আইন-আদালত
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী রায়
আবু ওবায়দুর রহমান
২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দেয়া হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তবে হাইকোর্টের ঐ রায়ের ওপর কিছু সংশোধনী এবং পর্যবেক্ষণ থাকবে বলে আপিল বিভাগ জানান, যা রায় প্রকাশিত হওয়ার পর সবিস্তারে জানা যাবে। ৩ আগস্ট ২০০৫ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এবং বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন। সেই সাথে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৭ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমদ, বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েম এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ এবং তাদের কার্যক্রমকেও অবৈধ ঘোষণা করে। (বিস্তারিত দেখুন- আসক বুলেটিন ডিসেম্বর ২০০৫ এবং জুন ২০০৯)
পটভূমি
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী মামলা কোনো রাজনৈতিক কিংবা জনস্বার্থ মামলা নয়। অনেকটা কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসার ঘটনার মতো এই মামলার উদ্ভব। ঢাকার ওয়াইজঘাটে অবস্থিত পাক্-ইতালিয়ান মার্বেল কোম্পানির মালিকানাধীন ‘মুন সিনেমা হল’ সরকার অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা করে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে হস্তান্তর করে। মালিকপক্ষ হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নং-৬৭/১৯৭৬) দায়ের করার পর কোর্ট ১৯৭৭ সালের ১৫ জুন ‘মুন সিনেমা হল’ মালিককে ফেরত দিতে সরকারকে নির্দেশ প্রদান করেন। হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া চলা অবস্থায় ১৯৭৭ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক আইনের প্রক্লেমেশন দ্বারা মুন সিনেমা হলকে অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা করা হয়। ফলে ‘মুন সিনেমা হল’ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৭ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক শাসনামলের সকল কার্যক্রমের বৈধতা প্রদান করা হয়। এরূপ পরিস্থিতিতে ’মুন সিনেমা হল’ ফেরত পেতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা ছাড়া মালিকপক্ষের অন্য কোনো আইনি পথ খোলা ছিল না।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্য কর্তৃক সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর তৎকালীন মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। তার শাসনামলে সামরিক আইনের ফরমানকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেয়া এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা হ্রাস করাসহ নানাবিধ বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ খন্দকার মোশতাক আহমদ তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। বিচারপতি সায়েম মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে বিচারপতি সায়েম জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত করে তার কাছে ক্ষমতা হন্তান্তর করেন। বিচারপতি সায়েম এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে Collaborators (Special Tribunal) Order-1972 (১৯৭২ সালের দালাল আইন) বাতিল করা, সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ বাতিল করে প্রকারান্তরে দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রবর্তন করা, সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর সংশোধন, সংবিধানের মৌলিক বিষয়ের পরিবর্তন এবং ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৭ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক শাসনামলের সব কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়ার জন্য সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আনা হয়।

হাইকোর্টের রায়
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৭ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমদ, বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েমের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ ছিল বেআইনি এবং আইনবহির্ভূত। ঐ সময়ে তাদের কার্যক্রমের অংশ সব Proclamation, Martial law Regulations and Martial Law Orders-গুলো বেআইনি ছিল। ঐসব অবৈধ কার্যক্রমকে বৈধ করার জন্য সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীও ছিল অবৈধ। তবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং বাস্তবতার নিরিখে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে চতুর্থ সংশোধনীর যেসব বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছে তা মার্জনার আওতায় আসবে। যেসব বিধান সংবিধানের মৌলিকত্ব ধ্বংস করেছিল (অনুচ্ছেদ- ৬, ৮, ৯, ১০, ১২, ২৫, ৩৮ এবং ১৪২) তা কোনোক্রমেই মার্জনার আওতায় আসবে না। এছাড়াও যেসব কাজ গত হয়ে গেছে আর ফেরানো যাবে না, রাষ্ট্রের প্রয়োজন এবং স্বার্থের বিষয় বিবেচনা করে সেসব কাজকেও মার্জনা করা হয়। উপরোল্লখিত সিদ্ধান্ত প্রদানের পাশাপাশি হাইকোর্ট নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করে-
