বেদখল হওয়া জমি বা জনস্বার্থে গৃহীত জমি ফিরে পাওয়ার দাবি করতে পারবে না। সুতরাং আইনের এ ফাঁকফোকরগুলো দিয়ে সিংহভাগ অর্পিত সম্পত্তি যে বৈধ দাবিদারদের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে, সে আশঙ্কা থেকেই যায়। হিন্দু যৌথ পরিবারের এক সহ-অংশীদারের সম্পত্তির ওপর অন্য সহ-অংশীদারের দাবি প্রথাগত আইনে স্বীকৃত হলেও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনে মালিকের সংজ্ঞা থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদারদের বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের এতোদিনের দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আইনের মাধ্যমে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালের বর্তমান আইনে এই ত্রুটিগুলোর দিকে নজর রাখা হয়েছিল বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে।

২০০১ সালের আইনটিতে পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটিও পরিলক্ষিত হয়। যেমন: আইন বলবৎ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে সরকার প্রত্যর্পণযোগ্য সম্পত্তির জেলাওয়ারি তালিকা তৈরি করবে, সরকারি গেজেট প্রকাশ করবে এবং ধারা ১০ অনুযায়ী তালিকা প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার জন্য বৈধ দাবিদারদের আবেদন করতে হবে; নতুবা ২৬(১) (খ) ধারা অনুযায়ী, এর পরে আর ওই সম্পত্তিতে কোনো স্বত্ব, স্বার্থ বা অধিকার দাবি করা যাবে না। কিন্তু ওই চূড়ান্ত তালিকায় কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম থাকলে এবং তার মাধ্যমে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সংশোধনের কোনো বিধান আইনে রাখা হয়নি, যার ফলে আইন প্রয়োগকালে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হতে পারে। (হোসেইন, ২০০১) ২০১১ সালের আইনে এই ত্রুটি রয়ে গিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে সংশোধনীর মাধ্যমে ৩০০ দিনে বর্ধিত করা হয়। ইতিমধ্যে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে (বিডিনিউজ২৪.কম, ২৮ নভেম্বর ২০১১)।

এবারে ২০১১ সালের সংশোধিত আইনটি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। আইনটির অধীনে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় দুটি তফসিল প্রকাশিত হয়েছে। ‘ক’ তফসিলে সরকারের দখলে থাকা সম্পত্তির তালিকা প্রকাশিত হয়েছে এবং ‘খ’ তফসিলে সরকারি তালিকাতে থাকা যেসব সম্পত্তি সরকারের দখলে নেই, ব্যক্তির দখলে আছে, তার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। ‘ক’ তালিকার সম্পত্তি ফেরত পেতে হলে জেলা জজের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা যাবে এবং ‘খ’ তালিকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বা ট্রাইব্যুনালের কাছে গেজেট বিজ্ঞপ্তির ৩০০ দিনের মধ্যে উক্ত সম্পত্তির অবমুক্তির জন্য আবেদন করতে হবে। এবার মালিক এবং সম্পত্তির তালিকা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। সহ-অংশীদারদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এমনকি ‘জনস্বার্থে’ বলতে কোন সম্পত্তি বোঝানো হয়েছে তাও পরিষ্কার করা হয়েছে। ‘জনহিতকর’ সম্পত্তির ক্ষেত্রে, সম্পত্তিটি দেবোত্তর সম্পত্তি, শ্মশান বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান হলে এবং এর কোনো মোহন্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার যে কোনো নাগরিককে গেজেট প্রকাশের ৩০০ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে দরখাস্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সেই ধরনের কোনো নাগরিক উৎসাহিত না হলে জেলা প্রশাসক একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করে তাদের বরাবরে উক্ত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ করবেন।

আশার কথা যে, অতীতের ভুলত্রুটিগুলো শুধরে নতুন আঙ্গিকে আইনটিকে সাজানো হয়েছে। তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত বিতর্কের ব্যাপারে সরকার এবং আইন বিভাগকেও মনে হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে আন্তরিক। একই সঙ্গে দেশের সুশীল সমাজও বিষয়টির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ভুক্তভোগীদের জন্য এখনই সময় মালিকানার দাবি সঠিক ফোরামে তুলে ধরার। মনে রাখতে হবে, এ আইনের সুফল যাতে বঞ্চিতদের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার।

তথ্য সূত্র
১। পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ দ্য ভেস্টেড প্রপার্টি অ্যাক্ট ইন রুরাল বাংলাদেশ; আবুল বারকাত, সাফিক উজ জামান, আজিজুর রাহমান, অভিজিত পোদ্দার, ১৯৯৭, এএলআরডি, ঢাকা।
২। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, তানিম হোসেইন শাওন, বুলেটিন, জুন ২০০১, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ঢাকা।
৩। ভূমিবার্তা, জুলাই ২০১২, এএলআরডি, ঢাকা।
৪। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের সুফল পাবেন কীভাবে? ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ, আইন এবং মানবাধিকারকর্মীদের জ্ঞাতব্য, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়ন জাতীয় সমন্বয় সেল, সেপ্টেম্বর ২০১২, এএলআরডি, ঢাকা।
৫। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ বিল সংসদে পাস, বিডি নিউজ ২৪ ডট কম, ২৮ নভেম্বর ২০১১।
৬। http://bdlaws.minlaw.gov.bd

 

 

রামুর ঘটনায় হাইকোর্টের
সুয়োমোটু রুল জারি

- মাবরুক মোহাম্মদ

 

রামুর বৌদ্ধপল্লী সাম্প্রদায়িক হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে কক্সবাজারের রামু থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ঘটনাটিতে ইন্ধন এবং ইসলামকে অবমাননার অভিযোগে উত্তম কুমারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২৯৫ ধারায় একটি মামলা দায়ের করে। সেদিনই নিরাপত্তা হেফাজতের নামে উত্তম কুমারের মা মাধু বড়ুয়া এবং পিসী আদি বড়ুয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরবর্তী সময়ে তাদের দায়েরকৃত মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়। উত্তম কুমারের মা এবং পিসী সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কয়েকবার জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু কোনো আদেশ না দিয়ে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনগুলো মামলার রেকর্ড হিসেবে নথিবদ্ধ করে রেখে দেন। এই অবস্থায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর একটি প্রতিনিধি দল মাধু বড়ুয়া এবং আদি বড়ুয়াকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য গত ১৬ অক্টোবর ২০১২ তারিখে রামুতে যায়। পরদিন অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর ২০১২ তারিখে স্থানীয় আইনজীবীদের সাথে আসক-এর আইনজীবীরা মাধু বড়ুয়া ও আদি বড়ুয়ার জামিনের শুনানির জন্য আদালতে উপস্থিত হন। কিন্তু ঐ দিন আদালত মামলার শুনানি থেকে বিরত থাকে।

একই দিন উত্তম কুমারের মা ও পিসীকে গ্রেফতারের বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ আমলে নিয়ে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি রুল জারি করেন। রুলে আদালত মাধু বড়ুয়া এবং আদি বড়ুয়ার আটক ও গ্রেফতার কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না- তার কারণ আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে জানানোর জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেন। এই মামলায় ইন্টারভেনর হওয়ার জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্র আদালতে আবেদন করে।

