সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   নারী
   তদন্ত
  আইনি-সংবাদ
   ফলোআপ
   সংখ্যাচিত্র

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

ফলোআপ


পিলখানা হত্যাকাণ্ডের এক বছর

এটিএম মোরশেদ আলম

২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কমকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। কেবল হত্যাই নয়, লাশ ক্ষতবিক্ষত করা, গণকবরে পুঁতে ফেলা, ম্যানহোল ও নর্দমায় ফেলে দেয়া এমনকি গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে ফেলারও ঘটনা ঘটে। এছাড়া লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা ইত্যাদি ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। প্রথমদিকে বিতর্ক থাকলেও পরবর্তীকালে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, বিদ্রোহের বিচার হবে বিডিআর আইনে এবং অন্যান্য অপরাধের বিচার হবে দেশে প্রচলিত সাধারণ আইনে। এ লক্ষ্যে সারা দেশকে ছয়টি ভাগে ভাগ করে বিডিআর আইন অনুসারে মোট ছয়টি বিশেষ আদালত গঠন করে বিদ্রোহের বিচার পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত বছরের ২৪ নভেম্বর প্রথম বিশেষ আদালত হিসেবে বিচার কার্যক্রমের সূত্রপাত ঘটায় রাঙ্গামাটিতে স্থাপিত ৪নং বিশেষ আদালত (বিস্তারিত দেখুন বুলেটিন ডিসেম্বর ২০০৯ সংখ্যা)। পরবর্তীকালে ফেনী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরা ও ঢাকার বিশেষ আদালতে বিচারকাজ শুরু হয়। অন্যদিকে, সাধারণ আইনে দায়ের হওয়া মামলা এখনো তদন্তাধীন, ঘটনার ব্যাপকতা এত বেশি যে, ঘটনার এক বছর পরও তা দেয়া সম্ভব হয়নি।
বর্তমান বিডিআর আইনে শাস্তির পরিমাণ কম হওয়ায় এবং অনেক বিষয় বর্তমান আইনে না থাকায় সরকার আইনটিকে যুগোপযোগী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বিডিআরের আমূল পরিবর্তন করে নতুন একটি আইনও প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আইনটির খসড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। বুলেটিনের পূর্ববর্তী সংখ্যাগুলোর ধারাবাহিকতায় বর্তমান লেখায় এসব বিষয়ের ফলোআপই আলোচনা করা হয়েছে।

ঢাকায় বিদ্রোহের বিচার শুরু
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে দুই আইনে। এর মধ্যে বিদ্রোহে জড়িতদের বিচার হচ্ছে বিডিআরের নিজস্ব আইনে। সারা দেশে মোট ছয়টি বিশেষ আদালত গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ঢাকায় গঠিত ৫নং বিশেষ আদালতে বিচার হবে দু’টি সেক্টরের বিদ্রোহী সদস্যদের-ঢাকা সেক্টর (সদর) এবং ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়ন। বিশেষ আদালত-৫ ঢাকা সেক্টরের (সদর) বিদ্রোহীদের বিচার শুরু করে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১০ পিলখানায় অবস্থিত দরবার হলে। ঐদিন মামলার বাদী নায়েব সুবেদার মোঃ শাহ আলম ভুঁইয়া আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেন। বিদ্রোহের সময় তিনি পিলখানাতেই ছিলেন। কীভাবে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, একে একে সেনা কর্মকর্তাদের কীভাবে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছিল, তার বিশদ বর্ণনা তিনি আদালতে উপস্থাপন করেন। তিনি আদালতকে জানান, বিদ্রোহের ঘটনায় মোট ৮৬ জন জড়িত, তাদের মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ জন সরাসরি জড়িত এবং অন্যরা বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা না করে পরোক্ষভাবে তাদের সহযোগিতা করেছে। তিনি প্রত্যেক অভিযুক্তের নাম পড়ে শোনান এবং আদালতকে অভিহিত করেন যে, এই মামলায় সাক্ষীর সংখ্যা মোট ৩০ জন। অভিযুক্তদের মধ্যে দু’জন পলাতক, একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ১৯ জন সাধারণ আইনে দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে বন্দি। অপর ৬৪ জন বর্তমানে পিলখানাতেই অবস্থান করছেন। বিডিআর মহাপরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত এই বিশেষ আদালতের অন্য সদস্যরা হলেন- লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম রব্বানী এবং মেজর সাইদ হাসান। ২৪ ফেব্রুয়ারি শুনানির দ্বিতীয় দিনে পলাতক দু’জন ছাড়া অন্য অভিযুক্তদের আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের কৌঁসুলি মেজর মতিউর রহমান অভিযুক্তদের উপস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন এবং আইনের ধারা উল্লেখ করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন। ১৫ এপ্রিল পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত ঐ দিনের কার্যক্রম শেষ করে এবং সেই সাথে পলাতক দুই আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন আদালত।

৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের বিদ্রোহীদের বিচার কাজ বিশেষ আদালত ৫-এ শুরু হয় ১৫ মার্চ ২০১০। ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের নায়েক সুবেদার মোঃ গিয়াস উদ্দিন ৩১০ জনের বিরুদ্ধে এদিন অভিযোগ উত্থাপন করেন। এর মধ্যে ২১০ জন গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে ঢাকা ও কাশিমপুর কারাগারে বন্দি আছে। বাকি ৬৯ জন এখনো বিডিআরে কর্মরত আছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তদের মধ্যে ৪৭ জন পদধারী নেতা। তারা মহাপরিচালকের নির্দেশ মেনে জওয়ানদের নিরস্ত্র ও নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেননি। এছাড়া বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ১১ জন। ৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে শরীরে অস্ত্র বহনের চিহ্ন দেখে। বিদ্রোহের সময় ২৩ জন পালিয়ে গেলেও তাদের মেসের টিনের বাক্সে পাওয়া গেছে কিছু গোলা বারুদ। অভিযুক্তদের মধ্যে ১০৮ জন দরবার হলে উপস্থিত ছিলেন। তারা মহাপরিচালকের নির্দেশ অমান্য করে দরবার হল ছেড়ে যায়। ১৬ মার্চ অভিযুক্ত ৩১০ জনকে আদালতে উপস্থিত করা হয় এবং তাদেরকে অভিযোগ পড়ে শোনানো হয়। ৯ মে অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করে এদিনের জন্য শুনানি মুলতবি করা হয়।

সাধারণ আইনে মামলার অভিযোগপত্র এখনো হয়নি
বিডিআর সদর দপ্তরে হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নবজ্যোতি খীসা বাদী হয়ে দেশে প্রচলিত সাধারণ আইনে মামলা দায়ের করেন। ডিএডি তৌহিদুল ইসলাম, নাসির উদ্দিন, হাবিবুর রহমান ও আবদুল জলিল এবং সিপাহি সেলিমের নাম উল্লেখসহ মামলায় কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকে আসামি করা হয়। এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সেনা কর্মকর্তা ও অন্যদের হত্যা, গুরুতর জখম, অবৈধ আটক, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, লাশ গুম করা, গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সম্পদের ক্ষতিসাধন করাসহ ১৯টি অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে তদন্তাধীন।

তদন্তের অগ্রগতি জানাতে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০ একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিআইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এক বছরের তদন্তে তারা নিশ্চিত হয়েছে বিদ্রোহের দিন পিলখানায় ৮ হাজার ২৯২ জন বিডিআর সদস্য উপস্থিত ছিল। এদের বেশিরভাগই ঐদিন বিদ্রোহে অংশ নেয়। তবে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল ৯০০ জন জওয়ান। এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন মোট ২ হাজার ২০৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে আরো ৭ হাজার ৯৭৪ জনকে। সম্মেলনে জানানো হয়, তদন্তকালে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে জওয়ানরা তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে যোগাযোগ করেছিলেন বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

