সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   প্রতিবেদন
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   ফলো-আপ
   নারী
   আন্তর্জাতিক
   পাঠক-পাতা
   সংগঠনবার্তা

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

আন্তর্জাতি

ভারতে নিষিদ্ধ হলো নারকো এনালাইসিস, পলিগ্রাফ টেস্ট ও ব্রেইন ম্যাপিং
শ্রাবন্তী শেগুফ

মানুষের মনের বৃত্তান্ত জানার বিষয়টি আজ আর শুধু চিন্তা-ভাবনা কিংবা পরিকল্পনার মধ্যেই আবদ্ধ নেই, বিজ্ঞানীরা মানুষের মনের গোপন তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য আবিষ্কার করেছেন বেশ কিছু প্রণালি। এগুলোর রয়েছে নানা নাম এবং নানা পন্থা। ব্রেইন ম্যাপিং, পলিগ্রাফ টেস্টিং এবং নারকো এনালাইসিসের নাম তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একজন সন্দেহভাজন কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটনে বেশ অনেকদিন ধরেই ব্যবহার হয়ে আসছে এসব প্রণালি। ভারতে এই ধরনের টেস্টগুলো সচরাচর ব্যাঙ্গালোর এবং আহমেদাবাদের ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে সম্পাদিত হয়ে থাকে। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে নারকো এনালাইসিস টেস্টে প্রাপ্ত তথ্যগুলোর সাথে পলিগ্রাফ এবং ব্রেইন ম্যাপিং এই দুটি পরীক্ষাতে প্রাপ্ত তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। সমপ্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দেয়া এক রায়ে একজন মানুষের মনে অবাধ বিচরণের এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

নারকো এনালাইসিস, ব্রেইন ম্যাপিং এবং পলিগ্রাফ- এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রণালিগুলো যদিও একই উদ্দেশ্যে অর্থাৎ তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অপরাধের তথ্য উদ্ঘাটনে সহায়তা প্রদান করার উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এ ধরনের পরীক্ষার পদ্ধতিগুলো একটি অন্যটির থেকে আলাদা। নারকো এনালাইসিসের ক্ষেত্রে স্নায়ু শিথিলকারী সোডিয়াম পেন্টোথাল অথবা স্কোপোলামাইন ধরনের ওষুধ ব্যবহৃত হয়, যেগুলো ‘ট্রুথ সিরাম’ নামে পরিচিত। অভিযুক্ত অথবা সন্দেহভাজন ব্যক্তির শিরায় ট্রুথ সিরাম প্রবেশ করিয়ে তাকে একের পর এক প্রশ্ন করা হতে থাকে। ওষুধের প্রভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিটি একটি ঘোরের মধ্যে চলে যায় এবং সেই অবস্থায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকে। এগুলোকে তার অবচেতন মনের গোপন কথা বলে ধরে নিয়ে উত্তরগুলোকে সত্য বলে ধারণা করা হয়। নারকো এনালাইসিসের মতোই পলিগ্রাফ টেস্ট আরেকটি পন্থা, যেটি অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সত্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। এটি ‘লাই ডিটেকশন টেকনিক’ বলেও পরিচিত। এই প্রণালিতে স্বাভাবিক অবস্থায় একজন ব্যক্তির রক্তচাপ, পালস্‌, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, ত্বকের সংবেদনশীলতা ইত্যাদি পরিমাপ করা হয়। এরপর তাকে একের পর এক অপরাধের সাথে সম্পর্কিত প্রশ্ন করার পরে উত্তর দেয়ার সময় অভিযুক্তের যে শারীরিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় সেটিকেই বলা হয় পলিগ্রাফ টেস্ট। এক্ষেত্রে ধরে নেয়া হয় যে, প্রতারণামূলক উত্তরগুলো প্রদান করার সময় শারীরিক প্রতিক্রিয়ার হার স্বাভাবিক অবস্থার থেকে ভিন্ন হয়। তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য এরকমই আরেকটি পন্থার নাম হলো ব্রেইন ম্যাপিং। এই পদ্ধতিতে অভিযুক্তের মাথার সাথে একটি সেন্সর যুক্ত করা হয় এবং তার সামনে অপরাধ সংশ্লিষ্ট নানা প্রকার শব্দ ও ছবির সাথে সাথে সাধারণ কিছু শব্দ ও ছবি প্রদর্শন করা হয়। এ সময় সেন্সরের সাহায্যে ব্রেইনের নানা ধরনের তরঙ্গ পরিমাপ করা হতে থাকে। বিশেষ বিশেষ ছবি ও শব্দের ক্ষেত্রে যে তারঙ্গিক তারতম্য পরিলক্ষিত হয় সেটিই ব্রেইন ম্যাপিং। সংক্ষেপে এই হলো নারকো এনালাইসিস, পলিগ্রাফ টেস্ট ও ব্রেইন ম্যাপিং। ৫ মে, ২০১০ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দেয়া এক রায়ে অসাংবিধানিক এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। প্রধান বিচারপতি কে. জি. বালাকৃষ্ণা, বিচারপতি আর. ভি. রাভিন্দ্র এবং বিচারপতি জে. এম. পাঞ্চাল সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চের দেয়া রায়ে বলা হয়- জোরপূর্বক এক ব্যক্তির ওপর এ ধরনের পরীক্ষা চালানো একজন মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপরে হস্তক্ষেপের শামিল। উক্ত রায়ে আরও বলা হয়, এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভারতের সংবিধানের-২০(৩) অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ‘নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করতে জোর প্রদান করা যাবে না’- এ নীতির বিপক্ষে যায়। সুতরাং এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পূর্ণরূপে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করা হয়। রায়ে আরও বলা হয় যে, এ ধরনের পরীক্ষার জন্য অভিযুক্তের পূর্বসম্মতি প্রয়োজন এবং পূর্বসম্মতি পাওয়া গেলেও প্রাপ্ত রিপোর্টকে আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণরূপে উপস্থাপন করা যাবে না। আর এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে যদি হয়ই তবে এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দেয়া নীতিমালা অনুসরণ করে চলতে হবে। উল্লেখ্য, এ প্রসঙ্গে ভারতের ল’ কমিশনের দেয়া এক রিপোর্টে তদন্তকারী সংস্থা কর্তৃক নারকো এনালাইসিস, ব্রেইন ম্যাপিং এবং পলিগ্রাফ টেস্টকে মানবাধিকারবিরোধী উল্লেখ করে অতি সত্বর এটি বন্ধ করার কথা বলা হয়।