১৮ অক্টোবর ২০১২ তারিখে ইস্যুকৃত সুয়োমোটু রুলের নিয়মিত শুনানির দিন ধার্য ছিল। এদিন আসক-এর আইনজীবীরা মাধু বড়ুয়া এবং আদি বড়ুয়ার জামিনের আবেদন নাকচ করে তাদের জেলহাজতে প্রেরণের বিষয়টি আদালতে তুলে ধরেন। তারা এই বিষয়ে আদালতের একটি নির্দেশনার জন্যও আবেদন জানায়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মাধু বড়ুয়া ও আদি বড়ুয়ার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা নেই। এই অবস্থায় আদালত তাদের অবিলম্বে জেল থেকে মুক্তির আদেশ দেন। আদেশে আদালত আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া মাধু বড়ুয়া ও আদি বড়ুয়াকে জেলহাজতে প্রেরণ সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক। আদালত মাধু বড়ুয়া ও আদি বড়ুয়াকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস অথবা আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর আশ্রয়কেন্দ্র অথবা তাদের পছন্দমতো স্থানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করার আদেশ প্রদান করেন। আদালতের এই আদেশের পর সেদিন রাতেই মধু ও আদি বড়ুয়াকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তির পর আসকের আইনজীবীরা তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারা মাধু বড়ুয়া ও আদি বড়ুয়ার আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)- এর আশ্রয় হোমে থাকার বিষয়ে আলোচনা করেন। মাধু ও আদি বড়ুয়া তাদের নিজ বাড়িতেই থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এরপর পুলিশ পাহারায় তাদের নিজ বাড়িতে প্রেরণ করা হয় এবং সেখানেই তাদের পুলিশি নিরাপত্তা দেয়া হয়। পরদিন আসক প্রতিনিধি দল মধু ও আদি বড়ুয়ার অবস্থা এবং পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের বাড়িতে যান।

 

হিন্দু আইন ও সংস্কারের এক ধাপ

- নীনা গোস্বামী

 

প্রাচীন হিন্দু আইনে বিধিবদ্ধ আইনের সংখ্যা খুবই কম। প্রথার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা হিন্দু আইনে যা কিছু সংস্কার সেই ঔপনিবেশিক আমলেই হয়। তাই তো সাহসী সব পদক্ষেপ, যেমন- সতীদাহ প্রথা রদ এবং হিন্দু বিধবা আইনের প্রচলন এই সময়ই হয়।

যেসব বিধিবদ্ধ আইনের ওপর ভিত্তি করে হিন্দু আইন বা হিন্দুদের ব্যক্তিগত আইনের একটি কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- The Hindu Married Women’s Right to Separate Residence and Maintenance Act,1946, The Hindu Women’s Rights to Property Act, 1937, The Hindu Gains of Learning Act, 1930, The Hindu Disposition of Property Act. 1916 (Act. No. xv of 1961),The Hindu Inheritance (Removal of Disabilities) Act (Act. No. xii of 1928), The Hindu Law of Inheritance (Amendment) Act, 1929, The Hindu Marriage Disabilities Removal Act, 1946, The Hindu Women’s Rights to Property (Extension to Agricultural Land) Act, 1943 (Assam Act No. xiii of 1943), The Hindu Widow’s Re-marriage Act, 1856 (Act No. xv of 1856), The Hindu Religious Welfare Trust Ordinance, 1983 (Ordinance No. l xviii of 1983 প্রভৃতি।
উপরোক্ত আইনগুলো দেখলেই বোঝা যায় পারিবারিক আইন ‘বিবাহ, ভরণপোষণ, বিবাহ রেজিস্ট্রেশন, বিবাহ বিচ্ছেদ’ বিষয়ক (শুধু The Hindu Married Women’s Right to Separate Residence and Maintenance Act,1946) বাদে কোনো আইনই অদ্যাবধি তৈরি হয়নি। ১৯৪৬ সালের পরে হিন্দু আইনের কোনো সংস্কার দেখা যায় না। এই সত্তর বছরে কোনো সরকারই এই বিশেষ দিকটির প্রয়োজন আছে বলে মনে করেনি। গত আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই হিন্দু নারীদের মধ্যে থেকে বেশ কিছু দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। ১৯৮৫-৮৬ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোডের দাবি উত্থাপিত হয়। সব ধর্মের সকল নারীর মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টিকারী সকল আইন বাতিল করে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়নের এই দাবি উত্থাপন করেন নারী নেতৃবৃন্দ এবং তাদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সকল ধর্মের কট্টরপন্থিরা এর বিরোধিতা করেন। সমস্যা ছিল অন্য জায়গাতেও। মুসলিম পারিবারিক আইনে নারীদের কিছু অধিকার থাকলেও অন্য ধর্মে, বিশেষ করে হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নারীদের অধিকারের জায়গাটি ছিল প্রায় শূন্য। এক কথায় বলতে গেলে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোডের জন্য যে ধরনের ’সাম্য’ অবস্থার এবং সহ-অবস্থান প্রয়োজন, তা ছিল না। ১৯৮৯-৯০ সালে আবারও বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর পাশাপাশি নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয় হিন্দুধর্মের ছোট ছোট সংস্কারের দাবি উত্থাপন করার। এই সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা হয়েছে। কট্টরপন্থিরা বলেছেন, হিন্দু ধর্মের সংস্কার সংসদের আইন দ্বারা কখনো হয়নি। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিলেন উপরোল্লিখিত আইনগুলোর কথা, যা এখনো চলমান। তবু আন্দোলন থেমে থাকেনি। এত সব আন্দোলনের পরেও দেখা যায়, যখন যে সরকারই এসেছে তারা আইনে ‘ইউনিফর্ম’ অর্থাৎ সকল নাগরিকের জন্য একই আইন এই তথ্য আমলে নেয়নি। কারণ ব্যক্তিগত আইনকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সবসময়। পারিবারিক আইনের ব্যবহারে ব্যক্তিগত আইনের প্রয়োগ থাকায় হিন্দু আইন সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের অবস্থানেই রয়ে গেছে। মানুষের প্রয়োজনেই যে আইন এ কথাটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। আজ মনে হয়, আইনের প্রয়োজনেই মানুষ এ কথাটি বুঝি একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।

নারী আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ২০০৯ সালে গঠিত হয় হিন্দু আইন প্রণয়নে নাগরিক জোট। এই জোটের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ হিন্দু বিয়ে আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করে আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। এ আইনের মধ্যে ছিল বিয়ে রেজিস্ট্রেশন, আদালতের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ, বহুবিয়ে রোধ ইত্যাদি। কিন্তু নাগরিক জোটের প্রেরিত খসড়া আইন থেকে সরকার শুধু বিয়ে রেজিস্ট্রেশন আইন পাস করে। তবে অনেক না পাওয়ার মধ্যে বর্তমান সরকারের নেয়া উল্লেখযোগ্য আইনি সংস্কার হলো- হিন্দু বিয়ে নিবন্ধন আইন ২০১২ এবং Registration (Amendment) ২০১২ জাতীয় সংসদে পাস করা। আমি প্রথমেই হিন্দু বিয়ে নিবন্ধন আইন ২০১২-এর সুবিধাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি। প্রথমত, সংবিধিবদ্ধ আইনের অনুপস্থিতির ঝুড়িতে এটি পার্লামেন্ট থেকে পাসকৃত আইন, যার প্রেক্ষিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা চাইলে অন্তত তাদের বিয়ে নিবন্ধন করার পথটি সুগম হলো। দ্বিতীয়ত, এই আইনটি সংখ্যালঘু হিন্দু সমপ্রদায়ের ব্যক্তিগত আইনের সংস্কারে ছোট হলেও একটি আইনের যোগ, যার দ্বারা অন্তত এটি বলা যায় ‘হিন্দু ব্যক্তিগত আইন সংস্কারযোগ্য নয়’- কথাটি ঠিক না। এই আইনটির বেশ কিছু অসুবিধাও আছে। যেমন: এই আইনটি হিন্দু সমপ্রদায়ের সকল নাগরিক মানতে বাধ্য- এমন বাধ্যবাধকতা না থাকায় শুধু এক শ্রেণির মানুষ এই আইনটির সুবিধা ভোগ করবে। সকল শ্রেণির নাগরিক সুবিধা পাবে না। উদাহরণ: যারা বিদেশে যেতে চাইবে তারাই শুধু বিয়ে রেজিস্ট্রি বেশি করবে। অন্যদিকে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। কারণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিয়ে অস্বীকারের যে প্রবণতার জন্য নারীরা দিনের পর দিন প্রতারিত হয় এই আইনের প্রয়োগে বাধ্যবাধকতার কজটি বাদ দেয়ায় আইনটি নারীদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা হিন্দু আইন অনুসরণ করেন। তাদের ব্যক্তিগত আইন বলে কিছু নেই। এই আইনটি শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু হিন্দু আইন অনুসারীরা এই আইনের আওতায় বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন এমন কথাটি যদি যুক্ত করা হতো, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী যারা হিন্দু আইন অনুসারী তারাও এই আইনের সুবিধা ভোগ করতে পারতেন। সবচেয়ে বড় অসুবিধা এই যে, আইনটির কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করে এখনও প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। বিধি প্রণয়নও হয়নি। বিধি প্রণয়ন হওয়ার পরই কেবল সরকার হিন্দু বিয়ে রেজিস্টার নিয়োগ দিতে পারবেন। আর তখনই আইনটি প্রায়োগিক দিক থেকে কার্যকারিতা পাবে। প্রসঙ্গক্রমে শতাধিক বছর আগে রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৯০৮-এর যে সংশোধনী আনা হয়, যা এখানে তুলে ধরা হলো- '(bb) registration fee payable for registration of a declaration of gift of any immovable property made under the Hindu, Christian and Buddhist Personal Law, if such gift is permitted by their Personal Law, shall be one hundred taka irrespective of the value of the property, provided such gift is made between spouses, parents and children, grand parents and grand children, full brothers, full sisters and, full brothers and full sisters'.
এই আইনটিতে সংশোধনী আনার ফলে সুবিধা ভোগ করবেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্মাবলম্বীই। এর উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কোনো মা-বাবা তার জীবিত অবস্থায় বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যদি চান তাদের কন্যাসন্তানকে কিছু সম্পত্তি দিয়ে যেতে (যেহেতু মৃত্যুর পর ছেলে থাকলে কন্যাসন্তানরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়), তাহলে তারা মাত্র ১০০ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে নির্ধারিত সম্পত্তি কন্যার অনুকূলে দান বা গিফট করতে পারবেন। এই আইনটির ক্ষেত্রেও একই অসুবিধা আছে। এখনও এর প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। আমরা আশা করবো উল্লেখিত দুটি আইনেরই কার্যকারিতা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

