প্রচ্ছদ-কাহিনী
যুদ্ধাক্রান্ত নারীর পুর্নবাসন 
“উৎসাহ দেয়া হতো, যাতে ওরা একটা বিজনেস গড়ে তোলে ওদের কমিউনিটিতে।”
- তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ
যুদ্ধাক্রান্ত নারীদের পুনর্বাসনে ১৯৭২ সালে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তার মধ্যে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টাটি ছিল অন্যতম। তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ শুরু থেকেই নিজেকে এ কাজে সম্পৃক্ত করেন। তিনি পুনর্বাসনের আওতায় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির দায়িত্ব গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত। ৯ নভেম্বর ২০০৯, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সদস্য মিসেস তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন শাহীন আখতার ও বাসবী বড়ুয়া। দীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারে পুনর্বাসন কর্মসূচির বহুমুখী উদ্যোগের পাশাপাশি যুদ্ধাক্রান্ত নারীর জীবন-সংগ্রামের নানাদিক ফুটে উঠেছে।
যুদ্ধাক্রান্ত নারীদের পুনর্বাসনে ১৯৭২ সালে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তার মধ্যে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টাটি ছিল অন্যতম। তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ শুরু থেকেই নিজেকে এ কাজে সম্পৃক্ত করেন। তিনি পুনর্বাসনের আওতায় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির দায়িত্ব গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত। ৯ নভেম্বর ২০০৯, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সদস্য মিসেস তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন শাহীন আখতার ও বাসবী বড়ুয়া। দীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারে পুনর্বাসন কর্মসূচির বহুমুখী উদ্যোগের পাশাপাশি যুদ্ধাক্রান্ত নারীর জীবন সংগ্রামের নানাদিক ফুটে উঠেছে।
আসক: আপনি ১৯৭২ সালে যুদ্ধাক্রান্ত নারীদের পুনর্বাসন কাজে যে জড়িত ছিলেন, সে সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। কীভাবে জড়িত হলেন?
তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ: আমি কুমিল্ল্লা একাডেমীতে ১৯৬৩ সালে জয়েন করি। ওখানে ছিলাম ইনস্ট্রাকটর, উইমেনস্ প্রোগ্রামের পরে ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটরের চার্জও আমাকে দিলেন আকতার হামিদ খান সাহেব। ওনার সাথে সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। ওখানে যখন ছিলাম, তখন শেখ সাহেবের ৭ মার্চ বক্তৃতার পরে, ৮ মার্চ আমার স্বামী ঢাকা থেকে এলো কুমিল্লায়। এসে বলল যে, মনে হচ্ছে খুব একটা গণ্ডগোল লাগবে, ঢাকায় চলো। ও আমাকে নিয়ে এলো ঢাকায়। তারপর তো আমার হাজবেন্ডকে বাসা থেকে আর্মি ধরে নিয়ে গেল। ও আর্মি ক্যাম্পে ছিল আড়াই মাসের মতো। জুন মাসে ওকে ধরে নিয়ে গেল। জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর মাসে ওকে ছাড়লো।
আসক: ওই সময়টায় আপনি কোথায় ছিলেন? আপনার অবস্থা কেমন ছিল?
তা. আ. তখন I was carrying. আমার একটাই বাচ্চা। আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমার বোন-দুলাভাইয়েরা এলেন। এসে আমাকে বললো যে, তুই চল। বাসা লক করে আমরা চলে গেলাম। তারপরে তো পুরো সময় ওখানেই ছিলাম।
দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আজিজুল হক সাহেব বার্ড-এর ডিরেক্টর ছিলেন। আমি ডিসাইড করলাম যে, ওখানে আর যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। আমার ছেলে ছোট, তারপর আমার স্বামীর এরকম অবস্থা।
’৭২ সালে যখন জাস্টিস সোবহানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার affected women-দের জন্য উইমেন রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন খুললেন তখন আমি ডাইরেক্টর, ট্রেনিং হিসেবে সেখানে যোগ দিই। আমাদের মেইন অফিস ছিল মোহাম্মদপুরে। ওখানে একটা ট্রেনিং সেন্টারও ছিল। আর বেইলী রোডে ফেডারেশন অব ইউনিভার্সিটি ওমেন-এর বিল্ডিং-এ উইমেন্স ক্যারিয়ার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট চালু করা হয়। ওদের বাড়িটা হচ্ছে হোস্টেল, ওখানে আমরা একতলাটা ভাড়া নিয়েছিলাম। দ্বিতীয় তলায় হোস্টেল ছিল।
আসক: ওখানে হোস্টেলে কারা থাকতো?
তা. আ. ওটা চাকরিজীবী মেয়েদের জন্যই খোলা হয়েছিল। আমরা ভাড়া নিয়েছিলাম একতলাটা, একতলায় ঢুকেই বাঁ হাতে একটা অফিস ছিল আর অফিসের পাশেই আমাদের অ্যাকাউন্টস অফিস ছিল। তারপরেই একটা বড় হল ছিল। এখনো আছে। হলটাতে আমাদের অফিস সেক্রেটারিয়াল কোর্সটা হতো। আর আরেক পাশটায় আমরা শুরু করলাম বাঁশ-বেত, জুট আর সেলাইয়ের কাজ। এদিকে কয়েকটা রুম ছিল সেখানেও আমাদের ট্্েরনিং প্রোগ্রামটা হতো। war affected women--দের জন্য ট্রেনিংগুলো করানো হতো। সেসময় সেক্রেটারিরা বেশিরভাগ অ্যাংলো ইন্ডিয়ানই ছিল। আমাদের মেয়েরা সেক্রেটারি হিসেবে খুব একটা যেত না। কিন্তু এখানে সেক্রেটারিয়াল কোর্সে শুধু টাইপিং না, শর্টহ্যান্ড ইত্যাদি ছিল। কোর্সটিচার মিসেস আকবর ছিলেন এবং দু’জন আইরিশ মহিলাও ছিলেন। আরেকজন ছিলেন মিসেস আলম, এরা দু’জনে সেক্রেটারিয়াল কোর্সটা করাতেন।
আসক: আপনি যে আইরিশ মহিলাদের কথা বললেন, ওনাদের কি যুদ্ধ উপলক্ষে এখানে আসা?
তা. আ. হ্যাঁ, ওনারা ওভারঅল সেক্রেটারিয়াল কোর্স ম্যানেজমেন্টে ছিলেন। মিসেস আলম আর মিসেস আকবর দু’জনেই খুব ভালো টিচার ছিলেন। মিসেস আকবর তো এক্সটারনাল এসে যদি একটু কম নাম্বার দিতেন তো কাঁদতে শুরু করে দিতেন। এত বেশি সিরিয়াস ছিলেন।
আসক: ওনারা কি এ কাজটার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ছিলেন নাকি চাকরিজীবী হিসেবে?
তা. আ. না, চাকরিজীবী হিসেবে, আমারটাও চাকরিই ছিল। আমরা অ্যাকাউন্টসে একজন ফ্রেশ অ্যাকাউন্ট্যান্ট নিয়েছিলাম। তারপরে সেলাই ট্রেনিংয়ে আমাদের ছিলেন সামসুন নাহার। শেখ সাহেবের আত্মীয়। উনিও খুব সিনসিয়ার ছিলেন। শেখ সাহেবের বোন বলে যে আলাদা অ্যাডভান্টেজ নিতেন তা না, খুব সিনসিয়ারলি শেখাতেন। আর বাঁশ-বেতের জন্য, জুটের জন্য আমরা নিয়ে এলাম হলিক্রসের একজন সিস্টারকে। জুটের একটা এক্সিবিশনও হয়েছিল। জুট কার্পেটের জন্য আমরা ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছিলাম।
আসক: আপা এখন মেয়েদের সম্পর্কে জানতে চাইবো।
তা. আ. ওখানে যারা সেক্রেটারিয়াল কোর্সে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিল ওয়ার এফেক্টেড উইমেন, যাদের স্বামী মারা গেছেন অথবা স্বামী নিখোঁজ তারাই বেশি। এছাড়া পাকিস্তান আর্মির শিবিরে অত্যাচারিত মহিলাও বেশ কিছু ছিলেন। একটা গাছে বাজ পড়লে গাছটা যেমন হয়ে যায়, এই ধরনের। এদের অনেকেই তেমন বোবা চোখে তাকিয়ে থাকতেন। আমি কারও নাম বলতে চাই না। তাদের ওপর এত অত্যাচার হয়েছিল! সেলাইয়ের ওপর একজনকে ট্রেনিং দিয়েছিলাম, তার চারটি বাচ্চা। সে তাদের রেখে স্বামীর খোঁজ করতে বেরিয়েছিল। স্বামী বোধহয় বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে ছিল। তার স্বামীর খোঁজ তো পায়ইনি, পথে তাকে আর্মিরা টেনে নিয়ে যায়। তারপর এক হাত থেকে আরেক হাত, এরকম করে তারপর সে ছাড়া পায়। সে এসেছিল ট্রেনিং নিতে। তার দুটি বাচ্চাকে এতিমখানায় দিয়ে দিয়েছিল আর দুটি বাচ্চাকে নিজের কাছে রেখেছিল।
আসক: স্বামীর আর কোনো খোঁজ পায়নি?