ঢাকায় দায়ের হওয়া ঐ মামলার পাশাপাশি দেশের ২৮টি জেলার ৩৭টি থানায় আরো ৪০টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এসব মামলায় এ পর্যন্ত মোট প্রায় দুই হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে ১৮ জন ডিএডি, ১৫ জন বিডিআরের সাধারণ কর্মচারী এবং দু’জন সাধারণ ব্যক্তি। ঢাকার বাইরের মামলাগুলোতে আসামিদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’র অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব মামলাও তদন্তাধীন।

নতুন আইন-নতুন নাম
বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন ২০০৯’ নামে নতুন একটি আইনের খসড়া ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। নতুন আইন অনুসারে ‘বিডিআর’ পরিবর্তিত হয়ে হবে ‘বিজিবি’। আইনটি প্রণীত হলে বাংলাদেশ রাইফেলস অর্ডার ১৯৭২ এবং রাংলাদেশ রাইফেলস (স্পেশাল প্রভিশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ বিলুপ্ত হবে। এসব আইন দিয়েই এতদিন বিডিআর পরিচালিত হতো।

নতুন আইন অনুসারে বিদ্রোহে জড়িত থাকা ও সহযোগিতার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। বাহিনীর বিশেষ আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এই শাস্তি প্রদান করতে পারবে এবং তা কার্যকরও করতে পারবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে সর্বোচ্চ শাস্তির পরিমাণ সাত বছর কারাদণ্ড। নতুন আইন প্রণীত হলে, শুধু নিজস্ব বাহিনীতে নয় বরং সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী বা তাদের সহযোগী বাহিনীতে বিদ্রোহের সাথে জড়িত থাকলে বা বিদ্রোহে বাধা না দিলেও বিডিআর সদস্যদের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।

খসড়া আইনে বর্ডার গার্ডকে একটি নিয়ন্ত্রিত ও সংরক্ষিত বাহিনী করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হতে পারবেন না। তাঁরা সংবাদপত্রে কোনো সংবাদ, বই, চিঠি ও অন্য কোনো তথ্য প্রকাশ করতে পারবে না। এ বাহিনী সীমান্তরক্ষা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধ এবং যুদ্ধাবস্থায় সেনাবাহিনীকে সহায়তা করবে। এছাড়া সরকার প্রদত্ত অন্যান্য দায়িত্বও পালন করবে।

প্রস্তাবিত আইনে অপরাধ সংক্রান্ত মোট ৩০টি ধারা যুক্ত করা হয়েছে- এর মধ্যে বিদ্রোহ, যুদ্ধকালীন শত্রু সম্পর্কিত অপরাধ, অবাধ্যতা, ছুটি ছাড়া অনুপস্থিত থাকা, পলাতক থাকা, আদেশ অমান্য করা, কর্মকর্তাদের হুমকি দেয়া, অধীনস্থ ব্যক্তিকে আঘাত করা, উৎকোচ নেয়া, মর্যাদাহানি করে এমন আচরণ করা, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করা, অশোভন আচরণ করা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব অপরাধের জন্য দুই থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের সাজা এমনকি মৃত্যুদণ্ডের কথাও বলা হয়েছে। তাছাড়া যুদ্ধাবস্থায় এসব অপরাধ করলে শাস্তি দ্বিগুণ হবে। সাজার মেয়াদ অনুসারে তিন ধরনের আদালতে এসব অপরাধের বিচার হবে। সংক্ষিপ্ত আদালত দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের অপরাধের বিচার করতে পারবে, বিশেষ সংক্ষিপ্ত আদালত পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং বিশেষ আদালত সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত অপরাধের বিচার করতে পারবে।

নতুন আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত নামে নতুন একটি আদালত গঠন করা হয়েছে। এই আদালত দেশের সাধারণ জনগণের বিচার করতে পারবে। অতিরিক্ত মহাপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা সীমান্ত চোরাকারবারিদের হাতেনাতে ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিচার করতে পারবেন। এই আদালতকে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড প্রদান করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।

অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন
বছর পেরিয়ে গেলেও বিডিআর বিদ্রোহের বিষয়ে নানা প্রশ্নের জবাব এখনো মেলেনি। বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে জওয়ানদের নানা ক্ষোভের কথা বলা হলেও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো স্পষ্ট হয়নি। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “বিডিআর বিদ্রোহ একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ ঘটনার পেছনে একটি গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে। এদের খুঁজে বের করা হবে।” একই দিন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া বলেন, “বিডিআরের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পেছনে দেশবিরোধী শক্তির ইন্ধন ছিল।” অথচ সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, “তদন্ত কমিটি তথ্যপ্রমাণসহ বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের শনাক্ত করতে পারেনি। এ ঘটনার পেছনের মূল কারণ বা মোটিভও কমিটির পক্ষে উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।” সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গঠিত সেনা তদন্ত আদালতের প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো বেসামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই, তথ্যের উৎসের সঠিকতা যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।” একটা প্রশ্ন তাই ঘুরেফিরে চলেই আসে, ‘তাহলে কি তদন্ত কমিটিগুলোর দক্ষতার অভাব ছিল নাকি অন্য কোনো বিষয়?’ শুধু দাবি-দাওয়া থেকে এত বড় ঘটনা ঘটেছে একথা এখনো অনেকেই মানতে পারেন না। পত্রপত্রিকায় এ ধরনের মন্তব্যও প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। তাছাড়া যেসব দাবি-দাওয়ার কারণে এত বড় ঘটনা ঘটলো সেসব দাবি-দাওয়ারই-বা কী হলো, অপারেশন ডাল-ভাত এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে জওয়ানদের যে ক্ষোভ ছিল সেগুলো কি তাহলে লাশের নিচে চাপাই পড়ে গেল? যেসব দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল সেগুলোর কি কোনো তদন্ত হবে না? বঞ্চিতরা কি তাহলে আবারো ক্ষোভ জমা করতে থাকবে? এরকম হাজারো প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।

 

 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন: সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নের সম্মুখীন

সাঈদ আহমেদ


একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আকাঙ্ক্ষা বহুদিন ধরে লালন করে আসছে এ দেশের মানুষ। দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে আন্তর্জাতিক সমপ্র্রদায়ের আগ্রহ সবসময় মেলে না। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রে সে মেলবন্ধনটাও ছিল। এ দুইয়ের মিলিত চেষ্টার ফলস্বরূপ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর জারি করা হয় জাতীয় ‘মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০০৭’। এরপর চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দিতে লেগে যায় প্রায় এক বছর। ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরী চেয়ারম্যান এবং দুই কমিশনার মুনিরা খান ও নীরু কুমার চাকমার সমন্বয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

এর পরপরই ক্ষমতায় আসে বর্তমান নির্বাচিত সরকার। নির্বাচিত সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক গঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কীভাবে গ্রহণ করে তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক ঔৎসুক্য ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে অনুমোদন না দেয়ায় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগেরও সৃষ্টি হয়। তবে সে উদ্বেগ দূরীভূত হয়ে যায় যখন সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। বিলটি আরও যাচাই-বাছাই করার জন্য আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। স্থায়ী কমিটি এই বিলে অনেক সুপারিশ প্রদান করে। এই সুপারিশ প্রদানের ক্ষেত্রে তারা সুশীল সমাজের মতামতকেও বিবেচনায় নেয়। সংসদীয় কমিটির এ সুপারিশগুলো অন্তর্ভুক্ত করে ৭ জুলাই ২০০৯ সংসদে উত্থাপিত হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ এবং ৯ জুলাই তা সংসদে পাস হয়। নতুন আইনটিকে ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতপূর্ব কার্যকারিতা দিয়ে ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাজকর্মকে বৈধতা দেয়া হয়।

