সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   প্রতিবেদন
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   ফলো-আপ
   নারী
   আন্তর্জাতিক
   পাঠক-পাতা
   সংগঠনবার্তা

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

মত-অভিমত

করপোরেট দুনিয়ার সামাজিক দায়িত্ববোধ

শাহ্ মোঃ মুশফিকুর রহমান

ইদানীংকার করপোরেট দুনিয়ায় ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’ একটি বহুল আলোচিত ও চর্চিত বিষয়। বড় থেকে মাঝারি করপোরেট হাউসগুলো নিয়তই বিবিধ সামাজিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে- কদাচিৎ অনাড়ম্বরে, প্রায়শই ঢাকঢোল পিটিয়ে। কেউ সাদা রঙের মানুষ খুঁজে বের করছে, নগরীর সৌন্দর্য বর্ধন করছে কেউ কেউ, কারও ঝোঁক ‘সামাজিক আন্দোলনের’ পৃষ্ঠপোষকতায়, কেউ লাগাচ্ছে গাছ, কেউবা শেখাচ্ছে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার গুরুত্ব। এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো হঠাৎই এতোসব সামাজিক দায়িত্ব পালন নিয়ে ক্ষেপলো কেন, তার কিনারা আমরা আমজনতা ততটা পাই না। আমরা তো জানতাম ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাজ মুনাফা করা। সামাজিক কাজকর্মের জন্য তো এনজিও এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি বা সংগঠনগুলো রয়েছেই। অবশ্য অতীতে অনেক ধনী ব্যবসায়ীকেও আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রচুর দান-খয়রাত করতে দেখেছি। আর কে না জানে, টাকা যার বেশি, দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা তার তত বেশি। সুতরাং আখেরে সমাজের তাতে লাভই হচ্ছে। তারপরও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে কিছু কথা থেকে যায়। সেই থেকে যাওয়া কথাই খানিকটা বলি।

একটা কাহিনী দিয়ে শুরু করি: সোলেমান সাহেব (ঈষৎ স্থানিকীকৃত নাম) জুতা বানাতেন। তার ব্যবসা চলছিলও বেশ। তো তিনি জুতার ব্যবসা নিয়ে একটা কোম্পানি খোলার চিন্তা করলেন। যেই চিন্তা সেই কাজ, তৈরি হলো- সোলেমান অ্যান্ড কোং লিমিটেড। সোলেমান সাহেব, তার স্ত্রী, এক কন্যা ও চার পুত্র হলেন কোম্পানির উদ্যোক্তা। দুই পুত্র ও সোলেমান সাহেব মিলে গঠিত হলো পরিচালনা পর্ষদ। পুরো জুতার ব্যবসা কোম্পানিতে হস্তান্তর করা হলো ৪০ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে। সোলেমান সাহেব ও তার পরিবারের সদস্যরা হলেন শেয়ারহোল্ডার এবং কোম্পানির পক্ষ থেকে সোলেমান সাহেবকে ১০ হাজার পাউন্ডের ডিবেঞ্চার ইস্যু করা হলো। ডিবেঞ্চারের মূল কথা হলো, সোলেমান সাহেব কোম্পানির কাছ থেকে ১০ হাজার পাউন্ড পাওনা। এদিকে দেশে ব্যবসার পরিস্থিতি খারাপ হতে লাগলো। এক বছরের মাথায় সোলেমান অ্যান্ড কোং লিমিটেড দেউলিয়া হয়ে গেল। এর মধ্যে অন্যান্য ব্যক্তির কাছে কোম্পানির সাত হাজার পাউন্ড দেনা পড়ে গেছে। কিন্তু হিসাব করে দেখা গেল, কোম্পানির টিকে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছয় হাজার পাউন্ডের বেশি নয়। সোলেমান সাহেব এই ছয় হাজার পাউন্ড কোম্পানির কাছে তার পাওনা বাবদ রেখে দিলেন এবং অন্য পাওনাদাররা কানাকড়িও পেলেন না। কারও কারও কাছে পুরো বিষয়টাকে নিরেট বাটপারি বলে মনে হতে পারে। আদালত কিন্তু বললেন- ঠিকই আছে। যদিও কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা সোলেমান সাহেবের হাতেই ছিল, তথাপি কোম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত হওয়ায় সোলেমান সাহেবের ব্যক্তিসত্তার সাথে কোম্পানির ব্যক্তিসত্তাকে এক করে দেখা অনুচিত এবং কোম্পানি আইনের বিধান মেনে উল্লিখিত পাওনাদারদের চেয়ে নিজের কোম্পানির কাছে সোলেমান সাহেবের পাওনা অগ্রগণ্য। কোম্পানির ব্যক্তিত্বকে এর সদস্য বা শেয়ারহোল্ডারদের ব্যক্তিত্বের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না- এই ধারণা দিতে গিয়ে শিক্ষকগণ শত বছর পুরনো ব্রিটিশ এই মামলার সবকই ছাত্রদের দিয়ে থাকেন (Salomon vs. Salomon & Co. 1897 AC 22)। এই কাহিনী বয়ানের উদ্দেশ্য একটাই- এটা বোঝানো যে, কোম্পানিগুলো যেসব সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে তা আসলে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা বা পরিচালনা পর্ষদের সভ্যরা করছেন না, করছে কোম্পানি নিজে, যে কিনা প্রাকৃতিক সত্তা নয়, কৃত্রিম সত্তা। সামপ্রতিককালে কোম্পানিগুলো যে সামাজিক দায়িত্বগুলোর দিকে ঝুঁকছে, তার অনেকগুলোই একান্ত মানবিক অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। কোনো কৃত্রিম সত্তাবিশিষ্ট কোম্পানির কি তেমন অনুভূতি থাকার কথা?

