- ASK Bulletin 2010
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   প্রতিবেদন
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   ফলো-আপ
   নারী
   আন্তর্জাতিক
   পাঠক-পাতা
   সংগঠনবার্তা

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

আইন-আদালত


বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে মামলা

এটিএম মোরশেদ আলম

‘ক্রসফায়ার’-এর নামে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী- মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এমন অভিযোগ যে অমূলক নয় সমপ্রতি তার প্রমাণ মিলেছে। নাটোরের এক সার ব্যবসায়ীকে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুনের ঘটনা ধামাচাপা দিতে অন্য সব ঘটনার মতো ক্রসফায়ারের গল্প সাজিয়েছে পুলিশ।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ডে নাটোরের সিংড়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিকসহ পুলিশের ১২ জন সদস্য ও সাতজন সহযোগী জড়িত। গ্রাম্য সালিশের জের ধরে পুলিশকে ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ১০ মে ২০১০ নাটোরের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান পুলিশের এসব কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন।

ঘটনার বর্ণনা মতে, সিংড়া উপজেলার বামিহাল গ্রামের রজব আলী ২০০৮ সালের ১৭ আগস্ট তার ছেলে আনসার আলীকে হত্যার অভিযোগ এনে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আনসার আলী সিংড়া বাজারে সারের ব্যবসা করতেন। মামলায় তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশিক সাইদ, সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আশরাফুল হক, সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বক্করসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, আনসার আলীকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ‘ক্রসফায়ার’ নামে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছে।

অতিরিক্ত মুখ্য হাকিম মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান মামলাটি গ্রহণ করে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসানকে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। এই তদন্তে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়াও ১২ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়। তদন্তে দেখা যায় যে, আনসারকে পুলিশ ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে নিজের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে সিংড়া থানায় নিয়ে যায়। ২৬ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত আনসারের বাবা রজব আলীসহ অন্য আত্মীয়রা থানায় গিয়ে আনসারের সাথে দেখা করেন এবং কথাও বলেন। ওই সময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ২৭ জুলাই আনসারকে আদালতে চালান দেয়া হবে বলে জানান। কিন্তু ২৬ জুলাই রাতে থানা থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে কাকিয়ান জঙ্গলে আনসারকে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয়। পরদিন সিংড়া থানায় এএসআই জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে বলেন যে, পুলিশের একটি টহল দল কাকিয়ান জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আনসারসহ অন্য ডাকাতরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে টহল দলের সদস্যরাও তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এতে আনসার মারা যান। কিন্তু আনসার যে আগে থেকেই পুলিশ হেফাজতে ছিল- মামলায় এই তথ্য গোপন করা হয়।

বিচার বিভাগীয় তদন্তে উল্লেখ করা হয়, আনসারকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই হত্যা করে লাশ কাকিয়ান জঙ্গলে ফেলা হয়েছিল। আনসার ‘ক্রসফায়ারে’ মৃত্যুবরণ করেননি। বরং তাকে গ্রেফতারের পর থানাহাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্ময় প্রকাশ করে বলা হয়, পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় আনসার ২৫ কিলোমিটার দূরে কাকিয়ান জঙ্গলে অন্য ডাকাতদের সাথে কীভাবে মিলিত হলেন?

তদন্তে ওই ঘটনায় সিংড়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বক্কর, এসআই লিয়াকত আলী, এএসআই প্রদ্যুৎ কর, কনস্টেবল জসিম, আছির উদ্দিন, কামাল, মোতাবেল ওরফে সানু, কাশেম, আনোয়ার, মফিজ, হাফিজুর রহমান, ব্যাটালিয়ন আনসার অধীর চন্দ্র, পুলিশের স্থানীয় সহযোগী সেলিম, হানিফ, ফিরোজ, আমজাদ হোসেন, কুদ্দুস, রশীদ ও মজিবরের জড়িত থাকার সত্যতা পাওয়া যায়।
অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান ১০ মে ২০১০ বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে পর্যালোচনা করেন। এরপর দণ্ডবিধির ৩৬৪, ৩০২ ও ৩৪ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনসার আলীকে সুপরিকল্পিতভাবে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি আসামিদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়ে পরোয়ানা জারি করেন।

জীবনধারণের অধিকার হলো মানুষের সর্বোচ্চ অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিল যেমন- মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা; নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ; অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত সনদ এবং নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী জীবনধারণের অধিকার হলো সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। সংবিধান এবং এসব আন্তর্জাতিক সনদের বাধ্যবাধকতার অধীনে রাষ্ট্র এই অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে বাধ্য। কোনো অবস্থাতেই এই অধিকারকে প্রত্যাহার করা যায় না, এমনকি সামরিক শাসন বা জরুরি অবস্থাতেও না। কিন্তু ২০০৪ সালে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গঠিত হওয়ার পর থেকে ‘ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধ’ বিভিন্ন নামে বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে, ২০১০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এমন হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৬১টি। ২০০৯, ২০০৮, ২০০৭, ২০০৬, ২০০৫ এবং ২০০৪ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২২৯, ১৭৫, ১৮০, ৩৫২, ৩৭৭ ও ২০৭টি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সংখ্যা দ্বারা রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতা ও দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করারই প্রমাণ মেলে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এই ভয়াবহতা বন্ধ করতে উচ্চ আদালত থেকে সরকারের প্রতি নির্দেশও দেয়া হয়েছে। ২৯ জুন ২০০৯ হাইকোর্টে সরকারের প্রতি একটি রুল জারি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণের আদেশ দেয়া হবে না মর্মে জানতে চাওয়া হয়। শুনানিকালে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আর কোনো ‘ক্রসফায়ার’ হবে না। কিন্তু তারপর বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ড। নির্বাচনী ইশতেহারে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা ক্ষমতায় গেলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করবে। সরকার তাদের সেই প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে পারেনি।

 

বেসরকারি গাড়ি রিকুইজিশন সংক্রান্ত
আইনের সংশোধন সময়ের দাবি


ফারহানা লোকমান

গাড়ি রিকুইজিশনকে কেন্দ্র করে ১৩ মে ২০১০ রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় পুলিশ ও ট্যাক্সিক্যাব চালকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই ট্রাফিক পুলিশসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় আট ট্যাক্সিক্যাব চালককে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১৪ মে ‘রাজধানীতে গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে পুলিশ-ক্যাব সংঘর্ষ গ্রেফতার ৮’ শীর্ষক সচিত্র প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গাড়ির মালিক ও চালকদের হয়রানি বন্ধে এবং গাড়ি রিকুইজিশন সংক্রান্ত আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ‘হিউম্যান রাইটস্‌ অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ (এইচআরপিবি) জনস্বার্থে একটি রিট মামলা দায়ের করে। এইচআরপিবি-এর পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ শুনানিতে বলেন, বর্তমানে পর্যাপ্ত গাড়ি ভাড়ায় পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটে রিকুইজিশন সংক্রান্ত আইনটি মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন ও বিভিন্নভাবে গাড়ির মালিক ও চালকদের হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় তা বাতিলযোগ্য। এই আইনের মাধ্যমে রিকুইজিশনকৃত গাড়ি কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। সামপ্রতিককালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গাড়ি রিকুইজিশন ও রিকুইজিশনের নামে পুলিশের চাঁদাবাজি সংক্রান্ত বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, অনেক ক্ষেত্রেই গাড়ির চালককে বিনা পারিশ্রমিকে রাতদিন গাড়ি চালাতে বাধ্য করা হয়, যা আইন পরিপন্থী। শুনানি শেষে ২৩ মে ২০১০ বিচারপতি এ.এইচ.এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি মোঃ দেলোয়ার হোসাইন গাড়ির রিকুইজিশন সংক্রান্ত ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশের ১০৩ (ক) ধারাটি কেন বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না- এই মর্মে রুল জারি করেন। স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার এবং ট্রাফিক বিভাগের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের উপ-কমিশনারদের দুই সপ্তাহের মধ্যে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ১০৩(ক) ধারায় বলা হয়েছে যে, অন্য কোনো আইনে যাই বলা হোক না কেন, পুলিশ কমিশনার লিখিত অর্ডারের মাধ্যমে জনস্বার্থে যে কোনো গাড়ি সর্বোচ্চ সাতদিনের জন্য রিকুইজিশন (অধিগ্রহণ) করতে পারেন। এই ধারায় আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো গাড়ি এরূপ অধিগ্রহণ করা হয়, তবে তার মালিককে নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