হিন্দু বিয়ে নিবন্ধন আইন ২০১২ অনেক না পাওয়ার মধ্যেও আলো বয়ে আনে। এটির ব্যাপক প্রচার আবশ্যক। এ ব্যাপারে একটি কথা না বললেই নয়। হিন্দু বিয়ে নিবন্ধন আইনের কারণে ভুক্তভোগী হিন্দু স্বামী-স্ত্রীদের জন্য বিয়ে বিচ্ছেদ আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। The Hindu Married Women’s Right to Separate Residence and Maintenance Act,1946 কারণে ভুক্তভোগী স্বামী-স্ত্রী একে অপরের থেকে আলাদা থাকতে পারেন। কিন্তু তা বিবাহের পরিসমাপ্তি ঘটায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই সারাজীবন আইন না থাকার কারণে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে সরকারের উচিত হবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে হলেও শর্তসাপেক্ষে আদালতের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ আইন প্রণয়নে উদ্যোগী হওয়া।

 

 

তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আদালতের রুল জারি

- অবন্তী নুরুল

 

অভিবাসী শ্রমিক আর কৃষকের সঙ্গে তৃতীয় যে দলটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে, তারা হলেন পোশাক শ্রমিক। জীবন নিংড়ানো ঘামে-শ্রমে তারা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে যোগ করেছেন অসামান্য সাফল্যগাথা। বাংলাদেশ উঠে এসেছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে। অথচ এসব শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল তা প্রকট আকারে ফুটে উঠেছে গত ২৪ নভেম্বর ২০১২ তারিখ সন্ধ্যায় আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে আগুন লাগা ও ১১১ জন শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনার মধ্য দিয়ে। ঐ সময় কারখানাটিতে প্রায় দুই হাজার ছয়শ’ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। শ্রম আইন-২০০৬ অনুযায়ী শ্রমিকদের জরুরি নির্গমন পথ না থাকা, দুর্বল অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, সে সময় কারখানার কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ করে রাখায় আগুনে পুড়ে ও ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা যায় প্রায় ১০০ শ্রমিক। বাকি ১০ জন আত্মরক্ষার্থে নিচে লাফিয়ে পড়তে গিয়ে মারা যান। এই মর্মভেদী ঘটনার পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে চারটি মনবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), নিজেরা করি ও ব্র্যাক একটি রিট মামলা দায়ের করে। মামলায় সংগঠনগুলো যুক্তি উত্থাপন করে যে, শ্রমিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত প্রচলিত আইন কারখানাগুলোতে মানা হচ্ছে কিনা তা নজরদারিতে সরকারের চরম ব্যর্থতার ফলশ্রুতিতে কারখানা কর্তৃপক্ষের এসব প্রচলিত আইন না মানার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এ কারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন এবং কারখানা নজরদারির জন্য প্রধান পরিদর্শক নিয়োগ ও তার ক্ষমতা ও কার্যাবলি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। বিধানগুলো নিম্নরূপ-
ধারা-৬২: অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন
১. প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে বিধি দ্বারা নির্ধারিতভাবে অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রত্যেক তলার সাথে সংযোগ রক্ষাকারী অন্তত একটি বিকল্প সিঁড়িসহ বহির্গমনের উপায় এবং অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
২. যদি কোনো পরিদর্শকের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, উপধারা (১)-এ উল্লিখিত বিধি অনুযায়ী বহির্গমনের ব্যবস্থা করা হয় নাই, তা হলে তিনি মালিকের উপর লিখিত আদেশ জারী করে কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন- তা অবহিত করবেন।
৩. প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে কোনো কক্ষ হতে বহির্গমনের পথ তালাবদ্ধ বা আটকিয়ে রাখা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তি কক্ষের ভিতরে থাকলে তা তৎক্ষণাৎ ভিতর থেকে সহজে খোলা যায়, এবং এ প্রকার সকল দরজা, যদি না এগুলি স্লাইডিং টাইপের হয়, এমনভাবে তৈরি করতে হবে তা যেন বাইরের দিকে খোলা যায়, অথবা যদি কোনো দরজা দুটি কক্ষের মাঝখানে হয়, তাহলে তা যেন ভবনের নিকটতম বহির্গমন পথের কাছাকাছি দিকে খোলা যায় এবং এই প্রকার কোনো দরজা কক্ষে কাজ চলাকালীন সময়ে তালাবদ্ধ বা বাধাগ্রস্ত অবস্থায় রাখা যাবে না।
৪. প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ বহির্গমনের জন্য ব্যবহৃত পথ ব্যতীত অগ্নিকাণ্ডকালে বহির্গমনের জন্য ব্যবহার করা যাবে এরূপ প্রত্যেক জানালা, দরজা বা অন্য কোনো বহির্গমন পথ স্পষ্টভাবে লাল রং দ্বারা বাংলা অক্ষরে অথবা অন্য কোনো সহজবোধ্য প্রকারে চিহ্নিত করতে হবে।
৫. প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রত্যেক শ্রমিককে অগ্নিকাণ্ডের বা বিপদের সময় তৎসম্পর্কে হুঁশিয়ার করার জন্য স্পষ্টভাবে শ্রবণযোগ্য হুঁশিয়ারি সংকেতের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৬. প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কক্ষে কর্মরত শ্রমিকগণের অগ্নিকাণ্ডের সময় বিভিন্ন বহির্গমন পথে পৌঁছার সহায়ক একটি অবাধ পথের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৭. যে প্রতিষ্ঠানে নিচের তলার উপরে কোনো জায়গায় সাধারণভাবে দশ জন অথবা ততোধিক শ্রমিক কর্মরত থাকেন অথবা বিস্ফোরক বা অতিদাহ্য পদার্থ ব্যবহৃত হয় অথবা গুদামজাত করা হয়, সে প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডকালে বহির্গমনের উপায় সম্পর্কে সকল শ্রমিকেরা যাতে সুপরিচিত থাকেন এবং উক্ত সময়ে তাদের কি কি করণীয় হবে তৎসম্পর্কে তারা যাতে পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ লাভ করতে পারেন সেই বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৮. পঞ্চাশ বা ততোধিক শ্রমিক/কর্মচারী সম্বলিত কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর অন্তত একবার অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার আয়োজন করতে হবে এবং এই বিষয়ে মালিক কর্তৃক নির্ধারিত পন্থায় একটি রেকর্ড বুক সংরক্ষণ করতে হবে।