হালে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশাত্মবোধের ইঁদুর দৌঁড়ে সবচেয়ে এগিয়ে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে এদের তৈরি বিজ্ঞাপনে এতো শ্রম, মেধা আর শৈল্পিকতা ব্যবহার করা হয় যে, কোনো কোনোটি দেখে চোখে পানি চলে আসে। কিন্তু আমাদের চোখে পানি আনতে এই ব্যবসায়ীদের কত কোটি টাকা যে বেরিয়ে যায় তার হদিস কে রাখে। একটি সহজ প্রশ্ন করি- পাবলিকের দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলে এদের কী লাভ? সামাজিক দায়িত্ব পালন করে ভোক্তার আস্থা অর্জন? নাকি জনগণের আবেগকে নিজেদের পক্ষে আনার মার্কেটিং কৌশল? কে না জানে, এসব কোম্পানির বেশিরভাগেরই সিংহভাগ মালিকানা বিদেশি কিছু কোম্পানির। কোনো মহান ব্রত নিয়ে তারা এ দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করতে এসেছে বলে আমাদের জানা নেই। এখানে যতক্ষণ ব্যবসার সুযোগ আছে, ততক্ষণই এরা আছে, নয়তো পুঁজি গুটিয়ে অন্য দেশে স্থানান্তর এবং নতুন দেশের দেশাত্মবোধ নিয়ে টানাটানি। সত্তার কৃত্রিমতা আসলেই অনেক সুবিধাজনক!

বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো নিয়ে কিছু বলার নেই। এদের কাজও ব্যবসা করা। কিন্তু নামিদামি গুণীজনেরা যখন এসব উদ্যোগে শামিল হন, তখন তা কিছুটা বিব্রতকরই বটে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানও আমাদের বিব্রত করার এই দায় থেকে মুক্ত নয়। ভাষা শহীদদের ভাস্কর্য যদি বসাতে হয় মোবাইল কোম্পানির টাকায় আর একুশের বইমেলা আয়োজন করতে হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থ সহায়তায়, তবে তা কার জন্য কতোটা সম্মানজনক সেটা বাংলা একাডেমীই ভালো বলতে পারবে।

তাহলে আমার বক্তব্য আসলে কী? আমি কি বলতে চাইছি যে, এসব কোম্পানির কোনো সামাজিক দায়িত্ববোধ থাকার দরকার নেই? বরং উল্টো একটা প্রশ্ন করি- কয়েক বছর আগে দুনিয়াজুড়ে তামাক বেচা একটি কোম্পানি এ দেশে ব্যাপক গাছপালা লাগিয়ে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল বলে খবরে প্রকাশ। অগুনতি মানুষকে তামাকের ধোঁয়া গিলিয়ে একটা কোম্পানির পক্ষে গাছ লাগানোটা আসলে কতটা দায়িত্বপূর্ণ কাজ? অথবা অবৈধভাবে ভিওআইপির (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) ব্যবসা করার খেসারত হিসেবে শতকোটি টাকা জরিমানা গুণে যখন কোনো কোম্পানি বিনামূল্যে চক্ষুশিবির করে আমাদের আহা উহু করার সুযোগ করে দেয়- তখন সেই কোম্পানির সামাজিক দায়িত্ববোধকে কী দৃষ্টিতে দেখা উচিত? এ প্রসঙ্গে আরও একটা কথা না বললেই নয়। করপোরেট বাণিজ্যের উল্টোপাল্টা কাজের খতিয়ান তুলে ধরা যাদের কাজ, সেই মিডিয়ার একটা অংশও নিজের কাঁধে অসামান্য সামাজিক দায়িত্বের বোঝা তুলে নিচ্ছে। কিন্তু এতো কাজ তো আর নিজের টাকায় করা সম্ভব নয়, অতএব হাত পাতো আবার সেই করপোরেট বাণিজ্যের কাছে। মিডিয়ার পেনিট্রেশন এতো বেড়েছে যে, আমরা আজকাল অনেক ছোটখাটো দুর্নীতিরও অনেক বড় বড় রিপোর্ট মিডিয়ায় পাই। কিন্তু অতি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি ভিওআইপির মতো হাজার কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য বা তার ফলে আরোপিত জরিমানার কথা কী করে যেন এক কলামেই এঁটে যায়। আপনি যখন দুর্নীতিবাজ কোম্পানির টাকায় ৩০ মিনিটে দুনিয়া কাঁপানোর কসরত করবেন, তখন সেই সুহৃদ দাতার বিরুদ্ধে কথা বলবেন কোন মুখে?

