সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   নারী
   তদন্ত
  আইনি-সংবাদ
   ফলোআপ
   সংখ্যাচিত্র

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

নারী


নারী দিবসের শতবর্ষ

খালেদা খাতুন

 

সারা বিশ্বে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শতবর্ষ পালিত হয়েছে। ন্তর্জাতিক নারী দিবস গুরুত্বসহকারে পালিত হওয়ার পেছনে রয়েছে নারী অধিকার আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস। এই দিবস ঘোষণা হওয়ার অনেক আগেই ভোটাধিকার, ন্যায্য মজুরি, ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে নারীরা আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করেছিলেন। ১৯১০ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস, ন্যায্য মজুরি ও কল-কারখানায় কাজের পরিবেশের উন্নতির জন্য রাস্তায় নেমে মিছিল করেছিলেন এবং ওই মিছিলে পুলিশের গুলিতে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য জন স্টুয়ার্ট মিল প্রথম নারীদের ভোটাধিকারের বিষয়টি পার্লামেন্টে উত্থাপন করেন। তারও প্রায় দু’দশক পরে নিউজিল্যান্ড সর্বপ্রথম নারীদের ভোট দেয়ার অধিকার প্রদান করে। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে ক্লারা জাটকিন, যিনি তৎকালীন জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের নারী শাখার অন্যতম নেত্রী প্রথম নারী দিবস পালনের কথাটি উত্থাপন করেন। তিনি প্রস্তাব দেন যে, প্রত্যেক দেশে নারীদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট দিবস থাকার প্রয়োজন আছে। সেই সময় ওই সম্মেলনে ১৭টি দেশ থেকে আগত ১০০ জন নারী ক্লারা জাটকিনের এই প্রস্তাবকে অকুণ্ঠ চিত্তে সমর্থন জানিয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ১৯ মার্চ তারিখে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হলেও পরবর্তীকালে ১৯১০ সালের ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার জন্য প্রস্তাব গৃহীত হয়। ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল নিউইয়র্কের সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকদের নারী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকাকে স্মরণে রেখে তাঁদের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা হওয়ার পর গত একশ’ বছর ধরে নারীর পক্ষে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘ নারী উন্নয়নের জন্য এবং নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নারী কমিশন গঠনের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে পৃথিবীব্যাপী সমতার ভিত্তিতে নারীকে সমঅধিকার প্রদানের দাবি সরব হতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ ১৯৭৯ সালে নারীর প্রতি সব বৈষম্য দূর করার জন্য একটি সনদ আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে প্রণয়ন করে। এই সনদটি স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছে পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো যারা এই সনদ অনুমোদন করেছে তাদের প্রতিনিয়ত নিজস্ব দেশের নারীর অবস্থা ও অবস্থানের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে জাতিসংঘে পাঠাতে হয়। এভাবে জাতিসংঘ নারী এজেন্ডাকে সচল রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মাহাত্ম্যকে যাচাই করতে হয় তাহলে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই দিবসটি পালনের মাধ্যমে নারীদের দাবি আদায়ের বিষয়টি আরও অনেক জোরালো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নারী মুক্তি আন্দোলনের সাথে আমাদের নারী আন্দোলন যুক্ত হয়ে একটি ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনের সাথে এদেশীয় নারী আন্দোলনের সম্পৃক্ততা গত দু’এক দশকের মধ্যে ঘটেনি। যদিও দিবস হিসেবে গত দু’দশক ধরে আন্তর্জাতিক নারীবাদ/নারীমুক্তি ও নারী অধিকার আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করছে নারী সংগঠনগুলো। গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে রোকেয়ার লেখনীতে আমরা একক নারী আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রয়োজন সম্পর্কে আভাস পাই। রোকেয়া সমাজে ও পরিবারের নারীর অধস্তন অবস্থানকে তার লেখনীর মাধ্যমে বারবার সামনে হাজির করেন। তিনি নারীর এই অধস্তন অবস্থানের পেছনের কারণগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোর তীব্র প্রতিবাদ করে গেছেন তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে। শিক্ষা গ্রহণ নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অন্যতম পূর্বশর্ত- সেটা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই সাখাওয়াত মেমোরিয়াল নামে একটি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই তার লেখা প্রচুর নারীকে প্রেরণা জুগিয়েছে এবং এখনও তার লেখা আমাদের জন্য ভীষণভাবে সমকালীন। নারীর সমঅধিকার লাভের ক্ষেত্রে ধর্মান্ধতা, পশ্চাৎপদতা, কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ ও শিক্ষার অভাব ইত্যাদির বিরুদ্ধে যে চ্যালেঞ্জ তিনি ছুড়ে দিয়েছিলেন, এখনও সেই সমস্যাগুলো আমাদের সমাজ থেকে অপসারিত হয়নি।