তা. আ. না, তার স্বামীর আর কোনো খোঁজ পায়নি। আরেকজন হিন্দু মেয়ে ছিল দেখতে খুব সুন্দর। সে যখন আমাদের এখানে আসে, তখন তার বয়স ছিল বড়জোর ২০-২২ বছর। সেও ছিল আর্মি ক্যাম্পে। যখন যুদ্ধ শেষ হলো তখন ছাড়া পেল। তারপরে ও সেই ট্রেনিংটা নেয়।

আসক: ও কোন ট্রেনিংটা নিয়েছিল?
তা. আ. ও সেক্রেটারিয়াল কোর্সে ছিল। আমরা সেক্রেটারিয়াল কোর্সে ম্যাট্রিক পাস হলেই নিয়ে নিতাম। ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওয়াইফ এসে স্পোকেন ইংলিশ এবং রিডিং ইংলিশের ক্লাস নিতেন। উনি voluntary service দিতেন। অনেকদিন পর ওর সাথে (হিন্দু মেয়েটির সাথে) দেখা হয় উদয়ন স্কুলে। আমি আমার ছেলেকে উদয়ন স্কুলে একবার নিতে গিয়েছিলাম, তখন ওর বিয়ে হয়েছে এবং ও ওর বাচ্চাকে নিতে এসেছে। এত ভালো লেগেছিল! আরেকজন ছিলেন এক উচ্চ পদস্থ সরকারি অফিসারের স্ত্রী, স্বামীকে পাক আর্মিরা মেরে ফেলে। তিনি ট্রেনিং কমপ্লিট করে বিমানের লন্ডন ব্রাঞ্চে চাকরি নিলেন এবং ওখান থেকেই রিটায়ার করেছিলেন। আরেকজন ছিলেন এক নিখোঁজ ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী, সে আইসিডিডিআরবিতে চাকরি নেয়। এরকমভাবে বিভিন্ন বড় বড় জায়গায় মেয়েদের চাকরি নেয়াতে এই সেক্রেটারিয়াল ট্রেনিংয়ের স্ট্যাটাস বেড়ে গেল। যেখানে আগে সেক্রেটারিদের নিচু চোখে দেখা হতো, সেক্রেটারিদের মনে করতো যে are easily accessable, সস্তা মনে করতো, সে জিনিসটা আর থাকলো না। আমরা কোর্সের সময় একটা ইন্টার্নশিপ দিতাম বিভিন্ন অফিসের সাথে যোগাযোগ করে। আমরা সেসব অফিসের কর্মকর্তাদের নিয়ে আসতাম বলার জন্য যে সেক্রেটারি হিসেবে what is their demand।
আসক: ইন্টার্নশিপের জন্য যেসব অফিসে পাঠাতেন, ওখানে তাঁদের পরিচয়টা জানানো হতো?
তা. আ. না। আমরা কারও পরিচয়ই কাউকে বলিনি। আমি এখনও বলি না।
আসক: এই প্রতিষ্ঠান থেকে এই ট্রেনিংয়ে মেয়েরা আসছে, এই মেয়েরা হলো মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনা- এই পরিচয়টা জানাজানি হতো না?
তা. আ. না! আমরা সেক্রেটারিয়াল কোর্স করতে আসছি। জাস্ট সেক্রেটারিয়াল কোর্স- ব্যস। মেয়েগুলো এখন এস্টাবলিশড হয়েছে। সেই ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী, যার স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সে একদম পাথর হয়ে গিয়েছিল। তার এক ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেটার আবার ডান হাতটা অবশ। এরা এখনও আমার সাথে যোগাযোগ করে। কিন্তু আমি কখনও এই ধরনের বিষয়গুলো তাদের মুখ থেকে বের করার চেষ্টা করি না।
আসক: কিন্তু তাঁদের দিক থেকে যদি বলার ইচ্ছে হয়?
তা. আ. এ বিষয়টা নিয়ে আমি চিন্তা করতে চাই না। আমি ঐ সময়টাকেই ভুলে যেতে চাই। আমার নিজের সময়টাকেও ভুলে যেতে চাই, ওদের সময়টুকুও আমি ভুলে যেতে চাই। ওদের একেকজনের যে কী অবস্থা! আমি ভুলে যেতে চাই।
আসক: যারা আসলে রিয়েল ভিকটিম ছিল, তাদের কাজ শেখার মনোযোগটা কেমন ছিল?
তা. আ. প্রথম থেকে তো ছিল না, তাদের নানাভাবে কাউন্সেলিং করতে হয়েছে। অনেক কাউন্সেলিং করতে হয়েছে তাদের জন্য। ‘আমার তো কিছু হবে না’- এই ধরনের নেগেটিভ মনোভাব ছিল তাদের। প্রথমে তো কথাই বলবে না। একদম থম মেরে রয়েছে। একটা, দুটো, তিনটা সিটিংয়ের পরে হঠাৎ করে কথা বলেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো নিজে নিজেই খুলে বলেছে। নিজে যখন বলেছে, তখনই আমরা শুনেছি। কিন্তু কখনো আমরা জিজ্ঞেস করিনি, আপনার প্রতি কী করা হয়েছিল। সে যখন তৈরি হয়েছে বলার জন্য, নিজে এসে তখন বলেছে- আপা, আমার ওপর যে কী গেছে আপনি তো জানেন না। যখন বলতে চেয়েছে তখন শুনেছি, তখন সময় দিয়েছি। যতক্ষণ বলতে চেয়েছে ততক্ষণ শুনেছি। কিন্তু যতক্ষণ না ওরা নিজে থেকে বলতে চেয়েছে, আমরা কখনও কাউকে জিজ্ঞেস করিনি কী হয়েছে। আমাদের মেইন উদ্দেশ্য ছিল ওদেরকে সাহায্য করা। অন্ধকার থেকে বের করে আনা এবং একটা লাইন ধরিয়ে দেয়া যেন সমাজে ওরা তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে মিশতে পারে। এই জিনিসগুলো আমাদের লক্ষ্য ছিল।
আসক: কাউন্সেলিং আপনারাই করাতেন?
তা. আ. আমরা যারা ছিলাম, আমরাই করতাম। আমরা ট্রেনিংয়ে কাউন্সেলিং করতাম।
আসক: এ ব্যাপারে আরেকটু বলবেন?
তা. আ. হয়তো টিচার এসে বললো, আপা আজকে একদমই মন দিচ্ছে না। কেউ হয়তো দু’দিন আসেনি। খবর পাঠাতাম বাড়িতে, লোক পাঠাতাম। কেমন আছো? শরীর-টরীর ভালো আছে কিনা? একদিন দু’দিন যাওয়ার পরে হয়তো এসে আবার থম মেরে বসে আছে। তারপরে ওই যে আরও পাঁচ জন শিক্ষার্থী আছে, তাদের সাথে মিশে মিশে কথা বলে বলে দেখতো যে আমি একা না, আরো অনেকে আছে আমার মতো।
আসক: আপনাদের ট্রেনিংয়ে যারা অংশ নিতেন, তাঁরা কি ফ্যামিলিতে একসেপ্টেড, ফ্যামিলির সঙ্গে থাকতেন? নাকি পুনর্বাসন কেন্দ্র বা হোস্টেলে?
