একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আকাঙ্ক্ষা বহুদিন ধরে লালন করে আসছে এ দেশের মানুষ। দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের আগ্রহ সবসময় মেলে না। কিন্তু জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রে সে মেলবন্ধনটা ছিল। এর ফলস্বরূপ এবং কিছুটা আন্তর্জাতিক চাপে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর জারি করা হয় ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০০৭’। এরপর কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দিতে লেগে যায় প্রায় এক বছর। ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং মুনিরা খান ও অধ্যাপক নীরু কুমার চাকমাকে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়।
নতুন সরকার নতুন আইন
এর অল্প কিছুদিন পরই ক্ষমতায় আসে বর্তমান নির্বাচিত সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নতুন সরকার কীভাবে গ্রহণ করে, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে অনুমোদন না দেয়ায় কমিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরপর ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০০৮’ নামে একটি আইন সংসদে উত্থাপন করা হয়। বিলটি আরও যাচাই-বাছাই করার জন্য আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। স্থায়ী কমিটি খসড়া এই বিলে অনেক সুপারিশ প্রদান করে এবং সংসদে উত্থাপনের একদিন আগে নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ও করে। ৭ জুলাই ২০০৯ সংসদীয় কমিটির সুপারিশসহ সংসদে উত্থাপিত হয় ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯’। ৯ জুলাই ২০০৯ তা সংসদে পাস হয় এবং ১৪ জুলাই ২০০৯ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। নতুন আইনটিকে ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাজকর্মকে বৈধতা দেয়া হয়। ২০০৭ সালের অধ্যাদেশ অনুমোদন না করে সরকারের নতুনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ প্রণয়নের কারণ খানিকটা অনুমান করা যায়। বর্তমান সরকার হয়তো চায়নি ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রতিষ্ঠিত হোক যে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয়েছে একটি অনির্বাচিত সরকারের হাতে। তাছাড়া ২০০৭ সালের অধ্যাদেশে অনিবার্য কিছু সংশোধনী আনারও প্রয়োজন ছিল।
উল্লেখযোগ্য সংশোধনী
নতুন আইনে যে সংশোধনীগুলো আনা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একজন চেয়ারম্যান ও দু’জন কমিশনারের স্থলে নতুন আইনে একজন চেয়ারম্যান ও একজন সার্বক্ষণিক বেতনভোগী সদস্যের বিধান রাখা হয়। তাছাড়া আরও সর্বোচ্চ ছয়জন অবৈতনিক সদস্য নিয়োগের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের বয়সসীমাতেও পরিবর্তন আনা হয়। ৫০ থেকে ৭২ বয়সসীমা পরিবর্তন করে করা হয় ৩৫ থেকে ৭০। শৃঙ্খলাবাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম কী হবে আগের আইনে তার কিছুই উল্লেখ ছিল না। নতুন আইনে এ সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়, ‘শৃঙ্খলা বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো দরখাস্তের ভিত্তিতে সরকারের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাইতে পারবে’ (ধারা-১৮)। প্রতিবেদন পেলে সেক্ষেত্রে এ ব্যাপারে যথাযথ করণীয় বিষয়ে কমিশন সরকারকে সুপারিশ দিতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে দুর্বলতা হচ্ছে, প্রতিবেদন না পেলে কমিশনের কিছুই করার থাকবে না। নতুন আইনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানকে কমিশনের অন্যতম সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া নতুন আইন অনুযায়ী কমিশনকে ঢাকার বাইরেও কার্যক্রম বিস্তৃত করার এবং কার্যালয় স্থাপনের এখতিয়ার দেয়া হয়।
কমিশনের কার্যাবলি
