Bulletin_September_2012
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   ফলোআপ
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন-আদালত
   পাঠক পাতা
   সেমিনার
   পরিসংখ্যান চিত্র
 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

পাঠক পাতা

 

প্রসঙ্গ: সিডও সনদের কার্যকারিতা

সেপ্টেম্বর ২০১২ বুলেটিনের পাঠক পাতায় মোহাম্মদ তরিক উল্লাহর ‘সিডও সনদ শুধুই কি প্রতিশ্রুতি?’ লেখাটির প্রেক্ষিতে সিডও সনদ প্রসঙ্গে কিছু কথা তুলে ধরতে চাই। লেখক তার লেখার শিরোনামকে যথার্থতা দিয়ে প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিকভাবে সিডও সনদ বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার এই লেখা আপাতভাবে আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি করিয়ে দেয়- বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে যে অঙ্গীকারগুলো করেছে বিগত ত্রিশ বছরে তার কতটুকু বাস্তবায়ন করছে বা করতে পারছে? সেক্ষেত্রে এই সনদের কার্যকারিতাই-বা কতটুকু? এ সনদটিকে কি শেষ বিচারে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যকরী একটি দলিল হিসেবে বিবেচনা করা যায়, নাকি এটি নেহাতই পক্ষরাষ্ট্রগুলোর জন্য কিছু প্রতিশ্রুতি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা একটু অন্যভাবে খোঁজার চেষ্টা করতে পারি।

১৯৮২ থেকে ২০১২ এই ত্রিশ বছরে বাংলাদেশ নারীর অবস্থা ও অবস্থানের উন্নয়নে একেবারে মন্দ অবস্থানে আছে তা নয়। সিডওর বিধান অনুসারে দেশে জেন্ডার বৈষম্য বিলোপে বিশেষ ব্যবস্থা, ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে নীতি, আইন, কর্মকৌশল ও বিভিন্ন কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে, নতুনভাবে আরো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এগুলো যে শতভাগ কার্যকর হচ্ছে তা হয়তো সরকারও দাবি করবে না। তবে এগুলো দেশে জেন্ডার বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করছে- এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। নারীর শিক্ষা গ্রহণ থেকে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য-সুরক্ষা থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রায় সবক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম কর্তৃক The Global Gender Gap Report-এ প্রকাশিত বিশ্ব জেন্ডার ব্যবধান সূচক ২০১২-এ উল্লিখিত ১৩৫টি দেশের মধ্যে সাফল্যের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৬তম। সূচকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থান ১০৫, পাকিস্তানের ১৩৪, নেপালের ১২৩। সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় শ্রীলঙ্কার অবস্থান অনেকখানি ওপরের দিকে (৩৯)। সূচকের শীর্ষে আছে নর্ডিক চার দেশ যথাক্রমে আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেন। অপর নর্ডিক রাষ্ট্র ডেনমাকের্র অবস্থান ৭। তালিকায় অষ্টম স্থান পাওয়া ফিলিপাইন এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে যথাক্রমে ২১ ও ২২তম অবস্থানে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো- বাংলাদেশের তুলনায় উন্নত দেশ হয়েও ইন্দোনেশিয়া (৯৭), মালয়েশিয়া (১০০), এমনকি জাপান (১০১), কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের (১০৮) অবস্থান নিচের দিকে। অবশ্য গত বছরের চেয়ে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিম্নগামী- ২০১১তে ১৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৯, ২০১০-এ যা ছিল ৮২। মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে এই জেন্ডার ব্যবধান সূচকে ১৩৫টি দেশের ক্রমতালিকাটি করা হয়েছে। বিষয় চারটি হলো: অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষাগত অর্জন, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম, যাকে একটি অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা গেলেও অন্য তিনটি বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক বেশি দুর্বলতর- অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে এই অবস্থান ১২১, শিক্ষাগত অর্জনের ক্ষেত্রে ১১৮, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষায় ১২৩। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে উল্লিখিত সূচকে বিবেচনা করা হয়েছে আইনসভায় নারী, মন্ত্রিত্বের অবস্থানে নারী, নারী রাষ্ট্রপ্রধান- এই তিনটি মানদণ্ডে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগকে বিবেচনা করা হয়েছে শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ, একই কাজের জন্য মজুরিসমতা, প্রাক্কলিত অর্জিত আয়, আইন প্রণেতা- উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক, পেশাদার ও কারিগরি শ্রমিক/কর্মী- এই পাঁচটি মানদণ্ড অনুসারে। বলাবাহুল্য, এই সূচকটি সমতার প্রশ্নে সার্বিকভাবে জেন্ডার ব্যবধানের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে না বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নির্ভরযোগ্য সংখ্যাগত বা পরিমাণগত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জেন্ডার ব্যবধান নিরসনের প্রশ্নে অগ্রগতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রওয়ারি একটি তুলনামূলক বিবরণ প্রদান করে। তবে দুটি দিক দিয়ে বিশ্ব জেন্ডার ব্যবধান রিপোর্টটি তাৎপর্যপূর্ণ-

