Bulletin_September_2012
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   ফলোআপ
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন-আদালত
   পাঠক পাতা
   সেমিনার
   পরিসংখ্যান চিত্র
 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

প্রচ্ছদ-কাহিনী

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে জবানবন্দি


-সুলতানা কামাল

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেন সুলতানা কামাল। গত ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর এই জবানবন্দি গ্রহণ করেন বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-১। তারপর আসামি পক্ষের আইনজীবীর জেরা চলে আরো দু’দিন। আমরা এখানে সুলতানা কামালের জবানবন্দির অংশটুকু পত্রস্থ করছি, যেখানে তিনি গোলাম আযমের মানবতাবিরোধী অপরাধের নানা দিক অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন। আমরা আশা করি, একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে পাঠকমনে যে অস্পষ্টতা রয়েছে, তা দূর করতে এ জবানবন্দি সহায়ক হবে।


১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ঘটনা যদি বলতে হয় তাহলে আমাকে পারিবারিক পরিস্থিতির কথা একটু উল্লেখ করতে হবে। এটা হয়তো সবারই জানা যে, আমার মা সুফিয়া কামাল সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। তার ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে, সেসব বিষয় আমরা খুব কাছে থেকে আগ্রহের সাথে লক্ষ্য করে যাচ্ছিলাম। আমার মা ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম পরিষদ বলে একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, যারা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছিল মূলধারার রাজনীতির আন্দোলনের সাথে। তার ফলে নির্বাচনের ফলাফল, সংসদ বসা না বসা ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত গভীর আগ্রহ ছিল এবং মার্চ মাসে যখন থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাতে আমরা সাংগঠনিকভাবে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেই সময়ে যেসব সভা, সমিতি ও সমাবেশ হচ্ছিল তাতে অংশগ্রহণ করেছি সক্রিয়ভাবে। ৭ মার্চের তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায়ও উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণ করেছি এবং ‘আমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, আমাদের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই বাণীতে উজ্জীবিত হয়েছি। এরপরই বিভিন্ন ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল, যেখানে একদিকে ইয়াহিয়া খান গোলটেবিল বৈঠক ডেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনার ভান করে যাচ্ছিলেন, অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক কর্মী কিংবা বাঙালি জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর নানা রকম হামলাও চালানো হচ্ছিল। এভাবেই চলছিল অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত ১২টার দিকে আমার ভগ্নিপতি চট্টগ্রাম থেকে টেলিফোনে জানতে চান যে, ঢাকার অবস্থা কেমন এবং শুধু এটুকুই বলতে পারেন যে, অবস্থা ভালো নয়। একথা বলার পরপরই টেলিফোনের লাইন কেটে যায়। একই সঙ্গে আমরা গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমার মা-বাবার বাড়ি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রাস্তায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে সেই সময় ৪-৫টি বাড়ির ব্যবধানে ছিল। আমরা মেশিনগান এবং কামানের গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই এবং সেই সময় পিলখানা থেকেও আমরা পাল্টাপাল্টি গুলির শব্দ শুনতে পাই। একদিক থেকে রাইফেলের গুলির শব্দ এবং অন্য প্রান্ত থেকে কামানের গোলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যেও একটি ভীতির সঞ্চার হয়। আমার মা এবং বাবাকে যেহেতু স্থানীয়রা মুরব্বি শ্রেণির মনে করতেন, তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকেন- কী হয়েছে। আমাদের পাশের দোতলা বাড়ির একজন জানালেন যে, তাদের বাড়ির ছাদ থেকে কোনাকুনিভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আগুনের হলকা দেখা যাচ্ছে। আমাদের বাড়ির সামনে একটি নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে একটি কালো পতাকা উড়ছিল এবং সেই বাড়ির দারোয়ানকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। আমাদের বাড়ির সামনে লেকের ওপর একটি ব্রিজ আছে ও ঐ ব্রিজের ওপর দিয়ে মানুষের দৌড়াদৌড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছিল এবং ঐ ব্রিজের ওপর একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। পরে জানতে পারি, সে স্থানীয়ভাবে পরিচিত পানাউল্লা সাহেবের ছেলে, সম্ভবত তার নাম খোকন। খোকনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর আমরা এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ শুনতে পাই, যা রাতভর চলছিল। পিলখানার গোলাগুলির শব্দ স্পষ্ট মনে আছে ২৭ মার্চ ভোর পর্যন্ত চলছিল। ইতোমধ্যে প্রচার করা হয় যে, কারফিউ দেয়া হয়েছে, ঘর থেকে কেউ বের হবে না। ২৭ মার্চ কিছু সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। আমরা তখন রাস্তায় বের হয়ে জানার চেষ্টা করি- কী হয়েছে। আমাদের বাড়িতে তখন কিছু লোকের সমাগম হতে শুরু করে, যাদের মধ্যে সাংবাদিক এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মীও ছিলেন। তারা জানালেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সাংঘাতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। প্রফেসর মনিরুজ্জামান, ড. জি সি দেব নিহত হয়েছেন, ড. জোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে গুলি করা হয়েছে, তিনি আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন এবং অনেক শিক্ষক পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ তাদের হত্যা করার জন্য খোঁজা হচ্ছে। জগন্নাথ হলে দফায় দফায় ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ইকবাল হলে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। মধুর ক্যান্টিনের মধুদার পরিবারের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে, ওই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। রোকেয়া হলের ধোপা বাসুদেব, তাকেও তার পরিবারসহ হত্যা করা হয়েছে। রোকেয়া হলেও সেনাবাহিনী প্রবেশ করেছে। হাটখোলা অঞ্চল থেকে প্রয়াত সাংবাদিক শাহাদাত চৌধুরী জানান যে, ইত্তেফাক অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে এবং অফিসের সামনে এলোপাতাড়ি গোলাগুলি করে অনেক লোককে হত্যা করা হয়েছে। আমরা একটি ছবি অনেক সময় দেখি, রিকশার ওপর রিকশাওয়ালা এবং এক যাত্রী একত্রে নিহত হয়ে পড়ে আছে। সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার সংবাদ পাঠালেন যে, সংবাদ অফিসেও আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার ভেতরে কবি ও সাংবাদিক শহীদ সাবের জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এরকম বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে থাকে যে, আগুন লাগানো হয়েছে, হত্যাকাণ্ড হয়েছে এবং মানুষ যত্রতত্র লাশ হয়ে পড়ে আছে।