ধারা-৩১৮: প্রধান পরিদর্শক, ইত্যাদি
১. এই আইনের উদ্দেশ্যে সরকার, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের দ্বারা, একজন প্রধান পরিদর্শক নিযুক্ত করবে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপ-প্রধান পরিদর্শক, সহকারী প্রধান পরিদর্শক অথবা পরিদর্শক নিযুক্ত করতে পারবে।

ধারা-৩১৯: প্রধান পরিদর্শক, ইত্যাদির ক্ষমতা ও দায়িত্ব
১. এই আইনের উদ্দেশ্যে প্রধান পরিদর্শক বা কোনো উপ-প্রধান পরিদর্শক সহকারী প্রধান পরিদর্শক বা পরিদর্শকের, তাদের এখতিয়ারাধীন এলাকায় নিম্নরূপ ক্ষমতা বা দায়িত্ব থাকবে, যেমন-
ক.প্রয়োজনীয় সহকারী সহকারে, তার বিবেচনায় কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য বা ব্যবহৃত কোনো স্থান বা আঙ্গিনা নৌযান বা যানবাহনে যে কোনো যুক্তিসংগত সময়ে প্রবেশ, পরিদর্শন এবং পরীক্ষাকার্য পরিচালনা করা;
খ.এই আইন বা কোনো বিধি, প্রবিধান বা স্কিম মোতাবেক রক্ষিত কোনো রেজিস্টার, রেকর্ড, নথিপত্র, নোটিশ, প্রত্যয়নপত্র বা অন্য কোনো দলিল দস্তাবেজ তলব করা এবং তা আটক, পরিদর্শন বা পরীক্ষা করা বা নকল করা;
গ. কোনো প্রতিষ্ঠান বা তাতে নিযুক্ত কোনো শ্রমিক সম্পর্কে এই আইন বা কোনো বিধি, প্রবিধান বা স্কিমের কোনো বিধান যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কিনা তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান বা পরীক্ষণ করা;
৫. প্রধান পরিদর্শক, অথবা তার নিকট থেকে এই উদ্দেশ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত তার অধস্তন কোনো কর্মকর্তা, এই আইন বা কোনো বিধি, প্রবিধান বা স্কিমের অধীন, তার এখতিয়ারধীন কোনো বিষয়ে, কোনো অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে অভিযোগ পেশ করতে পারবেন।
কিন্তু আইনের এসব বিধান মোটেও মানা হয় না কারখানাগুলোতে। শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে মালিকপক্ষকে বরাবরই উদাসীন থাকতে দেখা যায়। আর শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে নজরদারির ওপর সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও অনাগ্রহই মালিককে এ বিষয়ে উদাসীন থাকতে উৎসাহিত করে। গত ২৬ নভেম্বর ২০১২ তারিখ মামলাটির প্রাথমিক শুনানি হলে বিচারপতি জনাব মির্জা হোসেন হায়দার ও বিচারপতি জনাব ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডের ঘটনায় যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে না তার কারণ দর্শানোর জন্য সরকারের প্রতি রুল জারি করেন। চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়। সেই সাথে আদালত এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে একটি স্বাধীন কমিটি গঠনে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও বেলার প্রধান নির্বাহীর কাছে নাম চেয়ে আদেশ প্রদান করেন। দশ দিনের মধ্যে ঐ নাম জমা দেয়ার আদেশ দেয়া হয়। এছাড়া আদালত তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে ওই কারখানার এমডি ও তুবা গ্রুপের এমডি দেলোয়ার হোসেনকে নির্দেশ দেয়। কিসের ভিত্তিতে ওই ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে, প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করতে বলা হয়। একই আদেশে আদালত বাংলাদেশের সব পোশাক কারখানার একটি তালিকা সংবলিত প্রতিবেদন আদালতে পেশ করার নির্দেশ প্রদান করে। দুই মাসের মধ্যে শিল্প সচিবকে এই প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ওই সব কারখানার প্রতিটিতে অগ্নিনির্বাপণে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুসারে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তাও সচিবের প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে বলে নির্দেশ দেয়া হয়। রিট আবেদনে শিল্প সচিব, শ্রম সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রধান, কারখানা পরিদর্শক, বিজিএমইএর সভাপতি, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক, তুবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ও তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে ১৯৯৭ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর দায়ের করা একটি রিট আবেদনের রায় বাস্তবায়নের অগ্রগতিও জানতে চায় আদালত। উল্লেখ্য, প্রায় ১৫ বছর আগে উপরোক্ত রিট মামলায় (রিট পিটিশন ৬০৭০/১৯৭৭) হাইকোর্ট কারখানা পরিদর্শনে একটি জাতীয় কমিটি গঠনের নির্দেশনা প্রদান করে। সে নির্দেশনাও আজ পর্যন্ত পালন করা হয়নি। নির্দেশনাগুলো নিম্নরূপ-
১. বিবাদী ২ ও ৩-কে আইনানুযায়ী সুনির্দিষ্ট ও যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হলো।
২. আবেদনকারী সংগঠনের তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী ৪-১০ নম্বর বিবাদী কারখানাগুলো যাতে যথাযথ স্থান, বহির্গমন ব্যবস্থা, প্রতি কক্ষে কমপক্ষে দুটি দরজা এবং কারখানায় বহির্গমনের জন্য কমপক্ষে দুটি সিঁড়ির ব্যবস্থা করে ২ এবং ৩নং বিবাদীর তা নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
৩. কারখানা আইন-১৯৬৫ এবং ফায়ার অধ্যাদেশ-১৯৫৯ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকলে ২ ও ৩নং বিবাদী কোনো কারখানাকে লাইসেন্স ইস্যু করবেন না।
৪. ব্যাংকসহ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ২ ও ৩নং বিবাদী কর্তৃক ইস্যুকৃত লাইসেন্স বা যথাযথ নবায়ন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে কোনো ঋণ প্রদান করবেন না। যদি এসব প্রতিষ্ঠানকে তারা পুঁজি সরবরাহ করেন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে তারাও দায়ী থাকবেন।

তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি জাতীয় বিপর্যয়। এ সেক্টরটি থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও সরকারের সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা আর মালিকপক্ষের অবহেলায় এ সেক্টরে নিয়োজিত শ্রমিকদের কোনো নিরাপত্তাই নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে দেখা যায়, একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, সুপারিশমালা আসে, কিন্তু আগুনে পুড়ে মৃত্যুর কারণগুলো দূর হয় না। এ ধরনের ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর ব্যবস্থা করাই এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান কর্তব্য। নয়তো প্রাণ সংহারকারী এরকম অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হবে আরো অনেক শ্রমিকের জীবন আর আমাদের পোশাকশিল্পের বহির্বাজার।

 

স্পিকারের রুলিং, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
বিচার বিভাগ ও সংসদের সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক

- মাবরুক মোহাম্মদ

 

গত ২৯ মে ২০১২ তারিখে সড়ক ভবনের জমি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ। সড়ক ভবন নির্বাহী বিভাগের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। তাই এই বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের স্বার্থ আছে। আর সংসদ সদস্যরা যেহেতু নির্বাহী বিভাগ পরিচালনা করেন তাই এখানে তাদেরও কিছু আগ্রহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই সড়ক ভবনের জমির মালিকানা বিষয়ে আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে সংসদে কিছু মন্তব্য এবং এই বিষয়ে আদালতের পাল্টা কিছু মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ। সেই সাথে মিডিয়াও সরগরম হয়ে ওঠে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় সংসদের স্পিকার এই বিষয়ে একটি রুলিং দেন। এই রুলিং হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী একটি রিট দায়ের করেন। রিটের প্রেক্ষিতে আদালত একটি পর্যবেক্ষণ দেন। এখানে আমরা এই ঘটনায় দেয়া স্পিকারের রুলিং ও আদালতের পর্যবেক্ষণের আইনি বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করব- প্রকৃতপক্ষে স্পিকার ও আদালত যার যার অবস্থান থেকে কী বলতে চেয়েছেন সে বিষয়টির।