এক. ২০০৬ থেকে চালু হওয়া জেন্ডার ব্যবধান সূচকে স্কোরিং পদ্ধতিতে জেন্ডার ব্যবধান দূরীকরণে সাফল্য অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্রের স্কোরিং করা হয়। এতে দেখা যায় জর্জিয়া, হাঙ্গেরি, গায়ানার মতো গুটিকয়েক দেশ বাদে সব দেশেরই ২০০৬-এর চেয়ে ২০১২-এর স্কোর বেড়েছে অর্থাৎ সব দেশেরই জেন্ডার সমতা বাস্তবায়নের বিষয়ে সাফল্য রয়েছে। পুরোপুরি জেন্ডার সমতা বিরাজ করছে এমন রাষ্ট্র নেই। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে জেন্ডার ব্যবধান কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কাছের দেশ ফিলিপাইনের অগ্রগতি কিংবা শ্রীলঙ্কার সাফল্য অন্য দেশগুলোর জন্য উদাহরণ হতে পারে।

দুই. সামগ্রিক অর্থে এই সূচক জেন্ডার ব্যবধানের পরিপূর্ণ চিত্রকে উপস্থাপন না করলেও চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নারী-পুরুষের অবস্থা ও অবস্থানগত ব্যবধানকে নির্দেশ করার মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত দ্রুত পরিমেয় ও সহজসাধ্য মাপকাঠিতে কোনো রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করা সম্ভব। ফলে নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপের লক্ষ্যে গৃহীত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই সূচক রাষ্ট্রকে যেমন এ সংক্রান্ত পরবর্তী কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত ও কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে, তেমনিভাবে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে আরো কার্যকর করার জন্য সচেতন নাগরিকসহ অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এই সূচককে ব্যবহার করতে পারে।

