সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   নারী
   তদন্ত
  আইনি-সংবাদ
   ফলোআপ
   সংখ্যাচিত্র

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

মত-অভিমত


ভূমি

মুক্তাশ্রী চাকমা (সাথী)

 

বাংলাদেশের মোট আয়তন ৫৬,৯৭৭ বর্গমাইল। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ৫,০৮৯ বর্গমাইল। দেশের ৯ শতাংশ আয়তন পার্বত্য চট্টগ্রামের। পুরো দেশে মাথাপিছু চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ ০.২২ একর। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ মাথাপিছু ০.১৪ একর। উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে ৩.১% তথা ১,২৪,১৬০ একর ভূমি সব ধরনের চাষের উপযোগী। কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে বাগান চাষের উপযোগী ১৮.৭% (৭,৫৫,৮৪০ একর)। ৫.৩% (২,১৪,৪০০ একর) পানি/বসতি এলাকা, অবশিষ্ট ৭২.৯% (২,৯৪৩,৩৬০ একর) খাড়া পাহাড় ও পর্বত।

দেশের সাধারণ ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থা হতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পূূর্ণ পৃথক। ১৮৬০ সাল থেকে জেলা আইন ১৮৬০ প্রণয়ন করে পাহাড়ি এলাকা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনাধীনে রাখা হয়। ১৯০০ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি প্রণয়ন করে। এক কথায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ ভারত কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনাধীন রাখা হয়, তা কখনো বাংলার শাসনাধীন ছিল না। এর কারণ মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন, বিচার ও ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা মূল ব্যবস্থা হতে পৃথক ছিল বলে। যেমন: দেশের সাধারণ আইন ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়েল ১৯০০’ অনুসারে সরকার ভূমির মালিক, কিন্তু ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০’ অনুযায়ী সরকার বনাঞ্চলের মালিক। অপর সব মৌজাধীন ভূমির মালিক মৌজায় বসবাসকারীরা।
১৯৭৯ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি’র ৩৪ নং বিধি সংশোধন করে অস্থানীয় অপাহাড়িদের ভূমি বণ্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শুধু ১৯৭৯-১৯৮৫ সালেই সরকারি পরিকল্পনাধীন ৫ লাখ সমতলবাসী পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি সংক্রান্ত পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছে।
গত ১৯-২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সংঘটিত ভয়াবহ সহিংসতা এরূপ অপরিকল্পিত, অসহিষ্ণু স্থানান্তরের কারণেই সংঘটিত হয়েছে। গঙ্গারামমুখের একটি পাহাড়ে অ-আদিবাসীদের বসতি স্থাপনের প্রচেষ্টা হতে এ ঘটনার সূত্রপাত। ঐ সময় আদিবাসীদের বাধার মুখে সেখানে বসতবাড়ি নির্মাণে অ-আদিবাসীরা ব্যর্থ হন। উল্লেখ্য, উক্ত পাহাড়টি সরকার প্রত্যাগত আদিবাসী শরণার্থীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করে। পরবর্তীকালে, ১৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা নাগাদ, যখন দু’জন আদিবাসী একটি স্কুটারে করে দীঘিনালার দিকে রওনা হয়, পথে জিপে চড়া অ-আদিবাসী কয়েকজন তাদের ওপর চড়াও হয়। এই সময় স্কুটারে চড়া আদিবাসীদের চিৎকারে কিছুসংখ্যক পাহাড়ি এবং বিপরীতে অ-আদিবাসীরাও এগিয়ে আসে। স্থানীয় পুলিশের হস্তক্ষেপে তখন তা মিটে যায়। সেদিনই রাত ৯টা নাগাদ স্থানীয় আদিবাসীদের গুচ্ছগ্রামে হামলা হয়। এ হামলায় সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের সরাসরি অংশগ্রহণের কথা জানা গেছে। এর মধ্যে শুধু জোন কমান্ডার ওয়াসিমকে দায়িত্ব হতে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দু’জনের লাশ পাওয়া গেলেও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে ছয়জন আদিবাসী ঐ দিন নিহত হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় বাঘাইছড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু মামলার বাদী মৃত বুদ্ধপুদি চাকমার (৩৫) স্বামী মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজস্ব আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন। এমতাবস্থায় প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা না পেলে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি সম্ভব নয়। এ সময় তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে আইনগত সহায়তা প্রদানের অনুরোধ জানান।