- সংবিধান, প্রচলিত আইন কিংবা সেনাআইনে সামরিক শাসনের অস্তিত্ব নেই বিধায় সামরিক আইন পদ্ধতি অবৈধ এবং অসাংবিধানিক।
- জরুরি অবস্থা শুধু সংবিধান মতে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করতে পারবেন।
- সামরিক আইন জারি এবং সামরিক ঘোষণা দ্বারা যে প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেছিল, তা বেআইনি। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনস্বরূপ সংবিধান অবশ্যই যে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে। সংসদ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং অন্য সব সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকবে।
- সংবিধান সংশোধনী বিলের শিরোনাম সংক্ষিপ্ত ছিল। আইনানুযায়ী শিরোনাম দীর্ঘ হওয়া বাধ্যতামূলক যাতে সংশোধনের উদ্দেশ্য সহজে বোঝা যায়। কিন্তু তা না করার ফলে অসৎ উদ্দেশ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, যা অবৈধ।
- যে কোনো প্রক্লেমেশন সংবিধানের আওতায় প্রচলিত কোনো আইনের বিষয়ে হতে পারে। কিন্তু ঐ সময়ের সামরিক শাসনামলের সব প্রক্লেমেশনে নতুন আইনের উদ্ভব ঘটায় এবং তা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল।
- ঐ সময়ের সকল প্রক্লেমেশন সংবিধানের মৌলিকত্ব, আইনের শাসন, কোর্টের এখতিয়ার খর্ব করেছিল।
- পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ঐ সময়ের যাবতীয় কাজকে অনুসমর্থন (Ratify) করা হয়েছিল। কিন্তু সংবিধানে অনুসমর্থনের কোনো বিধান নেই। আছে সংশোধনের। সুতরাং সংশোধনের নামে অনুসমর্থন ছিল অবৈধ।
উল্লেখ্য, প্রখ্যাত আইনজীবী মাহমুদুল ইসলামের মতে, গত হয়ে যাওয়া কার্যক্রম বলতে সামরিক আইনের বিচারে কারও ফাঁসি হয়ে যাওয়া, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, বাজেট প্রণয়ন ইত্যাদি বোঝায়।
আসক-এর দুটি মামলা
অবন্তী নুরুল
অনিবন্ধিত ব্লাড ব্যাংকের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপের প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ
অনিবন্ধিত রক্ত সঞ্চালন কেন্দ্রের তালিকা, এগুলোর বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ এবং নিবন্ধিত কেন্দ্রগুলো নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কিনা- এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তিন মাসের মধ্যে দাখিল করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন। একই সাথে আদালত অনিবন্ধিত রক্ত সঞ্চালন কেন্দ্রের (ব্লাড ব্যাংক) কার্যক্রম বন্ধে কেন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট এবং ব্লাড ব্যাংক হতে যথাযথভাবে পরিশোধিত না হওয়া রক্ত গ্রহণ করার ফলে হেপাটাইটিস ‘সি’-এ আক্রান্ত জনৈক আইনুর রশিদের দায়ের করা একটি রিট মামলায় বিচারপতি সৈয়দ মাহামুদ হোসেন এবং বিচারপতি এটিএম ফজলুল কবীরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
মামলায় ৪ নভেম্বর ‘প্রথম আলো’তে প্রকাশিত সংবাদের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সরকারি অনুমতি পাওয়া ব্লাড ব্যাংক রয়েছে মাত্র ২৫টি। এর মধ্যে ঢাকায় ২২টি এবং ঢাকার বাইরে সারা দেশে নিবন্ধিত ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র তিনটি। ঢাকা শহরের অলিগলিতে এবং ঢাকার বাইরে প্রচুরসংখ্যক অনিবন্ধিত তথাকথিত ব্লাড ব্যাংক তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। শহরের এসব অনিবন্ধিত ব্লাড ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত পাঁচটি ঘাতক ব্যাধি (এইচআইভি/এইডস্, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, ভাইরাস, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়া) পরীক্ষা করা হয় না। সেই সাথে মানা হয় না রক্তদাতা নির্বাচনের পূর্বশর্ত। পেশাদার রক্তদাতা এমনকি শিশুদের ও কম বয়স্ক মানুষের কাছ থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এসব ব্লাড ব্যাংকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। চিকিৎসকের নামে যারা থাকেন তারা রক্তদাতা ও গ্রহীতার রক্তের প্রকৃত ক্রস ম্যাচিংয়ের পূর্বেই ক্রস ম্যাচিংয়ের