২০০৭ সালের অধ্যাদেশ অনুমোদন না করে নতুনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ প্রণয়নের বিষয়টি সহজেই অনুমেয়। বর্তমান সরকার চায়নি ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রতিষ্ঠিত হোক যে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানজাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়েছে একটি অনির্বাচিত সরকারের হাতে। তাছাড়া ২০০৭ সালের অধ্যাদেশে অনিবার্য কিছু সংশোধনী আনারও প্রয়োজন ছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ পাস হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল, বর্তমান সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ব্যাপারে আন্তরিক। কিন্তু জুলাই থেকে ডিসেম্বর, শেষ হয়ে গেল ২০০৯। ২০১০ সালেরও প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হতে চলল। এখনো জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সেভাবে কাজ শুরু করতে পারেনি। নতুন আইনে কমিশনের সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৭২ থেকে কমিয়ে ৭০ করা হয়। বয়স ৭০-এর বেশি হয়ে যাওয়ায় কমিশনের সদস্য মুনিরা খান পদত্যাগ করেন জুলাই ২০০৯-এ। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে অপর সদস্য অধ্যাপক নীরু কুমার চাকমাও ফিরে যান তার অধ্যাপনা পেশায়। সেই থেকে চেয়ারম্যান একাই রয়েছেন কমিশনে। তার কাজ সীমাবদ্ধ রয়েছে কিছু বিবৃতি আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি দেয়ার মধ্যে। কমিশনের কাজের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে- এখনো কমিশনের জন্য কোনো বিধিমালা প্রণয়ন না করা। কমিশন স্বউদ্যোগে একটি বিধিমালার খসড়া করে ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও এখনও সেটি অনুমোদন করা হয়নি। কমিশনের বিভিন্ন পদে ৬২ জন নিয়োগ চেয়ে একটি খসড়া অর্গানোগ্রাম কমিশনের পক্ষ থেকে ২০০৮ সালের ২২ নভেম্বর আইন মন্ত্রণালয় পাঠানো হয়। সেটির বিষয়েও এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। ১০ ডিসেম্বর ২০০৯ সর্বজনীন মানবাধিকার দিবসে কমিশন আয়োজিত এক সেমিনারে আইনমন্ত্রী ঘোষণা করেন- ‘স্পিকারের নেতৃত্বে বাছাই কমিটি এ মাসের (অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০০৯) শেষ দিকে বসবেন। ১ জানুয়ারি ২০১০-এর মধ্যে কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া হবে।’ কিন্তু মার্চ মাসের শেষার্ধেও এসে আমরা দেখছি- এখনো কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া হয়নি। অবশ্য পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে আমরা জেনেছি, সংসদ ভবনে স্পিকারের নেতৃত্বে বাছাই কমিটি বৈঠক করেছেন, কিন্তু তারা সদস্য হিসেবে কিছু ব্যক্তির নাম পরবর্তী বৈঠকে প্রস্তাবনা আকারে পেশ করার দায়িত্ব দিয়েছেন আইন মন্ত্রণালয়কে। সেই পরবর্তী বৈঠকও এখন পর্যন্ত হয়নি। বাছাই কমিটি কর্তৃক এ ধরনের নামের খসড়া প্রস্তাব করার দায়িত্ব আইন মন্ত্রণালয়কে দেয়াটাও গ্রহণযোগ্য নয়। এমনিতেই এখনো বাছাই কমিটিতে নির্বাহী বিভাগের সুস্পষ্ট প্রাধান্য রয়েছে। উপরন্তু নির্বাহী বিভাগকে এ দায়িত্ব দেয়াটা নিরপেক্ষ ও যোগ্য কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদাহরণ নয়।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর বয়সসীমা শেষ হয়ে যাবে এ বছরের জুন মাসে। অনেকের ধারণা- সরকার সেজন্য ধীরে চলো নীতি নিয়েছে। জুনের পরেই তারা চেয়ারম্যানসহ অন্য কমিশনারদের মনোনয়ন দিতে চান। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের সবকিছুতেই এত দীর্ঘসূত্রতার কারণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা ইতোমধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।