বাংলাদেশের নারীর অগ্রযাত্রা সাধিত হয়নি এ কথাটি বলা যাবে না। এ অঞ্চলের নারীরা ভোটাধিকার পায় ভারত বিভাগের পূর্বে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৯৩৫ সালে। তাই ভারত বিভাগের পর তদানীন্তন পাকিস্তান এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের নারীরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে ভোট দেয়ার অধিকার লাভ করেন। তবে তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কিছু খণ্ডচিত্র আমরা দেখতে পাই এবং এক্ষেত্রে বাঙালি নারীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে কয়েকজন নারী সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। নারীরা ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক দলে যোগ দেন এবং বিভিন্ন দাবি আদায়েও তারা সবসময় সোচ্চার ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অনেক নারী প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। গত দুই দশকে আমরা দু’জন নারী প্রধানমন্ত্রীকে পেয়েছি এবং এই বর্তমান সরকারের বেশ কয়েকজন নারী গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভারও গ্রহণ করেছেন।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে কিছু পরিবর্তনের ধারা পরিলক্ষিত হয়েছে তার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও আমরা কিছু পরিবর্তন দেখতে পাই। নারী শিক্ষা আগের তুলনায় বেড়েছে, ব্যাপকসংখ্যক নারী পোশাক কারখানায় কাজ করার জন্য পুরুষের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নারীরা আজ পুনরুৎপাদন অধিকার নিয়েও কথা বলছে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দূর করার জন্য বিশেষ আইন ও আদালত গঠিত হয়েছে। তার সুফল আমরা একেবারে পাচ্ছি না বললে ভুল বলা হবে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের ঘোষিত নারীর জন্য সব বৈষম্য দূরীকরণের সনদে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছে। এই সনদটির ধারাগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে আইনকে সমঅধিকারের ভিত্তিতে প্রণয়ন করার জন্য নারী সংগঠনগুলো আজ বিশেষভাবে সক্রিয়।

যদিও অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, নারীরা বিশেষত কর্মজীবী নারীরা আগের তুলনায় অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন (যেমন, মাতৃকালীন ছুটি, শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র) তথাপি সামগ্রিকভাবে সমঅধিকার লাভের ক্ষেত্রে অর্জনের বিষয়টা এখনও বেশ হতাশাব্যঞ্জক। এ দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা পুরুষের সমকক্ষ হওয়ার ক্ষেত্রে এখনও অনেকাংশে পিছিয়ে আছে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পুরুষতান্ত্রিকতা নারীর অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এখনও এ দেশের অধিকাংশ পুরুষ (অনেক ক্ষেত্রে নারীরাও) পারিবারিক নির্যাতনকে স্বামী ও স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় বলে মনে করেন। গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে জানা যায়, এ দেশে ৬৭% নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটে চলাফেরার ক্ষেত্রে নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যৌন হয়রানি এবং স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় উত্ত্যক্ত হওয়া নিত্যদিনের ব্যাপার। এসব কারণে অনেক মেয়ে নীরব প্রতিবাদস্বরূপ আত্মহননের পথও বেছে নিচ্ছে।

