সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   প্রতিবেদন
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   ফলো-আপ
   নারী
   আন্তর্জাতিক
   পাঠক-পাতা
   সংগঠনবার্তা

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

ফলোআপ

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার

এটিএম মোরশেদ আলম

২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ একটি বিদ্রোহের ঘটনায় বিডিআর সদর দপ্তর ঢাকার পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৮ জন নিহত হয়। সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ওপর ভিত্তি করে সরকার দু’ভাবে এই ঘটনার বিচার পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। এ অনুযায়ী বিডিআর আইনে সারাদেশে ছয়টি বিশেষ আদালত গঠন করে শুরু হওয়া বিদ্রোহের বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধের বিচার করার জন্য সাধারণ আইনে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলার অভিযোগপত্র এখনো দাখিল করা হয়নি। বর্তমান আলোচনায় গত তিন মাসের অগ্রগতিগুলোর দিকেই আলোকপাত করা হয়েছে।

পঞ্চগড়ে ২৯ জনেরই সাজা
বিদ্রোহের অপরাধে বিডিআর আইনে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম রায় হয় পঞ্চগড়ের ২৫ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরে স্থাপিত বিশেষ আদালতে। রায়ে ২৯ জন আসামির সবারই সাজা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজা হয়েছে ১৩ জনের। সাজাপ্রাপ্তরা সবাই ২৫ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদস্য। বিশেষ আদালতের প্রধান মেজর জেনারেল মোঃ মইনুল ইসলাম ৭ এপ্রিল ২০১০-এ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডাদেশের পাশাপাশি সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে ১০০ টাকা করে জরিমানাও করা হয়। বেসামরিক কারাগারে রায় ঘোষণার দিন থেকে সাজা কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। রায়ে বলা হয়, বিদ্রোহ হয়েছিল এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, অভিযুক্তরা এই বিদ্রোহের সাথে জড়িত ছিলেন। আদালত প্রধান হিসেবে মহাপরিচালক বলেন, বিচারের সময় তিনটি বিষয়কে বিবেচনায় রাখা হয়। বাহিনীর নিজস্ব আইনকে সমুন্নত রাখা রাষ্ট্রের সুরক্ষায় নিয়োজিত একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর শৃঙ্খলা রাখা এবং সেই সাথে দোষ স্বীকার করে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আদালতের কার্যক্রম দ্রুত নিষ্পন্নের বিষয়টিও বিচারকালে বিবেচনায় রাখা হয়। রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্তরা আদালতকক্ষে হৈচৈ শুরু করে। উল্লেখ্য, গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এই বিচার কাজ শুরু হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ে সাজা ৫০ জনের, নির্দোষ ১
১১ এপ্রিল বিডিআর বিদ্রোহ মামলার দ্বিতীয় রায়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ৫০ জনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে। একজনকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে। দণ্ডিতদের মধ্যে সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজা হয়েছে দু’জনের। দণ্ডিতরা সবাই ২০ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদস্য। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে বিচারকার্য শুরু হয়।

ফেনীতে সর্বোচ্চ সাজা ৪ জনের, খালাস ৫
বিদ্রোহের দায়ে ফেনীতে সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজা হয়েছে চারজনের। খালাস পেয়েছেন পাঁচজন। অন্য ৫৩ জনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজার আদেশ হয়েছে ১৮ এপ্রিল ২০১০। অভিযুক্তরা সবাই ১৯ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদস্য। গত বছর ২০ ডিসেম্বর এখানে বিচারকাজ শুরু হয়।


সাতক্ষীরায় সর্বোচ্চ সাজা ২৪ জনের, খালাস ৪
বিদ্রোহের মামলায় সাতক্ষীরায় ৬০ বিডিআর সদস্যের মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে ২৪ জনের। খালাস পেয়েছেন চারজন। বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে। দণ্ডিতরা সবাই সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অবস্থিত নীলডুমুর ৭ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদস্য। ১৯ এপ্রিল ২০১০ ঘোষিত রায়ে আদালত বলেন, কর্মকর্তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে খোঁজাখুঁজি করা, পরিকল্পিতভাবে ব্যাটালিয়নে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, তালা ভেঙে অস্ত্র লুট করা, শ্যামনগর-কালীগঞ্জ সড়কে অবরোধ করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, সাধারণ মানুষকে মারধর করে আতঙ্ক সৃষ্টি করাসহ বিভিন্ন অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় অভিযুক্ত ৬০ জনের মধ্যে ৫৬ জনকে সাজা দেয়া হলো। উল্লেখ্য, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর এই আদালতের বিচারকাজ শুরু হয়।


