Bulletin_September_2012
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   ফলোআপ
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন-আদালত
   পাঠক পাতা
   সেমিনার
   পরিসংখ্যান চিত্র
 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

তথ্যানুসন্ধান

মৃত্যুপুরী তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টস

- মো. খোরশেদ আলম রনি

 

 

গত ২৪ নভেম্বর ২০১২ সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তুবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শতাধিক নিহত এবং প্রায় দেড় শতাধিক শ্রমিক আহত হয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্বিতীয় শিফটে প্রায় ২০০০ গার্মেন্টস কর্মী ৪টি ফ্লোরে কাজ করছিল। রাত আনুমানিক সাড়ে ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের পর্যায়ক্রমে ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে এবং পরদিন সকাল পর্যন্ত আগুন নেভানোসহ উদ্ধার তৎপরতা চালায় এবং ২৫ নভেম্বর সকালে সেনাবাহিনীর একটি টিম এই উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। বিভিন্নসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মোট নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ১১৭ জন। এর মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে ৬৪ জন (নারী ৪৩, পুরুষ ২১) এবং অজ্ঞাত ৫৩ (অগ্নিদগ্ধ হয়ে বিকৃত হওয়ার কারণে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি)।

অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা
ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মধ্য থেকে জীবিত ফিরে আসা তাজরীন ফ্যাশনের কর্মী আশুরা (২০) আসক প্রতিনিধিদের কাছে এই ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দেন। আশুরা জানান, গত ৬ মাস ধরে এই কারখানায় কাজ করছিলেন। প্রতিদিনের মতো ২৪ তারিখ দুপুরের বিরতির পর থেকে পঞ্চমতলায় ডিউটি করছিলেন। সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে ফায়ার বেল (সাইরেন) বেজে ওঠে। ফায়ার বেল শুনে বের হয়ে আসতে চাইলে ফ্লোরে কর্মরত পিএম বলেন, এটা আগুন নেভানোর ট্রেনিং হচ্ছে। এসব কিছুই না; যে যার মেশিনে গিয়ে কাজ করো। তখন সবাই কাজে ফিরলেও ১৫ মিনিটের মধ্যেই ধোঁয়া দেখে সবাই হুড়োহুড়ি করে নিচের দিকে নামতে শুরু করে। আগুন লাগার পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায় এবং পুরো কারখানা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। অন্ধকার ও ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যেই তিনি কোনোমতে সিঁড়ি হাতড়িয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে আগুনের মধ্য থেকে বের হয়ে আসেন এবং এর পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

