প্রচ্ছদ-কাহিনী
কৃষ্ণা ব্যানার্জীর সাক্ষাৎকার
শরণার্থী শিবিরের অভিজ্ঞতা
১৯৭১
কুর্রাতুল আইন তাহ্মিনা
আসক পরিচালিত কথ্য ইতিহাস প্রকল্পটির (১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত) অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নারীর অভিজ্ঞতার বয়ান লিপিবদ্ধ করা। তা থেকে ২০০১-এর ফেব্রুয়ারির অমর একুশে বইমেলায় ঊনিশ জন ক্ষতিগ্রস্ত নারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘নারীর ৭১ ও যুদ্ধপরবর্তী কথ্যকাহিনী’ বইটি প্রকাশিত হয়। সেসময় প্রকল্পের গবেষকেরা তথ্য সংগ্রহের জন্য কয়েকজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম পশ্চিমবাংলার সমাজকর্মী কৃষ্ণা ব্যানার্জির সাক্ষাৎকারটি। প্রকল্পের পক্ষ থেকে ১৯৯৭-এর ৭ জুলাই, ফ্রিলান্স সাংবাদিক কুর্রাতুল আইন তাহ্মিনার গ্রহণ করা কৃষ্ণা ব্যানার্জির এ সাক্ষাৎকারটি প্রথমবারের মতো আসক বুলেটিনে মুদ্রিত হলো।
১৯৭১ সালে কৃষ্ণা ব্যানার্জী কলকাতায় Women’s Welfare নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মনে আছে, ৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতার ক্যাসেট তাঁরা বারবার শুনতেন; ২৫ মার্চের ঘটনা তাঁদেরকে খুবই আলোড়িত করেছিল- কলকাতায় মার্চ মাসজুড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সপক্ষে সহমর্মিতা জানিয়ে অনেক সমাবেশে তিনি যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একটি লজ্জাবোধও তখন কাজ করেছে যে, বাঙালি হয়ে পশ্চিবঙ্গবাসীরা বাংলাভাষার জন্য তেমন কিছুই করতে পারেননি।
৩০ বা ৩১ মার্চ তাঁর সংস্থার পরিচালক মিসেস প্রতিমা রায় তাঁদের বললেন শরণার্থী মেয়েদের মাঝে কাজ করার জন্য। ওঁরা নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নেন। কৃষ্ণা ব্যানার্জী, উনি তখন দেখতেন সংস্থার গৃহকল্যাণ বিভাগ, যেটি income generation-এর কাজ করত, দায়িত্ব পেলেন নানান মাপের হাজার হাজার পেটিকোট ও ব্লাউজ তৈরি করানোর। কাপড় যোগাড় করলেন প্রতিমা রায়।
ওঁদের কাজটা ছিল শরণার্থী শিবিরে আসা নির্যাতিত মেয়েদের নিয়ে। তাঁরা ঐ মেয়েদের চিকিৎসা এবং আশ্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতেন। কৃষ্ণা ব্যানার্জীর দায়িত্ব হলো আরও দু’তিনজনের সাথে গিয়ে ক’জন মেয়ে আনবে, কোথায় কী ব্যবস্থা হবে সেই যোগাযোগটা করা।
কলকাতার সল্ট লেক তখন ফাঁকা ময়দান। হিলি সীমান্ত থেকে সল্ট লেক পর্যন্ত লাখ লাখ উদ্বাস্তু মানুষের শিবির। কৃষ্ণা ব্যানার্জীর জানামতে, সব জায়গা থেকে আসা নির্যাতিত মেয়েদের এই শিবিরেই রাখা হতো। প্রথম যেদিন তিনি সল্ট লেকে শরণার্থী শিবিরে গেলেন তাঁর কাছে মনে হয়েছিল মানুষের সমুদ্র। তাঁর আরও মনে আছে, কেনেডির ব্যবস্থাপনায় মার্কিন Volunter রা কীভাবে শিবির ঠিকঠাক গড়ে দিয়েছিল।