এরূপ সহিংস ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৩ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়িতে বাঘাইহাটের ঘটনার প্রতিবাদে ডাকা ধর্মঘট সামপ্র্রদায়িক দাঙ্গার রূপ ধারণ করে। একজন অ-আদিবাসী এ ঘটনায় নিহত হন। পঞ্চাশের অধিক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়, যার মধ্যে চল্লিশের অধিক বাড়ি আদিবাসীদের।

এ সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে জনসংহতি সমিতি এবং ইউপিডিএফ (চুক্তির পক্ষ ও বিপক্ষ দল) যেসব দাবি পেশ করে, তা প্রায়ই এক। জেলা প্রশাসকের কাছে জনসংহতি সমিতির দাবিগুলো হচ্ছে-
- অনতিবিলম্বে প্রধানমন্ত্রী ও আঞ্চলিক পরিষদের বৈঠক
- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন
- ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ
- সেনাবাহিনী প্রত্যাহার (অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহার)
- পুলিশ ক্ষমতার ব্যাপ্তিকরণ
- ত্রাণসামগ্রী নিশ্চিতকরণ
- পার্বত্য চট্টগ্রামে অহেতুক রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ
- সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ।
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন’ ছাড়া অন্য দাবিগুলো ইউপিডিএফের দাবিনামায় আছে।
১৯- ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তীব্র এবং বিচ্ছিন্নরূপে অদ্যাবধি পাবলাখালী, বরকল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার পেছনে স্থানীয় অধিবাসীরা বিগত ক্ষমতাসীন দলের খাগড়াছড়ির এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে দায়ী করেন। তার গঠিত বাঙালি সম-অধিকার পরিষদ এ ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসকের কাছে যে স্মারকলিপি পেশ করে তাতে নিম্নলিখিত দাবিগুলো স্থান পায়-
- পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউএনডিপি পরিচালিত বৈষম্যমূলক কার্যক্রম বন্ধকরণ (আদিবাসীদের অগ্রাধিকার প্রদানে যেসব প্রজেক্ট চালিত)।
- CHT কমিশন নিষিদ্ধকরণ।
- কালো চুক্তির (পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি) পুনর্মূল্যায়ন।
২৩ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়িতে ঘটে যাওয়া সামপ্র্রদায়িক দাঙ্গার পর র‌্যাব ও আর্মি কর্তৃক প্রায় ৭০ জন গ্রেফতার হয়, এর মধ্যে ২৬ জন বাঙালি। অভিযোগ উঠেছে দু’জন আদিবাসীকে বেধড়ক পিটিয়ে মারাত্মক জখম করার। গ্রেফতারের পর এদের পুলিশ প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। খাগড়াছড়িতে এ সহিংসতায় মামলা দায়ের হয়েছে তিনটি।
১ মার্চ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে প্রতিবেদক দেখতে পান- শরণার্থী শিবির থেকে প্রত্যাগত আদিবাসীদের সরকার হতে প্রদানকৃত যে গুচ্ছগ্রামে এ সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে, সেখানে আর্মি ক্যাম্প অতিক্রম না করে পৌঁছানো সম্ভব নয়। প্রশাসনের নাকের ডগায় এরূপ সহিংস ঘটনার সূত্রপাত প্রশাসনের সমর্থন ছাড়া সংগঠিত হওয়া সম্ভব কিনা তাও একটি প্রশ্ন।
১ মার্চ ত্রাণসামগ্রী বাঘাইহাট পৌঁছলে স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের আতঙ্কের কথা এ প্রতিবেদকের কাছে ব্যক্ত করেন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেসব স্থানে পুনরায় বসতি স্থাপনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অথচ ভূমি দখলের জন্যই মূলত এরূপ সহিংসতার সৃষ্টি। ‘পুনরায় বসতি স্থাপিত না হলে ঐ সকল ভূমি বেদখল হয়ে যাবে’- পার্বত্য চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ মত ব্যক্ত করেন। স্থানীয় অধিবাসীরা পুনঃবসতি স্থাপনের ব্যাপারে আগ্রহী কিনা জানতে চাইলে তারা নিরাপত্তাহীনতা ও আর্মি গাড়ি টহলদানের দিকে দৃষ্টি আর্কষণ করেন। নিরাপত্তা প্রদানকারীদেরই নিরাপত্তাহীনতার কারণ হিসেবে অধিবাসীরা কেন চিহ্নিত করছেন তাও সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এরূপ সহিংসতা ধারাবাহিকভাবে ঘটতেই থাকবে যদি না সরকার ভূমি সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হয়। ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন কমিশন ২০০১’ প্রণয়নই এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। উক্ত আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধাত্মকরূপে বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে আইন প্রণয়ন ছাড়াও সরকার যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারলে আদিবাসী ও বাঙালি অভিবাসীদের এ বিরোধ চরম আকার ধারণ করবে। এসব সমস্যা সমাধানে এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সম্ভাব্য উপায় ও পদ্ধতি নির্ধারণ, যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা দেশের সরকারের ওপর হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন।