অগ্নিকাণ্ডের মধ্য থেকে বেঁচে যাওয়া শ্রমিক মো. জাহাঙ্গীর আলম (২৫) জানান- ঘটনার দিন তিনি ষষ্ঠতলার সুইং সেকশনে কর্মরত ছিলেন। ফায়ার বেল বাজার পর ষষ্ঠতলা থেকে তৃতীয়তলায় নেমে এলে তৃতীয়তলার পিএম রানা সাহেব বলেন, ‘এটা আগুন নেভানোর জন্য মহড়া চলছে। তোমরা যে যার কাজে যাও।’ এরপর তারা চারদিকে ধোঁয়া দেখে তৃতীয়তলা থেকে চতুর্থতলায় চলে যান। নিচে নামার কোনো পথ না পেয়ে চতুর্থতলার কনফারেন্স রুমের জানালা ভেঙে পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে প্রাণে বাঁচেন। তারা আরো জানান, সন্ধ্যার শিফটে একই সাথে ৪টি ফ্লোরে কাজ চলছিল এবং প্রায় দুই হাজার শ্রমিক ঐ সময় কর্মরত ছিল। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত শ্রমিক সুইং অপারেটর মো. নাজমুল (২৩) আসক প্রতিনিধিদের জানান- ঘটনার সময় তিনি তৃতীয় তলায় সুইং মেশিনে কর্মরত ছিলেন। সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে হালকা ধোঁয়া দেখে এবং আগুন লাগার সতর্ক সংকেত শুনে তিনি এবং চতুর্থ/পঞ্চম তলা থেকে অনেক লোক নিচে নামার জন্য দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত যান। কিন্তু সেখানে (দ্বিতীয়তলা) যাওয়ার পর ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘তোমরা নেমো না- আমি দেখছি, কী করা যায়। কিছুই হয়নি; হয়তো অসাবধানতাবশত সুইচে আঙ্গুল লেগে সাইরেন বেজেছে, তোমরা যে যার কাজে যোগ দাও।’ এরপর তারা (শ্রমিকরা) যে যার মেশিনে গিয়ে পুনরায় কাজে যোগ দেন। কিন্তু তখন চারদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলে তিনি দ্রুত নিচে নেমে দেখেন, মেইন গেট তালাবদ্ধ এবং সেখানে আগুন জ্বলছে। সে সময় হঠাৎ সব লাইট নিভে যায়। যে যার প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। অগ্নিনির্বাপণের জন্য প্রত্যেক তলায় ফায়ার বক্স থাকলেও তা ব্যবহার সম্পর্কে কোনো ট্রেনিং না থাকায় কেউই সেগুলো ব্যবহার করতে পারেননি। অপরদিকে অনেক ফ্লোরের গেট তালাবদ্ধ থাকায় অনেকেই বের হতে পারেননি। বাঁচার জন্য শ্রমিকেরা আহাজারি করতে থাকে। তাজরীন গার্মেন্টস এলাকায় নওগাঁ থেকে স্বামী আতিকুর রহমানকে খুঁজতে আসা রাশিদা বেগম আসক প্রতিনিধিদের জানান- আগুন লাগার সময় তার স্বামী আতিকুর রহমান তৃতীয় তলায় কাজ করছিলেন। সন্ধ্যার পর আতিকুর তাকে মোবাইল ফোনে জানান, ‘কারখানায় আগুন লেগেছে, আমি বোধ হয় বাঁচবো না। গেট বন্ধ, আমি নিচে নামতে পারছি না।’ এরপরই আতিকুরের মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। তথ্যানুসন্ধানকালে তাজরীন গার্মেন্টসের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্তকারী দলের প্রধান মাঈন উদ্দিন খন্দকার আসক প্রতিনিধিদের জানান- অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটির সূত্রপাত সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তবে গার্মেন্টসটিতে জরুরি বহিরাগমনের সিঁড়ি ছিল না। ভবনের সিঁড়িগুলো সব ভেতরের দিকে নিচতলায় গিয়ে মিলিত হয়েছে এবং আগুনের তীব্রতা বেশি থাকার কারণে নিচতলার সিঁড়ি দিয়ে বাইরে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
তথ্যানুসন্ধানকালে তাজরীন গার্মেন্টসের সামনে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক এম. আব্দুস সালাম (প্রশাসন ও অর্থ) জানান, তাজরীন গার্মেন্টসে আগুন লাগার খবর পাওয়ার ৩০/৪৫ মিনিটের মধ্যে আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইপিজেডের একটি টিম ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এরপর একে একে ফায়ার সার্ভিসের মোট ১৩টি ইউনিট আগুন নেভানো ও উদ্ধার কাজে অংশ নেয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ইপিজেড ইউনিটের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আনোয়ার হোসেন বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রথমে তার ইউনিটের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু গার্মেন্টস ভবনটির চারিদিকে বসতবাড়ি, জায়গার ও পানির স্বল্পতার কারণে তাদের কাজ ব্যাহত হয়। প্রথমতলার উত্তরপাশ থেকে আগুনের সূত্রপাত হলেও তা দ্রুত তৃতীয় ও চতুর্থতলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং তৃতীয় ও চতুর্থতলাতেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তৃতীয়তলা থেকে মোট ৬৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। লাশগুলো পুড়ে বিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া চতুর্থতলা থেকে ২১ জন, পঞ্চমতলা থেকে ৬ জন এবং ষষ্ঠতলা থেকে ৪ জনকে উদ্ধার করা হয়। এগুলো ছিল ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু। দ্বিতীয়তলা থেকে কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। তারা গত ২৫ নভেম্বর মোট ১০০টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন এবং এর আগের দিন অর্থাৎ ২৪ নভেম্বর ৯টি লাশ উদ্ধার করেন। প্রথম দিকে গার্মেন্টস ভবনের নিচতলার মেইন গেট বন্ধ থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যে তা খুলে দেয়া হয়। অষ্টম ও নবমতলার ছাদের গেট তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। গামেন্টসটিতে পর্যাপ্তসংখ্যক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল না। তাছাড়া যেগুলো ছিল, তাও ব্যবহৃত হয়নি। সম্ভবত এগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে শ্রমিকদের কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না।