“আমি প্রায় প্রতিদিনই যেতাম... যেখানে মেয়েদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল সেখানে গিয়ে মেয়েদের ওঁরা জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। আমাদের বলেছিলেন খুব বেশি খোঁচাখুঁচি করবে না, কারণ ওরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আছে, ওদের খুব প্রশ্ন করে না। ওরা নিজে থেকে যেটুকু বলে। সেখানে আমি দেখেছিলাম সব বয়সের মেয়েরা ছিল। একেবারে কিশোরী তো বটেই, মানে ১০-১২ বছরের মেয়ে থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী মহিলাদের পর্যন্ত সেখানে রাখা হয়েছিল, যাঁরা গর্ভবতী হয়ে গিয়েছিলেন।”
প্রচুর সংখ্যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এরকম নির্যাতিত মেয়েরা এসেছেন পুরো যুদ্ধকাল ধরে। কৃষ্ণা ব্যানার্জীদের প্রথম কাজ ছিল বস্ত্র যোগাড় করা। ভারত সরকার থেকে অল্পদামের একটা শাড়ি দেয়ার ব্যবস্থা হলো। আর এঁরা অন্য জামাকাপড় তৈরি করিয়ে দিতে লাগলেন: ‘আর আরেকটা কাজ ছিল, ওই মেয়েদের কে কেমন অবস্থায় আছেন- যাঁদের গর্ভপাত করানো যাবে তা করানো, নয়তো তাঁদের সেখানে রেখে বাচ্চা জন্ম হওয়ার পর সেই বাচ্চাদের কোথাও দত্তক দেয়ার ব্যবস্থা করা বা কোথাও আশ্রমে রাখা। তখন কলকাতায় এরকম আশ্রম খুব বেশি ছিল না, মাদার তেরেসা কিছু নিয়েছিলেন।’
তখন বেসরকারি সাহায্য সংস্থাও তেমন একটা বেশি ছিল না। পুরনো কংগ্রেসী আমলের কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ছিল তার মহিলারা এই কাজে এগিয়ে আসেন। কৃষ্ণা ব্যানার্জী টালিগঞ্জের অশোক অ্যাভিনিউর এরকম একটি সংস্থায় পান্নাদি নামে এক মহিলাকে জানাতেন কতজন মেয়ে আসবে, ওই সংস্থা তখন বন্দোবস্ত করত। এরকম আরও কিছু সংস্থা তখন কাজ করেছে কিন্তু তাদের নাম উনি চট করে মনে করতে পারলেন না। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো তখন একটা সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে কাজ করত। মহিলাদের সংস্থাই বেশি ছিল। এই সমন্বয় কমিটি মুজিবনগর সরকারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। তবে কৃষ্ণা ব্যানার্জী বলছিলেন, মুজিবনগর সরকার তখন স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়েই এত ব্যতিব্যস্ত যে মেয়েদের সমস্যাটা পুরো শরণার্থী সমস্যার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতো।
নির্যাতিত মেয়েদের অবস্থা অনুযায়ী শরণার্থী শিবির থেকে ভাগ ভাগ করে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হতো। যাঁদের গর্ভপাত করানো হতো, তাঁরা পরে আবার শিবিরেই ফিরে আসতেন। যাঁদের বাচ্চা হতো তাঁদের বেশ কয়েকটা হোমে রাখা হয়েছিল। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃষ্ণা ব্যানার্জী এরকম কয়েকশ’ মহিলার বন্দোবস্ত করেছিলেন।
