Bulletin_September_2012
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   ফলোআপ
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন-আদালত
   পাঠক পাতা
   সেমিনার
   পরিসংখ্যান চিত্র
 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

সেমিনার

ভুটানে সার্ক ল’ সেমিনার

 

বিগত বছরগুলোর মতো এবারও ২৪ ও ২৫ আগস্ট ২০১২ ‘সার্ক ল’ আয়োজন করেছিল আন্তর্জাতিক সেমিনার। ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে অনুষ্ঠিত সেই সেমিনারে অংশ নিয়েছিল সার্কভুক্ত দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। মানবাধিকার বলবৎ করার মাধ্যমে অধিকারবঞ্চিত জনগণের জন্য ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত সেমিনারে অংশ নিয়েছিলেন ভুটানের প্রধান বিচারপতি সোনাম তবগাই, ভারতের সাবেক বিচারপতি উমেশ সি ব্যানার্জি, ড. রনবির সিং, পাকিস্তানের বিশিষ্ট আইনজীবী মাহমুদ ওয়াই মানদভিওয়ালা, বাংলাদেশের বিশিষ্ট সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও সিনিয়র আইনজীবী বাসেত মজুমদারসহ প্রমুখ। বিশিষ্ট আইনজ্ঞদের এই মিলনমেলায় আমন্ত্রিত ছিলেন সার্ক (SAARC) দেশগুলোর নবীন আইনজীবী ও আইনের ছাত্রছাত্রীরাও। নবীন আইনজীবী ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান সার্কভুক্ত দেশগুলোর নিকট তুলে ধরি আমিসহ আরও তিনজন অ্যাডভোকেট ইয়াদনান রফিক রসি, অ্যাডভোকেট শারমিন আক্তার ও তারিফুল ইসলাম।

থিম্পুর হোটেল তাজে অনুষ্ঠিত দু’দিনব্যাপী এই সেমিনারে এবারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল Securing access to Justice in the Enforcement of Human Rights. তারই আলোকে সেমিনারের মোট তিনটি সেশনে বিভক্ত করা হয়। প্রথম সেশনে আলোচিত হয়, Identifying Pathways and Barriers for Disadvantaged People to Access Justice and Enforce Rule of Law. এই বিষয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ দেশের অবস্থান, সমস্যা ও সমাধানের পথগুলো সেমিনারে তুলে ধরেন। এই বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন আইনজীবী মো. ইয়াদনান রফিক রসি। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে আইনের শাসন অর্থহীন। তিনি আরও বলেন, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত, যা গণতান্ত্রিক উন্নতিকে ত্বরান্বিত করে। ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক ক্ষমতায়ন। ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূরীকরণের জন্য যা প্রয়োজন তা হলো জনসাধারণের আইনি সচেতনতা, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আইনগত সহায়তা, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। ভুটানের বিচারপতি খান্দা ভুটানের জনগণের অবস্থা দুর্গতির কথা উল্লেখ করে বলেন, আদালতে আসার জন্য তাদের কয়েক দিন ধরে হেঁটে আসতে হয়ে। এছাড়া তাদের অশিক্ষা ও আইনি অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা।

ভারতের ড. রণবীর সিং তাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ ব্যাখ্যা করে বলেন, আদালতে যাওয়ার অধিকার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। নেপালের বিচারপতি কল্যাণ শ্রেষ্ঠ অবশ্য আইনি সহায়তাকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বিশ্বের অধিকাংশ দরিদ্র মানুষের বসবাস। তাদের আইনি সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণবিধি প্রণয়ন করার বিষয়ে তিনি আলোকপাত করেন।

পাকিস্তানের বিশিষ্ট আইনজীবী মেহমুদ মানদাভিওয়ালা বিচার বিভাগীয় দুর্নীতি ও বিচার বিভাগের অবারিত ক্ষমতাকে Judicial terrorism বলে আখ্যা দেন। ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ভূমিকা অনস্বীকার্য বলে মনে করেন।