তা. আ. অনেকে একসেপ্টেড ছিল না। অনেকের ফ্যামিলি ছিল না। অনেক মেয়ের হয়তো অ্যাবোরশন করিয়েছে। তারপর আমাদের এখানে ট্রেনিংয়ে পাঠিয়েছে কিংবা ইস্কাটনের ট্রেনিং অফিসে। ফ্যামিলির সাথে কোনো যোগাযোগ নেই, তারা নিজেরাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। আবার এদের মধ্যে অনেকে হয়তো খুব বড়লোকের পাল্লায় পড়ে গেছে। বড়লোকের পাল্লায় পড়ে গিয়ে পরে আবার সুইসাইড করেছে। এরকম ঘটনাও ঘটেছে। কেউ হয়তো ফুসলিয়ে আরেক জায়গায় নিয়ে গেছে। তারপরে একহাত থেকে আরেক হাত। তারপরে হারিয়ে গেছে। এরকমও হয়েছে।
জাস্টিস সোবহানের নেতৃত্বে আমাদের কাজটা অনেক সহজ হয়েছিল। উনার কথা বললে শেষ করা যাবে না। প্রত্যেক দিন সকালবেলা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার আগে একবার আসতেন। এসে যা যা কাজ, করে দিয়ে যেতেন। আর যত রাতেই হোক টেলিফোন করতেন। সব যোগ্য লোকেরা একসঙ্গে হয়েছিলেন, তার ফলে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পেরেছিলাম।
আসক: উনি তো ওভারঅল দায়িত্বে ছিলেন?
তা. আ. হ্যাঁ। ছোটখাটো সব বিষয় উনার সাথে শেয়ার করা যেত।
আসক: ট্রেনিংয়ের মূল দায়িত্বে তো আপনি ছিলেন?
তা. আ. হ্যাঁ, আমি ছিলাম।
আসক: আবার আগের কথায় ফিরে আসি। যাদের ফ্যামিলি একসেপ্ট করেছে তাদের মানসিক বিষয়টা একধরনের, আর যারা একসেপ্টেড হয়নি তাদের অবস্থা আরেক ধরনের, এ রকম কিছু কি মনে হয়েছে?
তা. আ. আমরা তো ঐ জিনিসগুলো খুব একটা খুঁটিয়ে দেখতাম না। কয়েকজন ছিল যাদের স্বামীকে মেরে ফেলেছে, যেমন বললাম একজন সেক্রেটারির বোনের স্বামীকে মেরে ফেলেছে, একজন ইঞ্জিনিয়ারকে মেরে ফেলেছে। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের ফ্যামিলি তো তাদের আগলে রেখেছিল- সব ধরনের সাপোর্ট দিতো।
আসক : উনারাও আসতেন ট্রেনিং নিতে?
তা. আ. এরা সব ট্রেনিং নিতে আসতো এবং এরা শুধু ট্রেনিংই নেয়নি, ভালো ভালো পোস্টেও ওদের চাকরি হয়েছিল। আর কিছু ছিল যারা রেপড হয়েছিল, আর্মি ক্যাম্পে ছিল। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ফ্যামিলি একসেপ্ট করেনি। ফ্যামিলি এদের সাথে যোগাযোগ করেনি। আমরা কোনোদিন জিজ্ঞাসা করিনি যে তাদের কী ইতিহাস। এক মহিলার কথা বললাম না, যে সেলাইয়ের ট্রেনিং নিয়ে পরে আবার পিয়নের চাকরি নিয়েছিল! সে অনেক দিন পরে এসে আমাকে তার ইতিহাস বলেছিল। সে প্রায়ই এসে দেখা করে যেত। সে তার ফ্যামিলিতে ফিরে যায়নি। তার দুটি বাচ্চাকে এতিমখানায় দিয়ে দিয়েছিল। আর দুটি বাচ্চা তার কাছে ছিল। কাজেই তার বাচ্চাদের মানুষ করার উদ্দেশ্যে সে হোস্টেলে ছিল। তার ফ্যামিলি তাকে নিল কিনা she wasn’t worried about that. আরেকজন মেয়ে যার সঙ্গে উদয়ন স্কুলে বাচ্চা আনতে গিয়ে দেখা হয়েছিল, ওর ইতিহাসটা আমি জানি এইজন্য যে, ওই আমাকে বলেছিল। ও সুন্দর ছিল বলে ওকে বোধহয় ওর বসরাও খুব বিরক্ত করতো। পরে ও আমাকে ওর ঘটনাটা বলেছিল।
আসক: কত বছর পরে এসে বলেছিল?
তা. আ. কাছাকাছি সময়েই, আমি তো আবার ১৯৭৪ সালে ইনস্টিটিউট ছেড়ে চলে যাই। ওই সময়ের ভেতরেই।
আসক: বিভিন্ন রকমের ট্রেনিং- এটা কি মেয়েদের পছন্দ অনুযায়ী হতো নাকি লেখাপড়া বা যোগ্যতা অনুযায়ী আপনারা ঠিক করে দিতেন?
তা. আ. লেখাপড়া না জানলে তো সেক্রেটারিয়াল কোর্সটা পারবে না। সেলাইয়েও মাপজোখ লিখতে হবে। কাজেই এসব ক্ষেত্রে লেখাপড়া জানাটা জরুরি ছিল। সেক্রেটারিয়াল কোর্সে আমাদের বাংলায়ও কোর্স ছিল এবং ইংরেজিতেও কোর্স ছিল। কিন্তু জুট ও বাঁশ-বেতে লেখা পড়া না জানলেও চলতো।
আসক: ড্রপ আউট কেমন ছিল?
তা. আ. খুব কম ছিল। ব্যাপার হচ্ছে কি, একা ঘরে বসে না থেকে এখানে এসে অন্য মেয়েদের সাথে কথা বলা- এটারও একটা আকর্ষণ ছিল রেপ ভিকটিম মেয়েদের। যে পাঁচজন মেয়ের সাথে কথা বলতো, তারা তো তাদেরই বন্ধু। বাড়িতে কেবল ওই এক কথা। কিন্তু এখানে তো বিভিন্ন সাবজেক্ট নিয়ে কথা বলছে, এটা হচ্ছে ওটা হচ্ছে, সেজন্যও পরিবেশটা ওদের আকর্ষণ করত।
আসক: ট্রেনিং সেন্টারটা কি ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চলছিল?
তা. আ. পরেও চলেছে, অন্য মেয়েরা ট্রেনিং নিয়েছে। এখনো তো চলছে।
আসক: ’৭২-এর পুরো সময়টা নিশ্চয়ই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েরা ট্রেনিং নিয়েছে। পরেও কি এসেছে?
তা. আ. আমার ঠিক মনে নেই। আমি ’৭৪ পর্যন্ত ছিলাম এবং তখন ওয়ার এফেক্টেড নয় এমন মেয়েরা আসতে শুরু করে দিয়েছে।
আসক: কত মাসের ছিল কোর্সটা?
তা. আ. লম্বা কোর্স ছিল। এক বছর তো বটেই। এটা একটা প্রফেশনাল ট্রেনিং, বাইরে থেকে এক্সটারনালরা আসতেন। পরীক্ষা হতো সেক্রেটারিয়াল কোর্সে। রেগুলার পরীক্ষা হতো। আমরা সার্টিফিকেট দিতাম। বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণকে আমরা খুব আকর্ষণীয় করেছিলাম। বাঁশ, বেতের কাজ, সেলাইর কাজ, জুটের কাজ। বাঁশ-বেতের মোড়া তারপর ঝুড়ি তৈরি করা- এগুলো হলিক্রসের শিক্ষয়িত্রীরাই করাতেন। সিস্টার ফ্রান্সিস ছিলেন, আরেকজন সিস্টার ছিলেন, নাম মনে নেই। খুব যত্ন করে শেখাতেন। মিসেস নাহার ছিলেন সেলাইয়ে।
আসক: আরও কিছু প্রফেশন ’৭২-এ ইনট্রুডিয়ুস করা হয়েছিল যেমন- রান্নাবাড়া, আচার তৈরি- এগুলো কোথায় হতো?
তা. আ. এগুলো আমাদের ওখানে হতো না। এগুলোর মোহাম্মদপুরে ট্রেনিং হতো। ওখানে একটা ডে কেয়ার সেন্টারও ছিল।
আসক: মোহাম্মদপুর কোন এলাকায় ছিল?
তা. আ. বাবর রোডে ঢুকেই ডানদিকে একটা দোতলা বাড়ি ছিল। ওখানে হেড অফিস ছিল, প্লাস ট্রেনিং সেন্টার ছিল। ওখানে একটা ডে কেয়ার সেন্টারও ছিল। বাচ্চাদের জন্য, মায়েদের বাচ্চাদের জন্য।
আসক: ধানমণ্ডি ২ নম্বরের সাদা বাড়িটায়?
