তথ্যানুসন্ধান
১০ বছর জেল খেটে রকিবুজ্জামানের জামিন
বাবা পেলেন লাশ
অবন্তী নুরুল
পরিবারের বড় সন্তান রকিবুজ্জামান রকিব ৩২ বছরের তরতাজা যুবক। ১৯৯৮ সালে গ্রেফতর হয়ে তখন থেকে জেলখানায় আটক থাকার পর গত ১৩ মে খবরের শিরোনাম হয়েছেন এইভাবে, ‘১০ বছর জেল খেটে জামিন, কিন্তু বাবা পেল লাশ’। দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত এই রিপোর্টটি পড়ে জানা যায় যে, রকিবুজ্জামান রকিবের দীর্ঘ ১০ বছর জেল খাটার পর গত ১১ মে তারিখে জামিনে মুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও ঐদিন রাতে জেলগেটের ভেতর থেকে সাদা পোশাকধারী একদল লোক বাইরে অপেক্ষমাণ বাবা এস এম কামরুজ্জামানের সামনে দিয়ে তাকে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চলে যায়। পরের দিন সকালে ইন্দিরা রোড থেকে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ।
এই রিপোর্টটি নজরে আসার পর আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পক্ষ থেকে আমি অবন্তী নুরুল ও আবু আহমেদ ফয়জুল কবির এ বিষয়ে একটি তদন্ত কাজে যাই। তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিহত রকিবুজ্জামানের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী এস এম কামরুজ্জামানের সাথে দেখা হলে তিনি জানান- ১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলায় রকিবুজ্জামান গ্রেফতার হন এবং ১০ বছর জেলখানায় আটক থাকেন। মামলাটি এখনও বিচারাধীন। ১৯৯৮ সালে গ্রেফতার হলেও ২০০৫ সালে রকিবুজ্জামান জামিন লাভ করেন। কিন্তু কামরুজ্জামান ছেলেকে জেল থেকে বের করেননি। কেননা তার ছেলে রকিব পড়াশোনায় অমনোযোগী ছিল এবং বন্ধুবানধবদের সাথে ছোটখাটো অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। আর সে কারণে তিনি চেয়েছিলেন ছেলে জেলে থেকে সংশোধন হোক। তাছাড়া বিগত সরকারের সময় ক্রসফায়ার নামক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও তিনি মাথায় রেখে ছেলেকে বের করেননি। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তাদের ক্রসফায়ারকে নিরুৎসাহিত করার নির্দেশনা মিডিয়ায় আসার পরে ছেলের মা ও ছেলের স্ত্রীর অনুরোধে তিনি রকিবুজ্জামানকে জামিনে বের করে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার ভাষ্য মতে, “ছেলেকে জামিনে বের করার লক্ষ্যে গত ১১.০৫.২০০৯ তারিখে আইনজীবী রিজভীর মাধ্যমে আমি ও আমার পারিবারিক ঘনিষ্ঠ স্বজন মো. আরমান জেলগেটে যাই। দুপুর সাড়ে তিনটায় আইনজীবী রিজভী নধরষ নড়হফ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রতিক্ষার পরেও ছেলে বের না হওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়ি। এক পর্যায়ে রাত ৮টার দিকে জেলগেটে জেলার বজলুর রহিমকে পেয়ে যাই। তাকে আমি আমার পরিচয় জানিয়ে বলি, আমি সরকারি চাকরি করি, আমার ছেলের নধরষ নড়হফ জমা দিয়েছি। অনেকক্ষণ হয়ে গেল ছেলে তো বের হচ্ছে না। তখন জেলার সাহেব বলেন- একটু দেরি হয়, কেননা অনেক ফরমালিটিস ছাড়াও অনেক লোক বের হয় এ কারণেই দেরি হয়। অপেক্ষা করেন কোনো অসুবিধা হবে না।
জেলার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও এভাবে রাত ১১টা বেজে যায়। রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত জেল থেকে হাজতি-কয়েদিরা বের হচ্ছিলো। এরপর আর কেউ বের হয়নি। ধীরে ধীরে জেলগেটের সম্মুখটাও ফাঁকা হয়ে যায়। লোকজন খুব একটা নেই। রাত ১১টার সময় হঠাৎ একটি পুলিশ পিকআপ ভ্যান জেলগেটের সামনে আসে। গাড়িটি একদম গেটের কাছাকাছি দাঁড়ায়। এর মধ্যে দেখি কারারক্ষীরা গেট খুলছে এবং সেই ফাঁকে তখন আমি দেখতে পাই গেটের কাছাকাছি কারারক্ষীদের ব্যবহৃত টেবিলের ওপর দুই হাত ভর দিয়ে মাথা নিচু করে আমার ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এরপর গেট বন্ধ হয়ে