সড়ক ভবন মামলা থেকে বিচার বিভাগ ও সংসদ বিতর্ক
সড়ক ভবনের জমির মালিকানা নিয়ে গত বছর ২০১১ সালে একটি মামলা দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মঞ্জিল মোর্শেদ। এই মামলায় সড়ক ভবনের জমির মালিকানা সুপ্রিম কোর্টের বলে রায় দেন হাইকোর্ট এবং জমি সুপ্রিম কোর্টকে বুঝিয়ে দেয়ার আদেশ দেন। কিন্তু সড়ক ভবন কর্তৃপক্ষ সময়মতো আদালতের আদেশ পালনে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলার প্রতিপক্ষ আদালতে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে ২ মে ২০১২ তারিখের মধ্যে সড়ক ভবনের ব্লক-সি সম্পূর্ণ হস্তান্তর করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু এবারও নির্ধারিত তারিখের মধ্যে আদালতের আদেশ পালনে তারা ব্যর্থ হয়। ১৪ মে ২০১২ শুনানির নির্ধারিত তারিখে আদালত ৫ জুন ২০১২ তারিখের মধ্যে ব্লক-সি-এর বাকি অংশ এবং ব্লক-এ-এর দুটি কক্ষ হস্তান্তরের আদেশ দেন।

এরপর গত ২৯ মে ২০১২ তারিখে একজন সংসদ সদস্য এই বিষয়ে সংসদে আলোচনার সূত্রপাত করেন। আলোচনায় আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। এই আলোচনার মোড় হঠাৎ করেই ঘুরে যায়। সংসদ সদস্যরা সড়ক ভবন মামলার একজন বিচারপতিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য দেন। এই অবস্থায় স্পিকার সংসদে তাঁর কিছু পর্যবেক্ষণ দেন। তিনি বলেন, ‘আদালতের রায়ে যদি জনগণ ক্ষুব্ধ হয় তাহলে তারা একদিন আদালতকেও রুখে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে কোনো সরকারও যদি স্বৈরাচারী হয়ে যায় তাহলে জনগণ তাকে রুখে দাঁড়ায়।’

এরপর গত ৫ জুন ২০১২ তারিখে আদালত অবমাননার মামলাটির নির্ধারিত তারিখে রিটকারী আইনজীবী সড়ক ভবন বিষয়ে সংসদে আলোচনা ও স্পিকারের মন্তব্য আদালতের নজরে আনেন। এ সময় আদালত স্পিকারের মন্তব্য ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল’ মন্তব্য করে এই বিষয়ে একটি রুল দিতে উদ্যত হন। তবে আদালতে উপস্থিত প্রাক্তন আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, সড়ক ভবন মামলার আইনজাবী আনিসুল হক এবং অন্যান্য সিনিয়র আইনজীবীর হস্তক্ষেপে আদালত রুল দেয়া থেকে বিরত হন। রুলের পরিবর্তে আদালত আদেশ ও এতে কিছু পর্যবেক্ষণ দেন। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, সংসদ ও বিচার বিভাগ তাদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং রাষ্ট্রের এই দুই অঙ্গের সুসম্পর্ক অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিচারাধীন বিষয়ে সংসদে আলোচনা না হওয়া বাঞ্ছনীয়। একইভাবে সংসদের আলোচনার বিষয়ে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ অনুচিত। তাই এই বিষয়ে সংসদের আলোচনা আমরা অগ্রাহ্য করছি। পরিস্থিতি দেখে প্রতীয়মান হয় যে, আলোচ্য মামলার বিষয়ে স্পিকারকে সঠিক তথ্য দেয়া হয়নি। আমরা আশা করি, এ বিষয়ে তাকে সঠিক তথ্য দেয়া হবে এবং তিনি সংসদ সদস্যদের বিচারাধীন বিষয়ে আলোচনা থেকে বিরত রাখতে সফল হবেন।

এদিন সংসদ চলাকালে আদালতের এই আদেশে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দেন। তারা বিচারপতি কর্তৃক সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদ ও সংসদ অবমাননার অভিযোগ তোলেন এবং বিচারপতিদের অভিসংশনের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান। একজন সংসদ সদস্য এই বিষয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দেন। এই বিষয়ে তারা স্পিকারের রুলিং দেয়ার দাবি জানান। এরপর গত ১৮ জুন ২০১২ তারিখে স্পিকার একটি রুলিং দেন। রুলিংয়ে স্পিকার বলেন, আমি যে কথাগুলো বলেছি তার সারমর্ম হচ্ছে মহামান্য আদালতের প্রতি আমাদের সবার শ্রদ্ধা আছে। আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। আদালতের মাননীয় বিচারকের মন্তব্যের সূত্র ধরে অনেকেই বিশেষ করে পত্র-পত্রিকায় একে সংসদের সাথে বিচার বিভাগকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে মর্মে উল্লেখ করে। সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে আসলে এটি কোনো বৈরিতা নয়। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে রয়েছে ৪০ বছর ধরে গড়ে ওঠা গভীর সম্প্রীতি ও আস্থার সম্পর্ক। পারসপরিক এ সুসম্পর্কের কারণেই অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এ দেশটি আজ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি একজন সংসদ সদস্য হিসেবে এবং স্পিকার হিসেবে সবসময় বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ একে অপরের পরিপূরক এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন। এক্ষেত্রে কর্ম পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক এবং তা সর্বাবস্থায় জনগণের কল্যাণ সাধন। দেশ ও জাতির কল্যাণে এ সম্পর্ক অটুট হোক এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। রুলিংয়ে স্পিকার সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, আপনারা সবাই সিদ্ধান্ত নিলে আমার জন্য তা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সার্বিক বিবেচনায় যেহেতু এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ সমীচীন হবে বলে আমি মনে করি না, তাই আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করবো সংসদে আপনাদের উত্থাাপিত প্রস্তাবটি আপনারা আমার সাথে একমত হয়ে প্রত্যাহার করবেন।

স্পিকারের রুলিং চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট
সংসদে দেয়া স্পিকারের এই রুলিংয়ে বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আখতার ইমাম। রিটে স্পিকারের রুলিং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে অভিযোগ করা হয়। বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চে রিটটি দায়ের করলে একজন বিচারপতি আবেদন শুনতে বিব্রতবোধ করেন। এরপর রিটটি বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চে পুনরায় দাখিল করা হয়। গত ২৪ জুলাই ২০১২ শুনানি হয়। শুনানিতে রিটকারী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এই বিষয়ে আদেশের পরিবর্তে আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ দেয়ার ব্যাপারে একমত হন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ
পর্যবেক্ষণের শুরুতেই আদালত হাইকোর্টের একজন বিচারপতি কর্তৃক সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের বিষয়ে সংসদ সদস্যদের মন্তব্য বিষয়ে বলেন, সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের কোনো কার্যধারা বিষয়ে কোনো আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না বা সংসদের কার্যধারা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। কিন্তু ঘটনার দিন সংশ্লিষ্ট বিচারপতি বা কোনো আইনজীবী সংসদের কোনো কার্যধারা চ্যালেঞ্জ করেননি। তাই সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগ অবান্তর। এরপর আদালত সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির বিস্তারিত উল্লেখ করেন। এছাড়াও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন নজির দিয়ে আদালত বলেন, আদালতে বিচারাধীন কোনো বিষয়ে সংসদে আলোচনা করা যায় না। এ ধরনের আলোচনা সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির পরিপন্থী। সড়ক ভবন মামলা যেহেতু আদালতের বিচারাধীন বিষয় তাই এই বিষয়ে সংসদে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। এরপর আদালত স্পিকারের রুলিং ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই আলোচনার সূত্র ধরে আদালত বিচার বিভাগ ও সংসদের সাংবিধানিক অবস্থান ও এদের সম্পর্ক বিষয়ে উল্লেখ করেন। আদালত বলেন, বিচার বিভাগ ও সংসদ রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে অন্যতম। রাষ্ট্রের এই দুটি অঙ্গই সংবিধানের সৃষ্টি। সংসদ আইন প্রণয়ন করে। আর সেই আইনের বৈধতা পরীক্ষা করার ক্ষমতা সংবিধান উচ্চ আদালতকে দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গই স্বাধীন। কিন্তু এই স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলো নিজেদের কাজ সঠিকভাবে পালন করছে কিনা তা দেখার দায়িত্বও সংবিধান অন্যান্য অঙ্গকে দিয়েছে।