থানা থেকে প্রাপ্ত তথ্য
তথ্যানুসন্ধানে আশুলিয়া থানায় কর্তব্যরত কর্মকর্তা এ.এস.আই খায়রুজ্জামান জানান- তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গত ২৫.১১.২০১২ তারিখে দণ্ডবিধির ৩০৪-ক/৩৪, ৩২৩, ৩২৫ ও ৪৩৬ ধারা উল্লেখ করে থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। মামলা নং ৬২/৮৭৩। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মোস্তফা কামালকে দেয়া হয়েছে। মামলার এজাহারের বক্তব্য থেকে জানা যায়- ২৪.১১.২০১২ তারিখে ১৯ ঘটিকায় অজ্ঞাত পরিচয় আসামিরা আশুলিয়া থানাধীন পূর্ব নরসিংহপুরস্থ তাজরীন ফ্যাশন লি. তুবা গ্রুপের নবমতলা ভবনের নিচতলায় অগ্নিসংযোগ করে। এতে উক্ত গার্মেন্টসের শ্রমিকরা উপর তলা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে গুরুতর জখম অবস্থায় এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। এর মধ্যে মোট ৪৮ জনের মৃতদেহ শনাক্ত করায় তাদের লাশ আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং ৫৮ জন শ্রমিকের মরদেহ কেউ শনাক্ত না করায় এগুলো আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে দেয়া হয়।

আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম সূত্রে জানা যায়- ২৫ নভেম্বর দুর্ঘটনাস্থল থেকে দুটি লাশবাহী পিকআপযোগে মোট ৫৮টি লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিয়ে আসে হয় । পরবর্তী সময়ে লাশগুলোর ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়, যার মধ্য থেকে ৭টি লাশ নিহতের স্বজনেরা শনাক্ত করে নিয়ে যায় এবং বাকি লাশগুলো জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

গার্মেন্টস ভবনটির নিচতলা পরিদর্শনে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো দৃশ্যমান হয়-
- গার্মেন্টসটির মোট তিনটি সিঁড়ি, যার সবক’টিই নিচতলার ভেতরের দিকে অবস্থিত। দুর্ঘটনার সময় দ্রুত বের হওয়ার জন্য বাইরের দিকে কোনো সিঁড়ি নেই।
- উত্তর-পূর্ব কোনার সিঁড়ির ঠিক বাম পাশেই রয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার।
- নিচতলার প্রধান ফটক এবং ছোট ফটকটির মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর।
- আর এসব বিপজ্জজনক বস্তুগুলোর মাঝে অপরিকল্পিতভাবে রাখা ছিল সুতা ও কাপড়ের স্তূপসহ কিছু গার্মেন্টসের কাজে ব্যবহৃত অতিদাহ্য পদার্থ।
- আসক-এর তথ্যানুসন্ধানও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স টিম প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী ভবনের নিচতলার উত্তর পাশ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। বিগত বছরগুলোতে গার্মেন্টসে আগ্নিকাণ্ডে মৃতের পরিসংখ্যান:
১৯৯০-এর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টির মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন গার্মেন্টসে। যাতে জীবন দিতে হয়েছে অন্তত ৫০০ জন শ্রমিককে।

পর্যালোচনা
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা-৬২ (১) অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে বিধি দ্বারা নির্ধারিতভাবে অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রত্যেক তলার সাথে সংযোগ রক্ষাকারী অন্তত একটি বিকল্প সিঁড়িসহ বহির্গমনের উপায় এবং অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ধারা-৬২ (৩) অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে কোনো কক্ষ থেকে বহির্গমনের পথ তালাবদ্ধ বা আটকে রাখা যাবে না। ধারা-৬২ (৪) অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ বহির্গমনের জন্য ব্যবহৃত পথ ব্যতীত অগ্নিকাণ্ডকালে বহির্গমনের জন্য ব্যবহার করা যাবে এরূপ প্রত্যেক জানালা, দরজা বা অন্য কোনো বহির্গমন পথ স্পষ্টভাবে লাল রঙ দ্বারা বাংলা অক্ষরে অথবা অন্য কোনো সহজবোধ্য প্রকারে চিহ্নিত করতে হবে। ধারা-৬২ (৫) অনুযায়ী প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে, উহাতে কর্মরত প্রত্যেক শ্রমিককে অগ্নিকাণ্ডের বা বিপদের সময় তৎসম্পর্কে হুশিয়ার করার জন্য, স্পষ্টভাবে শ্রবণযোগ্য হুশিয়ারি সংকেতের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ধারা-৬২ (৭) অনুযায়ী, যে প্রতিষ্ঠানে নিচ তলার উপরে কোনো জায়গায় সাধারণভাবে দশজন বা ততোধিক শ্রমিক কর্মরত থাকেন, অথবা বিস্ফোরক বা অতিদাহ্য পদার্থ ব্যবহৃত হয়, অথবা গুদামজাত করা হয়, সে প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডকালে বহির্গমনের উপায় সম্পর্কে সকল শ্রমিক যাতে পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ লাভ করতে পারেন, সেই বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ধারা-৬২ (৮) অনুযায়ী, পঞ্চাশ বা ততোধিক শ্রমিক/কর্মচারী সংবলিত কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর অন্তত একবার অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার আয়োজন করতে হবে। সমপ্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটিতে উপর্যুক্ত সবক’টি বিধানের কিছু কিছু ক্ষেত্রে আংশিক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ লঙ্ঘন পরিলক্ষিত হয়েছে। অপরদিকে, উৎপাদনে যাওয়ার পূর্বে একটি কারখানাকে সরকারের ১৮টি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র নিতে হয়। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসে এখন যে ত্রুটি ও অপ্রতুলতার কথা বলছে, এসব ত্রুটি ও অপ্রতুলতা থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটি সবগুলো জায়গা থেকে কীভাবে ছাড়পত্র পেল?

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয়। এই ঘটনায় আশুলিয়া থানায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারে তুবা গ্রুপের নবমতলা ভবনের নিচতলায় অজ্ঞাত আসামিদের যে অগ্নিসংযোগের কথা বলা হয়েছে, আসক-এর তথ্যানুসন্ধানে এখন পর্যন্ত এমন কিছু পাওয়া যায়নি।

আমরা জানি না, এই লাশের মিছিল আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের এবং সরকারের বিবেককে নাড়া দেবে কিনা! শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করে তারা কি কেবলই মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলবে? যেই শ্রমিকদের কল্যাণে আমাদের তৈরি পোশাক বিশ্ববাজার দখল করে আছে, সেই শ্রমিকরা কি এভাবেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে? আর কত শ্রমিক জীবন দিলে মালিক ও সরকারের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে?

 

 

রামু ট্র্যাজেডি

- আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

 

কক্সবাজার জেলার রামু, উখিয়া, টেকনাফ উপজেলায় ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে ইন্টারনেট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে উত্তম বড়ুয়া নামের এক যুবকের অ্যাকাউন্টে একটি ছবি ট্যাগ করাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি করে স্থানীয় কিছু মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষ। ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টা থেকে ছোট পরিসরে বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশ-মিছিল শুরু করে। এ ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিলে একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের কথা শোনা গেছে। এরপর রাত আনুমানিক ৯টার দিকে স্থানীয় বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের বাড়িঘর এবং বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের প্রাচীন উপাসনালয়গুলোকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে মিছিলকারীরা। ঘটনার সূত্রপাত রামু উপজেলায়, তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে উখিয়া ও টেকনাফে। সে সময় আক্রান্ত বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের লোকজন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এরপর রাত ১১টা ৩০ মিনিট থেকে ১২টা ৩০ মিনিটের মধ্যে শুরু হয় বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের বাড়িঘরগুলোতে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, ভাঙচুর এবং চলে ভোর ৪টা পর্যন্ত। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশ প্রশাসন অগ্নিসংযোগের সময় কোনোরকম বাধা প্রদান করেনি, এমনকি তারা অগ্নিসংযোগ ও লুটকারীদের কাউকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতারও করেন। রামু উপজেলা প্রশাসন রাত ২টায় ১৪৪ ধারা জারি করলেও বাস্তবে তা অকার্যকর ছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য দমকল বাহিনী বিলম্ব করে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছায় ভোর ৪টার দিকে। এর আগেই স্থানীয় বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের লোকজন নিজেরাই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। দমকল বাহিনী যেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যেতে না পারে সে জন্য রাস্তায় রাস্তায় হামলাকারীদের বাধা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা প্রদানে প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবের বিষয়টি স্পষ্ট। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রামু, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৭টি বৌদ্ধ মন্দির সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৩টি মন্দির আংশিক ভস্মীভূত, ভাঙচুর, লুটপাট বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া একটি হিন্দু মন্দির আংশিক ভস্মীভূত হয়েছে। সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে ২৭টি বসতবাড়ি এবং আংশিক ভস্মীভূত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭৭টি।