উক্ত রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে, সরকার ও পুলিশকে জনস্বার্থ ব্যতীত কোনো গাড়ি রিকুইজিশন না করার এবং গাড়ি রিকুইজিশন চলাকালে কোনো মালিক বা চালককে হয়রানি না করার ও রিকুইজিশনকৃত গাড়ি কোনো সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার না করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ঢাকা মহানগর পুলিশের ডেপুটি কমিশনারকে (ট্রাফিক) রিকুইজিশনকৃত গাড়ির মালিক ও চালককে বর্তমান ভাড়ার হারে ভাড়া পরিশোধ ও গাড়ির কোনো ক্ষতি হলে সাতদিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়াও গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনে যে তিন পুলিশ কর্মকর্তার ছবি ছাপা হয়েছে তাদের নাম, বর্তমান অবস্থান এবং যে ক্যাবচালকের ছবি ছাপা হয়েছে তার নাম, ঠিকানা ও সংঘর্ষের ওপর রিপোর্ট ২৬ মের মধ্যে দাখিল করতে পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেয়া হয়। এ অনুযায়ী তাদের নাম, ঠিকানা দাখিল করা হলে আদালত তিন পুলিশ ও ক্যাবচালককে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। ৭ জুন তাদের আদালতে হাজির করা হয় এবং ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেয়া হয়। সাথে সাথে এ তিনজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ বা দণ্ডবিধিতে মামলা করারও নির্দেশ দেয়া হয়। পুলিশের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সাত দিন ও আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতির প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়। ২৩ মে’র নির্দেশনার পরদিন পত্রিকায় ৩০০ গাড়ি রিকুইজিশনের খবর প্রকাশিত হয়। এটি আদালতের নজরে এলে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ২৫ মে রিকুইজিশনের ব্যাপারে তথ্য জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। ওই রিকুইজিশন জনস্বার্থে কিনা, গাড়ি কারা ব্যবহার করছেন এবং গাড়ির মালিক, চালককে ভাড়া দেয়া হয়েছে কিনা, এসবের তালিকা এক সপ্তাহের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। ১৭ জুন চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় চট্টগ্রামের বিআরটিএ ও নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের হিসাবে দেখা যায়, নগরে চলাচলকারী ৮৭৭টি বাস-মিনিবাসের মধ্যে ৬০৪টি, ৪৯০টি হিউম্যান হলারের মধ্যে ৩৩৭টি এবং প্রায় পাঁচ হাজার মাইক্রোবাসের মধ্যে ৩১০টি নির্বাচনের কাজে ব্যবহারের জন্য রিকুইজিশন করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের জন্য প্রায় ১২৬৭টি গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়। নির্বাচন কমিশন, জেলা প্রশাসন, র‌্যাব ও আনসারসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা যানবাহনের যে চাহিদা পুলিশের কাছে দিয়েছে সে অনুযায়ী এসব গাড়ি আটক করা হয়। যানবাহনের মালিকেরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, একটি বাস ভাড়ায় চললে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকা জ্বালানি খরচ ও চালক-সহকর্মীর বেতন বাদ দিয়ে লাভ থাকে। আর প্রতিটি মাইক্রোবাসে লাভ থাকে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। রিকুইজিশনকৃত গাড়ি থেকে মালিকের লাভ হবে দূরে থাক, গাড়ির ছোটখাটো যন্ত্রাংশ খোয়া গিয়ে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পুলিশ বিভাগকে পর্যন্ত গাড়ি দিতে না পারা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কিন্তু এভাবে এই ব্যর্থতার দায়ভার নিতে হচ্ছে নাগরিককেই। ক্যাবচালকেরা জানান, পুলিশ কর্মকর্তারা ট্যাক্সিক্যাব আটক করে প্রতি মাসে দুই থেকে তিনবার এবং মাসের অর্ধেক সময় পুলিশ ব্যবহার করে। প্রতিবার রিকুইজিশন করে ছয়-সাত দিন রেখে দেয়। তখন তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। ঢাকার ৪১টি থানা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ গাড়ি রিকুইজিশন করে তথাকথিত জনস্বার্থের নামে। কিন্তু বাস্তবে রিকুইজিশনকৃত গাড়ি বিক্রি করে দেয়ারও নজির আছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে “আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ বা রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বা দখল” নিষিদ্ধ করা আছে এবং আইন অনুযায়ী রিকুইজিশন করতে হবে তা অবশ্যই জনস্বার্থে হতে হবে। কিন্তু নাগরিকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিদিন শত শত গাড়ি রিকুইজিশন করা কখনোই জনস্বার্থে হতে পারে না। এমন বাস্তবতায় পুলিশের পরিবহন পুলে গাড়ি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি ১৯৭৬ সালের ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশের উপযুক্ত সংশোধনী আনা জরুরি।

 

আত্মহত্যার প্ররোচনা সংক্রান্ত
আসক-এর দুটি মামলা

সোফিয়া হাসিন

 

ইভটিজিং বা উত্ত্যক্তকরণ কিছু কিছু উচ্ছৃঙ্খল এবং বখাটে তরুণ ও যুবক তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা প্রকাশের একটি ভয়ঙ্কর মাধ্যম, আর একই সাথে তাদের দ্বারা লাঞ্ছিত মেয়েদের জন্য চরম অবমাননা, মানসিক পীড়ন এবং জীবনহানির কারণ। সামপ্রতিককালে উত্ত্যক্ত করার প্রবণতা এতটা বেড়ে গেছে যে, ২০১০ সালের জানুয়ারি-মে এ পাঁচ মাসের পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে, ২১ জন মেয়ে অপমান ও মানসিক পীড়ন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। মেয়েটির সাথে সাথে তার বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশীরাও বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন, খুন হচ্ছেন উত্ত্যক্তকরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে। আমরা জানি, রাষ্ট্রে বসবাসরত সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এর জন্য প্রয়োজনীয়, কার্যকর, যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এবং সেই আইনের সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগ, প্রচার এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধে বাংলাদেশে যে আইন প্রচলিত আছে, তা বর্তমান অপরাধের ভয়াবহতা অনুসারে যথেষ্ট ও কার্যকর নয়। কারণ, এই ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তির পরিমাণ খুবই কম। তাছাড়া বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত হওয়ার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন, যা খোলা চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। এ কারণে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা পুলিশ সহজে এ বিষয়ে কোনো আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত হয়ে মেয়েটি আত্মহত্যা করলে, তবেই আত্মহত্যার প্ররোচনা দানের অভিযোগে মামলা নেয়া হয় ও দায়ের করা হয়। এ রকমই দুটি মামলা নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো।

