প্রতিবেদন
ঢাকাকে বাঁচাতে হলে
আইন মানা দরকার
এটিএম মোরশেদ আলম
সমপ্রতি ঢাকার নিমতলীতে ঘটে গেল এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। ৩ জুন ২০১০ রাতে নিমতলীর নবাবকাটারা এলাকার ৪৩/১ নম্বর বাড়িতে আগুন লেগে মারা যায় মোট ১২১ জন, এদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদন মতে, ভবনটির নিচতলায় বিয়ে উপলক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে রান্নার কাজ চলায় তা থেকে সৃষ্ট তাপে পাশের গুদামে সংরক্ষিত রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে আগুন লেগে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তা আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গুদামে যে রাসায়নিক দ্রব্য ছিল তার নাম এনএনডাই নাইট্রেসো পেন্টামিথিলিন (ডিএনপিটি)। এটি একটি অত্যন্ত দাহ্য এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ। বাতাসের সাথে মিশলে এতে আগুন লেগে যায় এবং অতিমাত্রায় দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, এই রাসায়নিক দ্রব্য শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে মিশলে মানুষ অচেতন হয়ে পড়ে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই রাসায়নিক দ্রব্যের সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও এক্ষেত্রে সেসব নিয়ম-কানুন মানা হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে ১৭ দফা সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম-কারখানা সরিয়ে নেয়া, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া, অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন-২০০৩ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা, রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে তদারকি প্রক্রিয়া জোরদার করা, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ মজুদকরণ বা বিপণন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা, বাড়িঘরে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক তারের গুণগত মান নিশ্চিত করা, ফায়ার সর্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগকে যুগোপযোগী করা, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। ঘটনার জন্য রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিক তিন ভাইকে দায়ী করে তদন্ত কমিটি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নিমতলীর ঘটনার কয়েকদিন আগে ১ জুন ২০১০ রাজধানীর বেগুনবাড়ীর একটি পাঁচতলা ভবন ধসে পাশের টিনসেড কয়েকটি বাড়ির ওপর পড়ে। এতে প্রাণ হারায় ২৫ জন। রাজউক তদন্ত করে বের করে যে, বাড়িটি ছিল অনুমোদনহীন। আশপাশের আরো কয়েকটি বাড়িরও অনুমোদন নেই বলে তারা জানায়। যে কোনো মুহূর্তে সেগুলোও ধসে পড়তে পারে। এই অবস্থায় রাজউক ১৪ জুন থেকে ঐ এলাকায় অনুমোদনহীন বাড়িগুলো ভাঙতে শুরু করে। বেগুনবাড়ী বা নিমতলী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পুরো বাংলাদেশ তো বটেই, খোদ ঢাকা শহরে এরকম ঘটনা ঘটছে বারংবার। ফায়ার সার্ভিসের হিসাব মতে, শুধু ৫ জুন ২০১০ পর্যন্ত এ বছর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে মোট ৮১৮টি। বসুন্ধরা সিটি এবং জাপান গার্ডেন সিটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে মাত্র কিছুদিন আগে। চট্টগ্রামের কেটিএস গার্মেন্টস, গাজীপুরের গরীব এন্ড গরীব সোয়েটার কারখানায় আগুন লাগার ঘটনাও আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। গাজীপুরের স্পেকট্রাম কারখানা ধসে মারা যাওয়া শ্রমিকদের স্বজনদের আহাজারি এখনো আমাদের কানে বাজে। প্রতিবারই দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে। ঘটনার পর কিছুদিন তারা তৎপরও থেকেছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পত্রপত্রিকাও সরব থেকেছে কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কোনো প্রকার উদ্যোগ চোখে পড়েনি। রাজউক সমপ্রতি প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে এবং এই তালিকা থেকে অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য রাজউকের প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যার মূলে না গিয়ে শুধু ভবন ভাঙায় যেন একমাত্র সমাধান মনে করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ড বা ভবনধস সবকিছুর মূলেই রয়েছে আইন না মেনে অপরিকল্পিকভাবে নগরায়ন এবং আইনের বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা। ভবন নির্মাণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ন সম্পর্কে আইনে কী আছে তা আলোচনা করার পূর্বে ঢাকাকে কেন মরণফাঁদ বলা হয় সে বিষয়ে সামপ্রতিক সময়ের কিছু তথ্য-উপাত্তের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন।
অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই ৯৭ ভাগ ভবনে
দমকল বাহিনীর হিসাব মতে, ২০০৫ সালে ঢাকা শহরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ৯৮৭টি। এই সংখ্যা প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৯ সালে হয় ১,৩৮৪। ঢাকার বহুতল ভবনগুলোতে আগুন লাগার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১০ সালের মে মাস পর্যন্ত সরকারের হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ (সিইউএস) যৌথভাবে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা যায়, শহরের ৯৭ ভাগ বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, ভবন নির্মাণের সময় বিল্ডিং কোড এবং ইমারত নির্মাণ আইন ঠিকমতো অনুসরণ করা হচ্ছে না। আইনে ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক, জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা, ফায়ার লিফট, ফায়ার অ্যালার্ম, ভবনের ভূগর্ভে ন্যূনতম দুই লাখ লিটার পানির আধার, দমকল বাহিনী সহজেই আগুন নেভাতে পারে সেরকম ব্যবস্থা রাখার কথা বলা থাকলেও জরিপে দেখা যায়, ভবন নির্মাণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো এসব শর্ত মানছে না।
ভবনধস
ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, নির্বিচারে রাজধানীর জলাশয়, ডোবা ও নিচু এলাকা ভরাট করা হয়েছে। ওইসব এলাকায় মাটির নিচে পিট জমে আছে। এই পিট শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়। আবার বৃষ্টির পানি গেলেই ফুলে ওঠে। এ কারণে রাজধানীর ৬৫ ভাগ এলাকার মাটিই বহুতল ভবনের অনুপযোগী। এসব জমিতে নির্মাণ করা বহুতল ভবন যে কোনো সময় হেলে পড়তে পারে। কোনো কোনো এলাকায় ভবন নিচে দেবে যেতে পারে। এসব এলাকার মাটির গুণগত মান বহুতল ভবনের জন্য কোনোভাবেই উপযুক্ত নয়।

গবেষণায় ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মাটি সংগ্রহ করে গুণগত মান পরীক্ষা করে। এতে দেখা যায়, রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ছাড়া বাকি সব এলাকার মাটিই নিম্নমানের। সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন মাটি রয়েছে কোতোয়ালি, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কমলাপুর, সেগুনবাগিচা, কাকরাইল, ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী, খিলক্ষেত, উত্তরখান, উত্তরার অংশবিশেষ, মিরপুর ১, মিরপুর ২, মিরপুর ৩, মিরপুর ৬ ও মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায়। এসব এলাকায় বড়জোর ছয়তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা যেতে পারে। তবে ৬০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত পাইলিং করা প্রয়োজন। অন্যথায় তিন থেকে সাতদিন টানা বৃষ্টিপাত হলে ভবনগুলো উপড়ে পড়তে বা দেবে যেতে পারে।
অন্যদিকে খুবই নিম্নমানের মাটি রয়েছে মেরাদিয়া, সাতারকুল, বাড্ডার অংশবিশেষ, মিরপুরের ১৪ নম্বর এলাকা, বোটানিক্যাল গার্ডেনের আশপাশের নিম্নাঞ্চল, কল্যাণপুর ও মোহাম্মদপুরের অংশবিশেষ, পল্লবীর নিম্নাঞ্চল, কালাপানি এলাকাসহ আরো কিছু এলাকায়। এসব এলাকায় কোনো ভবন নির্মাণই করা উচিত নয়। খুব বেশি প্রয়োজনে কাঠের বাড়ি নির্মাণ করা যেতে পারে। অথচ এসব এলাকায় নির্দ্বিধায় গড়ে উঠছে বহুতল ভবন এবং পত্রপত্রিকায় ভবনে ফাটল, ভবন হেলে পড়া ইত্যাদি সংবাদও প্রকাশিত হচ্ছে প্রায়ই।
ভূমিকম্প
বর্তমান ঢাকার সবচেয়ে মারাত্মক বিপদ হলো ভূমিকম্প। বেশ কিছুদিন থেকে ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও অনুভূত হচ্ছে প্রায়ই। খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ১৬ জুন ২০১০ সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বলেন যে, রাত্রিবেলায় রাজধানীতে সাড়ে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে তাৎক্ষণিক হতাহতের সংখ্যা হবে প্রায় এক লাখ। তবে দিনের বেলা ভূমিকম্প হলে এই সংখ্যা কিছুটা কম হবে। তিনি আরো বলেন, এই মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার দালানকোঠা সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে এবং প্রায় ৮৬ হাজার দালানকোঠা মধ্যম বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনে অবস্থিত ৩ লাখ ২৬ হাজার দালানকোঠার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য পাওয়া গেছে বলে তিনি সংসদকে জানান। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানী হবে একটি মৃত্যুপুরী।