যায়। ৫-৭ মিনিট পরে দেখি পুলিশের গাড়িটি চলে যায়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে দেখি জেলগেটের সামনে দুটি মাইক্রোবাস ও র্যাব-১০ লেখা একটি পিকআপ জেলগেটের সামনে আসে। একটি মাইক্রোবাস একদম জেলগেটের প্রধান ফটকের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। দু’জন গাড়ি থেকে নেমে গেটের ভেতর ঢুকে যায়। এর অল্প কিছু পরেই ঐ দু’জন জেলগেটের ভেতর থেকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে আমার ছেলে রকিবকে বের করে মাইক্রোবাসের মধ্যে তোলে। আমি এটা দেখা মাত্র দৌড়ে মাইক্রোবাসের কাছে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়াই এবং আমার আইডি কার্ড বের করে বলি, আমি সরকারি চাকরি করি। আপনারা কারা? এর মধ্যে আমার ছেলে আমাকে দেখে বাবা বাঁচাও বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে। মাইক্রোবাসের লোকজন তখন গাড়ির গ্ল্লাস তুলে দিয়ে দ্রুত জেলগেট থেকে নাজিমউদ্দিন রোড ধরে চলে যায়। মাইক্রোবাসটির পেছনে পেছনে অপর একটি মাইক্রোবাস ও র্যাব-১০ লেখা পিকআপটি চলে যায়। গাড়িতে যারা ছিল সবাই সিভিল পোশাকে ছিল। এ ঘটনায় আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে জেলারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। জেলার আমাকে ধমক দিয়ে বলেন- আপনার ছেলেকে আমরা ছেড়ে দিয়েছি। এর বেশি আমরা জানি না।
পরদিন আমি সকালে বেইলি রোডের ডিবি অফিসে যাই। ডিবি অফিস জানায়, না এ নামের কেউ আমাদের হেফাজতে নেই, আমরা এরকমভাবে কাউকে আনিওনি। ডিবি অফিস আমাকে পরামর্শ দেয় থানায় জিডি করার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে আমি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় চলে যাই কিন্তু থানা জিডি গ্রহণ করেনি। অতঃপর আমি চলে যাই র্যাব-১০-এর আঞ্চলিক অফিসে। সেখানে আমাকে জানায়, তাদের হেফাজতে এ নামে কেউ নেই। সেখান থেকে আমি চলে যাই কেরানীগঞ্জে র্যাব-১০-এর প্রধান অফিসে। তারাও জানান যে, তাদের হেফাজতে এ নামে কেউ নেই। এভাবে সময় চলে গেলে আনুমানিক দুপুর ১টার সময় আমাকে অজ্ঞাত একজন ফোন করে জানায়, আপনি কোথায়, এখনই ঢাকা মেডিকেলে চলে আসেন। আমি ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে দেখি আমার ছেলের লাশ। অজ্ঞাতপরিচয়ে মর্গে রয়েছে। উপস্থিত পুলিশ জানায়, তেজগাঁও থানা পুলিশ ইন্দিরা রোড থেকে ভোরে লাশ উদ্ধার করেছে। এভাবেই আমার ছেলেকে খুঁজে পেলাম, তবে জীবিত নয় মৃত। ছেলে বাবা বাঁচাও বলে যে আর্তনাদ করেছে সেটা প্রতি মুহূর্তে আমার কানে বাজছে, যতদিন বেঁচে থাকবো এ আর্তনাদ আমি ভুলবো না।”
আমরা বিষয়টি সম্পর্কে আরো জানার জন্য ওই দিনই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলারের সাথে দেখা করতে যাই। কিন্তু দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা জেলগেটে অপেক্ষা করার পরও তিনি সাক্ষাতের অনুমতি দেননি।
উল্লেখ্য, তেজগাঁও থানার পুলিশ ইন্দিরা রোড থেকে লাশটি উদ্ধার করার পর এস আই জহুরুল ইসলাম বাদি হয়ে এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করেন। তিনি ফোনে তদন্তকারী আবু আহমেদকে জানান যে, ২১ মে ২০০৯ তিনি রকিবুজ্জামানের মৃতদেহে সাতটি বুলেটের আঘাত লক্ষ্য করেছেন, যার মধ্যে চারটি বুকের বিভিন্ন জায়গায় এবং পিঠে তিনটি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় কাউকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া এবং পরদিন তার লাশ পাওয়া যাওয়া শুধু গভীর উদ্বেগজনক ঘটনাই নয় বরং তা রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা নাগরিকের সাংবিধানিক ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, যা আইনের শাসনের প্রতি জনগণের অনাস্থাকে প্রকট করে তুলবে এবং তা আমাদের জন্য ডেকে আনবে মহাবিপর্যয়। এ ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতাও নেই।