রামু উপজেলার রামু শ্রীকুল গ্রামের হীরা সেন বড়ুয়া ঘটনার বিষয়ে জানান- ‘রাত ১১টা ৩০ মিনিট থেকে ১২টার দিকে আগুন দিয়েছে শত শত লোক। তখন আমি আমার পরিবার নিয়ে পালিয়ে গেছি বাড়ি থেকে। ঘরে আগুন দেয়ার সময় হামলাকারীরা আমাকে বলে, ‘ঘরে যারা আছে তাদের নিয়ে বের হও, নাইলে পুড়ে মারা পড়বা।’ আমরা ঘর থেকে দৌড়ে যাচ্ছি আর পেছনে তাকিয়ে দেখি ঘরবাড়ি আগুনে জ্বলছে। সকালে বাড়ি ফিরে এসে দেখি আগুনে পুড়ে সব শেষ।


স্কুলশিক্ষক পলাশ বড়ুয়া ঘটনার বিবরণ জানাতে গিয়ে বলেন- ‘রাত ৮টা ৩০ মিনিটে মিছিল শুরু হয়। তখন মিছিলটি ৬০-৭০ জনের ছিল। ক্রমান্বয়ে মিছিলে লোকজন বেড়েছে। এরপর মোটরসাইকেলে এবং জিপ (মহিন্দ্র জিপ) গাড়িতে লোকজনকে এলাকায় ঢুকতে দেখেছি। রাত ১২টার দিকে আগুন দেয়া শুরু হয়েছে। এলাকার লোকজনের চেয়ে অপরিচিত লোকজনকেই মিছিলে বেশি মনে হয়েছে। স্থানীয় মুসলমানরা যাদের সঙ্গে আমাদের বসবাস, তাদের মধ্যে প্রায় সকলেই ছিল নিশ্চুপ, বাধা দেয়নি বরং তাণ্ডবে অংশ নিয়েছে। তবে মিছিলকারীরা যখন রাখাইন মন্দিরে আক্রমণ করে তখন স্থানীয় কলেজের অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল মোশতাক সাহেবের ছেলে শামীম আহসান বুলু স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে তাকে হামলাকারীরা মারধর করে। এটা আমি দূর থেকে দেখেছি।’
রামুর চিং সাং রাখাইন বৌদ্ধ মন্দিরে প্রতিবেদক উপস্থিত হলে লক্ষ্য করা যায় মন্দিরটি ১৮৮৫ সালে স্থাপিত হয়েছে। এই মন্দিরের ভেতরের দিকে হামলাকারীরা ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে, মন্দিরের দানবাক্স থেকে শুরু করে প্রতিমা, ধর্মীয় গুরুদের বসার স্থান থেকে সিলিং ফ্যান পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মন্দিরের মূল্যবান এক কেজি ওজনের স্বর্ণের বুদ্ধমূর্তি, দুর্লভ ধাতুর মূর্তি এবং ৩টি পিতলের দুর্লভ মূর্তি হামলাকারীরা নিয়ে গেছে। যেগুলো আড়াই হাজার বছর পূর্ব থেকে সংগৃহীত বলে জানিয়েছেন মন্দিরটির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক উ থোই চিং। তিনি জানান- ‘মন্দিরটি ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরা এই মন্দিরে নিয়মিত আসতেন। এই ঘটনায় আমাদের হৃদয় ভেঙে গেছে। কেউ মন্দিরের অবকাঠামো মেরামত করে দিতে পারে কিন্তু আমাদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে পারবে না। আমাদের ওপর এই আক্রমণের কারণটা জানতে চাই।’
মধ্য মেরেংলোয়া গ্রামের স্বপন বড়ুয়া (৪০) ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন- ‘রাত ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে আমার ঘরে আগুন দিয়েছে। প্রথমে বাড়িতে ঢিল ছুড়ে মারে। ঘরে তখন আমার মা, স্ত্রী, এক সন্তান ও ভাইয়ের স্ত্রী ছিল। ঢিল ছোড়ার আধা ঘণ্টা পরে ঘর ভাঙচুর ও লুটতরাজ করে। ভাঙচুরের আগেই পরিবারের সবাই আমরা পার্শ্ববর্তী নূরুল ইসলামের (সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান) বাড়িতে আশ্রয় নিই। সকালে বাড়িতে এসে দেখি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এক কাপড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম।’ স্বপন বড়ুয়ার দেয়া বক্তব্যকে সমর্থন করে তাঁর মা বসু বালা বড়ুয়া এবং স্ত্রী উপালী বড়ুয়া বলেন- ‘আজ আমরা নিঃস্ব।’