রাঙ্গামাটিতে ৯ জনের সাজা

রাঙ্গামাটিকে অবস্থিত বিশেষ আদালত-৪ লংগদু এলাকার রাজনগরে অবস্থিত ১২ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের নয়জনকে সাজা প্রদান করেছে। ২ মে ঘোষিত এই রায়ে হাবিলদার মোঃ শামসুল হককে সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজা এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে। ২০০৯ সালের ২৪ নভেম্বর এখানেই প্রথম বিচার কার্য শুরু হয়। একই আদালতে রাঙ্গামাটির মারিশ্যার ৯ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের ৭৫ জন বিডিআর সদস্যদের বিচার কাজ এখনো চলছে।

ঢাকার বিশেষ আদালতে বিচার অব্যাহত
বিদ্রোহের বিচার করার জন্য ঢাকার বিশেষ আদালতের বিচার কার্যক্রম এখনো অব্যাহত আছে। ঢাকার আদালতে বিচার হচ্ছে ‘২৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’, ‘১০ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’, ‘১৫ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’, ‘১৭ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’, ‘২৮ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’, ‘৩০ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’, ‘৩৬ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’, ‘৪২ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’ এবং আরটিসিঅ্যান্ডএস-এর অভিযুক্ত সদস্যদের। প্রত্যেক ব্যাটালিয়নের জন্য আলাদা অভিযোগপত্র দাখিল করে বিচার পরিচালিত হচ্ছে। পিলখানার দরবার হলে স্থাপিত বিশেষ আদালত ৫ ও ৬ এই বিচারকাজ পরিচালনা করছে।

২৩ জুন ‘২৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন’-এর ৬৬৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। একই ব্যাটালিয়নের সুবেদার মোঃ মতিউর রহমান বিশেষ আদালত ৫-এ মামলাটি দায়ের করেন। অন্যদিকে পিলখানার সিগন্যাল সেক্টর এবং রাইফেলস সিকিউরিটি ইউনিট (আরএসইউ)-এর মোট ৩০০ সদস্যের বিচার শুরু হয়েছে ৬ মে ২০১০। সিগন্যাল সেক্টরের ১৮৭ জন এবং আরএসইউ-এর ১১৩ জনের বিরুদ্ধে ৬নং বিশেষ আদালতে এই অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। একই আদালতে হাসপাতাল ইউনিটের ২৫৬ জন বিডিআর সদস্যের বিচার কাজ অব্যাহত আছে। তাদের ২৯ এপ্রিল আদালতে হাজির করে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।

সিলেটে বিদ্রোহের বিচার শুরু
সিলেটের বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের বিচার শুরু হয়েছে ২ এপ্রিল ২০১০। আখালিয়া বিডিআরের আঞ্চলিক সদর দপ্তরে স্থাপিত ৩নং বিশেষ আদালতে সুনামগঞ্জের ৮ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের ১৪ সদস্য বিচারের মুখোমুখি হবে। আসামিদের মধ্যে ১০ জন আগেই গ্রেফতার ছিলেন।

সাধারণ আইনে মামলা: অভিযোগপত্র দাখিল আবার পেছালো
মামলা দায়ের হওয়ার এক মাসের মধ্যে দাখিলের কথা থাকলেও অন্তত ১৩ বার পেছালো অভিযোগপত্র দাখিলের তারিখ। সর্বশেষ ১৯ মে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা এদিনও আদালতের কাছে সময় প্রার্থনা করেন এবং ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত ৩০ জুন প্রতিবেদন দাখিলেন তারিখ ধার্য করেন। উল্লেখ্য, এ মামলায় প্রায় দুই হাজার ২৬৪ জন বিডিআর সদস্য এবং বিডিআর নন এমন ৩৪ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এদের মধ্যে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে দুই হাজার ২৪০ জনকে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ৫৩৩ জন।