সিডও সনদে অনুস্বাক্ষর কিংবা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্র যখন সনদটির পক্ষরাষ্ট্রে পরিণত হয়, তখন তার ওপর এ সনদের বিধানগুলো বাস্তবায়নের আইনগত বাধ্যবাধকতা অর্পিত হয়। রাষ্ট্র তার এই দায়িত্ব কীভাবে পালন করছে সেটি পরিবীক্ষণ করে জাতিসংঘের সিডও কমিটি। প্রত্যেকটি পক্ষরাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্তির এক বছরের মধ্যে ঐ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি প্রারম্ভিক প্রতিবেদন পেশ করতে হয়। এরপর কমপক্ষে চার বছর পরপর পক্ষরাষ্ট্র নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদন প্রদান করে। প্রারম্ভিক প্রতিবেদনে পক্ষরাষ্ট্র ঐ রাষ্ট্রে নারীর বিদ্যমান অবস্থানকে বিস্তারিত ও বিস্তৃতভাবে (Detailed & Comprehensive) উল্লেখ করে। এরপর দ্বিতীয় ও পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে প্রারম্ভিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উক্ত সময়কার (৪ বছরের) বৈষম্য বিলোপে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ এবং এতে কী কী গুরুত্ববহ উন্নয়ন হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ থাকতে হয়। পাশাপাশি উল্লেখ করতে হয় এ সংক্রান্ত উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য ধারা (Key trends) এবং এ সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো। প্রতিবেদন দাখিল হওয়ার পর প্রাক-অধিবেশন পর্যায়ে সিডও কমিটির পাঁচ সদস্যের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ পক্ষরাষ্ট্রের কাছে প্রতিবেদন, প্রতিবেদন দাখিল বা সিডও লক্ষ্যগুলো নিয়ে প্রশ্ন করেন। পক্ষরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সাধারণত একদিন বা তার বেশি সময় নিয়ে সেসব প্রশ্নের জবাব বা প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ লিখিতভাবে কমিটির অধিবেশনে উপস্থাপন করেন এবং অধিবেশন চলাকালে কমিটির সদস্যদের করা প্রশ্নেরও জবাব দেন। প্রত্যেকটি পক্ষরাষ্ট্রের প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে কমিটি তার সমাপনী বা চূড়ান্ত ভাষ্য প্রদান করে। সমাপনী ভাষ্যে থাকে পক্ষরাষ্ট্র কর্তৃক সনদ বাস্তবায়নে অগ্রগতির ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর ও প্রতিবন্ধকতাগুলো, ইতিবাচক দিক ও উদ্বেগের প্রধান বিষয়গুলো এবং সনদ বাস্তবায়ন বেগবান করার জন্য পরামর্শ ও সুপারিশগুলো। এ বিষয়ে এটি স্পষ্ট যে, সিডও সনদের বিধানগুলো অনুসরণ করে সনদ বাস্তবায়নে যথাযথ ভূমিকা পালন করছে কি-না সে ব্যাপারে প্রত্যেকটি পক্ষরাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে হয়। সিডও কমিটির অধিবেশন চলাকালীন ও প্রাক-অধিবেশন পর্যায়ে বেসরকারি সংস্থাগুলোরও তথ্য প্রদান ও অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও Universal Periodic Review (UPR)-এর মাধ্যমে রাষ্ট্‌্রকে মানবাধিকারের মৌলিক সনদগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতির ব্যাপারে জবাবদিহির বিধিব্যবস্থা চালু হয়েছে। এই ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- এখানে যে কোনো ব্যক্তি চাইলে Individual Complaint আকারে তথ্য ও অভিযোগ মানবাধিকার কাউন্সিলে পেশ করতে পারে। অর্থাৎ এই বিধিব্যবস্থাকে ব্যবহার করে জেন্ডার বৈষম্য বিলোপে আরো দায়িত্বশীল করার সুযোগ সবার জন্যই রয়েছে।

সিডও সনদসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সনদগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে সনদ বাস্তবায়নে পক্ষরাষ্ট্রগুলোর কার্যকারিতার ওপর। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যেহেতু সরকারের, সেক্ষেত্রে সনদ বাস্তবায়নের মূল ভূমিকা সরকারকেই পালন করতে হয়। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র মানে শুধু সরকার নয়, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জনগণ। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সরকারের দায়িত্ব পালন অর্থহীন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অসম্ভব। জনগণকে সম্পৃক্ত করা ও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে সরকারের হলেও মনে রাখতে হবে, কাজটি বেশ কঠিন এবং যৌক্তিকভাবেই সময়সাপেক্ষ। এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি জনগণের সচেতন ও সক্রিয় একটি অংশকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হয়। এই ক্ষেত্রটি যত বেশি বিস্তৃত হবে সরকারের দায়িত্ব পালন তত বেশি সহজ হবে, লক্ষ্যে পৌঁছানো ততই ত্বরান্বিত হবে। এ জন্য সিডও সনদের লক্ষ্য অর্জনে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান সবাইকেই আরো দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

এ.কে.এম. বুলবুল আহমেদ
কর্মসূচী কর্মকর্তা (আইন)
এএলআরডি


তথ্যসূত্র
১. http://www.un.org/womenwatch/daw/cedaw/NGO_In-formation_note_CEDAW.
২. CEDAW report 9 Dec 09 FINAL http://www.mowca.gov.bd/ ?page_id=285