উপসংহার
আমাদের দেশে স্বাধীনতার আগে ষাটের দশক থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরে আশির দশকের সময়টাকে নারী আন্দোলনের একটি প্রশংসনীয় অধ্যায় বলা যেতে পারে। সেই সময় বাম ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর নারী শাখায় যে নারীরা কর্মী এবং নেতৃস্থানীয় অবস্থানে ছিলেন তারা নারী বিষয়ক ইস্যুগুলোতে সমাজকে সচেতন করেছেন। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তার মধ্যে হস্তশিল্প, সেলাই প্রশিক্ষণ অন্যতম। নারীর সমঅধিকার সংক্রান্ত দাবি দাওয়া (যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন) নিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের সূচনা তারাই প্রথম করেছিলেন। আশির দশকে বাম রাজনৈতিক দল এবং মূলধারার রাজনীতির নারী শাখার বাইরেও নারী মুক্তি আন্দোলনের আরেকটি স্বাধীন, ক্ষীণ অথচ সাহসী ধারা পরিলক্ষিত হয়। নারীর সার্বিক মুক্তি সাধনের জন্য নারীর একটি পৃথক লড়াইয়ের জায়গার প্রয়োজন আছে- তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে সেই জিনিসটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এর উদাহরণস্বরূপ আমরা পাই নারীর পুনরুৎপাদন/প্রজনন অধিকার সংক্রান্ত ধারণাকে রাজনৈতিকভাবে উত্থাপন করা এবং অনেকাংশে সমাজকে বোঝানো যে সন্তান ধারণে নারীর সিদ্ধান্তই অগ্রগণ্য হবে। সে সময়টায় নারী সংগঠনগুলো কোনোরূপ বিদেশি সাহায্য ছাড়াই মৌলবাদ, ফতোয়া ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে স্বেচ্ছাসেবী নারী মুক্তি আন্দোলনের সেই ধারাটি দিন দিন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। আজকাল নারী আন্দোলনে এনজিওর কর্মকাণ্ড প্রশংসনীয় হলেও দাতা সংস্থা অথবা বিদেশি সাহায্য ব্যতীত সম্পূর্ণ স্বাধীন নারী আন্দোলন গড়ে না ওঠার শূন্যতা অনুভব করা যায়। দাতা সংস্থাদের সাহায্যে পরিচালিত নারী বিষয়ক কর্মকাণ্ড প্রকল্পভিত্তিক ও প্রকল্পকেন্দ্রিক এবং একটি সময়ের মধ্যে শেষ করার তাগিদ থাকে। একটি বিশেষ সময়ের মধ্যে যে ধরনের পরিবর্তন বা ফলাফল আশা করা হয় তা বয়ে আনাও সম্ভ্ভব না। তাছাড়া একটি দেশের নারী আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে গড়ে ওঠা কোনোভাবে কাম্য হতে পারে না।



বাংলাদেশে নারী অধিকার ও সিডও সনদ

তাবাসসুম মখ্‌দুমা


আট মার্চ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যথাযথভাবে পালিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ‘সমঅধিকার ও সমসুযোগের নীতি নিশ্চিত করবে জাতির অগ্রগতি’-এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আরও সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও উচ্চারিত হলো নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের স্লোগান।

জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর ‘বিশ্ব নারীর সমমর্যাদাবিষয়ক কমিশন’ গঠিত হয় ১৯৪৬ সালে। এই কমিশনেরই পর্যবেক্ষণে লক্ষ্য করা হলো, ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা’ নারীর অধিকার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়নি। মূলত পুরুষের অধিকারকেই প্রাধান্য দিয়েছে। তারপর জাতিসংঘের অনুমোদনে ‘বিশ্ব নারীর মর্যাদাবিষয়ক কমিশন’ ১৯৪৭ সাল থেকে ২০ বছর ধরে লিখে তৈরি করেছে ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ’ বা সিডওর খসড়া প্রতিবেদন। ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘে জমা পড়ার পর খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে ১২ বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্ব্বর সনদটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। সনদের আইন অনুসারে ২০টি দেশ বা রাষ্ট্রের স্বাক্ষরের পর ১৯৮০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সনদটি কার্যকর হয়েছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সুদান ও সোমালিয়া ছাড়া অন্য সব সদস্য রাষ্ট্র এই সনদে স্বাক্ষর দিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট রয়েছে। সর্বশেষ পর্যায়ে এই সনদের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য কমিটি ‘অপশনাল প্রটোকল’ বলে একটি ব্যবস্থা অনুমোদন করেছে, যাতে নারী প্রয়োজনে সরাসরি কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ জানাতে পারেন।