তা. আ. হ্যাঁ। বিদেশি ডাক্তাররা ওখানে ছিলেন। ওখানে অ্যাবোরশনগুলো হতো। আবার বাচ্চাগুলোকে ওখান থেকে বিদেশে নিয়ে যেত।
আসক: নারী পুনর্বাসনের ব্যাপারে নীলিমা ইব্রাহিম বা মালেকা খান তাদের সাথে কি আপনার যোগাযোগ ছিল? ওনারা কি ট্রেনিং সেন্টারে আসতেন মেয়েদের দেখতে?
তা. আ. সাজেদা আপা আসতেন। সাজেদা আপা আসতেন নিয়মিত। হামিদা হোসেন আর মিসেস নার্গিস জাফর আসতেন। মালেকা খান ছিলেন গার্ল গাইডে। অফিসটা আমাদের ট্রেনিং সেন্টারের পাশে। ওইজন্য মালেকা খানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তারপরে মাজেদা আপা ওনাকে মীরা আপা বলে সবাই ডাকত। মালেকা খান, মাজেদা আপা ওরা সব গার্ল গাইডের সঙ্গে জড়িত ছিল। মালেকা খানের বোন আমাদের এখানে পুতুল বানানো শেখাতো। ওর ভাই মারা যাওয়ার পর এই বোনটা একেবারে পাথরের মতো হয়ে গিয়েছিল।
আমরা গার্ল গাইডের অফিসে একটা ডে কেয়ার সেন্টার খুলেছিলাম। তারপরে অঙ্গনা নামে আমরা একটা দোকান শুরু করলাম গাইডের একটা রুম ভাড়া নিয়ে সেলস সেন্টার হিসেবে। চালাতে পারলাম না, তার কারণ এক নম্বর হচ্ছে ৮ ঘণ্টার বেশি একজন দারোয়ান আমি রাখতে পারি না, কাজেই তিনটা দারোয়ান আমাকে রাখতে হতো। তারপর একজন সেলস গার্ল সকালবেলা এসে রাত পর্যন্ত থাকবে না। দু’জন সেলস গার্ল আবার একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট রাখতে হয়। আর বাড়ি ভাড়া। সব পুষিয়ে লাভ করা সহজ ছিল না। কারণ তখন বেইলী রোডে এত মানুষ ছিল না যে কেনাকাটা করবে। কাজেই চালাতে পারলাম না। দোকান বন্ধ করে দিলাম।
আসক: ঐ জিনিসগুলো মেয়েরা বানাচ্ছিল?
তা. আ. হ্যাঁ মেয়েরা যে বানাচ্ছিল ঐ জিনিসগুলোই বিক্রি হতো। কিন্তু আমরা পারলাম না, বিক্রি করতে।
আসক: কতদিন চলেছিল দোকানটা?
তা. আ. খুব কম, ছয় মাসের মতো চলেছিল। কিন্তু ঐ যে মেয়েরা ট্রেনিং নিচ্ছিল, আমরা তাদের বলতাম তোমরা অর্ডার নিয়ে এসো। টিচাররা কাপড় কেটে দিত, ওরা সেলাই করে খদ্দেরকে সাপ্লাই করত। এভাবে পয়সা রোজগার করতো। এভাবে উৎসাহ দেয়া হতো, যাতে ওরা একটা বিজনেস গড়ে তোলে ওদের কমিউনিটিতে।

আসক: এখান থেকে চলে যাওয়ার পরে মেয়েরা সেলাইয়ের কাজ বা ওরকম কিছু করেছে কোথাও?
তা. আ. আমি একটা জিনিস বলি, আজ গার্মেন্টস এত উঠতে পারতো না যদি না ’৭১-এর এই প্রশিক্ষণ সেন্টার গড়ে উঠতো। এই ধরনের যুদ্ধ তো একটা ধাক্কা দেয়, যার জন্য আমাদের যে ফ্যামিলি সেফটি নেট ছিল সেটা ভেঙে গেছে। একজন ভাই মারা গেলে, চারজন ভাই আগে ম্যানেজ করতে পারতো তার বাচ্চাদের। কিন্তু যখন তিনটি ভাইই মারা যায়, তখন তিনটি ভাইয়ের পরিবারকে ম্যানেজ করা যায় না। কাজেই যুদ্ধের পর, আমাদের বউদের বাইরে যেতে দেব না- এই ব্যারিয়ারটা ভেঙে গেল। দুই নম্বর হচ্ছে, এই যে ট্রেনিংটা ওরা নিল, এর ফলে পরে দেখবেন যে, বছর দশেক আগেও মৌচাক মার্কেটে গেলে আমরা মেয়েদের দেখতাম তারা মাপ নিচ্ছে মার্কেটের ভেতরে দর্জির দোকানে। এখন যে গার্মেন্টস সেক্টর দেখা যায় তার পেছনে কিন্তু এই মেয়েরাই আছে। একটা স্টেপ তৈরি করে দেয়া হয়েছিল বলেই আজকে গার্মেন্টস সেক্টর এত উপরে উঠছে।
আসক: আমার নিজের কৌতূহল আছে জানার যে- ’৭১-এর ধর্ষণের শিকার মেয়েদের এখন তো বয়স হয়ে গেছে, এখনকার পরিস্থিতিতে সেই সময়ের অপরাধগুলোকে তাঁরা কীভাবে দেখছেন বা এখনো ইচ্ছাটা বেঁচে আছে কিনা যে অপরাধীদের শাস্তি হোক, বিচার হোক।
তা. আ. আমার সঙ্গে ওদের যোগাযোগ নেই। সত্যি বলছি এখন আর যোগাযোগ নেই। ওরা নিজেরা এসে হঠাৎ করে কখনো যোগাযোগ করে। ওরা মাঝে মাঝে এসে বা কোনো জায়গায় দেখা হলে হয়তো ‘স্লামুওয়ালাইকুম আপা আমি ওমুক’ বলে পরিচয় দেয়। অথবা কোনো অ্যামবাসিতে গেলে কেউ হয়তো উঠে দাঁড়িয়ে বললো- ‘স্লামুওয়ালাইকুম আপা আমি ওখানে ছিলাম।’ এই এরকম। আমি কখনো ওদের ঠিকানা রাখি নাই।
আসক: আপা আপনি তো অনেক জায়গায় অনেক দায়িত্বশীল পদে কাজ করেছেন। এই কাজটাকে কি কখনো আলাদা মনে হয়, যে আপনি দুই বছর এখানে কাজ করলেন, যুদ্ধের শিকার মেয়েদের নিয়ে?
তা. আ. সে সময়ের কথা আমার মনে করতে ইচ্ছে করে না। এত অত্যাচার মেয়েদের ওপরে হয়েছে- আমার মনে করতে ইচ্ছে করে না। এবং সত্যি এই যে, কত বছর পরে আজকে আমি মুখ খুলেছি! আমি কিন্তু সাধারণত এ ব্যাপারে কাউকে কোনো কথা বলিই না।
আসক: আমি কয়েকটা ইন্টারভিউ নিয়ে দেখেছি, আপনার মতো অনেকের সেই সব কথা মনে করতে কষ্ট হয়। আবার অনেকে বলতে চান, অনেকে আবার দুঃখের কথা বলতে পছন্দ করেন। আপনার কি এটা মনে হয় যে, সে সময় আপনি প্রেগন্যান্ট ছিলেন, আপনার হাজবেন্ডকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরে নিয়ে গেল, যুদ্ধের বিভীষিকা- এসব আপনার কথা না বলার পেছনে কোনো কারণ?