৪০ বছর পরেও স্বীকৃতি পায়নি নারী মুক্তিযোদ্ধারা

১.
এপ্রিলের শেষ থেকে শুরু করে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত চার দফায় ইন্ডিয়া গিয়েছি নৌকা নিয়ে অস্ত্র আনার জন্য। নদীতে গানবোট নিয়ে পাকিস্তানি আর্মি টহল দিত। এরই মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা করে ভারতে যেতাম অস্ত্র আনতে। লিস্ট থাকত আমার কাছে। একবার ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি। যেহেতু অস্ত্রের লিস্ট আমার কাছে ছিল, মাথায় শুধু এটাই ছিল যে কোনোমতেই ওদের কাছে লিস্ট যাওয়া চলবে না। নৌকা থেকে নেমে গ্রামের ভেতর দৌড়েছি। কতক্ষণ দৌড়েছিলাম মনে নেই। যখন মনে হলো ওরা (পাকিস্তানি আর্মি) আর নাগাল পাবে না, তখন মনে পড়লো নৌকার পাশে ফেলে রেখে এসেছি আমার স্বামীকে (সহযোদ্ধা), ওদের ঠেকানোর জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, যুদ্ধের পরে যখন অস্ত্র জমা দেয়ার সময় এলো তখন আমার মুক্তিযোদ্ধা স্বামী যিনি আমার সহযোদ্ধা ছিলেন, তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমার অস্ত্র জমা দিতে যাওয়ার দরকার নেই, তোমার অস্ত্র আমি জমা দিয়ে দিচ্ছি।’ কারণ তিনি ও তার পরিবার চায়নি, আমার যুদ্ধে যাওয়ার কথা জানাজানি হয়ে যাক। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করেছি, স্বামীর এমন কথা মেনে নিতে পারিনি, তার কথা অগ্রাহ্য করেই আমার অস্ত্র আমি নিজে জমা দিয়েছি। আর তাই নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার নাম মুক্তিযোদ্ধা লিস্টে উঠেছে। আমার এই পরিচিতি পাওয়ার জন্য আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে আমার পরিবারের সাথে, সমাজের সাথে। কিন্তু এমন অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে যারা আজও আড়ালে রয়ে গেছেন। এভাবেই মুক্তিযোদ্ধা নারীর প্রতি পরিবার, সহযোদ্ধা, বন্ধুর মনোভাবের বর্ণনা দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা আমিনা বেগম।