ফরমে সই করে রাখেন। এসব কেন্দ্রে নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, নেই পোস্ট ডোনেশন রুম, পরিবেশও নোংরা। সন্ধানী, বাঁধন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মতো সংগঠনগুলোরও নেই কোনো কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার। এমনকি এসব সংগঠন এখনো বিনা লাইসেন্সেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া ঢাকা শহরের বড় বড় হাসপাতালগুলোর অনেকগুলোতেও ব্লাড ব্যাংক নেই। অথচ এসব হাসপাতালে প্রতিদিনই জটিল অপারেশন হচ্ছে। ঢাকার চানখারপুল, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর রোড, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা, আজিজ সুপার মার্কেট, পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল সংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য ব্লাড ব্যাংক। এসব ব্লাড ব্যাংক দূষিত রক্ত বিক্রি করছে উচ্চ মূল্যে। আবার কোথাও কোথাও ফার্মেসি বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রক্ত সরবরাহ করে, তা বিভিন্ন হাসপাতালে বিক্রি করা হচ্ছে। অনিরাপদ এসব রক্ত গ্রহণের ফলে মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মামলার বাদী আইনুর রশিদও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কর্তৃক পরিচালিত একটি ব্লাড ব্যাংক থেকে পরিসঞ্চালিত রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হন বলে উল্লেখ করা হয়।
অথচ নিরাপদভাবে রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য রয়েছে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন ২০০২ ও বিধিমালা ২০০৮ এবং এই আইনে লাইসেন্স ছাড়া ব্লাড সেন্টার পরিচালনা, ভুল ব্যবস্থাপত্র প্রদান, অননুমোদিত পদ্ধতিতে রক্ত পরিসঞ্চালন, বিনষ্টযোগ্য উপকরণ বিনষ্ট না করা, এসব উপকরণ পুনরায় ব্যবহার করা, অনিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন, অননুমোদিত উপায়ে রক্ত, রক্তের উপাদান ও রক্তজাতসামগ্রী সংগ্রহ উৎপাদন ও বিতরণ, অননুমোদিত ব্যক্তি কর্তৃক রক্ত পরিসঞ্চালন, রক্তদাতার ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার এবং অতিরিক্ত সেবা ফিস আদায় ইত্যাদি বিষয়গুলোকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখও করা হয়েছে।
আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে যে, একটি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র, শুধু লাইসেন্স থাকা সাপেক্ষে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারবে আর বিধিমালা ২০০৮-এ বলা হয়েছে যে, রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রে রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক বা চিকিৎসা কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ, টেকনিক্যাল সুপারভাইজার, রেজিস্টার্ড নার্স ও ল্যাব সহকারী থাকতে হবে।
একই বিধিতে প্রতিটি ব্লাড সেন্টারে রক্তের নমুনা পরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির একটি বিস্তারিত তালিকা এবং রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ প্রণালিসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতির বিস্তারিত ম্যানুয়াল অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এসব বিষয়ের প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়েই লাইসেন্সবিহীন এসব ব্লাড ব্যাংক অবৈধভাবে তাদের কর্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ নিয়ে সরকারেরও কোনো মাথাব্যথা নেই এবং এ বিষয়ে তারা কোনো নিয়মিত ও সুষ্ঠু তদারকিও করছে না। যদিও নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইনানুসারে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য ‘জাতীয় নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কাউন্সিল’ গঠিত হবে এবং এই আইনের ৫ ধারায় এইচআইভি ভাইরাস হেপাটাইটিস বি, সি, ম্যালেরিয়া এবং সিফিলিসসহ সর্বপ্রকার রক্তবাহিত রোগ হতে মানবদেহকে রক্ষার জন্য নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিসঞ্চালনের পদ্ধতি নির্ধারণ, বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নীতিমালা প্রণয়ন, পেশাদার রক্তদাতাদের রক্তদানে পর্যায়ক্রমে নিরুৎসাহিতকরণ সম্পর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রগুলোতে পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়ন প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করবে এবং আইনের ২৯ ধারার বিধান অনুযায়ী এ কাউন্সিলের সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে সহায়তার জন্য রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যাবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এই আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র স্থাপনের পূর্বশর্ত লাইসেন্স প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর। আইনে বলা হয়েছে যে, নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও ফরমে কর্তৃপক্ষের কাছে লাইসেন্সের আবেদন করতে হবে। আর ৯(৫) ধারা মতে, এই আইন বলবৎ-এর পূর্বে যে রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রগুলো ছিল সেগুলোকে এই আইন কার্যকর হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে বলে উল্লেখ আছে। আইনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এরূপ কোনো আবেদন যদি করা না হয়ে থাকে অথবা লাইসেন্স গ্রহণের পূর্বশর্ত যদি সঠিকভাবে পূরণ না হয় তবে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ ৯(২) ধারা মোতাবেক বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের যাবতীয় কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করবে। এছাড়া আইনের ১৫ ধারার অধীনে সরকার বেসরকারি পরিসঞ্চালন কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের জন্য এক বা একাধিক পরিদর্শন কমিটি গঠন করতে পারবে এবং ১৬ ধারা অনুযায়ী এই কমিটি বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রগুলো আইন বা বিধি মোতাবেক নির্ধারিত শর্তাবলি পালন করছে কিনা কিংবা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করছে কিনা তা পরিদর্শন করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিদর্শনকালে এই কমিটি যদি দেখতে পায় যে, কোনো বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র আইনানুযায়ী কাজ করছে না বা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করেছে তাহলে ১৫ দিনের মধ্যে কমিটি লিখিতভাবে জানাবে এবং সরকার জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার প্রয়োজন হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য নির্দেশ দিতে পারবে।
কিন্তু আইন ও বিধিমালায় নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের সব বিধান থাকার পরও বিবাদীরা তাদের আইনসঙ্গত দায়িত্বগুলো পালন এবং অবৈধ এসব ব্লাড ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। ফলে নাগরিকের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার সাংবিধানিক অধিকার দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
শহীদেরটেক বস্তির স্থাপনা অপসারণের নোটিশ প্রদান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না মর্মে সরকারের প্রতি হাইকোর্টের রুল জারি
বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যতিরেকেই গত ১৪ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে সরকারের গণপূর্ত বিভাগ লিখিত নোটিশ জারির মাধ্যমে আগারগাঁও এলাকার শহীদেরটেক বস্তিতে নোটিশ জারির দশ দিনের মধ্যে বস্তি থেকে সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দিলে উচ্ছেদের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে বস্তিবাসীদের পক্ষে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও চারজন বস্তিবাসী গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের সচিব, ঢাকার ডেপুটি কমিশনার, পুলিশের আইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এবং শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিবাদী করে একটি রিট মামলা দায়ের করলে মহামান্য হাইকোর্ট এই অপসারণের নোটিশ প্রদান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না মর্মে সরকারের প্রতি হাইকোর্টের রুল জারি করেন।
মামলার আরজিতে বলা হয়, শেরেবাংলা নগর থানাধীন পূর্ব আগারগাঁওয়ের সরকারি জায়গা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত প্লটেই এ আনুমানিক দুই হাজার একশ’ ভূমিহীন মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে ২০-২৫ বছর যাবৎ বসবাস করছে। উক্ত বস্তিতে ইউনিসেফের শিক্ষা কার্যক্রম, ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং আশা, পদক্ষেপ প্রভৃতি এনজিওর ক্ষুদ্র কর্মসূচি রয়েছে। গত ১৪ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ও ডেপুটি কমিশনার তার স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে বস্তিবাসীদের অনতিবিলম্বে বস্তির অভ্যন্তরস্থ সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ প্রদান করেন। অন্যথায় আইনানুগ প্রক্রিয়ায় উক্ত স্থাপনাগুলো অপসারণ করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন, যদিও পুনর্বাসন ব্যতীত যে কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রমকে আইনবহির্ভূত ঘোষণা করে এর আগে মহামান্য হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন (১৯ বিএলডি ১৯৯১)।