নারায়ণগঞ্জে আমাদের এক আত্মীয় সাত্তার জুটমিলে ছিলেন। তারাও জানালেন যে, সেখানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং একটি বাড়ির ঘরে মশারির ভেতর শায়িত মা ও শিশুকে একই সঙ্গে হত্যা করা হয়েছে। আস্তে আস্তে আমরা জানতে পারলাম যে, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, রাজশাহী সর্বত্রই একই ধরনের হত্যাকাণ্ড চলছে এবং পুলিশের তৎকালীন বড় কর্মকর্তা মামুন মাহমুদ রাজশাহীতে ছিলেন, তাকেও হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় কর্মরত বাঙালি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আমরা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম যে, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে যে লেক আছে সেই লেকের অপর পাড়ে যে ধানমণ্ডি গার্লস হাইস্কুল, এর সামনে তখন কোনো বাড়ি ছিল না, সেই গার্লস স্কুলের ছাদে মেশিনগান ফিট করা হচ্ছিল এবং লেকের পাড়েও মেশিনগান নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী অবস্থান নিচ্ছিল। অর্থাৎ ২৫ মার্চের সন্ধ্যা থেকেই তাদের এই আক্রমণের প্রস্তুতি চলছিল।

২৭ মার্চ সকালবেলায় যখন আমরা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই, আমি নিজে দেখেছি বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে মালামাল নিয়ে ট্রাকে তুলছে। কারফিউ যখন আবার দেয়া হয় তখন আমরা ঘরে ফিরে আসি। বিবিসি এবং অন্যান্য রেডিও থেকে শুনতে পাই যে, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে অপারেশন সার্চলাইট নামে একটি হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছে, যা গণহত্যার শামিল। লাখ লাখ লোক নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে এখান থেকে সেখানে, এ-গ্রাম থেকে ও-গ্রামে পালিয়ে বেড়াচ্ছে এবং সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে। সেখানে ৮০ বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে শুরু করে নবজাত শিশুকে কোলে নিয়ে মা পর্যন্ত দৌড়াচ্ছে। অর্থাৎ কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ, যুবক, সবল কিংবা অসমর্থ মানুষ চরম অনিরাপত্তাবোধ নিয়ে প্রাণভয়ে শুধু প্রাণটুকু রক্ষা করার জন্য এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছিল। আমাদের মতে, এটা মানবতার চরম অবমাননা এবং মানবাধিকারের নিকৃষ্টতম লঙ্ঘন। ইতোমধ্যে এই খবরটিও পাই যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে ২৬ মার্চ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সেই খবরও পাচ্ছিলাম। আমাদের কিছু বন্ধু-বান্ধব যারা বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা মুক্তিবাহিনী গঠন হওয়ার খবরও নিয়ে আসছিলেন। তারা সেই বাহিনীতে ক্রমশ যোগ দিচ্ছিলেন এবং আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন। সেভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সুযোগ হয়েছিল। আমার মাকে কেন্দ্র করেই আমাদের পরিবারে মুক্তিযোদ্ধাদের যোগাযোগ কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল এবং আমরা দুই বোন সক্রিয়ভাবে উক্ত কার্যে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এভাবেই তখন আমরা নানাভাবে তথ্য আদান-প্রদান, মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সুযোগ সৃষ্টি করা- এসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা চলছিলই। হঠাৎ করে এপ্রিল মাস থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, তখনকার কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। তখনকার পত্রপত্রিকায় সেই খবরগুলো অত্যন্ত ফলাও করে ছাপা হচ্ছিল। কাজেই সেই ঘটনাগুলোর সাথে কারা কারা যুক্ত ছিলেন, তাদের নামও আমরা জানতে পারি। ঘুরেফিরেই জামায়াতে ইসলামী, পিডিপি মুসলিম লীগ- এই দলগুলোর নাম উঠে আসতে থাকে। তখন একটি নাম খুব বেশি করেই আমাদের চোখে পড়তো, সেই নামটি হলো গোলাম আযম, যিনি টিক্কা খান এবং পাকিস্তানি বাহিনীর অন্য নেতৃবৃন্দের সাথে প্রায়ই মিলিত হতেন এবং কীভাবে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করা যায় সেই নিয়ে আলোচনা করতেন এবং বক্তৃতা ও বিবৃতি দিতেন। তাদের বিবৃতিতে দুটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উঠে আসতো যে, পাকিস্তান অর্থই হচ্ছে ইসলাম এবং পাকিস্তানের বিরোধিতা করা মানেই হচ্ছে ইসলামের বিরোধিতা করা। অর্থাৎ ইসলামকে বাঁচাতে হলে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে এবং দুষকৃতকারীদের (তাদের ভাষায় মুক্তিযোদ্ধারাই দুষকৃতকারী) নির্মূল করতে হবে। এজন্য দেশবাসীকে উজ্জীবিত করতে হবে এবং সে দায়িত্ব তারা নিতে চান। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পেলাম যে, তারা প্রথমে শান্তি কমিটি নামে কিছু সাংগঠনিক তৎপরতা চালায় এবং জনসাধারণকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে চাপ সৃষ্টি করে যোগ দিতে বাধ্য করতে থাকে। এরপর আমরা দেখতে পাই যে, তারা মে মাসে রাজাকার বাহিনী নামে একটি বাহিনী তৈরি করে। যতদূর মনে পড়ে, রাজাকার বাহিনীর প্রথম সূচনা হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে খুলনায়। আমরা এও জানতে পারি যে, তারা কিছু গোপন কিলার ফোর্স তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। আলবদর, আলশামস নামে দুটি বাহিনী ঐ উদ্দেশ্যে গঠন করেছে। তারা খুব গোপনে এ কাজগুলো করবে মর্মে জেনেছিলাম। আমরা তখন জানতে পাই যে, জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র এবং তরুণ কর্মীদের নিয়ে এই বাহিনী তৈরি করা হয়েছে। সর্বক্ষেত্রেই এসব কর্মকাণ্ডের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে গোলাম আযমের নামই বারবার উল্লেখিত হয়েছে। প্রায়শই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উচ্চতম পর্যায় থেকে টিক্কা খানসহ অনেকে গোলাম আযমের নাম ধরেই প্রশংসা করেছেন যে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্যই তিনি এত কাজ করছেন। সেই সময়ে গোলাম আযম পাকিস্তান পর্যন্ত সফর করেন। সেখানে গিয়েও মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কথাবার্তা বলেন এবং বারবার একথা বলেন যে, তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করার জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত। ১৯৭১ সালের জুন মাসে আমার ছোট বোন সাইদা কামাল, যার মুক্তিযোদ্ধা সনদ নম্বর ১৮৩৫ এবং আমি (মুক্তিযোদ্ধা সনদ নম্বর ১৮৩৮) সীমান্ত পার হয়ে ভারতের আগরতলায় যেতে বাধ্য হই। জুন মাসে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার সেই ছোট বোন এবং আমি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের বাড়ির ঠিক সামনে স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ খান সাহেব থাকতেন। তিনি খবর পাচ্ছিলেন যে, বিমান বাহিনীতে যে বাঙালি কর্মকর্তারা রয়েছেন, তাদের যখন ডাকা হয় তারপর তারা আর ফিরে আসেন না। এরকম একটা সময়ে যখন হামিদুল্লাহ খান সাহেবকে হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করতে বলা হলো এবং নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, রায়ের বাজারের কাছে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় একটি অপারেশনে তাকে যেতে হবে, তখন তিনি আমার মায়ের কাছে এসে সাহায্য চান- কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে তিনি বাঁচতে পারেন। তখন আমরা তাকে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে সাহায্য করি। দুঃখজনকভাবে তার বাড়ির কাজের ছেলেটিকে পাকবাহিনী পরদিন ধরে নিয়ে যায়। তখন একটা শঙ্কা দেখা দিল যে, কাজের ছেলেটি যদি জিজ্ঞাসাবাদের চাপে আমাদের পরিবারের সঙ্গে হামিদুল্লাহ খান সাহেবদের যে যোগাযোগ হচ্ছিল সে খবর বলে দেয়, তাহলে আমাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যে যোগাযোগ আছে তাও প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। তখন আমাদের পরামর্শ দেয়া হলো, যেন আমরা দুই বোন অন্তত সীমান্ত পার হয়ে যাই। তারপর আমরা ১৬ জুন ঢাকা থেকে স্থলপথে রওনা হয়ে নদী পার হয়ে কুমিল্লার চান্দিনা থেকে রিকশা করে আগরতলার সোনামুড়ায় পৌঁছাই। আমাদের পূর্বপরিচিত একজন ডাক্তার ক্যাপ্টেন আখতার আহমেদ যিনি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, তিনি তখন সোনামুড়া ফরেস্ট বাংলোতে একটি ছোট চিকিৎসা কেন্দ্র খুলেছিলেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করার জন্য। তিনি এবং তার স্ত্রী খুকু আহমেদ সেখানে ছিলেন এবং তারা দু’জনই আমাদের বন্ধু ছিলেন। আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করি এবং আমরা দুই বোন তাদের সঙ্গে কাজ করতে যোগ দেই। সেই চিকিৎসা কেন্দ্রটি ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। সেই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন মেজর খালেদ মোশাররফ। তার সঙ্গে আমরা দেখা করলাম। তিনি আমাদের অনুমতি দিলেন সেখানে কাজ করার এবং আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিবন্ধিত হলাম। সেখানে থাকতে থাকতে একটা বড় হাসপাতালের পরিকল্পনা নেয়া হলো, যেটা বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল নামে পরিচিত হয়েছিল। আগরতলা থেকে ৬০ মাইল ভেতরে বিশ্রামগঞ্জ নামক স্থানে আমরা হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করি। সেখানে আমাদের সঙ্গে এই কর্মকাণ্ডে জড়িত হন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মোবিন, ডা. কামরুজ্জামান প্রমুখ, যারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অত্যন্ত সম্মানিত এবং সুপরিচিত। পরে ডা. ক্যাপ্টেন সিতারা এসে আমাদের সঙ্গে অক্টোবর মাসে যোগ দেন, যিনি পরবর্তী সময়ে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হন। আমাদের এ ব্যাপারে প্রথমে যিনি সুযোগ দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন আখতার আহমেদ, তিনিও পরবর্তী সময়ে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হন। আমরা সেখানে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ থেকে আরও কয়েকজন মেয়ে যারা বাংলাদেশে ভেতরে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করছিল এবং যোগাযোগ রাখছিল, তারাও সেখানে এসে হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেন। যাদের মধ্যে প্রফেসর জাকিয়া খাতুন, আসমা, রেশমা, মিনু, অনুপমা, পদ্মা, নীলিমা, ডা. ডালিয়া, ডা. শামছুদ্দিন উল্লেখযোগ্য। আমরা সবাই একত্রে সেই হাসপাতালে কাজ করেছি। আমরা নানাভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের খবরাখবর পেতাম। বিভিন্ন বেতার, বিশেষ করে বিবিসি, আকাশ বাণী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং আমেরিকা প্রবাসী ভাইয়ের কাছে আমার মায়ের দেয়া কোড ল্যাংগুয়েজের চিঠির (যা ভাইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে আসতো) মাধ্যমে আমরা দেশের অভ্যন্তরের খবরাখবর পেতাম। তদুপরি মুক্তিযোদ্ধারা যখন গেরিলা যুদ্ধ করার জন্য দেশের অভ্যন্তরে যেত, তারা ফিরে এলে তাদের মাধ্যমেও খবরাখবর পেতাম। ২ নম্বর সেক্টরের যেসব মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন স্থানে অপারেশন করতো, তাদের মাধ্যমে আমরা সেসব অপারেশনের খবর পেতাম এবং যারা দেশের অভ্যন্তরে এই স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করতো অর্থাৎ শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস- তাদের কার্যাবলির খবরাখবরও আমরা পেতাম। শেরাটনের বোমা হামলার ঘটনা, রুমী, বদি, আলম, বাদল, চুল্লু, সামাদ, আলভী গংদের বিভিন্ন গেরিলা অপারেশনের ঘটনা সবকিছুই আমরা নিয়মিত ঐ হাসপাতালে বসে পেতাম। আমরা খবর পেতাম যে, রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটির লোকজন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে দেশের অভ্যন্তরের সমস্ত খবরাখবর প্রদান করতো। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের পরিবারবর্গের সব খবরাখবর, তাদের বাসস্থান, তাদের কার্যাবলি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কাছে প্রদান করতো। আমরা আরও খবর পাই যে, তারা বিভিন্ন বয়সের নারীদের ধরে নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে এবং বাঙ্কারে প্রদান করতো। যার ফলে ক্রমাগত যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়ে তাদের অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় এবং অনেকেই নির্যাতনের কারণে সেই ক্যাম্প কিংবা বাঙ্কারে মারা যায়। রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর নেতা হিসেবে অনেকের নামের সঙ্গে অধিকাংশ সময়েই আমরা গোলাম আযমের নাম শুনতাম। তার সঙ্গে আমরা আরও অনেক নাম শুনেছি। যেমন, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মো. মুজাহিদ, আব্বাস আলী খান। তবে তাদের মধ্যে সর্বদাই জামায়াতের নেতা হিসেবে গোলাম আযমের নাম উচ্চারিত হতো। আলবদর, আলশামস, রাজাকার এই বাহিনী সমূহের নেতা হিসেবে গোলাম আযম স্বাধীনতার পক্ষের মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেমন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তেমন এর বিরোধী পক্ষের প্রতীক ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম। সেই সময়ে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এদের অবস্থা সম্পর্কে আমরা জেনেছি যে, প্রাণ রক্ষার্থে তাদের দেশের ভেতরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পালাতে হচ্ছে, ভারতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে এবং তাদের শুধু ধর্মের কারণে হত্যা করা হচ্ছে। তাদের অনেককে জোর করে ধর্মান্তর করা হয়েছে। আমরা আরও অনেক ঘটনা শুনেছি যে, তাদের সমস্ত সম্পত্তি ফেলে শুধু নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। চার্চের মধ্যে ঢুকেও তাদের হত্যা করা হয়েছে, মন্দির গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, শুধু ধর্মীয় কারণে তাদের এভাবে অত্যাচারিত ও ধর্মান্তরিত হতে হয়েছে। শুধু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদেরই একই উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে তা নয়, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এবং স্বাধীনতার পক্ষের প্রত্যেকটি মানুষের চেতনাকে আঘাত করে তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। তবে বিশেষভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের চিহ্নিত করে ধর্মীয় কারণে তাদের ওপর হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ করা হয়েছে। ২৫ মার্চের রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পৃথিবীর একটি নিকৃষ্টতম গণহত্যা এই কারণে যে, একটি গণতন্ত্রকামী, নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল। এখানে উল্লেখ করতে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর পরিচালিত হত্যাকাণ্ড, ইকবাল হল পুড়িয়ে দেয়া, জগন্নাথ হলের ছাত্র হত্যা, রোকেয়া হলের অভ্যন্তরে হত্যাকাণ্ড, কালীমন্দির আক্রমণ, শাঁখারী বাজার, রায়ের বাজার, হাটখোলা, ওয়ারি প্রভৃতি হিন্দুঅধ্যুষিত এলাকায় অগ্নিসংযোগ করা, আবার একই সাথে রাজারবাগে অগণিত পুলিশ সদস্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া, একই রকমভাবে পিলখানায় রাইফেলসের সদস্যদের ওপর আক্রমণ করা একটি ঘৃণ্য গণহত্যার উদাহরণ স্থাপন করে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের গণহত্যা চলতে থাকে।

