- ASK Bulletin 2010
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   নারী
   তদন্ত
  আইনি-সংবাদ
   ফলোআপ
   সংখ্যাচিত্র

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

আইনি-সংবাদ


আধুনিক নগরায়নে কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা: সমস্যা ও সমাধান


মেফতাহুল জান্নাত

অন্যতম প্রধান শর্ত এর কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। উন্নত দেশে নগর পরিকল্পনা ও ভবনের নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, ঢাকা মহানগরীর অধিকাংশ বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আবার যেসব ভবনে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে, অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তা তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য নেই কোনো প্রস্তুতি।

সামপ্রতিক সময়ে মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটিতে আগুন লেগে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে একই পরিবারের সাতজনের মৃত্যুর ঘটনাটি যেমন হৃদয়বিদারক, তেমনি আমাদের নগরজীবনে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের গরীব এন্ড গরীব সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ২১ জন শ্রমিক প্রাণ হারালেন। উল্লিখিত ঘটনা দুটিতেই প্রাণহানি ঘটেছে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। অর্থাৎ ভবন দুটিতে পর্যাপ্ত ‘ফায়ার এক্সিট’ না থাকা বা থাকলেও তা তালাবদ্ধ রাখার কারণে প্রচণ্ড ধোঁয়া আর অক্সিজেনের অভাবে এতগুলো মানুষকে জীবন হারাতে হলো। অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান আছে যে, প্রতিটি ভবনে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার উপযোগী জরুরি নির্গমন পথ থাকতে হবে। আবার ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ দেশের বৃহত্তম শপিং মল বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সের উপরের সাতটি তলা পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিহত হন সাতজন, আহত হন শতাধিক। এখানে দেখা যায়, বিকল্প সব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো সেগুলোর ব্যবহার করা যায়নি। কারণ, এগুলোর তত্ত্বাবধানে যারা ছিলেন তাদের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না। অথচ আইনের বিধান হলো- বহুতল ভবনগুলোতে নিয়মিত অগ্নি প্রতিরোধ সংক্রান্ত মহড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বলাবাহুল্য, এধরনের মহড়া প্রায় হয় না বললেই চলে। ফলে বরাবরই প্রাণ হারাতে হয় নিরীহ মানুষকে।
অগ্নিকাণ্ড যে কোনো কারণে ঘটতে পারে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার চিত্রটি বারবার প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। আধুনিক নগর ব্যবস্থার এমন অপরিকল্পিত ব্যবস্থার চিত্র অবশ্যই প্রশ্নবোধক। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও নির্বাপণে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধানগুলো এখানে তুলে ধরা হলো:
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, নির্বাপণ ও অগ্নিকাণ্ড থেকে উদ্ধার কার্যের লক্ষ্যে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩ প্রণীত হয়। এই আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী যেসব এলাকায় এই আইন কার্যকর হবে, সরকার সেখানে এক বা একাধিক অগ্নিনির্বাপণ ব্রিগেড সংরক্ষণ করবে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি, কোনো ভবন বা স্থানকে মালগুদাম বা কারখানা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলে তাকে এই আইনের অধীনে ফায়ার ব্রিগেডের মহাপরিচালকের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। ধারা ৭ অনুযায়ী, অগ্নি প্রতিরোধ, নির্বাপণ ও সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত বিষয়ে মহাপরিচালকের ছাড়পত্র ব্যতীত কোনো বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদন বা অনুমোদিত নকশার পরিবর্তন করা যাবে না। এই আইনের অধীন দণ্ডনীয় অপরাধ আমলযোগ্য (পড়মহরুধনষব) অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের বিধান লঙ্ঘন করে কোনো ভবন বা স্থানে দাহ্যবস্তু সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ বা বাছাই করেন তবে তিনি অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ড এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া উক্ত দাহ্যবস্তু সরকার বরাবর বাজেয়াপ্ত হবে।