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯-এর ধারা-১২তে কমিশনের কার্যাবলি বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, “কোন ব্যক্তি, রাষ্ট্রীয় বা সরকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বা কোন জনসেবক কর্তৃক মানবাধিকার লংঘন বা লংঘনের প্ররোচনা সম্পর্কিত কোন অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি কর্তৃক দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কমিশন তদন্ত করতে পারবে। কারাগার বা সংশোধনাগার, হেফাজত, চিকিৎসা বা ভিন্নরূপ কল্যাণের জন্য মানুষকে আটক রাখা হয় এমন যে কোন স্থান পরিদর্শন করা ও উন্নয়নের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ করা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানের সাথে সম্পর্কিত আইনসমূহের সাদৃশ্য পরীক্ষা করা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা, মানবাধিকার সম্পর্কে গবেষণা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ইত্যাদির ব্যবস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকাশনা এবং প্রচার কমিশনের কার্যাবলীর অন্তর্ভুক্ত। মানবাধিকার প্রয়োগে কর্মরত সংগঠনসমূহকে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান এবং কমিশনে অভিযোগ দায়েরের জন্য সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি/ব্যক্তির পক্ষে কোন সাহায্যপ্রার্থীকে আইনী সহায়তা প্রদানসহ সমঝোতার মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি করাও কমিশনের কার্যাবলীর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া মানবাধিকার সংরক্ষণ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান কমিশনের অন্যতম কাজ। তবে আদালতে বিচারাধীন কোন মামলার বিষয় অথবা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ১৯৮০-এর অধীন স্থাপিত ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য কোন বিষয় ও ন্যায়পাল কর্তৃক বিবেচ্য কোন বিষয় কমিশনের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হবে না।”
তদন্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা
কমিশন কর্তৃক পরিচালিত তদন্তে যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় তবে কমিশন কী পদক্ষেপ নিতে পারে সেটি বলা আছে আইনের ধারা-১২তে। সেখানে বলা হয়েছে- “কমিশন বিষয়টি মধ্যস্থতা ও সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে পারবে। এতে সফল না হলে মানবাধিকার লংঘনকারী ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা বা অন্য কোন কার্যধারা দায়ের করার জন্য এবং মানবাধিকার লংঘন প্রতিরোধ বা প্রতিকারের উদ্দেশ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট সুপারিশ করবে।”
যে ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের কাছে কমিশন কর্তৃক কোনো সুপারিশ করা হয়, সুপারিশ অনুযায়ী গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে উক্ত ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে কমিশনে প্রতিবেদন প্রদান করার জন্য কমিশন আহ্বান করতে পারবে। প্রতিবেদন দাখিল করা উক্ত ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে। ব্যর্থ হলে কমিশন ঘটনার বিবরণ মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে দাখিল করবে। রাষ্ট্রপতি এর কপি সংসদে উত্থাপনের ব্যবস্থা করবেন। এছাড়া এ আইনের ১৮ ধারা বলে কমিশন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিজ উদ্যোগে বা কোনো দরখাস্তের ভিত্তিতে সরকারের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাইতে পারে।
দেড় বছরে বিগত কমিশনের কাজ
নতুন আইনে কমিশনের সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৭২ থেকে কমিয়ে যেহেতু ৭০ করা হয়, তাই সেই বয়সসীমা অতিক্রম করায় বিগত কমিশনের সদস্য মুনিরা খান পদত্যাগ করেন ২০০৯-এর জুলাই মাসে এবং একই সময়ে ডেপুটেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কমিশনের অপর সদস্য অধ্যাপক নীরু কুমার চাকমাও ফিরে যান তার অধ্যাপনা পেশায়। সেই থেকে চেয়ারম্যান একাই ছিলেন কমিশনে। অন্য লোকবলও তেমন ছিল না। তাই দেড় বছরে কমিশনের তেমন কোনো কাজ দৃশ্যমান হয়নি। কিছু কিছু ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ, কোনো ভিকটিমকে দেখতে যাওয়া অথবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়ার মধ্যেই মূলত তাদের কাজ সীমাবদ্ধ ছিল। কমিশন রাষ্ট্রপতির কাছে যে প্রতিবেদন দাখিল করে এবং তারা নিজেদের পরিচিতিমূলক যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছে, তা থেকে কমিশনের কিছু কাজের কথা জানা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে যখন খবর প্রকাশিত হয় যে আটক আদিবাসী নেতা রাংলাই ম্রোকে ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তখন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ তাকে দেখতে যান। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হওয়া অগ্নিদগ্ধ মিনার সাথে, গরম তেলে পুড়ে যাওয়া শিশু মাসুমের সাথে কমিশনের সদস্যরা দেখা করেন। তাছাড়া বেশ কয়েকটি ‘ক্রসফায়ারে মৃত্যু’ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক ‘অপহরণের’ অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিশন সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছ থেকে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি পাঠায়। কয়েকটি ক্ষেত্রে কমিশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়, যেমন: বাপ্পীর মৃত্যু (এক বাপ্পীর পরিবর্তে অন্য বাপ্পীর ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা), মহিউদ্দিন আরিফ নামের একজনের মৃত্যু, থানা হেফাজতে আসামির মৃত্যু, ১০ মাস ধরে র্যাব সদস্যের নিখোঁজ থাকা, ৩৮ দিনেও এক ব্যবসায়ীর খোঁজ না পাওয়ার ঘটনা। এছাড়া কমিশন গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতা, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশিদের হত্যা, থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর নিপীড়ন, অব্যাহত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ইত্যাদির প্রতিবাদ জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা অধিবেশনে কমিশনের একজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি সরকারি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে সে অধিবেশনে যোগ দেন। ১০ ডিসেম্বর ২০০৯ কমিশন একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
কমিশন পুনর্গঠন
এক বছর কমিশন সদস্যহীন অবস্থায় ছিল। ২০০৯-এর ডিসেম্বরে বাছাই কমিটি একটি বৈঠক করে কমিশনের জন্য যোগ্য লোক খোঁজার দায়িত্ব দেয় আইন মন্ত্রণালয়কে। এদিকে কমিশনের চেয়ারম্যানের অবসর নেয়ার বয়স পূর্ণ হয় ২২ জুন ২০১০। তার মাত্র কয়েকদিন আগে ১৭ জুন ২০১০ বাছাই কমিটি পুনরায় বৈঠকে বসে এবং ২২ জুন ২০১০ রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানকে চেয়ারম্যান এবং কাজী রিয়াজুল হককে সার্বক্ষণিক সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে কমিশন পুনর্গঠন করেন। তাছাড়া আরও পাঁচজনকে অবৈতনিক সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তারা হলেন- আইনজীবী ফৌজিয়া করিম ফিরোজ, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন মোল্লা, অ্যারোমা দত্ত, সেলিনা হোসেন এবং অধ্যাপক নীরু কুমার চাকমা।
নিয়োগের পরপরই বিতর্ক
অনেকদিন পর হলেও কমিশন পুনর্গঠন করাটা সবাই একটি ভালো উদ্যোগ হিসেবেই নিয়েছিল। কিন্তু নিয়োগের ক’দিন পরই অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন মোল্লার বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তিনি যখন ১৯৯৯ সালে গবেষণার কাজে জার্মানির হাউডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন তখন সেখানেও তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগেরই জনৈক ছাত্রীর আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শেষে তাকে বিভাগের সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি এবং বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়। তবে তার বিভাগ কর্তৃক নেয়া এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে তিনি হাইকোর্টে একটি রিট করেছেন, যার শুনানি এখনো শেষ হয়নি। পত্রিকায় এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তাকে সরিয়ে দিয়ে রাঙ্গামাটির শিক্ষিকা নিরূপা দেওয়ানকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়।
কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ
একজন সদস্যের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগ আসার পর তাকে সরিয়ে দিয়ে নতুন একজনকে নিয়োগ দেয়াটাই হয়তো যথাযথ হয়েছে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এটি সম্পন্ন করা হলো, একটি কার্যকর ও শক্তিশালী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের পথে তার প্রভাব কী হতে পারে একটু আলোচনা করে দেখা যাক-