এই মেয়েরা কখনো পরিবারের সাথে এসেছেন, কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে এসেছেন। যাঁরা পরিবারের সাথে এসেছিলেন: ‘এমনও হয়েছে যে পরিবাররা তাঁদের ফেরত নিয়েছে- আমি যতদূর জানি গর্ভপাতের পর তাঁরা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। আবার অনেকে যেতে চাননি। মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত ছিলেন যে তাঁরা পরিবারের লোকদের সাথে কথা বলতে চাইতেন না, যেতে চাইতেন না। এই মেয়েদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুই সমপ্রদায়ের লোকই ছিল।’
যে মেয়েরা পরিবারে ফিরতে চাইতেন না, তাঁদের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর সমন্বয় কমিটি কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। কৃষ্ণা ব্যানার্জী কাউন্সেলিংয়ের কাজে ছিলেন না, তবে তাঁর ধারণা হয়েছিল যে কাউন্সেলিংটা খুব একটা ভালোভাবে হতো না: ‘ওই একটা চেষ্টা করা ধমক-ধামক দিয়ে যাও, নিতে চাইছে যখন, যাবে না কেন? কিন্তু জিনিসটা বুঝে- তখন যদি আমার আজকের এই অভিজ্ঞতা থাকত তবে আমি ওদের অনেক বেশি সাহায্য করতে পারতাম।’
অনেক মেয়েকে কোথাও কাজ দিয়েও রাখা হতো। ডিসেম্বরের পর তাঁদের বাংলাদেশে চলে আসতে বলা হয়। বাংলাদেশ সরকারও তাঁদের ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট ছিল। কৃষ্ণা ব্যানাজী বলছিলেন যে যদিও ভারত সরকার সবাইকে ফেরত যেতে বলেছিল, অনেকে বিশেষ করে হিন্দু মেয়েরা রয়ে যেতেই চাইতেন। তবে আস্তে আস্তে অনেকেই বাংলাদেশে ফিরে আসেন বলে কৃষ্ণা ব্যানার্জীর ধারণা।
যাঁরা রয়ে গিয়েছিলেন বা রয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তাঁদের সম্বন্ধে কৃষ্ণা ব্যানার্জী বলছিলেন: ‘আমরা যাঁদের দেখেছি তাঁরা মূলত নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর। কারণ যাঁরা একটু উচ্চবিত্ত শ্রেণীর ছিলেন, তাঁরা তাঁদের আত্মীয়-স্বজন, চেনাশোনাদের মধ্যে জায়গা খুঁজে নিয়েছিলেন যেভাবেই হোক। তাঁরা শরণার্থী শিবিরে যাননি। আমাদের ওপর যে মেয়েদের ভার ছিল তাঁরা নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর।’
এই মেয়েদের ‘সেবিকা’ বা আয়া ধরনের একটি কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে কিছু কাজে ঢোকানো হয়েছিল, পরবর্তীকালে তাঁরাও অনেকে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। বাচ্চাদের বেশিরভাগকেই বিদেশিরা দত্তক নিয়ে নেয়। কৃষ্ণা ব্যানার্জীর হাত দিয়েই ৭০-৭৫ জন বাচ্চার দত্তকের বন্দোবস্ত হয়েছিল। এবং বিদেশি পরিবাররা এসে নিয়ে গিয়েছিল অর্থাৎ দত্তকের নামে বাচ্চাদের বিক্রি করার ব্যাপারটা তিনি অন্তত লক্ষ্য করেননি। সরকারি ও বেসরকারি যেসব সংস্থা দত্তকের ব্যাপারটা দেখেছে তারা ভালো সংস্থা ছিল বলেই তাঁর মনে আছে।
নির্যাতিত মেয়েদের কী অবস্থা দেখেছিলেন তিনি? ‘অনেকে অন্তত শতকরা চল্লিশজন মেয়ে অত্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল। সেটা খুব স্বাভাবিক। কেউ কেউ কথা বলতে চাইতো। অনেককে কী রকম একটা দাগ (চিহ্ন) দেয়া হয়েছিল অর্থাৎ তাকে যে rape করা হয়েছে, সে রকম একটা চিহ্ন ওরা দেখাত আমাদের। ... অনেকে খুব বেশি কথা বলত। মানে যেন সবকিছু বলে ফেলবার ... কী কী করল এমন ঘটনা বিশদ বলার চেষ্টা করত। আবার অনেকে একেবারে চুপ। কিছুই বলতে চাইত না।’