১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকার সিডও সনদের ৩০টি ধারার মধ্যে ২, ১৩ (ক), ১৬র ১গ ও চ বিষয়ে সম্মতি সংরক্ষণ রেখে স্বাক্ষর করেছে। ১৯৯৭ সালে ১৩(ক) (পারিবারিক কল্যাণের অধিকার) এবং ১৬চ (অভিভাবকত্ব, প্রতিপালকত্ব, ট্রাস্টিশিপ ও সব ক্ষেত্রে শিশুদের স্বার্থই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)- এই ধারা দুটির প্রতি সংরক্ষণ সরকার তুলে নিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকার ২ ধারা (মূলত এই ধারাটি গুরুত্বপূর্ণ যে সনদে উল্লিখিত ধারাগুলোর বাস্তবায়নে সরকার নিজ দেশে আইন করবে) এবং ১৬.১.গ ধারা (বিবাহ এবং এর বিচ্ছেদকালে একই অধিকার ও দায়িত্ব) বাংলাদেশ সরকার সংরক্ষণ করে রেখেছে।

সরকার ‘পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ ও শরিয়া আইনের পরিপন্থী’ উল্লেখ করে ১৬.১.গ ধারার প্রতি সম্মতি দিচ্ছে না। ২ ধারার প্রতি সম্মতি দিচ্ছে না ১৬.১.গ বিষয়ে ও অন্যান্য কিছু বিষয়ে আইন করার প্রতি সরকার এখনো সম্মত নয় বলে। যেমন ধর্মনিরপেক্ষভাবে দেশের সব নারীর জন্য পারিবারিক আইনে নারী-পুরুষের অধিকার ও দায়িত্ব সমান হোক, বিয়ে রেজিস্ট্রি ও তালাক দেয়ার অধিকার হিন্দু নারীর জন্য আইনসম্মত করা হোক; উত্তরাধিকারে ধর্মনির্বিশেষে সব নারীর জন্য নারী-পুরুষের অধিকার সমান করে আইন হোক- এসব বিষয়ে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’তেও সরকার দ্বিমত পোষণ করেছে। এমনই যদি হয় তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতা কোথায়? সিডও সনদের কয়েকটি ধারার বিষয়ে এবং জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির নানা বিষয়ে সরকার ধর্মীয়ভাবে বাধা বলে মূলত নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বজায় রাখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখছে।

মুসলিম দেশ বলে আখ্যায়িত দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ২৯-এর ১ ধারা সংরক্ষিত রেখেছে তাদের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে। মুসলিম দেশগুলোর অধিকাংশ সরকার কোনো সংরক্ষণ ছাড়াই সিডও সনদে স্বাক্ষর দিয়েছে। তারা নারী-পুরুষের বৈষম্য বিলোপের জন্য সিডও সনদের ধারাগুলোতে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিচ্ছে এবং সম্মিলিতভাবে সমাজ ও সংস্কৃতির মূল্যবোধের অসাম্য, অবক্ষয়, নির্যাতন বন্ধের পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিউনিশিয়া, তুরস্ক, মালয়েশিয়ার নারীসমাজ ও সরকার শরিয়ার বিধান বিষয়ে কাজ করে প্রমাণ করেছে, মানুষে মানুষে বিভেদ শরিয়ার বিধান কেন কোনো ধর্মীয় বিধানেই অনুমোদিত নেই। নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্যও ধর্মীয় বিধানে নেই। মূলত ধর্মীয় বাধা নয়, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও রক্ষণশীলতাই নারীর প্রতি বৈষম্য বজায় রাখছে।
তাই সময়ের দাবি, বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সিডওর পূর্ণ বাস্তবায়ন।


শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন তথা ইভটিজিং এক দুরারোগ্য সামাজিক ব্যাধি


শ্রাবন্তী শেগুফ্‌তা



আত্মহত্যা নাকি মহাপাপ; তবুও মানুষ আত্মহত্যা করে। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি- একজন মানুষ কখন এই ভয়ঙ্কর পথ বেছে নেয়?
মহানগরীর শ্যামলীতে বসবাসরত ক্লাস নাইনে পড়ুয়া নাসফিয়া আপন পিংকি (১৪) অথবা পাবনার ঈশ্বরদীর মশুড়িয়াপাড়ার বঙ্গবন্ধু উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী বৃষ্টি খাতুনের (১২) কথাই ধরা যাক না কেন, তাদের আত্মহত্যার পেছনে অনুঘটকরূপে কাজ করেছিল এক তীব্র মানসিক গ্লানি, যার সাথে ছিল চরম নিরাপত্তাহীনতা। বখাটে ছেলেদের অত্যাচার যখন একটি মেয়ের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, সমাজ-সভ্যতা-রাষ্ট্র তখনও থেকে যায় নির্লিপ্ত। অনেক সময় পরিবার থেকেও মেয়েটির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় নানা প্রকার বিধিনিষেধ। একদিকে পরিবারের চাপ, অন্যদিকে বখাটেদের উৎপাত; এসবের ফলস্বরূপ দিশেহারা মেয়েটি যখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তখন কয়দিনের জন্য সে হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, গণমাধ্যমগুলো কিছুদিন তাকে নিয়ে বেশ সরব ভূমিকা পালন করে। এরপরে আস্তে আস্তে থিতিয়ে যায় সবকিছু, বখাটেদের অত্যাচার-উৎপাত-নিপীড়ন চলতে থাকে আগের নিয়মেই; সুরাহা হয় না কোনো কিছুর। একটি সভ্য-স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এমনটি কারও কাম্য হতে পারে না।

নিজ-গৃহ, কর্মক্ষেত্র কিংবা বিদ্যালয় প্রাঙ্গন কোনো স্থানেই নিরাপদ নয় নারীরা। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গত ২৫ মার্চ,২০১০ শ্রেণীকক্ষের সামনে দন্ডায়মান পপি আক্তার (১১) এলাকার চার বখাটের ছোঁড়া এয়ারগানের বুলেটের আঘাতে তার ডান চোখটি হারায়। এই নারকীয় ঘটনা ধামাচাপা দিতে তৎপরতা চালাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল এবং এলাকার এক সালিশের মাধ্যমে তিন লাখ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত দিয়ে বখাটেদের অব্যাহতি দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। আবার এই ঘটনার ঠিক একদিন পূর্বে ২৪ মার্চ, ২০১০ গুলশানের কালাচাঁদপুরে ইয়াবাসেবনকারী যুবক রুবেল ও তার বন্ধু মিথুনের গুলির আঘাতে নিজগৃহে খুন হন ব্যবসায়ী সাদেকুর রহমান (৫৫) এবং তার স্ত্রী রোমানা নার্গিস (৪৫)। ঘটনার দিন ব্যবসায়ী সাদেকুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে স্কুল পড়ুয়া ছোটমেয়েকে বিয়ের জন্যে চাপ প্রদান করে অপহরনের হুমকি দেয় তারা। কথা কাটা-কাটির এক পর্যায়ে রুবেল ও মিথুন উক্ত দম্পতিকে হত্যা করে এবং পালিয়ে যায়।

রাষ্ট্রে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব যেখানে রাষ্ট্রের, সেখানে রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে? যেখানে মেয়েদের সুরক্ষা প্রদানে উপযুক্ত আইন নেই, যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে মৃত্যু ঘটে ইয়াসমিনদের, সেখানে নিত্যই এমন ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। বিগত কয়েক বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জে চারুকলার ছাত্রী সীমি বানু, খুলনার কলেজছাত্রী ফারজানা আফরিন রুমি কিংবা গাইবান্ধার ছোট্ট মেয়ে তৃষার ঘটনাসহ আরও অনেকের ঘটনাই আমাদের সামনে এসেছে, যারা বখাটেদের নিগ্রহের কারণে বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার পথ।