স্পিকারের রুলিংয়ে বৈধতা পরীক্ষা করতে গিয়ে আদালত রুলিংয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ উদ্ধৃত করেন। এ বিষয়ে আদালত মন্তব্য করেন, স্পিকারের রুলিং বিচ্ছিন্নভাবে না পড়ে পুরোটা একসাথে পড়তে হবে। আদালত বলেন, স্পিকারের রুলিং সম্পূর্ণ পড়লে দেখা যাবে তিনি রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সংসদ সদস্যদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন বা বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। এতে বোঝা যায়, তিনি রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গের মধ্যে কোনো বিরোধ বা সংঘাতের বিপক্ষে। আদালত স্পিকারের রুলিংয়ের একটি অংশ উদ্ধৃত করেন, ‘আদালতের মাননীয় বিচারকের মন্তব্যের সূত্র ধরে অনেকেই বিশেষ করে পত্র-পত্রিকায় একে সংসদের সাথে বিচার বিভাগকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে মর্মে উল্লেখ করেছেন। সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে আসলে এটি কোনো বৈরিতা নয়।’ আদালত বলেন, এই মন্তব্যের মাধ্যমে স্পিকার বিতর্কের অবসান চেয়েছেন এবং নিজেই বিতর্কের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর স্পিকার নিজেই যেহেতু বিতর্কের অবসান করে দিয়েছেন তাই এই বিষয়ে দেয়া রুলিংয়েরও কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। রাষ্ট্রের দুটি অঙ্গের সুসম্পর্কের কথা চিন্তা করে স্পিকার সচেতনভাবেই এই কাজটি করেছেন বলে আদালত মন্তব্য করেন। তাই এই বিষয়ে কোনো আলোচনা বা বিতর্ক অপ্রয়োজনীয় বলেও আদালত উল্লেখ করেন।

আদালতের এই পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে সরকার আপিল বিভাগে একটি আপিল দায়ের করে। হাইকোর্ট বিভাগের মতো আপিল বিভাগও কিছু পর্যবেক্ষণসহ আপিলটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছে। তবে আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ এখনও প্রকাশিত হয়নি।

শেষ কথা
স্পিকারের রুলিং ও আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, দুটিই রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। অত্যন্ত সুচিন্তিত ও সচেতন হয়ে রাষ্ট্রের এই দুটি অঙ্গের মধ্যে সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের শুভচিন্তা ও পদক্ষেপ সংসদ ও আদালত উভয়ের জন্যই প্রশংসনীয়। একটি বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্যের সূত্র ধরে রাষ্ট্রের দুটি অঙ্গের মধ্যে সংঘর্ষ ও সম্পর্কের অবনতি কাম্য নয়। তাই এই বিষয়ে স্পিকারের রুলিং ও আদালতের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আশা করা যায়, আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণের বিষয়টি একইভাবে প্রতিফলিত হবে।

 

 

খ্রিস্টান পারিবারিক আইন সংস্কার

- ফারহানা লোকমান

 

পারিবারিক আইন সমূহের সংস্কার আন্দোলন চলে আসছে বহুদিন ধরে, যার সর্বশেষ ফল হলো হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন, ২০১২। বাংলাদেশের আরেক সংখ্যালঘু ধর্মীয় সমপ্রদায়, খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য আইনে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হলেও বিবাহ বিচ্ছেদ, পুনঃবিবাহ ও ভরণপোষনের বেলায় যথেষ্ট বৈষম্য রয়েছে। খ্রিস্টান সমপ্রদায়ের দেড়শ বছরের পুরোনো আইনের সীমাবদ্ধতা, বৈষম্য ও অপ্রতুলতা নির্ণয় করে ২০১২ সালে আইন কমিশনে একটি সুপারিশ পাঠানো হয়। এই লক্ষ্যে “খ্রিস্টান পারিবারিক আইন: সমস্যা, সম্ভবনা ও সংস্কার চিন্তা” শিরোনামে সাউথ এশিয়ান ইন্সটিটিউট অফ এডভান্সড লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজ-এর উদ্যোগে একটি গবেষণা কাজ হয়েছিল। ড. ফসটিনার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণাটি ‘সিভিল ল’স গভার্নিং খ্রিস্টানস ইন বাংলাদেশ: এ প্রোপোসাল ফর রিফর্ম’ নামে প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশনার আলোকে খ্রিস্টান পারিবারিক আইনের প্রধান প্রধান বৈষম্যমূলক বিধি লেখাটিতে তুলে ধরা হলো।

জোসেফ ও জেনিফার ক্যাথলিক খ্রিস্টান। তাদের বিবাহিত জীবনের দুই বছরের মাথায় জন্ম নেয় তাদের পুত্রসন্তান মিল্টন। চাকরি আর সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে জেনিফার। এ কারণে সংসারের প্রতি জোসেফের অমনোযোগিতা। প্রথম দিকে ধরতে পারে না জেনিফার। মদ পান করে গভীর রাতে ঘরে ফেরা শুরু করে জোসেফ। প্রায় দুই-তিনদিনের জন্য উধাও হয়ে যেত সে। সংসারের এমনকি মিল্টনের খাবারের খরচও দিত না। জেনিফার প্রতিবাদ করলে জোসেফ তাকে গালিগালাজ করত, অপমান করত। মিল্টনের বয়স যখন এক বছর তখন জেনিফার আবিষ্কার করে জোসেফের সাথে তার সহকর্মী এনার অবৈধ সম্পর্ক চলছে। জেনিফার জোসেফকে বোঝায়, চার্চে নিয়ে যায়। কিন্তু জোসেফের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসে না, বরং মানসিক অত্যাচারের পরিমাণ বাড়তে থাকে। জেনিফার চার্চের ফাদারের সাহায্য চাইতে গেলে ফাদার তাকে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করার পরামর্শ দেন। তাকে বোঝায় ক্যানন ল’ অনুযায়ী বিয়ে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। জেনিফার মুখ বুজে সংসার করতে থাকে। কিন্তু জোসেফ এনাকে নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য কক্সবাজার বেড়াতে গেলে জেনিফার নিরুপায় হয়ে উকিলের কাছে যান। উকিলের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন শুধু ব্যভিচারের অভিযোগ এনে খ্রিস্টান স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে না। একদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ, অন্যদিকে প্রচলিত আইনের বিধিনিষেধ জেনিফারকে অকূল পাথারে ফেলে দেয়। আবার জোসেফের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও জেনিফারের জন্য অসম্ভব। এখন কী করবে জেনিফার?