প্রথমত, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ অনুযায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ প্রক্রিয়া হচ্ছে- জাতীয় সংসদের স্পিকারের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বাছাই কমিটি প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুই ব্যক্তির নাম সুপারিশ করবে এবং রাষ্ট্রপতি তাদের মধ্য থেকে একজনকে নিয়োগ দেবেন (ধারা-৭)। এমনিতেই বাছাই কমিটি যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ নয়। কারণ স্পিকারকে প্রধান করে সাত সদস্যের বাছাই কমিটিতে আরও রয়েছেন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং স্পিকার মনোনীত দু’জন সংসদ সদস্য, যার একজন হবেন বিরোধী দলের। সাত সদস্যের চারজন মিলে কোরাম পূর্ণ হবে। অর্থাৎ স্পিকার, দু’জন মন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব অথবা সরকার দলের সংসদ সদস্য মিলেই যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। উপরন্তু বাছাই কমিটির আইন মন্ত্রণালয়কে যোগ্য লোক খোঁজার দায়িত্ব দেয়াটা শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ মানবাধিকার কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে খুব একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নয়। এরপর যখন দেখা গেল নিয়োগের মাত্র একদিন পর একজন সদস্যের বিরুদ্ধে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাকে সরিয়ে দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেয়া হলো এবং তা জানানো হলো আইন মন্ত্রণালয় প্রেরিত বিজ্ঞপ্তি মারফত, তখন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকার তথা মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা পরিষ্কারভাবে জানতে পারলাম না, নতুন যাকে নিয়োগ দেয়া হলো তার নাম কি বাছাই কমিটির প্রস্তাবনায় ছিল কিনা। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জনগণের কাছে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
আবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যেহেতু একটি ‘সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা’ তাই এর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আইনেই উল্লেখ রয়েছে (ধারা-৮)। সেখানে বলা হয়েছে- সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেসব কারণে ও যে পদ্ধতিতে অপসারিত হতে পারেন, সেরকম কারণ ও পদ্ধতি ব্যতীত চেয়ারম্যান বা কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না। আরও বলা হয়েছে- চেয়ারম্যান বা কোনো সদস্য যদি কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হন বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিজের দায়িত্ববহির্ভূত অন্য কোনো পদে নিয়োজিত হন (চেয়ারম্যান ও সার্বক্ষণিক সদস্যের ক্ষেত্রে), কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতস্থ ঘোষিত হন বা নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে রাষ্ট্রপতি তাকে অপসারণ করতে পারবেন। চলতি ঘটনার মধ্য দিয়ে যে খারাপ নজির স্থাপিত হলো, তা হচ্ছে- মন্ত্রণালয় প্রায় এক বছর ধরে যোগ্য লোক খোঁজার পরও এমন একজন নিয়োগ পেলেন, যার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগ রয়েছে। আর সেটাকে যে প্রক্রিয়ায় শোধরানো হলো তার মধ্য দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের কর্তৃত্বের বিষয়টি প্রকাশ্য হয়ে গেল এবং কমিশনের কোনো সদস্যকে অপসারণের আইনি প্রক্রিয়াকেও ঠুনকো বিষয়ে পরিণত করা হলো।
শেষ কথা
শুরুতেই আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জন্য এটা একটা বাজে নজির স্থাপিত হলো এবং একই সঙ্গে কমিশনকে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতাও দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলো। আমরা মনে করি, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে জনগণের মধ্যে আস্থার সঙ্কট যেন তৈরি না হয় তার দিকে সরকারের অবশ্যই সতর্ক নজর রাখা উচিত।
সুশীল সমাজের সাথে
মানবাধিকার কমিশনের কাজের
আরও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন
বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরী
মানবাধিকার কমিশনের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে অবসর নেন ২০০৭ সালের ২৩ জুন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান পদে সরকার তাকে নিয়োগ দেয় ১ ডিসেম্বর ২০০৮। ২২ জুন ২০১০ নির্ধারিত বয়সসীমা (৭০ বছর) অতিক্রান্ত হওয়ায় কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরীর মেয়াদ শেষ হয়। আসক: কমিশনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন (জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯) কতটুকু সহায়ক বলে আপনি মনে করেন? এ আইনে কোনো দুর্বলতা আছে কি; যদি থাকে তা কী কী? আ.ক.