বর্তমানে ইভটিজিংয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। ১১টি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৯ সালে ইভটিজিংয়ের ঘটনা ঘটে ৫৪টি, এর মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ৭টি, তার মধ্যে আত্মহত্যার তিনটিসহ মোট মামলার সংখ্যা দশটি। এদিকে নারী নির্যাতন ও নানাপ্রকার যৌন হয়রানির মাত্রা যখন লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে তখন ২০০৯ সালের ১৪ মে যৌন নিপীড়নরোধে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে যুগান্তকারী এক রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগ (রিট মামলা নং ৫৯১৬/২০০৮)। রায়ে বলা হয়, জাতীয় সংসদে যতদিন পর্যন্ত যৌন হয়রানি রোধে কোনো আইন প্রণয়ন না করা হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত হাইকোর্টের দেয়া এ নির্দেশনা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর থাকবে। যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞা প্রদানপূর্বক আদালত বলেন- শারীরিক ও মানসিক যে কোনো ধরনের নির্যাতন যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। এছাড়াও পত্র মারফত, টেলিফোন কল, এসএমএস, কার্টুন, হয়রানির উদ্দেশ্যে বেঞ্চ-চেয়ার-টেবিল-দেয়াল লিখন, ভালোবাসার প্রস্তাবে অসম্মতি জ্ঞাপন করায় হুমকি প্রদর্শন, ব্ল্যাক মেইলের উদ্দেশ্যে ছবি তোলা অথবা ভিডিও চিত্রধারণ, পর্নোগ্রাফি, কাউকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সুন্দরী বলাও যৌন হয়রানির আওতাভুক্ত হবে। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী কেউ যদি কোনো নারীর শালীনতার অমর্যাদা করার জন্য কোনো মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি বা কোনো বস্তু প্রদর্শন করে তাহলে ওই ব্যক্তি এক বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে। অপরদিকে দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারার বিধানমতে- যেই ব্যক্তি কোনো নারীর শালীনতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বা সে তদ্দারা তার শালীনতা নষ্ট করতে পারে জেনে তাকে আক্রমণ করে বা তৎপ্রতি অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে, সেই ব্যক্তি যে কোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এছাড়াও ঢাকা মহানগরী পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ৭৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ রাস্তায় বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে কোনো মহিলাকে পীড়ন করে বা তার পথ রোধ করে অথবা অশালীন ভাষা ব্যবহার করে, অশ্লীল আওয়াজ বা অঙ্গভঙ্গি অথবা মন্তব্য করে তবে সেই ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদণ্ড বা দুই হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০(২) ধারায় নারীদের উত্ত্যক্তকরণের ফলে দোষী ব্যক্তির শাস্তির বিধান ছিল; কিন্তু অপব্যবহারের অজুহাত দিয়ে ২০০৩ সালে আইনটি সংশোধন করে এই বিধান বিলুপ্ত করা হয়। এর ফলে অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের যে সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি হয়েছিল তাও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে প্রচলিত আইনগুলো ইভটিজিং এবং মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়। এই অপরাধ রোধকল্পে কার্যকর কোনো আইনের অনুপস্থিতি এবং বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকর তথা অপরাধের বিপরীতে নগণ্য শাস্তির বিধানের ফলে একদিকে অপরাধীরা যেমন পার পেয়ে যাচ্ছে, অপরদিকে বখাটেদেরও নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না কিছুতেই।