দায়িত্ব নিলেন নতুন ডিজি

বিডিআরের নতুন মহাপরিচালক হিসেবে মেজর জেনারেল মোঃ রফিকুল ইসলাম ৯ মে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মেজর জেনারেল মোঃ মইনুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হন। বিডিআরে যোগ দেয়ার আগে রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। উল্লেখ্য, বিদায়ী মহাপরিচালক ৪ মার্চ ২০০৯ দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

হেফাজতে মৃত্যু অব্যাহত
ঘটনার পর থেকে বন্দি বা হেফাজতে থাকা অবস্থায় অভিযুক্ত বিডিআর সদস্যরা অস্বাভাবিকভাবে মারা যেতে থাকে, যা এখনো অব্যাহত আছে। ৭ এপ্রিল গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যায় বিডিআর সদস্য মোঃ বায়োজী উজ্জামান (বয়স ৫১ বছর)। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, ৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টার দিকে মৃত বায়োজী হঠাৎ পেট ও বুকে ব্যথা অনুভব করেন। পরে রাত ৮টার দিকে তাকে গাজীপুর হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু গাজীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোঃ কমর উদ্দিন জানান, রাত ৯টার দিকে তাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে সাধারণ আইনে দায়ের হওয়া মামলায় তিনি আসামি ছিলেন। একই কারাগারে বন্দি অবস্থায় এর আগেও দু’জন বিডিআর সদস্য মারা যান। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে বন্দি অবস্থায় মারা যান নায়েক সুবেদার গোলাম মোস্তফা এবং ২ মার্চ মারা যান হাবিলদার মোঃ এনামুল হক। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বন্দি বা হেফাজতে থাকা অবস্থায় মোট মৃতের সংখ্যা ৫৯ জন।

 

ইউপিআর ব্যবস্থার অধীনে বাংলাদেশের
মানবাধিকার অঙ্গীকার এবং বর্তমান বাস্তবতা

প্রশান্ত কুমার রায় ও সাঈদ আহমেদ

 

ভূমিকা
জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত প্রতিটা দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য ২০০৭ সাল থেকে শুরু হয়েছে ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ (ইউপিআর) পদ্ধতি। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে পরিচালিত এই পদ্ধতির আওতায় জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা চলছে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেনেভাস্থ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদন, বেসরকারি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের সঙ্কলিত তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই পর্যালোচনা শেষে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে মানবাধিকার সংক্রান্ত ৪২টি বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করে। ফেব্রুয়ারির অধিবেশন থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো বিচার-বিবেচনা শেষে ২০০৯ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত ইউপিআর অধিবেশনে ৪২টি বিষয়ের মধ্যে দুটি বিষয় (মৃত্যুদণ্ড বিলোপ এবং সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা) ছাড়া ৪০টি বিষয়ে সুপারিশ বাংলাদেশ গ্রহণ করে সে অনুযায়ী কাজ করার অঙ্গীকার করে। এক বছর পর সে অঙ্গীকার কতটুকু পূরণ হলো তার একটি রিপোর্ট কার্ড তৈরি করে ২৩ জুন ২০১০ বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব মিজারুল কায়েসের কাছে হস্তান্তর করে ১৭টি মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের ফোরাম ‘ইউপিআর ফোরাম’। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের করা অঙ্গীকারের প্রেক্ষিতে যে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে সেগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি উদ্বেগের ক্ষেত্রগুলোও উল্লেখ করা হয়। যেহেতু ওই অঙ্গীকারগুলোতে সুনির্দিষ্ট কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং কত সময়ের মধ্যে তা করা হবে তা স্পষ্ট ছিল না, তাই তার কতটুকু পূরণ হয়েছে তা পরিমাপ করা খুব একটা সহজ হয়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ স্বাক্ষর ও সংরক্ষণ প্রত্যাহার
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ স্বাক্ষর সংক্রান্ত সুপারিশের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বক্তব্য ছিল যে- বাংলাদেশ প্রায় সব মৌলিক মানবাধিকার সনদের পক্ষভুক্ত হয়েছে এবং অন্য সনদগুলো অনুস্বাক্ষরের বিষয়টি নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করছে। এক্ষেত্রে ইতিবাচক হচ্ছে- মন্ত্রিসভা ২২ মার্চ ২০১০ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইন (রোম স্ট্যাটিউট) অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল অনুমোদনের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। তাছাড়া অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে স্বাক্ষর করলেও এটি অনুমোদনের বিষয়ে অদ্যাবধি কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদের ওপর থেকে বিদ্যমান সংরক্ষণ প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। সিডও সনদের অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬(১)(গ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারেরও সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা নেই।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করে যে- ইতোমধ্যেই জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে- ১৪ জুলাই ২০০৯ ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন- ২০০৯’ জারি করা হলেও সেই থেকে কমিশনের সদস্যপদ শূন্য ছিল। ২২ জুন ২০১০ সরকার চেয়ারম্যান ও অন্য ছয়জন কমিশনার নিয়োগদানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু সে নিয়োগ নিয়ে নানারকম বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উপরন্তু কমিশনের জন্য বিধিমালা ও সাংগঠনিক কাঠামো এখনো অনুমোদন করা হয়নি।

জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সব ক্ষমতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২৬ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদে দুর্নীতিদমন কমিশন আইন ২০০৪-এর সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে। এই সংশোধনী গৃহীত হলে সরকার কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর করার যে অঙ্গীকার করেছে তা পূরণ হবে না এবং কমিশনের কর্মপরিধি যেমন সঙ্কুচিত হবে তেমনি এর ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার হবে। যেমন সংশোধনীতে বলা হয়েছে- সরকারি কর্মকর্তাদের (মন্ত্রীসহ) বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে কমিশনকে সরকারের পূর্বানুমতি নিতে হবে। আরো প্রস্তাব করা হয়েছে যে, কমিশনের সচিব হবেন প্রধান হিসাব কর্মকর্তা এবং তিনি সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এটি অবধারিতভাবেই কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করবে। তাছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ করা এবং মিথ্যা অভিযোগে শাস্তির বিধান রাখাও দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিদের সহায়তা
জাতিসংঘের যে বিষয়ভিত্তিক বিশেষ প্রতিনিধি রয়েছেন তাদের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি বিষয়ে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করে। এক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়- বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে জাতিসংঘের মানবাধিকার ও দারিদ্র্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাগদালেনা সিপুলভেদা এবং সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্যাটরিনা আলবুরেক ডিসেম্বর ২০০৯-এ বাংলাদেশ সফর করেন। বাসস্থানের অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধির সফরেও বাংলাদেশ রাজি হয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘুদের অধিকার বিষয়ক, বিচারবহির্ভূত হত্যা বিষয়ক এবং বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি বারংবার সফরসূচি চূড়ান্ত করার অনুরোধ জানালেও বাংলাদেশ তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে না।

বৈষম্যমূলক আইন সংস্কার
নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় আইনি সংস্কার বিষয়ে দেয়া সুপারিশগুলো বাংলাদেশ গ্রহণ করলেও এ বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। আইন কমিশন বৈষম্যমূলক আইন চিহ্নিত করে সংশোধনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকারের অনুমোদনের জন্য তারা সে কর্মপরিকল্পনা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তা অনুমোদনের অপেক্ষায় মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ে অঙ্গীকার করা হয় যে- আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে সরকার বরদাশত করবে না। কিন্তু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। ‘ক্রসফায়ার নেই’ কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ‘আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর ফলে মৃত্যু ঘটছে’- এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন দেয়া হচ্ছে। আসক-এর সঙ্কলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৯ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ২২৯ জন, আর ২০১০-এর জুন মাস পর্যন্ত এ সংখ্যা ৬১।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশ। বাস্তবতা হচ্ছে- বিচার বিভাগের কাজকে মসৃণভাবে চালানোর জন্য সরকার ইতোমধ্যেই নিম্ন আদালতের জন্য বেশ কিছু বিচারক নিয়োগ দিয়েছে। তবে হাইকের্টে ২০ জন বিচারককে নিয়োগ দেয়া নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। তাছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের কোনো নীতিমালা না থাকায় দলীয় নিয়োগের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। সরকার সমপ্রতি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘অপরাধ আমলে নেয়ার’ ক্ষমতা প্রদান করা হবে। এতে করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা বিচারিক ক্ষমতা পাবেন যা বিচার বিভাগের পৃথককরণ নীতির বিরোধী। তাছাড়া বর্তমান সরকার বিচার ব্যবস্থার প্রচলিত নিয়মনীতি অনুসরণ না করে বেশ কিছু দুর্নীতির মামলা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে।

