Bulletin_September_2012
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   ফলোআপ
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন-আদালত
   পাঠক পাতা
   সেমিনার
   পরিসংখ্যান চিত্র
 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

ফলোআপ


ওবামার মিয়ানমার সফর

- মোশাহিদা সুলতানা ঋতু

জননন্দিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মানুষের মন জয় করতে জানেন অনেক কিছু দিয়ে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে বক্তৃতা। ওবামা যেমন একজন দৃঢ়কণ্ঠের তুখোড় বক্তা, তেমনই তুখোড় অং সান সু চিও। তবে তাঁর কণ্ঠ কোমল। কথার জাদুতে দুনিয়া কাঁপানো এ দুই বক্তা মিয়ানমারের মাটিতে পাশাপাশি দাঁড়ালেন যেদিন, সেটা ১৯ নভেম্বর ২০১২। এদিকে বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষা করছিল রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে কী বলেন তা শুনতে। যথারীতি নিরাশ করেননি ওবামা। রোহিঙ্গাদের অধিকারের পক্ষে যতটুকু না বললেই নয় বা যতটুকু আবেগ ও যুক্তির ভারসাম্য রেখে বললে ওবামা-ভক্তরা আবারও চমৎকৃত হন- ততটুকু বলে ওবামা দায়মুক্ত হলেন। কিন্তু তিনি কথা বলার সময় জানলেন না যে, রোহিঙ্গা বিষয়ে বার্মিজ ভাষায় অনুবাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রচার করেনি বার্মিজ গণমাধ্যম। ওবামাকেও কি বোকা বানানো যেতে পারে? নাকি এটাকে বোকা বানানোর সংজ্ঞায় ফেলা যায় না? নাকি এরকমই হওয়ার কথা ছিল? লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের রিসার্চ ফেলো এবং বহুল পরিচিত বার্মিজ গণতন্ত্রকর্মী মং জার্নি এ ঘটনাকে তুলনা করেছেন একদল মহিষকে বিটোফেন-এর সঙ্গীত ‘মুনলাইট সোনাটা’ শোনানোর সঙ্গে। ওবামার সুন্দর কথা আমরা শুনেছি, শুনেছে আমেরিকান ভোটাররা, শোনেনি বার্মিজরা যাদের শোনা দরকার। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর কী ধরনের সহিংসতা চলছে আমরা জানি। দু’দিন আগেও বুধিদংয়ে ৫০টি পুকুরের পানিতে বিষ মিশিয়ে দিয়ে গেছে রাখাইনরা। আর প্রতিদিন প্রাণরক্ষা করতে শত শত মানুষ বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে দেশছাড়া হচ্ছে। এ সহিংসতায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ‘অবদান’ অনস্বীকার্র্র্য। আন্তর্জাতিক সংস্থা, গণমাধ্যম ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে, সহিংসতায় মিয়ানমারের নাসাকা বাহিনীর সক্রিয় থাকা এবং রাখাইনরা নিপীড়ন করার সময় এ বাহিনীর নিষ্ক্রিয় থাকার প্রমাণ পেয়েছি আমরা। তা সত্ত্বেও মিয়ানমারের বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চি ক’দিন আগে দিল্লিতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা সম্পর্কে দায়িত্বহীন মন্তব্য করলেন। এ বছর আরাকানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম সহিংসতা শুরুর পর থেকে সু চি তাঁর নীরব ভূমিকার জন্য সমালোচিত হয়ে এসেছেন। শেষ পর্যন্ত এ মাসে মুখ খুলে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি এ সহিংসতাকে দু’পক্ষের সহিংসতা দাবি করে কারও পক্ষে না দাঁড়ানোর অজুহাত দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখাতে চাইছেন যে, তিনি কোনো পক্ষ নিচ্ছেন না। আবার একই সঙ্গে দিল্লি সফরে গিয়ে তিনি বলে এসেছেন যে, অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিকরা মিয়ানমারে অনুপ্রবেশ করছে। মিয়ানমারে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সহিংসতা বন্ধ করার জন্য তিনি দু’দেশকে নিজ নিজ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। এ ধরনের মন্তব্যের পেছনে পরোক্ষভাবে তিনি যা ইঙ্গিত করেছেন, তা হলো- এ সহিংসতার পেছনে শুধু জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করছে না, বাংলাদেশিদের মিয়ানমারে অনুপ্রবেশও একটি অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে।