তথ্যসূত্র
- পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসী জুম্মদের শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের রূপরেখা- শ্রী সুধাসিন্ধু খীসা।
- পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা- শ্রী গৌতম কুমার চাকমা।
- পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০।
- জেলা আইন ১৮৬০।
- মঙ্গল কুমার চাকমা, আদিবাসী অধিকারকর্মী।
- উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা, সভাপতি, খাগড়াছড়ি জেলা কমিটি, ইউপিডিএফ।
- ১৯-২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্রগুলো।
- পার্বত্য চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ ও ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত তথ্য ।

 

ছাত্ররাজনীতি বনাম দলীয় রাজনীতি

এটিএম মোরশেদ আলম


রাজশাহী মেডিকেল কলেজে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রথা প্রচলিত আছে। প্রথাটির নাম ‘মুরগি ধরা’। ভর্তি পরীক্ষার কঠিন সিঁড়ি অতিক্রম করে সর্বোচ্চ মেধাধারী যেসব ছাত্রছাত্রী এই চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়, ভর্তির দিন তাদেরকে নিজেদের দলে ভেড়ানোই হলো ‘মুরগি ধরা’। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা পরিবেশে এসে এসব ছাত্রছাত্রী পড়ে কল্পনাতীত বিড়ম্বনাময় ও যন্ত্রণাদায়ক এক পরিস্থিতিতে। তাদের নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে রীতিমতো টানাটানি হয় এবং দিনের শেষে হিসাব করা হয় কে কয়টা ‘মুরগি’ ধরতে পেরেছে। ‘মুরগি’ হিসেবে এভাবে ধরা দেয়ার ওপরই নির্ভর করে ভবিষ্যতে তাদের ক্যাম্পাসে অবস্থান, তাদের সিট বরাদ্দ এবং অনেক কিছু। নতুন ধরা এ ‘মুরগি’দের নিয়ে শোডাউন ও মিছিল করা হয় এবং দলীয় স্ল্লোগানে ক্যাম্পাস মুখরিত হয়। নবাগত ছাত্রছাত্রীদের মতামত এক্ষেত্রে কোনোমতেই আমলযোগ্য নয়। তারা দলের নেতাদের কথামতো মিটিং, মিছিলে যোগ দিতে বাধ্য।

নামের ভিন্নতা থাকলেও দেশের অনেক ক্যাম্পাসে প্রায় একই কায়দায় রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে এ দেশের অনেক ছাত্রছাত্রীর। রাজনীতিতে যাদের অভিষেক হয় এমন জোরজবরদস্তিমূলক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের কাছ থেকে সুখকর কিছু কালেভাদ্রে পাওয়া গেলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা হয় পূর্বসূরিদের অনুসারী এবং শিক্ষা লাভের যে অধিকার তাদের সহজাত বলে তারা জানতো অঙ্কুরেই তা পড়ে যায় হুমকির মুখে।