অপরদিকে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬ (সংশোধনী ২০০৬)-এ আবাসিক, বাণিজ্যিক, সমাবেশস্থল, জাতীয় ইমারত, শিল্প ইমারত, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের ইমারত নির্মাণের জন্য বিশেষ বিধান দেয়া হয়েছে। বিধি ১৭(১) অনুযায়ী, ইমারতের মেঝের যে কোনো অবস্থান থেকে ২৫ মিটারের মধ্যে জরুরি নির্গমন পথ থাকতে হবে এবং এই নির্গমন পথ সিঁড়ির লবি ও লিফট লবি থেকে পৃথক ও নিচতলার সাথে সংযুক্ত হতে হবে। এছাড়া ইমারতের যে কোনো প্রকাশ্য স্থানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা এদের প্রয়োগ বিধিসহ স্থাপন করতে হবে। ইমারতে অবস্থানকারীদের ত্বরিত ইমারত ত্যাগের নির্দেশ জ্ঞাপক ‘ফায়ার অ্যালার্ম’ প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এছাড়া সাত বা ততোধিক তলাবিশিষ্ট ইমারতের ক্ষেত্রে জাতীয় ইমারত নির্মাণ কোড অথবা অগ্নি প্রতিরোধ দপ্তর অনুমোদিত অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও নির্বাপণে বিদ্যমান সমস্যাগুলো
বিদ্যমান আইনে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং যথাযথ তদারকি ও পরিদর্শনের অভাবে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। জাপান গার্ডেন সিটিতে আগুনের শিকার ভবনটিতে ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকলেও পানির সংযোগ ছিল না, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সবগুলো ছিল অকেজো। বহুতল ভবনে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও ভবন নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ এসব নিয়মনীতি না মেনেই করছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। বহুতল ভবন ও কারখানায় জরুরি নির্গমন পথ রাখার বিধান আইনে থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এছাড়া গৃহায়ন প্রকল্পগুলোতে অপ্রশস্ত সড়ক নির্মাণের ফলে ফায়ার ব্রিগেডের দুর্ঘটনাস্থলে ত্বরিত পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক ব্যবহারেরও প্রস্তুতি নেই অধিকাংশ ভবনে। বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণের জন্য পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণের বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে কীভাবে রক্ষা পেতে হয়, কী ব্যবস্থা নিতে হবে- এ সংক্রান্ত কোনো মহড়া আমাদের অধিকাংশ বহুতল ভবনে করা হয় না। বুয়েটের উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, অনেক আধুনিক ২০-২৫ তলা ভবনের সিঁড়ি মাত্র একটি, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ (সূত্র : ১৪ ফেব্রুয়ারি ’১০, দৈনিক কালের কণ্ঠ)। বিকল্প সিঁড়ি বা ফায়ার স্টেয়ার যে কোনো দুর্ঘটনা থেকে রক্ষার জন্য অপরিহার্য। এ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, অগ্নিকাণ্ডের ফলে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে যে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, রাজধানীর আধুনিক আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোও তা থেকে খুব একটা নিরাপদ নয়।

পরিত্রাণের উপায়
উন্নত দেশগুলোতে সব বহুতল ভবনে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকার ফলে অগ্নিকাণ্ড থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করলে আমাদের দেশেও অগ্নি প্রতিরোধ ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে-
১. রাজউক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ সংক্রান্ত বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদারকি জোরদার করতে হবে।
২. প্রতিটি বহুতল ভবনে জরুরি নির্গমন সিঁড়ি ও নিজস্ব কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করতে হবে।
৩. বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা যাতে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত থাকে সে ব্যাপারে প্রতিনিয়ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
৪. ভবনে আগুন লাগলে তা যেন দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে এ ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া এবং ভবন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এ সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর নিয়মিত অনুসন্ধান ও পরীক্ষা অব্যাহত রাখতে হবে।
৫. ফায়ার সার্ভিস ও দমকল বাহিনীর আধুনিকায়ন ঘটাতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি দমকল বাহিনীর সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে হবে।
দুর্ঘটনার ওপর নিয়ন্ত্রণ সাধ্যাতীত হলেও এর কারণ সীমিতকরণ এবং এর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ আমাদের সাধ্যাতীত নয়। ব্যাপক জনসচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতাই পারে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে।

১. তথ্যসূত্র: দৈনিক আমার দেশ, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১০।


সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রচলিত আইনকে যুগোপযোগী করতে হবে