আবেদনে বলা হয়, সরকার যেক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই বস্তিবাসীসহ শহুরে বাস্তুহারাদের বিকল্প বাসস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সেক্ষেত্রে বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা না করেই নতুন করে বস্তি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সরকার কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনারই পরিপন্থী এবং তা সরকারের পুনর্বাসন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে। সেই সাথে উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে শিশু, মহিলা, বৃদ্ধসহ প্রায় দুই হাজার একশ’ মানুষ সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় পড়বে এবং তাদের জীবনধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। এরূপ উচ্ছেদের ফলে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এই বস্তির বাসিন্দারা সংবিধান কর্তৃক নিশ্চিতকৃত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
আদালতের নির্দেশ
শুনানি শেষে বিচারপতি মমতাজউদ্দিন আহমেদ ও বিচারপতি নাইমা হায়দারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ উক্ত বস্তির স্থাপনা অপসারণের নোটিশ প্রদান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর জন্য সরকারের প্রতি রুলনিশি জারি করেন। একই সাথে আদালত ৪ জুন ২০১০ পর্যন্ত বস্তি উচ্ছেদ না করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন।
ফতোয়ার নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন
হাইকোর্টের আদেশ ও প্রশাসনের নীরবতা
রোকেয়া চৌধুরী
২৫ আগস্ট ২০০৯ বিচারপতি সৈয়দ
মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ গ্রাম্য সালিশে ‘ফতোয়ার’ নামে অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত শাস্তি আরোপ এবং প্রয়োগ রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন (রিট পিটিশন নং ৫৮৬৩/২০০৯)। পাশাপাশি প্রশাসনের জ্ঞাতসারে অবৈধ শাস্তি, দোররা মারা, প্রহার ও বেত্রাঘাত করা প্রতিরোধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- মর্মে রুল জারি করেন।
ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার পরিপন্থী এসব শাস্তি বন্ধ ও এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা চেয়ে পাঁচটি মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্র্যাক ও নিজেরা করি রিট আবেদনটি দায়ের করে। 
স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিচালককে পক্ষভুক্ত করে উক্ত রিট আবেদনে বলা হয়, ফতোয়ার নামে অবৈধ শাস্তি প্রদান আইন ও মৌলিক অধিকার- এর পরিপন্থী এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সংবিধান অনুযায়ী আইনের সমান আশ্রয় লাভ প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং কোনো ব্যক্তিকেই নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না। ফতোয়ার মাধ্যমে অবৈধ শাস্তি আরোপ ও প্রয়োগ সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(২) ও ৪৩ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। বাংলাদেশে ফতোয়ার নামে যে ধরনের শারীরিক নির্যাতন করা হয়, তা ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির স্বেচ্ছাকৃত আঘাত ও স্বেচ্ছাকৃত গুরুতর আঘাত সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর অধীনে দণ্ডনীয় অপরাধ। দণ্ডবিধির ৩২৪ ও ৩২৬ ধারায় মারাত্মক অস্ত্র বা অন্য কোনো মাধ্যমের সাহায্যে স্বেচ্ছাকৃত আঘাত ও গুরুতর আঘাতের জন্যে পৃথক শাস্তির বিধান আছে। কোনো ব্যক্তিকে দৈব আক্রোশের ভয় দেখিয়ে আইনানুগ কোনো কাজ থেকে বিরত থাকতে অথবা আইন পরিপন্থী কোনো কাজ করতে বাধ্য করা ধারা ৫০৮-এর অধীনে দণ্ডনীয় অপরাধ (অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড)।
গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে ছোটখাটো ঘরোয়া বিরোধ নিষ্পত্তি বাংলাদেশে অপ্রচলিত নয়। কিন্তু ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা ফতোয়ার নামে অবৈধ শাস্তি, দোররা, বেত্রাঘাত, হিল্লা বিয়ে, এক ঘরে করে রাখার মতো নির্মম ও বর্বর শাস্তি প্রদান করে থাকে। বিচারিক ক্ষমতাহীন এসব সমাজপতি ও ধর্মীয় নেতাদের বিচার এবং আরোপিত শাস্তির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানুষের ধর্মভীরুতা, অজ্ঞতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে আইনবিরোধী এসব শাস্তি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ধর্ষণের বিচার করতে বসে ধর্ষিতাকে দোররা মারা অথবা ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেয়ার মতো ঘটনাও বিরল নয়। ফতোয়ার নামে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু অথবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে আত্মহত্যার সংখ্যা অনেক। স্থানীয় প্রভাবশালীদের দাপটে এসব ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই চাপা পড়ে যায়। প্রাথমিক তদন্ত শুরু হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতিতের পরিবার মীমাংসা করতে বাধ্য হয়। স্থানীয় প্রশাসন জমায়েত বা সালিশের খবর পেলেও অথবা অনেক ক্ষেত্রে শাস্তি কার্যকর করা হবে জেনেও কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয় না। এমনকি, সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাও সালিশে অংশগ্রহণ করে থাকেন।
ধর্মীয় ও সামাজিক শাসনের নামে অবৈধ শাস্তির শিকার হয় প্রধানত নারীরাই। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা হতে সংগৃহীত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী ২০০২ সালে ৩৯ জন, ২০০৩ সালে ৪৪ জন, ২০০৪ সালে ৫৯ জন, ২০০৫ সালে ৬৯ জন, ২০০৬ সালে ৬৬ জন, ২০০৭-এ ৭৭ জন, ২০০৮-এ ২১ জন এবং ২০০৯-এ ৪৮ জন মহিলা ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতিত হন। পত্রিকাসূত্রে প্রাপ্ত আসক-এর তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী- ২০০৯ সালে মৌখিক তালাক, প্রেম, বিয়ের আগে অন্তঃসত্ত্বা হওয়া, ধর্ষণ, অন্য ধর্মের পুরুষের সাথে কথা বলা, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ‘কুপ্রস্তাব’-এ অস্বীকৃতি, কুচরিত্র এসব অভিযোগে তিনটি হিল্লা, বিশটি দোররা, পাঁচটি একঘরে করা, পাঁচটি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, দুটি তালাকের ফতোয়া দেয়া হয়।
ফতোয়ার বৈধতা নিয়ে ২০০০ সালে অপর একটি রিট আবেদনে (রিট আবেদন নং-৫৮৯৭/২০০০) বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ১ জানুয়ারি ২০০১-এ ফতোয়া নিষিদ্ধ ও অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। আদালত রায়ে বলেন, ‘ফতোয়া’ অর্থ আইনত ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিমত। বাংলাদেশে মুসলিম আইন ও অন্যান্য বিদ্যমান আইনে বিচারিক মতামত দেয়ার ক্ষমতা এবং এখতিয়ার শুধু আদালতেরই আছে। তাই ফতোয়ার নামে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার যে পুনরাবৃত্তি ঘটছে তার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
ফতোয়ার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান অবৈধ এবং এ মর্মে প্রশাসনকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে আদালতের আদেশের পরও ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতন চলছে। ২০০০ সালের রিট আবেদনটি ছিল একটি হিল্লা বিয়েকে কেন্দ্র করে, ২০০১ সালে মামলার রায়ের প্রায় ছয় বছর পর ২০০৭ সালে বগুড়ার তাঁতিপাড়ায় এক মাসে ষোলোটি হিল্লা বিয়ের ঘটনা ঘটে (দৈনিক প্রথম আলো, ৭ মে ২০০৭)। ২০০৯ সালের রিট আবেদনে রুল জারির দিন বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় অসামাজিক কাজে জড়িত আছে- এ অভিযোগে এক গৃহবধূকে ১০১টি দোররা মারা হয়। এরপর রাজশাহী, কেশবপুর, নীলফামারী, টাঙ্গাইল, নড়াইলে সালিশে হিল্লা বিয়ে, একঘরে করা ও দোররা মারার বেশ কয়েকটি ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
কোনো ক্ষেত্রেই প্রশাসন বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং ৪ মার্চ ২০১০ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যসূত্রে জানা যায়, রংপুরে এক পুলিশ কর্মকর্তা চিড়িয়াখানায় ও পার্কে বিনোদনের উদ্দেশ্যে আসা ছেলেমেয়েদের (অনেকের অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন) হয়রানিমূলকভাবে গ্রেফতার করেন এবং গ্রেফতারকৃত মেয়েদের বোরখা পরতে আদেশ দেন। বোরখা পরতে বাধ্যবাধকতা আরোপের এ ঘটনায় তিন আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ উক্ত কর্মকর্তাকে হাজিরার আদেশ দেন।
২০০০ সালের রিট আবেদনে আদালত ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। ২০০৯ সালে রুলে আদালত সুনির্দিষ্টভাবে স্থানীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে ফতোয়ার মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে আদেশ দেন। হাইকোর্ট বিভাগের এ দুটি সুনির্দিষ্ট আদেশের পরও স্থানীয় প্রশাসনকে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হতে দেখা যাচ্ছে।