১৯৪৮ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, সেজন্য রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে না এসে কেন বাংলাদেশ ছেড়ে মিয়ানমারে যাবেন তার কোনো ব্যাখ্যা মিয়ানমারের কাছে নেই। তাছাড়া মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা নাগরিক অধিকার তো পানই না বরং তাদের জন্য ব্যবসা, কৃষি, মাছ, চাষ সবকিছুই কঠিন। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালের আগে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তে যে বাণিজ্য হতো, তার বেশিরভাগ ছিল রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। ১৯৮২-এর পর থেকে যখন সংবিধান অনুযায়ী রোহিঙ্গারা নাগরিক অধিকার হারায়, তারপর থেকে বার্মিজরা এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। যদি ধরে নিই যে, অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার কোনো সুযোগ থাকলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে মানুষ যেতে চায়- রোহিঙ্গাদের সে সুযোগও নেই। বরং নাসাকা বাহিনী চাঁদাবাজি করে যা কিছু ব্যবসার সুযোগ করে দেয়, সেজন্যও ওদের চড়া মূল্য দিতে হয়। বাংলাদেশ সরকার এর মধ্যে একটি প্রতিবাদ পাঠিয়েছে এবং তাতে যথার্থভাবেই উল্লেখ করা আছে যে, যে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের মধ্যে দুই লাখকে মিয়ানমার ফেরত নিতে সম্মতি জানিয়েছিল। যাদের নিজেরাই ফেরত নিতে রাজি হয়েছিল, তাদের নাগরিক অধিকার দিতে না পেরে অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দেয়াকে ‘উদ্দেশ্যমূলক অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ’ ছাড়া কিছুই বলা যায় না। অং সান সু চি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন শান্তির জন্য। তিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে অসঙ্গতিপূর্ণ কথা বলার জন্য নোবেল পুরস্কার পাননি বলেই আমরা জানি। শান্তিতে নোবেল বিজয়ীর কাছ থেকে মানুষ সহিংসতার বিপক্ষে কথা শোনার আশা করেন। তাহলে তিনি রাজনীতিবিদ হয়ে কি ভুলে গেলেন যে, তিনি শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন? না, ভুলে যাননি। আর যাননি বলেই তিনি বলছেন, তিনি কারও পক্ষ নেবেন না। কিন্তু পরোক্ষভাবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েই চলেছেন যে, সহিংসতার জন্য উভয়পক্ষই দায়ী। সু চি তাঁর জাদুকরি কথার মাধ্যমে জনগণকে এটা ভুলিয়ে দিতে চাইছেন যে, রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতার পেছনে মিয়ানমার সরকারের অবদানই প্রধান। এখন আসা যাক বহুল আলোচিত ওবামার মিয়ানমার সফর প্রসঙ্গে। কথা দিয়ে বিশ্ববাসীকে কাত করে দিয়েছেন এ অনন্য বক্তা। আমি ওবামার কথার ঠিক যতটা ভক্ত, ততটা বিভক্ত তাঁর স্বীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথের সঙ্গে। মিয়ানমারে আসার আগেই ওবামা গাজা আক্রমণ সম্পর্কে যে অভিমত দিয়েছেন তা থেকে অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে, যুক্তরাষ্ট্রের কথায় ও কাজে অমিল কোথায়। ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৬৪৩৪ কোটি ডলার শুধু মিলিটারি এইড হিসেবে দিয়েছে। ওবামার সময় ২০১১ সালেই এর পরিমাণ ছিল ৩০০ কোটি ডলার। শুধু তাই নয়, প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, নভেম্বরের নির্বাচনের আগেই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেলআবিবকে গাজায় আক্রমণের সবুজ সংকেত পাঠানো হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক উদ্যোগেই নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ পর এ হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়। ওবামা খুব সুন্দরভাবে কথার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে এ হামলার পেছনে আত্মরক্ষাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। আর তার ঠিক পরেই তিনি যখন মিয়ানমারে এসে রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ তোলেন, তখন আরেকবার বিমোহিত হয়ে ওবামার ভক্তরা ভুলে যান তার আগের দিন ওবামা কী বলেছেন। প্যালেস্টাইনের শিশুরা যখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়ে একে একে প্রাণ হারাচ্ছে, তখন রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় ওবামার আহ্বান বরং তার নিজের আত্মরক্ষার কবচ হিসেবেই বেশি অনুরণিত হয়। মিয়ানমার অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে ঢেলে সাজানোর জন্য জ্বালানি নীতিমালা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিমালা তৈরি করছে। মিয়ানমারের উদার অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণের কারণে মিয়ানমার এখন অংশত অনুন্মোচিত একটি বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সমীকরণ মেলাতে ওবামার মিয়ানমারেই আসার কথা, বাংলাদেশে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কথা ও কাজের অসঙ্গতি যাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা মনে হয়, অং সান সু চির কথা ও কাজের অসঙ্গতিও তাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ই মনে হতে পারে। এসব ‘স্বাভাবিক’ ঘটনার ভিড়ে ‘অস্বাভাবিক’ ঘটনা তাহলে কী? রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দেয়া? তাহলে বলতে পারেন ওবামার বক্তৃতার সময় বার্মিজ অনুবাদ গণমাধ্যমে প্রচার বন্ধ রাখাটাও ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা। ওবামা তার কাজ করেছেন। মিয়ানমারও তার নিজের পথেই অগ্রসর হবে। তার প্রথম আলামত আমরা পেয়েছি ওবামার রোহিঙ্গা বিষয়ে বক্তব্য অনুবাদ প্রচার না করাতে। অনেকেই ভাবতে পারেন যারা ইংরেজি বোঝেন তারা তো বুঝেছেনই, তাহলে অসুবিধা কোথায়? এখানে ভুলে গেলে চলবে না গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ হচ্ছে মূল শক্তি। বার্মার জনগণকে অন্ধকারে রেখে ওবামার বক্তব্য বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানো ইঙ্গিত করে- মিয়ানমারের জনগণ ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করবে কিন্তু তাকে দূর থেকে শাসন করবে অন্যরা। রোহিঙ্গাদের পক্ষে মিয়ানমার সরকার কী পদক্ষেপ নেয় তাই বলে দেবে ওবামার কথা আসলে কতটুকু কার্যকর হবে।

আমরা এত ‘স্বাভাবিক’ ঘটনার পরও এখন কয়েকটি ‘অস্বাভাবিক’ ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় আছি। তার মধ্যে একটি হলো রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার প্রদান করা। দেখা যাক এত মোহময়ী বক্তব্যের ভিড়ে এই ঘটনাটি কীভাবে ঘটে।

সৌজন্যে বিডিনিউজ ২৪, ২১ নভেম্বর ২০১২

 

***