ইসরাত জাহান তামান্না


গত ৩ ফেব্রুয়ারি ’১০ সকাল ১১টায় উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সামনের সড়কে মধুমতি পরিবহনের একটি বাসের চাপায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় ছয় বছর বয়সী হামিম শেখ। এ ঘটনায় তার মা সোনিয়া শেখ চোখে গুরুতর আঘাত পান। পুলিশ চালকসহ বাসটি আটক করে, পরে রমনা থানায় এ বিষয়ে মামলা হয়।

হামিমের মৃত্যুর দু’দিন পরেই গত ৫ ফেব্রুয়ারি ’১০ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সংলগ্ন পুরনো বিমানবন্দর সড়কে মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়ে বাসচাপায় মৃত্যু হয় সাত বছরের শিশু সুমি আক্তারের। ওই দুর্ঘটনায় ১৪ মাস বয়সী শিশুপুত্র হাসানসহ আহত হন সুমির মা হাসিনা বেগম।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা খুব সাধারণ চিত্র। ঢাকা মহানগর পুলিশের সূত্রমতে, ২০০৯ সালে ঢাকা মহানগরে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৫২টি। মারা গেছে ৩২৪ জন এবং আহত হয়েছে ২৭২ জন। চালকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৪০টি আর পথচারীর কারণে ঘটেছে ১২টি। উক্ত বছরে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬১৭টি। এর মধ্যে ২১৯টির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। অভিযোগপত্র দিয়েছে ২৪১টির। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, থানায় মামলা হয়েছে ৪,৪২৬টি। দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৭৬৪ জন, আহত হয়েছে ৩,২৮৪ জন। বুয়েটের গবেষণায় দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, পথচারী ও যাত্রীদের অসাবধানতাসহ ১৭টি কারণ চিহ্নিত করা হয়। ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বছর মাত্র ১৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে যা ২০০৮ সালের বা তারও আগের। এর মধ্যে ৮টিতে আসামি খালাস পেয়ে গেছে আর সাজা হওয়া ১১টিতে সামান্য কিছু অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে, একজনেরও কারাদণ্ড হয়নি। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি ’১০)

সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিশু মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে বিদ্যমান আইনকে যুগোপযোগী করার বিষয়টি বর্তমানে আলোচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রচলিত আইন ও এর সীমাবদ্ধতার দিকে এখানে আলোকপাত করছি।
দণ্ডবিধির ২৭৯ ধারায় বলা হয়েছে, জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা কোনো ব্যক্তি আহত হতে পারে এমনভাবে রাস্তায় বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যের সাথে গাড়ি চালালে, তার যে কোনো বর্ণনার কারাদণ্ড যার মেয়াদ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ড যার পরিমাণ সর্বনিম্ন এক হাজার এবং সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে অথবা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

এ ধারার ব্যাখায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি আপাতত বলবৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করে যানবাহন চালায় তাহলে এ ধারার অধীনে বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যের সাথে যানবাহন চালনা করেছেন বলে বিবেচিত হবেন।

আমাদের দেশে চালকেরা প্রতিনিয়ত এ বিধান লঙ্ঘন করে কিন্তু মধ্যস্থতা হয়ে যাওয়ার কারণে সাধারণত এ ধারার অধীনে মামলা দায়ের করা হয় না। মামলা দায়ের হলেও অভিযোগপত্র না দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি করা হয়।

সাধারণত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩০৪খ ধারায় মামলা হয়। এখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি রাস্তায় বেপরোয়া বা অবহেলার সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে দণ্ডার্হ নরহত্যা নয় এমন মৃত্যু ঘটায় তাহলে সেই ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

আবার দণ্ডবিধির ৩৩৮ক ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়াভাবে বা তাচ্ছিল্যের সাথে গাড়ি চালানোর জন্য যদি কারো জীবন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন হয় তাহলে উক্ত চালক দুই বছর পর্যন্ত যে কোনো কারাদণ্ডে এবং সেই সাথে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারেন।

