সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   প্রতিবেদন
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   ফলো-আপ
   নারী
   আন্তর্জাতিক
   পাঠক-পাতা
   সংগঠনবার্তা

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

পাঠক-পাতা

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বনাম যুদ্ধাপর

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সমগ্র জাতি আজ সোচ্চার যেন স্বাধীনতাবিরোধী সেই পুরনো শকুনরা বিচারের মাধ্যমে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে যখনই সরকার এদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে এবং সমগ্র জাতি অধীর আগ্রহে প্রস্তুত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য, ঠিক তখনই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ এই বিষয়টি নিয়ে স্বাধীনতার অপশক্তি এবং কিছু সুবিধাভোগী মহল জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তির বেড়াজাল সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধ হচ্ছে আন্তর্জাতিক আইন ও অনেক দেশের সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় আইনের অধীন পৃথিবীর জঘন্যতম অপরাধ।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট-১৯৭৩-এর জঘন্যতম শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এই ধারণাটির প্রথম সূত্রপাত ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে নাৎসি বাহিনী সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, নৃশংসতা, নারকীয় আচরণের ব্যাপকতার ফলেই সর্বপ্রথম ‘ন্যুরেমবাগ ট্রাইব্যুনালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- “হত্যা, নিশ্চিহ্নকরণ, দাসকরণ, উৎখাতকরণ এবং এ ধরনের অমানবিক কাজ যা বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে।”

১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও তার এদেশীয় দোসররা (দালাল, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্‌) যে অত্যাচার, নির্যাতন, লুট, ধর্ষণ, গণহত্যা, নিধন প্রভৃৃতি ধরনের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ছিল তা শুধু গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের মানদণ্ডে বিচার করা ঠিক হবে না। যেহেতু এটি ছিল ঘাতকদের মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ।

১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন’-এর ধারা ৩(২)-এ আট শ্রেণীর অপরাধের কথা বলা হয়েছে। ধারায় ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যে আট শ্রেণীর অপরাধের বিচারের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ৩(২) ধারায় যে আট শ্রেণীর অপরাধের কথা বলা হয়েছে সংক্ষেপে তা বলা হলো-
ক. মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ: যেমন- হত্যা, নিশ্চিহ্নকরণ, দাসত্বকরণ, বন্দি, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, ধর্ষণ অথবা অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড যা যে কোনো বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো হয়।
খ. শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ: যেমন- যুদ্ধের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি অথবা আগ্রাসন অথবা যে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে যুদ্ধ ঘোষণা।
গ. গণহত্যা: গণহত্যা বলতে বোঝায় কোনো নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, জাতি, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধ্বংস বা বিনষ্ট করা।
ঘ. যুদ্ধাপরাধ: সাধারণত যুদ্ধাপরাধ বলতে বোঝায় যুদ্ধের আইন-কানুন বা প্রচলিত প্রথা লঙ্ঘন করে কোনো অপরাধ করা।
ঙ. ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করে কোনো অপরাধ করা।
চ. আন্তর্জাতিক আইনের অধীন যে কোনো অপরাধ।
ছ. এরূপ কোনো অপরাধ করতে প্ররোচিত বা উস্কানি দেয়া অথবা ষড়যন্ত্র করা বা চেষ্টা করা।
জ. এরূপ কোনো অপরাধের অংশীদারিত্ব বা সহযোগী হওয়া অথবা এরূপ কোনো অপরাধ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সংবিধির ২০০২-এর ৫ ধারায় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এতে বলা হয়- হত্যা, নিশ্চিহ্নকরণ, উৎখাতকরণ, দাসকরণ এবং এ ধরনের অমানবিক কাজ যা ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর পরিচালিত হয়- তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যুদ্ধাপরাধ থেকে ভিন্নতর যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয় যুদ্ধকালীন সময় কিন্তু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয় যুদ্ধকালীন ও শান্তিকালীন উভয় অবস্থাতেই। পাকিস্তানি সহযোগী এদেশীয় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস শুধু যুদ্ধাপরাধ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ করেছিল। তাই সরকার শুধু যুদ্ধাপরাধের বিচার না করে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার করার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে যথোপযুক্ত কাজ করেছে।