আমরা সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচিত হতে চাই। আমরা চাই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। এটা অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখা সুস্পষ্টভাবে সংবিধানের লঙ্ঘন। আর সে কারণেই উপরের এই ঘটনাটির সুষ্ঠ তদন্ত ও এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
অভিবাসী শ্রমিক
সব হারিয়ে কিংবা লাশ হয়ে ঘরে ফেরা
শাহ আলম ফারুক
এ বছরের শুরু থেকে অভিবাসী শ্রমিকের ফিরে আসার মাত্রাটা অন্যান্য বছরের তুলনায় বাড়তে শুরু করে। দৈনিক সংবাদ (২৫.০৪.২০০৯)-এ প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়- এ বছরের শুরু থেকে সাড়ে ৩ মাসে চাকরি হারিয়ে ২৭ হাজার ২২৪ জন প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন কারণে জেল খেটে এবং পাসপোর্ট হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন ২৬ হাজার ৩৫৭ জন। এ সংখ্যা গত পুরো বছরে ফিরে আসা শ্রমিকের অর্ধেক।
২০০৮ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে এসেছেন ৫৪ হাজার ১৬৩ জন কর্মী। রিপোর্টে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর বরাত দিয়ে আরো বলা হয়, এ বছর সাড়ে তিন মাসে ফিরে আসা শ্রমিকদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন ১০ হাজার ৩৯১ জন। ভিসা মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়াসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায় এদের ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক ৮ হাজার ৭৭৬ জন ফিরে এসেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। তাদের মধ্যে চাকরি না থাকায় পাসপোর্র্টসহ ৮০৫ জন। অবশিষ্ট ৭ হাজার ৯৭১ জন আউটপাসের মাধ্যমে ফিরেছেন। ফিরে আসা সংখ্যাগত দিক দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন মালয়েশিয়া প্রত্যাগতরা। সেখান থেকে ফিরেছেন ৫ হাজার ৫৬৫ জন। তাদের মধ্যে কোম্পানিতে কাজ না থাকার কারণে এবং ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় আউটপাস নিয়ে ফেরত আসেন ৫ হাজার ৫০৪ জন। অবশিষ্ট ৬১ জন কোনো কাজ না পাওয়ায় পাসপোর্টসহ ফিরেছেন। এদিকে ৭ জুন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর পক্ষে সংসদকে জানানো হয়- মে পর্যন্ত ৫ মাসে ৩৮,২০৮ জন দেশে ফিরে এসেছেন।
একদিকে প্রতারণার শিকার বা কন্ট্রাক্ট শেষ বা বিশ্বমন্দার কারণে অভিবাসী শ্রমিকদের ফেরত আসার সাথে মৃত লাশ হয়ে ফিরে আসার সংখ্যাও গত ক’বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডেইলি স্টার (১৭.৫.২০০৯)-এ প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়- ২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৯ মে পর্যন্ত ৮,১০৭ জন অভিবাসী শ্রমিক লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন। রিপোর্টে আরো বলা হয়, ২০০৮ সালে সরকারি হিসাবে ২,২৩৭টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যেখানে ২০০৭-এ ১,৬৭৩ এবং ২০০৬ সালে সংখ্যা ছিল ১,৪০২ এবং ২০০৪ সালে ১,৭৮৮ জনের মৃত্যু ঘটে। আবার এ বছরের প্রথম ৪ মাসে ৮৩৪ জন লাশ হয়ে ফিরে আসে (ইনকিলাব ৪.৫.০৯)। এসব লাশের সাথে আসা ডকুমেন্টসে মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রধানত লেখা থাকে- হার্ট স্ট্রোক, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে লাশের গায়ে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়। যাতে আশঙ্কা হয় নির্যাতনের কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ঘটনায় যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা- যেমন পোস্টমর্টেম, তদন্ত এবং তদন্ত হয়ে থাকলে তার প্রেক্ষিতে কেউ অভিযুক্ত হয়েছিল কিনা বা শাস্তি পেয়েছিল কিনা, সেরকম তথ্য প্রায়শ জানা যায় না।