তা. আ. ঐটা হয়তো এফেক্ট করেছে, যে আজ আমার হাজবেন্ডকে আমি ফিরে পেয়েছি, আর যদি না আসতো- দ্যাট ফ্যাক্ট হ্যাভ এফেক্টেড মি। সেটাও হয়তো একটা জিনিস যে, আমার মতো ওরাও হয়তো বলতে চায় না, বিষয়টা নিয়ে আলাপ করতে চায় না। ইনফ্যাক্ট, সে সময়ের কথা আমার ছেলেও বিশেষ জানে না। আমার ছেলে ’৭১ সালের ২৮ নভেম্বর জন্মালো, আমার ছেলের সাথেও এতটা আলাপ করিনি। হ্যাঁ, ওর বাবার কথা জানে যে, বাবা অ্যারেস্টেড হয়েছিল কিন্তু এর বেশি কিছু জানে না।
আসক: সে সময়টায় (’৭২ সালে) আপনাদের মতো আরো মানুষ আন্ত-রিকতাসহ অনেক কঠিন কাজে নেমেছিলেন। সবার মধ্যেই মহৎ কিছু করার প্রণোদনা ছিল। ’৭২-এর খবরের কাগজগুলো স্ক্যান করতে গেলে দেখা যায়, সব জায়গায় আশার প্রদীপ জ্বলছে, মানুষ খুব আশাবাদী ছিল।
তা. আ. যেদিন দেশ স্বাধীন হলো, সেদিন আমি ইস্কাটনে। সেদিন আমাদের মনোভাব এরকম ছিল যে, এখন যদি শেখ সাহেব ডাক দেন, তোমরা সব কাজ বন্ধ করে চলে আস, রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে, রাস্তাঘাট তৈরি কর- আমরা সবাই কাজে নেমে যেতাম। এরকম মনোভাব ছিল আমাদের। উনি একবার যদি ডাক দিতেন যে আমরা কন্সট্রাক্ট করবো, তোমরা যে যার কাজ সব ফেলে চলে এসো, রাস্তাঘাট তৈরি কর, রাস্তা-ব্রিজ তৈরি কর। আমরা সব চলে যেতাম। ঠিক আমি ঐ মুহূর্তের কথা বলছি। আমার মনে আছে (তখন রোববার সাপ্তাহিক ছুটি ছিল), রোববার দিনও অফিস। আমি কী কথায় যেন আমার স্বামীকে বললাম যে, রোববারও তুমি অফিসে যাবে? সে বললো, তুমি কী বলছো, দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন যদি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করতে হয়, আমি ২৪ ঘণ্টাই কাজ করবো।
আসক: এই রকম একটা ফিলিংস খবরের কাগজ থেকেও উঠে আসছিল, যা আর কখনো দেখা যায়নি।
তা. আ. দেশ গড়ার একটা বিরাট সুযোগ আমরা হারিয়েছি। এক বিরাট Opportunity আসছিল- সোনার বাংলাকে আমরা সত্যি সোনা দিয়ে মুড়ে দিতে পারতাম। শুধু কেউ যদি এটাকে ঠিকমতো পরিচালনা করতো!
যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের
পুনর্বাসন
প্রেক্ষাপট
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধ এক বিভীষিকার নাম। বিশ্বব্যাপী যখনই যেখানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সেখানেই নারীরা যুদ্ধের লুণ্ঠিত দ্রব্য হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। যুদ্ধের সময় অপরপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার অন্যতম কৌশল হলো এক পক্ষ দ্বারা অন্যপক্ষের নারী সমাজকে লাঞ্ছিত করা, যাতে করে এই লাঞ্ছনার চিহ্ন তারা বহন করে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এসব নারীর ঠাঁই না হয় সমাজে, না হয় পরিবারে, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই তারা হতে থাকে বঞ্চিত-লাঞ্ছিত-অপমানিত। যুদ্ধকালে ধর্ষিত নারীদের সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে জার্মানির একজন গাইনোকলোজিস্ট মনিকা হাউজার গড়ে তুলেছেন সাহায্যকারী সংস্থা ‘মেডিকা মনডিয়েল’। ২০০৮ সালে তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মনিকা হাউজার ভূষিত হয়েছেন অল্টারনেটিভ নোবেল পুরস্কারে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘মেডিকা মনডিয়েল’ সংস্থাটি আজ কাজ করে যাচ্ছে বসনিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া, লাইবেরিয়া এবং কঙ্গোতে, যেখানে নারীদের জন্য পরিস্থিতি ভীষণরকম সঙ্কটজনক। ডোনেশনের মাধ্যমে পরিচালিত সংস্থাটির স্টাফরা কথোপকথন এবং থেরাপির মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করলেও তারা আইনি সহায়তা ও জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাও দিয়ে থাকেন। মনিকা হাউজার ও তার কাজ এবং মেডিকা মনডিয়েল ও পুনর্বাসিত যুদ্ধকালের ধর্ষিত নারীদের নিয়ে করডুলা মায়ারের লেখা নিবন্ধ Conversation, Milk and Honey-এর ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে এ নিবন্ধটি। 
যে ক্ষতের কথা অনুক্ত থাকে, তা কি কোনোভাবে সারিয়ে তোলা সম্ভব? মনে হয় এই প্রশ্নের সহজ উত্তরটি ‘না’ হবে। কিন্তু এসব অনুক্ত ক্ষত নিয়েই যুদ্ধকালে ধর্ষিত নারীরা পাড়ি দেয় দুর্বিষহ বাকিটা জীবন। জার্মানির কলোগনির গাইনোকলোজিস্ট মনিকা হাউজার কাজ করছেন যুদ্ধকালে ধর্ষিত নারীদের নিয়ে। মনিকার কাজের শুরু বসনিয়ায় যুদ্ধকালে ধর্ষিত নারীদের নিয়ে একটি ম্যাগাজিন লেখা আর্টিকেল পড়ে। সেই সময় জার্মানির কলোগনিতে বসবাসরত বত্রিশ বছর বয়স্ক মনিকা হাউজার এই আর্টিকেলটি পড়ে বিচলিত হয়ে এ ব্যাপারে সাহায্যকারী সংস্থাগুলোকে যখন তার নিজস্ব সহায়তা প্রদানের কথা বলেন, তখন তারা তাকে উন্মাদ প্রতিপন্ন করে। জাতিসংঘের স্টাফ মেম্বাররা এই মতামত দেন যে, ‘ধর্ষিত মুসলিম নারীরা সমাজে পুনর্বাসিত হবে না।’ এতদসত্ত্বেও হাউজার কোনো পূর্ব ধারণা কিংবা কোনো প্রকার অর্থ সহায়তা ছাড়াই নিজের প্রচেষ্টায় শুরু করেন তার কাজ। এর কয়েক মাস পরে তিনি গড়ে তোলেন যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ধর্ষিত নারীদের জন্য বিশ্বের প্রথম থেরাপি সেন্টার। ভিকটিমরা এখান থেকে গ্রহণ করছে ভবিষ্যতের আশা- যাকে অবলম্বন করে একজন প্রান্তিক নারী বেঁচে থাকতে পারে। এছাড়াও চিকিৎসা সহায়তা, মানসিক ও আইনগত কাউন্সেলিং সেবা তো রয়েছেই। গত বছর মনিকা তার কাজের জন্য অল্টারনেটিভ নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ধর্ষিত নারীদের শারীরিক ক্ষত সারিয়ে তুলতে কাজ করার পাশাপাশি তাদের মানসিক ক্ষত সারিয়ে তুলতেও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
যেখানেই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে সেখানেই নারীরা যুদ্ধের লুণ্ঠিত দ্রব্য হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে ধর্ষকেরা স্থায়ীভাবে সমাজে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। যুদ্ধকালীন সময়ে ধর্ষণের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষকে অবমাননা করা। এই ধরনের বিধ্বংসী মনোভাবের প্রভাব যুদ্ধের পরেও বছরের পর বছর ধরে চলমান থাকে। এসব নারীর মনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি বিশ্বাস জন্মায় যে, এই লজ্জা কেবল তাদের একার, এই মানসিক যন্ত্রণা তারা বয়ে চলে জীবনভর এবং এই দুর্ভোগ তাদের সন্তানরাও ভোগ করে চলে সারা জীবন ধরে। বসনিয়াতে যুদ্ধকালীন সময়ে বিশ হাজারেরও বেশি নারী সার্বিয়ান সেনাদের দ্বারা ধর্ষিত হয়; কসোভোতে এই সংখ্যা আরও বেশি। ‘Rape was the rule’ জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিরা এমনটিই বলেন যখন ১৯৯৪ সালে হুতু বুচার রুয়ান্ডায় আক্রমণ শুরু করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমপ্রতি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার নারীদের ওপর একটি জরিপ চালায়। এদের মধ্যে ৭৫% জানায় যে, তারা সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। যখনই সৈন্যদের ফ্রন্ট স্থানান্তর হয়েছে কিংবা বিদ্রোহী জনগোষ্ঠী দলে দলে স্থানান্তরিত হয়েছে তখনই তাদের ওপর এই ধর্ষণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। বিখ্যাত লেখক হোমারের লেখায়ও দেখা যায় কীভাবে গ্রিকরা নিজেদের মাঝে ট্রোজান নারীদের বণ্টন করে নিয়েছিল।