বরিশালের একটি উদাহরণ দেই। বাজারে সমবেত নিরস্ত্র মানুষের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ যখন দৌড়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে গেছে, তখন লঞ্চ থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের বিপরীত দিক থেকে গুলি করেছে। এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এরকম ঘটনা দেশের সর্বত্রই ঘটেছিল। এই ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করার কৌশল এবং সেই কৌশলকে সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা যারা দিয়েছে, তারাও এই অপরাধের সমান ভাগীদার। আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও বেতারের মাধ্যমে, যা সেই সময়কার তথ্য সরবরাহের মূল মাধ্যম ছিল জানতে পারি এই সমর্থনের এবং সহযোগিতার মাস্টার মাইন্ড ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা এবং শান্তি কমিটিরও অন্যতম শীর্ষ নেতা গোলাম আযম। আমরা এও জেনেছি যে, ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট এবং ৩১ আগস্ট গোলাম আযম পাকিস্তানের লাহোর ও হায়দারাবাদে নিজে উপস্থিত থেকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এসব কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়েছেন, মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন এবং মুক্তিবাহিনীকে নির্মূল করার আহ্বান জানিয়েছেন। লক্ষ্য করা যেতে পারে, সেপ্টেম্বর মাসে যখন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভবত দু’জন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের সংবর্ধনা দিতে গিয়ে গোলাম আযম বলেন- ঠিক যে লক্ষ্যে শান্তি কমিটি এবং রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছে, একই লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে একটা প্রশ্ন পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, শান্তি কমিটি কখনও সশস্ত্র কোনো অভিযানে অংশগ্রহণ করেছে কিনা। আমাদের কাছে যে তথ্য আছে তারা কখনও কখনও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে সশস্ত্র অভিযানে অংশ নিয়েছে। রাজাকারদের কাছে অস্ত্র ছিল সেটা সকলেরই জানা আছে। আমরা আরও লক্ষ্য করি, ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর যখন মুক্তিযোদ্ধারা জয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও গোলাম আযম ইয়াহিয়া খানের সাথে সাক্ষাৎ করে সংবাদ সম্মেলন করে বলছেন যে, মুক্তিবাহিনীকে পরাভূত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তিনি দম্ভভরে একথাও বলেন যে, সে ব্যাপারে রাজাকাররাই যথেষ্ট। লক্ষণীয় যে, একটি ব্যক্তি একটি গণহত্যা পরিচালনাকারী সরকারের কতখানি কাছের লোক এবং আস্থাভাজন হলে ঐ সময়ে তাদের নেতার সাক্ষাৎ পান এবং তাদের পক্ষে কথা বলেন। আমরা রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর মরিয়া এবং নৃশংস আচরণ প্রত্যক্ষ করি ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। যে উপায়ে এবং যে নির্যাতন ও অত্যাচার করে এই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয় নাৎসি আমলেও অনেক হত্যাকাণ্ড তা দেখে লজ্জিত হবে। আমরা জানি, রাজাকার, শান্তি কমিটি এবং আলবদর ও আলশামস এসব বাহিনীর দার্শনিক এবং কৌশলগত পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন গোলাম আযম।