কলেজশিক্ষক ববিতা বড়ুয়া ঘটনা সম্পর্কে বলেন- ‘মিছিল যখন গেছে তখনও আমরা ভাবিনি বাড়িঘরে আক্রমণ করবে। আমরা জানালা খোলাই রেখেছিলাম। ভাবিনি বাড়িতে আগুন দেবে। সে সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। আক্রমণকারীরা বাড়িতে এলে বাবা বলেন- ‘তোমরা সব নিয়ে যাও কিন্তু আগুন দিও না।’ হামলাকারীরা মারমুখী হয়ে ওঠে। যখন বাড়িঘরে ভাঙচুর শুরু হয়, তখন উপায়ান্তর না দেখে পালিয়ে যাই। সারারাত খোলা আকাশের নিচে ছিলাম। আমাদের শিক্ষাজীবনের সকল পর্যায়ের সার্টিফিকেট, মার্কসিট, কম্পিউটার, জমির দলিলপত্রসহ বাড়ির সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বাড়ির হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে কাপড়চোপড় ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র এই ঘটনায় ভস্মীভূত হয়েছে। হামলাকারীরা জোরে জোরে চিৎকার করে বলছিল, ‘আগুন দাও, পাউডার দাও, পেট্রোল দাও- এরকম চলছিল, সে এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের রাত।’

৫নং ফতেকারকুল ইউনিয়নের সংরক্ষিত (৭,৮,৯ নং ওয়ার্ড) আসনের নারী ইউপি সদস্য রাবেয়া বশরী বলেন- ‘ঘটনাটি ন্যক্কারজনক, তবে আমরা সবাই বৌদ্ধদের পাশে আছি। ক্ষতিগ্রস্তদের এখন ত্রাণ দেয়ার চেষ্টা করছি।’ তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, এ ঘটনা কারা ঘটাল? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিশ্চুপ থাকেন। রামু উপজেলার অপর্ণাচরণ বৌদ্ধ মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ভিক্ষু অনিল বড়ুয়া মন্দিরে হামলা প্রসঙ্গে বলেন- অপর্ণাচরণ বৌদ্ধ মন্দিরটি আনুমানিক ৬০-৭০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত। আনুমানিক রাত সাড়ে ৭-৮টার দিকে বেশ কিছু লোক অপর্ণাচরণ বৌদ্ধ মন্দিরের পাশের রাস্তায় জড়ো হতে থাকে। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে লোকসংখ্যা বাড়তে থাকে এবং তারা মন্দির ভাঙার ও অগ্নিসংযোগ করার জন্য উদ্যত হয়। রাত আনুমানিক ৯টা/সাড়ে ৯টার দিকে রামু থানায় এবং রামু উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে ঘটনার বিষয়ে জানালেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। পরে রাত আনুমানিক ১২টা/সাড়ে ১২টার দিকে দুর্বৃত্তকারীরা মন্দির ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করার সময় তিনি কয়েকজন পুলিশকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। সম্পূর্ণ ভস্মীভূত রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারে উপস্থিত হলে লক্ষ্য করা যায়- বিহারটি বাংলা ১১১২, ইংরেজি ১৭০৬ সালে স্থাপিত হয়েছিল। এ সময় কথা হয় বিহারে উপস্থিত প্রধান ভান্তে (বড় ভান্তে) সত্যপ্রিয় মহাথেরো, প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু, ছোট ভান্তে প্রমুখের সাথে। তারা জানান- গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৯টার দিকে একটি মিছিল সীমা বিহারের সামনের রাস্তা দিয়ে বাজারের দিকে চলে যায়। মিছিলটি বিহার অতিক্রম করার সময় তারা বিহারের মধ্যে কয়েকটি ইটপাটকেল পড়ার শব্দ শোনেন। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে একজন বড়ুয়ার মাধ্যমে খবর পান যে মিছিলকারীরা সীমা বিহারে হামলা করতে পারে। খবর পাওয়ার পরপরই বিহারে উপস্থিত ভিক্ষুরা বড় ভান্তে সত্যপ্রিয় মহাথেরোকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। ইতোমধ্যে তারা আরো খবর পান যে, রামু উপজেলার কয়েকটি বৌদ্ধবিহারে আগুন দেয়া হয়েছে এবং রাত আনুমানিক ১২টার দিকে বিহারের বিল্ডিংয়ের ওপর থেকে স্থানীয় লাল চিং বৌদ্ধবিহারে আগুনের শিখা অবলোকন করেন। এর পরপরই কয়েকজন দুর্বৃত্তকারী সীমা বিহারের গেটের তালা ভেঙে বিহারে ঢুকে পড়ে। বিহারে ঢুকেই তারা কিছু একটা উপকরণ বিহারের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তৎক্ষণাৎ প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। আগুন যখন দাউদাউ করে জ্বলছিল, তখন হামলাকারীরা বিহারের ভেতরে এবং পাশের ঘরবাড়িতে ভাঙচুর করতে থাকে। আনুমানিক রাত ১টার দিকে রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফোন রিসিভ করলে তাকে ঘটনার ভয়াবহতা অবগত করলে তিনি বলেন, আমি আসছি। এরপর কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও প্রশাসনের কাউকে দেখা যায়নি। রাত বাড়ার সাথে সাথে হামলার মাত্রাও বাড়তে থাকে। রাতের শেষ দিকে হামলাকারীরা বিহার ত্যাগ করলে স্থানীয় জনগণ বিহারে পাশের পুকুর থেকে পানি এনে আগুন নিভিয়ে ফেলে। আগুন নেভানোর পরপরই দমকল বাহিনী ও প্রশাসনের লোকজন সীমা বিহারে উপস্থিত হয়।