নগর পরিকল্পনা
বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত যে, একটি মহানগরকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য তিনটি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। এক. কাঠামোগত পরিকল্পনা (স্ট্রাকচার প্ল্যান); দুই. নগরায়ন এলাকার পরিকল্পনা (আরবান এরিয়া প্ল্যান) এবং তিন. বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ)। যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ১৯৯৩-৯৫ সালে প্রণীত হয় ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিএমডিপি)। এতে কাঠামোগত ও নগরায়ন এলাকার পরিকল্পনা উভয়ই চূড়ান্ত করা হয়। এরপর এর ওপর ভিত্তি করে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ প্রণয়ন করে সে অনুযায়ী নগর উন্নয়ন কার্যক্রম গৃহীত হওয়ার কথা।
১৯৯৭ সালে সরকার ডিএমডিপি অনুমোদন করে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু ড্যাপ প্রণয়নের পদক্ষেপ তখনও নেয়া হয়নি। পরবর্তীকালে ২০০৪ সালে ঢাকা মহানগরকে চার ভাগে বিভক্ত করে চারটি আলাদা প্রতিষ্ঠানকে ড্যাপ প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা ২০০৭ সালে রাজউকের কাছে ড্যাপ দাখিল করে। ২০০৮ সালে সরকার ড্যাপ চূড়ান্ত করার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সুপারিশগুলোকে হুবহু গ্রহণ করে বর্তমান সরকার ২২ জুন ২০১০ ঢাকা মহানগরীর জন্য বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) গেজেট আকারে প্রকাশ করে। ঢাকাকে বাঁচানোর জন্য বলার মতো এটাই সাম্প্রতিক সময়ের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ, যদিও ড্যাপ-এর বিরোধিতা করে ইতোমধ্যেই ভূমিদস্যুরা সরব হয়েছে। ড্যাপকে বাস্তবায়ন করা হলে ঢাকা শহরের আয়তন হবে ৫৯০ বর্গকিলোমিটার। এর ২১ শতাংশ থাকবে জলাশয় ও জলাভূমি হিসেবে সংরক্ষিত। এই ২১ শতাংশ এলাকায় ইতোমধ্যে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেয়া হবে। এছাড়া অননুমোদিত এলাকায় অবস্থিত ভারী ও দূষণকারী শিল্পগুলো চিহ্নিত করা হবে এবং তা নির্দিষ্ট শিল্প এলাকায় সরিয়ে নেয়া হবে। থাকবে পর্যাপ্ত রাস্তা, পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান।
আইন কী বলে?
ভবন বা ইমারত নির্মাণ সংক্রান্ত মূল আইন হলো ইমারত নির্মাণ আইন-১৯৫২ এবং এর অধীনে ২০০৬ সালে প্রণীত ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা শুধু সাধারণ জনগণের ইমারত নির্মাণ করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সরকারি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হয় না। সরকারি ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় সরকারি ইমারত নির্মাণ আইন-১৮৯৯।
যাই হোক, ইমারত নির্মাণ আইন-১৯৫২-এর মূল কথা হলো- আইন দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো ইমারত নির্মাণ, জলাধার খনন বা ভরাট, পহাড় খনন ইত্যাদি পরিচালনা করা যাবে না। অনুমোদিত ইমারত যে উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার অনুমতি নেয়া হয়েছে, তা ভিন্ন অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে অনুমোদনহীন ঘরবাড়ি অপসারণ বা ভোগদখলকারীদের উৎখাত করতে পারবে।
অন্যদিকে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৬ এর মূল কথা হলো- যে জমির ওপর ইমারত নির্মিত হবে তা নির্মিতব্য ভবনের ভার বহন করতে সক্ষম কিনা সে বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে এবং নকশা অনুমোদনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। একইভাবে অগ্নিনিরাপত্তা সম্পর্কে বিধিমালায় বলা হয়েছে যে, নির্মিত ইমারতে অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত সব ব্যবস্থা বিধিমালা অনুসারে নিশ্চিত করতে হবে, ইমারতে জরুরি প্রস্থান (ইমার্জেন্সি এক্সিট) ব্যবস্থাসহ এর প্রদর্শনকারী দিকচিহ্ন থাকতে হবে। অগ্নিনির্বাপণ কাজের সুবিধার্থে ভবনটিতে গমনের জন্যও পর্যাপ্ত রাস্তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আইনগুলো ঠিকমতো মানা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য রয়েছে একাধিক কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে দায়িত্ব হলো রাজউকের। ঢাকা শহরে রাজউকের অনুমোদন ব্যতীত আইনত কোনো ভবন গড়ে ওঠার কথা নয়। কোনো জলাশয় ভরাট করার ক্ষেত্রেও রাজউকের অনুমতি