অভিযুক্ত অথবা সন্দেহভাজন ব্যক্তির থেকে সত্য উদ্ঘাটনে ব্যবহৃত নারকো এনালাইসিস, পলিগ্রাফ টেস্ট এবং ব্রেইন ম্যাপিং প্রণালিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে পূর্বের করা একাধিক পিটিশনের প্রেক্ষিতে সমপ্রতি সুপ্রিম কোর্টের তরফ থেকে এই রায় প্রদান করা হয়। পিটিশনারদের মধ্যে- গুজরাটে একটি সন্ত্রাসী দলের ‘গডমাদার বলে পরিচিত- স্যাঙ্কটোবেন জাদেযা, ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় অভিযুক্ত তামিল চিত্রপ্রযোজক ভেঙ্কাটেশ্বর রাও এবং আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন অরুণ গাওয়ালির নাম উল্লেখ্য। ভারতের বেশ কিছু আলোড়ন সৃষ্টিকারী মামলায় সত্য উদ্ঘাটন করতে নারকো এনালাইসিস যাদের ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন- ১৯৯৩ সালের মুম্বাই সিরিয়াল বোমা বিস্ফোরণ মামলার প্রধান আসামি আবু সালেম, জাল স্ট্যাম্প এবং স্ট্যাম্প পেপার মুদ্রণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে ভারতের শীর্ষ অপরাধী আবদুল করিম তেলগী, সেপ্টেম্বর ২০০৮-এর মালেগাও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার সাথে যুক্ত সাধভী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, নয়াদিল্লির ‘নয়ডা’ এলাকায় শিশু ও নারীদের ক্রমিক খুনের দায় অভিযুক্ত মনিন্দর সিং পান্ধারা এবং সুরেন্দর কোহলি। এই রায়টি নিয়ে ভারতে বর্তমানে দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়েছে- একপক্ষ বলছে, রিমান্ডে নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর নারকীয় অত্যাচার চালিয়ে সত্য কথা উদ্ঘাটনের অপপ্রচেষ্টা থেকে বিজ্ঞানসম্মত এসব প্রণালি ব্যবহার করা ঢের ভালো। অপরপক্ষের মতে, এই রায়ের ফলে একজন মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুনিশ্চিত হলো। কেননা মানুষের মস্তিষ্ক-মন-চিন্তা-চেতনা এক বিচিত্র জিনিস; একজনের ওপর একটি পরীক্ষা চালিয়ে সফল হলেই যে অন্যজনের ওপর সেই পরীক্ষায় সফলও হওয়া যাবে, এমনটি কোনোভাবেই হলফ করে বলা যাবে না। সুতরাং বর্তমানে ভারতে যথেচ্ছভাবে অভিযুক্ত অথবা সন্দেহভাজন ব্যক্তির ওপর এ ধরনের পরীক্ষা চালিয়ে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা কর্তৃক তথ্য উদ্ঘাটনের এক অনিশ্চিত পদ্ধতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকে তারা খুব ভালো একটি পদক্ষেপ বলে মনে করছে। এ ধরনের প্রণালিকে সমর্থন জানানোর অর্থ হচ্ছে, একটি নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার পথে বাধা সৃষ্টি করা। জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে একজন মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় বলেই তাদের বিশ্বাস।