১. শিলা খাতুন বৃষ্টির আত্মহত্যায় প্ররোচনা দানের অভিযোগে মামলা
ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, মৃত শিলা খাতুন বৃষ্টি (১২) পিতা- কদম আলী, পাবনা জেলার ঈশ্ব্বরদী উপজেলার মশুড়িয়াপাড়ায় তার মামা কোরবান আলীর বাড়িতে থেকে স্থানীয় বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীতে পড়াশোনা করত। পার্শ্ববর্তী কামারপাড়ার দুখু (২২) এবং মুসা(২১)সহ চার-পাঁচ জন বখাটে যুবক অনেকদিন থেকেই স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এবং স্কুলে গিয়ে বৃষ্টিকে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করছিল এবং ভয় দেখিয়ে আসছিল। ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টায় স্কুলে টিফিনের সময় দুখু ও মুসা শ্রেণীশিক্ষিকার অনুপস্থিতির সুযোগে অন্য সহপাঠীদের সামনেই বৃষ্টিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এই অবমাননা সহ্য করতে না পেরে ঐদিনই বাড়িতে ফিরে বৃষ্টি গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। ঘটনার দিন অর্থাৎ ৩ ফেব্রুয়ারি রাতেই বৃষ্টির মামা কোরবান আলী বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় দুখু, মুসাসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দানের অভিযোগে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী-২০০৩)’-এর ৯ক এবং ৩০ ধারায় মামলা করেন (থানা মামলা নং-৩(২)১০ এবং জি. আর. মামলা নং-৫০/২০১০)। জাতীয় দৈনিক পত্রিকা থেকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ঘটনাটি জানতে পেরে ঈশ্বরদী থানায় যোগাযোগ করে এবং বাদীর সাথে কথা বলে আইন সহায়তা প্রদান করে। এর মধ্যে মামলার তদন্তকারী অফিসার তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল করেছেন এবং ২ নং অভিযুক্ত মুসা গ্রেফতার হয়েছে এবং ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। ১৫ মার্চ ২০১০ মামলাটি ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে’ বদলির আদেশ হয়। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে’ বদলি হয়ে আসার পর মামলাটির নতুন নম্বর হয়েছে ৮৫/২০১০। বর্তমানে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর লিটিগেশন ইউনিট মামলাটি পরিচালনা করছে।

২. উম্মে কুলসুম ইলোরার আত্মহত্যায় প্ররোচনা দানের অভিযোগে মামলা
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায় যে, মৃত উম্মে কুলসুম ইলোরা (১৪), পিতা- মোঃ নিজামউদ্দিন মোল্লা, রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও থানার মধ্যনন্দীপাড়ায় বাবা-মার সাথে বসবাস করত এবং দক্ষিণ বনশ্রী গোড়ান প্রজেক্ট হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ত। ইলোরার স্কুলে যাওয়া-আসার পথে একই এলাকার বখাটে মোঃ রেজাউল (১৯) প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত এবং আজেবাজে কথা বলত। এ বিষয়টি ইলোরার বাবা জানতে পারলে তিনি রেজাউলকে ডেকে বোঝান ও রেজাউলের অভিভাবকদেরও বিষয়টি অবগত করেন। এরপরও ৩১ মার্চ ২০১০ দুপুরবেলা স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে ইলোরা এবং তার মায়ের পথ আটকে রেখে বখাটে রেজাউলসহ আরও ৫-৭ জন বিভিন্ন ধরনের আপত্তিজনক কথাবার্তা বলে হুমকি দেয়। এভাবে বখাটে রেজাউল কর্তৃক ক্রমাগত উত্ত্যক্ত হয়ে এবং সম্ভ্রমহানির আশঙ্কায় ভীত হয়ে ৩ এপ্রিল ২০১০ দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ইলোরা বিষ জাতীয় দ্রব্য পান করে আত্মহত্যা করে। এরপর ইলোরার বাবা মোঃ নিজামউদ্দিন মোল্লা বাদী হয়ে মোঃ রেজাউলসহ আরও কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে ইলোরার আত্মহত্যায় প্ররোচনা দানের অভিযোগে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী-২০০৩)’-এর ৯ক এবং ৩০ ধারায় খিলগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেন (থানা মামলা নং-৬(৪) ২০১০ এবং জি.আর. মামলা নং-২১৪/১০)। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) থানা ও ভিকটিমের বাবার সাথে কথা বলে এই মামলাটিতে প্রয়োজনীয় আইন সহায়তা প্রদান করছে।

বর্তমানে নারীদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, আমি আগেই বলেছি- বাংলাদেশের আইনে এ অপরাধের জন্য শাস্তির যে বিধান আছে, তা পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া আইনের যথেষ্ট প্রচার না হওয়ার কারণে কেউ জানেই না যে উত্ত্যক্ত করা অপরাধ। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় বলা আছে- কেউ যদি কোনো নারীর শালীনতার অমর্যাদা করার জন্য কোনো মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি বা কোনো বস্তু প্রদর্শন করে তাহলে ঐ ব্যক্তির এক বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড হবে। অর্থাৎ উত্ত্যক্ত করার জন্য শাস্তির পরিমাণ খুবই অল্প। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যখন কেউ মানসিক পীড়নের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে, তখন আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করা হয় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায়। তবে বর্তমানে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী ২০০৩)’-এর ৯ক এবং ৩০ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনা দানের অভিযোগে মামলা করা হচ্ছে। যদিও এখানে সরাসরি উত্ত্যক্ত করার কথাটি বলা হয়নি। এই আইনের ৯ক ধারায় বলা হয়েছে যে- কোনো নারীর সম্মতি বা ইচ্ছা ছাড়া, যদি কোনো ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত কোনো কাজ দ্বারা সম্ভ্রমহানি হওয়ার কারণে ঐ নারী আত্মহত্যা করে, তাহলে ঐ ব্যক্তি ঐ নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দানের অপরাধে অপরাধী হবেন। এই অপরাধের জন্য তিনি অনধিক ১০ বছর অথবা অন্যূন ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া এই আইনের ৩০ ধারায় অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা বা সহায়তার জন্য দণ্ডিত হওয়ার বিধান দেয়া আছে।

 

জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার জন্য নিরাপদ ফল
নিশ্চিতকরণে সুপ্রিম কোর্টের
হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা

সোফিয়া হাসিন

 

বিগত কয়েক বছর থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, অসাধু কিছু ফল ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায়, অসময়ে ফল পাকানো ও বেশিদিন ধরে ফল সংরক্ষণ করার জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন ও কীটনাশক জাতীয় বিষাক্ত কেমিক্যাল ফলে মেশাচ্ছে। সামপ্রতিককালে এসব বিষাক্ত কেমিক্যাল ফলে মেশানোর হার এতটাই বেড়ে গেছে যে, বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, জনস্বাস্থ্যের জন্য তা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে। এর প্রেক্ষিতে হিউমেন রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) জনস্বার্থে একটি রিট পিটিশন এই মর্মে দায়ের করে যে- ‘ফল পাকানোর উদ্দেশ্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অপরপক্ষ (সরকার) ব্যর্থ হয়েছে; যদিও সংবিধান ও আইন অনুযায়ী সরকার তা করতে বাধ্য।’ ১০ মে ২০১০ এর শুনানি শেষে বিচারপতি এ.এইচ.এম. শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং বিচারপতি মোঃ দেলোয়ার হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে ফলে বিষাক্ত কেমিক্যালের ব্যবহার, উক্ত ফল সংরক্ষণ ও বিক্রি বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কতিপয় নির্দেশনা দিয়েছেন।

