সংগঠনবার্তা
‘ঘরে ও বাইরে নারী থাকুক নিঃশঙ্ক ও নিরাপদ’
উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধে চাই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
একের পর এক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। বখাটেদের অত্যাচারে স্কুলে যেতে পারছে না স্কুল পড়ুয়া মেয়েরা। স্কুলের গণ্ডিতে অথবা স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে থেকেও নিরাপত্তা নেই। বখাটেদের উৎপাত সেখানেও বিসতৃত। উৎপাত শুধু ওই মেয়েটির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, আক্রান্ত হচ্ছেন বাবা-মা, পরিবার-পরিজন। সামান্য প্রতিরোধ-প্রতিবাদ দেখা গেলেও উত্ত্যক্তকারীদের দৌরাত্ম্য কমছে না। কোথাও কোথাও বখাটেদের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাসীন দলের নামও শোনা যাচ্ছে। অব্যাহত পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে, সমাজ, পরিবার-পরিজন কারও কাছ থেকে যথেষ্ট সমর্থন না পেয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মেয়েরা বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (১ জানুয়ারি- ৭ জুন ২০১০) মোট ৪৭ জন মেয়ে লাঞ্ছিত হয়েছে, এর মধ্যে অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ২১ জন এবং কন্যার অপমান সইতে না পেরে একজন পিতা আত্মহত্যা করেছেন ও হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন আরেক পিতা। আর উত্ত্যক্তকরণের প্রতিবাদ করায় খুন হয়েছেন তিনজন এবং লাঞ্ছিত হয়েছেন ১০ জন পুরুষ। এই প্রবণতার বিরুদ্ধে বর্তমানে নানামুখী উদ্যোগও অবশ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি চলছে, সভা-সমাবেশ-মানববন্ধন হচ্ছে। স্কুলের গেটে সাদা পোশাকে পুলিশ নিয়োগ হয়েছে, বখাটেদের ধরতে পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৩ জুন ২০১০ ‘ছাত্রীদের উত্ত্যক্তকারী বখাটে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশব্যাপী শিক্ষা দিবস’ পালিত হয়েছে। তবুও বন্ধ হচ্ছে না উত্ত্যক্ত করা। এই সমস্যার বিস্তার ঘটেছে সর্বত্র। এক্ষেত্রে গ্রাম-শহর ভেদাভেদ যেমন নেই তেমনি ভেদাভেদ নেই ধনী-গরিব শ্রেণীতেও। এ থেকে উত্তরণের জন্য তাই প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন। এক্ষেত্রে শুধু কঠোর হস্তে দমন করার চিন্তাও যেমন কোনো ফল বয়ে আনবে না, তেমনি ভুক্তভোগী মেয়েদের ঘরে আটকে রাখাও কোনো সমাধান নয়। উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধে প্রচলিত আইন তেমন কার্যকর নয়। উত্ত্যক্ত করার কারণে অপমানে আত্মহত্যার পরই কেবল পুলিশ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধে মামলা নিয়ে। কিন্তু আমাদের জানা মতে, এ ধরনের মামলায় আসামিদের শাস্তি হওয়া ঘটনা বিরল। কারণ দণ্ডবিধির এই ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণ করা দুরূহ। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ২০০৩ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনীতে ৯-ক ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনা অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবুও সবকিছু মিলিয়ে প্রচলিত আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা হচ্ছে উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়ে প্রতিকার পাওয়ার রাস্তা খুবই সীমিত। আত্মহত্যা করলে তবে আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা হয়। কিন্তু সবার প্রত্যাশা- আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত ঘটনা ঘটার আগেই উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধে যথেষ্ট আইনি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় অবশ্য উত্ত্যক্তকরণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেখানে শাস্তির পরিমাণ অত্যন্ত কম এবং পুলিশকে এই ধারা ব্যবহার করতেও তেমনটা দেখা যায় না।

ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের রূপরেখা কী হতে পারে তা নিয়ে মতবিনিময়ের উদ্দেশ্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সেগুনবাগিচাস্থ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা কনফারেন্স হলে ১৮ মে ২০১০ ‘ইভটিজিং প্রতিরোধে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় প্রধান অতিথি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যথাক্রমে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ। আলোচনা সভায় তিনজন ছাত্রী তাঁদের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা তুলে ধরেন। উন্মুক্ত আলোচনায় ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন এবং নারী উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধে সুপারিশমালা পেশ করেন। আলোচনায় উঠে আসা সুপারিশগুলো ছিল মূলত পাঁচ ভাগে বিভক্ত। এখানে সরকার, পুলিশ, স্কুল, এনজিও এবং সাধারণ জনগণের জন্যও সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ উঠে আসে। সরকারের জন্য যেসব সুপারিশ আসে তার মধ্যে অন্যতম ছিল জোরদার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজনে আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন করা। এছাড়া সর্বস্তরে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারকে আরো উদ্যোগ নেয়ারও সুপারিশ করা