চৌ: আমার মনে হয় আইনটি আংশিকভাবে সহায়ক। আইনানুযায়ী মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রতিকার প্রার্থী/ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে এবং মানবাধিকার কমিশনকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষমতা দিলে ভালো হতো। আইনে বলা আছে, ন্যায়পাল আইন ১৯৮০-এর অধীন ন্যায়পাল কর্তৃক বিবেচ্য কোনো বিষয় এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের অধীনে স্থাপিত কার্যাবলি বা দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হবে না। এর ফলে কমিশনের কাজের ক্ষেত্র খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে বিবেচ্য ও বিচারযোগ্য শব্দের পরিবর্তে ‘বিচারাধীন’ উল্লেখ করা যেত। তাছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিচার যেমন আলাদা ট্রাইব্যুনালে হয়, তেমনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোর বিচারও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হওয়া উচিত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তার যে কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য চাইবার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। ঘটনাটি অনুসন্ধানে যে কোনো স্থানে প্রবেশের অধিকারও থাকতে হবে। আসক: আপনার কার্যকালীন সময়ে কমিশন উল্লেখযোগ্য কী কী কাজ করেছে। এই কাজগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আ.ক.চৌ: এই সময়কালে মানবাধিকার কমিশনের দাবির প্রেক্ষিতে কমিশনের এই সময়ের কাজকে আমি ১০০ নম্বরের মধ্যে ৫০ দিতে চাই। ৫টি ঘটনায় তদন্ত কমিশন গঠন হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-
- বাপ্পীর মৃত্যু (এক বাপ্পীর পরিবর্তে অন্য বাপ্পীর ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা)
- মহিউদ্দিন আরিফ নামের একজনের মৃত্যু
- থানা হেফাজতে আসামির মৃত্যু
- ১০ মাস ধরে নিখোঁজ র্যাব সদস্য
- ৩৮ দিনেও খোঁজ পাওয়া যায়নি এক ব্যবসায়ীর।
এছাড়াও কমিশন সমপ্রতি বিমানবাহিনীর জমি দখল, পটিয়াতে সংখ্যালঘু পরিবারের জায়গা দখল (একোয়ার) এবং পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারী কর্তৃক এক কিশোরের ওপর গরম তেল ছোড়ার বিষয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া কমিশন সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেল পরিদর্শন করে। আসক: কমিশনের কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা ও মনোভাব সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? আ.ক.চৌ: কমিশনের কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতায় আমি সন্তুষ্ট। আসক: সুশীল সমাজের সাথে কমিশনের কাজের অভিজ্ঞতা কী? এ বিষয়ে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি? আ.ক.চৌ: মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমি সাহায্য পেয়েছি। যেমন- আইন ও সালিশ কেন্দ্র, অধিকার প্রভৃতি। তবে সুশীল সমাজের সাথে মানবাধিকার কমিশনের কাজের আরও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আসক: পরিপূর্ণ কমিশন গঠন করার ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী কী ছিল? এই বাধাগুলো নিরসনে সরকারের মনোভাব কেমন ছিল? আ.ক.চৌ: দেশে এ পর্যন্ত যতগুলো কমিশন গঠিত হয়েছে যেমন- নির্বাচন কমিশন, তথ্য কমিশন সবগুলোর কাঠামো এক, শুধু মানবাধিকার কমিশন ছাড়া। আমি মনে করি, মাত্র একজন পূর্ণকালীন সদস্য যথেষ্ট নয়। তবুও আইনে যেভাবে রয়েছে সেভাবে অবিলম্বে পূর্ণ কমিশনের মনোনয়ন দেয়া প্রয়োজন।
তাই একজন চেয়ারম্যান, চারজন ফুল সদস্য (দু’জন সদস্য ও দু’জন কমিশনার) নিয়ে কমিশন দ্রুত গঠিত হওয়া দরকার। আসক: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ অনুযায়ী শুধু অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিগণই নন, মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করা যে কেউ কমিশনের চেয়ারম্যান হতে পারেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী? আ.ক.চৌ: আমি মনে করি, এটি ভালো হয়েছে। কারণ বিচারপতিগণের বাইরেও অনেক যোগ্য মানুষ রয়েছেন। আসক: মানবাধিকার সুরক্ষায় বিচার বিভাগের সঙ্গে কমিশনের কাজের কেমন সমন্বয় হওয়া উচিত? উভয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে আপনার মতামত দিন। আ.ক.চৌ: সমন্বয় অবশ্যই প্রয়োজন, সমন্বয় ও সহযোগিতাই কাজগুলোর সঠিকভাবে সমাধান করতে পারে। আসক: আপনার উত্তরসূরির কাছে আপনার প্রত্যাশা কী? কমিশনের কাজকে সফলতার সাথে এগিয়ে নেয়ার জন্য আপনার পরামর্শ কী? আ.ক.চৌ: উত্তরসূরির কাছে আমার প্রত্যাশা অনেক। তিনি যেন স্বাধীনভাবে কমিশনের কাজগুলোকে এগিয়ে নিতে পারেন সে প্রত্যাশা করি। আশা করি অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠন করা হবে। সবার সহযোগিতার মাধ্যমে কমিশন পরিপূর্ণভাবে কাজ করবে। আর একটা প্রত্যাশা যে, নতুনভাবে গঠিত কমিশন যেন নিজস্ব ভবনে কাজ শুরু করতে পারে। আসক: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আ.ক.চৌ: আসককেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: প্রশান্ত কুমার রায় ও সাঈদ আহমেদ