ছাত্ররাজনীতি নিয়ে দেশে বর্তমানে দুটি পক্ষ। প্রথম পক্ষের যুক্তি হলো, ছাত্ররাজনীতির একটা বিরাট ঐতিহাসিক অবদান আছে, যা আমাদের দেশের প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। ’৫২, ’৬৯, ’৭১ কিংবা হালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। কারো কারো মতে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও ছাত্র তথা যুব সমাজ একটা মুখ্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। অন্যদিকে, অপরপক্ষ ছাত্ররাজনীতির বর্তমান শীর্ণ অবস্থা, সহিংসতা, ক্ষমতার লড়াই, টেন্ডারবাজির ভয়াবহ চিত্র দেখে সমূলে ছাত্ররাজনীতিকে উৎপাটন করার পক্ষেই মত দিচ্ছেন। দুই পক্ষই তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো সঠিক। কিন্তু দ্বিতীয়পক্ষ যুক্তি উপস্থাপনের সময় ছাত্ররাজনীতির সামনে একটি শব্দ অতিরিক্ত যুক্ত করেন, সেটা হলো ‘দলীয়’। এই ‘দলীয়’ শব্দটার কারণেই আমরা আজ ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় অধ্যায়কেও অস্বীকার করতে দ্বিধা করছি না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭, ৩৮ এবং ৩৯ অনুচ্ছেদকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রত্যেক নাগরিকের সমাবেশ করার অধিকার আছে, তারা পছন্দমতো দল করতে পারবে এবং তাদের চিন্তা স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করতে পারবে। এগুলো প্রত্যেকের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অর্থে ছাত্ররাও তাদের পছন্দমতো দল করবে- এটা সাংবিধানিকভাবেই স্বীকৃত। আবার শিক্ষা হলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে এই চাহিদা পূরণে দায়বদ্ধ। এই দায়বদ্ধতা থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিক্ষাঙ্গনে সঠিক পরিবেশ রক্ষা করা, সময়মতো পরীক্ষা নেয়া এবং ছাত্রছাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া। সুতরাং যেসব ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হতে চায়- তারা রাজনীতির সাথে যুক্ত হবে এটা তাদের অধিকার কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তারা অন্যের অধিকারকে লঙ্ঘিত করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে পারবে না।

নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডির মধ্যে থেকে গণতন্ত্র চর্চা করা, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা, সাধারণ ছাত্রদের দেশকে ভালোবাসার কথা বলাই হলো ছাত্ররাজনীতি। ছাত্ররা সরকারকে তাদের যৌক্তিক দাবি পূরণ, দেশের কল্যাণে সরকারের যে কোনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ হতে বিরত রাখার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পারে। কিন্তু কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে অন্য পক্ষের বিরোধিতা করে শিক্ষাঙ্গনের সাধারণ ছাত্রছাত্রীর ভোগান্তির কারণ হতে পারে না। কিন্তু সামপ্র্রতিক সময়ের ছাত্র সংঘাতগুলোর প্রকৃতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে-সবগুলোই ছিল রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তার, হল দখল, ভর্তিবাণিজ্য, টেন্ডার দখল ইত্যাদি অছাত্রসংক্রান্ত উদ্দেশ্যে।

২০০৯ সালে সংশোধিত জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৯০বি ধারার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধনের যে শর্ত দেয়া হয়েছে তাতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, যদি কোনো দলের সাথে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র সংগঠন থাকে তাহলে সেই দল নিবন্ধনের অযোগ্য হবে। অর্থাৎ কোনো ছাত্র সংগঠন জাতীয় রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হতে পারবে না। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের স্বার্থে তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ছাত্র সংগঠনগুলোকে বাদ দিলেও তা শুধু কাগজের পৃষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের অবস্থা একই। আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের প্রধান কার্যালয়ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের ভবনে। এমনকি ছাত্রলীগের সব কার্যক্রমকে দেখভাল করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের তিনজন সাংগঠনিক সম্পাদক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আহমদ হোসেন এবং বি এম মোজাম্মেল হককে। ছাত্রদলের চিত্রও অভিন্ন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে ছাত্রদল। ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন বিএনপির নির্বাহী কমিটির ছাত্রবিষয়ক সহ-সম্পাদক এবং ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০ প্রথম আলোতে প্রকাশ, ‘ছাত্রদলের বর্ধিত সভা কাল, দিকনির্দেশনা দেবেন খালেদা জিয়া’, ১৫ মার্চ ২০১০ একই পত্রিকায় প্রকাশ- ‘আওয়ামী লীগের কোন্দলে ছাত্রলীগ নেতা খুন’- এরকম আরো হাজারো খবর প্রতিদিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এসব খবর থেকে অনুমান করা কষ্টসাধ্য নয় যে, কাগজে-কলমে ছাত্র সংগঠনগুলো দলের অংশ না হলেও বাস্তবে দলীয় নেতারাই পরিচালনা করে ছাত্র সংগঠনগুলো। ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনও এর বাইরে নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফারুক নিহত হওয়ার পর গ্রেফতার হওয়া শিবির কর্মীরা তো স্বীকারই করে নিয়েছে যে, তারা এই কাজ করেছে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নির্দেশে (ইকরামের স্বীকারোক্তি: শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলা করে শিবির, প্রথম আলো, ৮ মার্চ ২০১০)।