উখিয়া উপজেলার পশ্চিম মরিচ্যা দীপংকুর বৌদ্ধবিহারে উপস্থিত হলে লক্ষ্য করা যায়, মন্দিরটিতে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। মন্দিরের ভান্তে বিমল জ্যোতি মহাথের জানান- ‘৩০.৯.১২ তারিখ (রোববার) রাত ৯টায় হাতে লাঠিসোটা নিয়ে কয়েকশ’ লোক মন্দিরের দিকে আসতে থাকে। সে সময় আমিসহ মন্দিরে একজন বুড়ি ছিলেন। লোকজন মন্দিরের দিকে আসতে দেখে আমি নিশ্চিত হই মন্দিরে আক্রমণ করার জন্যই তারা আসছে। আমি ও বুড়ি (মন্দিরের সেবী) মন্দিরের পশ্চিম দিকে দৌড়ে ধানক্ষেতে লুকাই। ওখান থেকেই দেখতে পাই আগুন জ্বলছে মন্দিরে। সারারাত ধানক্ষেতে ছিলাম। ভোরে এসে দেখি মন্দিরের সবকিছু ভাঙচুর করেছে, আগুনে পুড়ে গেছে সবকিছু। মন্দিরের তিন পাশ থেকে হামলাকারীরা আগুন দিয়েছে। মন্দির থেকে দুটি কষ্টিপাথরের দুর্লভ মূর্তি ও দুটি শ্বেতপাথরের মূর্তি নিয়ে গেছে। এছাড়া বড় তিনটি মূর্তির ব্যাপক ক্ষতি করেছে, মূর্তি ভাঙার চেষ্টা করেছে, তারপরও আগুন দিয়েছে। মন্দিরটির পরিচালনা কমিটির সদস্য সাধন বড়ুয়া এ প্রসঙ্গে বলেন- ‘২৯ সেপ্টেম্বর রামুর ঘটনার পরেও প্রশাসন সতর্ক হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিল্পমন্ত্রী সরেজমিন রামু ঘুরে যাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের মন্দিরে হামলা হলো। এটা কীভাবে আমরা বিশ্বাস করব যে, প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিল। পুরো ঘটনাটি বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের ওপর আঘাত। আমরা ন্যায়বিচার পাব না, আশাও করি না। পুলিশ দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করবে না- আমরা নিশ্চিত। রামুর ঘটনার পরও সরকারের সিদ্ধান্তের অভাবে আমরা আক্রান্ত হয়েছি।’