এই বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার জন্য সরকার ২০০৯ সালে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩’-এর কিছু ধারার সংশোধন করে অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের সুযোগ দেয়া হয়। এতে আমাদের আইনটি ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল, টোকিও ট্রাইব্যুনাল বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের বিচারের আইনের চেয়েও সময়োপযোগী ও স্বচ্ছ হয়েছে।
কিন্তু অতি সমপ্রতি কিছু রাজনৈতিক দল ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জনমনে বিভ্রান্তির বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে। তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে মূল বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তে লিপ্ত আছে। তাই সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি জনগণের কাছে সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীর বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচার করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। এদের বিচারের মাধ্যমে আমরা জাতি হিসেবে কলঙ্কমুক্ত হবো। তাই এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তি বা অন্য কোনো সুবিধাভোগী মহল জনমনে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার স্পর্ধা যাতে দেখাতে না পারে সেদিকে সকল জনগণ এবং সরকারের সদাজাগ্রত অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

আহসান হাবিব
লেকচারার, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ




যৌনপীড়ন যখন পরিবারের অভ্যন্তরে


তিতলী নবম শ্রেণীর ছাত্রী। মাস ছয়েক হলো ওর বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। দুলাভাই একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। প্রথমদিকে দুলাভাইকে তিতলীর ভালোই লেগেছে, হাসিখুশি, গপ্পোবাজ, আমুদে মানুষ। দুলাভাই এলেই নানারকম গল্প হয় তিতলীর সাথে। গল্পের ছলে দুলাভাই প্রায়ই তিতলীর হাত, কোমর জড়িয়ে ধরে। তিতলীর অস্বস্তি লাগলেও কিছু বলতো না। কিন্তু যতোবারই দুলাভাই আসে কোনো না কোনো ছলে তিতলীকে একা পেলেই জড়িয়ে ধরার চেষ্টা চালায়। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, দুলাভাই আসার কথা শুনলেই তিতলী এখন অজানা এক আশঙ্কায় ভীত, সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে।

তিতলীর মতো পরিবারের সদস্যদের দ্বারা এই ধরনের যৌনপীড়ন বা উত্ত্যক্ততার শিকার বহু মেয়েকেই হতে হয়। চাচা, মামা, খালু, দুলাভাই, শিক্ষক, কাজিন প্রমুখ ছাড়াও পরিবারে অনুপ্রবেশকারী যে কারও মাধ্যমে এই যৌনপীড়ন হতে পারে। অফিস, পার্ক, রাস্তা, বিচ, বাস অর্থাৎ ঘরের বাইরে সংঘটিত যৌনপীড়নগুলো যতটা সহজে অন্যের সাথে আলোচনা করা যায়, এসব ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় ভিকটিম লজ্জায়, অস্বস্তিতে এবং অনেক সময় সামাজিকতার কারণে কাউকে কিছু বলতে পারে না। ঘরের বাইরে থেকে ঘরের ভেতরের যৌনপীড়ন ভিকটিমের ওপর অনেক জটিল এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