হয়। তাছাড়া উত্ত্যক্তকারীদের প্রতিরোধে প্রশাসনিকভাবে শিক্ষকদের সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা, প্রতিটি স্কুলে এমন একটি ফোরামের ব্যবস্থা করা যেখানে উত্ত্যক্তকরণের শিকার ছাত্রীরা তাদের কথা খোলাখুলিভাবে বলতে পারবে এবং সেখানে তারা আইনি, প্রশাসনিক, মনোসামাজিকসহ সব ধরনের সহযোগিতা পায়, সব স্তরের শিক্ষাক্রমে বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা, হটলাইনের ব্যবস্থা করা এবং উত্ত্যক্তকারীদের উৎসাহিত করে গণমাধ্যমে এমন বিজ্ঞাপন/অনুষ্ঠান প্রচারে সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজনে এমন অনুষ্ঠান প্রচারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ারও সুপারিশ করা হয়। পুলিশ প্রশাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ হলো- আইনের দ্রুত ও সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা, আইনি ব্যবস্থা প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, প্রত্যেক ওয়ার্ডে কমিউনিটি পুলিশকে আরো সক্রিয় করা। আলোচনায় স্কুলগুলোর জন্যও কিছু সুপারিশ উঠে আসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো- প্রতিটি স্কুলে একজন শিক্ষককে ফোকাল পার্সন নিয়োগ করা, সপ্তাহে অন্তত একদিন মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা করা, অভিভাবক ও ম্যানেজিং কমিটিকে সম্পৃক্ত করা, শিক্ষকদের রক্ষণশীল মানসিকতা পরিহার করা, বিনোদনমূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা, বিদ্যালয়গুলোতে নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো।
এনজিওদের জন্য যেসব সুপারিশ আসে তার মধ্যে অন্যতম হলো- প্রতিটি স্থানে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং মেয়েদের সাহস ও মনোবল বাড়ানোর জন্য কার্যক্রম গ্রহণ। উত্ত্যক্তকরণ বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে সরকারের পাশাপাশি এনজিওদের বিশেষ ভূমিকা রাখার কথাও উঠে আসে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা আইনি প্রতিকারের পাশাপাশি ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রতি জোর দেন। তারা বলেন- এই আন্দোলন পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। উত্ত্যক্তকরণের শিকার মেয়েকে দোষারোপ করা থেকে মা-বাবাকে বিরত থাকতে হবে, পরিবারের মধ্যে নৈতিকতা চর্চা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং উত্ত্যক্তার শিকার মেয়েটিকে পরিবার থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে। সর্বোপরি পরিবার থেকেই সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আলোচনায় সমাজের সবার সক্রিয় হয়ে একসাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, ভয়াবহ এই সমস্যা মোকাবেলায় ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। তবে সেই আন্দোলনের সহায়ক শক্তি হিসেবে উত্ত্যক্তকরণকে সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সাঈদ আহমেদ
এটিএম মোরশেদ আলম
২০০১ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা তদন্ত
কমিশনের সাথে আসক প্রতিনিধি দলের মতবিনিময়
অষ্টম সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও সংখ্যালঘুসহ তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর সরকারদলীয় সমর্থকদের নির্যাতনের তথ্য উদ্ঘাটনকল্পে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের মেয়াদ ২৬ জুন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর মেয়াদ আরো তিন মাস বাড়ানোর জন্য কমিশন আবেদন জানাবে। গত ৮ জুন কমিশনের সাথে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর একটি প্রতিনিধি দলের মতবিনিময়কালে এ তথ্য জানানো হয়। সে সময় কমিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন এবং কমিশনের সদস্য ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মীর শহীদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কমিশনের পক্ষ থেকে আরো জানানো হয় যে, দীর্ঘ সময় পর তথ্য প্রদানে ভিকটিমের অস্বীকৃতি, বিশেষত ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির মতো ঘটনায় সামাজিক লজ্জার ভয় এবং কিছুক্ষেত্রে নির্যাতনকারীদের ক্ষমতাসীন দলে যোগদানের ফলে নির্যাতনের ব্যাপকতার তুলনায় অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক ভুক্তভোগী কমিশনে অভিযোগ লিপিবদ্ধ করেছেন। তারপরও প্রায় চার হাজার অভিযোগ ইতোমধ্যে কমিশনে জমা পড়েছে। এসব ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন এবং অভিযুক্তদের চিহ্নিতকরণ বিশাল ব্যাপ্তির কাজ। তাই কমিশনের জনবল ও মেয়াদের স্বল্পতার বিষয় বিবেচনায় রেখে চার হাজারের মধ্যে ৫০০টি ঘটনার বিস্তারিত তথ্যানুসন্ধানের জন্য কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিশন সূত্রে জানা যায়- ওই সময়কার নির্যাতন সম্পর্কে অনেক বইপত্র-দলিলাদি পাওয়া গেলেও বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার মতো তথ্য অনেকক্ষেত্রেই পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রসঙ্গত কমিশন জানায়, চারদলীয় জোট সরকারের পুরো পাঁচ বছর মেয়াদের ঘটনাবলি নয় বরং ২০০১ সালের নির্বাচনের পরপর সংঘটিত ঘটনাগুলো সম্পর্কেই কমিশন অনুসন্ধান চালাবে। এক্ষেত্রে ২০০১-এর অক্টোবর নির্বাচন-পরবর্তী