এখন প্রশ্ন হলো, সামাজিক দায়িত্ব পালনের নামে এই যে টাকা খরচ করা হচ্ছে, এসব অর্থ কি কোম্পানির নিজের? এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাজেটে সামাজিক দায়িত্ব পালনের খাতে আলাদা বরাদ্দ রাখে। কিন্তু সব গোল্লায় গেলেও প্রজেক্টেড রেভিনিউ যে ঠিক রাখা চাই। তাই সামাজিক খাতে বরাদ্দের একটা প্রভাব পড়ে প্রডাক্ট বা সার্ভিস প্রাইসিংয়ে। ফলাফল দাঁড়াচ্ছে, সামাজিক খাতে কোম্পানিগুলোর ব্যয়িত টাকা আসলে আসছে আপনার-আমার, মানে ভোক্তার পকেট থেকে। একটু উল্টো করে ভাবি। ধরা যাক, কোম্পানিগুলো সামাজিক দায়িত্ব পালনের দায় থেকে নিজেদের রেহাই দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতে তাদের বিক্রীত পণ্য বা সেবার মূল্য হতো কম আর আমাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হতো না। তো এই সহজ বুদ্ধি কোম্পানিগুলো কাজে লাগায় না কেন? কেননা সামাজিক দায়িত্ব পালনের দৌড়ে অন্য কোম্পানির তুলনায় পিছিয়ে পড়লে বাজারে তাদের সুনাম যাবে কমে আর তার প্রভাব পড়বে বিক্রিবাট্টায়। অর্থাৎ কেউ না থামালে এ প্রক্রিয়ার গতিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকাটাই মনে হচ্ছে নিয়তি। এটা এমন এক মার্কেটিং কৌশল যা প্রথাগত মার্কেটিংয়ের সুবিধা তো দেয়-ই, পাশাপাশি একটি কোম্পানিকে সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি এনে দেয়। হাল আমলের ব্র্যান্ডিংয়ের এ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা ও তা চালিয়ে নেয়া চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক পুঁজি ঢেলে, অনেক নিয়ম মেনে, অনেক ব্যুরোক্রেটিক বাধা ডিঙিয়ে তবেই একটি কোম্পানি খোলা যায়। আর এটি চালাতে মানতে হয় হাজারো নিয়ম-কানুন- কোম্পানি আইন, শ্রম আইন, ট্যাক্স আইন, পরিবেশ আইন, ভোক্তা অধিকার আইন, ইন্ডাস্ট্রির নিজস্ব আইন- এমন বহু আইনের বহুতর বিধিনিষেধ। এগুলো সব ঠিকঠাকমতো মেনে চললে শ্রমিকরা ঠিকমতো সুবিধাদি পাবে, রাষ্ট্র পর্যাপ্ত ট্যাক্স পাবে, পরিবেশ ঠিক থাকবে, অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে না এবং ভোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উন্নতমানের পণ্য বা সেবা পাবে। এমন একটি আইন মেনে চলা কোম্পানির কাছে আমাদের আর বেশি কী চাওয়ার থাকতে পারে? এর অতিরিক্ত ‘সামাজিক দায়িত্ব’ নিতে গেলেই সমাজের ও রাষ্ট্রের ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক সম্পর্কের সমীকরণে গড়বড় দেখা দেবে, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হবো আমরা- সাধারণ ভোক্তাগণ। কোম্পানিগুলো সৎভাবে ব্যবসা করুক, সেখান থেকে যুক্তিসঙ্গত লাভ করুক, লাভের টাকা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিলিয়ে দিক। শেয়ারহোল্ডাররা তো আর কোম্পানির মতো কৃত্রিম ব্যক্তি নয় বরং রক্তমাংসের মানুষ। তাদের মানবিকবোধ উচ্চ শ্রেণীর হলে নিজের লাভের পয়সায় তারা সামাজিক দায়িত্ব পালন করুক। তাতে সমাজ উপকৃতই হবে।