কথা প্রসঙ্গে, শরণার্থী শিবিরে দেখা আরেকটি ঘটনার কথা বলছিলেন কৃষ্ণা ব্যানার্জী। ত্রাণ কাজে আসা সম্মানিত/সাধারণ পুরুষ নির্বিশেষে কারোর কারোর মধ্যে এমন প্রবণতা দেখেছেন যে এই মেয়েরা তো ধর্ষিতা হয়েছে, সুতরাং সহজলভ্য। মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার ঘটনাও তিনি দেখেছেন। আবার এই মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টাও তিনি লক্ষ্য করেছেন। তাঁরা এসব দিকে কড়া নজর রাখতেন। কিন্তু তাঁর ধারণা, এদিক থেকে ওদিক থেকে কিছু মেয়েকে হয়তো ‘টেনে বের করে নিয়ে গেছে।’ মেয়েদের, সবারই প্রচণ্ড অভাব-কষ্ট তো ছিলই।
এই মেয়েদের কেউ কেউ শহরাঞ্চলের হলেও বেশিরভাগই ছিল গ্রামের। তাঁরা বলতেন, নির্যাতনকারীরা ছিল ‘খানসেনা’। একজনের কথা কৃষ্ণা ব্যানার্জীর মনে আছে, এক মহিলা তাঁর বয়স হয়েছে অর্থাৎ তাঁর ছেলেমেয়ে আছে। কোথায় তারা আছে তা তিনি জানতেনও না। তারপর তিনি raped হয়ে গর্ভবতী হন। তাঁর গর্ভপাত করানো গিয়েছিল। কিন্তু তিনি এটা কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না- তিনি সমানে বলছিলেন... ‘এই রাক্ষসকে বার করে দাও, আমার আসল ছেলেমেয়েদের আমি কখন খুঁজে পাব।’ তাঁর একবারও দ্বিধা হয়নি যে এটাকে বাদ দিয়ে দেয়া উচিত। আর পাগলের মতো ভাবছিলেন কোথায় পাবেন ছেলেমেয়েকে।
শরণার্থী শিবিরে অনুসন্ধান কেন্দ্র থাকলেও ওই মহিলা তাঁর সন্তানদের ফিরে পেয়েছিলেন কি না কৃষ্ণা ব্যানার্জীর তা জানা নেই। ‘এমন একটা আংশিকভাবে কাজগুলো হয়েছে না- আর এত বড় ব্যাপার যে ঐভাবে সব জায়গায় গিয়ে খোঁজ নেয়া সম্ভব ছিল না। অনেক পরে যখন সব চুকে গেল তখন আমি খোঁজ নিয়েছিলাম... কিন্তু তখন সব এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে।’
ধর্ষিত মেয়েদের শরীরে প্রচুর মারধর, কাটাকাটি, ক্ষত- এসবের চিকিৎসাও করতে হয়েছে। ওঁরা অন্য নির্যাতনগুলোর কথাও বলতেন ‘যেমন বলেছে যে, ‘আমাদের অনেকে একসঙ্গে ধরেছে- কেউ মারছে’- মানে rapeটা যেন নির্যাতনেরই (torture) একটা অংশ। ওদের মনেও কিন্তু শুধু rape না, এই পুরো বিভীষিকাটা ছিল প্রচণ্ড আর সেটা ওদের চোখেমুখে দেখা যেত। ...বলতো, কেন এমন হলো? আর এমন কোনো গালাগাল নেই যা দেয়নি সে সময়। স্বাভাবিকভাবেই তখন তাদের প্রচণ্ড রাগ। ...(ওদের) রাক্ষস, দানব ইত্যাদি বলতো।’
এই মেয়েরা খুব একটা শিক্ষিতা ছিলেন না। তাছাড়া বলাই ছিল বেশি প্রশ্ন করতো না। ‘কিন্তু নিজে থেকে অনেকে অনেক কিছু বলেছেন। কোথায় লাগিয়েছে খুলে দেখিয়েছেন। ...মারধর তো প্রচুর করেছে, নীল দাগ তো প্রচুর, গায়ে-পিঠে সব জায়গায়। কাটার চিহ্ন। আর ওই যে বললাম, আমার কীরকম মনে আছে, সেই দাগটা কী আমি ঠিক বলতে পারব না, তবে বলত আমাদের এমন করে দিয়েছে যে সকলে দেখলেই বুঝতে পারবে যে raped হয়েছি। কোনো একটা brand করত, না কি অনেকের মধ্যেই এই দাগটা দেখেছি।’ এই দাগটা কি সবার মধ্যেই ছিল না বিশেষ কোনো অঞ্চলের বিষয়, তা কৃষ্ণা ব্যানার্জীর মনে নেই।