লক্ষ্য করা গেছে যে, যেসব ফল মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ও উপকারী, সেই ফলগুলোতেই অসাধু ফল ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশাচ্ছে। বিশেষত আম, কলা, পেঁপে, আপেল, কমলা জাতীয় ফলের চাহিদা বেশি থাকায় এসব ফলেই বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের হার বেশি। ফলের মাধ্যমে এই বিষাক্ত কেমিক্যাল মানুষের দেহে পৌঁছালে ক্যান্সার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস ও বিকল হওয়া, টিউমার ইত্যাদি নানা ধরনের জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। গত কয়েক বছরের বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে, বাংলাদেশে হঠাৎ করেই বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার (যেমন- রক্ত, হাড়, পাকস্থলী, অন্ত্র, লিভার, ফুসফুস ইত্যাদির ক্যান্সার) এবং কিডনি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। শুধু ফল নয়, অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যেও অসাধু হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও খাদ্য ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রঙ, প্রিজারভেটিভ, টিস্যু পেপার, মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়া দুধ, পচা ডিম ইত্যাদি মেশাচ্ছে। ১০ মে, ২০১০ হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার আগেও এ বিষয়ে কতিপয় আইন ও অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। খাদ্য ব্যবসায়ীদের অসাধু তৎপরতা বন্ধ করার জন্য ২০০৫ সালে ‘বাংলাদেশ বিশুদ্ধ খাদ্য (সংশোধনী) আইন- ২০০৫’ পাস হয়। এই আইনের ৬(১) ধারায় বলা হয়েছে- ‘কোনো লোক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এবং নিজে বা তার পক্ষে অন্য কোনো লোক দিয়ে কোনো ভেজাল খাদ্যবস্তু প্রস্তুত বা বিক্রি করতে পারবে না।’ এই আইনের ৬ক ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ‘কোনো লোক সরাসরি নিজে বা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, কীটনাশক ধরনের কোনো বিষাক্ত কেমিক্যাল দ্রব্য বা কোনো খাদ্য-রঙ বা সুগন্ধি যা মানবদেহের ক্ষতি করতে পারে তা খাদ্যে ব্যবহার করতে পারবে না এবং এসব বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো খাদ্য বিক্রি করতে পারবে না।’ এই আইনের ৪৪ ধারায় খাদ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তিগুলোর উল্লেখ আছে।

এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধ্যাদেশ-২০০৮’ জারি করে। কিছু সংশোধনসাপেক্ষে অধ্যাদেশটি ৬ এপ্রিল, ২০০৯ বর্তমান সরকারের মাধ্যমে আইনে পরিণত হয়। এই অধ্যাদেশের আওতায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও তার শাস্তি অধ্যাদেশের ৩৭-৫৬ ধারায় বলা আছে। এ আইনের ৪১ এবং ৪৬ ধারায় বলা আছে যে- কোনো ব্যক্তি ভেজাল মেশানো কোনো পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করলে বা করার জন্য প্রস্তাব করলে, অথবা মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর কোনো দ্রব্য বা বস্তু কোনো খাদ্যপণ্যের সাথে মেশালে ঐ ব্যক্তি অনূর্ধ্ব ৩ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৫৭-৬৪ ধারায় এ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এই অধ্যাদেশের অধীন অপরাধগুলোর বিচার করবেন। তবে এই অপরাধগুলো জামিনযোগ্য, আমলযোগ্য ও আপোসযোগ্য হবে। যে ব্যক্তি বা ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তাকে ৩০ দিনের মধ্যে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’-এর মহাপরিচালক বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দায়ের করবে। অভিযোগ দায়েরের ৯০ দিনের মধ্যেই মহাপরিচালক বা সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলা দায়েরের জন্য ঐ অভিযোগটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা পক্ষ রায় প্রদানের ৬০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সেশন জজের আদালতে আপিল করতে পারবেন। উপরোক্ত বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াও এই আইনের আওতায় মোবাইল কোর্ট গঠনের মাধ্যমে ঘটনাস্থলে অপরাধগুলো তাৎক্ষণিকভাবে আমলে নেয়া এবং বিচার করার বিধানও আছে। এর প্রেক্ষিতে বিগত বছরগুলোতে সরকার মোবাইল কোর্ট গঠন করে বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকান, ডিপার্টমেন্টাল শপ, বাজার, আড়তে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভেজাল খাদ্যদ্রব্য উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করে এবং অপরাধীরা শাস্তিও পায়। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমগুলোতে সরকারের এসব কার্যক্রম ও অপরাধীদের শাস্তির খবর দেখে মানুষ সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি লাভ করেছিল। কিন্তু সামপ্রতিককালে আবারো ফলে কার্বাইড এবং বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে, যা জনমনে আশঙ্কা ও ভীতির সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষিতে এইচআরপিবি কর্তৃক জনস্বার্থে দায়ের করা রিট পিটিশনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুলনিশি জারি করেন এবং জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য ফলে বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানোর বিরুদ্ধে সরকারকে কেন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেয়া হবে না এবং এ সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না মর্মে সরকারকে তিন সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর আদেশ দেন। সেই সাথে আশু পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নিম্নলিখিত নির্দেশনা প্রদান করেন-

- বিএসটিআই এবং র‌্যাব ঢাকার ফলের আড়তগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে কেউ কোনো বিষাক্ত দ্রব্য মেশানো ফল কোনোভাবে সংরক্ষণ, মজুদ এবং বিক্রি করতে না পারে। এছাড়া প্রতিদিন পাইকারি ফলের আড়তের ফল পরীক্ষা করে দেখারও নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
- ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ বা এনবিআর চেয়ারম্যানকে এ ধরনের বিষাক্ত ফল আমদানি বন্ধের উদ্দেশ্যে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য এবং ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে।
- রাজশাহীর ডিআইজি অফ পুলিশকে তার পুলিশ ফোর্সকে কাজে লাগিয়ে রাজশাহীর বাণিজ্যিক আমের বাগানগুলো পরিদর্শন করতে বলা হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা যেন ফলে বিষাক্ত দ্রব্য মেশাতে না পারে সেই ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
- বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবদের অবিলম্বে এসব মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে সরকারকে এ বিষয়ক প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে প্রদানের জন্যও বলা হয়েছে।
- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব অসাধু ফল ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪’-এর অধীনে মামলা দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছেন।


তথ্যসূত্র
- ‘বাংলাদেশ বিশুদ্ধ খাদ্য (সংশোধনী) আইন-২০০৫’;
- ‘বাংলাদেশ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধ্যাদেশ-২০০৮’;
- আসক বুলেটিন-মার্চ, ২০০৯;
- 'The Daily Star' 'Newspaper;
- দৈনিক প্রথম আলো


বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিল ২০১০
আইনি পর্যবেক্ষণ

আতিয়া নাজনীন

 

নব্বই দশকের শুরুর দিকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এরূপ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বর্তমানে ৫১টি, যেখানে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হলেও এর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯২ সালে প্রণয়ন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন। ১৯৯৮ সালে আইনটির একটি সংশোধনী আসে। পরবর্তীকালে আইনটিকে যুগোপযোগী করা এবং বিভিন্ন মহলের চাহিদার প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করে। কিন্তু জাতীয় সংসদে গৃহীত না হওয়ায় আইন হিসেবে অধ্যাদেশটি আলোর মুখ দেখেনি। এমতাবস্থায় বিভিন্ন মহল থেকে আইনটিকে নতুন করে পর্যালোচনা ও সংশোধনীর কথা বারবার উঠে আসছিল। এ প্রেক্ষিতে ১৪ জুন, ২০১০ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিল চূড়ান্ত করে। উল্লেখ্য, সর্বপ্রথম বিলটির একটি খসড়া প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পরে সুপারিশ ও পর্যালোচনার জন্য তা সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়। সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা শেষে বিলটি এখন চূড়ান্তভাবে সংসদে উত্থাপন এবং আইনে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। উল্লেখ্য, পর্যালোচনায় সংসদীয় কমিটি যেসব সুপারিশ পেশ করেছে, সেসব নিয়ে একদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেমন সন্তুষ্ট নয়, অন্যদিকে তেমনি বিলটির ভালো-মন্দ, পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত প্রকাশ করছে নানা মহল।

সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা শেষে বিলটি এখন চূড়ান্তভাবে সংসদে উত্থাপন এবং আইনে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। উল্লেখ্য, পর্যালোচনায় সংসদীয় কমিটি যেসব সুপারিশ পেশ করেছে, সেসব নিয়ে একদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেমন সন্তুষ্ট নয়, অন্যদিকে তেমনি বিলটির ভালো-মন্দ, পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত প্রকাশ করছে নানা মহল।

কী আছে আইনে?
সূক্ষ্ম পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিলটি একপেশে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকপক্ষের দিকেই এক্ষেত্রে পাল্লাটি বেশি ভারী মনে হয়। কেন এই কথা বলা হচ্ছে, সেটি বিলের কয়েকটি প্রস্তাব পর্যবেক্ষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

প্রথমত, শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রণীত খসড়া বিলে প্রস্তাব ছিল ছাত্রদের বেতন নির্ধারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ইউজিসির (ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন) অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু স্থায়ী কমিটির সুপারিশের ফলে বর্তমান বিলটিতে বলা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ইউজিসির কাছ থেকে অনুমতি নয় বরং ইউজিসিকে অবহিত করলেই হবে। ইউজিসি প্রয়োজনে পরামর্শ প্রদান করতে পারবে। ফলে ছাত্রবেতন নির্ধারণ সংক্রান্ত বিষয়টি ইউজিসি তথা রাষ্ট্র্রপক্ষের হাতে না থেকে চলে যাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ বা মালিকপক্ষের আওতায়।

দ্বিতীয়ত, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের একজন সদস্যকে অর্থ কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ করার সুপারিশ করেছে। বিভিন্ন সময়ে মালিকপক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিতেও এমন বক্তব্য লক্ষ্য করা গেছে। উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রণীত খসড়া বিলে উপাচার্যকে অর্থ কমিটির প্রধান রাখার বিধান ছিল। একটি ব্যাপার এখানে বলে রাখা ভালো, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মালিকপক্ষ কর্তৃক মনোনীত হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে উপাচার্যের বদলে তাদেরই একজন অর্থ কমিটির সভাপতি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ সংক্রান্ত ব্যাপারে মালিকপক্ষেরই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। তবে বিদ্যমান আইনের মতোই এই বিলের অধীনে উপাচার্য সমস্ত একাডেমিক কার্যক্রমের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

তৃতীয়ত, মন্ত্রণালয় প্রণীত খসড়া আইনে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও অর্থ কমিটিতে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের একজন সদস্য রাখার বিধান ছিল। কিন্তু সংসদীয় কমিটি বিলে সদস্যসংখ্যা একজন থেকে বাড়িয়ে তিনজন করার প্রস্তাব করেছে। স্পষ্টতই এর মাধ্যমে মালিকপক্ষের আধিপত্য বিস্তার হচ্ছে। চতুর্থত, স্থায়ী কমিটির প্রস্তাবিত বিলে বলা আছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির দু’জন প্রতিনিধি সিন্ডিকেটের সদস্য হবেন। তবে তাদের কোনো নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা থাকবে না। বড়জোর তারা কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে লিখিত আপত্তি জানাতে পারবেন।

সুতরাং এটা খুবই সুস্পষ্ট যে, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রণীত বিলটি মালিকপক্ষকে কতটা সুরক্ষা দিয়েছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিলটির ইতিবাচক দিক লক্ষ্য করা যায়। যেমন- বিলে বলা হয়েছে উপাচার্য হতে হলে ১০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাসহ গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজে মোট ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এছাড়াও সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইনে কিন্তু উপাচার্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত ছিল।

আবার সামপ্রতিক সময়ে জঙ্গি তৎপরতা ও সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে এবং এক্ষেত্রে কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জড়িত থাকার অভিযোগের ভিত্তিতে বিলটিতে একটি নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে। তা হচ্ছে, বিলে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতা বা এ জাতীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা করা যাবে না।

একইভাবে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে নতুন এই বিলে শাস্তির বিধান বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন, বিদ্যমান আইনে অপরাধের জন্য তিন বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডের বিধান আছে। বিলে তা যথাক্রমে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং দশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আবার বিলে প্রস্তাবিত বিধানগুলো লঙ্ঘন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক স্থাপন ও পরিচালনার অনুমতি বাতিলসহ বন্ধ ঘোষণার বিধান রাখা হয়েছে। প্রচলিত আইনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক সনদের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বর্তমান বিলে তা সাত বছরে উন্নীত করা হয়েছে।

নিঃসন্দেহে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আইনের সংশোধনী বাঞ্ছনীয়। কিন্তু তাকে হতে হবে স্বার্থনিরপেক্ষ। আইনে পরিণত হওয়ার আগে বর্তমান বিলটির বিতর্কিত বিষয়গুলো/সুপারিশগুলো আরো একবার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি।

 

আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মার্কিন তেল-গ্যাস কোম্পানি
শেভরনের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়

শ্রাবন্তী শেগুফতা

 

আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মার্কিন তেল-গ্যাস কোম্পানি শেভরনের বিপক্ষে বাংলাদেশ জয়লাভ করেছে। শেভরনের করা একটি আরবিট্রেশন মামলায় পেট্রোবাংলার কাছে শেভরনের ২৪০ মিলিয়ন ডলারের দাবি নাকচ করে দিয়ে ১৮ মে, ২০১০ বাংলাদেশের পক্ষে রায় এসেছে। এর ফলে দাবিকৃত অর্থ পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো হুইলিং চার্জ পরিশোধ বাবদ শেভরনকেই এখন গুনতে হবে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