আমরা যদি ২৭৯, ৩০৪খ এবং ৩৩৮ক ধারার দিকে একটু লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে, সাধারণ দুর্ঘটনার (যা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করতে পারে) ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের কারাদণ্ড, অন্যদিকে দুর্ঘটনার মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানোর শাস্তিও সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, যা এই আইনের অন্যতম দুর্বলতা। সাধারণ দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনার ফলে মৃত্যু ঘটানোর শাস্তি কখনোই এক হতে পারে না। দু’ক্ষেত্রেই অপরাধটি জামিনযোগ্য।

অভিনেত্রী, আইনজীবী ও সংসদ সদস্য তারানা হালিম মনে করেন, বেপরোয়া যান চালানোর লাগাম টেনে ধরার জন্য দণ্ডবিধির ৩০৪-খ ধারা সংশোধন করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে বেপরোয়া যান চালানোর ফলে মৃত্যু ঘটানোর সাজা কমপক্ষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা উচিত। অথবা এ বিষয়ে বিদ্যমান আইনের সব ফাঁকফোকর ঢেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষ আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। যেখানে যানবাহন চলাচলজনিত সব অপরাধ অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং বেপরোয়া যান চালনার মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানোর সাজা কমপক্ষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে, সেখানে দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের পরিবারকে চিকিৎসা খরচ এবং পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও আনুষঙ্গিক সহায়তা দেয়ার বিধানও থাকবে। অন্যদিকে ৩০৪-খ ধারায় কিংবা বিশেষ আইনে অপরাধটি জামিন অযোগ্য করতে হবে। ঘাতক যান ও চালককে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারের জিম্মায় রাখতে হবে। এ সময়টুকুতে তাদের কোনোভাবে মালিকের জিম্মায় দেয়া যাবে না। কারণ, এটা তাদের পুনরায় অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত করে। তবে কাজটা সহজ হবে না। কারণ, বাস-ট্রাক-চালক-মালিক ঐক্য সমিতির ঐক্যবদ্ধ ও অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন এবং অব্যাহত ধর্মঘটের মুখে ১৯৮২-৮৫ পর্যন্ত সময়ের তৎকালীন সরকারকে বেপরোয়া যান চালিয়ে মৃত্যু ঘটানোর সাজা দুই দফায় কমিয়ে ১৪ বছর থেকে তিন বছরে নিয়ে আসতে হয়। তারানা হালিম আরও বলেন, প্রয়োজনে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমাদের আন্দোলন শুধু ঘাতকের বিরুদ্ধে, নিয়ম মেনে চলা চালকের বিরুদ্ধে নয়। এছাড়াও তিনি দুর্ঘটনা সংক্রান্ত আইন সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে একটি নোটিশ পাঠান। নোটিশের জবাবে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় বেশিরভাগ মৃত্যুই ঘটে চালকদের অসাবধানতায়। কিন্তু আইনের দুর্বলতার কারণে হত্যাকারী জামিনে বের হয়ে যায়। দণ্ড কম থাকায় চালকদের মধ্যে কোনো ভীতি সৃষ্টি হয় না। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আইনটি সংশোধনের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে চিত্রনায়ক ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’র (নিসচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন- সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রচলিত আইনের সংশোধন কিংবা বিশেষ আইন প্রণয়নের যে কথাটি বর্তমানে আলোচিত হচ্ছে তার সঙ্গে তিনি একমত। তিনি আরও বলেন, ঘাতক চালককে শাস্তি দান বা শাস্তি বাড়ানোই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান নয়, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে চাইলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দিতে হবে তা হলো: পথচারীকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে এবং তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে; সেতু ও সংযোগ সড়কগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে, রোড-লাইটগুলো সঠিকভাবে প্রদর্শন করতে হবে, ফিটনেসবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন কিংবা অবৈধ পন্থায় সংগৃহীত লাইসেন্সপ্রাপ্ত গাড়ির চলাচল ঠেকাতে হবে, রাস্তা পারাপারের সময় মুঠোফোনে কথা বলা যাবে না। তিনি বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক মানে দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক।’ উল্লেখ্য, চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ফলস্বরূপ রাজধানীর কাকরাইলে তিনি একটি ড্রাইভিং ইনস্টিটিউট চালু করেছেন।