যে মেয়েদের কৃষ্ণা ব্যানার্জী দেখেছেন, তাঁরা কি সবাই পুরো সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন? ‘একেবারে উন্মাদ হয়ে গেছেন এমন লোকও ছিলেন। আমার মনে হয় না তাঁরা আর সুস্থ হয়েছেন। অনেকের খুব বীভৎসভাবে যৌনাঙ্গ কেটে দেয়া হয়েছিল এবং দু’একজন মারাও গেছেন। ...মারধর, খাওয়া-দাওয়া নেই, মানসিক বিপর্যয়- অনেকে কাটিয়ে উঠতে পারেননি, একেবারে উন্মাদ হয়ে গেছেন।’
মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা চলেছে। যতটা সম্ভব। পরে তাঁদেরও বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। কৃষ্ণা ব্যানার্জী বলছিলেন, ভারত সরকারের তখনকার ভূমিকায় তাঁরা খুব impressed হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক সাহায্যও এসেছিল। তবে তাঁর ধারণা, পৃথিবীর অন্যত্র শরণার্থীদের জন্য এখন যতটা করা হয়, বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ততটা পরিমাণে আসেনি।
ফিরে আসি নির্যাতিত মেয়েদের কথায়। অনেক মেয়েই বলতো সে আসতে পেরেছে, তার বোনকে তো মেরেই ফেলেছে। মা-মেয়ে দু’জনেই ধর্ষিতা হয়েছেন, হয়তো একজন আসতে পেরেছেন, এমন ঘটনা কৃষ্ণা ব্যানার্জী শুনতেন।
শরণার্থী শিবিরে আসা এই নির্যাতিত মেয়েরা কি জানতেন কেন তাঁদের এই অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হলো? যুদ্ধটা কেন হচ্ছে? ‘এটা আমার মনে দাগ কেটেছিল যে কী হচ্ছে ব্যাপারটা, এরা কিন্তু বুঝতে পারেননি। ... ওঁরা এমনও বলেছেন, ‘নিজেরা নিজেরা কী করলো না করলো আর মেয়েগুলোর সর্বনাশ করে দিল।’ ...এটা ওদের খুব ভালো করে কেউ বোঝায়নি যে মুক্তিযুদ্ধটা কী। ...যাঁরা লেখাপড়া শেখেননি বা কোনোরকম exposure যাঁদের হয়নি, তাঁদের মধ্যে কোনো ধারণাও আসেনি।’ অথচ তাঁদের বাড়ির ছেলেরাই হয়তো যুদ্ধে গেছে। ‘এটা খুবই আশ্চর্য। এই মেয়েরা যে একদম আড়ালে ছিলেন তা বোঝা যায়। আমার মনে হয় যাঁরা একটু শিক্ষিকা, তাঁরা হয়তো জিনিসটা ধরতে পেরেছিলেন। কিন্তু এমনিতে আমাদের মনে হয়েছিল যে মেয়েরা বড্ড অন্ধকারে।
চিকিৎসা, গর্ভপাত, বাচ্চা দত্তক দেয়া এসব হয়ে যাওয়ার পর মেয়েদের মানসিক অবস্থা কেমন হতো? আবার নতুন করে শুরু করার বা বুঝবার মনোভাব ছিল কি? ‘কয়েকজনের ছিল। খুবই ছিল। বেশিরভাগেরই ছিল। তাঁরা তাঁদের পূর্ব জীবনটা ফিরে পেতে চেয়েছিলেন। তাঁরা তো সংসারী মানুষ। কেউ কেউ সেটা সংখ্যায় কম, ভয়ানক হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন। যেন তাঁদের জীবনটাই শেষ হয়ে গেল। এবং সেখানে যে ধরনের counselling প্রয়োজন ছিল যে, এটা তোমার দোষ নয়, ...সেই counselling টা ভালোভাবে হয়নি।’
আবার কৃষ্ণা ব্যানার্জীর একটি অল্পবয়স্ক মেয়ের কথা মনে আছে যে নির্যাতিতা হয়েছিল, শরীরে প্রচুর মারের চিহ্ন ছিল কিন্তু গর্ভবতী হয়নি। অন্য অনেকের সাথে সেই মেয়েটি ক্যাম্পে কাজও করত- ওদের সেলাই মেশিন দেয়া হয়েছিল। এই মেয়েটি সবাইকে সাহায্য করত। পরে মেয়েটি তার বাবাকে ফিরে পায়।