সময়কাল থেকে ২০০২ সালের মার্চ পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলিকেই কমিশন বিবেচনা করছে। আসক-এর পক্ষ থেকে উপদ্রুত এলাকার সে সময়কার প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভূমিকা ও দায়দায়িত্ব নিরূপণের বিষয়ে কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এ ব্যাপারে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয় যদিও কমিশনের কর্মপরিধিতে ওই সময়ে প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের ভূমিকা ও পদক্ষেপ পর্যালোচনা ও তাদের সম্ভাব্য দায়দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত নেই, তারপরও কমিশন এদের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য সঙ্কলন করছে এবং এসব তথ্যও রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে কমিশন জানায়। আসক-এর পরিচালক (তদন্ত ও তথ্য সংরক্ষণ) মোঃ নূর খানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন নীনা গোস্বামী, মোহাম্মদ টিপু সুলতান, আবু ওবায়দুর রহমান, মোঃ শাহ আলম ফারুক এবং জন অসিত দাস।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ-এর পক্ষে এ দায়েরকৃত রিটের শুনানিকালে একই বছরের ৬ মে হাইকোর্ট সরকারকে দুই মাসের মধ্যে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠন এবং কমিশন গঠনের ছয় মাসের মধ্যে কমিশনকে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ প্রদান করেন। আদালত কর্তৃক বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে কমিশন গঠন করা না হলে ২০০৯-এর ১০ ডিসেম্বর রিটের আবেদনকারী পক্ষ সরকারের তিন সচিবসহ চার কর্মকর্তার বরাবর উকিল নোটিশ পাঠান। নোটিশে বলা হয়, হাইকোর্টের নির্দেশনানুযায়ী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত কমিশন গঠন করা না হলে উপরোক্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হবে। এরপর ১৭ ডিসেম্বর সরকার অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিশন গঠন করার ঘোষণা দেয়। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন- পুলিশের সাবেক ডিআইজি নজরুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আবদুল হান্নান এবং পুলিশের বিশেষ সুপার (পরবর্তীকালে ডিএমপি যুগ্ম কমিশনার হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মীর শহিদুল ইসলাম। ব্যক্তিগত কারণে পুলিশের সাবেক ডিআইজি নজরুল ইসলাম কমিশনে থাকতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে উপসচিব আবদুল হান্নানের পরিবর্তে উপসচিব মনোয়ার হোসেন আখন্দকে নিয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিশন কাজ শুরু করে। তদন্ত কমিশনের কার্যপরিধি সম্পর্কে বলা হয়- কমিশনের রিপোর্টে ঘটনাগুলোর পটভূমি, ঘটনার কারণ, ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ থাকবে। গঠনের পর ২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ কমিশন এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে, ২০০১-এর নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংঘটিত সহিংস ঘটনা যথা: হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, বসতবাড়ি উচ্ছেদ, ভূসম্পত্তি দখল, নির্যাতন-নিপীড়নসহ যাবতীয় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, জাতিগোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের অভিযোগের বর্ণনা, সাক্ষ্য প্রমাণ, ছবি, সিডি বা অন্য কোনো তথ্য-উপাত্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ২০ কার্য দিবসের মধ্যে কমিশনে লিখিত কিংবা মৌখিক বিবরণ দাখিল করতে অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তীকালে আরো একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত অভিযোগ দাখিলের সময়সীমা বৃদ্ধি করে। গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তথ্য আহ্বানের পর কমিশন ১০ এপ্রিল থেকে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া এলাকা বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগ, তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণাদি সংগ্রহ করে। স্থানীয় পুলিশ, জেলা প্রশাসন ছাড়াও মানবাধিকার সংগঠনগুলো কমিশনকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে বলে কমিশন জানায়। এরি মধ্যে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)সহ বিভিন্ন বেসরকারি পেশাজীবী নাগরিক সংগঠন ঐ সব ঘটনার বেশ কিছু তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন, প্রমাণাদি কমিশনে জমা দিয়েছে। কমিশন গঠনের পর কমিশনের রিপোর্ট দেয়ার সময় প্রথমে এক দফা তিন মাস বাড়ানো হয়। সেই বর্ধিত মেয়াদ ২৬ জুন শেষ হয়ে যাওয়ার পর কমিশন আবারো সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করে। সর্বশেষ ৩০ জুন কমিশন সূত্র জানায়, এরি মধ্যে কমিশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময়সীমা আরো তিন মাস বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। মতবিনিময়ের সময় আসক প্রতিনিধিবৃন্দ কমিশনের সার্বিক সফলতা কামনা করে প্রয়োজনে কমিশনকে সর্বতোভাবে সহায়তা প্রদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। কমিশন তথ্য-প্রমাণাদি, প্রতিবেদন দিয়ে সহায়তা করায় আসককে ধন্যবাদ জানায়।
শাহ আলম ফারুক