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১০-এর বিভিন্ন পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা বা ইভটিজিং রোধকল্পে মাঠে নামছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। খবরটি যদিও-বা জনমনে আশার সঞ্চার করে, কিন্তু প্রশ্ন হলো এর কার্যকারিতা কতখানি। কেননা পূর্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ইভটিজিং প্রতিরোধে নানামুখী পদক্ষেপের কথা শোনা গিয়েছিল, তাতে কোনো প্রতিকার মেলেনি। সামপ্র্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো থেকে দেখা যায়, ইভটিজিং ও মেয়েদের নানা প্রকারে হয়রানিকরণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র নামধারী বখাটেদের হাতে লাঞ্ছিত হন দুই তরুণী, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বড়ীতলী গ্রামের এইচএসসি পরিক্ষার্থী রেশমা খাতুন (১৮) বখাটেদের অত্যাচারের হাত থেকে নিস্তার পেতে বেছে নেয় আত্মহননের পথ, অপরদিকে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ ক্যাম্পাসেই বহিরাগত যুবকদের দ্বারা লাঞ্ছিত হন দুই ছাত্রী। ওই ছাত্রীদের উদ্ধার করতে গিয়ে বখাটেদের মারধরে আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ছয়জন ছাত্র। এসব ঘটনা থেকে যে বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়, তা হলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের অবহেলা, কোনো সুনির্দিষ্ট কঠোর আইনি বিধির অভাব এবং জনগণের সচেতনতার অভাব- যার ফলস্বরূপ সমাজে বিদ্যমান ইভটিজিং তথা মেয়েদের নানা প্রকারে উত্ত্যক্তকরণের কোনো প্রতিকার মিলছে না।

নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ কনভেনশন (সিডও) এবং সংবিধানের মাধ্যমে স্বীকৃত শিক্ষার অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন তথা যৌন হয়রানি রোধ করতে হাইকোর্টের দেয়া দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে আইন প্রণয়ন জরুরি। পাশাপাশি এ ব্যাপারে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড সর্বস্তরে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে।

 

তিন ইন্দোনেশীয় নারী সংসদ সদস্যের
বাংলাদেশ সফর

সুবর্ণা সরকার



আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট (স্টেপস)-এর আয়োজনে গত ১৮-২০ জানুয়ারি ২০১০ ইন্দোনেশীয় তিনজন নারী সংসদ সদস্য বাংলাদেশ সফরে আসেন। এশিয়া প্যাসিফিক ফোরাম অন উইমেন, ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এপিডব্লিউএলডি)-এর ‘উইমেন এম পি এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় এ সফর অনুষ্ঠিত হয়। ইন্দোনেশিয়ার ’হাউস অব রিজিওনাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’-এর ভাইস চেয়ারম্যান এবং জোক জাকার্তার রানী মিসেস গুস্তি কেনজিং রাতু হেমাসের নেতৃত্বে সফরকারী দলে ছিলেন দু’জন নারী সংসদ সদস্য- মিসেস হাইয়ারিয়া এবং মিসেস ডেন্‌টি একা ইউডি প্রাতুই। সঙ্গে ছিলেন আরো দু’জন স্টাফ সদস্য- রাহমাত্‌ হলিজোন মাইজা এবং মোহাম্মদ বাইয়্যু।