যাঁরা নতুন জীবনের কথা ভাবতেন, তাঁরা কি স্বাধীন দেশ পাওয়ার কথাও ভাবতেন? ‘আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে তাঁদের খুব ভালো ধারণা ছিল। তবে তাঁদের বোঝানো হয়েছিল যে তোমরা যখন ফিরে যাবে তখন জিনিসটা আর হবে না। কিন্তু তাদের মনে মনে একটা ভয় ছিল, এই যে একটা insecurity হয়ে গেল, জীবনে একটা অদ্ভুত অবস্থা হয়ে গেল, এর ফলে তাঁদের বিশ্বাসের ভিতটাই নড়ে গিয়েছিল, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এবং যতই তাঁদের বোঝানো হচ্ছিল এ ঘটনা আর ঘটবে না, তোমরা অনুসন্ধান কেন্দ্রে যাও এবং নিজেদের লোকদের খুঁজে বের কর। ...কিন্তু তাদের খুব একটা ধারণা এ বিষয়ে ছিল না। কেন যুদ্ধটা হলো সে সম্পর্কে ধারণা ছিল না। ফিরে গিয়ে অবস্থা বদলাতে পারে, সেই ধারণাও মনের মধ্যে হয়নি।’
যাঁদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ ছুটে গিয়েছিল, তাঁদের ভয় ছিল তাঁরা আবার গৃহীত হবেন কি না। গৃহীত হননি এমন একটি ঘটনার কথাই কৃষ্ণা ব্যানার্জী শুনেছেন। যে মেয়েটিকে কোনো সংস্থায় কাজ দেয়া হয়েছিল। গৃহীত হওয়ার অনেক ঘটনা মিসেস প্রতিমা রায় তাঁদের বলেছেন। মিসেস রায় বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ রাখতেন, যাওয়া-আসা ছিল। তিনি পরিচিত মেয়েদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। কারোর খোঁজ মিলত- পরিবারে ফিরে গেছে বা কাজ করছে। কারোর খোঁজ মিলত না। একটি ব্যাপার ওঁরা খুব বলতেন যে হিন্দু পরিবার হলে এই মেয়েরা এত সহজে গৃহীত হতো না।
শরণার্থী শিবিরে যে নির্যাতিত মেয়েরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সহমর্মিতা যেমন ছিল, তেমনি প্রচণ্ড বিবাদও হতো। এটা ওঁরা কেউ কেউ যেন প্রমাণ করতে চাইত যে ‘আমাকে জোর করে করেছে। কিন্তু ও ওরকমই মেয়ে।’
নির্যাতিত মেয়েরা যখন নিজেদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের কথা বলত, কোন জিনিসটা ওরা সবচেয়ে বড় করে দেখত? ‘এই যে rape, এটাই ওদের কাছে সবচেয়ে খারাপ লাগত। এর চেয়ে মেরে ফেললেও ভালো হতো বলে তারা বলত। আমার চিরদিনই এই বিষয়ে রাগ হতো, মনে হতো মৃত্যু হচ্ছে অনেক খারাপ জিনিস। rape করেছে সেটা তো আমার কোনো দোষ নয়। আমার শরীরের একটা বিশেষ অংশ অন্যান্য অংশের চেয়ে important কেন? ...সেটা আমি বারবার বোঝাতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদেরই দলের মধ্যে এমন কিছু মহিলা আছে, যারা বলত- ‘ঠিক তো rape করে দিয়েছে, এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে।’ ...আমার মতো হয়তো দু’একজন ছাড়া rapeটাকে ওরা সব থেকে খারাপ মনে করেছে। বলেছি, তোমার চোখের সামনে যে তোমার দিদি খুন হলো, এটা কি তার চেয়েও খারাপ যে তোমাকে rape করা হয়েছে? (উত্তর হতো) ‘না, এটা করলে তো আর কিছু থাকে না।’