 

 

পাকিস্তানে অষ্টাদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস ও
সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ

মাবরুক মোহাম্মদ

 

গত ৮ এপ্রিল ২০১০ পাকিস্তানের সংসদে পাস হলো সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী। এতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব করে সংসদকে অধিক শক্তিশালী করা হয়েছে। বিগত দিনগুলোতে সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রপতির যে ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিলেন তা এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়। এর মাধ্যমে মোশাররফ কর্তৃক পাসকৃত ১৭তম সংশোধনী ও অপর সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হকের বেশ কিছু সংশোধনীও বাতিল হয়ে গেছে।

সংশোধনী বিল পাসের পর প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানী সাংবাদিকদের কাছে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, আজ আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেমে ফেরত যাওয়ার যে অভিপ্রায় আমাদের আছে, তা অর্জনে এটি প্রথম পদক্ষেপ। আমরা জনগণকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতার সংসদীয় গণতন্ত্র উপহার দিতে চাই। ভবিষ্যতে আর কোনো রাজনীতিবিদ সামরিক একনায়ককে সহায়তা করবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দেশে সাংবিধানিক শাসন অব্যাহত রাখতে সবাইকে তিনি সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

যা যা সংশোধন হলো
১. সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ কর্তৃক পাসকৃত ১৭তম সংশোধনী বাতিল করা হয়।
২. অনুচ্ছেদ ৬(১) প্রতিস্থাপন করে সংবিধান স্থগিত, বাতিল বা স্থগিত ও বাতিলের প্রচেষ্টাকে রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই কাজে প্ররোচনা বা সহায়তাকারীও একই অপরাধে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে অনুচ্ছেদ ৬(২এ) সংযোজন করা হয়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বৈধতা দানের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে।
৩. অনুচ্ছেদ ১৭-এর সংগঠনের অধিকার প্রতিস্থাপন করা হয়। নতুন অনুচ্ছেদে বলা হয়, যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধসাপেক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তির সংগঠন করার অধিকার থাকবে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণকারী যে কোনো ব্যক্তি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারবে। আইন অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের তহবিলের উৎস জানাতে বাধ্য থাকবে।
৪. নতুন অনুচ্ছেদ ১৯-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, আইন অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আরোপসাপেক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তির জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার অধিকার থাকবে।
৫. নতুন অনুচ্ছেদ ২৫ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, পাঁচ থেকে ষোলো বছর বয়সী সব শিশুকে সরকার বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করবে।
৬. অনুচ্ছেদ ৪৮ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি এখন থেকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।
৭. অনুচ্ছেদ ৫১ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিস্থাপিত অনুচ্ছেদকে ২১ আগস্ট ২০০২ তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদান করা হয়েছে। এতে জাতীয় সংসদ, সংসদের আসন, সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা, সংসদীয় আসন পুনর্নির্ধারণসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংস্কার করা হয়।
৮. অনুচ্ছেদ ৯১ প্রতিস্থাপিত করে মন্ত্রিসভা গঠন, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও অপসারণ, মন্ত্রিসভার কাজ ও জবাবদিহিতাসহ ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এছাড়া হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ও অপসারণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংসদীয় কমিটি গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতা, নিয়োগ ও অপসারণ প্রক্রিয়ায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে।
সর্বশেষ সংশোধনী বিলের মাধ্যমে উচ্চতর আদালতে বিচারপতি নিয়োগে জুডিশিয়াল কমিশন গঠনকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। এতে বলা হয়, উচ্চতর আদালতের বিচারপতি নিয়োগে সংসদের সংশ্লিষ্টতা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য হুমকি। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ফুল কোর্টে ২৪ মে মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৭ জুন ২০১০ পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়।