স্বভাবতই, এসব অপরাধ বন্ধে মনিকা হাউজারের কোনো কিছুই করার সুযোগ নেই। তবুও তার নেয়া পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব তো জানতে পারে নারীদের ওপর যুদ্ধের সময়ে কী ধরনের অত্যাচার চালানো হয়েছে। মনিকা বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ চলতেই থাকে আর আমরাও দেখতে থাকি একইরকম বিষণ্ন-বিধ্বস্ত-দুঃখী মুখগুলো।’ তবে বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব ধীরে ধীরে এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। কয়েক বছর আগে প্রখ্যাত অভিনেত্রী নিকোল কিডম্যান কসোভোতে হাউজারের প্রজেক্ট পরিদর্শনে যান। আগস্ট মাসে আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন কঙ্গোতে একটি ক্যাম্পে ধর্ষিত নারীদের দেখতে যান। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধের অবশ্যই বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত।’ জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুনকেও বিষণ্ন দেখাচ্ছিল যখন তিনি গোমায় একটি হাসপাতাল পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছিলেন। তিনি বলেন- ‘এসব নারী ফিস্টুলাসহ ছিন্ন ভ্যাজিনা, ব্লাডার এবং রেকটাম ওয়াল নিয়ে দুর্বিষহ রোগগ্রস্ত জীবনযাপন করছে।’
আজ মনিকার সংগঠন ‘মেডিকা মনডিয়েল’-এ একশ’ জন স্টাফ মেম্বার কাজ করছে। এদের মধ্যে চল্লিশজন জার্মানির কলোগনিতে অবস্থিত হেডকোয়ার্টারে কাজ করছে। এছাড়াও পঞ্চাশজন ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছে সেখানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুই মিলিয়ন জার্মান নারী যে রকম দুর্বিষহ সময় অতিবাহিত করেছে, জনগণকে তা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যও জার্মানিতে হাউজার ‘Zeit zu sprechen’ (time to talk) নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছেন। কসোভোর একটি ছোট্ট শহর জাকোভায় মহিলা কাউন্সিলরদের জন্য আয়োজিত একটি সেমিনারে ফ্রাঙ্কফুর্ট অ্যাম মেইনের ট্রমা থেরাপিস্ট, ইঙ্গেবর্ন ইওয়াখিমের সাথে অবস্থানকালে হাউজার বলেন- কাউন্সিলরদের প্রথমে ক্লায়েন্টদের আস্থাভাজন হয়ে তাদের সুস্থির করে তুলতে হবে। তারপর তাদের সাথে ধর্ষণ বিষয়টি নিয়ে খোলামেলাভাবে আলোচনা করে বিষয়টিকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা ফেলে আসা অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করতে সহায়তা করতে হবে। ইঙ্গেবর্ন ইওয়াখিম কাউন্সিলরদের ট্রমা হতে মুক্তি প্রদানের নানা পদ্ধতি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যেমন একজন ক্লায়েন্ট যখন তার ঘটনা বর্ণনা করেন তখন কাউন্সিলর তার কথার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে, তার সাথে একত্রে বাগানে খনন করার মতো কাজে হাত লাগাতে পারেন। মোট কথা কাউন্সিলরদের ক্লায়েন্টদের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করতে হবে। এমনকি তিনি তাদের ম্যাসাজ থেরাপিও শেখান। যদিও প্রথমে সকলে মনে করেছিল যে, এটি একটি অবাস্তব-হাস্যকর প্রক্রিয়া। কিন্তু এরপরে অবশ্য তারা একমত হয় যে, ম্যাসাজ ব্যথা প্রশমনে সহায়তা করে।
প্রথমদিকে কসোভোয় মেডিকার কাউন্সিলররা ছিল সাধারণত আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং শিক্ষক। মেডিকা তাদের ট্রমা থেরাপিস্ট হিসেবে ট্রেনিং দেয়। শুরুর দিকে কসোভোতে কোনো সাইকোলজিস্ট ছিল না। মেডিকার নারীকর্মীদেরই প্রশিক্ষণ দেয়া হতো এবং তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কলিং বেল টিপে সাহায্যের প্রস্তাব দিত। এভাবেই ২০০৪-এর বসন্তকালে তারা নুরকা নামে একজনের সন্ধান পায়।
প্রথম যখন মেডিকা কাউন্সিলররা নুরকাকে খুঁজে পেয়েছিল তখন কদাচিৎই সে বাড়ির বাইরে বের হতো। সে মনে করত, সবাই বুঝি তার দিকে তাকিয়ে বলছে- তার ওপর কী ধরনের নারকীয় ব্যাপার ঘটেছে। এসব চিন্তায় রাতে তার ঘুম আসত না। সকালেও সে ঠিকভাবে ঘুম থেকে উঠতে পারত না। ‘আমার মনে তখন শুধু একটা চিন্তাই ঘুরপাক খেত, নিজেকে হত্যা করা।’ এভাবেই বলে চলছিল নুরকা। তার গ্রামে সার্বিয়ান সেনারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে খুন করে পুরুষদের আর নারীদের একটি বাড়িতে ধরে নিয়ে যায়। বেশিরভাগ সময়ই কামরায় প্রবেশ করে একজন নারীর ওপর দলবেঁধে তারা অত্যাচার চালাত। বলতে বলতে নুরকা হঠাৎ এতটাই উত্তেজিত হয়ে ওঠে যে, তার শ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছিল। চোখ থেকে পানি মুছে ফেলে নুরকা আবার শুরু করে- সেখানে ছেলে-বুড়ো অসংখ্য মানুষ তাদের ওপর অত্যাচার চালাত। তার ওপর প্রায় তিন দিনব্যাপী এই অত্যাচার চলে। এর মধ্যেই কামড় ও আঁচড়ের দাগে ভরা শরীর নিয়ে তার সন্তানকে সাথে নিয়ে সে আলবেনিয়ায় পালিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছার পরে একজন মহিলা ক্যাম্প ডাক্তার আবিষ্কার করেন যে, সে অন্তঃসত্ত্বা। নুরকা এরপরে জ্ঞান হারায়। জ্ঞান ফিরলে পরে ডাক্তার প্রথমেই তাকে বলেন যে, ‘আমি তোমার স্বামীকে এ ব্যাপারে কিছুই বলবো না।’ ঐ অবস্থায় গর্ভের সন্তানটিকে গ্রহণ করা ছিল নুরকার পক্ষে অচিন্ত্ত্যনীয় একটি ব্যাপার।
যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে ভীষণরকম দুর্বল ও ভাবলেশহীন নুরকাকে তার স্বামী বারবার সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে বলতে থাকেন যে, ‘বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তুমি কিছু ভেবো না। সবচেয়ে বড় কথা হলো আজ আমরা বেঁচে আছি।’ তার স্বামী তাকে পরিত্যাগ করতে পারে এই আশঙ্কা ও লজ্জায় নুরকা তাকে তখনো তার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা কিছুই বলেনি। ফলে তার স্বামীর কাছে কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছিল না কেন সে বিছানায় অনড় অবস্থায় বিমর্ষচিত্তে পড়ে আছে। যে কয়বার নুরকা তার বন্ধুদের বলেছে কতটা বিভীষিকাময় ছিল সেই সময়, যখন সৈন্যরা এসেছিল, ততবারই তারা বলেছে, ‘আমি অনেক ভাগ্যবান যে আমার ওপর এমনটি ঘটেনি।’ নুরকা বলতে বলতে চুপ হয়ে যায়। তাকে এ অবস্থা থেকে সারিয়ে তুলতে মেডিকা কাউন্সিলররা যখন এগিয়ে এসে তার আস্থাভাজন হতে সমর্থ হন, তখন সে আস্তে আস্তে কথা বলতে শুরু করে এবং এরপর ধীরে ধীরে একটু একটু করে ভালো বোধ করতে থাকে। সে আবার ঘরের বাইরে বের হওয়ার মতো সাহস অর্জন করে। নুরকা বলে, কীভাবে সে কোনো ইউনিফর্ম পরিহিত কাউকে সামনে দেখলে কাঁপতে থাকতো কিংবা টেলিভিশনে যুদ্ধের কোনো দৃশ্য দেখলেই কীভাবে সমস্ত শরীরে সেই পুরনো কামড় অথবা আঁচড়ের ক্ষতগুলো অনুভব করত। তার প্রতিবেশীরা ছিল শত্রুভাবাপন্ন। তারা বলত যে, ‘আমরা তো জানি তোমার ওপর কী হয়েছিল। এখন তবে কেন তুমি ভালো থাকবে?’ এমনটা চলতে চলতে একদিন সে তার স্বামীকে সত্য ঘটনাটা বলে দেয়, যে অনেকদিন ধরেই এই ঘটনাটা নিয়ে অনুমান করছিল। এরপর থেকে দেখা যায় কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত মানসিক শক্তি নুরকা পাচ্ছে। মেডিকা থেকে সে যন্ত্রপাতি, ট্রাক্টরের কিছু পার্টস জোগাড় করে অন্য কৃষিজীবী নারীদের সাথে নানাবিধ সবজি চাষ শুরু করে। বর্তমানে প্রতি মাসে সে ২৫০ ইউরো উপার্জন করে, যার দ্বারা সে তার স্বামী ও সন্তানদের সহায়তা করে। মেডিকা যাদের সহায়তা করেছিল, নুরকা সেই ৯০০০ নারীর মধ্যে হাতেগোনা একজন, যে কিনা খোলাখুলিভাবে তার বিভীষিকাময় অতীত সম্পর্কে কথা বলতে আজ আর দ্বিধাবোধ করে না।
কসোভোয় যুদ্ধের সময় বিধবা হওয়া নারীরা প্রতি মাসে ৩৬ ডলার পেনশন পায়। কিন্তু মৌ-পালন, দুগ্ধ উৎপাদন খামার প্রভৃতির পরিচালনার ফলে তারা আজ তাদের পেনশনের প্রায় দশগুণ অর্থ উপার্জন করছে। যেই নারীরা একসময় ছিল আত্মহত্যাপরায়ণ, আজ তারা বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করছে; বিক্রি করছে তাদের খামারে উৎপাদিত মধু। এই নারীদের আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য যেটি ছিল মূল চালিকাশক্তি, তা হলো কাজ। অন্য যে কোনো পন্থার থেকেও এসব জীবনমুখী কাজ এদেরকে পুনরায় বেঁচে থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
মনিকা হাউজার আফগানিস্তানের যেসব এলাকায় কাজ করেছেন সেখানকার পরিস্থিতি এতটাই সঙ্কটজনক যে, তাকে এবং আফগান মেডিকা কাউন্সিলরদের কান্দাহারের বাইরের ফিল্ড স্টেশনগুলো বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এরপরেও দুর্বিষহ অবস্থার মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের মধ্যবর্তী অপর তিনটি সেন্টার এখনো তারা চালু রেখেছেন। সেসব এলাকায় বাল্যবিবাহ, অত্যাচার, হত্যা অতি সাধারণ ঘটনা। ধর্ষিত নারীদের কখনও কখনও কারাগারেই তাদের বাকি জীবনটুকু কাটাতে হয়। যখন মেডিকার আইনজীবীরা তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন, তখনও আদৌ তারা সমাজে ফেরার অনুমতি পাবে কিনা, এ ব্যাপারে তাদের মোল্লা, সমাজপতি, পরিবার-প্রতিবেশী সবার সাথে আপোস-মীমাংসা করতে হয়।
লাইবেরিয়ার ফিশটাউন দেশের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এলাকা বলে পরিচিত। ২০০৭ সালে হাউজার যখন সেখানে নারীদের সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রথম একটি কাউন্সেলিং সেন্টার চালু করেন, তখন এ ব্যাপারে তিনি অনেক আশাবাদী ছিলেন। উজ্জ্বল একটি রোবের সাথে হোয়াইট পেপারে তৈরি হ্যাট পরেছিলেন তিনি, যাতে লেখা ছিল ‘Stop raping baby girls' এজন্য নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট এলেন-সিরলেফ তাকে সেক্সুয়াল ভায়োলেন্সের সারভাইভর হিসেবে আখ্যা দেন। এত প্রচেষ্টার পরেও আজ পর্যন্ত এসব এলাকাতে সমস্যার দুর্বিষহতা কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ফিশটাউনের মানুষজন কালো জাদুতে বিশ্বাস করে। সেখানে তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত গোপন গোষ্ঠী ও সমাজ আছে। এসব অবস্থার ফলে সেখানকার মানুষগুলো গতিহীন এক অপরিবর্তিত জীবনযাপন করে আসছে। যখনই কেউ ধর্ষিত হবে তখনই যেন নিকটস্থ থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়, এ ব্যাপারে মেডিকার কাউন্সিলররা মানুষজনকে সবসময়ই উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু তারা ভীষণরকম গরিব। এর ফলে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির তরফ থেকে অর্থ প্রদান করার ফলে অভিযোগকারী পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা তুলে নেয়া হয়। এর জন্য তিন কিংবা চার ডলারই যথেষ্ট। একবার মনিকা হাউজার দেখতে চান ধর্ষকরা কোথায় তাদের শাস্তি ভোগ করছে। অথবা আদৌ তারা শাস্তি ভোগ করছে কিনা। তিনি কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান, চারজন ব্যক্তি কারাগারের সামনে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে, যাদের মধ্যে দু’জন গার্ড এবং দু’জন আসামি। এদের একজন তাকে বলে যে চারপাশে যেহেতু জঙ্গল তাই পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা নেই, সেজন্যই তারা এখানে এভাবে বসে আছে। হাউজার হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘এই তো এখানকার বিচার ব্যবস্থা।’ লাইবেরিয়ায় কাজ করা একটি চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার তাই তিনি বারেবারে তার স্টাফ মেম্ব্বারদের এই ব্যাপারে আরো সচেতন হতে বলেন।
হাউজার বলেন- ‘একজন ভিকটিম অর্থাৎ একজন ধর্ষিত নারী পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে নিয়ে আসে’- কসোভোর সমাজে ধর্ষিত নারীদের এভাবেই মূল্যায়ন করা হয়। এমনকি এই সমাজ এসব নারীকে নিয়ে লজ্জাও বোধ করে।’ তিনি সেসব পুরুষের কথা বলেন, যারা তাদের ধর্ষিত স্ত্রীদের পরিত্যাগ করেছে। তিনি বলে চলেন, সেসব শতবর্ষ পুরনো কানুন-প্রথা, প্রাচীন প্রথাভিত্তিক আইনের কথা- যেখানে বিধান করা আছে বিধবারা শুধু তাদের স্বামীর ভাইদের বিয়ে করতে পারবে নতুবা তারা পুনর্বিবাহ করতে পারবে না। মনিকা আরো বলেন, ‘ধর্ষণ এই বিষয়টি শুধু মৌনতার অবগুণ্ঠনেই ঢাকা নয়; এই বিষয়টি সুপ্রাচীন শক্ত প্রাচীরের দ্বারাও দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ।’
কসোভোতে মেহ্মাটে এফেনডিয়ার কন্যাদের আদর্শরূপে গণ্য করা হয়। তিন শতাব্দী আগে অস্ট্রো-তুর্কিশ যুদ্ধের সময় যখন অস্ট্রিয়ান সৈন্যরা তাদের ধর্ষণ করতে আসে, তখন তারা নিজেদের শরীরে ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে অসম্মানের চেয়ে মৃত্যুকে বরণ করেছিল। আজও জাকোভায় তাদের স্মরণে একটি মনুমেন্ট আছে, ব্যাক কোর্ট ইয়ার্ডে আছে ছয়টি সমাধি এবং একটি ছোট্ট কেবিনেট, যেখানে অহর্নিশি কয়েকটি মোমবাতি জ্বালানো থাকে।
জার্মানির আরো কিছু করা উচিত
করডুলা মায়ারের ধারণকৃত মনিকা হাউজারের সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ-
প্রশ্ন: ডা. হাউজার, সিমবা নামে অত্যধিক পরিচিত কঙ্গোলেজ মিলিশিয়া লিডার জেয়ারমাইন কাটানগা আজ ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের সম্মুখীন। এর প্রতিক্রিয়ায় আপনার পরিচালিত সংগঠনের একজন নারী বলেছেন- যদি যুদ্ধকালে তাকে ধর্ষণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু একজনও আজ দোষী সাব্যস্ত হতো তাহলে তার চেয়ে বেশি আর কেউ আনন্দিত হতো না। আপনি কি মনে করেন এরকম আশার কোনো ইতিবাচক ফল লাভ সম্ভ্ভব?