ছাত্ররাজনীতির এই অবস্থার পেছনে শিক্ষকদের ভূমিকাও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ইন্ধন, কোনো ক্ষেত্রে তাদের নিষ্ক্রিয়তা ছাত্রদের অছাত্রসুলভ সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়। এ প্রসঙ্গে ড. জোহা স্মারক বক্তৃতায় সুলতানা কামালের একটি বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। “কোন প্রশ্রয়ে, কোন আশ্রয়ে ছাত্ররা বা ছাত্রের নাম ধরে সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এমন অনাচার ঘটাতে পারে দিনের পর দিন, বিনা প্রতিরোধে, কোনো জবাবদিহিতা বা শাস্তির আশঙ্কা না রেখেই? কেন বিশ্ববিদ্যালয় হবে অত্যাচার, হত্যা, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন আর দখলবাজির আস্তানা? এর দায়দায়িত্ব কে নেবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিক্ষকদেরও তাকাতে হবে নিজের দিকে।” ব্যতিক্রমধর্মী সম্মানিত শিক্ষকদের বাদ রেখে বলতে চাই, প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকরাও দলীয় রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হয়ে পড়েছেন। লাল দল বা সাদা দলের ব্যানারে তারা কোনো না কোনো দলকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে সেই বিশেষ দলের নেতাদের মন রক্ষার্থে অথবা তাদের খুশি করতে তারাও অশিক্ষকসুলভ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। কে সিন্ডিকেটের সদস্য হবেন, হলের প্রভোস্ট কে হবেন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান কে হবেন, রেজিস্ট্রার কে হবেন ইত্যাদি সবই এখন নির্ভর করে দলের বিবেচনার ওপর। আর এ কারণেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসিসহ অন্যান্য পদে রদবদলের হিড়িক লেগে যায়।

সবশেষে একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করতে চাই। পত্রিকা অনুসারে ২০০৯ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে মোট ৩৬০টি। এতে আহত হয়েছে ৪,২৫৮ জন এবং নিহত হয়েছে ৪১ জন। পত্রিকাতে প্রকাশিত এসব সহিংসতার খবর পড়লে দেখা যায়, যদিও এগুলোকে রাজনৈতিক সহিংসতা বলা হচ্ছে কিন্তু এসবের বেশিরভাগ সহিংসতাতেই নিজ নিজ দলের ছাত্র সংগঠনগুলো জড়িত ছিল। তারাই বেশি আহত হয়েছে এবং সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে তারাই জীবন দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। অথচ আইন অনুসারে তাদের এসব রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত রাখারই কথা ছিল না। সুতরাং স্পষ্টতই বোঝা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের ব্যবহার করে তাদের হাতিয়ার হিসেবে। আর এ কারণেই আজ ছাত্ররাজনীতি এতো কলুষিত, এতো নিন্দিত এবং এতো সমালোচিত। সরকারসহ সব রাজনৈতিক দলের কাছে তাই দাবি জানাই, ছাত্রদের আর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হোন এবং সাধারণ ছাত্রদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করুন। নচেৎ দিনবদলের স্বপ্ন কোনোদিনই বাস্তবে পরিণত হওয়ার নয়।