 

পাকিস্তানে আহমদিয়া হত্যাকাণ্ড

জাইর হাসান

 

সমপ্রতি আমরা যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, আমি আশা করি, এ লজ্জার সাথে আমরা যেন নিজেদের কখনো খাপ খাইয়ে না নেই।

যখন আমাদের মানুষগুলো সমস্ত রকমের বাজে কাজের মূল হিসেবে ফেসবুককে তীব্রভাবে দোষারোপ করছিল, সঠিকভাবে প্রতিবাদ করেছিল আন্তর্জাতিক আইন এবং মানুষের পবিত্র জীবনের প্রতি ইসরায়েলিদের শিষ্টাচার-বর্জিত দৃষ্টিভঙ্গির, তখনই ১০০ জনেরও বেশি পাকিস্তানিকে নৃশংসভাবে নিজেদের মাটিতে হত্যা করা হয়েছে। কোনো ফিসফিস শব্দও নেই।

আমরা জনগণ খুব দ্রুত প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমে যাই, যা হয়তো অচিরেই আমাদের জাতীয় ক্রীড়ায় পরিণত হবে। তাহলে কোথায় গেল সেই বন্য আগুনের মতো দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা বিক্ষোভ? পাকিস্তানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান? তালেবান নেতাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করা?

এবার এরকম কিছুই হয়নি, কারণ এবারের বলি আহমদিয়ারা। কেবল আহমদিয়া হওয়ার জন্যই যখন এতজন পাকিস্তানি নাগরিক মারা গেল এবং মারা যাচ্ছিলো, যখন আমাদের রক্ষা করার কাজে রাষ্ট্রের অক্ষমতা নগ্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছিলো, তখন যেখানে সব সংবেদনশীল মানুষের কাছ থেকে সান্ত্বনা ও সমবেদনার বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা, তখন আমাদের তরফ থেকে সেখানে ছিল কিছু বিক্ষিপ্ত, ভাসা-ভাসা, ঠাণ্ডা এবং সতর্কতামূলক শোকবাক্য।

পাকিস্তানিরা এবং মুসলিমরা যে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী নয়, তা বিদেশিদের বোঝানো অন্যতম একটি কঠিন কাজ। আমরা একটা ছোট্ট উচ্ছৃঙ্খল দলের পাগলামির শিকার। কিন্তু নীরব থেকে এই হত্যাযজ্ঞে আমরাও শরিক হয়েছি। লাহোর হাইকোর্টের বাইরে একটা ব্যানার ঝোলানো হয়েছে, যা কুৎসিতভাবে ঘোষণা করছে- আহমদিয়ারা ইসলামের শত্রু। একটি পাকিস্তানি টক শোর হোস্ট তো কোনো রাখঢাক না করেই বলে দিলো যে, আহমদিয়াদের বেঁচে থাকার হক নেই। তাদের নির্মমভাবে শাস্তি দেয়া হয়েছে তাদের ঘৃণ্য কাজ এবং পরিণামহীন উক্তির জন্য। সমপ্রতি বড় কিছু ধর্মীয় দল এই আক্রমণকে আহমদিয়া আইন সম্পর্কিত বিতর্ককে উস্কে দেয়ার ষড়যন্ত্র বলে ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানের বড় বড় রাজনৈতিক দলের বর্ষীয়ান নেতারাও আকারে-ইঙ্গিতে আহমদিয়াদের অভিযুক্ত করে বলছে, তারা কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য নিজেদের ১০০ জনকে মেরেছে। এই ঘটনাকে অত্যাচার আর ঘৃণার নিখুঁত উদাহরণ ছাড়া আর কোনোভাবেই বিচার করা যায় না। আমরা পাকিস্তানিরা কোনোভাবেই দাবি করতে পারি না যে, বাকস্বাধীনতাকে অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমরা মূল্য দেই। আমরা যদি তা করি, আমাদের ভণ্ডামির চোটে আমাদেরই শ্বাসরোধ হয়ে যাবে। মানব ইতিহাসে কখন একটি রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে লাভবান হতে পেরেছে?