১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর আমরা ফিল্ড হাসপাতাল থেকে কলকাতায় চলে যাই। তারপর ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসি। ১৬ ডিসেম্বরে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর আমরা কলকাতায় বসেই পাই। তখন যাতায়াতের ব্যবস্থা খুবই খারাপ ছিল। আমরা ট্রেনে বেনাপোল পর্যন্ত এসে তারপর কখনও রিকশায়, কখনও নৌকায়, কখনও বাসে ঢাকায় প্রবেশ করি। কারণ যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত ছিল। এমন এক পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসি, যেখানে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী কেউ না কেউ নিহত হয়েছেন। কোনো কোনো পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের হারিয়েছি, সহপাঠীদের হারিয়েছি, মুক্তিযুদ্ধে যারা যোগ দিয়েছিল সেই বন্ধুদের হারিয়েছি, একেকটি পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি নিহত হওয়ায় দুরবস্থায় পতিত হয়েছে। নারীদের অবস্থা ততোধিক বিপন্ন। কারণ তারা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা সবাই জানি, দুই লাখ নারী মুক্তিযুদ্ধকালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, আরও দুই লাখ নারী নানাভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন এবং পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষ অভিভাবকহারা হয়ে অসহায় অবস্থায় নিপতিত হয়েছেন। তারা অনেকেই আমার মা সুফিয়া কামালের কাছে তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলতে আসেন। বাঁচার একটি উপায় খুঁজে দিতে এবং সাহায্য করার জন্য অনুরোধ জানান। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে আমার মা সুফিয়া কামাল তাঁর অন্য সহকর্মীদের নিয়ে নারীদের পুনর্বাসনের জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ নিতে শুরু করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ব্র্যাক নামে পরিচিত যে বেসরকারি সংস্থাটি আছে তার প্রথম চেয়ারপারসন ছিলেন আমার মা। ব্র্যাক এবং নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে এসব সংগঠনের মাধ্যমে তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন এবং এর জনগণের পুনর্বাসনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। আমাদের পরিবারের লোকেরাও ঐ কাজে যুক্ত হয়ে যাই। সেই কারণে নারী পুনর্বাসনের কাজে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাই। একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এই ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করতে শুরু করি। এর ধারাবাহিকতায় মানবাধিকারের কাজের সাথে যুক্ত হই এবং আইন অধ্যয়ন করতে শুরু করি, যা শেষ করি ১৯৭৮ সালে। নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে মূলত যে কাজ করা হতো, সেটা হলো যারা সাহায্যপ্রার্থী হয়ে আসতেন, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কারণ তাদের মধ্যে অধিকাংশই অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন। তাদের নিরাপদে থাকা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রয়োজন মেটানো, তারা যাতে করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজে পুনর্বাসিত হতে পারেন, সেজন্য তাদের জন্য নানা সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া এবং যারা পরিবারে ফিরে যেতে চেয়েছেন তারা যেমন সসম্মানে ফিরে যেতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা। আমি একটি বিশেষ দায়িত্বের কারণে ১৯ জন অত্যাচারিত নারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, যাদের সবাইকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ধর্ষণ করেছিল। তাদের অনেককেই স্থানীয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসররা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে হস্তান্তরিত করেছিল। এরা মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন এবং তাদের মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য বিশেষ করে এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল। নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে একজন বিদেশি ডাক্তার ছিলেন যার নাম ডা. ডেভিস। তাছাড়াও দেশীয় নারী, পুরুষ স্বেচ্ছাসেবী ও ডাক্তাররা ছিলেন। সার্বক্ষণিকভাবে আমার মা সুফিয়া কামাল, রাজনীতিবিদ বদরুন্নেসা আহমেদ, সমাজসেবী সায়রা আহম্মেদ, মালেকা খান, আফিফা হক প্রমুখ এই পুনর্বাসন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। ঐ পুনর্বাসন কেন্দ্রটি ঢাকার ইস্কাটনে অবস্থিত ছিল। পুনর্বাসন কেন্দ্রে যেসব যুদ্ধশিশু ছিল, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের মায়েদের একটা সুযোগ দেয়া হয়েছিল যে, তারা রাজি থাকলে ঐ শিশুদের দত্তক দেয়া যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে এবং তার পূর্ববর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষ যোগ থাকার কারণে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে মানবাধিকার, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবতার মর্যাদা ইত্যাদি বিষয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সেই অবস্থান থেকেই একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি ট্রাইব্যুনালের কাছে এই প্রত্যাশা রাখি যে, পৃথিবীর ইতিহাসে নিকৃষ্টতম একটি গণহত্যার সঙ্গে যারা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল, যারা নীতিগতভাবে সমর্থন দিয়ে ও সহযোগিতা দিয়ে এই গণহত্যাকে সমর্থন জুগিয়েছে এবং মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে, সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটি লোককে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে, দেশের অভ্যন্তরে যারা ছিল তাদের অনবরত ভীতিকর অবস্থায় নিজের বাড়িঘর, গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয়ের জন্য ছুটতে বাধ্য করেছে, দুই লাখ নারীকে ধর্ষণের শিকার এবং আরও লাখ লাখ নারীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করেছে, কোটি কোটি পরিবারকে বিপর্যস্ত করেছে, বিচারের মাধ্যমে এই মানবতাবিরোধী অপরাধীরা যথাযথ শাস্তি পাবে। আমি এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি প্রদান করেছি। অধ্যাপক গোলাম আযম আজ ট্রাইব্যুনালে আসামির কাঠগড়ায় উপস্থিত আছেন। এই আমার জবানবন্দি।