“আমাদের চেষ্টা
থাকবে
মানবাধিকারের
অভাবে
সুশাসনের
যে ব্যত্যয় ঘটে
তা সবার
উপলব্ধিতে
আনা”-
ড. মিজানুর রহমান
ড.মিজানুর রহমান মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ২২ জুন ২০১০ নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনবিভাগের অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও ড. মিজান বিভিন্নভাবে মানবাধিকার শিক্ষায় ভূমিকা পালন করে আসছেন। তিনি বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল লিগ্যাল এডুকেশন (CLEP) এবং দৈনন্দিন আইন (Street law) শিক্ষা কর্মসূচি প্রবর্তনে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। সম্প্রতি ড. মিজানুর রহমান সার্ক অঞ্চলের আইনের সেরা শিক্ষক হিসেবে ‘প্রফেসর এন আর মাধব মেনন বেস্ট ল’ টিচার অ্যাওয়ার্ড ২০১০’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন।
আসক: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ায় আপনার অনুভূতি কেমন? ড. মিজান: আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে একটি দেশের মানবাধিকারের ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক না কেন আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সেই ভূমিকা পালন করতে পারেনি। কেন পারেনি আমি সেই বিশ্লেষণে যাব না। আমাদের চেষ্টা থাকবে মানবাধিকারের গুরুত্ব এবং মানবাধিকারের অভাবে সুশাসনের যে ব্যত্যয় ঘটে তা সবার উপলব্ধিতে আনা। আমি আশা করি, মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে সরকারের এমন একটা আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে যে, সরকার আমাদের কাজ দ্বারা লাভবান হবে এবং আমরাও সরকারের সহযোগিতায় আমাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারব। এরকম একটি অবস্থায় আমরা কমিশনকে নিয়ে যেতে চাই। অতীতে কমিশন এবং সরকারের মধ্যে যে আচার-আচরণ আমরা দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে উভয়ে যেন প্রতিপক্ষ। কিন্তু এটা হওয়ার কথা নয়। আমি সাধারণভাবে বুঝি- যে কোনো সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার কমিশনের উদ্দেশ্যও কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ উদ্ঘাটন করে সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে মানবাধিকার রক্ষা ও বিকাশে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। সুতরাং উভয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্যই এক। উভয়ের লক্ষ্য যদি এক হয় তবে তো একে অন্যের প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা নয় বরং সহযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা। তাই এই যে সরকার এবং কমিশনের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, আমার প্রথম প্রচেষ্টাই হবে এই দূরত্ব কমিয়ে নিয়ে এসে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা এবং সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া, যেন মানবাধিকার রক্ষার মাধ্যমে জনকল্যাণে আমরা আমাদের ভূমিকা রাখতে পারি। আসক: সেই লক্ষ্য পূরণে যে টিমকে আপনি নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন সেটি কেমন হলো বলে আপনি মনে করেন? ড. মিজান: আমি ব্যক্তিগতভাবে কারো বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। কারণ এই টিমের মনোনয়নে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। যারা তাদের মনোনয়ন দিয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই চিন্তাভাবনা করে, বিচার-বিশ্লেষণ করেই মনোনয়ন দিয়েছেন। তবে দু’একজনের কথা জানি, তাদের অতীত কর্মকাণ্ড থেকে জানি যে তারা মানুষকে ভালোবাসেন, দেশকে ভালোবাসেন, দেশের জনগণকে ভালোবাসেন। এতটুকু পুঁজি যদি থাকে যে আমি দেশকে ভালোবাসি, দেশের মাটিকে ভালোবাসি, দেশের মানুষকে ভালোবাসি তাহলে কিন্তু মানবাধিকারের কাজকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমার সবসময় বিচারপতি কৃষ্ণা আয়ারের একটি কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন- ‘মানবাধিকারের কাজ তারাই করতে পারে, অন্যের দুঃখে যাদের চোখে জল আসে। অন্যের দুঃখে যদি কান্না না আসে তবে তুমি মানবাধিকারকর্মী হবার যোগ্য নও।’ যে মানুষদের নিয়ে কমিশন গঠিত হয়েছে তাদের অন্তত কয়েকজনকে আমি জানি যে, মানুষের দুঃখে তাদের চোখে জল আসে। এরকম মানবপ্রেমী লোকদের নিয়ে কাজ করতে সুবিধা যে হবে- সেটা তো বলাই বাহুল্য। আসক: আমরা মনে করি যে অবৈতনিক কমিশনারদের একটা ভূমিকা হয়তো থাকবে। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা মূলত নির্ভর করবে চেয়ারম্যান এবং সার্বক্ষণিক কমিশনারের বোঝাপড়ার ওপর। যিনি সার্বক্ষণিক কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি যেহেতু আইন শিক্ষা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ছিলেন সেহেতু আপনি নিশ্চয়ই তার সাথে আগেও কাজ করেছেন। আপনাদের বোঝাপড়াটা কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন? ড. মিজান: কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য হিসেবে যিনি মনোনয়ন পেয়েছেন তার সাথে অতীতে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। লিগ্যাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আমরা এক সাথে কাজ করেছি। আমি একাডেমিক দিকটা দেখতাম আর উনি প্রশাসনিক দিকটা দেখতেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে যে কর্মকাণ্ড হবে তার একটা বড় অংশ থাকবে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। সেটি যদি সঠিকভাবে না হয় বা সেখানে যদি দুর্বলতা থাকে, তবে অন্যান্য কাজ সঠিকভাবে করাও কিন্তু দুষ্কর হবে। তাই আমি মনে করি উনি, আমাদের জন্য দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হবেন। আসক: শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনগুলোর কাজের প্রবণতা লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, মানবাধিকার রক্ষার কাজে কমিশনের এখতিয়ার বা আগ্রহ কম থাকে, যতটা থাকে মানবাধিকারের প্রচারধর্মী কাজে। বর্তমানে যে ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠন করা হলো সেখানেও আমরা দেখছি অধিকাংশের পারদর্শিতা মানবাধিকারের প্রচারণামূলক জায়গায়। এর ফলে মানবাধিকারের সুরক্ষামূলক কাজে কমিশনের দুর্বলতা দেখা যাবে? এরকম কিছু তো আশঙ্কা করার সুযোগ রয়েছে। ড. মিজান: আমাদের যে যোগ্যতা, আমাদের অতীতের কাজের যে ক্ষেত্র তা বিবেচনায় এমন আশঙ্কা করাটা হয়তো যুক্তিযুক্ত। কিন্তু আরেক দিক দিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায়, তদন্ত বা বিচারিক ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতার লোকের প্রাক-অভিজ্ঞতা কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা একটি কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকেন। বর্তমান কমিশনে যারা থাকবেন তারা কিন্তু কোনো কাঠামো দ্বারা আবদ্ধ নন। কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রেখে অনেক সমস্যার প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয় না। শুরুতে আমাদের হয়তো একটু কষ্ট হবে, তবে সেটা অতিক্রম করার যোগ্যতা আমাদের আছে বলে আমি মনে করি।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে- আইনে আমাদের কাজের ক্ষেত্র হিসেবে যে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে, আমাদের তো তার ভেতরেই থাকতে হবে। তবে আমি মনে করি, আইনে আমাদের যতটুকু ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা ব্যবহার করে আমরা যদি মানবাধিকার আন্দোলনকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে পারি, তবে কমিশন কোনো ঠুনকো প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে, যার যে কোনো উচ্চারণ সমগ্র দেশের জন্য গুরুত্ব বহন করবে এবং সরকার সে বিষয়ে নজর দিতে বাধ্য হবে। আসক: আমরা দেখেছি যে, ভারতে যে আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে, সেই আইনেই সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, অবসরপ্রাপ্ত কোনো প্রধান বিচারপতি হবেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। কিন্তু আমাদের আইনে এটি সেভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। বর্তমানে যে কমিশন গঠিত হলো সেখানেও আমরা দেখছি- নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আধিক্য রয়েছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? ড. মিজান: এটি যে দারুণভাবে ইতিবাচক সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। মানবাধিকার সংরক্ষণ মানেই হচ্ছে ন্যায় নিশ্চিত করা বা ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের বিচার বিভাগের যে দৃষ্টিভঙ্গি বা যে মনোভাব দ্বারা বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেখানে ধরা যাক-একজনের গরু চুরি হয়েছে, সে আদালতে অভিযোগ করেছে। কাউকে হয়তো অভিযুক্তও করেছে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ায় দেখা গেল যে, উপযুক্ত সাক্ষী পাওয়া গেল না অথবা যে সাক্ষী পাওয়া গেল তার সাক্ষ্যে আদালত সন্তুষ্ট হলেন না এবং আদালত অভিযুক্তকে খালাস দিলেন। প্রচলিত কাঠামোবদ্ধ বিচার ব্যবস্থায় এটাই ন্যায়বিচার। কিন্তু কে গরুটি চুরি করল তা কিন্তু উদ্ঘাটন হলো না এবং যার গরু চুরি হলো সেও কিন্তু তার গরুটি ফেরত বা কোনো ক্ষতিপূরণ পেল না। অর্থাৎ তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলো না। আমাদের প্রচলিত কাঠামোবদ্ধ বিচার ব্যবস্থার এ এক বড় সীমাবদ্ধতা। কিন্তু আমাদের এর বাইরে গিয়ে দেখতে হবে যে, যার ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণে রাষ্ট্র কী করতে পারে। যারা শুধু আদালতে বসে বিচার করেন তারা এ কাজটি কখনও করতে পারেননি। সুতরাং কমিশনকে তাদের মধ্যে আবদ্ধ রাখাটা সমীচীন হতো না। আসক: মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯-এর বিষয়ে আপনার কোনো মতামত রয়েছে? ড. মিজান: আইনটি আমি পড়েছি। তবে এটির বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য যেভাবে গভীর অধ্যয়ন দরকার সেটি এখনো করার সুযোগ হয়নি বলে এ বিষয়ে এ মুহূর্তে কোনো মতামত দিতে চাই না। তবে কমিশনের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়েছে- আমরা প্রথমেই যে কাজটি করব তা হচ্ছে- আইনটি বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে আমাদের মতামত আমরা সরকারকে জানাব। আসক: কমিশনে মাত্র একজন সার্বক্ষণিক কমিশনার। বাংলাদেশের জনসংখ্যা, আয়তন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকোপ ইত্যাদি বিবেচনায় আপনি কি এটাকে পর্যাপ্ত মনে করেন? ড. মিজান: আমি মনে করি, সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন ছিল। আমাদের দেশে যে ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে তার সবগুলো নিয়ে কাজ করতে হলে লোকবল কিন্তু একটা বড় ব্যাপার। তাই কমিশনারদের সংখ্যা যদি আরও বাড়ানো যেত তবে সেটা যে ভালো হতো তা বলাই বাহুল্য। আসক: কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সরকার এবং নাগরিক সমাজ বা জনগণের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ সৃষ্টি করতে হয়। এক্ষেত্রে নাগরিক সংগঠনগুলোর কাছে আপনার প্রত্যাশা কী? ড. মিজান: আমরা কিন্তু সবসময় দেখেছি যে বেসরকারি সংগঠনগুলো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বেশি সোচ্চার। সেটার অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু আমরা সবাই জানি, মানবাধিকার কিন্তু আরও অনেক ব্যাপক। যখন নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়, তখন সবাই সরকারের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে এবং সরকারকে এর জন্য দায়ী করে। এতে করে এক ধরনের বৈরী অবস্থার সৃষ্টি হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা এক ব্যক্তির অপরাধের দায় সরকার নিয়ে জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ানোর চাইতে অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে জনগণের কাছ থেকে সাধুবাদ নেয়াটা যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সেটা আমি সরকারকে বুঝিয়ে দিতে চাই। আসক: অনেকেই আপনার নিয়োগকে দলীয় নিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী? ড. মিজান: আমি আওয়ামী লীগের সদস্য নই, আমি কখনও আওয়ামী লীগের রাজনীতিও করিনি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির ক্ষেত্রে যে বিভক্তি রয়েছে, সেখানে আমারও একটি বিশেষ দিকে ঝোঁক রয়েছে। একটি বিষয়ে বলতে পারেন আমার অন্ধ বিশ্বাস। সেটি হলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি- আমার আবেগ সেখানে জড়িত। তবে আমি এটা স্পষ্ট করতে চাই যে, আমি যেমন সরকারের কারও সঙ্গে এ নিয়ে তদবির করিনি, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকেও কেউ আমার কাছ থেকে কোনো দস্তখত নেননি। আমি মনে করি, আমাকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। আমারও সদিচ্ছা রয়েছে। আসক: আপনাকে আবারও অভিনন্দন এবং অসংখ্য ধন্যবাদ। ড. মিজান: আসককেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: শ্রাবন্তী শেগুফতা এবং সাঈদ আহমেদ