২.
সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে পায়ে গুলি খেয়ে পড়ে যাই। যখন বুঝতে পেরেছি ধরা পড়ে যাব, শেষ গ্রেনেডটা ছুড়ে মারি পাকিস্তানিদের দিকে। দু’জন পাকিস্তানি আর্মি মারা যায় সেই মুহূর্তে। কিন্তু নারী বলে ওরা আমাকে মেরে ফেলেনি। নিয়ে যায় ক্যাম্পে। চার মাস অমানুষিক নির্যাতন করে ক্যাম্পে রেখে। হঠাৎ একদিন শুনলাম দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু যখন বাড়ি ফিরি আমার পরিবার আমাকে গ্রহণ করেনি। সমাজ থেকে শুনতে হয়েছে নানা ধরনের কটাক্ষ। তখন থেকে সংগ্রাম করে যাচ্ছি, আজও সংগ্রাম করছি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও শুধু নারী হওয়ার কারণে পাইনি মুক্তিযোদ্ধার সম্মান বরং পদে পদে হয়েছি বঞ্চিত, লাঞ্ছিত। এভাবেই সমাজ কীভাবে নারী মুক্তিযোদ্ধাকে বঞ্চিত করেছে তার বর্ণনা করেন মুক্তিযোদ্ধা হালিমা বেগম। এ তো মাত্র দু’জন নারী মুক্তিযোদ্ধার কথা, এরকম আরো নারী মুক্তিযোদ্ধা ৪০ বছর ধরে বঞ্চিত হয়ে আসছেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে। যে কোনো দেশের জন্য এটা খুবই দুঃখজনক যে, সেই দেশের স্বাধীনতা অর্জনকারী মুক্তিযোদ্ধারা বছরের পর বছর বঞ্চিত হয়ে আসছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ছিল লাখো নারীর নানামুখী অংশগ্রহণ। যে নারী অন্ধকারে ভাত রেঁধে মুক্তিযোদ্ধাদের খাইয়েছে কিংবা যে নারী ওষুধ সরবরাহ করে, নার্সিং করে তাদের সুস্থ করেছে, যে নারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সরবরাহ করেছে, অস্ত্র সরবরাহ করেছে, এদের কারও অবদানই কি সম্মুখ যুদ্ধের তুলনায় কম? তাদের এই অংশগ্রহণ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা বা সম্মুখযুদ্ধ কীভাবে সম্ভব হতো? কিন্তু সেই নারীর অংশগ্রহণের কোনো স্বীকৃতিই কি আমরা আমাদের ইতিহাসে দেখতে পাই? একটি জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধের আংশিক বা বিকৃত ইতিহাস দিয়ে কোনো জাতির সমৃদ্ধি আদৌ সম্ভব কি? এবার একটু পাঠ্যবইয়ের দিকে ফেরা যাক। আমাদের ন্যাশনাল কারিকুলাম বইয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত রয়েছে পর্যায়ক্রমে ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠের ইতিহাস। আবার পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নামে একটি অধ্যায় রয়েছে। ক্লাস ফোরের বাংলা বইয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নামে রয়েছে একটি ছোট গল্প। কিন্তু এখানে কোথাও মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ তো নেই-ই বরং যে ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে, সেটাতেও রয়েছে রাজনীতিকরণ। প্রতি ৫ বছর পরপর পরিবর্তন হয় আমাদের পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে পাঁচ বছর পরপর শুরু হয় দুই বড় দলের কাড়াকাড়ি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে স্বাধীনতার ঘোষক এবং যুদ্ধে তার অবদানের কথা আলোচনা হয় প্রায় দুই পৃষ্ঠাজুড়ে। বাকি এক-দেড় পৃষ্ঠায় অন্যান্য ইতিহাস। আবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে পাঠ্যপুস্তকে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের বক্তব্য ছাড়া অন্য সকল অংশ বাদ হয়ে যায় এবং একই সাথে স্বাধীনতার ঘোষক হয়ে যান মেজর জিয়াউর রহমান, সে সময় যিনি একজন ঊর্ধ্বতন সৈনিক ছিলেন মাত্র। সুতরাং একই শিশু দুই সরকারের আমলে দুই ধরনের ইতিহাস পড়ছে। ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে হচ্ছে। অন্যদিকে পাঠ্যবইয়ে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা এবং যুদ্ধে নারীর অবদানের কথা উল্লিখিত নেই বলে ছোটবেলা থেকেই তার ধারণা তৈরি হচ্ছে নারী দুর্বল, মুক্তিযুদ্ধে তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই শুধু নির্যাতিত হওয়া ছাড়া। সেটাও বর্ণিত হয়েছে খুবই অসম্মানজনকভাবে। ইতিহাস বিভাগের অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে পুরো একটি সাবজেক্ট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থাকলেও, সেখানে কোথাও মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ এবং অবদানের কথা উল্লেখ নেই। যেসব রেফারেন্স বই দেয়া হয়েছে সেগুলোও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নয়। সুতরাং আমাদের শিক্ষাজীবনে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান সম্পর্কে জানার কোনো ব্যবস্থাই নেই। কেবল যদি কোনো শিক্ষার্থী বা কোনো ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে জানতে চায় তাহলে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কিছু লেখকের লেখা বই থেকে জানতে পারে। সেই বইগুলোও সহজলভ্য নয়। একজন নারী মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে এই লেখা শেষ করতে চাই। মুক্তিযোদ্ধা রাবেয়া। তার বাড়ির সামনেই ছিল ব্রিজ। কাজ করতেন পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে। ক্যাম্পের বিভিন্ন তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাচার করতেন। বাড়ির সামনের ব্রিজটি নিজের হাতে বোমা পেতে ভেঙে ফেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়ক হিসেবে তাকে তখন দেখে ফেলে রাজাকাররা।

এরপর তার বাড়িতে আসে পাকিস্তানি আর্মি। দৌড়ে পালাতে গিয়ে পায়ে গুলি খান। তারপর স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন। আজও তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটেন। ভারতের ক্যাম্পে গিয়ে নাম লেখাননি বলে মুক্তিযোদ্ধার খাতায় তার নাম নেই, নাম হয়েছে বীরাঙ্গনা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পাতা কুড়ান। তা হাটে বিক্রি করে দিনযাপন করেন। আর মাঝে মধ্যেই লোকমুখে শুনতে পান ‘পাকিস্তানির বউ’ সম্বোধন। এই তার স্বীকৃতি। স্বাধীনতার ৪১ বছর পেরিয়ে গেল, আজও অধিকাংশ নারী মুক্তিযোদ্ধার অবস্থা রাবেয়ার মতো। কেউবা দিন গুনছেন শেষ যাত্রার। কেউ কেউ চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। বর্তমান সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। পূর্বে যারা সরাসরি অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে, তাদেরই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির কথা উল্লিখিত ছিল। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ‘যেসব নারী সরাসরি, স্পাইং, নার্সিং’ করেছেন তাদের নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা ঘোষণা দেন। তাদের নাম লিপিবদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে ঘোষণা দেন যে, যেসব নারী যুদ্ধের সময় সরাসরি বা নার্সিং বা স্পাইং বা রান্না করে যুদ্ধে সাহায্য করেছেন, তাদের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদে যোগাযোগ করতে হবে এবং তারা যে যুদ্ধ করেছেন তার সাক্ষীসহ সেটা তাকে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু গরিব মুক্তিযোদ্ধার বাসায় টেলিভিশন নেই বা তারা পত্রিকা পড়েন না। তাদের কাছে এই ঘোষণা পৌঁছানোর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাহলে তিনি কীভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দরখাস্ত করবেন। আবার যিনি এক স্থানে যুদ্ধ করেছেন, পরবর্তী সময়ে অন্য স্থানে চলে এসেছেন বা তার সহযোদ্ধারা মারা গেছেন বা তিনি জানেন না তার সহযোদ্ধারা কোথায়- তিনি কীভাবে প্রমাণ করবেন যে, তিনি মুক্তিযোদ্ধা? তাই শুধু উদ্যোগ গ্রহণ করলেই চলবে না, তার বাস্তবায়নের দিকটি নিয়েও ভাবতে হবে সরকারকে।