উত্তর: বর্তমানে সবকিছুই ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। যদিও ইস্টার্ন কঙ্গোতে কাটানগা নারী ও শিশুদের সেক্সুয়াল স্লেভে পরিণত করেছিল, তারপরও হেগ প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে সেক্সুয়ালাইজড ভায়োলেন্সের উল্লেখই করেননি। বসনিয়ায় অসংখ্য ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত সার্বিয়ান রাডোভান কারাডিছের ব্যাপারেও এমনটিই ঘটেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো যে, এটি একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।
প্র: কিন্তু যুদ্ধকালে ঘটিত ধর্ষণের ঘটনাগুলো তো প্রমাণ করা খুবই কঠিন।
উ: মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যান্য অপরাধের সাথে এর পার্থক্যটা কোথায়। এই ধরনের ঘটনা তদন্ত করা কঠিন- এজন্য তো নারীরা দায়ী নয়, এর জন্য তো প্রসিকিউটরদের দায়বদ্ধতার পরিমাণ বেশি হওয়া উচিত। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ব্যাপার, যা থেকে ‘হেগ’-এর প্রাক্তন চিফ প্রসিকিউটর কার্লাডেল পন্টে বিরত ছিলেন। এই যে সেক্সুয়ালাইজড ভায়োলেন্সগুলো তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে এর দায়ভার অনেকাংশে কিন্তু তাদের ওপরই বর্তাচ্ছে।
প্র: এখন পর্যন্ত কতজন যুদ্ধকালের ধর্ষক দোষী সাব্যস্ত হয়েছে?
উ: শুধু হাতেগোনা কয়েকজন। কিন্তু ঐসব ট্রায়ালকে খুব বেশি গুরুত্ব কখনই দেয়া হয়নি। ২০০১ সালে তথাকথিত ফোকা ট্রায়ালে হেগ সর্বপ্রথম সিদ্ধান্ত দেয়, ধর্ষণ একটি যুদ্ধাপরাধ এবং নির্যাতন, যার ফলশ্রুতি অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং সেক্সুয়াল স্লেভারি। প্রথমবারের মতো এটি দেখানো হয় কীরকম সুনিয়ন্ত্রিতরূপে বসনিয়ার ১২ থেকে ৭০ বছর বয়স্ক নারীরা সেক্সুয়াল ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছে। অপরাধীদের ২০ বছর পর্যন্ত কারাভোগের শাস্তি হয়েছে।
প্র: কিন্তু একজন নারীর জন্য কি কোর্টে এ বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়াটা কঠিন নয়?
উ: অবশ্যই, বিশেষত যখন কোনোরকম সাহায্য ব্যতীত সম্পূর্ণ একা আসামিপক্ষের উচ্চ পারিশ্রমিক প্রাপ্ত আইনজীবীর সম্মুখীন হতে হয় তাকে। কিন্তু এমন অনেক নারীই রয়েছে যারা বলিষ্ঠ ও দৃঢ়কণ্ঠে বলতে পারে তাদের ওপর কী ধরনের অত্যাচার চালানো হয়েছিল। যখন তারা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়, তখন তা তাদের ভগ্ন হৃদয়ে কিছুটা হলেও শান্তি আনয়ন করে। কিন্তু যেহেতু সাক্ষী ছাড়া অপরাধের শাস্তি দেয়া সম্ভ্ভব নয় সেজন্য অতি শিগগিরই ‘উইটনেস প্রোটেকশন প্রোগ্রাম’- চালু করা দরকার যেন আরও বেশিসংখ্যক নারী পুনরায় সেই অতীতের জঘন্য অভিজ্ঞতায় ভারাক্রান্ত না হয় এবং গৃহে নির্যাতনের শিকার না হয়ে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী হয়।
প্র: অন্য যে কোনো ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদদের থেকেও ইউ.এস. সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন যুদ্ধকালীন ধর্ষণকে আরো বেশি অভিযুক্ত করেন।
উ: এটি খুবই ভালো ব্যাপার কিন্তু আমি শুধু একটি কথা ভেবেই অবাক হই, জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অথবা জার্মান চ্যান্সেলরই-বা কেন এই একই কাজটি করছেন না? মেডিকা মনডিয়েল কয়েক মাস আগে এই ব্যাপারটির দাবিতেই চ্যান্সেলর অফিসে গিয়েছিল।
প্র: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ধর্ষিত প্রায় দুই মিলিয়ন নারীর নিয়তির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আপনারা ‘Zeit zu sprechen’ (time to talk) শিরোনামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছেন।
উ: জার্মানের যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ খুব অবহেলার সাথে দেখত এই ধর্ষিত নারীদের; তাই এটি খুবই যুক্তিসঙ্গত যে আমি তাদের জন্য স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করছি। যখন আমি বসনিয়া অথবা কসোভোতে পাঠচক্র অথবা পাবলিক ইভেন্ট আয়োজন করি, তখন প্রায় প্রতি সময়ই একজন না একজন নারী আমার কাছে আসে এবং বলে, ‘আমি জানি আপনি আসলে কী নিয়ে কথা বলছেন।’ এরপর তারা বলে যায়, কীভাবে সেসময় তারা ধর্ষিত হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব নারীর দুর্ভোগকে কেই-বা স্বীকৃতি দেয়। এজন্য না আছে কোনো মনুমেন্ট, না আছে কোনো মেমোরিয়াল সাইট। এই প্রসঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কোনো আলাপচারিতার দরকার বেশিরভাগ মানুষই বোধ করে না। জার্মান রাজনীতিবিদরাও কেবলই আফগান নারীদের অধিকার সম্পর্কে কথা বলতে আগ্রহবোধ করে, যেখানে জার্মানিতেই করার জন্য বহু কিছু বাকি আছে।
প্র: এ ব্যাপারে আপনার প্রত্যাশা কী?
উ: আমি পুরুষদেরও এই কাজে অংশগ্রহণ করতে দেখতে চাই। আমরা এসব নারীর মানসিক শান্তি ও স্বস্তির জন্য কাজ করলেও কোনো পুরুষকে আমাদের কাজে অংশ নিতে দেখি না। আরেকটি সমস্যাসঙ্কুল স্থান হলো বৃদ্ধনিবাস- কেননা সেখানকার কর্মরত ব্যক্তিদের বেশিরভাগই যুদ্ধের সময়ে নির্যাতিত নারীদের মধ্যে বিদ্যমান মানসিক জড়তা/ যুদ্ধাতঙ্ক সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না।
প্র: এই বিষয়টিকে আপনি কেন এতটা প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন?
উ: মৃত্যুর আগে কোনো বৃদ্ধ মহিলা চাইতেই পারে যুদ্ধের সময়কার বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু কথা বলতে। তার চেয়েও বেশি সাধারণ এই ধরনের ঘটনা। যেমন- একবার একজন নারী সেবাগ্রহীতাকে যখন ইউরিন ক্যাথেটার প্রবেশ করানো হচ্ছিল তখন সে পাগলের মতো চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘খবরদার... তোমরা কেউ আমার সাথে এমন করবে না।’ তখন সবাই মনে করছিল যে সে বোধহয় হিস্টিরিয়াগ্রস্ত; কিন্তু কারও মাথায় একটিবারের জন্যও আসেনি যুদ্ধকালে তাদের ওপর সংঘটিত অত্যাচারের ফলে সঞ্চিত নারকীয় অভিজ্ঞতার সাথে তাদের এই অস্বাভাবিক আচরণের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং এতে করে একজন বৃদ্ধ নারী পুনর্বার মুখোমুখি হচ্ছে একটি আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতার। এই ধরনের মর্মস্পর্শী ঘটনা প্রায়শই ঘটেই চলেছে। এই ধরনের আতঙ্কজনক ঘটনার প্রভাব তারা বয়ে নিয়ে চলে জীবনব্যাপী। পরবর্তী প্রজন্মের সূত্র ধরে এর প্রভাব জার্মান সমাজে বিদ্যমান রয়ে গিয়েছে এখনো।
সূত্র: ইন্টারনেট