অন্যদিকে বিদ্যমান আইন সংশোধনের বিপক্ষে বাসচালক ও মালিকেরা। বেশিরভাগ বাস-মালিক ও চালকরা দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএর গাফিলতিকে দায়ী করছে। তারা বলেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি মানা হয় না। অদক্ষ কিংবা শিক্ষানবিশ চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হয়। কিছু টাকা-পয়সা দিলেই একটি লাইসেন্স যোগাড় করা কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। তাই শাস্তি বাড়ানো নয় বরং বিদ্যমান অনিয়ম দূর করতে পারলেই দুর্ঘটনা কম ঘটবে বলে বাস-মালিক ও চালকরা মনে করে।

দুর্ঘটনার ব্যাপকতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত কিছু দিনের মধ্যে হামিমসহ বেশ কয়েকজন শিশু দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার কারণে ৭ ফেব্রুয়ারি ’১০ বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি বোরহানউদ্দিনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) রুল জারি করেছেন। স্বরাষ্ট্রসচিব, যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক), বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান ও পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ ৮ জনকে তিন সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। মিনিবাস ও ট্রাকের বৈধ লাইসেন্স নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে কার্যকর করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- মর্মে সরকারের প্রতি এই রুল জারি করা হয়।

 

ভিন দেশে অবস্থানরত পলাতক আসামির প্রত্যর্পণ

ফারহানা লোকমান


কোনো রাষ্ট্রের এখতিয়ার তার নিজ রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্য রাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্যক্তির ওপর সেই রাষ্ট্রের এখতিয়ার নেই। এখন কোনো গুরুতর অপরাধ করে কোনো অপরাধী যদি অন্য কোনো রাষ্ট্রে পালিয়ে যায় তবে কি সে বিনা বিচারে পার পেয়ে যাবে? সামপ্র্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বহুল আলোচিত হচ্ছে।

গত ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ৩০ জানুয়ারি দৈনিক সমকালে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাকি সাতজনের মধ্যে আজিজ পাশা মৃত এবং লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ লিবিয়ায়, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম হংকংয়ে, লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং মেজর (অব.) নূর চৌধুরী কানাডায়, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে মোসলেহ উদ্দিন ভারতে অবস্থান করছে।

আন্তর্জাতিক আইনে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি থাকলে বা পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে অবস্থানরত অপর একটি রাষ্ট্রের আইন দ্বারা অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত অপরাধীকে নিজ রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ বা হস্তান্তর করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটির নাম বহিঃসমর্পণ। পলাতক অপরাধীকে বিচারের জন্য অথবা অপরাধীর অনুপস্থিতিতে তার বিচার হয়ে গেলে শাস্তি কার্যকর করার জন্য তার সমর্পণ দাবি করা যায় এবং যে রাষ্ট্রের অপরাধটি বিচার করার এখতিয়ার আছে সেই রাষ্ট্রই কেবল সমর্পণ দাবি করতে পারে। বাংলাদেশের সরকার এই প্রক্রিয়ায় নূর চৌধুরীসহ অন্য পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করছে।

বহিঃসমর্পণ সাধারণত বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ১৯৩৩ সালে বহিঃসমর্পণ নীতির ওপর স্বাক্ষরিত ‘গড়হঃবারফবড় ঞৎবধঃু্থ অনুযায়ী চুক্তি থাকলেই কেবল একটি রাষ্ট্র অপরাধীকে ফিরিয়ে আনার জন্য দাবি জানানোর অধিকারী হয় এবং অন্য রাষ্ট্রটির ওপর তাকে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব অর্পিত হয়। চুক্তির অনুপস্থিতিতে বহিঃসমর্পণ একটি রাষ্ট্রের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তার ওপর কোনোরূপ বাধ্যবাধকতা থাকে না, তবে কোনো রাষ্ট্র অপরাধীকে ফেরত পাঠাতে চাইলে আইনগত কোনো বাধা নেই বরং অপরাধীর রাষ্ট্র তাকে গ্রহণে বাধ্য।

বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে বহিঃসমর্পণ আইন নামে একটি আইন প্রণীত হয়। এই আইন দ্বারা বাংলাদেশের সাথে চুক্তি আছে এমন রাষ্ট্রগুলো হতে অপরাধীদের ফিরিয়ে আনা ও রাষ্ট্রগুলোতে অপরাধীকে সমর্পণ করা এবং যে রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি নেই সেই রাষ্ট্রের অপরাধীকে সমর্পণ করার বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে এই আইনের বাইরে চুক্তিতে কোনো শর্ত থাকলে চুক্তির শর্তই প্রাধান্য পাবে।

এই আইনে বহিঃসমর্পণযোগ্য অপরাধ অর্থাৎ যেসব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বা অভিযুক্ত হলে কোনো ব্যক্তির সমর্পণ দাবি করা যায়, সেসব অপরাধের উল্লেখ আছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে বা এখতিয়ারের মধ্যে সংঘটিত এবং আইনের তফসিলে উল্লিখিত খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী বা শিশু পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের অন্তর্ভুক্ত অপরাধগুলো বহিঃসমর্পণযোগ্য অপরাধ। বহিঃসমর্পণের উল্লেখযোগ্য নীতি ‘দ্বৈত অপরাধীত্ব নীতি’ অনুযায়ী সংঘটিত অপরাধটি সমর্পণ দাবিকারী ও সমর্পণকারী উভয় রাষ্ট্রের আইনেই অপরাধ হতে হবে। আবার রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় অপরাধগুলো বহিঃসমর্পণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক, আদর্শগত বা ধর্মীয় অপরাধের কারণে তাড়িত-বিতাড়িত এবং হুমকির সম্মুখীন কোনো ব্যক্তিকে আশ্রয় বা অংুষঁস দেয়া ও তার সুরক্ষা দেয়া আন্ত-র্জাতিক আইনে একটি স্বীকৃত প্রথা। কিন্তু রাজনৈতিক অপরাধ নির্ধারণের কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। বিভিন্ন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে একই অপরাধ কখনো রাজনৈতিক, কখনো ফৌজদারি হয়। অপরাধের উদ্দেশ্য, পরিধি ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আশ্রয় দানকারী রাষ্ট্রের উচ্চ আদালত বা বিচার বিভাগ অপরাধটি রাজনৈতিক কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেন। দিন দিন রাজনৈতিক অপরাধের পরিধি ছোট হয়ে আসছে। বর্তমানে সন্ত্রাসবাদ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশেষ করে রাষ্ট্র নায়কদের হত্যাও রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ১৯৮৮ সালে স্বাক্ষরিত ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী রাজনৈতিক হত্যাও জঘন্যতম ও বহিঃসমর্পণযোগ্য অপরাধ।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে, ‘এটি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্রোহ সংঘটনের মামলা নয় বরং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার মামলা’ অর্থাৎ এটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক বা সামরিক অপরাধ নয় বরং এটি ফৌজদারি অপরাধ যা বহিঃসমর্পণযোগ্য।

আন্তর্জাতিক আইনের রীতি অনুযায়ী যখন কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের পলাতক আসামিকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করে, তখন আশ্রয়দানকারী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই আসামির বিচার করা। গড়হঃবারফবড় ঞৎবধঃু অনুযায়ীও নিজ রাষ্ট্রের নাগরিককে বহিঃসমর্পণ না করার যে রীতি আছে সে অনুযায়ীও নিজ রাষ্ট্রের আইনে উক্ত নাগরিকের বিচার করতে হবে।

বহিঃসমর্পণের শর্তগুলো পূরণ হওয়ার পরও কানাডা প্রাথমিকভাবে নূর চৌধুরীকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। কেননা কানাডায় ১৯৭৬ সালে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে আর এ কারণে কানাডায় অবস্থানরত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে বহিঃসমর্পণ করা যাবে না। কানাডায় আশ্রয় নেয়া কোনো অপরাধীকে ফেরত চাইলে বিদেশি দেশগুলোকে এই নিশ্চয়তা দিতে হয় যে, দেশে আনার পর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে না অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিতে হবে।