অভিজ্ঞতা ও কর্মকৌশল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উভয় দেশের নারী সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সক্ষমতা বৃদ্ধিই ছিল এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য। সর্বস্তরের নারীর সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র তৈরিতে নারী সংসদ সদস্যরা যেন আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন, বিশেষত সংসদে নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নে যেন বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেন সেটাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিও এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। সফরকালে মিসেস গুস্তি কেনজিং রাতু হেমাসের নেতৃত্বে সফরকারী দল জাতীয় সংসদ ভবনে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মেহের আফরোজ চুমকিসহ অন্য নারী সংসদ সদস্যদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তারা দুই দেশের নারীদের সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। সংসদে নারী সদস্য সংখ্যা এবং তাদের ক্ষমতার পরিধি নিয়েও আলোচনা করেন। এছাড়াও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে সামাজিকভাবে কীভাবে দেখা হয় এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সম্ভাব্য উপায় নিয়েও তারা কথা বলেন। আলোচনাকালে মিসেস রাতু হেমাস বলেন, ইন্দোনেশিয়ায় সংসদে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। ২০০৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১.৬% আর ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮% (৫৬০ জনে ১০২ জন), ‘হাউস অব রিজিওনাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’-এ নারী সিনেটরের সংখ্যা ২০০৪ সালে ছিল ২১% (১২৮ জনে ২৭ জন) এবং ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭.৭% (১৩২ জনে ৩৫ জন)। এছাড়াও রাজ্য কাউন্সিলে নারী সদস্য সংখ্যা ২০০৪ সালে যেখানে ছিল ১০%, সেখানে ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১%। সংসদে নারীর এই অংশগ্রহণ বৃদ্ধিকে ইন্দোনেশিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ইতিবাচক বলে তারা মনে করেন। এখানে উল্লেখ্য, একজন নারী হিসেবে প্রথমবারের মতো মিসেস গুস্তি কেনজিং রাতু হেমাস ইন্দোনেশিয়ার ‘হাউস অব রিজিওনাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’-এর ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন, বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্যতামূলকভাবে ৩০% আসন নারীদের জন্য বরাদ্দ করে এবং ওইসব আসনে তারা সরাসরি নির্বাচন করে। একই রকম ব্যবস্থা বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ইতিবাচক হবে বলে বাংলাদেশের নারী সদস্যরা মত প্রকাশ করেন। সেই সাথে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রীসহ পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, কৃষি, মহিলা ও শিশুর মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে নারীর অবস্থানকে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য এক মাইলফলক হিসেবে বাংলাদেশের নারী সংসদ সদস্যবৃন্দ উল্লেখ করেন। এছাড়াও এই প্রথম মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান একজন নারী। তবে উভয় দেশেই রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এভাবে উৎসাহব্যঞ্জকভাবে বৃদ্ধি পেলেও এখনও সামগ্রিক চিত্রটা সন্তোষজনক নয়। তাই উভয়পক্ষই সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে তা দূরীকরনের পদক্ষেপ নেয়া এবং প্রচলিত আইন ও নীতিমালার পরিবর্তনের পক্ষে মতামত দেন। মতবিনিময় সভার পরে তারা সংসদ ভবন ঘুরে দেখেন এবং একটি অধিবেশনও পর্যবেক্ষণ করেন।
সফরকারী দল আসক-এর নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সুলতানা কামাল এ সময় সফররত দলের সদস্যদের কাছে মানবাধিকার রক্ষা এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষ তথা নারীর ক্ষমতায়নে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সাথেও মতবিনিময় করেন। সেখানে দু’দেশের বিদ্যমান আইনে নারীদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এছাড়াও আলোচনায় বাংলাদেশের নারী নেতৃবৃন্দ ইন্দোনেশিয়ার গোলযোগপূর্ণ আচেহ প্রদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান এবং বাংলাদেশের কিছু কিছু জায়গায়ও একই রকম কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সেক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সফররত দলের মিসেস ডেনটি বলেন, মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও ‘ইন্দোনেশিয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ নয়। কাজেই ধর্মীয় মৌলবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রশ্রয় দেয়া হয় না। তাই অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া একই অভিমত পোষণ করে বলে তিনি জানান। যেহেতু দুটি দেশই মুসলিমপ্রধান এবং মিশ্র সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, সেহেতু ইন্দোনেশীয় নারী সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবর্গের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উভয় দেশের নারীদের সামগ্রিক চিত্রের ইতিবাচক পরিবর্তনে নীতিমালা ও কর্মকৌশল প্রণয়ন সম্ভব হবে বলে উক্ত মতবিনিময় সভায় মত প্রকাশ করা হয়।

সফরের শেষ দিন ইন্দোনেশীয় তিনজন নারী সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাদের সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সম্মেলন শেষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিরোনামে তথ্যচিত্রের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস বিস্ময়ভরে দেখেন। সেইসাথে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে দেখার মধ্য দিয়ে সফরের পরিসমাপ্তি ঘটে।