মোশফেক আরা
নারী আন্দোলন কর্মী



চেঞ্জ মেকারদের পারিবারিক নির্যাতন ঠেকানোর অঙ্গীকার

 

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)সহ অন্যান্য মানবাধিকার এবং নারী অধিকার সংস্থার সর্বাত্মক চেষ্টায় দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলন এবং দাবির ফসল হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০। আইনটি পাসের পর দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও সরকার এর বাস্তবায়নের জন্য বিধিমালা প্রস্তুত করতে পারেনি। শহর এবং গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ এখনো আইনটি সম্পর্কে অবগত নয়। ‘আমরাই পারি’ নামক সংগঠনের আওতায় পারিবারিক নির্যাতন না করা ও ঠেকানোর অঙ্গীকার করে সামাজিক প্রচারাভিযানে অংশ নেয়া চেঞ্জ মেকাররা পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধের গুরুত্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। ‘আমরাই পারি’-এর ওয়েবসাইটে ২০১১ সালের জুন মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের ১০ লাখের বেশি মানুষ পারিবারিক নির্যাতন করবেন না বলে দেশের ৫৫টি জেলায় তাদের নাম নিবন্ধনের মাধ্যমে অঙ্গীকার করেছেন। চোখের সামনে এ ধরনের নির্যাতন দেখলে তারা মেনে নেবেন না। অন্যদেরও এ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করবেন। এ অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষগুলো ‘চেঞ্জ মেকার’ নামে পরিচিত। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের উদ্যেগে ‘আমরাই পারি’ নামে সামাজিক প্রচারাভিযানে যুক্ত হয়েছেন চেঞ্জ মেকাররা। ২০০৪ সালে অক্সফামের সহায়তায় এ প্রচারাভিযানের সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশেই। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের মোট ১৫টি দেশে এটি চলছে। যে কেউ যে কোনো সময় থেকে নিজেকে চেঞ্জ মেকার হিসেবে ভাবতে পারেন। তবে শর্ত হলো, তার মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনকে চ্যালেঞ্জ করার ইচ্ছা বা মনোবল থাকতে হবে। কাজের দায়বদ্ধতা বাড়ানো এবং পরিসংখ্যান রাখার সুবিধার জন্য এলাকার স্থানীয় সংগঠনের কাছে গিয়ে চেঞ্জ মেকার হিসেবে নাম লেখাতে হয়। এর আওতায় সব কাজ করতে হয় সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। এক ব্যক্তিকে চেঞ্জ মেকার হওয়ার পর তিনি কমপক্ষে ১০ জনের সঙ্গে পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কথা বলবেন বলে অঙ্গীকার করতে হয়। তবে গত বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন চেঞ্জ মেকার গড়ে ৬৪ জনের সঙ্গে কথা বলেন। নেপালে ৩৯ জন, ভারতে ২৬ জন, পাকিস্তানে ১৯ জন এবং শ্রীলঙ্কার চেঞ্জ মেকাররা ২৬ জনের সঙ্গে কথা বলেন। জরিপ অনুযায়ী চেঞ্জ মেকারদের কথা শোনার পর বাংলাদেশের শতকরা ৬৯ ভাগ মানুষই তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়েছে। এটিও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। ২০০৯ সালে পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) করা এক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের ৯৩ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার। ৯১ শতাংশ অর্থনৈতিক এবং ৮৪ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনের শিকার। ১৩ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন। গবেষণায় উল্লিখিত নারীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং সাথে সাথে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ততার বিষয়টি উদ্বেগজনক।

