তথ্যানুসন্ধান
গাজীপুরে গার্মেন্টসে আগুন
প্রাণ হারালেন ২১ শ্রমিক
শাহ আলম ফারুক
গরীব এন্ড গরীব কোম্পানি লিমিটেড। গাজীপুরের চৌরাস্তার
সন্নিকটে অবস্থিত এ সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে এর আগে ২০০৯ সালের ২০ আগস্ট আগুন নেভাতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল আবুল কালাম (২৮) নামের এক ফায়ার সার্ভিস কর্মীর। ছয় মাসের মাথায় ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে আবারো এ গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলো। যার ফলে ২১ জন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু ঘটে, যাদের মধ্যে ছিলেন ১৫ জন নারী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, মালিকপক্ষের সীমাহীন অবহেলা আর অসাবধানতার বলি হলেন তারা। জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ড ও কারখানায় প্রাণহানির ঘটনায় গার্মেন্টসের পরিচালনা পর্ষদকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করলেও অদ্যাবধি (১৪ মার্চ ২০১০) সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পারিনি।
আসক তদন্ত ইউনিটের পক্ষ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধান করা হয়। তথ্যানুসন্ধানের সময় গরীব এন্ড গরীব কোম্পানি লিমিটেড নামক সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখা যায়- ছয়তলা ভবনের উপর টিনের বেড়া ও ছাদ দিয়ে সপ্তম তলা নির্মাণ করা হয়েছে। মূল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়- মেশিনপত্র, গার্মেন্টস সামগ্রী, ফ্যান, সুইচসহ সবকিছু আগুনে পুড়ে প্রায় পুরোপুরি দগ্ধ হয়ে গেছে। তখনো আগের রাতের ছিটানো পানিতে মেঝে সয়লাব হয়ে আছে। দ্বিতীয় তলার সামনের দিকের কলাপসিবল গেটের মুখে সোয়েটারের স্তূপ দেখা গেল। এ তলাটি সুইং সেকশনের কাজে ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়। তৃতীয় তলায় ফিনিশিং ও লিংকিং এবং চতুর্থ তলায় লিংকিং সেকশনের পুরো ফ্লোরের মেশিনপত্রসহ সবকিছুতে গাঢ় ছাইয়ের আস্তরণ দেখা গেল। সপ্তম তলার দুই দরজাবিশিষ্ট আনুমানিক ৪৫-৫৫ ফুট দৈর্ঘ্য, ২০-২৫ ফুট প্রস্থের এ রুমে গ্রিল লাগানো দুটি বড় বড় জানালা আছে। পুরো ফ্লোরের মধ্যে একমাত্র ঐ দুটি জানালা দিয়ে বাইরের বাতাসে নিশ্বাস নেয়া যায়। কিন্তু তালাবদ্ধ থাকায় আটকেপড়া কোনো শ্রমিকই সে কক্ষে ঢুকতে পারেনি। এ তলা থেকে ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা ১৮টি লাশ উদ্ধার করেন। ফ্লোরে দেখা গেল, শ্রমিকদের রাতের জন্য আনা খাবারভর্তি টিফিন ক্যারিয়ার, ফুড বক্স, পাউরুটি, কলা ইত্যাদি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে জুতো, মেয়েদের হাতব্যাগ ইত্যাদি। সিঁড়ি দিয়ে সাততলা থেকে ছয়তলায় নামার পথসহ সামনে-পেছনের দুটি সিঁড়ি ঘরের বহির্ভাগে গ্রিল ও কাচঘেরা অংশের কাচ ভাঙা অবস্থায় দেখা গেল। এসব সিঁড়িঘরের বহির্ভাগে বাতাস চলাচলের কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশেষত সাততলাসহ পুরো কারখানার ভেন্টিলেশন সিস্টেমে ব্যাপক সমস্যা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। দুটি সিঁড়ির মধ্যে পেছনের সিঁড়িতে মালামাল রাখা হতো বলে ফায়ারকর্মীরা জানান।