নূর চৌধুরী ইতিমধ্যে কানাডা সরকার কর্তৃক প্রদত্ত দেশত্যাগের নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করেছেন এই যুক্তিতে যে, দেশে ফেরত পাঠালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। তিনি কানাডার সংবাদমাধ্যমে তার পক্ষে খবর প্রকাশ করান। কানাডার মানবাধিকার সংস্থাগুলোও তাকে ফেরত না পাঠানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে (সমকাল, ৩০ জানুয়ারি ২০১০)।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানানো হয়, নূর চৌধুরী কানাডার অবৈধ অভিবাসী (২০০২, ’০৪, ’০৫, ’০৬ সালে কানাডা শরণার্থী স্ট্যাটাসে অবস্থানের আবেদন নাকচ করে দেয়) হওয়ায় সরকার তাকে দীর্ঘদিন সে দেশে অবস্থানের সুযোগ দেবে না। তৃতীয় কোনো দেশে তাকে ডিপোর্ট/সমর্পণ করা হবে, বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে যেন তৃতীয় এমন কোনো দেশে তাকে পাঠানো হয়, যে দেশে মৃত্যুদণ্ড বলবৎ আছে এবং যে দেশের সাথে বাংলাদেশের বহিঃসমর্পণ চুক্তিও রয়েছে (৩১ জানুয়ারি, দৈনিক জনকণ্ঠ)।

উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত একটি সেল থাইল্যান্ডের সাথে বহিঃসমর্পণ চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে সেখানে অবস্থানরত মেজর (অব.) বজলুল হুদাকে ফিরিয়ে এনে তার শাস্তি কার্যকর করেছে। সুতরাং আশা করা যায়, কানাডাসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর বা কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত অন্য পলাতক আসামিদেরও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সহায়ক গ্রন্থ: পরিবর্তনশীল বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইন- ড. মিজানুর রহমান



সংসদ অধিবেশন: প্রত্যাশা ও
প্রাপ্তির সামঞ্জস্য কতটুকু?

মাবরুক মোহাম্মদ


সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ জাতীয় সংসদ। এখানে জনগণ তাদের ভোটে সাংসদদের নির্বাচিত করেন। এই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা স্ব-স্ব নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় সংসদে। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদ হয়ে ওঠে পুরো দেশের মানুষের মুখপাত্র। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ আইন বিভাগ, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সংসদ বা আইন বিভাগ আইন প্রণয়ন ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংসদে অনেক জটিল, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও কারিগরি বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে হয়। সময়ের স্বল্পতা ও কারিগরি দক্ষতার কারণে বর্তমান সময়ে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার ওপর অর্পণ করা হয়ে থাকে। তাদের প্রণীত আইন নিয়ে সংসদে আলোচনাই মুখ্য কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এই আইন প্রণয়ন ও এ সংক্রান্ত আলোচনা ছাড়া সংসদের অন্য দুটি কাজ হচ্ছে সরকারি অর্থের নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় ইস্যুতে বিস্তারিত আলোচনা। বর্তমান সময়ে চলমান সংসদ অধিবেশনে অন্য দুটি কাজের চেয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদের আলোচনাই প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এই ইস্যুগুলোর মধ্যে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে না।

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংসদে আলোচনা নিঃসন্দেহে সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিতর্ক হয় এবং সরকারের নীতি ও কার্যপদ্ধতি তৈরির মাধ্যমে জনগণের দুর্দশা লাঘবের উপায় বেরিয়ে আসে। আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সরকারের নীতি এবং কার্যপদ্ধতির মূল্যায়ন সম্ভব হয়। সংবিধানের ৭৩(৩) অনুচ্ছেদে সংসদে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণের ওপর আলোচনার বিধান রাখা হয়েছে। এটি সাংসদদের জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের নীতির সমালোচনা করার সুযোগ দেয়। এছাড়াও সংসদের রুলস অব প্রসিডিউর বিভিন্ন পন্থায় নানা জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ প্রদান করেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের প্রশ্ন করার মাধ্যমেও জবাবদিহিতা ও সরকারের নীতির পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও তার অধস্তনদের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এটি অত্যন্ত কার্যকর রক্ষাকবচ। তাদের কার্যক্রমের ওপর আনুষ্ঠানিক সমালোচনার এটিই সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে নিজের কার্যক্রমের ওপর প্রতিনিয়ত সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বাধ্য করে। ফলে মন্ত্রীকে তাঁর কাজের বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়, কারণ এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে। তাঁকে উত্থাপিত প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতে হবে এবং সেই জবাব জনগণের কাছে সন্তোষজনক হতে হবে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সংসদের অধিবেশনগুলো এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য অর্জনে অনেকখানিই ব্যর্থ হয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার বদলে অধিবেশনগুলো অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছে পরস্পরকে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে। নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের আপামর জনসাধারণ অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের দিকে। তাদের প্রত্যাশা, তাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা ও তা সমাধানের উপায় খুঁজবেন তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। কিন্তু সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার কতখানি প্রতিফলন ঘটছে সংসদের দৈনন্দিন অধিবেশনে তা প্রশ্ন-সাপেক্ষ। বিদ্যুৎ সমস্যার কোনো সন্তোষজনক সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা নেই, পানি নিয়ে ঢাকাবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে, যানজট সমস্যার কোনো সুষ্ঠু সমাধানের পন্থা বের হয়নি। তাছাড়া দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অনেক বিষয় যেমন- সামপ্র্রতিক সময়ে প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পাদিত চুক্তি, সমুদ্র বিরোধ, বন্দি বিনিময়, বিদেশে পলাতক আসামিদের দেশে ফেরত আনা, বিডিআরের পুনর্গঠন, সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও অস্থিরতা বিষয়ে আলোচনার সুযোগ ছিল। এসবসহ আরও নানা বিষয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হতে পারত। সমাধানের উপায় খোঁজার চেষ্টা চালানো যেতে পারত। বিরোধী দল দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পর সংসদে যোগ দিয়েছে। এই ইস্যুগুলো নিয়ে তারা রাজপথে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছে। তাদের সামনে সুযোগ ছিল এই বিষয়গুলো সংসদে আলোচনায় এনে সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার। তারা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। দীর্ঘদিন পর অধিবেশনে ফিরে তারা সঙ্কীর্ণ দলীয় রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে সরকারকে জনগণের সমস্যা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। সরকারি দলও অনর্থক আক্রমণের মাধ্যমে বিরোধী দলকে প্রশ্রয় দিয়েছে। দলীয় রাজনীতি চর্চার ফাঁকে জনমানুষের সমস্যাগুলো হারিয়ে গেছে। নাম পরিবর্তনের রাজনীতির মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়েই অধিকাংশ সময় সাংসদরা ব্যস্ত থেকেছেন। প্রতিটি বিষয় আলোচনার উপযুক্ত স্থান আছে। পল্টনের মহাসমাবেশে আর জাতীয় সংসদের অধিবেশনে একই বিষয়ে বিতর্ক হতে পারে না। উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত বিষয়ে আলোচনাই দায়িত্বশীল সাংসদদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষদের প্রত্যাশা।
দেশের ১৫ কোটি মানুষ এক সাথে সংসদে গিয়ে কথা বলতে পারে না। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যার যার নির্বাচনী এলাকার কণ্ঠস্বর। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের প্রতিনিধি তাঁরা। ভোটদানকারী প্রতিটি নাগরিকের অধিকার আছে সংসদে সে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব হবে। তার সমস্যাগুলো আলোচনায় আসবে ও সমাধানের পথ খোঁজা হবে। জনগণের এই প্রতিনিধিত্ব হওয়ার অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সাংসদদের। উল্লেখ্য, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৮ সংসদ কার্যক্রম বিষয়ে সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি প্রদান করেছে। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রম বিষয়ে আদালতে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। তাই সংসদ যাতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চিন্তা-চেতনার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে, সেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব হওয়ার অধিকার যেন সুরক্ষিত হয় তা দেখভালের দায়িত্ব সাংসদদের। সাংসদরা তাঁদের এই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবেন ও তা পালনে যত্নবান ও নিষ্ঠাবান হবেন- এটিই জনগণের প্রত্যাশা। জনমানুষের এই প্রত্যাশা পূরণে সামনের দিনগুলোতে সাংসদরা মনোযোগী হবেন বলে আশা করা যায়।