উত্তোলনকৃত গ্যাসের অংশীদারিত্ব নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে করা এ মামলাটিতে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অফ ইনভেস্টমেন্ট ডিসপুট (ICSID)-এর তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালের তরফ থেকে এ রায় দেয়া হয়। পেট্রোবাংলার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানা যায়, এই রায়ের ফলে পেট্রোবাংলার পাইপলাইন ব্যবহারের জন্য হুইলিং চার্জ বাবদ শেভরনের কাছ থেকে আগামী ২০ বছরে আনুমানিক ৩১২ মিলিয়ন ডলার পাবে বাংলাদেশ। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞগণের মতে, তিনটি গ্যাসক্ষেত্রেই গ্যাসের মজুদ নিশ্চিতভাবে বাড়ছে। তাই হুইলিং চার্জ থেকে পেট্রোবাংলার আয় আরও বাড়বে। ওঈঝওউ-এর এই রায়ের ফলে শেভরনের দাবিকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থও বাংলাদেশ সরকারকে আর ফেরত দিতে হবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মার্কিন কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশের বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার ও জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লক পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। সর্বপ্রথম এই ব্লকগুলো পরিচালনার দায়িত্বে ছিল আরেক মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল। পরবর্তীকালে অক্সিডেন্টালের দায়িত্ব আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইউনোকলের কাছে হস্তান্তরিত হয় এবং ইউনোকল ২০০৫ সাল থেকে মৌলভীবাজার গ্যাসফিল্ড থেকে উত্তোলন শুরু করে। এর কয়েক বছর পর শেভরনের কাছে ইউনোকলের মালিকানা হস্তান্তরিত হয়। ১৯৯৯ সালে জালালাবাদ ক্ষেত্রে উত্তোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই গ্যাসের বিলের ওপর ৪ শতাংশ হারে হুইলিং চার্জ কেটে আসছে পেট্রোবাংলা। অক্সিডেন্টাল তখন এ বিষয়ে আপত্তি করেনি। ইউনোকল দায়িত্ব নেয়ার ৫ বছর পর ২০০৪ সালে সর্বপ্রথম হুইলিং চার্জ দিতে আপত্তি জানায়। পরে ২০০৬ সালের ৩০ জুন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অফ ইনভেস্টমেন্ট ডিসপুট-এ ইউনোকল আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি পেশ করে। ইউনোকলের পক্ষ থেকে এখানে বলা হয়- ১৯৯৯ সালে স্বাক্ষরিত উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পি.এস.সি.) অনুসারে শুধু তৃতীয় কোনো পক্ষের গ্যাস বিক্রি করতে গিয়ে পেট্রোবাংলার পাইপলাইন ব্যবহার করা হলেই এভাবে হুইলিং চার্জ কেটে রাখা যাবে। যেহেতু মিটারিং পয়েন্টে দেয়া হচ্ছে তাই হুইলিং চার্জ কাটা পি.এস.সি. বহির্ভূত। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হয়- পি.এস.সি. অনুযায়ী ক্ষেত্র থেকে উৎপাদনের পর ডেলিভারি পয়েন্ট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পরিচালনকারী প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু ঐ গ্যাস পৌঁছে দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট তেল-গ্যাস-কোম্পানি ইউনোকল পেট্রোবাংলার পাইপলাইন ব্যবহার করে আসছিল। এ কারণে পি.এস.সি. অনুযায়ী পেট্রোবাংলার তরফ থেকে তাদের কাছ থেকে হুইলিং চার্জ কেটে রাখা হচ্ছিল। পরে ইউনোকলের কাছ থেকে ব্লকগুলোর দায়িত্ব পাওয়ার পর শেভরনও পূর্বেকার আরবিট্রেশন মামলাটি চালিয়ে যেতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য, তিনটি ফিল্ডের গ্যাস প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ডেলিভারি পয়েন্টে পৌঁছে দিতে শেভরন পেট্রোবাংলার অধীনস্থ কোম্পানি গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির (জিটিসিএল) পাইপলাইন ব্যবহার করে আসছে। ২০০৯ সালের ৯ মে ICSID-এর ট্রাইবুনালে এ মামলার আবেদনের শুনানিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ২৪০ মিলিয়ন ডলার দাবি করে শেভরন। এছাড়াও জালালাবাদ, বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্রের উত্তোলিত গ্যাসের বিরোধপূর্ণ এ ৪ শতাংশ হুইলিং চার্জের আজীবন মালিকানা দাবি করে কোম্পানিটি। দুই পক্ষের এই বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রথম শুনানি হয় ২০০৭ সালের ১৪ এপ্রিল নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে। এরপর শুনানি (মেরিট পর্যায়ের) হয় ২০০৮ সালের ৭ জুলাই ওয়াশিংটনে। চূড়ান্ত শুনানি হয় ২০০৯ সালের ১৭ ও ১৮ মে ICSID-এর লন্ডন আদালতে। এর এক বছর পর গত ১৮ মে, ২০১০ ICSID-এর ওয়াশিংটন ডিসি ট্রাইব্যুনালে এ মামলার রায় দেয়া হয়। ICSID কর্তৃক প্রদত্ত রায়ে বলা হয়- শেভরন হুইলিং চার্জ হিসেবে কয়েক বছর সরকারকে টাকা দেয়ার পর হঠাৎ করেই এ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে; কিন্তু পি.এস.সি.তে এ অর্থ দেয়ার কথা বলা আছে। সুতরাং ICSID- এর ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক শেভরনের দাবি অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করে মামলা খারিজ করে দেয়া হয়। তবে শেভরন চাইলে এ মামলায় আপিল করতে পারে। শেভরনের সঙ্গে এ মামলার শুনানি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ইকসিডের প্রধান কার্যালয় ওয়াশিংটন ছাড়াও লন্ডন ও হেগ কার্যালয়েও অনুষ্ঠিত হয়। এই ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস-এর পক্ষে ড. কামাল হোসেন, ড. শরীফ ভূঁইয়া ও মঈন গনি। এছাড়াও ছিলেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন পাঁচজন বিদেশি আইনজীবী- টোবি ল্যানভাউ কিউসি (এসেক্স কোর্ট চেম্বার), জেরেমি পি কার্ভার, স্যামুয়েল এ স্টার্ন (হিলস স্টার্ন অ্যান্ড মরলি এলএলপি) এবং প্রফেসর লঁরাম বোয়াসোঁ দ্য শাজুন্র। শেভরনের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করে কিং অ্যান্ড স্পলডিং এলএলপি।

২০০০ সালের পর পেট্রোবাংলার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ কোম্পানি কেয়ার্ন, কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো, ইতালিয়ান কোম্পানি সাইপেম এবং ডাচ্‌ কোম্পানি শেল মামলা করে। এর মধ্যে শেল, সাইপেম এবং কেয়ার্নের মামলার রায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গেছে। বাদবাকি নাইকো মামলার শুনানি এখনও শুরু হয়নি। ১৯৯৪ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে কানাডিয়ান কোম্পানি সিমিটারের পেট্রোবাংলার বিরুদ্ধে করা আরবিট্রেশন মামলায় বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে জয়লাভ করে। ১৬ বছর পর পুনরায় আন্তর্জাতিক কোনো ট্রাইব্যুনালে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এ ধরনের জয়লাভ প্রসঙ্গে আলোচ্য মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্বকারী অন্যতম একজন কৌঁসুলি ড. শরীফ ভূঁইয়া এক টেলিসাক্ষাৎকারে জানান- “পূর্বেকার মামলাগুলোতে বাংলাদেশের হেরে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল কৌঁসুলিদের পূর্ণ প্রস্তুতির অভাব। এই মামলার ফলাফলে এই দৃষ্টান্তই স্থাপিত হয় যে, এ দেশে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা অথবা চুক্তির শর্ত নির্ধারণের যে কোনো ব্যাপারে আমরাও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারি।”

 

জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ে দুটি জনস্বার্থে মামলা

তাবাসসুম মখদুমা

 

বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্প পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। এ কার্যক্রমের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর অন্যতম হচ্ছে- মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং পরিবেশ দূষণ। ভাঙার জন্য আনা জাহাজগুলোতে থাকে কালো তেল ও বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য। এসব বিষাক্ত দ্রব্যাদি ও জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে কোনো আয়োজন নেই। ফলে এসব বর্জ্য ঠেলে দেয়া হয় সমুদ্রে। জাহাজ কাটতে গিয়ে সৃষ্টি হয় খণ্ড-বিখণ্ড লোহার টুকরো ও গুঁড়া। এসব পদার্থেরও শেষ গন্তব্য ঐ সমুদ্র। ফলে শিপব্রেকিং এলাকার সমুদ্রোপকূল অঞ্চল বর্জ্যের আঁস্তাকুড়ে পরিণত হয়েছে। এই কারণে দূষিত হচ্ছে সমুদ্রের লোনা জল। সমুদ্র উপকূলে মাছসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্য নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অপরদিকে জাহাজ ভাঙা কার্যক্রমের শ্রমিকরা নানাবিধ সমস্যা ও ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ শিল্পের সাথে বিভিন্ন ধরনের শ্রমিক জড়িত। অভাবের তাড়নায় শ্রমশক্তির এক বৃহৎ অংশ বাধ্য হয় বিপজ্জনক এই কায়িক শ্রমে নিযুক্ত হতে। নিরাপত্তার উপকরণ না থাকার কারণে শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি বেড়ে যায়। শ্রমিকরা স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, পয়ঃনিষ্কাশন, আর্থিক নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে একেবারে ন্যূনতম সুবিধা পেয়ে থাকে। প্রায়ই শ্রমিকরা মারাত্মক অসুস্থ বা আহত হয়, দুর্ঘটনায় মারা যায়। সাধারণত তাদের শিপইয়ার্ডের কাজের ধরন এবং ঝুঁকি সম্পর্কে না জানিয়েই কাজে নিয়োগ করানো হয়। শিপইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকদের অন্য কোনো প্রশিক্ষণ, ইন্স্যুরেন্স, নিয়োগপত্র এবং রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা নেই। নিহত হলে শ্রমিকদের পরিবারকে ঠিকভাবে ক্ষতিপূরণও দেয়া হয় না। এসবের অন্যতম কারণ হলো জাহাজ ভাঙা কার্যক্রমকে আজো শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এ শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রচুর রাজস্ব আয় হলেও নীতিনির্ধারকদের কাছে এদের সঠিক খবর কখনোই পৌঁছায় না। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাহাজ ভাঙা শিল্প আমাদের দেশে উন্নয়নশীল দেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই ব্যবসা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই খাত আড়াই লাখ শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ বেকারত্ব দূরীকরণে, দারিদ্র্য বিমোচনে এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। শুধু এই শিল্প থেকে সরকার প্রতি বছর রাজস্ব আদায় করে ৭-৮শ’ কোটি টাকা। এছাড়া সরকার জাহাজ ভাঙা কর্মকাণ্ড থেকে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি ভূমির ইজারামূল্য থেকেও বার্ষিক আয় করে থাকে। প্রতি বছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ লোহার চাহিদা থাকে তার সিংহভাগই জোগান দেয় জাহাজ ভাঙা শিল্প। এ দেশে আকরিক লৌহখনি না থাকায় জাহাজ ভাঙা শিল্পকে ভাসমান লৌহখনি বলা হয়ে থাকে। কারণ এ শিল্পই প্রতি বছর এ দেশের প্রায় ২০ লাখ থেকে ২২ লাখ টন লোহার জোগান দেয়। দেশের স্টিল ও রি-রোলিং মিলগুলোও জাহাজ ভাঙা শিল্পের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এ দেশের ৯০% ইস্পাত ও রি-রোলিং মিল তাদের কাঁচামালের জন্য সম্পূর্ণভাবে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। জাহাজের স্ক্র্যাপ মেটেরিয়ালের মধ্যে ইস্পাতের পরিমাণ সর্বাধিক। জাহাজ থেকে প্রাপ্ত ইস্পাতে কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে লোহার রড, ইস্পাতের পাত ইত্যাদিতে পরিণত করা হয়। এ দেশের চারশ’ রি-রোলিং মিলে জাহাজ থেকে প্রাপ্ত লোহার প্লেটগুলো প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া এ দেশের ফার্নিচার শিল্প, নির্মাণ শিল্প, রপ্তানি বাণিজ্য, স্যানিটেশন শিল্পসহ অনেক শিল্প এবং ব্যবসা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জাহাজ ভাঙা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তবে এ শিল্পের এত উপকারিতা সত্ত্বেও এটি সত্য যে, জাহাজগুলো মুনাফা এবং লাভ বয়ে আনে ঠিকই, একইসাথে বিপুল পরিমাণ দূষিত বর্জ্যও নিয়ে আসে। আর সচেতনতা ও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে এ কার্যক্রম প্রতিনিয়ত পরিবেশকে করেছে মারাত্মকভাবে দূষিত। কোনো রকম পেশাগত নিরাপত্তা না থাকায় পরিবেশের সাথে সাথে হুমকির মুখে পড়ছে অসহায় শ্রমিক গোষ্ঠী। নানা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনাগুলো বেশ কয়েকটি কারণে ঘটতে পারে ও ঘটে থাকে। যেমন-

১. জাহাজ ভাঙা কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দফতরগুলোর দায়িত্ববোধের ঘাটতির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা অব্যাহত থাকা;
২. ঝুঁকিমুক্ত পূর্ব প্রস্তুতি ও জাহাজ ভাঙা কর্মকাণ্ডে সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা;
৩. গ্যাসমুক্ত না করে জাহাজ কাটার সময় আগুনের তাপে প্রচণ্ড শব্দে গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে জাহাজের সংলগ্ন অংশ বিকট শব্দে টুকরো টুকরো হয়ে ব্যাপক এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে ও পড়ে। লোহার এসব টুকরো সিসার তৈরি বুলেটের মতো ভয়ঙ্কর;
৪. মালামাল বিভিন্ন পরিবহনে বোঝাই করার সময় তাড়াহুড়া করতে গিয়ে প্লেট চাপা পড়েও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনার খবর বাইরের লোকজন জানতে পারে না;
৫. ওয়্যার মেশিন কিংবা লোহার তার দিয়ে বেঁধে লোহার বড় খণ্ডগুলো টেনে আনার সময় তার ছিঁড়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে যা খুবই বিপজ্জনক। এক্ষেত্রে তারের বহন ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয় না এবং পুরনো তার ব্যবহার করা হয় বলে এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে।
এছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, গ্যাস কাটারের সঠিক ব্যবহারপ্রণালি না জানা, প্রয়োজনীয় ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব কিংবা কাজের সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকা এবং অদক্ষ শ্রমিক প্রভৃতি কারণেও শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। শ্রমিকরা দলবেঁধে কাঁধে করে জাহাজের প্লেট এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বয়ে নিয়ে যায়। এভাবে প্লেটগুলো বহন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এগুলো মসৃণ না হওয়াতে হাত কেটে যায়, পিঠ কেটে যায়। এই প্লেটগুলোর কোনো কোনোটির ওজন ৫শ’ কেজির ওপরে। তাছাড়া এসব প্লেট কাটা হয় পুরনো পদ্ধতিতে এলপি গ্যাসের সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডারের প্রকাশ্য সংযোগ ঘটিয়ে, যা কাজের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। যারা এসব কাজ করেন তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন হেলমেট, বুট, গ্লাভস্‌ প্রভৃতি সরবরাহ করা হয় না আবার সরবরাহ করলে শ্রমিকরা তাও পরে না। ফলে সবসময় ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। নিয়মানুযায়ী গ্যাস ফ্রি না করে কাটিংয়ের কাজ করাতে মাঝে মধ্যে বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আগুন লেগে যায়। কাছাকাছি কোনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নেই, নেই কোনো হাসপাতাল। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সারাদিন শ্রমিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে কিন্তু তার বিনিময়ে তারা পর্যাপ্ত মজুরি পায় না। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার পরও কোনো নিয়োগপত্র দেয়া হয় না। অতিরিক্ত মজুরি বা বোনাস দেয়া হয় না কোনো উৎসবেই। নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান থাকলেও মালিক, কন্ট্রাক্টর থানা ও প্রশাসনের সহায়তায় কোনো ক্ষতিপূরণ না দিয়েই অনেক সময় শ্রম আইনের বিধান এড়িয়ে যায়। জাহাজ ভাঙা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্য যে কোনো শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের চেয়ে বেশি। প্রচুর ক্ষতিকর ও বিষাক্ত উপাদান অজান্তেই ঢুকে যাচ্ছে শ্রমিকদের শরীরে। পরিণতিতে ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা ঘাতকব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইয়ার্ডগুলোতে বিশুদ্ধ পানি বা স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থাও নেই। শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের অবহেলিত শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য জনস্বার্থে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। ২০০৮ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং নিহত ও মারাত্মকভাবে আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হাইকোর্টের কাছে প্রতিকার চেয়ে বেলার পক্ষ থেকে রিট পিটিশনটি (পিটিশন নং ২৩/২০০৮) দায়ের করা হয়। ৭ জানুয়ারি ২০০৮ সুপ্রিম কোটের হাইকোর্র্র্ট ডিভিশন বেলার পক্ষে রুলনিশি জারি করেন। মামলার শুনানিতে বেলা নানা যুক্তির পাশাপাশি আরও তুলে ধরে কীভাবে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বাংলাদেশ সংবিধানসহ নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনগুলো লঙ্ঘিত হচ্ছে। রুলে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এবং নিহত ও আহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শাও নোটিশ প্রদান করা হয়। তাছাড়া দু’জন বিবাদীকে নির্দেশ দেয়া হয় রায় প্রাপ্তির তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট করার জন্য। ২০০৯ সালে উক্ত বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একটি জনস্বার্থ মামলা (রিট পিটিশন নং-৭৫২৮/২০০৯) দায়ের করে। এই রিট মামলার প্রেক্ষিতে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত বেঞ্চ নিম্নোক্ত আদেশ প্রদান করেন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত জাহাজ ভাঙা শিল্প শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল এবং বেঁচে থাকার অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় শ্রম আইন ২০০৬-এর প্রয়োগে ব্যর্থতায় তাদের কেন দায়ী করা হবে না এবং জাহাজ ভাঙা শিল্পে কেন শ্রম আইন ২০০৬ প্রয়োগের জন্য নির্দেশ দেয়া হবে না- এই মর্মে হাইকোর্ট শিল্প মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রধান শিল্প পরিদর্শক, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এবং জাহাজ ভাঙা শিল্প মালিক সমিতির সভাপতিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন। মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় আছে।