ঘটনার সময় নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্বে থাকা মোঃ মোজাম্মেল দাবি করেন- আগুন লাগার পর সামনের ও পেছনের দু’দিকের গেটই খোলা ছিল। তিনি জানান- রাত ৯টার দিকে যখন আগুন লাগে তখন ৩০ জনের মতো শ্রমিক ছিল। আর চারজন অফিস সহকারী ও প্রহরী ছিলেন। গার্মেন্টস কর্মী সুমন জানান- ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে কারখানায় আগুন লাগার সময় তিনি তিনতলায় ছিলেন। প্রচণ্ড কালো অন্ধকার ধোঁয়া ও তাপের কারণে নিচে নামতে পারেননি। প্রথমে কাচঘেরা ঘরে ছিলেন। পরে নিজের কাপড় দিয়ে নাক-মুখ পেঁচিয়ে বাথরুমে ঢুকে পানি ছেড়ে দেন। এরপর এক পর্যায়ে কখন অজ্ঞান হয়ে পড়েন তা জানেন না।
সুমন আরো জানান- সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পাশের মেসে থাকা স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনি জানান- দ্বিতীয়তলায় লিংকিং সেকশনে আগুনের সূত্রপাত হয়। ওই সময় ঐ তলায় কেউ ছিল না। তৃতীয়তলার স্যাল এবং সপ্তমতলায় উইন্ডিং সেকশনে ৫০ জনের মতো শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। তৃতীয়তলায় আটকেপড়া চারজনের মধ্যে তিনজন মারা যান। এর মধ্যে একজনের লাশ গাজীপুর সদর হাসপাতালে না নিয়ে আত্মীয়রা আগেই নিয়ে গেছেন। 
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান- প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কারণে আগুন লেগেছে। সিনথেটিক ধরনের কাপড় পুড়ে প্রচণ্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এ কারণে এত প্রাণহানি ঘটেছে। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আবু জাফর জানান- কারখানার নিজস্ব পানির উৎস না থাকায় শুরুতেই তাদের অভিযান বিঘ্নিত হয়। পরে পাশের একটি ওয়াশিং কারখানার ময়লা পানি আগুন নির্বাপণের জন্য ব্যবহার করতে শুরু করেন। প্রথমত, ঘটনাস্থলে এসে কী দেখেছেন? এ প্রশ্নে তিনি জানান- কারখানার সামনে ও পেছনে দুটি সিঁড়ির মূল কলাপসিবল গেট বন্ধ ছিল। এ অবস্থায় নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় গেট ভেঙে তারা ভেতরে প্রবেশ করেন। আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে তৃতীয়তলার গ্রিল ভেঙে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা চারজনকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে সপ্তমতলায় অধিকাংশ লাশের সন্ধান পাওয়া যায়।
গাজীপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়- ঐ হাসপাতালে দু’জন আহত এবং ২০ জন নিহতের লাশ আনা হয়েছিল। হাসপাতাল মর্গের ডোম আলী জানান- রাত সাড়ে ৯টা/১০টার মধ্যে ওখানে ২০টা লাশ এসেছিল। লাশগুলোতে ‘কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। লাশগুলো আগুনে পোড়া মনে হয়নি।’ তিনি আরো জানান- ময়নাতদন্ত করার জন্য ডাক্তার প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু ২৬.২.২০১০ তারিখ দুপুর একটার মধ্যে সবগুলো লাশ স্বজনরা নিয়ে যায়।
রোগী ভর্তির রেজিস্টার দেখে হাসপাতালের একজন স্টাফ জানান- আহতাবস্থায় গরীব এন্ড গরীব সোয়েটার লিমিটেডের দু’জনকে ভর্তি করা হয়েছিল। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন- আঃ রহিম (২৮), পিতা-অজ্ঞাত। রেজিঃ নাম্বার ১০১০/১৫। ভর্তির সময় ২৫.২.২০১০ ইং তারিখ ১১.৫৫ মিনিট। অপরজন হলেন আলমগীর (৩০), পিতা-নজরুল ইসলাম। রেজিঃ নাম্বার ১০০৯/১৪। ভর্তির সময় ১১.৩০ মিনিট ২৫.২.২০১০ ইং। ভর্তির পর এরা পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল। পরে ঐ রাতেই তারা হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন বলে ওয়ার্ডে রক্ষিত রেজিস্টারের বর্ণনা সূত্রে জানা যায়।