বস্তুত যথাযথ আইনি কাঠামোর অনুপস্থিতি এবং নিবিড় মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় রিক্রুটিং এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রতারণা, দুর্নীতি আর অনিয়মের শিকার হয়ে প্রতিশ্রুত কাজ না পেয়ে, কখনো-বা অবৈধভাবে বিদেশে গিয়ে জেল খেটে, খাদ্য আশ্রয়হীন হয়ে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে লাশ হয়ে, কখনো-বা শূন্য হাতে অভিবাসী শ্রমিকরা দেশে ফিরছেন।
শ্রমিকদের নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে গত ৩ জুন ২০০৯ আসক অফিসে কথা হয় অভিবাসী অধিকার সংক্রান্ত মালয়েশিয়ান এনজিও টেনাগানিতার কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের সাথে। আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সি সম্পর্কে তিনি মনে করেন- নিজ জেলা বা এলাকায় অফিস স্থাপন করলে এ ব্যাপারে তাদের অনেক বেশি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে।
নিরাপদ অভিবাসনের জন্য অন্য একটি সমস্যা ভিসা ট্রেডিং। সাধারণভাবে আগে যেখানে নিয়োগকর্তাই (নেপালসহ অনেক দেশ থেকে এখনও) ভিসা দিয়ে এমন কি পথখরচ দিয়ে শ্রমিক নিয়ে যেতেন, সেখানে এখন টাকা দিয়ে নিয়োগকর্তা বা তার প্রতিনিধির কাছ থেকে ভিসা কিনে আনা হয়। পথখরচও সাধারণভাবে শ্রমিককে দিতে হয়। অভিবাসী অধিকার কর্মী হারুন মনে করেন আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে অবৈধ ও অনৈতিক ভিসা ট্রেডিং বন্ধ করার জন্য যে জোর প্রচেষ্টা চলছে, সেই প্রয়াসে সরকারকে বেশি করে সংশ্লিষ্ট ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তাছাড়া সরাসরি নিয়োগকর্তার সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে কীভাবে শ্রমিক প্রেরণ করা যায়- তার পথও খুঁজতে হবে।
সামপ্রতিককালে আউটসোর্সিং এজেন্ট এবং লেবার কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে প্রবাসে নিয়োগকৃত শ্রমিকরা প্রতারণার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। টেনাগানিতার হারুন মনে করেন, এরকম আউটসোর্সিং এজেন্ট এবং লেবার কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে যাওয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে। মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতায় তিনি জানান, বিশেষত মালয়েশিয়ায় প্রতারিত শ্রমিকদের এক বিরাট অংশ এসব আউটসোর্সিং এজেন্ট বা লেবার কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে প্রদত্ত ভিসায় সে দেশে গিয়ে অবর্ণনীয় সমস্যায় পড়েছিলেন। প্রয়োজনে আউটসোর্সিং এজেন্ট বা লেবার কন্ট্রাক্টরের সাথে সরকারি পর্যায়ে দরকষাকষির মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকতর পেশাগত সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
অভিবাসন এক গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিশেষত প্রেরণকারী রাষ্ট্রগুলোর কাছে বিশেষ কদর পাচ্ছে। ফিলিপাইন, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ প্রেরণকারী অন্যান্য রাষ্ট্রের দূতাবাসগুলো গ্রহণকারী রাষ্ট্রে নিজ নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য কাজ করে থাকেন। বাংলাদেশের বিদেশি মিশনগুলো সম্পর্কে প্রায়শ অভিবাসীদের কাছ থেকে বিরূপ অভিজ্ঞতার কথা শোনা যায়। বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট, প্রবাসীদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে আমরা জেনেছি- বিপদে আপদে তারা বাংলাদেশি মিশনের লোকজনের সাহায্য পাননি। অথচ এসব ক্ষেত্রে তাদের অন্য দেশের সহকর্মীরা নিজ নিজ দূতাবাস থেকে সাহায্য পেয়ে থাকেন। অভিবাসী অধিকার কর্মী হারুন মনে করেন, এক্ষেত্রে দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ ওরিয়েন্টেশন দিতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রটোকল কনভেনশনের মাধ্যমে প্রাপ্য সুবিধা অভিবাসীদের কল্যাণে কতদূর ব্যবহার করা যায় সে সম্পর্কেও দূতাবাসের লোকজনকে বিশেষ ধারণা দেয়া যেতে পারে। হয়রানির প্রক্রিয়া বন্ধ করে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে অভিবাসীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