 

লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ওপর নমপেনে শুনানি

মিজান মল্লিক

 

বিভিন্ন দেশে সশস্ত্র সংগ্রাম ও সহিংসতা চলাকালে নারীদের ওপর ধর্ষণসহ নানা নির্যাতন চালানো হয়। এ বিষয়ে গত ১০ ও ১১ অক্টোবর কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নারীদের শুনানি হয়েছে। কম্বোডিয়ান ডিফেন্ডারস প্রজেক্ট (সিডিপি), ট্রান্সকালচারাল সাইকোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন কম্বোডিয়া (টিপিও) ও ভিকটিম সাপোর্ট সেকশন অব দ্য এক্সট্রাঅরডিনারি চেম্বার ইন দ্য কোর্টস অব কম্বোডিয়া (ইসিসিসি) যৌথভাবে এর আয়োজন করে। এই শুনানি ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। এতে কম্বোডিয়ার সরকার, ইসিসিসি ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ ছাড়া স্থানীয় সুশীল সমাজ ও বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সশস্ত্র সংগ্রাম ও সংঘর্ষ চলাকালে নির্যাতনের শিকার নারীরা এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা এতে সাক্ষ্য দেন। তাঁদের ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল এসব বিষয়ের ওপর সিদ্ধান্ত দেয় এবং সুপারিশ তুলে ধরে। শুনানির একটি অধিবেশনে বাংলাদেশ (১৯৭১), কম্বোডিয়া (১৯৭৫-১৯৭৯), নেপাল (১৯৯৬-২০০৬) ও তিমুরে (১৯৭৪-১৯৯৯) নির্যাতনের শিকার নারীদের কয়েকজন সাক্ষ্য দেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত শোনে প্যানেল। কোনো কোনো দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ, কিংবা সংঘর্ষ চলাকালে নারীদের ওপর কেন ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হয়, এ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। এসব ঘটনার বিচারের প্রয়োজনীয়তা ও বিচারকাজে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, এ বিষয়েও তাঁদের মতামত জানান। সারাবিশ্বে নারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজলুশন ১৩২৫, ১৮২০, ১৮৮৮, ১৮৮৯ ও ১৯৬০ মেনে চলার জোর দাবি জানান।

শুনানিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত
শুনানিতে প্রাপ্ত তথ্য বা সিদ্ধান্ত ও সুপারিশমালা প্রকাশের আগে বিভিন্ন দেশে নির্যাতনের শিকার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্বাগত জানায় প্যানেল। নৃশংস নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর দীর্ঘদিন এ নারীরা মুখ বুজে সয়ে গেছেন। কিন্তু অবশেষে তাঁরা সাহস করে নীরবতা ভেঙেছেন। এ জন্য তাঁদের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়। প্যানেল জানায়, ভিকটিমদের লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। লজ্জিত হতে হবে নির্যাতনকারীদের এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের। সব দেশে স্থিতিশীল অবস্থায় তো বটেই, যুদ্ধ কিংবা সংঘাত চলাকালেও নারীদের অধিকার সমুন্নত রাখতে হবে বলে মতামত ব্যক্ত করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো-

১. সেক্সুুয়ালাইজড অ্যান্ড জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স ইন দি আরম্‌ড কনফ্লিক্ট (এসজিবিভিসি): শুনানিতে দেয়া সাক্ষ্য থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, প্রায় সব দেশেই এসজিবিভিসি-এর সময়ে নির্যাতনের ধরন পৃথক হলেও এদের মূলে একই ধরনের কারণ রয়েছে। নারীদের ওপর এই সহিংসতার অন্যতম কারণের একটি হলো, ঐতিহাসিকভাবেই নারী ও পুরুষের ক্ষমতার অসমতা। যুগ যুগ ধরে দেশে দেশে পুরুষরা নারীদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে। নারীদের সমকক্ষ হিসেবে গণ্য করেনি।
২. এসজিবিভিসি ও পরবর্তী সময়ে ভিকটিমদের অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়তে হয়। তাঁদের জীবিকা সঙ্কট দেখা দেয়। এ ছাড়া ভিকটিমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মানবাধিকার ভোগ করতে পারে না।
৩. যদিও সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালে সবচেয়ে ভয়ানক নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে নারী ধর্ষণকে বেছে নেয়া হয়; কিন্তু এটিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তেমন বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না। তারা ধরে নেয়, এটা হয়েই থাকে। আর এ কারণে আন্তর্জাতিক মহল নীরব থাকে। এতে মনে হয় ধর্ষণের শিকার নারীরাই অপরাধী। ধর্ষণকারীরা পার পেয়ে যায়। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয় না।