নির্যাতিতাদের সবচেয়ে বড় আশা ছিল যে, পরিবারে বা সংসারে ফিরে গেলে তাদের ওরা ক্ষমা করবে। অথচ অপরাধটা কিন্তু তার না।
অতীতের কলঙ্ক থেকে মুক্তি
২২ মে ২০০৯ ‘এ্যাকশন ফর এ প্রোগেসিভ পাকিস্তান’ নামক একটি গ্রুপ তাদের ওয়েবসাইটে ‘১৯৭১ সালের নৃশংসতার জন্য আমরা বাংলাদেশীদের কাছে ক্ষমা চাই: অতীতের কলঙ্ক থেকে মুক্তি’ শীর্ষক বিবৃতিটি প্রকাশ করে। সেটি এই একই শিরোনামে ২৬ মে ‘সাউথ এশিয়া সিটিজেনস্ ওয়েব’-এ প্রকাশিত হলে ওখান থেকে সংগ্রহ করে বাংলা-তর্জমা করে পত্রস্থ করা হয়েছে আসক বুলেটিনে।
১৩ মে, ২০০৯ বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তান সরকারের (তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান) কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানায়। উত্তরে ‘গতস্য শোচনা নাস্তি’ বলে বাংলাদেশের এ দাবিকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তান সরকার। এবারই যে প্রথম এই দাবি তোলা হয়েছে তা নয় এবং বরাবরের মতো এবারও চাতুর্যপূর্ণ উক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান এ দাবিকে এড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার দাবিকে নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মাচের্র সামরিক আক্রমণ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করা পর্যন্ত পুরো নয় মাস পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার নিজের দেশের মানুষের ওপরেই চালিয়েছে নির্বিচারে গণহত্যা। তাদের নৃশংসতা এতটাই বাছবিচারহীন এবং উদ্দেশ্যমূলক ছিল যে, হাজার হাজার সাধারণ বাঙালি, অগণিত বাঙালি নারী, শত শত বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র শিকার হয় হত্যা, ধর্ষণ, নজিরবিহীন লুটপাটের মতো মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের। প্রায় ৪০ বছর হতে চললো এখনও মৃত মানুষের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কারণ এখনও নানা জায়গায় আবিষ্কৃত হচ্ছে অনেক গণকবর, যা সাক্ষী দিচ্ছে আমাদের জনগণের ওপর সংঘটিত নির্মম হত্যাযজ্ঞের। আর এসব ভয়াবহতা পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাপুরুষের মতো অস্বীকার করে আসছে সবসময়। এসব নির্মমতার একমাত্র স্মারক হামিদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টকে (যা কিনা ছিল পাকিস্তান সরকারের অফিসিয়াল প্যানেল) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোসহ পরবর্তী সব সরকারই অনৈতিকভাবে গোপন করেছে এবং মাত্র কিছুদিন আগে ২০০০ সালে তা প্রকাশ করা হয়েছে।
ক্ষমা প্রার্থনার দাবির প্রেক্ষিতে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘গতস্য শোচনা নাস্তি’ জাতীয় এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ অস্বীকৃতি পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতাদের ঘৃণ্য কার্যাবলিরই প্রতিফলন ঘটায়। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি ক্ষমা চাওয়ার কোনো উদ্যোগই কখনো নেয়া হয়নি। এমনকি সে দেশের জনগণের তরফ থেকেও জনসমক্ষে সত্য ঘটনা স্বীকারের জন্য সরকারের ওপর নিরবচ্ছিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়নি।