সেমিনারের দ্বিতীয় সেশনটির আলোচ্য বিষয় ছিল Specific Justice needs of Under-Privilege People : Legal Services and Legal Aid interventions. এই সেশনে ভুটানের বিচারক জাংচুক নরবু (Jangchuk Norbu) তার দেশের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ভুটানের ২৩. ৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। সুতরাং তাদের দেশে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কোর্ট ফি মওকুফ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন এবং তিনি আরও জানান, যদি রাষ্ট্র এ বিষয়ে ব্যর্থ হয় তাহলে বিষয়টিকে আমলে নিয়ে বিচার বিভাগের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে পাকিস্তানের বিশিষ্ট আইনজীবী আলী জাফর পাকিস্তানের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তার অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আইনগত সহায়তা প্রদান করা আইনজীবীর আইনগত দায়িত্ব। তিনি আরো বলেন, উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষ আইনগত সহায়তা-প্রত্যাশী। তাই এসব দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সকল আইনজীবী ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের শিক্ষানবিশ আইনজীবী তারিফুল ইসলাম বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ উল্লেখ করে বলেন, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন দরিদ্র মানুষ যখন আইনগত সহায়তা বা প্রতিনিধিত্ব পেতে ব্যর্থ হয়, তখন তার মৌলিক অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাস্তবে আইনগত সহায়তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা। আইনগত সহায়তা প্রদানকারীদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন।

সেমিনারের শেষ সেশনের আলোচ্য বিষয় ছিল Poverty, Patriarchy and Women’s Vulnerability to HIV/AIDS, vulnerable and the Marginalized. উক্ত সেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম। সার্কভুক্ত দেশগুলো ছাড়াও ইউ.এন.ডি.পি (UNDP) ও ইউএনএইডস্‌ (UNAIDS)-এর মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকর্তারা আলোচ্য বিষয়ের ওপর বক্তব্য রাখেন।

এই সেশনে বাংলাদেশের এইডস আক্রান্ত নারীদের প্রতি বৈষম্যের সমালোচনা করে এজন্য এ দেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে দায়ী করেন অ্যাডভোকেট শারমিন আক্তার শিউলি। শিক্ষা, সম্পত্তি, শ্রম ও আর্থিক সেবা বা ঋণপ্রাপ্তি প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি সমাজের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই এইডস আক্রান্ত নারীদের দুর্দশার মূল কারণ। সেমিনারে শারমিন আক্তারের সাথে একমত হয়ে আমি আরও কিছু বিষয় উপস্থাপন করি। এন.জি.ওদের সাথে দেশের সরকারের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আইনি সহায়তাসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে আমার মতামত প্রদান করি।

সেমিনার শেষে সকল দেশের প্রতিনিধিদের প্রচেষ্টায় একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয় এবং সে অনুযায়ী সম্মিলিতভাবে পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নিম্নে বর্ণিত কর্মকাণ্ড যৌথভাবে পরিচালনা করার ঘোষণা দেয়া হয়।

সার্ক ল’ এখন থেকে নিম্নলিখিত থিম্পু ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ
বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান বাস্তবায়নের জন্য কোর্টকে স্বপ্রণোদিত (Suo Moto) আদেশ জারির ব্যবস্থা প্রদান করা। এমনকি পেশাদারি আইনি সহায়তা ছাড়াও ন্যায়বিচার সম্পৃক্ত মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করা।

প্রবীণ আইনজীবীদের বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য উৎসাহিত করতে হবে, তাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে বিচারকদের পাশে দাঁড়িয়ে দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্তদের প্রতিকার লাভে সহায়তা দিতে উৎসাহিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগগুলোতে ‘Legal Aid Clinic’ চালু করতে হবে, সিনিয়র ছাত্রছাত্রীদের বাধ্যতামূলকভাবে আইনি সহায়তায় কাজ করতে হবে, যাতে দরিদ্র এবং দুর্দশাগ্রস্ত/ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করা হবে। এর মাধ্যমে পেশাগত সদাচারী, নাগরিকত্ব ও সামাজিক বোধসম্পন্ন নবীন আইনজীবীর এক প্রজন্ম উদ্ভব ঘটবে।

প্রত্যেকটি দেশের বার কাউন্সিল এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দিতে হবে।

সুশীল সমাজ ও ছাত্র সংগঠনগুলোকে প্রচারণামূলক অভিযান পরিচালনা করার জন্য কার্যকরী সহায়তা প্রদান করতে হবে। যাতে সাধারণ জনগণ জানতে পারে তাদের অধিকার কী এবং কী কী আইনি সহায়তা তাদের প্রাপ্য। প্রগতিশীল নতুন এক পদ্ধতি তৈরি করতে হবে যা কার্যকরভাবে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বাস্তবায়ন করে।

এমন একটি আইনি পরিবেশ গঠনের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে, যা নারী অধিকার উন্নয়ন এবং সংরক্ষণ করে এবং যা এইচআইভি আক্রান্ত মহিলাদের আইনগত সুরক্ষা প্রদান ও উন্নয়ন সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে। সে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবামূলক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের অধিকার লঙ্ঘন থেকে তাদের রক্ষা করতে হবে।

কানিজ ফাতেমা
শিক্ষানবিশ আইনজীবী ও সহকারী গবেষক এল.এস.টি.বি.

* * *