সহিংসতার ধরন
১. শুনানিতে সাক্ষ্য দেয়া সব দেশের নারীই বলেছেন, নানা ধরনের এসজিবিভিসির শিকার হয়েছেন তাঁরা। ধর্ষণ ছাড়াও অন্য বেসামরিক নাগরিকদের মতো নারীদের গ্রেফতার, খুন, গুম, বিনা বিচারে আটকে রাখা, দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক নানা ধরনের কাজ করতে বাধ্য করাসহ বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার করা হয়।
২. বাংলাদেশ, নেপাল, কম্বোডিয়া ও তিমুরের নারীদের বর্ণনানুযায়ী, তাঁদের অনেককে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেয়েশিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ, দিনের পর দিন ধর্ষণের শিকার হওয়া। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও সেবিকারা এ ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাননি। অনেককে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়। নির্যাতনের অংশ হিসেবে অনেককে ধর্ষণ করা হয়।
৩. অপহরণ শেষে নারীদের যৌন দাস হিসেবে ব্যবহার করা।
৪. নারীদের নগ্ন হতে এবং সবার সামনে প্রদর্শিত হতে বাধ্য করা।
৫. গর্ভাবস্থায় ও সন্তান প্রসবের পরপরই জবরদস্তিমূলক শ্রমে বাধ্য করা।
৬. জোর করে বিয়েতে বাধ্য করা।
৭. ধর্ষণ, জোর করে বিয়ে কিংবা পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার পর সন্তান ধারণে বাধ্য করা।
৮. শিশুসহ পরিবারের সদস্য কিংবা পরিচিতজনদের সামনে নগ্ন করা ও ধর্ষণসহ নানা নির্যাতন করা। অনেক সময় কেবল নারী ও মেয়েশিশু হওয়ার কারণেই তাঁদের টার্গেট করা হয় এবং তাঁদের ওপর এ ধরনের ভয়ানক নির্যাতন চালানো হয়। কখনো-বা সশস্ত্র সংগ্রামে শত্রুপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগসাজশ থাকা, কিংবা তাঁদের সহযোগিতা করার অভিযোগ এনে, অথবা স্রেফ শত্রুপক্ষ বিবেচনায় নারী ও মেয়েশিশুদের অপহরণ করা হয়। পরে তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।

শুনানিতে বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার নারীদের সাক্ষ্য থেকে উঠে আসে, সম্প্রদায় ও জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু হওয়ার কারণেও তাঁদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। প্রধানত সংখ্যালঘু নারীদের ধর্ষণ করা হয়। এছাড়াও তাঁদের সঙ্গে অন্যান্য সহিংস আচরণ করা হয়।
প্যানেল উল্লেখ করে, কোনো দেশে সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালে সংখ্যালঘু
সম্প্রদায়ের নারী ও মেয়েশিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাদের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে অন্য সবাইকে পাশে দাঁড়ানোর সুপারিশ করে প্যানেল।

ভিকটিম, তাঁদের পরিবার ও সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব
নির্যাতনের শিকার হয়েও বেঁচে যাওয়া নারীরা প্রায়ই সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েন। এতে তাঁদের ওপর মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে-
১. লজ্জাবোধ, গ্লানি, আত্মধিক্কার, আতঙ্ক, বীভৎস সব স্মৃতি দ্বারা তাড়িত হওয়া, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া, নিঃসঙ্গ ও অসহায় বোধ করা। এসব কারণে তাঁদের অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। কেউ কেউ আত্মহত্যা করেন।
২. ধর্ষণজনিত কারণে গভীর ক্ষত কিংবা গর্ভপাতজনিত কারণে গর্ভধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া।
৩. ধর্ষণজনিত কারণে গর্ভধারণ এবং সেই সন্তান প্রসবের পর সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হওয়া।
৪. ধর্ষণের শিকার নারীদের তাঁদের স্বামীরা গ্রহণ করে না, তালাক দেয়, পরিবারের সদস্যরাও প্রায়ই দূরে ঠেলে দেয়। এভাবে ওই নারীর পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়।
৫. ভূসম্পত্তি বেদখল হওয়া। আশ্রয়হীন হয়ে পড়া। চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া। খাদ্য ও আবাসন সঙ্কট। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়া।
৬. জীবনের নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষালাভ করতে না পারা, জীবিকার অভাব, বিয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা এবং তাঁদের সন্তান লালন-পালনে সমস্যা। শত বাধা অতিক্রম করে এর মধ্যেও যারা বাঁচার লড়াই করে যাচ্ছেন, তাঁদের বীরের মর্যাদা দিতে হবে। তাঁদের সরকারি ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এছাড়া তাঁদের সন্তান ও নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের উচিত হবে এই নারীদের পাশে দাঁড়ানো। তাঁদের জীবনসংগ্রামে সহযোগিতা করা এবং অভিবাদন জানানো।

দায়দায়িত্বের প্রশ্ন ভুক্তভোগী নারীদের সাক্ষ্য থেকে উঠে এসেছে, কোনো দেশে যুদ্ধ কিংবা সহিংসতা চলাকালে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী এবং অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বাহিনীর সদস্যরাও নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালায়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি বাহিনী কৌশলগত কারণে ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতন করে। যদিও নারী ও শিশু তো বটেই, বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতেও সরকার বাধ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সরকার তা করে না। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সরকার এসব দায় স্বীকার করে না। অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় না।