তথ্যানুসন্ধানকালে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের নাগরিক এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের গুরুদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে সকলের মধ্যেই আতঙ্ক লক্ষ্য করা গেছে। নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা এবং অভাবনীয় তাণ্ডব তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাদের ওপর এই আঘাত। অন্যদিকে ২৯ সেপ্টেম্বর ঘটনার পর থেকে উত্তমের অবস্থান কেউ জানে না, না তার পরিবার, না প্রশাসন। সেদিনই ফেসবুকের সূত্র ধরে উত্তমকে দায়ী করে রামু থানায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। উত্তমের খোঁজ না পেয়ে প্রশাসন উত্তমের মা মাধু বড়ুয়া এবং দূর সম্পর্কের মাসি আদি বড়ুয়াকে আটক করে। আমরা সংবাদপত্রের মাধ্যমে এবং কক্সবাজার জেলা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পারি তাদের পুলিশ নিরাপত্তাজনিত কারণে হেফাজতে নিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করেই ১৫ অক্টোবর স্থানীয় সূত্রে জানতে পারলাম, তাদের আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ রিমান্ড প্রার্থনা করেছে এবং আদালত একদিনের রিমান্ড মঞ্জুরও করেছেন। প্রায় পক্ষকাল পরে প্রশাসনের এই পদক্ষেপে হতবাক হতে হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানতে পারি, উত্তম ও তার স্ত্রী পরিবার থেকে আলাদা বসবাস করে। তাঁর মা মাধু ও দুই বোন যাদের মধ্যে একজন প্রতিবন্ধী তাদের নিয়ে তার মা থাকেন তার বাবার বাড়িতে। উত্তমের বাবা চট্টগ্রামে দিনমজুরের কাজ করেন। উত্তম তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন প্রায় পাঁচ বছরের বেশি। উত্তম তার মা এবং বোনদের ভরণপোষণ কিংবা পারিবারিক খোঁজখবর না রাখার জন্য সামাজিক বৈঠকও হয়েছে বারকয়েক। উত্তম তার মা এবং পরিবার থেকে আলাদা বসবাস করেন এটা সকলেই জানতেন। তাহলে প্রশাসন হঠাৎ করে কেন উত্তমের মা শুধু নয় সেখানে বেড়াতে আসা দূর সম্পর্কের মাসি আদিকেও নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়ার নামে উত্তমের নামে দায়েরকৃত মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখালো এটা কারও বোধগম্য নয়। উত্তমের মা-মাসিকে রিমান্ডে নেয়ার ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত হয় তাদের আইনগত সহায়তা প্রদান করার। সেই উদ্দেশ্যে ১৭ অক্টোবর ২০১২ কক্সবাজার ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়। অবশেষে ১৮ অক্টোবর উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় মাধু ও আদি মামলা থেকে মুক্তি লাভ করেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরেজমিন রামু ঘুরে আসার পরেই আমরা লক্ষ্য করেছি, সরকারি পর্যায়ে সহায়তা পরিবারপ্রতি বরাদ্দ যথাযথ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১০২টি পরিবারের মধ্যে ৯৭টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দু’তিনটি পরিবার ছাড়া প্রায় সকলেই সহায়তার পরিমাণ ও পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও পদ্ধতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। বিশেষত রামু কলেজের শিক্ষক ববিতা বড়ুয়া জানান- ‘ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের সকলের ঘরবাড়ির অবস্থা এক ধরনের ছিল না। তাই সহায়তার পরিমাণ এক হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। সাধারণভাবে মনে হতে পারে, ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষয়ক্ষতির ধরন ও মাত্রা ভিন্ন। আর সে কারণে আমি নিজে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ করেছিলাম বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে। কিন্তু প্রশাসন কর্ণপাত করেনি।’ এছাড়া উপাসনালয়গুলোর বিষয়ে প্রশ্ন আছে। কেননা সেখানে অবকাঠামো মূল বিষয় নয় কিংবা অর্থই সব নয়, সেখানে জড়িয়ে থাকে বিশ্বাস, পবিত্রতা আর ঈশ্বরের ছায়া। প্রাচীন ঐতিহাসিক বৌদ্ধ মন্দিরগুলো থেকে লুট হয়ে যাওয়া অমূল্য বুদ্ধমূর্তিগুলো উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে উদ্যোগ নিতেই হবে। অবশ্য ইতোমধ্যে র‌্যাব ও পুলিশ কয়েকটি বুদ্ধমূর্তি উদ্ধার করেছে, এ ধরনের উদ্ধার আশার কথা, তবে প্রায় সবগুলোই যেন পাওয়া যায় সেই বিষয়ে কাজ করতে হবে।

অন্যদিকে সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একে অপরকে দোষারোপ করার যে প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করেছি, তাতে আশঙ্কা- এর ফলে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের যে সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে অনাস্থা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেবে।

দেশের কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে রামু ট্র্যাজেডির রাজনৈতিক খেলা মেনে নেয়া সম্ভব নয়। দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির উদ্যোগ নিতেই হবে। অন্যথায় দায় বর্তাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের ওপরই।

* * *