অভিবাসী শ্রমিকদের বিষয়ে ১৯৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বর ‘সকল অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সনদ’ অনুমোদিত হয়। এ পর্যন্ত ৪০টি দেশ সনদটি অনুসমর্থন বা রেটিফাই ও বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশ সম্মতিসূচক স্বাক্ষর করেছে। ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী এ কনভেনশন প্রথমবারের মতো অভিবাসী শ্রমিকের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের আইনগত নিরাপত্তা এবং অভিবাসনের সব পর্যায়ে শ্রমিকের অধিকার তথা মানবাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছে। সর্বোপরি, এ কনভেনশনের মাধ্যমে অনিয়মিত বা নথি-বহির্ভূত অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই কনভেনশন বাংলাদেশ কর্র্তৃক রেটিফাই বা অনুসমর্থন এখন সময়ের দাবি। আমলারা যুক্তি দেখান, এ কনভেনশন স্বাক্ষর করলে গ্রহণকারী দেশগুলোতে জনশক্তি নিয়োগ ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে। বস্তুত এ কথার কোনো ভিত্তি নেই। ফিলিপাইন, নেপালসহ যে দেশগুলো এই কনভেনশন রেটিফাই করেছে, সেসব দেশের জনশক্তি প্রেরণের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৫ এপ্রিল ২০০৯, জেদ্দায় প্রবাসী ব্যাংক স্থাপন, বিমানকে অধিকতর সচল করাসহ অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দেন। পররাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে। তবে অভিবাসী শ্রমিকের সমস্যা তথা নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে উপরোক্ত বিষয়গুলো সরকারের সদয় বিবেচনায় আনা জরুরি। ১৯৮২ সালে প্রণীত একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বর্তমানে জনসম্পদ অভিবাসনের বিষয়টি প্রধানত নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ অধ্যাদেশটি বর্তমানের প্রেক্ষিতে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা- ১৯৮২ সালের অভিবাসন আইনকে যুগোপযোগী করে বিশেষত অভিবাসন সংক্রান্ত অপরাধকে সংজ্ঞায়িত ও এসব অপরাধের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে, রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রম নিবিড় মনিটরিংয়ের কার্যকর পদ্ধতি চালু এবং ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসী শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ ও আইনগত প্রতিকার লাভের সহজ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে নতুন আইন পাস করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে ঠিক যাত্রার আগে অভিবাসী শ্রমিকদের ওয়ার্ক পারমিটের শর্ত, বেতন-ভাতাদি, ভিসার বৈধতা, গ্রহণকারী দেশের আইন-কানুন ইত্যাদি বিষয়ে যে প্রি-ডিপারচার ব্রিফিং দেয়া হয়, তার পরিবর্তন আনা দরকার। এ ব্রিফিংটা যদি বিদেশ যাবার জন্য মনস্থির করার সাথে সাথে দেয়া হয়, বিদেশ যাওয়া না-যাওয়ার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তা শ্রমিককে বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারে। তাছাড়া আমরা মনে করি, অভিবাসী শ্রমিকের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করে প্রাক-অভিবাসন থেকে অভিবাসন-পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের করণীয় নির্ধারণ করা যেতে পারে।