আজ, আমরা পাকিস্তানিরা, ১৯৭১ সালে নিজের দেশের লোকের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতন চালানোর কোনো যুক্তি খু্ঁজে পাই না। একইসাথে পাকিস্তান সরকার হামিদুর রহমান কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনের জের ধরে গত ৩৮ বছর ধরে যেভাবে এসব নৃশংসতা অস্বীকার করে আসছে, আমরা একেও অযৌক্তিক মনে করি। আমরা মনে করি, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে আমাদের ভাইবোনদের হত্যা করেছিল, ধর্ষণ করেছিল এবং তাদের সহায়-সম্পত্তি লুটপাট করেছিল তা স্পষ্টতই বিবেকবিরুদ্ধ কাজ। আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর এই দাবিকে অস্বীকার করি যে, সেসব নৃশংসতা আমাদের নামে করা হয়েছিল।
আজ আবার দেশের মানুষের বিরুদ্ধে নেয়া সামরিক পদক্ষেপ পাকিস্তানকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক মানবিক বিপর্যয়ের প্রান্তে, যা কিনা ১৯৭১ সালে ‘পাকিস্তান মিলিটারি’ নামক একটি স্বার্থ এবং একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সংঘটিত বর্বরতাকে মনে করিয়ে দেয় আমাদের। আমরা দাবি জানাই যে, আমাদের দেশ ১৯৭১ সালের সামরিক আক্রমণের দায় স্বীকার করবে এবং ক্ষমা চাইবে। সেই সাথে হামিদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টে যাদের নাম আছে সেসব দোষী ব্যক্তিকে তাদের নিষ্ঠুরতার জন্য শাস্তি দেবে এবং একইসাথে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত যে অপূরণীয় ক্ষতি ও লুটপাট হয়েছে তার যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ দেবে।
একমাত্র এভাবেই আমরা আমাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি- একটি জাতি, একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমরা অতীতের কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে পারি এবং আশা করি, বাংলাদেশি জনগণের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে।
স্বাধীনতার কিছুদিন পর ফায়েজ আহমেদ ফায়েজ ঢাকায় এক সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ফিরে এসে উদ্বেগের সাথে বর্ণনা করেছেন- ‘কব নজর মে আয়েগি, বেদাগ সব্জে কি বাহার, খুন কে ধাব্বে ধুলেঙ্গে বর্সা তো কে বাদ।’ (যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- কবে দাগহীন সবুজের সমারোহ নজরে আসবে। কত বর্ষা পরে খুনের দাগ মুছে যাবে।)
আমাদের নামে আমাদের ভাইবোনদের ওপর মৃত্যু আর ধ্বংসের যে স্রোত বয়ে গেছে তার জন্য আমরা অনুতপ্ত এবং যত শিগগিরই সম্ভব আমরা এর প্রতিকার করতে চাই, তা না হলে এই কালিমা আমাদের জাতির বিবেকে স্থায়ী আসন করে নেবে।
অনুবাদ: সেলিনা খাতুন