এই প্রশ্ন শুধু একা জেনিফারের নয়। এই প্রশ্নের সম্মুখীন আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী খ্রিস্টান সমপ্রদায়ভুক্ত বহু নীলা, মেরি, লারা কিংবা ক্রিস্টিনা। বাংলাদেশের চারটি প্রধান ধর্মীয় সমপ্রদায়ের মধ্যে খ্রিস্টান সমপ্রদায় অন্যতম। এই উপমহাদেশে খ্র্রিস্টান জনগোষ্ঠীর বসবাস প্রায় পাঁচশ’ বছর ধরে। সাধারণভাবে খ্রিস্টান বলতে তাদের বোঝায় যারা যিশুখ্রিস্টের শিক্ষা ও আদর্শের অনুসারী। মূল্যবোধের ভিত্তিতে খ্রিস্টান সমপ্রদায় ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট উপসমপ্রদায়ে বিভক্ত। রাষ্ট্রীয়ভাবে যেসব আইন দ্বারা উপমহাদেশের খ্রিস্টান সমাজ পরিচালিত হয় তার প্রত্যেকটি ইংরেজ আমলে প্রণীত। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী মূলত প্রটেস্ট্যান্ট ছিল বিধায় প্রণীত আইনগুলোতে প্রটেস্ট্যান্ট মূল্যবোধের প্রভাব দেখা যায়। বাংলাদেশের খ্রিস্টান সমপ্রদায়ের মধ্যে ক্যাথলিক সমপ্রদায়ভুক্ত মানুষই বেশি। ক্যাথলিকদের আচার, আদর্শ ও আধ্যাত্মিকতা ‘কোড অফ ক্যানন ল’ দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেল থেকে উদ্ভূত এবং ক্যাথলিকদের মাণ্ডলিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিকনির্দেশক। পারিবারিক আইনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক যেমন- বিয়ে, বিয়ের বৈধতা, বিয়ে বাতিলকরণ, সন্তানের বৈধতা ইত্যাদি কোড অফ ক্যানন ল’তে লিপিবদ্ধ আছে, রাষ্ট্রীয় খ্রিস্টান পারিবারিক আইনগুলোতে ক্যানন লয়ের যথেষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। বাংলাদেশের খ্রিস্টান সমপ্রদায় প্রধান যেসব আইন দ্বারা পরিচালিত সেগুলো হলো- দি ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯; দি ম্যারেজ অ্যাক্ট, ১৯৭২; দি ম্যারেড উইম্যান্স প্রপারটি অ্যাক্ট, ১৯৭৪; দি সাকসেশন অ্যাক্ট, ১৯২৫; দি কোড অফ ক্যানন ল’ (ক্যাথলিকদের জন্য) এবং সকল ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য পারিবারিক বিষয়াদি সম্পর্কিত আইনগুলো যেমন গার্ডিয়ানস এন্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০।

ক্যানন আইনের ১০৫৬ ধারায় বলা হয়েছে, খ্রিস্টান বিয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ঐক্য ও অবিচ্ছেদ্যতা। আবার বিভিন্ন জায়গায় পরোক্ষভাবে একে চুক্তিও বলা হয়েছে এবং বিয়ের সিভিল বা দেওয়ানি দিকগুলোকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে (যেমন ধারা ১০৫৯)। প্রটেস্ট্যান্টদের মতে, বিয়ে একটি ধর্মীয় সংস্কার। বিয়ে এবং বিয়ের বিচ্ছেদ নিয়ে দুই উপসমপ্রদায়ের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও দি ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯ উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এই অ্যাক্ট অনুযায়ী খ্রিস্টান দম্পতির সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রক্রিয়া তিনটি-
১. বিয়ে বিচ্ছেদ (ধারা: ১০): স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ এনে আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে। কিন্তু স্ত্রী শুধু ব্যভিচারের অভিযোগ এনে একই প্রতিকার পেতে পারে না। এখানে স্বামী এবং স্ত্রীর অধিকারের ক্ষেত্রে একটি চরম বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। কোনো স্ত্রীর স্বামী যদি শুধু ব্যভিচারী হয়, তাহলে স্ত্রী ব্যভিচারের কারণে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে না। স্বামী যদি ব্যভিচারসহ ধর্মত্যাগ, অন্য ধর্মগ্রহণ, অপর কোনো মহিলাকে বিয়ে করে, কোনো নিকট আত্মীয়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত থাকে, বহুকামিতা, ধর্ষণ, সমকামিতা, পাশবিকতা বা নৃশংসতা করে, অথবা কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া দুই বছর স্ত্রীর খোঁজখবর না রাখে, তাহলেই শুধু স্ত্রী আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে ব্যভিচার ছাড়া অন্য কোনো অভিযোগ না থাকলে খ্রিস্টান স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে বানোয়াট কোনো সহঅভিযোগ (ধর্ষণ, পাশবিকতা ইত্যাদি) আনতে চান না বিধায় বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। এছাড়াও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন করার কোনো সুযোগও এই আইনে নেই।
২. বিয়ে বাতিলকরণ: নিম্নলিখিত কারণে বিয়ে বাতিল করার জন্য যে কোনো পক্ষ আদালতে আবেদন করতে পারেন- ১. স্বামী বিয়ের সময় এবং মামলা দায়ের করার সময় পর্যন্ত পুরুষত্বহীন ছিল; ২. বিয়ের পক্ষদ্বয়ের মধ্যে এমন সম্পর্ক বিদ্যমান যার কারণে বিয়ে করা আইনত নিষিদ্ধ ; ৩. বর বা কনে কেউ বিয়ের সময় পাগল ছিল; ৪. স্বামী বা স্ত্রী যে কারো পূর্ববর্তী স্ত্রী বা স্বামী বিয়ের সময় জীবিত ছিল।
৩. জুডিশিয়াল সেপারেশন: ব্যভিচার, নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা বা কোনো কারণ ছাড়া দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে পরিত্যাগ করার কারণে স্বামী বা স্ত্রী আদালতে জুডিশিয়াল সেপারেশনের মামলা করতে পারে। এখানে সম্পত্তির ক্ষেত্রে স্ত্রী তার যাবতীয় পাওনার অধিকারী হয় এবং তার নিজস্ব সকল সম্পত্তি ইচ্ছামতো ব্যয় করতে পারে।

দি ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯ অনুযায়ী বিয়ে বিচ্ছেদ সংক্রান্ত তিনটি ফোরাম থাকলেও সমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময়ই বিয়ে বিচ্ছেদ করতে নিরুৎসাহিত করে থাকে। ক্যানন আইন অনুযায়ী (ধারা ১০৮৩-১০৯৪) যেসব অযোগ্যতার জন্য বিয়েকে বাতিল বলে গণ্য করা হয় সেগুলোর প্রতিফলন দেখা যায় ডিভোর্স অ্যাক্টের বাতিলকরণ অধ্যায়ে। ক্যানন আইন অনুযায়ী বিয়ে বাতিলকরণ অর্থ হলো এই বিয়ে প্রথম থেকেই অবৈধ, ওই পুরুষ ও মহিলার মধ্যে কখনোই বৈধ বিয়ে ছিলো না। এই বিয়ে শুরু থেকেই বাতিল বলে স্বামীস্ত্রীর একে অপরের ওপর অধিকার তৈরি হয় না। ডিভোর্সেরও প্রয়োজন হয় না। তবে এ ধরনের সম্পর্ক থেকে কোনো সন্তানের জন্ম হলে সেই সন্তান বৈধ হবে এবং মা-বাবার সম্পত্তিতে তার অধিকার জন্মায়।

দি ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯-এর ধারা ১৭ ও ২০-এর অধীনে বিয়ে বিচ্ছেদ ও বাতিলকরণ সম্পর্কিত রায় হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক নিশ্চিত করতে হয়, যা অনেক বিচার প্রার্থীর জন্য কষ্টকর। আদালতের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া জটিল বলে খ্রিস্টান সমপ্রদায়ের মধ্যে এফিডেভিট করে বিয়ে বিচ্ছেদ ও পুনরায় বিয়ে করার প্রচলন উল্লেখযোগ্য হারে বেশি, যা দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার সন্তানকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। কারণ পূর্বের বিয়ের বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ না হলে পুনরায় বিয়ে খ্রিস্টান ধর্মমতে অবৈধ। খ্রিস্টান বিয়ের ক্ষেত্রে চার্চের সার্টিফিকেটের সাথে সাথে ‘জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহ রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৮৮৬’-এর অধীনে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হলে, খ্রিস্টান নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনের সহায়তা গ্রহণ করা সহজতর হতো।