কেসস্টাডি-১
রুহি (ছদ্মনাম) ষষ্ঠ শ্রেণীতে থাকতে কোরআন তেলাওয়াত শেখানোর জন্য হুজুর রেখে দেয়া হয়। হুজুর মধ্যবয়স্ক মানুষ। রুহির তেলাওয়াতের সময় কোনো ভুল হলে হুজুর ওকে শাস্তি দেয়ার ছলে প্রায়ই ওর জামার গলার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিতো। হুজুর কেন এরকম করছে, শুধু ওর সাথেই কি করে নাকি সব মেয়ের ক্ষেত্রেই এটা হয়, এই প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজে না পেলেও হুজুরের প্রতি ভীষণ ঘৃণা, রাগ ওকে আচ্ছন্ন করে। কাউকে কিছু না বলে এভাবেই প্রায় দু’বছর ও হুজুরের কাছে পড়ে। বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করার পর রুহি টের পায় আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো সহজভাবে ও ছেলেদের সাথে মিশতে পারছে না। ছোটবেলার যেই কুৎসিত স্মৃতি ওকে প্রতিনিয়তই তাড়া করে। তাই বন্ধুরা যখন কোনো দুষ্টুমির ছলে গায়ে হাত দেয়, সাথে সাথে সেই হুজুরের কথা ওর মনে পড়ে যায়। ছেলে বন্ধুদের সাথে একা থাকলেই মনে হয় এই বুঝি ওরা কোনো না কোনোভাবে উত্ত্যক্ত করবে।

কেসস্টাডি-২
রিমি (ছদ্মনাম) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। রিমি বিবাহিত। ছোট থেকেই রিমি দেখেছে ওদের বাসায় সবসময় আত্মীয়স্বজনদের ভিড়। এরকমই দূরসম্পর্কের এক মামা ছিল ২৫-২৬ বছরের, যিনি রিমিদের বাসায় থাকতো। রিমি তখন দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। ওর বাবা-মা দু’জনেই চাকরি করেন। সেই মামা রিমিকে অনেক আদর করতো। রিমিও মামাকে অনেক পছন্দ করতো। কিন্তু একদিন মামা গল্প করতে করতে হঠাৎ রিমির প্যান্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেয়। ছোট্ট রিমি কিছু না বুঝলেও বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মামা ওকে অনেক বুঝিয়ে আদর করে, আইসক্রিম খাওয়ার লোভ দেখিয়ে হাত ঢুকিয়ে দেয়। এরপর মামা ওকে বোঝায়, ও যদি মাকে কিছু না বলে সে রিমিকে অনেক চকোলেট দেবে। অবোধ রিমি কিছু না বুঝলেও এরপর থেকে সহজে মামার কাছে আসতে চাইতো না। কিন্তু মামা ঠিকই কোনো না কোনোভাবে রিমিকে বুঝিয়ে আদর দিয়ে তার উদ্দেশ্য হাসিল করতো। বড় হওয়ার পর যখন রিমি সব বুঝতে শেখে সেই মামার প্রতি, ছেলেদের প্রতি ভীষণ এক ঘৃণা ওর মনের মধ্যে তৈরি হয়। সব ছেলেকেই মনে হয় এরকম নোংরা মানসিকতাসম্পন্ন। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বিয়ে হলে রিমি প্রথম প্রথম ওর স্বামীর সাথে সহজ হতে পারে না। কিছুতেই মনে হয় না এই লোকটি ওর আপনজন। ওর স্বামীও বুঝতে পারে রিমির কোনো মানসিক সমস্যা আছে। রিমিকে সাইকিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে গেলে তিনি বের করেন ছোটবেলার সেই ভয়াবহ স্মৃতি রিমির ভেতরে মারাত্মকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