 

প্রস্তাবিত সংশোধনী আইনে রূপান্তরিত হলে
দুর্নীতি দমন কমিশন কাগুজে বাঘে পরিণত হবে

ইসরাত জাহান তামান্না

 

একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন প্রণীত হয়। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে কমিশনের আইন পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য সুপারিশের লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদের অধীনে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ছয়টি বৈঠক শেষে আইনটি সংশোধনের লক্ষ্যে কিছু সুপারিশ প্রদান করে। গণমাধ্যম প্রতিবেদন অনুযায়ী কমিটির সুপারিশগুলো দুদকের প্রস্তাবিত খসড়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনের কিছু ধারা সংশোধনে দুদক দ্বিমত পোষণ করলেও সেটি আমলে নেয়া হয়নি।

সংশোধিত খসড়া আইন অনুযায়ী মন্ত্রীসহ সরকারি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে।১ এ বিধান সরকারি কর্মকর্তাদের দুদকের এখতিয়ার-বহির্ভূত করার সমতুল্য। একই সাথে এটি সংবিধানের মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। কেননা দুদক সব শ্রেণী-পেশার নাগরিকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ক্ষমতা রাখলেও সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে যদি পূর্বানুমতির বিধান রাখে, তাহলে তা জনগণের সংবিধান স্বীকৃত সমান অধিকার মূলনীতিকে লঙ্ঘন করে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়, কমিশনের সচিব নিয়োগ দেবে সরকার এবং সচিবই মুখ্য হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ২০০৪ সালের মূল আইন অনুযায়ী দুদকের সচিব নিয়োগকর্তা হচ্ছে কমিশন। এ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে দুদকের সব কার্যক্রমে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। দুদক আইনের মুখবন্ধে স্বাধীন দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু সবক্ষেত্রে সরকার হস্তক্ষেপ করলে দুদকের স্বাধীনতা বলে আর কিছু থাকে না।

খসড়া আইনে আরও বলা হয়েছে, দুদকের নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার কার্যক্রম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজ সম্পর্কে দুদকের সমমানের কর্মকর্তাই জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। উল্লেখ্য, পূর্বের আইনে এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

বর্তমান আইন অনুযায়ী দুদক তার কাজকর্মের জন্য কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী দুদক সব কাজের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। কমিশনারদের রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ বিধানের ফলে দুদকের ওপর রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। কেননা সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হবে। তাই দুদককে রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ করলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে। তাছাড়া সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেভাবে অপসারিত হতে পারেন, দুদক আইন অনুযায়ী দুদকের কমিশনারকেও সেভাবে অপসারণ করা যায়, যার মধ্য দিয়ে তার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিশনারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় বিধায় রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহিতার বিধানটি অমূলক। খসড়া প্রস্তাবে দুদকের মন্তব্যে বলা হয়েছে, এই সংশোধনী গৃহীত হলে কমিশন একটি পক্ষপাতদুষ্ট হীনবল, অযৌক্তিক, গণবিরোধী এবং অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে (২৭ এপ্রিল ২০১০, দৈনিক প্রথম আলো)।

খসড়া আইনে আরও বলা হয়েছে, কমিশন সরকারের সম্মতি ছাড়া কোনো দেশ বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে চুক্তি করতে পারবে না। তাদের কাছ থেকে কোনো সহায়তা বা ঋণ নিতে পারবে না। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী মিথ্যা অভিযোগে দুর্নীতির মামলা করা হলে অভিযোগকারী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার সম্মুখীন হবে। টিআইবি মনে করে, দুদকের জন্য এরূপ বিশেষ বিধির দরকার নেই। প্রচলিত আইনেই মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

এছাড়া সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গোপন তথ্য কমিশনকে না দিলে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। কমিশনের যে কোনো মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী আইনে কমিশনকে করদাতাদের তথ্য গোপন রাখার কথা বলা হয়েছে।

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে দুদকের সঙ্গে স্বশাসিত শব্দটি সংযোজন করেছিল। অধ্যাদেশটি সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপন না করায় তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। খসড়া সংশোধনী আইনে স্বশাসিত শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি হলো, স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান নিজের আয় দিয়ে চলে। কিন্তু দুদকের নিজস্ব কোনো আয় নেই। এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারের অর্থ দিয়ে চলে বিধায় স্বশাসিত হবে না। সংশোধনীর যে প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হয়েছে, তা আইনে পরিণত হলে কমিশন অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সংশোধনীগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী দুদককে রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে টিআইবির সুপারিশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে কমিশনের দায়বদ্ধতা সংসদের একটি বিশেষ কমিটির ওপর ন্যস্ত হতে পারে, যাতে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের সমানসংখ্যক প্রতিনিধিত্ব থাকবে। প্রস্তাবিত সংশোধনী আইনি মতামতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইনি মতামত পেলে এবং তা সংসদে পাস হলে আইনটি কার্যকর হবে। এ সংশোধনীগুলো আইন হলে দুদকের ক্ষমতা খর্ব হবে এবং দুদক নখ-দন্তহীন বাঘে পরিণত হবে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।


তথ্যসূত্র
১. দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪
২. দৈনিক প্রথম আলো