আন্তর্জাতিক আইন
জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ অনুযায়ী যুদ্ধ চলাকালে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও নির্যাতন করা চলবে না। এতে আরও বলা হয়েছে-
ক. কোনো নারীকে ধর্ষণ, জোর করে বিয়ে ও পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা চলবে না।
খ. বিচারবহির্ভূত আটক, কোনো নারীর সম্ভ্রমহানি, তাঁকে জোর করে নগ্ন করা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা চলবে না।
অথচ যুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়। যেসব ক্ষেত্রে তা করা হয় সেগুলো হলো-
ক.মানবতাবিরোধী অপরাধ, যেমন- নারীদের ধর্ষণ করা, জোর করে আটকে রাখা, গর্ভধারণে বাধ্য করা, যৌনসেবা দিতে বাধ্য করা প্রভৃতি।
খ.যুদ্ধাপরাধ, যেমন- হত্যা কিংবা ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়ে শারীরিক জখম করা। অমানবিক আচরণ করা। কম্বোডিয়ায় নারীদের ধর্ষণ, জোর করে বিয়েতে বাধ্য করা ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। এসব ঘটনাকে জেনোসাইড হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। কারণ এগুলো করা হয়েছিল জাতি, গোষ্ঠী কিংবা বিশেষ সম্প্রাদায়কে ধ্বংস করার উদ্দেশে।
চারটি দেশেই যুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি লঙ্ঘন করা হয়। এসব ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: নারীর প্রতি বৈষম্য, তাঁদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা। ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা না করা। [এই কাজগুলো দ্য কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফরমস অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন-এর লঙ্ঘন। এই দলিলটি কম্বোডিয়া (১৯৯২), বাংলাদেশ (১৯৮৪), নেপাল (১৯৯১) ও তিমুর (২০০৩) অনুসমর্থন করেছে।] এছাড়া মেয়েশিশুদের অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, যৌন প্রতারণা, বাল্যবিয়ে, পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নকরণ, পূর্বসূরিদের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা [এই কাজগুলো দ্য কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড (সিআরসি)-এর লঙ্ঘন। দলিলটি কম্বোডিয়া (১৯৯২), বাংলাদেশ (১৯৯০), নেপাল (১৯৯০) ও তিমুর (২০০৩) অনুসমর্থন করেছে।] তাদের রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- বিনা বিচারে আটক, জোর করে যৌন সেবাদাসে পরিণত করা, আরোগ্য লাভের সুযোগবঞ্চিত করা [এই কাজগুলো দি ইন্টারন্যাশনাল কোভিন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)-এর লঙ্ঘন। দলিলটি কম্বোডিয়া (১৯৯২), বাংলাদেশ (২০০০), নেপাল (১৯৯১) ও তিমুর (২০০৩) অনুসমর্থন করেছে।] অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার হরণের মধ্যে রয়েছে- জোর করে কাজ করানো, গৃহদাসে পরিণত করা, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি, গৃহহীন করা, চরম দারিদ্র্য, চাকরির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করা [এই কাজগুলো দি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনেন্ট অন ইকোনোমিক, সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস (আইসিইএসসিআর)-এর লঙ্ঘন। দলিলটি কম্বোডিয়া (১৯৯২), বাংলাদেশ (১৯৯৯), নেপাল (১৯৯১) ও তিমুর (২০০৩) অনুসমর্থন করেছে।] নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণের মধ্যে রয়েছে- ধর্ষণসহ অন্যান্য যৌন নিপীড়ন, অনাহারে রাখা, নগ্ন থাকতে বাধ্য করা [এই কাজগুলো দি কনভেনশন এগেইনস্ট টরচার (সিএটি)-এর লঙ্ঘন। দলিলটি কম্বোডিয়া (১৯৯২), বাংলাদেশ (১৯৯৮), নেপাল (১৯৯১) ও তিমুর (২০০৩) অনুসমর্থন করেছে।]

আন্তর্জাতিক আইনগুলো প্রয়োগে ব্যর্থতা

প্যানেল উল্লেখ করেছে, কোনো কোনো দেশে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন সরকার সাধারণত এসব নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও বাহিনীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকে। যুদ্ধ চলাকালে ও পরবর্তী সময়ে নারীদের অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত আইন আছে। তবে সমস্যা হলো এসব আইন প্রয়োগ করা হয় না।

প্যানেলের সুপারিশ
প্যানেল চারটি দেশের সরকারের প্রতি বেশ কিছু সুপারিশ প্রদান করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
সুশীল সমাজের সহযোগিতায় গণআদালত গঠন, ট্রুথ কমিশন গঠন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ধর্ষণসহ নির্যাতনের শিকার নারীদের সম্মান প্রদর্শনের নিশ্চয়তা দেয়া এবং তারা যেন বীভৎস সেই ঘটনাবলি বলে যেতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনে ভিকটিমদের নাম-পরিচয় গোপন রাখতে হবে।

সুশীল সমাজের সহযোগিতায় নির্যাতনের শিকার নারীদের তালিকা তৈরি করা। তাঁদের বক্তব্য নথিভুক্ত করা। তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা বা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দেয়া। তাদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা, পেনশন, বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবাসহ অন্যান্য আর্থিক সহায়তা দেয়া।

সংখ্যালঘু হিন্দুদের রক্ষা করা। তাঁদের যেন বৈষম্যের শিকার হতে না হয়, বরং সমান অধিকার ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।

জাতিসংঘের প্রতি সুপারিশ
সিরিয়াস ক্রাইমস ইউনিট অ্যান্ড সিরিয়াস ক্রাইমস ইনভেস্টিগেশন ইউনিট বা এসসিআইটি তদন্ত কাজ শেষ করতে পর্যাপ্ত সময় ও অন্যান্য সহযোগিতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে জাতিসংঘের মহাসচিবকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। জাতিসংঘকে অবশ্য এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, ওই সব দেশের সরকারের কাছে দেয়া এসসিআইটির প্রতিবেদন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ সবকিছু মনিটর করছে।

দাতাদের প্রতি সুপারিশ
এসজিবিভিসির শিকার নারীদের মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসা দিতে হবে। সম্মানজনক জীবিকার জন্য তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনার কাজে সহায়তাসহ অন্যান্য সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক দাতাদের এগিয়ে আসতে হবে।

সুশীল সমাজ ও বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রতি সুপারিশ
সুশীল সমাজ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (এনজিও) নিশ্চিত করতে হবে যে, রাষ্ট্র লিঙ্গ সমতার বাধ্যবাধকতা মেনে চলছে। হিউম্যান রাইটস ট্রিটি কমিটিকে ছায়া প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। বীরাঙ্গনাদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিগ্রহের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।


এশিয়া-প্যাসেফিক রিজিওনাল উইমেন্স হিয়ারিং শীর্ষক প্যানেল স্টেটমেন্ট-এর সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদ।

 

 

 

 

 

* * *