রুহি, রিমির মতো এই ধরনের ভুক্তভোগীর সংখ্যা আমাদের সমাজে অসংখ্য। শিশু অবস্থায় যৌনপীড়নের শিকার হওয়ায় তারা সেটা ঠিকমতো বুঝতে পারে না। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে সেই স্মৃতি তাদের মধ্যে নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঘরের বাইরের যৌনপীড়ন, শ্লীলতাহানি নিয়ে মানুষ যতটা সোচ্চার ঘরের ভেতরের যৌনপীড়ন নিয়ে ততটা নয়। শিশু অবস্থায় একটি মেয়ে যখন এই অভিজ্ঞতার শিকার হয় তখন সে ঘরের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক নিয়ে বড় হয়। পরবর্তীকালে বাইরের পৃথিবীতে সে নিজেকে অন্য দশজনের মতো করে খাপ খাওয়াতে পারে না। যৌনপীড়ন নিয়ে আজ সবাই সচেতন হয়ে উঠলেও ঘরের ভেতরের যে যৌনপীড়ন, সেটা অনেক বেশি ভয়াবহ। এটি বন্ধের জন্য প্রয়োজন পরিবারের মা-বাবার তাদের কন্যা-শিশুর প্রতি অধিক মনোযোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি, অপরাধীকে শনাক্তকরণের পর তার বিষয়ে আইনি সাহায্য নেয়া। তাহলে এই ধরনের যৌনপীড়ন করার আগে ব্যক্তি কিছুটা হলেও চিন্তা করবে।


রওশন আক্তার ঊর্মি
উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



প্রসঙ্গ: ইভটিজিং দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল

বখাটেদের উৎপাতে আরো একটি সম্ভাবনাময় জীবনের মৃত্যু ঘটল। আগৈলঝাড়ায় বখাটে যুবকদের উত্ত্যক্তের শিকার হয়ে রোববার রাতে আত্মহত্যা করেছে অষ্টম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী মিতালী মণ্ডল [দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫.৫.১০]। জানা যায়, খ্রিষ্টান সমপ্রদায়ের ছেলে সুশীল মিতালীর সাথে জোরপূর্বক আপত্তিকরভাবে ছবি তোলে এবং প্রতিনিয়ত প্রেমের প্রস্তাব দিতে থাকে। মিতালী রাজি না হওয়ায় তাকে হুমকি দেয়া হয়- ছবিটি দিয়ে এলাকায় পোস্টারিং করে দেয়া হবে। লজ্জায়, ঘৃণায়, নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে অপমানের হাত থেকে রেহাই দেয়ার জন্য বিষপানে আত্মহত্যা করে মিতালী। এরকম ছাত্রী হত্যার খবর প্রতিদিনই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে।

গত ৩ এপ্রিল বখাটেদের উপদ্রব সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় উম্মে কুলসুম ইলোরা। সেটা ঘটেছে খোদ রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার নন্দীপাড়ায়। এরকম আত্মহত্যার তালিকায় রয়েছে সিমি, রিমি, শাপলা, তৃষা, মাহিমা, স্বপ্না ও রুমানা। তাদের সাথে কিছুদিন আগে যোগ হলো ইলোরা, তারপর মিতালী। এভাবে আর কত? এরকমভাবে লাশের মিছিল কি বাড়তেই থাকবে? এরকম আত্মহননের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে- এ কোন সমাজে আমাদের বসবাস? যে সমাজে পুরুষ নারীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার জন্য প্ররোচিত করে! নারী যেন কোনো মানুষ নয়, শুধু পুরুষের ভোগের সামগ্রী। ধিক্কার এ সমাজকে।

ইলোরার মৃত্যুর ঘটনায় জানা যায়, রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী মডেল স্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল ইলোরা এবং স্কুলে যাওয়া-আসার পথে তাকে রেজাউল নামে এক স্থানীয় যুবক উত্ত্যক্ত করত, আজেবাজে কথা বলে অপহরণের হুমকি দিত। রেজাউলের পরিবারের কাছে বিচার চেয়ে কোনো ফল পায়নি ইলোরার পরিবার। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে বিচার দেয় ইলোরার পরিবার আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে রেজাউল। রাস্তায় ইলোরার হাত ধরে টানাটানি করে। এ অপমান সইতে না পেরে ইলোরা আত্মহত্যা করে। ইলোরা জীবদ্দশায় এ বখাটেদের শাস্তি দেখে যেতে পারেনি। তার পরিবার কি পাবে এর ন্যায্য বিচার? নাকি আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবে অপরাধী। বলবে ইলোরার সাথে প্রেম ছিল, সে পারিবারিক চাপে আত্মহত্যা করেছে ইত্যাদি, ইত্যাদি...। ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতাধারী একটি মহল।

আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে কেন?
একটি মেয়ে ষষ্ঠ কি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে, জীবনের সে কী বোঝে? সে কেন আত্মহত্যা করবে? পরিবার, সমাজ যখন মেয়ের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, মেয়েটি আত্মগ্লানিতে ভুগে যে আমার জন্য আমার পরিবার অপমানিত হচ্ছে, তখন সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। সমপ্রতি ‘শিশু রক্ষায় আমরা’ ও ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ আয়োজিত ‘জাতীয় শিক্ষানীতিতে নিরাপত্তা শিক্ষা সংযুক্তকরণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশে ৮১% নারী কোনো না কোনোভাবে উত্ত্যক্তের শিকার।

বখাটেদের উৎপাত থেকে রক্ষা পেতে বাসা বদল করে, পালিয়ে থেকেও রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। এরকম ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর গুলশানে। তাছাড়া শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার সামন্তসার ইউনিয়নে উত্ত্যক্তের শিকার মেয়েটিও পালিয়ে বেড়াচ্ছে [খবর দৈনিক প্রথম আলো, ০৩.০৬.২০১০]।

সম্প্রতি মোবাইল ফোনের যথেচ্ছ ব্যবহার, যত্রতত্র মেয়েদের ছবি তোলা এবং সেগুলো দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছে বখাটেরা। এ ধরনের অভিযোগের স্তূপ জমেছে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে। ইভটিজিং তথা যৌন হয়রানির মাত্রা এখন এতটাই বেড়ে গেছে যে, দেখে মনে হয় মেয়েরা ঘরে-বাইরে কোথাও আর নিরাপদ নন। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুই মেয়েদের জন্য নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মীর হাতে ছাত্রীর লাঞ্ছিত হওয়া, কয়েকদিন আগে বর্ষবরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারাই তাদের সহপাঠী ২০ জন ছাত্রী লাঞ্ছিত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুরো জাতি স্তম্ভিত। যেসব শিক্ষার্থী বিদ্যা অর্জন করে দেশের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হবেন, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তারাই কিনা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন! এই কি তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অর্জন? যে শিক্ষা পারে না নারীকে সম্মান দিতে। কোন মূল্য আছে তার?

প্রচলিত আইনের কার্যকারিতার অভাব
দেশের আইনে যৌন হয়রানির জন্য দণ্ডের বিধান থাকলেও সেসব আইনের কোনো প্রয়োগ নেই বললেই চলে। তার ওপর শাস্তিও তেমন কঠোর নয়। তাই সহজেই পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির ঘটনায় একটি যুগান্তরকারী রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগ ১৫ মে ২০০৯। তাতে বলা হয়েছে, শারীরিক ও মানসিক যে কোনো ধরনের নির্যাতন যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। ই-মেইল, মুঠোবার্তা (এসএমএস), পর্নোগ্রাফি, টেলিফোনে বিড়ম্বনা, যে কোনো ধরনের চিত্র, অশালীন উক্তিসহ কাউকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সুন্দরী বলাও যৌন হযরানির পর্যায়ে পড়ে। এছাড়াও রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের অশালীন উক্তি, কটূক্তি করা কিংবা কারও দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো ইত্যাদি যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য হবে।

উক্ত দিকনির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, পরবর্তী কোনো সুস্পষ্ট আইন না আসা পর্যন্ত এই নির্দেশনা বহাল থাকবে। কিন্তু তারপরও বন্ধ হচ্ছে না ইভটিজিং। অনেকে মনে করেন, সুস্পষ্ট আইন না থাকার কারণে এ সমস্যা হচ্ছে।


মুনমুন সাহা
চতুর্থ বর্ষ, আইন ও বিচার বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়