যখন কোনো রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকের মধ্যকার চুক্তি ভেঙে পড়ে, তা ভেঙে পড়ে সব নাগরিকের ২৮ মে ২০১০, প্রায় ১০০ পাকিস্তানি নাগরিক, মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং ঈশ্বরের নিন্দাকারী হিসেবে বলি হয়েছে। এটা ভয়ঙ্কর তবে চমকে যাওয়ার মতো নয়। কিন্তু যেটা চমকানোর মতো ছিল তা হলো নীরবতা- হৃদয় তোলপাড় করা নৈঃশব্দ।জন্যই। এটা শুধু আহমদিয়াদের দিয়েই শেষ হবে না। আজকের পাকিস্তানের জন্য মার্টিন নিয়েলারের (Martin Niemller) সেই উক্তিই সত্য যে- “তারা প্রথমে কমিউনিস্টদের জন্য এসেছিল এবং আমি কিছুই বলিনি কারণ আমি কমিউনিস্ট ছিলাম না। এরপর তারা ট্রেড ইউনিয়ানিস্টদের জন্য আসে এবং তখনও আমি কিছু বলিনি কারণ আমি ট্রেড ইউনিয়ানিস্ট ছিলাম না। ... এরপর তারা আমার জন্য আসল এবং সেই সময়ে আর কেউ বাকি ছিল না কথা বলার জন্য।”

আহমদিয়াদের জন্য কথা বলা কোনো দয়া নয়। এটা মানবিকতার চেয়েও বেশি কিছু। এটির মূলনীতিই হলো আত্মরক্ষা। যদি আমরা আহমদিয়াদের এই শাস্তি মেনে নিই, যা তারা ভোগ করছে তাদের করা কোনো কাজের জন্য নয় বরং আহমদিয়া হওয়ার জন্য এবং তাদের কিছু বিশ্বাসের জন্য; তাহলে আমরা নিজেরাই নিজেদের এনে দাঁড় করিয়ে দেবো একটি রক্তাক্ত পিচ্ছিল ঢালের ওপর, যা আমাদের একটা ভয়ঙ্কর স্থানে নিয়ে যাবে, যেখানে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ নয়, কারণ শেষ পর্যন্ত সেখানে কারও কোনো অধিকার নেই। তুমি কি বলতে পারো এরপর তুমি, তোমার বন্ধু, তোমার পরিবার, তোমার প্রিয় মানুষ আক্রান্ত হবে না? তুমি কি বলতে পারো, তোমাকে তোমার নিকটজনদের কবর দিতে হবে না, যারা তোমার প্রতিবেশীদের উদাসীনতা, সন্দেহ এবং এমনকি ঘৃণার শিকার? রাতে দরজা লাগিয়ে তুমি কি নিশ্চিত যে কোনো প্রতিরোধ তৈরি করতে পারবে- একটা রাস্তা, একটা শহর, একটা সম্পূর্ণ দেশের বিরুদ্ধে, যারা তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে? কতটা নিশ্চিত তুমি?

আমি এই লজ্জাজনক ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রথম ব্যক্তি নই। আমি প্রার্থনা করি, আমি যেন শেষ ব্যক্তি না হই। এই হতবিহ্বল পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কমের মধ্যে এ কথাগুলো বলতে পারা উচিত যে- তারা মানুষও এবং আমাদের স্বদেশি এবং তাদের হারিয়ে আমাদের অন্তর ভেঙে যাচ্ছে। যদি তারা সবুজের অংশ নাও হয়, তারা নিশ্চিতভাবেই সাদা অংশে আছে। তারা জিন্নাহর পাকিস্তানের অংশ এবং যারা ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করে, তাদের চেয়ে হাজার গুণে আহমদিয়ারা পাকিস্তানের অংশ। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)
সূত্র : ইন্টারনেট

- জাইর হাসান- লাহোরভিত্তিক ফ্রিল্যান্স লেখক

অনুবাদ: সোফিয়া হাসিন ও রওশন আক্তার ঊর্মি