প্রয়োজন। তাছাড়া যে উদ্দেশ্যে ভবনটি নির্মাণের অনুমতি নেয়া হয়েছে সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করার দায়িত্বও রাজউকের। অন্যদিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি প্রদানের দায়িত্ব ঢাকা সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত। কোথাও অবৈধভাবে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল কিনা, এক ব্যবসার জন্য অনুমতি নিয়ে অন্য ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে কিনা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি ঠিক জায়গায় পরিচালিত হচ্ছে কিনা, অনুমতি দেয়া হলে জনস্বার্থের ক্ষতি হতে পারে কিনা ইত্যাদি সবকিছুই তদারকি করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
আবার বিদ্যুৎ সংযোগ সংক্রান্ত সবকিছু তদারকি করার দায়িত্ব ‘ডেসা’ বা ‘ডেসকো’র ওপর ন্যস্ত। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দায়িত্ব হলো ভবনে অগ্নিনির্বাপণ এবং অগ্নিপ্রতিরোধের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে কিনা তা তদারকি করা। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ভবনই আইনত গড়ে ওঠার কথা নয়। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, নির্বাপণ ও অগ্নিকাণ্ড থেকে উদ্ধার কাজকে অধিকতর সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রণীত হয় ‘অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন- ২০০৩’। এই আইনের বিধান অনুসারে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ভবন বা স্থানকে গুদাম বা কারখানা হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তাকে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের কাছ থেকে পূর্বানুমোদন নিতে হবে। মহাপরিচালকের অনুমোদন ছাড়া কোনো বহুতল ভবনের নকশাও পরিবর্তন করা যাবে না।
অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধস নিয়ে কর্তৃপক্ষের এরকম অবহেলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একাধিকবার সরকারের প্রতি কারণ দর্শনোর নোটিশ জারি করেছেন। ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল সাভারের স্পেকট্রাম সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড হঠাৎ ধসে পড়ে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুসারে ধসে পড়ার সময় প্রায় ৪০০ শ্রমিক কারখানায় কর্মরত ছিল এবং তারা সবাই বিধ্বস্ত ভবনের নিচে আটকা পড়ে। ৯ দিন ধরে উদ্ধারকার্য চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ১০৮ জনকে জীবিত আর ৭৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বাকিরা ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়া অবস্থায় থেকে যায়। এই ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলায় হাইকোর্ট ১৩ জুন ২০০৫ সরকারের প্রতি রুলনিশি জারি করেন। সেই সাথে কারখানা ভবনের নির্মাণ, ভূমির মালিকানা, ভবন নির্মাণের বৈধতা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু বিজিএমইএ ব্যতীত অন্য কেউ এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি।
আবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ চট্টগ্রামের কেটিএস গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন শ্রমিক জীবন্ত দগ্ধ, বহু শ্রমিক চিরতরে পঙ্গু, শতাধিক শ্রমিক আহত ও প্রচুর সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই ঘটনায় হাইকোর্ট ৮ মার্চ ২০০৬ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি রুলনিশি জারি করেন। সেই সাথে ঘটনাটির উপযুক্ত তদন্ত করা, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদান এবং ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ ব্যবস্থা কেন গ্রহণ করা হবে না- মর্মে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি।
ঢাকা শহরের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। এই সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠছে অসংখ্য ভবন, বাড়িঘর। কিন্তু এসব বাড়িঘর নিয়ম মেনে গড়ে উঠছে কিনা তা দেখা যাদের দায়িত্ব তারা যদি ঠিকমতো তাদের দায়িত্ব পালন করে এবং যারা বাড়িঘর বানাচ্ছেন তারা যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন, তাহলে আমরাই পারি আমাদের প্রিয় ঢাকাকে বাঁচাতে।
তথ্যসূত্র
- প্রথম আলো, ১৬ জুন ২০১০
- প্রথম আলো, ১৫ জুন ২০১০
- প্রথম আলো, ১৯ জুন ২০১০
- ইত্তেফাক, ৭ জুন ২০১০
- প্রথম আলো, ১৭ ও ২৮ জুন ২০১০; বিডি নিউজ ২৪, ২৮ জুন ২০১০