বিচ্ছেদ-পরবর্তী স্ত্রীর ভরণপোষণের (এলিমনি) সর্বোচ্চ সীমা স্বামীর আয়ের ১/৫ ভাগ, যা আদালতের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। সর্বোচ্চ সীমার বিধান উঠিয়ে দিয়ে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে আদালতের হাতে থাকা উচিত। যাতে আদালত সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই হার নির্ধারণ করতে পারেন। এছাড়াও খ্রিস্টান নারী ও পুরুষ কর্তৃক শিশু দত্তক গ্রহণ সম্পর্কিত কোনো সুনির্দিষ্ট আইন দেশে বিদ্যমান নেই। দত্তক গ্রহণ সম্পর্কিত পৃথক আইন প্রণয়ন এই সময়ের প্রেক্ষিতে অপরিহার্য।

দেড়শ’ বছরের পুরনো ও সেকেলে আইনগুলো বর্তমানে উদ্ভূত বৈবাহিক কলহ, অশান্তি, প্রতারণা ও অন্যান্য সমস্যা সমাধানে অপ্রতুল। এই অবস্থার প্রধান শিকার নারী ও সন্তানরা। আবার খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আইনের সহাবস্থান তাদের মানসিক দ্বিধা ও টানাপড়েনের মধ্যে ফেলে দেয়। কোড অফ ক্যানন ল’ অনুযায়ী বাস্তবোচিত ও সুনির্দিষ্ট প্রতিকার পেতে ব্যর্থ হলে তারা রাষ্ট্রীয় আইনের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু শতবর্ষের পুরনো আইনও অনেকক্ষেত্রে প্রতিকার দিতে ব্যর্থ হয়। সাধারণত রাষ্ট্র নাগরিকদের ধর্মীয় আইনে হস্তক্ষেপ করে না কিন্তু যদি ধর্মীয় আইন সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলের পরিপন্থী হয় তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য বৈষম্যহীন আইন প্রণয়ন করা। বাংলাদেশের খ্রিস্টান পরিবারগুলোর বাস্তবিক সমস্যাগুলোর দিকে স্বচ্ছ দৃষ্টি রেখে সকল চার্চকে (ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট) সাথে নিয়ে বিদ্যমান আইনগুলোর সময়োপযোগী সংস্কার প্রক্রিয়া আরম্ভ করা আবশ্যক। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ধরনের সংস্কার ল’ কমিশন কর্তৃক সুপারিশকৃত এবং সংসদে পাসকৃত, এই সংস্কারে ভারতের ক্যাথলিক বিশ্ব সম্মেলনও (CBCI) পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল। বাংলাদেশেও সংস্কারের সময় হয়েছে যার প্রথম ধাপ হলো খ্রিস্টান সমাজের মধ্যে সচেতনতা তৈরি।

তথ্যসূত্র
১ ড. ফসটিনা পেরেরা, সিভিল ল’স গভার্নিং খ্রিস্টানস ইন বাংলাদেশ: এ প্রপোসাল ফর রিফর্ম, সাউথ এশিয়ান ইন্সটিটিউট অফ এডভান্সড লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজ, ২০১১ (লেখক একজন গবেষণা সহকারী ছিলেন)
২. পারিবারিক আইনে বাংলাদেশের নারী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র
৩. খ্রিস্টান পারিবারিক বিষয় পরিচালনাকারী বিদ্যমান আইনগুলো


ফরমালিনযুক্ত খাদ্য আমদানি,
বাজারজাতকরণ ও বিপণন বন্ধে
আদালতের নিষেধাজ্ঞা

- জাকিয়া সুলতানা

 

দীর্ঘদিন ধরে মাছ, দুধ এবং বিভিন্ন ধরনের ফলে যথেচ্ছ পরিমাণে ফরমালিন ব্যবহার হচ্ছে। সমপ্রতি এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোকে ফরমালিনযুক্ত খাদ্যদ্রব্য বিক্রি বিষয়ে উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া মৎস্য অধিদপ্তর দ্বারা পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মার্কেট ও বাজারে অভিযানের ফলে স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, মানবদেহের জন্য অতীব ক্ষতিকর ফরমালিন যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরমালিন ব্যবহারে মানুষের লিভার, কিডনি, শ্বাসতন্ত্র ইত্যাদি অঙ্গের কার্যকারিতার জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সহযোগী সংগঠন আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার (আইএআরসি) জিনগত কারণের বাইরে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে ফরমালিনকে এক নম্বর তালিকায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ফরমালিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।

২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফরমালিনের ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বাণিজ্যিক রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি, থার্মোপ্লাস্টিক রেজিন তৈরি, পোশাক ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে, গবেষণাগারে এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রের প্রয়োজনে ফরমালিন আমদানি করা হলেও যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে তা পরে বাইরে বিক্রি করা হচ্ছে। একই সাথে আমদানি সহজলভ্য হওয়ায় এবং সীমান্তে ফরমালিন ও ফরমালিনযুক্ত খাদ্যদ্রব্য চোরাইভাবে এবং অবাধে দেশে প্রবেশ করছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত ফরমালিনযুক্ত খাদ্যদ্রব্য শনাক্ত হওয়ার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও ফরমালিন আমদানি নিয়ন্ত্রণে, খাদ্যে ফরমালিনের মিশ্রণ রোধে এবং ফরমালিনযুক্ত বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণ থেকে জনস্বাস্থ্যকে রক্ষায় কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় উদ্বিগ্ন হয়ে গত ১৯ নভেম্বর, ২০১২ তারিখে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) হাইকোর্টে এক রিট মামলা দায়ের করে।

দায়েরকৃত এ মামলায় এফবিসিসিআইর পক্ষের আইনজীবী হিসেবে ছিলেন বেলার সিনিয়র আইনজীবী ইকবাল কবির এবং আরো ছিলেন অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দীন এবং অ্যাডভোকেট খায়রুল আলম। এ মামলার প্রেক্ষিতে বিচারপতি মির্জা হোসেন হায়দার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ খাদ্যে ফরমালিন রোধে বাজারগুলোতে ফরমালিনসহ রাসায়নিক দ্রব্য পরীক্ষার সরঞ্জাম সরবরাহ, আগ্রহী ক্রেতাদের উপস্থিতিতে রাসায়নিক পরীক্ষার সুযোগ এবং এর নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সচেতনতার জন্য প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ প্রদান করেছেন। নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করে এক মাসের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতেও আদালত বিবাদীদের ওপর নির্দেশ প্রদান করেছেন। একই সাথে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অধিক মাত্রার ফরমালিনযুক্ত খাদ্য প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। তবে আমদানিকৃত খাদ্যে কোনোরূপ স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ ফরমালিন বা রাসায়নিক পদার্থ নেই বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তা দেশে প্রবেশ করতে পারবে বলেও আদালত মতামত প্রদান করেছেন।

এছাড়া খাদ্যে ফরমালিনসহ রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে কিনা, তা শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাজারগুলোতে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নিয়ন্ত্রিত সিটি করপোরেশনের বাজারগুলোতে ৩০ দিনের মধ্যে পরীক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। এ মামলায় আদালত মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন ও অন্য রাসায়নিক পদার্থ আমদানি, বণ্টন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না এবং বাজারে বিক্রির জন্য আনা খাদ্যদ্রব্য ফরমালিন ও রাসায়নিকমুক্ত বলে নিশ্চিতের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে বাণিজ্য সচিব, পরিবেশ সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, শিল্প সচিব, মৎস্য সচিবসহ ২১ বিবাদীকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এসব রাসায়নিক দ্রব্যযুক্ত খাদ্যে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতনতার জন্য ১৫ দিনের মধ্যে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করতেও বলা হয়েছে। সমপ্রতি এফবিসিসিআইর উদ্যোগে রাজধানী ঢাকার চারটি বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বাজারগুলো হলো- মালিবাগ বাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার, মহাখালী কাঁচাবাজার ও গুলশান-২ কাঁচাবাজার। এই বাজারগুলোতে দেয়া হয়েছে ফরমালিন শনাক্তকরণ যন্ত্র। আমরা আশাবাদী, পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হবে।

 

* * *