‘আমরাই পারি’ প্রচারাভিযানের পক্ষ থেকে দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৯ জন। স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ১৯০ জন। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন ২২ জন এবং খুন হয়েছেন ৪৯ জন। উপরিউক্ত গবেষণা ও পরিসংখ্যানের আলোকে এটা অনুধাবন করা সহজ যে, চেঞ্জ মেকারদের প্রচারাভিযান এবং অঙ্গীকার পারিবারিক ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে প্রতিরোধ জোটের জাতীয় কমিটির চেয়ারপারসন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমরাই পারি’ বা বিভিন্ন সংগঠন কাজ করার ফলে দেশে নারী নির্যাতন কমে গেছে তা বলার মতো পরিস্থিতি এখনো আসিনি। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির ফলে নারীরা মুখ খুলছেন। ২০ বা ২৫ বছর ধরে নির্যাতনের শিকার নারীরাও আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রে আসছেন। আসক-এর নির্বাহী পরিচালক আরো বলেন, ‘আমরাই পারি’ প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনেকে বুঝতে পারছেন যে এই নির্যাতনগুলো নিয়ে কথা বলা যায়। গত আট বছরে ১০ লাখ চেঞ্জ মেকার তৈরি হওয়া অবশ্যই বড় একটি অর্জন বলে মন্তব্য করেন তিনি। ‘আমরাই পারি’র ওয়েব সূত্র অনুযায়ী এ প্রচারাভিযানে ৪৮টি জেলায় ৩৯টি বেসরকারি সংগঠন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছে। এ সংগঠনগুলোতে মাসে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন ভুক্তভোগী পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কথা বলতে আসছেন। শুরুতে মাত্র ছয়টি সংগঠন ও সাতটি জেলায় প্রচারাভিযানটি শুরু হয়। বর্তমানে দেশের প্রায় ৫০০টি স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে আন্দোলনটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। এখন ৫৫ জেলার ৪৭২ উপজেলার ২৩৮৪টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ডের ১৬৬৬৬টি গ্রামে চেঞ্জ মেকাররা পারিবারিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। চেঞ্জ মেকারদের প্রায় অর্ধেকেরই বয়স ১৪-২৫ বছর। তাছাড়া কর্মসূচিতে পুরুষের অংশগ্রহণ প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ। এ ধরনের প্রচারাভিযানের গুরুত্ব প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, একজন নারী যদি সারাক্ষণ স্বামী বা তার পরিবারের অন্যদের হাতে মার খাওয়ার ভয়ে থাকেন, তাহলে তার জন্য ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। এ প্রচারাভিযানে যুক্ত হয়ে নারীরা এ আত্মবিশ্বাস অর্জন করছেন যে, তার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কেউ করতে পারবে না। ওই নারী এই আত্মবিশ্বাস অন্যান্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করতে পারছেন। শুধু সরকার আইন বা নীতি করে অবস্থার পরিবর্তন করে দেবে তা নয়। ‘আমরাই পারি’ কর্মসূচিতে প্রত্যেকের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাই এ প্রচারাভিযান অব্যাহতভাবে চলতে হবে। সর্বোপরি এ কথা বলা অনস্বীকার্য যে, চেঞ্জ মেকাররা পারিবারিক পর্যায়ে নারী নির্যাতন বন্ধে যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা প্রশংসার দাবিদার। তবে এ মহতী উদ্যোগের অনেক বেশি প্রচার বা প্রসার আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া একটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য আইনি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারকে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০-এর বিধিমালা প্রস্তুতকরণ এবং সাথে সাথে আইনটির সুফল নিশ্চিত করার জন্য সকল প্রকার জটিলতা নিরসনে আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। তবেই আমরা একটি নির্যাতনমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

তথ্যসূত্র
১. গেজেট পারিবারিক সহিংসতা ( প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০
২. প্রথম আলো
৩. সিপিডি প্রতিবেদন ২০০৯
৪. www.wecanendvaw.org


মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত
মানবাধিকার কর্মী

* * *