মানবাধিকার কর্মীদের মানবাধিকার রক্ষা
মানবাধিকার কর্মীদের মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করা হলেও বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সাংবাদিকরা সরকারদলীয় প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাদের হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মাসুম নামের জনৈক সাংবাদিক (দৈনিক নিউএজ পত্রিকা) র‌্যাবের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০১০ পর্যন্ত ১১৩ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছেন (আসক-এর তথ্য সংরক্ষণ হিসাব অনুযায়ী)। তাছাড়া চ্যানেল ওয়ান ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ, সাময়িকভাবে ফেসবুক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়। ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে ২৩ মার্চ ২০০৯ তারিখে খাগড়াছড়ির এমপি যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে চেয়ারম্যান করে প্রত্যাগত পাহাড়ি শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা হয়, ১৯ আগস্ট ২০০৯ সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি পুনর্গঠন করা হয়, ১৯ জুলাই ২০০৯ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন পুনর্গঠন করা হয় এবং ২৯ জুলাই ২০০৯ এক ব্রিগেড সৈন্যসহ ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি নেই। ঐ অঞ্চলে সহিংসতাও বন্ধ হয়নি। সহিংসতা প্রতিরোধে সেনাবাহিনী ও সরকারের ভূমিকা নিয়েও নানা সময় প্রশ্ন উঠেছে।

জাতিসংঘ সনদের আওতায় প্রতিবেদন প্রদান
বিভিন্ন সনদের আওতায় প্রতিবেদন প্রদানে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, একমাত্র শিশু অধিকার সনদের আওতায় বাংলাদেশ নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। নির্যাতনবিরোধী সনদ বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে স্বাক্ষর করলেও এখনো এর আওতায় কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। বর্ণবৈষম্যবিরোধী সনদের আওতায় সর্বশেষ ২০০০ সালে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী সংক্রান্ত সনদের আওতায় ফেব্রুয়ারি ২০১০-এ প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিলের কথা থাকলেও এখনো তা দেয়া হয়নি। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সনদের আওতায় কখনোই কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়নি।

নাগরিক সমাজের সঙ্গে ইউপিআর ফলোআপ
নাগরিক সমাজের সঙ্গে ইউপিআর বিষয়ে ফলোআপ সংলাপ অনুষ্ঠানে অঙ্গীকার করলেও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুশীল সমাজের সঙ্গে এ পর্যন্ত কোনো সংলাপই অনুষ্ঠিত হয়নি।

পরিশেষ
পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস উপস্থাপিত প্রতিবেদনকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার সর্বক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ধারার সূচনা করতে সচেষ্ট। তবে যে গতিতে সেটা হবে বলে মানুষ প্রত্যাশা করছে, অনেকক্ষেত্রে হয়তো তা হচ্ছে না। তিনি নাগরিক সমাজের ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন, পারস্পরিক সংলাপের মধ্য দিয়ে সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে আমাদের যে ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্য সেখানে পৌঁছতে হবে।

ইউপিআর ফোরাম প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল। তিনি বলেন-এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা চাই সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থাকুক। কিন্তু যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে তখন নাগরিক হিসেবে আমরাও দায়বদ্ধ বোধ করি এবং বিব্রত হই। তিনি বলেন- মানুষের মৃদু প্রতিবাদ যখন আমলে নেয়া হয় না তখনই মানুষ সোচ্চার প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তিনিও বিভিন্ন বিষয়ে অব্যাহত সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন। প্রতিনিধি দলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- কর্মজীবী নারীর সভাপতি শিরীন আকতার, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এবং নারীপক্ষ, বিলস্‌, মহিলা পরিষদ ও আসক-এর অন্যান্য প্রতিনিধি।