মত বিনিময়
জাতিসংঘে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা
পরিস্থিতি উন্নয়নে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সুপারিশ,সরকারের প্রতিশ্রুতি ও পরবর্তী অগ্রগতি
প্রশান্ত কুমার রায়
জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল প্রতি চার বছর অন্তর জাতিসংঘের প্রতিটা সদস্য রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি পুনর্বীক্ষণের জন্য সর্বজনীন পুনর্বীক্ষণ ব্যবস্থা (Universal Periodic Review-UPR) নামে একটি নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ ব্যবস্থার অধীনে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ বাংলাদেশের ২০০৪-০৮ সময়কালের মানবাধিকার পরিস্থিতি পুনর্বীক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশের ওই অধিবেশনে রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদনের পাশাপাশি ইউপিআর ফোরামের (আইন ও সালিশ কেন্দ্রকে সচিবালয় করে ১৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত) পাঠানো প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে বিভিন্ন সুপারিশ উত্থাপিত হলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সেসব সুপারিশ বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দেন। ১০ জুন ২০০৯ তারিখে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশনে এই সুপারিশগুলো চূড়ান্তভাবে গৃহীত হবে।
১০ জুনের এই অধিবেশনকে সামনে রেখে গত ৭ জুন ২০০৯ হিউম্যান রাইট্স ফোরাম অন ইউপিআর, বাংলাদেশ (ইউপিআর ফোরাম) জাতীয় পর্যায়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। ধানমণ্ডির ওমেন’স ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশন অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ সভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা, পরিস্থিতি উন্নয়নে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সুপারিশ, সরকারের প্রতিশ্রুতি ও পরবর্তী অগ্রগতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
সভায় ইপিআর ফোরামের পক্ষ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৯ থেকে বর্তমান পর্যন্ত সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরার পাশাপাশি উদ্বেগের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষণা, বিচার বিভাগ পৃথককরণ, জুডিশিয়াল সার্ভিস সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠা, তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের ঘোষণাসহ সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক সিদ্ধান্তের জন্য সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট অঙ্গীকার এবং গত ফেব্রুয়ারিতে ইউপিআর অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ন্যূনতম ২৫ জনের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজ ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ না পাওয়া, প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ না করা, গৃহ সহিংসতা আইন, বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ না করা, এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পাস না হওয়ায় ফোরামের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং নিম্নোক্ত সুপারিশ পেশ করা হয়:
* বর্তমান এবং অতীতের সকল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অন্যায় আটক ও নির্যাতনের নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা;
* বিডিআর বিদ্রোহে জড়িতদের প্রচলিত আইনে বিচারের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা;
* যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠানের জন্য অবিলম্বে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা;
* সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আইন সংশোধনে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ;
* জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা;
* পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ এবং
* জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখপূর্বক স্পষ্ট অঙ্গীকার প্রদান: যেমন- কোন সময়ের মধ্যে কোন সনদ অনুসমর্থন করা হবে, কোন সময়ের মধ্যে কোন বৈষম্যমূলক আইনগুলো সংশোধন করা হবে, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিদের (Special Rapportiour) উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানানো হবে কি-না ইত্যাদি
সভার প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত দর্শকদের মধ্য থেকে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধের বিচার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, অভিবাসী শ্রমিক ইত্যাদি বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আইনের শাসন ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একসঙ্গে চলতে পারে না বলে মন্তব্য করেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন। ফতোয়া প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। প্রবাসে বাংলাদেশিদের মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রবাসে কিছু মৃত্যু স্বাভাবিক এবং কিছু মৃত্যু অস্বাভাবিক। অস্বাভাবিক যে কোনো মৃত্যুর কারণ অবশ্যই আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। মানবাধিকার কমিশন গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সম্পর্কিত অধ্যাদেশ সংসদীয় কমিটিতে আছে। প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর চলতি অধিবেশনে কমিশন সম্পর্কিত আইন পাস হবে।
এই সভায় সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ফোরামের সমন্বয়ক সাঈদ আহমেদ এবং ফোরামের পক্ষ থেকে অন্যদের মধ্যে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী বত্তব্য রাখেন। ওই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল।