সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   তথ্যানুসন্ধান
   ফলোআপ
   নারী
   আন্তর্জাতিক
   মতবিনিময়

যোগাযোগ
সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

৭/১৭, ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১০০০

ইমেইল-
ask@citechco.net,
            publication@askbd.org

আইন-আদালত


পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে হাইকোটের রায়

এটিএম মোরশেদ আলম

পঞ্চম সংশোধনী সংক্রান্ত রিট মামলাটির সূত্রপাত একটি সিনেমা হলকে কেন্দ্র করে। তৎকালীন ওয়াইজঘাটে (হোল্ডিং নং ১১) ‘পাকিস্তান ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি ছিল। তারা সেখানে তৈরি করে মুন সিনেমা হল। একাত্তরের ডিসেম্বর মাসের দিকে একদল লোক সেটি দখল করে নেয়। পরবর্তীকালে শিল্প মন্ত্রণালয় এটাকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা ট্রাস্টকে বরাদ্দ দেয়। কিন্তু মুন সিনেমা হলের মালিকরা তাদের সম্পত্তি ফেরত চান।
এতদুদ্দেশ্যে সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, এটা আসলে কোনো পরিত্যক্ত সম্পত্তি নয়। কমিটি ৬ জানুয়ারি ১৯৭৫ সম্পত্তিটি মূল সিনেমা হলের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয় এই সুপারিশ মানতে অস্বীকার করে। তাই পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের ঘোষণার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৭৬ সালে প্রথম একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। হাইকোর্ট বিভাগ ১৫ জুন ১৯৭৭ পরিত্যক্ত সম্পত্তি ঘোষণার সরকারি সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায় অনুসারে শিল্প মন্ত্রণালয় ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ বাড়িটিকে অবমুক্তকরণের জন্য প্রজ্ঞাপনও জারি করে। কিন্তু বাস্তবে হস্তান্তর বাকি থাকে।

এরপর ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ জিয়াউর রহমান ৭নং এমএলআর (মার্শাল ল’ রেগুলেশনস) জারি করেন। এখানে বিধান ছিল, সরকার যেসব বাড়ি পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করবে, সেটাই চূড়ান্ত। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বৈধতা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এরূপ বিধান জারি হওয়ার পর শিল্প মন্ত্রণালয় সুর পাল্টে ফেলে দাবি করে, সামরিক আইনের কারণে হাইকোর্টের রায় বাতিল হয়ে গেছে।

১৯৯৪ সালে মুন সিনেমার মালিকরা দ্বিতীয় একটি রিট মামলা দায়ের করে সিনেমা হল হস্তান্তরের আরজি জানান। কিন্তু এই রিট আবেদনে জিয়াউর রহমানের ওই এমএলআরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। পঞ্চম সংশোধনীর অধীনে জিয়ার সামরিক ফরমান কার্যকর থাকার কারণে হাইকোর্ট তাদের আরজি সরাসরি খারিজ করে দেন। আপিল করলে আপিল বিভাগও ১৯৯৯ সালে হাইকোর্টের খারিজ আদেশ বহাল রাখেন।

মুনের মালিকরা ২০০০ সালে তৃতীয় রিটটি দায়ের করেন। এবার তারা তাদের হলকে পরিত্যক্ত ঘোষণাকারী সামরিক আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ দুই মাসের মধ্যে মুন সিনেমা হলের সম্পত্তি রিট মামলাকারীর কাছে হস্তান্তর করতে সরকার ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা ট্রাস্টকে নির্দেশ দেন এবং একই সাথে জিয়াউর রহমানের সেই সামরিক ফরমানকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং সামরিক ফরমানকে বৈধতাদানকারী সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে।

পরবর্তী আইনি লড়াই
রায় ঘোষাণার রাতেই (২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট দিবাগত রাত) তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর বাসভবনে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করার আবেদন নিয়ে হাজির হন। বিচারপতি পরদিন সকাল পর্যন্ত রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ৩০ আগস্ট আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ শুনানি শেষে স্থগিত আদেশ তিন মাসের জন্য বাড়ানো হয়। এরপর বিভিন্ন মেয়াদে স্থগিতাদেশ বর্ধিত হতে থাকে।

এর মধ্যে সরকার বদল হয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসে। তারা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের দায়ের করা আপিল প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ৩ মে তারা প্রত্যাহারের আবেদন করে। এদিকে বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন এবং তিনজন আইনজীবী- অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার মুন্সী আহসান কবীর ও অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান মামলাটিতে পক্ষভুক্ত হয়ে নিয়মিত আপিল দায়ের করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তাদের যুক্তি, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলে দেশে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হবে, বাকশাল কায়েম হবে এবং একটা সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হবে। আপিল বিভাগ ৪ মে তাদের আবেদন মঞ্জুর করে চার সপ্তাহের মধ্যে লিভ টু আপিল দায়েরের নির্দেশ দেন। ২৫ মে তারা লিভ টু আপিল দায়ের করেন।

পঞ্চম সংশোধনী
পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যেসব পরিবর্তন আনা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সংবিধানের শুরুতেই ‘বিসমিল্লাহ হির রহমানির রহিম’ যুক্ত করা, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ শব্দগুলো যুক্ত করা, সমাজতন্ত্র কথাটির শেষে ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার’ কথাগুলোকে লেজুড় লাগানো এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করা। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে করা সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ’৭৯-এর ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের জারি করা সকল ফরমান এবং কাজকে বৈধতা দেয়া হয়। এই পুরো সময়টা জুড়েই সামরিক শাসন জারি ছিল। এখানে উল্লেখ্য, পঞ্চম সংশোধনীর কারণেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা কিংবা জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার বিচার শুরু করতে অনেক বছর সময় লেগেছে। কারণ, এই সময়ে কৃত সব কাজই ছিল বৈধ। হত্যা, নির্যাতন এমনকি ধর্ষণ সবই বৈধ।

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্ল্লেখ ছিল, ‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ... জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি’, পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে হয়তো উভয় শব্দগুচ্ছের মধ্যে কোনো পার্থক্য নজরে পড়বে না। কিন্তু কেউ যদি একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেন তাহলেই বিষয়টা নজরে আসবে। আমাদের স্বাধীনতা নিছক কোনো সামরিক বাহিনীর একক যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। সংশোধনী এনে ‘মুক্তির সংগ্রাম’-এর পরিবর্তে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে জনগণের সেই অবদানকে অস্বীকার করা হয়েছে। এর পেছনে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত ‘মুক্তির সংগ্রাম’ শব্দগুলোকে বাদ দেয়াসহ অন্য কোনো সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

সংবিধান সংশোধন বনাম মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধানের যে কোনো বিধান সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন বা প্রতিস্থাপন করা যাবে। মোদ্দাকথা, সংসদের ৩০০ জনের মধ্যে যদি ২০০ জনের সমর্থন থাকে তাহলে সংবিধান সংশোধন করা যাবে। অন্যদিকে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দেশের মালিক হলো জনগণ। তাদের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান হলো দেশের সর্বোচ্চ আইন। অন্য কোনো আইন যদি সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তাহলে সেটা বাতিল হবে অথবা যতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না ততখানি বাতিল বলে গণ্য হবে। এই অনুচ্ছেদের মূল কথা হলো, সব আইনের ওপরে সংবিধান। ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধান সংশোধন করে এমন কোনো বিধান করা যাবে না যা ৭ অনুচ্ছেদের বিধানকে খর্ব করে। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে কতগুলো সামরিক ফরমানের বৈধতা দেয়া হয়। এই ফরমানগুলোর বেশিরভাগই সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এর অর্থ হলো, ওই ফরমানগুলোকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেয়া হলো। এর ফলে ৭ অনুচ্ছেদের বিধান স্পষ্টভাবেই লঙ্ঘিত হলো।

পঞ্চম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ে মূলত এই বিষয়টিই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই মামলার রায়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বাতিল করা হয়নি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে পুনরায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি কিংবা বাকশালও কায়েম করা হয়নি। বরং সাংবিধানিক প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যহীন সামরিক ফরমান জারির সংস্কৃতিকে বাতিল করা হয়েছে।

হাইকোর্টের রায় ও পরবর্তী রাজনীতি
হাইকোর্ট পঞ্চম সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন যে, ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ’৭৯-এর ৯ এপ্রিল পর্যন্ত জারি করা সব ফরমান অবৈধ। খন্দকার মোশতাক আহম্মেদ, বিচারপতি আবু সায়েম এবং মেজর জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ ও সামরিক শাসন জারি অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী হিসেবে রায়ে উল্লেখ করা হয়। তৎকালীন জোট সরকার ঐদিন রাতেই কেন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করলো এবং বর্তমান সরকার কেন সেই আপিল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিল? আবার বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন এবং তিনজন আইনজীবী এতদিন পরে এসে কেন মামলার পক্ষভুক্ত হওয়ার আগ্রহ পোষণ করলেন, এর পেছনে কী উদ্দেশ্য আছে- তা অবশ্যই আমাদের ভেবে দেখতে হবে। আইনি মারপ্যাঁচ কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ঠেলাঠেলিতে না গিয়ে শুধু একটি বিষয়ের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে চাই। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যেসব পরিবর্তন করা হয়েছিল তার সব বাতিল হবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে দেশে যাতে আর সামরিক শাসন কায়েম না হয় এই রায় তাতে একটা বড় ভূমিকা রাখবে, যা গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

প্রাসঙ্গিক কথা
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মামলা এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। কিন্তু এ নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করতে চায় বেশ কয়েকটি ইসলামি রাজনৈতিক দল। এরই মধ্যে ১৬টি দল বৈঠক করে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করেছে। দলের নেতারা মনে করেন, আন্দোলন জোরদার হলে আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে যেতে পারে। অথচ এসব দলের অনেক নেতাই হাইকোর্টের রায় পড়ে দেখেননি। খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায় পড়িনি। তবে রায় যদি কার্যকর হয় তাহলে দেশ ’৭২ সালের সংবিধানের অধীনে চলে যাবে’ [ওয়াসেক বিল্লাহ্‌ ‘পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামছে ১৬ ইসলামি দল’ প্রথম আলো, ১৭ মে ২০০৯]। কেন তারা আন্দোলনে যাবেন? উত্তর খুব সহজ, এসব দলের জন্ম হয়েছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে। পঞ্চম সংশোধনীর পূর্বে সাংবিধানিকভাবেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দ্বার উন্মোচিত হয়। সুতরাং পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলে যদি তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়-এই ভয়েই তাদের আন্দোলনের হুমকি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে কিনা সেটা আপিল বিভাগের রায়েই পরিষ্কার হবে। তবে একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইসলামের দোহাই দিয়ে যারা নারী উন্নয়ন নীতিকে ঠেকানোর চেষ্টা চালাতে পারে, বাউল সাধক লালনের মূর্তিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে তাদের আন্দোলন সম্পর্কে জনগণকে আরো সতর্ক হতে হবে।


যৌন হয়রানি বন্ধে হাইকোর্টের দিকনির্দেশনা

তাবাসসু মখদুমা

 

যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞা প্রদানপূর্বক যৌন হয়রানি রোধে কয়েকটি দিকনির্দেশনা উল্লেখ করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়েছে, যত দিন পর্যন্ত জাতীয় সংসদে যৌন হয়রানি রোধে কোনো আইন প্রণয়ন করা না হয়, ততদিন বাংলাদেশ সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের দেয়া এ নীতিমালা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে। উল্লেখ্য, যৌন হয়রানি রোধে আমাদের দেশে কোনো আইন বা নীতিমালা কখনো ছিল না এবং এখনো এ বিষয়ে কোনো আইন নেই। ১৫ মে ২০০৯ তারিখে হাইকোর্টের দেয়া এই রায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ কেন্দ্র গঠন এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত ও অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ না করার কথাও বলা হয়।

উক্ত রায়ে বলা হয়, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে অভিযোগ কেন্দ্র থাকবে। এই অভিযোগ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ন্যূনতম পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি থাকবে আর কমিটির প্রধান হবেন একজন নারী। এছাড়া কমিটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী সদস্য থাকবেন। কমিটি যৌন হয়রানির কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষে পুলিশের কাছে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পাঠাবেন। এরপর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধের ধরন ও মাত্রা বুঝে বিচার বিভাগ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, কমিটি নির্যাতন সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং পুলিশের কাছে অপরাধীকে না পাঠানো পর্যন্ত নির্যাতিত ও অভিযুক্ত ব্যক্তির কোনো পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না।

যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞায় আদালত বলেন, শারীরিক ও মানসিক যে কোনো ধরনের নির্যাতন যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। ই-মেইল, মুঠোবার্তা (এসএমএস), পর্নোগ্রাফি, টেলিফোনে বিড়ম্বনা, যে কোনো ধরনের চিত্র, অশালীন উক্তিসহ কাউকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সুন্দরী বলাও যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। আর যেহেতু শুধু কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে না, তাই রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের অশালীন উক্তি, কটূক্তি করা কিংবা কারও দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো ইত্যাদি যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য হবে। এই রায় অনুযায়ী, কোনো নারীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, যে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করা, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করা, দেয়াললিখন, অশালীন চিত্র ও আপত্তিকর কোনো ধরনের কিছু করা যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে। রায়ে আরও বলা হয়, যৌন নিপীড়ন ও শাস্তি সম্পর্কে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করতে হবে। আদালত কার্যকর শাস্তির বিধান করে এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আদালতে চার দিনব্যাপী রিট আবেদনকারীর আইনজীবী শুনানি করেন। শুনানিতে যৌন হয়রানির ওপর ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রায় তুলে ধরা হয়। ‘বিশাকা ও অন্যান্য বনাম রাজস্থান সরকার ও অন্যান্য’ মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দেয়া ১৯৯৭ সালের রায় এ ক্ষেত্রে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, যৌন হয়রানির ওপর ভারতে এখনো কোনো আইন করা হয়নি। তারপরও বিশাকা মামলায় আদালতের দেয়া রায়ের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ভারতে যৌন নিপীড়ন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, ভারতে বিশাকা মামলায় যৌন হয়রানি রোধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় উচ্চ আদালত নীতিমালা প্রণয়ন করে দেন।

আদালত আইন সচিব, নারী ও শিশু বিষয়ক সচিব, শিক্ষা সচিব, শ্রম সচিব, তথ্য সচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারারস্‌ অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স্‌ অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারারস্‌ অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ পুলিশ এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে হাইকোর্টের এই রায় মেনে চলার নির্দেশ দেন। রিট আবেদনকারীর আইনজীবী ফৌজিয়া করিম বলেন, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের এই রায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে পালন করতে হবে।

রিট আবেদনকারী সালমা আলী রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে বলেন, হাইকোর্ট যুগান্তকারী রায় দিয়েছে এবং মহিলাদের যৌন নিপীড়ন থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে ও নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নে এই রায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগে মাইলফলক হিসেবে থাকবে। তাঁর মতে, এই রায় যৌন হয়রানি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট, কর্মস্থল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য দিকনির্দেশনা চেয়ে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী জনস্বার্থে হাইকোর্টে এ রিট দায়ের করেন। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষে ফৌজিয়া করিম রিটের শুনানিতে অংশ নেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন ফাহিমা নাসরীন, রেবেকা সুলতানা, রেহানা সুলতানা প্রমুখ। সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাজিক আল জলিল।

আদালত ওই দিন শুনানি শেষে কেন নতুন আইন বা বিধিমালা প্রণয়ন করার নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানাতে সরকারের প্রতি রুল জারি করেন। রুলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে বলা হয়।

হাইকোর্টের এ রায় ইতোমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং সর্বমহলে ইতিবাচক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এ রায়ে সংসদকেই আইন প্রণয়নের সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু যত দিন এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা না হয়, ততদিন এ দিকনির্দেশনাগুলো কার্যকর থাকবে।

উল্লেখ্য, বিগত কয়েক বছরে যৌন হয়রানির বেশ কিছু ঘটনা জনমনে আলোড়ন তৈরি করে। এর মধ্যে ২০০১ সালে যৌন হয়রানির রেশ ধরে নারায়ণগঞ্জে চারুকলার ছাত্রী সিমি বানুর আত্মহত্যা, ধর্ষিত হওয়ার পর ২০০২ সালে মহিমা খাতুনের আত্মহত্যা, ২০০৩-এ ধর্ষিত হয়ে গার্মেন্টসের কর্মী শাহীনুরের ট্রেনের নিচে আত্মহত্যা, অপহরণকারী বাসায় এলে অপহরণ এড়াতে কলেজছাত্রী ফারজানা আফরিন রুমীর আত্মহত্যা, অপহরণের পর এক সপ্তাহ ধরে ধর্ষিত হওয়ায় কলেজছাত্রী বিভা রানী সিংহের মানসিক বিকৃতি ও নিজ মায়ের সামনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ায় চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী আলপিনার আত্মহত্যা এবং ২০০৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড়ে নয় বছর বয়সী চামেলী ত্রিপুরার ধর্ষণ ও খুন অন্যতম। এছাড়া নানা সময় যৌন হয়রানির শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আনীত অভিযোগ পুলিশের অবহেলা ও অসহযোগিতার কারণে ধামাচাপা পড়ার ঘটনা বারবার মনে করিয়ে দেয়, যৌন হয়রানি রোধে আমাদের দেশে সুনির্দিষ্ট আইনের কতটা প্রয়োজন। হাইকোর্টের এই রায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সমর্থ হবে- এ প্রত্যাশা সবার।

 

জাবির শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব বিজয়
যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়

সারোয়ার হোসাইন


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি বিষয়ক মামলার (রিট পিটিশন নং ৯৪১৪/২০০৮) রায় ঘোষিত হয় ১৭ মে ২০০৯ তারিখে। তিনটি তদন্ত কমিটির সুপারিশ অগ্রাহ্য করে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কর্তৃক অব্যাহতি প্রদানের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ।

একইসাথে আদালত শিক্ষার্থীদের সাময়িক বহিষ্কারাদেশকেও অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং বি.এন.ডব্লিউ.এল.এ বনাম সরকার মামলায় আদালত নির্দেশিত ‘যৌন হয়রানিবিরোধী নীতিমালা’ অনুযায়ী নতুন করে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে।

যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপনকারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের চার ছাত্রীসহ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানী এবং মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), কর্মজীবী নারী ও নিজেরা করি বাদি হয়ে জনস্বার্থে উক্ত রিট মামলা দায়ের করেন।

মামলার ঘটনায় প্রকাশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন সানির বিরুদ্ধে উক্ত বিভাগের চার ছাত্রী ২০০৮ সালের মে মাসে যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে একটি প্রাথমিক সত্যাসত্য যাচাই কমিটি গঠন করে ও তারপর অধিকতর সত্যাসত্য যাচাই কমিটি গঠিত হয়। উভয় কমিটিই তাদের প্রতিবেদনে অভিযুক্ত শিক্ষক সানির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে বলে উল্ল্লেখ করে। এর প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৪৪ ধারা অনুযায়ী একটি পূর্র্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তারপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত নিপীড়নের বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ না করেই অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়া’র কথা বলে ১৩.০৯.২০০৮ তারিখে সিন্ডিকেট অভিযুক্ত শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন সানিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদান করে। সিন্ডিকেটের এরূপ সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা তদন্ত প্রতিবেদনের প্রকাশ ও সানিকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের দাবিতে আট মাস ধরে অনশনসহ আন্দোলন করেছেন। এ সময় উক্ত শিক্ষক অভিযোগকারীদের এ ব্যাপারে আর আন্দোলন না করার জন্য নানাভাবে হুমকি দেন। উক্ত আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সাথে দেশের সচেতন নাগরিকরা সংহতি প্রকাশ করে। ২০০৮ সালের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয় উক্ত শিক্ষককে পুনর্বহাল করলে ক্যাম্পাসে তার প্রত্যাবর্তনে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এরূপ আন্দোলনের মধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষক সানি বহিরাগত দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভের মুখে পড়ে ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। সানি ছয়জন ছাত্রছাত্রীর (এর মধ্যে দু’জন অভিযোগকারী ও দু’জন সাক্ষ্যদানকারী) বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেন। সিন্ডিকেট এ ঘটনায় পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ঐ দিনেই ওই ছয়জনকে সাময়িক বহিষ্কার করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির একাংশ ওই ছাত্রছাত্রীদের তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের দাবি জানায় ও ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয়। এদের মধ্যে অনেকেই ওই ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের (সাময়িক বহিষ্কার) প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করেই নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন সানিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দানের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে জনস্বার্থে এই রিট মামলাটি দায়ের করা হয়।মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২৭ অক্টোবর ২০০৮ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রুলনিশি জারি করেন এবং পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের সাময়িক বহিষ্কারাদেশ স্থগিত করেন এবং কেন সানিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করা ও কেন একটি নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে না এ মর্মে কারণ দর্শানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আদালতে জবাব দেয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথ নিয়মেই কাজ করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় যৌন হয়রানির শিকার ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে গৃৃহীত সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করে। এর প্রেক্ষিতে আদালত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানির অভিযোগে গঠিত তিনটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেয়। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আদালতে প্রতিটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটিসহ প্রতিটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযুক্ত শিক্ষককে অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তার আচরণ অশিক্ষকসুলভ বলে উল্ল্লেখ করা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তাকে তদন্ত চলাকালীন সময়ে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়নি।

পূর্ণাঙ্গ শুনানি শেষে আদালত আবেদনকারীদের পক্ষে রুল এবস্যুলোট ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃক অব্যাহতি প্রদানের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। একইসাথে আদালত শিক্ষার্থীদের সাময়িক বহিষ্কারাদেশকেও অবৈধ ঘোষণা করেছেন এবং বি.এন.ডব্লিউ.এল.এ বনাম সরকার মামলায় আদালত নির্দেশিত ‘যৌন হয়রানিবিরোধী নীতিমালা’ অনুযায়ী নতুন করে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত রায়ে আরও ঘোষণা করেন যে, কোনো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সত্যাসত্য যাচাই প্রতিবেদন বা তদন্ত প্রতিবেদনে ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি’ এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা যাবে না।

মামলার রায়ে প্রাপ্তি
১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই যৌন হয়রানিবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও অভিযোগ সেল গঠনের দাবি ওঠে। সে সময় যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়নের জন্য রেহনুমা আহমেদসহ কয়েকজন শিক্ষকের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি দীর্ঘ সময় কাজ করে একটি খসড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিলেও পরে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পরে বাংলা বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভের ফলে জাবি কর্তৃপক্ষ পুনরায় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষকসহ আইনি সহায়তা ও মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালের সমন্বয়ে ১০ সদস্য-বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। তারা নতুন ও পূর্ণাঙ্গ একটি নীতিমালা সিন্ডিকেটকে হস্থান্তর করেন। জাবি কর্তৃপক্ষ পরে এই নীতিমালার অপব্যাবহার হতে পারে, এবিষয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে অজুহাতে নীতিমালাটি আর পাস করেনি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ঐ খসড়ার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি অভিন্ন যৌন হয়রানিবিরোধী নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করে। কিন্তু এই নীতিমালাও বাস্তবায়িত হয়নি। ক্যাম্পাসগুলোতে যৌন হয়রানি চলতেই থাকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন সানির বিরুদ্ধে একই বিভাগের কয়েকজন ছাত্রী কর্তৃক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ক্যাম্পাসে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ বিষয়ে কোনো নীতিমালা না থাকায় ছাত্রছাত্রীরা প্রনীত নীতিমালা গ্রহনের জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। বারবার এরূপ আন্দোলন ও দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি সত্ত্বেও সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত নিপীড়ন প্রতিরোধে কোন নীতিমালা প্রনয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে বিএনডব্লিউএলএ বনাম বাংলাদেশ মামলায় আইনের ক্ষেত্রে একটি বড় শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে। আসক, কর্মজীবী নারী ও নিজেরা করি’র দায়ের করা রিট মামলার রায়ে প্রাপ্ত নির্দেশনার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা ও হয়রানিমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ছয় ছাত্রছাত্রীর সাহসী প্রতিবাদ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দৃঢ় সংকল্পের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। আমরা আশাকরছি, আদালতের এই রায় ক্যাম্পাস সমূহকে হয়রানীমুক্ত রাখতে ফলপ্রসু ভুমিকা রাখবে ও এর হাত ধরে অচিরেই একটি যৌন হয়রানী প্রতিরোধ আইন প্রণীত হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ হবে হয়রানিমুক্ত সর্বোচ্চ নিরাপদ ও জ্ঞানার্জনের মুক্ত মঞ্চ।

 

 

উপজেলা পরিষদ আইন ২০০৯

আতিয়া নাজনীন

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা সীমিত এবং সাংসদদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করে গত ৬ এপ্রিল ‘উপজেলা পরিষদ (রহিত আইন পুনঃ প্রচলন ও সংশোধন) আইন ২০০৯’ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাস করা হয়েছে। সেইসাথে ‘উপজেলা পরিষদ সংক্রান্ত স্থানীয় সরকার (থানা পরিষদ ও থানা প্রশাসন পুনর্গঠন) অধ্যাদেশ ১৯৮২’ এবং বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জারি করা ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) অধ্যাদেশ ২০০৮ (২০০৮ সালের ৩২ নং অধ্যাদেশ)’ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। ৬ এপ্রিল পাস হলেও আইনটি ২০০৮ সালের ৩০ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে বলে আইনের ১(২) দফায় উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাসকৃত ‘উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ (১৯৯৮ সালের ২৪ নং আইন)’-এর সংশোধিত আইন হিসেবে এটি পাস করা হয়। সংশোধনীসহ গৃহীত এ আইনের অধীনে বাংলাদেশে তৃতীয়বারের মতো উপজেলা পরিষদ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।

আইনে যা আছে : সংশোধিত এ আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই এর কয়েকটি ধারা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, আইনের ২৫(১) ধারার অধীনে সাংসদদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে এমন বিধান রাখা হয়েছে। আবার ২৫(২) ধারাতে বলা হয়েছে, ‘সরকারের সহিত কোন বিষয়ে পরিষদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিষদকে উক্ত বিষয়টি সংশ্ল্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যকে অবহিত করতে হবে।’

২৭ ধারায় খ উপধারার ৪ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে বলা হয়েছে, উপজেলা পরিষদের প্রতিটি বৈঠকের পর পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে বৈঠকের কার্যবিবরণী স্থানীয় সাংসদের কাছে পাঠাতে হবে। উল্লেখ্য, এ কার্যবিবরণী আগে শুধু সরকারের কাছে (স্থানীয় সরকার বিভাগ) পাঠানোর বিধান ছিল। এমনকি, উপজেলা পরিষদের কোনো বিষয়ে সরকারের কাছে চিঠি পাঠাতে চাইলেও তা সাংসদকে জানিয়ে করতে হবে।

এ আইনের অধীনে উপজেলা পরিষদে ১৪টি স্থায়ী কমিটি গঠন করার বিধান রাখা হয়েছে। কমিটিগুলো হচ্ছে- আইন-শৃঙ্খলা, যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি ও সেচ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন, মহিলা ও শিশু উন্নয়ন, সমাজকল্যাণ, ভূমি, মৎস্য ও পশুসম্পদ, পল্ল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, তথ্য ও সংস্কৃতি, বন ও পরিবেশ এবং বাজারমূল্য পর্যবেক্ষণ, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ। ১৯৯৮ সালের আইনে কমিটির সংখ্যা ছিল ৭টি- নিঃসন্দেহে বর্তমান উদ্যোগটি বাস্তবসম্মত এবং যথেষ্ট ফলদায়ক হতে পারে। উল্ল্লেখ্য, চেয়ারম্যান এসব কমিটির কোনোটিরই প্রধান হতে পারবেন না, তবে পরিষদের সদস্য বা স্থানীয় অন্য কোনো ব্যক্তি এসব কমিটির সভাপতি হতে পারবেন।

আইনের ৩৩ ধারা সংশোধনের কারণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এখন থেকে উপজেলা পরিষদের সচিব হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং তিনি পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা দেবেন।

আবার সংশোধিত ৪২ ধারা অনুযায়ী উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সুপারিশ গ্রহণপূর্বক তা সরকারের কাছে পাঠাতে হবে।

‘উপজেলা পরিষদ (রহিত আইন পুনঃ প্রচলন ও সংশোধন) আইন ২০০৯’ এবং উদ্ভূত জটিলতা
এরকম একটি আইন পাসের মধ্য দিয়ে সুস্পষ্টভাবেই সংবিধানের ৯, ১১, ৫৯, ৬০, ৬৫ অনুচ্ছেদগুলো লঙ্ঘনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের একটি পবিত্র দায়িত্ব হচ্ছে সংশ্ল্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দান করা। আবার ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে। পাসকৃত আইনটিতে যখন উপদেষ্টা হিসেবে সাংসদের দেয়া কোনো সিদ্ধান্ত উপজেলা পরিষদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করার বিধান রাখা হয় তখন আইনটি স্থানীয় শাসনের জন্য সত্যিকার অর্থেই কতটুকু উৎসাহব্যঞ্জক- তা অতি সহজেই বোধগম্য।

সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদের অধীনে স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হয়েছে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর- জাতীয় সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর নয়। সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ৩য় পরিচ্ছেদে স্থানীয় শাসনের যে ধারণা প্রদান করা হয়েছে তা স্পষ্টতই আইন প্রণয়ন থেকে আলাদা। কিন্তু এই আইনের মাধ্যমে সাংসদদের স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত করার যে বিধান রাখা হয়েছে তা ৫৯(১) ও ৬৫ অনুচ্ছেদের আলোকে অবশ্যই তাদের এখতিয়ার-বহির্ভূত এবং সংসদে আইন পাস করেও তারা সে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ [৪৪ ডিএলআর (এডি)১৯৯২] মামলার রায় স্মর্তব্য। যেখানে আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে বলেছে, সংসদ স্থানীয় সরকারের ব্যাপারে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করতে পারেন না।

উপজেলা পরিষদ আইনটিকে বৈষম্যমূলক বললেও ভুল হবে না। আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী শুধু নির্বাচিত ৩০০ জন সাংসদকেই উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে এবং সংরক্ষিত আসনের ৪৫ জন নারী সাংসদকে এর আওতায় আনা হয়নি। ফলে আইনটি একদিকে যেমন নারীর প্রতি সৃষ্টি করছে অসমতা, আরেকদিকে তা সংবিধানের মূল চেতনা থেকে সরে গেছে অনেক দূরে।

সাংবিধানিক ও আইনগত জটিলতা ছাড়াও আইনটি পাসের ফলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন, দেশে বর্তমানে উপজেলার সংখ্যা ৪৮২টি এবং সংবিধানের ৬০ অনুচ্ছেদের বিধানানুযায়ী আঞ্চলিক এলাকা থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য সংখ্যা ৩০০ জন। এক্ষেত্রে গাণিতিক বিভাজনে একজন সাংসদ ১.৬টি উপজেলায় উপদেষ্টা হতে পারেন। অন্যদিকে সংসদীয় আসনের সীমানার কারণে শতাধিক উপজেলা দু’জন সাংসদের নির্বাচনী এলাকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, ফলে এসব উপজেলা পরিষদে আইনানুযায়ী দু’জন উপদেষ্টা থাকবেন। এক্ষেত্রে দু’জন যদি দুই দলের হন বা একই দলেরও হন, দু’জনের দুইরকম উপদেশ সবটাই যদি পরিষদের জন্য গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে, তা কীভাবে নিরসন করা হবে?

যাই হোক, ‘উপজেলা পরিষদ (রহিত আইন পুনঃ প্রচলন ও সংশোধন) আইন ২০০৯’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ৫ মে ২০০৯ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার অন্তর্বর্তী নীতিমালা নির্ধারণ করে একটি পরিপত্র জারি করে। পরিপত্রটি আপাত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাজের পরিধি অনেক বড় হলেও আসল ক্ষমতা কিন্তু সাংসদের হাতেই। আর দুঃখজনক হলেও সত্য, পরিপত্রে ভাইস চেয়ারম্যানের কাজ কী হবে, সে সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনাই নেই। পরিপত্রে পরিষদের সভা আহ্বান থেকে শুরু করে উপজেলা চেয়ারম্যানের স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু মূল আইনে, যেহেতু স্থানীয় সাংসদদের পরিষদের উপদেষ্টা রেখে সব ধরনের কাজে তাদের পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। ফলে পরিষদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কি না সে সম্পর্কে সংশয় কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

আারেকটি ব্যাপার ইতিপূর্বে উপজেলা পরিষদের সভায় স্থানীয় উন্নয়ন সম্পর্কিত টিআর প্রকল্প কমিটি গঠন করা হতো এবং বরাদ্দও দেয়া হতো পরিষদের অনুকূলে। কিন্তু অতি সমপ্রতি সরকার টেস্ট রিলিফের (টিআর) চাল ব্যবহারের যে নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে, তাতে প্রকল্প কমিটি তৈরির এখতিয়ার এককভাবে সাংসদদের দেয়া হয়েছে। ফলে স্থানীয় উন্নয়নে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা আরও একপ্রস্থ খর্ব হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সাংসদরাই যদি প্রকল্প কমিটি গঠন ও উন্নয়ন বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়েন, তাহলে একদিকে যেমন দুর্নীতি বেড়ে যাবে, অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় সরকারের সাংবিধানিক অধিকারও ক্ষুণ্ন হবে।

এককথায়, উপজেলা পরিষদ (রহিত আইন পুনঃ প্রচলন ও সংশোধন) আইন ২০০৯ শুধু বাংলাদেশ সংবিধান, বিশ্বব্যাপী স্থানীয় সরকারের প্রচলিত ধারণাই নয় বরং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির এবং গণতান্ত্রিক চেতনাবোধের সাথেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সাংসদরা জাতীয় সংসদে জনগণের জন্য আইন প্রণয়ন করতে গিয়ে সাধারণ জনমত উপেক্ষা করবেন- এটা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু উপজেলা পরিষদ আইনটি পাসের ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী উভয় দলের সদস্যরা নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এর পেছনে উপজেলা ব্যবস্থায় সাংসদদের ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ কাজ করেছে বলে মনে হয়।

নিঃসন্দেহে একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইন প্রণয়নের অগাধ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের রয়েছে, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এই ক্ষমতা সীমাহীন নয় এবং সব ক্ষমতার উৎসই জনগণ। কারণ সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীনে ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে।’ আর তাই আইন হতে হবে জনগণের জন্য। অবিলম্বে তাই আইনটির পুনর্বিবেচনার প্রত্যাশা করি।

 

পার্বত্য জেলায় পারিবারিক আদালত
সরকারের প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ

সেলিনা খাতুন


দেশের তিনটি পার্বত্য জেলায় পারিবারিক আদালত স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে ৩ মে ২০০৯ হাইকোর্ট সরকারের প্রতি একটি রুল জারি করেছে। সেই সাথে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর ১(২) ধারাকে কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না- তিন সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে তার কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ প্রদান করেছে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের যৌথভাবে দায়ের করা এক রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং বিচারপতি মমতাজউদ্দিন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ প্রদান করে।

রিট আবেদনে বলা হয়, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর ১(২) ধারা অনুসারে তিনটি পার্বত্য জেলা বাদে দেশের সব জেলায় পারিবারিক আদালত স্থাপিত হবে। এ কারণে ঐসব জেলায় পারিবারিক আদালত স্থাপন করা যায়নি। ফলে ওখানে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর পারিবারিক ব্যাপারে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ ছিল না। উল্লেখ্য যে, হাইকোর্টের প্রদত্ত একটি রায়ের প্রেক্ষিতে ইতিপূর্বে পার্বত্য জেলাগুলোতে জজকোর্ট স্থাপিত হয়েছে।

আবেদনকারীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট ইদ্রিসুর রহমান এবং তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট তৌফিকুল ইসলাম এবং অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল

মুক্তাশ্রী চাকমা (সাথী)

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এর দেয়া হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশের প্রেক্ষিতে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এ তিন জেলায় আলাদা আলাদা জেলা আদালতের মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত স্থাপন করে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) দেশের সকল নাগরিকের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করায় হাইকোর্ট এই নির্দেশ দেন। একই বছর সেপ্টেম্বর মাস থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল পার্বত্য চট্টগ্রামের আদালতে সংশ্লিষ্ট হয়।

‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ এ শিরোনামে বিশেষ বিধান প্রণীত হয় ১৯৯৫ সালে। এর পূর্বে মূলত Cruelity to women (deterrent punishment) Ordinance 1983 (LX of 1983)- অধ্যাদেশের অধীনে নারীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকল্পে কার্যাদি সম্পন্ন হতো। পরবর্তীকালে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে অপরাধ দমনের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ১৯৯৫ সংশোধিত হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ নামে প্রণীত হয়। এ আইনের অধীনে নারী বলতে ২(ছ) অনুযায়ী যে কোনো বয়সের নারী [অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে জাতীয়তা, গোষ্ঠী ও ধর্মভিত্তিক পরিচয় কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করছে না]।

এ আইনটি অন্য যে কোনো আইন হতে প্রাধান্য পাবে, তা ৩ ধারাতে লিপিবদ্ধ আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নিঃসন্দেহে সব জাতির নারীরা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আশায় দ্বারস্থ হবেন। এ লেখাতে আমি মূলত আদিবাসী নারীদের এ আইনের অধীনে মামলা করার ক্ষেত্রে যেসব অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বা হতে পারে বলে দৃষ্ট হচ্ছে, তার ওপরেই আলোকপাত করছি।

এ আইনের অধীনে নারীর বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ বিচার্য তা হলো-
* শারীরিক মারাত্মক ক্ষতি (৪ ধারা)
* নারী পাচার (৫ ধারা)
* মুক্তিপণ আদায় (৮ ধারা)
* ধর্ষণ, ধর্ষণের ফলে মৃত্যু (৯ ধারা)
* আত্মহত্যার প্ররোচনা (৯ক ধারা)
* যৌন পীড়ন (১০ ধারা)
* যৌতুকের জন্য মৃত্যু (১১ ধারা)
* ধর্ষণের ফলে জন্মলাভকারী শিশু সংক্রান্ত বিধান (১৩ ধারা)।

৪ ধারার অধীনে সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণত আদিবাসী নারীরা তাদের নিজ সমাজের পুরুষ দ্বারা বেশিমাত্রায় নিগৃহীত হয়ে থাকে। তাছাড়া সংখ্যাগুরু সমাজের পুরুষেরা এ অপরাধ সংঘটিত করে গণহত্যা, লুটতরাজজনিত অপরাধ সংঘটনের সময়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নারীরা সর্বাধিক নির্যাতনের শিকার হয় সম্ভবত এ ধারার অধীনে। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে মারধর করা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়া এ ধারার অধীনে যে শারীরিক মারাত্মক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে, তা সংঘটিত না হলেও অত্যন্ত মানহানিকর এক অপরাধ নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হচ্ছে, যা এ ধারার অধীনে অপরাধ বলে গণ্য হচ্ছে না। আদিবাসী যেসব নারী শ্রমিক বিভিন্ন কারখানায় কাজ করছেন, তারাই মূলত এ অপরাধের শিকার। এ অপরাধকে বৈধ রূপ দেয়ার জন্য যে দোষে আদিবাসী নারীটিকে দোষী করা হয় তা হলো সংখ্যাগুরু সমাজের কোনো পুরুষের সাথে মেলামেশা। বেশিরভাগ সময়ই এ মেলামেশার ধরন হলো কথা বলা, বাস কাউন্টারে এক সাথে দেখতে পাওয়া। মোবাইল ক্যামেরাতে তোলা ছবি এ অপরাধের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একজন ভিকটিমের সাথে কথা বলে জানতে পারা যায় এ ধরনের অপরাধের বিচারের জন্য সালিশের আয়োজন করা হয়। ২০-২৫ জন আদিবাসী পুরুষ এ সালিশে উপস্থিত থাকেন। অভিযোগকারীরাই অভিযুক্তকে জেরা করে থাকেন। অভিযোগের অকাট্যতা প্রমাণে ছবি দেখানো হয়। অভিযুক্তের পক্ষে কোনো যুক্তি দেখানোর অবকাশ থাকে না। অপরাধ স্বীকার না করলে ‘প্রহার’ করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রহারকারীর সংখ্যা সর্বনিম্ন ছয়জন। এ পর্যায়ে অপরাধ স্বীকার করে না নিলে ঐ কারখানার কোনো আদিবাসী সংগঠনের কাছে হস্তান্তর করা হয় অভিযুক্তকে। এখানে অভিযুক্ত নারী পুনরায় প্রহারের শিকার হয়, অভিযোগ স্বীকার করে মুচলেকা প্রদান করতে হয়। অধিকাংশক্ষেত্রেই চাকরি ছেড়ে চলে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এ ধরনের অপরাধের শিকার নারীটি সমাজে একঘরে হওয়ার আশঙ্কায় আদালতে বিচারপ্রার্থী হন না।

এরূপ অপরাধ যে শুধু কারখানাগুলোতে সংঘটিত হচ্ছে তা নয়। ভিন্নরূপে এ ধরনের দমন-পীড়ন গ্রামে, শহরে, কলেজে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সংঘটিত হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আদিবাসী সংগঠনগুলোকে এমনকি আদিবাসী নারী সংগঠনগুলোকেও এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।

সামাজিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার যে চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা হতে আদিবাসী পুরুষেরা আদিবাসী নারীদের ওপর এরূপ অবমাননাকর কাজ করে তা নিঃসন্দেহে একজন নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ তার আত্মসম্মানবোধকে আঘাত করে। পারিবারিক বিচার অথবা সামাজিক সুষ্ঠু বিচারের ক্ষেত্রে ‘প্রহারভিত্তিক বিচার’-এর চেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য কোনো পন্থার কথা কেন আদিবাসী পুরুষরা এবং আদিবাসী সংগঠনগুলো বিবেচনা করছে না তা একটি বড় প্রশ্ন। এরূপ অপরাধ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সর্বোপরি তা ‘ওপেন সিক্রেট’ অথচ এ ব্যাপারে অপরাধ প্রমাণে সাক্ষ্য (যার আইনগত গ্রহণযোগ্যতা আছে) যোগাড় করা দুঃসাধ্যই নয়, অসাধ্য।
গত ৪ মে ২০০৯, হাইকোর্ট ডিভিশন সরকারকে কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে পারিবারিক আদালত স্থাপিত হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৫ ধারার অপরাধের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী নারীরা দু’ভাবে অপরাধের শিকার হয়-

* অভ্যন্তরীণ পাচার
* বৈদেশিক পাচার

এরূপ অপরাধ সংগঠনে আদিবাসী নারীদের অতি সরলতা, অজ্ঞতাই অপরাধীদের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।
৮ ধারার অধীনে অপরাধের উল্লেখযোগ্য নজির জানা নেই। ৯ ধারায় ধর্ষণ, ধর্ষণের ফলে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। আদিবাসী নারীরা সাধারণত সংখ্যাগুরু সমাজ কর্তৃক এ অপরাধের শিকার হয়ে থাকে। অতি সম্প্রতি বান্দরবানের লামায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া এ ধরনের অপরাধের সর্বশেষ নজির। এ আইনের ১৭ ধারাতে ট্রাইব্যুনালের অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণের যে নীতি/পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে- তার অধীনে অপরাধীকে কোনো কোনো সময় সব সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিচারের সম্মুখীন করা সম্ভব হয় না। ট্রাইব্যুনালে ‘অপরাধ’ বলে বিবেচিত হওয়ার জন্য যে ছাড়পত্র দরকার হয়, সে ছাড়পত্র প্রাপ্তিতে আদিবাসীরা অহেতুক হয়রানির শিকার হয়।

বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ধর্ষণের মামলায় অপরাধীর শাস্তি হয়েছে এরূপ নজির একটিও নেই। রাঙ্গামাটি BLAST কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট জুয়েল দেওয়ানের সাথে সাক্ষাৎকারে জানা যায়, পূর্বে আদিবাসী নারীরা সাধারণত সংখ্যাগুরু সমাজের পুরুষ কর্তৃক ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত হত্যার শিকার হতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমানে আদিবাসী পুরুষ কর্তৃক এ অপরাধের শিকার নারীর সংখ্যাও কম নয়।

৯ (ক) ধারার অধীনে সংঘটিত অপরাধের উল্লেখযোগ্য নজির জানা নেই। উপরোক্ত আইনের ১০ ধারায় যৌন পীড়নের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের শিকার প্রায় প্রতিটি আদিবাসী নারী। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণের জন্য যে পরিমাণ সাক্ষ্যের প্রয়োজনীয়তা এ আইনে বলা আছে, তা অপরাধ প্রমাণকে অত্যন্ত দুরূহ করে তুলেছে। ১১ ও ১৩ ধারার অধীনে অপরাধের উল্লেখযোগ্য নজির জানা নেই।

প্রচলিত ধারণা এই যে, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা সহিংসতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আদিবাসী নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এ ক্ষেত্রে জোরালো অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আদিবাসী আন্দোলনে আদিবাসী নারীদের যেসব সমস্যা উত্থাপন ও উপস্থাপন করা হয়, তা মূলত আংশিক। আদিবাসী নারীদের নির্যাতনের পূর্ণ চিত্র এখানে তুলে ধরা হয় না। পারিবারিক সহায়তা প্রদানের মানসিকতা বৃদ্ধি, মনোভাব ও আচরণের পরিবর্তন, অদক্ষতা ও তথ্যের অভাব দূরীকরণ, নারীদের মধ্যে নিজ অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার্থে সচেতনতা বৃদ্ধি এ প্রকারের অপরাধ রোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সর্বোপরি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ তদন্ত অপরাধ দমন ও এ আইনের অপব্যবহার রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। তদন্ত পরিচালনার সময় কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর প্রতিভূ না হয়ে, নিরপেক্ষভাবে অপরাধীকে শাস্তি প্রদানে প্রশাসন যথাযথ ভূমিকা পালন করবে এটাই কাম্য।


খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ

প্রতিটি জেলায় আদালত গঠনে হাইকোর্টের নির্দেশ
তাবাস্‌সুম মখ্‌দুমা


প্রতিটি জেলায় স্বতন্ত্র আদালত (ফুড কোর্ট) স্থাপনের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ১ জুন, ২০০৯ তারিখে হাইকোর্ট এই নির্দেশ দেন। একই সাথে প্রতিটি জেলায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক ‘খাদ্য বিশেষজ্ঞ’ ও ‘খাদ্য পরিদর্শক’ নিয়োগেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী আগামী এক বছরের মধ্যে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে হলফনামার মাধ্যমে আগামী ১ জুলাই, ২০১০ তারিখের মধ্যে আদালতকে জানাতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার ও ফুড অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের সদস্যসচিবকে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

খাদ্যে ভেজাল রোধে সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ‘জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল’ গঠনের নির্দেশনা চেয়ে গত ১৮ জানুয়ারি, ২০০৯ তারিখে জনস্বার্থে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)-এর পক্ষে ছয় আইনজীবী এ রিট দায়ের করেন, যার চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট এসব নির্দেশনা দেন।

প্রাথমিক শুনানি শেষে পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ অনুযায়ী ‘জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল’ গঠনে সরকারকে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানাতে সরকারের প্রতি রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। রিট আবেদনে বলা হয়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল মিশিয়ে পণ্য বিক্রি করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিষাক্ত কেমিক্যাল, রঙ, ইউরিয়া, ফরমালিন ইত্যাদি মিলিয়ে থাকে, যা দেশের যে কোনো নাগরিকের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯-এর ৪ ধারা অনুযায়ী জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল গঠন করে ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধের বিধান রয়েছে যদিও সরকার এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এর ফলে ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণ করে জনসাধারণ কিডনি, যকৃত, ক্যান্সারসহ মারাত্মক সব জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ভেজাল প্রতিরোধে সরকারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে রিটে আবেদন করা হয়।

উল্লেখ্য, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এই নির্দেশ দেন, যেখানে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন মনজিল মোরশেদ আর সরকারপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম ইনায়েতুর রহীম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল করুণাময় চাকমা।

 

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯

আতিয়া নাজনীন


চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার অধিকার জনগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত (অনুচ্ছেদ ৩৯) এবং তথ্য জানার অধিকার হচ্ছে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার অধিকার অর্জনের অন্যতম শর্ত। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০ অক্টোবর ২০০৮ প্রণয়ন করে তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ। যাই হোক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জারি করা মোট ১২২টি অধ্যাদেশের মধ্য থেকে বর্তমান সরকার যে ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেয়, এই অধ্যাদেশ তার মধ্যে একটি। গত ৫ এপ্রিল ২০০৯ জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার প্রেক্ষিতে এবং রাষ্ট্‌্রপতির সম্মতি লাভের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হয়। উল্লেখ্য, অতীত কার্যকারিতা দেয়ার ফলে এই আইনটি কার্যকর হয়েছে ২০ অক্টোবর ২০০৮ থেকে। তবে আইনের ৩টি ধারা- ৮, ২৪ এবং ২৫ ধারার কার্যকারিতা শুরু হবে ১ জুলাই ২০০৯ থেকে।

আইনটির প্রস্তাবনার আলোকে বলা যায়- সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এই আইন প্রণীত হয়েছে।

প্রথমেই জানা যাক, এই আইনে ‘তথ্য অধিকার’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? আইনের ২ (ছ) ধারা অনুযায়ী ‘তথ্য অধিকার’ অর্থ হচ্ছে কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার। আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য জানার অধিকার আছে এবং কোনো নাগরিকের তথ্যানুসন্ধানের প্রেক্ষিতে ঐ কর্তৃপক্ষ বাধ্য থাকবে তাকে তথ্য জানাতে। এই আইনে ‘কর্তৃপক্ষ’ বলতে বোঝানো হয়েছে -

* বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সৃষ্ট কোনো সংস্থা;
* সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়;
* আইনের অধীনে সংবিধিবদ্ধ কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান;
* সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বা সরকারি তহবিল হতে সাহায্যপুষ্ট কোনো বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান;
* বিদেশি সাহায্যপুষ্ট কোনো বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান;
* সরকার, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান;
* সময়ে সময়ে সরকার কর্তৃক গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান।

যে কোনো নাগরিক লিখিতভাবে বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম বা ই-মেইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তার কী তথ্য প্রয়োজন তা জানাতে পারবেন। অনুরোধ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহ করবেন। এরূপ তথ্য কোনো ব্যক্তির জন্ম-মৃত্যু, গ্রেফতার বা কারাগার থেকে মুক্তি সংক্রান্ত হলে অনুরোধ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করতে হবে। এ আইন কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কার্যালয়, সংস্থা ও প্রতিটি দপ্তরে তথ্য প্রদান ইউনিট স্থাপন এবং আইন জারির ৬০ দিনের মধ্যে ঐ ইউনিটের জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। প্রসঙ্গতই প্রশ্ন আসতে পারে, কোনো নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার প্রত্যাখ্যাত হলে এই আইনে কী প্রতিকার পাওয়া যাবে?- যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়া কোনো নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হলে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য প্রদান করা না হলে, তথ্য কমিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার এ আচরণকে অসদাচরণ গণ্য করে কমিশন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করতে পারে।

আইনের ৩২ ধারানুযায়ী, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা গোয়েন্দা কাজে নিয়োজিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান, যেমন-জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা শাখা, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা সেল, পুলিশের বিশেষ শাখা ও র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখাকে এ আইনের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ তারা জনগণকে তথ্য জানাতে বাধ্য থাকবে না। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, এই সংস্থাগুলোর কয়েকটি দ্বারাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে অনেক। তবে সুখের কথা, ৩২(২) ধারায় স্পষ্ট করে বলা আছে, এরূপ কোনো সংস্থা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত থাকলে সেক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।

আলোচনার এই অংশে যে আরেকটি বিষয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি তা হচ্ছে, তথ্য অধিকার আইন ও অন্য কোনো আইনের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দিলে কোন আইনটি প্রাধান্য পাবে? এ প্রসঙ্গে আইনের ৩ ধারা (আইনের প্রাধান্য) যা বলে তা হলো-

“প্রচলিত অন্য কোন আইনের-
(ক) তথ্য প্রদান সংক্রান্ত বিধানাবলী এই আইনের বিধানাবলী দ্বারা ক্ষুণ্ন হইবে না।
(খ) তথ্য প্রদানে বাধাসংক্রান্ত বিধানাবলী এই আইনের বিধানাবলীর সহিত সাংঘর্ষিক হইলে, এই আইনের বিধানাবলী প্রাধান্য পাইবে।”

দেখা যাচ্ছে, উপধারা (ক) এবং (খ) সুস্পষ্টভাবেই পরস্পরবিরোধী। উপধারা (ক)-তে বর্তমান আইনটির তুলনায় তথ্য প্রদান সংক্রান্ত প্রচলিত অন্য আইনের প্রাধান্য স্বীকার করা হয়েছে। আবার একই ধারার (খ) উপধারায় এই আইনটিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

ক্স আইনের বিধানানুসারে, যখন কোনো বিশেষ আইনের সাথে সাধারণ আইনের সংঘর্ষ দেখা দেয়, তখন বিশেষ আইনটিই প্রাধান্য পায়। তথ্য অধিকার আইনটি একটি বিশেষ ধরনের আইন, তাই এই আইনটির প্রাধান্যই স্বীকার্য। সেক্ষেত্রে অবশ্যই ৩ ধারার (ক) উপধারাটি না থেকে শুধু উপধারা (খ) থাকলে আর কোনো ধরনের দ্ব্যর্থতার অবকাশ থাকবে না। যাই হোক, অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করার সময় কয়েকটি ক্ষেত্রে সংশোধনী আনা হয়।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা জনগণের অধিকার। আইনটি সংসদে পাস হওয়ার ফলে এই অধিকারটি জনগণের হাতের কাছে এসেছে। যেহেতু বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী রাষ্ট্‌্েরর সব ক্ষমতার মালিক জনগণ তাই শুধু কথায় নয় বরং একথা কাজে প্রমাণ করতে হলে বাস্তবিক অর্থেই এটা অনুধাবন করা জরুরি যে, তথ্য জানার অধিকার জনগণের ক্ষমতায়নের অপরিহার্য অংশ। এক্ষেত্রে আমরা প্রতিবেশী দেশ ভারতকে উদাহরণ হিসেবে সামনে আনতে পারি। ২০০৫ সালে সেখানে তথ্য অধিকার আইন পাস হয়। আইনটি পাস হওয়ার পর দেখা গেল, আইনটি সবচেয়ে কার্যকর হয়েছে দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের নিম্নতম পর্যায়ে। আমাদের দেশেও আইনটির সুফল এরকমভাবে স্থানীয় পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে- এটাই এখন কাম্য। আর এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন, আইনটি কার্যকর হওয়ার আগেই এতে বিদ্যমান অসঙ্গতিগুলো দূর করে কীভাবে একে আরো গণমুখী করে তোলা যায় অবিলম্বেই সেদিকে আইনপ্রণেতাদের নজর দেয়া।

ঢাকার চার নদীর তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে
হাইকোর্টের রুল
তাবাস্‌সুম মখ্‌দুমা


ঢাকার চার নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার তীরবর্তী সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদীগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রকৃত সীমানা নির্ধারণের জন্য কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। গত ২৪ মে ২০০৯, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ঢাকার মৃতপ্রায় চার নদীকে বাঁচাতে এ আদেশ দেন।

একই সাথে আদালত এই রিট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই চার নদীর তীরে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণসহ আবারও মাটি ভরাটের কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য বিবাদিদের প্রতি আদেশ দেন। রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মনজিল মোরশেদ শুনানিতে বলেন, অবৈধ দখলদারদের জন্য দেশের নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তাই পরিবেশ বিপর্যয় রোধে তিনি আদালতের কাছে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করেন।

রিটে বলা হয়, বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ফলে পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয় ঘটেছে। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ২০০০ সালের জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নদীর স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করা বেআইনি। অথচ প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়। এই আবেদনে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত নদী বাঁচাও আন্দোলনের সংবাদও তুলে ধরা হয়।

উল্লেখ্য, মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ আইনজীবী- আসাদুজ্জামান, ছারওয়ার আহাদ চৌধুরী, এখলাস উদ্দিন ভূঁইয়া, তপন কান্তি দাস ও মামুন আলম এই রিট আবেদন করেন।

সরকারপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোস্তফা জামান ইসলাম। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী নির্যাতন তদন্তে কমিশন গঠনে
সরকারের প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশনা

শাহ আলম ফারুক

হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আগামী দুই মাসের মধ্যে ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও সংখ্যালঘুসহ তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর সরকারদলীয় সমর্থকদের নির্যাতনের উদ্ঘাটনকল্পে তদন্ত কমিশন গঠন করতে সরকারকে নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সাথে কমিশন গঠন হওয়ার পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে রিপোর্ট দাখিলেরও নির্দেশ দেয়া হয়। স্বরাষ্ট্র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর সচিব, মহাপুলিশ পরিদর্শক, অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক ও ছয়টি বিভাগীয় অঞ্চলের উপ-মহাপরিদর্শককে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ-এর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের সাত আইনজীবী এ রিট করেন। ওইদিন শুনানি শেষে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা যাচাইয়ে কেন তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে না, তা জানাতে সরকারের ওপর রুল জারি করা হয়। রুলের ওপর শুনানিকালে ৬ মে ২০০৯ তারিখে আদালত সরকারকে সময় বেঁধে দিয়ে কমিশন গঠনের নির্দেশ প্রদান করেন।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তীকালে দেশের যে ক’টি এলাকায় নৃশংসতম নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে অন্যতম জনপদ ভোলা। ভোলার লালমোহন, চরফ্যাশন, সদর, দৌলত খাঁ উপজেলা কোথায় নিপীড়ন হয়নি। সবচেয়ে নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছিল লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত চর অন্নদাপ্রসাদ, ফাতেমাবাদ, পেয়ারী মোহন নামের গ্রামগুলোতে। নির্বাচনের পর দু’তিনদিন সেখানে ধর্ষণ, লুট, নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। শাশুড়ির সামনে পুত্রবধূ, বাবা-মার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়সী স্ত্রীলোকেরা যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের এক চরম দৃষ্টান্ত। সেদিন স্থানীয় থানা প্রশাসন এসব নির্যাতিতের পাশে প্রথমে দাঁড়ায়নি। পরবর্তীকালে আসকসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনের তৎপরতায় কিছু মামলা রেকর্ড হয়, যার মধ্যে দু’একটি মামলার রায়ও হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর নির্যাতন ইস্যুতে আসকের দায়েরকৃত রিট হাইকোর্টে বিচারাধীন আছে।

২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা থেকে আসক ভোলার নির্যাতিত মানুষগুলোর নিয়মিত খোঁজখবর করা অব্যাহত রেখেছে। এরই অংশ হিসেবে ২৭ ডিসেম্বর, ২০০৮ তারিখে নির্বাচনের প্রাক্কালে পূর্ববতী নির্বাচনের ভিকটিমদের মানসিক অবস্থা ও নির্বাচনপূর্ব সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে জেলা সদর থেকে যাত্রা শুরু সাতসকালে। প্রথম গন্তব্য ভোলা জেলার সর্বদক্ষিণের উপজেলা চরফ্যাশন। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় মধ্যবেলা। চরফ্যাশন বাজারের ব্রিজের গোড়ায় একসময় অটো মেকানিক ক্ষুদিরামের দোকান ছিল। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর চাঁদা চাওয়া হয়েছিল ক্ষুদিরামের কাছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করার মতো বোকামি সে করেনি, শুধু কিছু সময় চেয়েছিল। কিন্তু তাকে সময় না দিয়ে তারই মেকানিক দোকানের সরঞ্জামাদি দিয়ে প্রকাশ্য বাজারে মানুষজনের সামনে পিটিয়ে মূমুর্ষ করে ফেলে তাকে। এমনকি চরফ্যাশন হাসপাতালেও রাজনৈতিক দলের পরিচয়ধারী সন্ত্রাসীরা তার চিকিৎসায় বাধা দেয়। এ অবস্থায় হামলার সামান্য সময়ের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন ক্ষুদিরাম মেকানিক। স্বজনেরা প্রতিকারের আশায় মামলা করেছিলেন। কিন্তু আবারও সেই রাজনীতি। অভিযোগ আছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জোটের চাপে এক পর্যায়ে মামলাটিও তুলে নিতে বাধ্য হন ক্ষুদিরামের শোকাহত স্বজনরা।

ক্ষুদিরামের বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরাম, ভোলার কনভেনর সাংবাদিক মুবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী এবং আসক তদন্ত কর্মকর্তার (প্রতিবেদক) সাথে হিন্দু সমপ্রদায়ের অনেকের কথা হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের অনুভূতি কী। পরিস্থিতি কেমন মনে করছেন। আমাদের মনে ছিল ২০০১-এর সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংস ঘটনাগুলোর কথা। নির্বাচন-পূর্ববর্তী অবস্থা পর্যবেক্ষণে চরফ্যাশন থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো লালমোহনের লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে। একটু ঘুরপথে বেড়ির ওপর দিয়ে দু’তিন কিলোমিটার গিয়ে গ্রামীণ রাস্তায় চার-পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছিল। এ যাত্রায় নির্যাতিত পরিবারের সদস্য, গ্রামবাসী, রিকশা, শ্রমিক, চা দোকানি, পথিক অনেকের সাথে কথা হয়। প্রায় সবাই নির্বাচনপূর্ব পরিবেশকে ভালো বললেন, জানালেন প্রশাসন তৎপর। সন্ত্রাসীরা দাপট দেখাচ্ছে না। ভয়মুক্তভাবে এবার ভোট দেয়া যাবে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০০১-এর মতো নির্বাচনপূর্ব সহিংসতা এবার ছিল না। পরিবেশ ছিল শান্ত।

এমন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিন কুমিল্লা সদর উপজেলার দক্ষিণ হাজতিয়া গ্রামের হাইস্কুলের শিক্ষক মাস্টার শামসুল হক ছিলেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে কুমিল্লা-১০ আসনের চারদলীয় প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট। আসক ও ব্লাস্টের যৌথ তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়- ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণের পর ভোট গণনা শেষ হয়। ভোট গণনা শেষে প্রতিদ্বন্দ্বী মহাজোট প্রার্থীর এজেন্টের সাথে কোলাকুলি করে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে বাড়িতে ফিরছিলেন মাস্টার শামসুল হক। বাড়ি ফেরার পথে স্কুল গেট বরাবর এলে বিদ্যুৎ চলে যায়। বিদ্যুতহীন অন্ধকারে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে এগোতেই পেছন থেকে মাস্টার শামসুল হকের মাথা-ঘাড় বরাবর হকিস্টিক দিয়ে আঘাত করা হলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। শামসুল হক তখন ছাত্রের বয়সী এলাকার লোকমান-জাফরসহ কয়েকজনকে দেখতে পান। এরপর লোকমান ‘তুই লোটাস কামালকে (মহাজোটপ্রার্থী আনহ মোস্তফা কামাল) গালি দিয়েছিস’- এ কথা বলে প্রথমে ডান কান, পরে লাঠি, হকিস্টিক দিয়ে মাস্টারকে পেটাতে থাকে। এক পর্যায়ে ওরা মূমুর্ষ অবস্থায় শামসুল হককে তার বাড়ির গেটের সামনে ফেলে যায়। সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে গুরুতর অসুস্থ মাস্টারকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়া যায়নি। পরে ভোররাতে মাস্টারকে কুমিল্লার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২.১.২০০৯ ভোরে তার মৃত্যু ঘটে। অভিযুক্ত লোকমান আওয়ামী লীগ কর্মী বলে এলাকায় পরিচিত। মাস্টারের মৃত্যুর পর এলাকার কথিত মাতব্বররা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের চেষ্টা করে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে লাশের ময়নাতদন্ত হয়। মাস্টারের বড় মেয়ে শামীমা নাসরীন বাদি হয়ে থানায় মামলা করেছেন। অবিবাহিত পাঁচ মেয়ে আর এক সদ্য তরুণ ছেলেকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে সঁপে দিয়ে কতিপয় রাজনৈতিক কর্মী নামধারী সন্ত্রাসীদের নির্যাতনে প্রাণ হারালেন মাস্টার শামসুল হক।

নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতি সন্তোষজনক থাকলেও নবম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে দেশের নানা স্থান থেকে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার তথ্য পত্রপত্রিকায় ছাপা হতে থাকে। পরিস্থিতিদৃষ্টে মনে হচ্ছে- আমাদের জাতীয় নির্বাচনের সাথে (যার শুরু ২০০১-এ) সহিংসতার এক নতুন যোগসূত্র স্থাপন হয়েছে। পাঁচ বছর পর নির্বাচন হবে- এরপর বিজয়ী দল প্রতিশোধ নিতে বিজিত (কোথাও কোথাও উল্টোটাও হচ্ছে) দলজোটের সমর্থকদের ওপর চরম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে খুনোখুনি, লুটপাট তাণ্ডব চালাবে। দোকান-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করবে। ক্ষেতের ফসল থেকে শুরু করে ঘরের সাধারণ জিনিসপত্রও লুট করবে। এর মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছু সত্য বাকিটা অতিরঞ্জিত বলে দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করবেন। শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই নয় বিগত চারদলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সংসদে বলেছিলেন, যারা এ ধরনের প্রচারণা চালিয়ে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। শুধু হুমকিই নয়, নির্বাচনোত্তর সহিংসতা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও কথা বলায় সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরকে ২০০১ সালের ২২ নভেম্বর কলকাতা যাওয়ার সময় এয়ারপোর্ট থেকে আটক করা হয় এবং পরে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকাবস্থায় তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অতি বর্ধিত মেয়াদকাল, সাংবিধানিক দায়দায়িত্বের অতিরিক্ত বহুবিধ কর্মকাণ্ড নিয়ে আইনি ও নৈতিক বিতর্ক থাকলেও একটি স্বচ্ছ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সত্যিকার পরিবেশ এবং মাঠ পর্যায়ে আস্থা সৃষ্টিতে তারা বেশ সফল হয়েছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে এবারের সংসদ নির্বাচন ছিল উৎসবমুখর ভয়হীন। অতি বিশাল বিজয় পেয়েও বিজয় মিছিল না করার মহাজোটের নেত্রীর সিদ্ধান্তও ছিল অভিনন্দনযোগ্য। বোঝা যাচ্ছিল যে, বিগত সরকারের আমলের নির্যাতিত লোকগুলো প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে। সন্দেহটা অমূলক ছিল না। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে পুরোনো আমলে সংঘটিত নির্যাতন ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয়া গণতান্ত্রিক আচরণ নয়। আগে কেউ অবৈধভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কোনো কিছু দখলে রাখলে, তাও আইনানুগ প্রক্রিয়াতেই উদ্ধার করতে হবে। এক্ষেত্রে আগে চাঁদা দিয়েছি এখন চাঁদা নেবো, আগে মার খেয়েছি এখন মার দেবো-এসব চর্চা আর যাই হোক গণতান্ত্রিক হতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে এর কোনো শেষ থাকবে না। মহান একুশের দলীয় আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন- আগের (চারদলীয় জোট) সরকারের মতো আচরণ করলে জনগণ আবার তাদের মতো জবাব দেবে। ইতিমধ্যে নির্বাচনোত্তর সহিংসতার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক চোখে পড়েছে। আগে থানায় মামলা নিতেই যেখানে পুলিশ অপারগতা প্রকাশ করতো, এবার অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার সাথে সাথে মামলা নেয়ার খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। বেশ ক’জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

আমরা আশা করি, এ ব্যাপারে কালক্ষেপণ না করে সরকার উচ্চ আদালতের বেঁধে দেয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিশন গঠন করে ২০০১ থেকে নির্বাচন-পরবর্তী সব ভয়াবহ ঘটনা চিহ্নিত ও এর আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করাসহ ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণের ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। এক্ষেত্রে কোন ঘটনাগুলো পূর্বের কৃতকর্মের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ঘটেছে, কোন ঘটনাগুলো পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে করা হয়েছে, সাধারণত কারা এ ধরনের সুযোগ নেয়, কারা শিকার হয়, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা লুটেরা অসৎ ব্যক্তি কারা, কীভাবে থানা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেসময়ে কাজ করেছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক ও জনপ্রতিনিধিরা কী ধরনের ভূমিকা রেখেছেন- এ সবকিছুই তদন্তে বেরিয়ে আসা উচিত। সময়কাল বা অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না এনে এরকম দুর্বৃত্তপনার সাথে জড়িত সবার আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করাকে সরকারের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।