গাজীপুর সদর থানায় গেলে কথা হয় কর্তব্যরত কর্মকর্তা এএসআই তাহেরের সাথে। তিনি জানান- পুরো বিষয়টি ওসি ও সেকেন্ড অফিসার দেখছেন। তিনি আরো জানান- ফ্যাক্টরির মেইন গেট লক করা ছিল। দম বন্ধ হয়ে শ্রমিকরা মৃত্যুবরণ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা হয়েছে।
আগস্ট ২০০৯-এর ঘটনা
তথ্যানুসন্ধানের সময় জানা যায়, একই গার্মেন্টসে গত বছর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অগ্নিনির্বাপণ করতে গিয়ে একজন ফায়ারকর্মীর মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় গরীব এন্ড গরীব কোম্পানি লিমিটেডের তৎকালীন উৎপাদন কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রাজ্জাকের উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক যুগান্তর (২২.৮.২০০৯) জানায়, ২০.৮.২০০৯ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ফ্যাক্টরির তৃতীয় তলায় একটা রুমে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। তখন ঐ রুমে কেউ ছিল না। তিনি জানান- আগুন নেভাতে গিয়ে তিনিসহ ফ্যাক্টরির আনোয়ার হোসেন (৩২), নিটিং সুপারভাইজার মনির হোসেন (২৬), নিটিং অপারেটর জীবন মাহমুদ (৩০) আহত হয়েছেন। একই তথ্যসূত্রে প্রকাশ, তাছাড়া আগুন নেভাতে গিয়ে আবুল কালাম (২৫) নামে এক ফায়ারম্যান বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত হন। একই দিনের ইংরেজি কাগজ নিউএজ থেকে জানা যায়- দ্বিতীয়তলায় এ আগুনের সূত্রপাত হয়ে তা তৃতীয়তলায় ছড়িয়ে পড়ে। পরপর সংঘটিত দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে প্রকৃতিগত কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। উভয় ক্ষেত্রে বৃহস্পতিবার রাত এবং এমন ফ্লোরে আগুন লেগেছে যেখানে কোনো কর্মী কর্মরত ছিল না। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত যে কারণেই হোক না কেন, সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়- উক্ত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির অবকাঠামোগত সমস্যা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ত্রুটি, আপদকালীন অবস্থায় কর্মীদের করণীয় বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ, মহড়ার অভাব, ঘটনার সময় গেট তালাবদ্ধ থাকা এবং নিয়মমতো পানির রিজার্ভার না থাকায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের তাৎক্ষণিক দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যার কারণেই সম্পদ ও প্রাণহানির ব্যাপ্তি বেড়েছে।
কঠোর কঠিন পদক্ষেপ ও অপরিবর্তিত দৃশ্যপট
বর্তমানে প্রচলিত ‘শ্রম আইন ২০০৬’-এ কর্মরত সময়ে কারখানায় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ব্যাপারে কতিপয় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। উক্ত আইনের ৬২ ধারার উপধারাগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের বা বিপদের সময় সহজে বহির্গমনের জন্য বিকল্প সিঁড়ি এবং অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের ব্যবস্থা, কারখানায় কর্মী রয়েছে এমন কক্ষ তালাবদ্ধ বা আটকিয়ে না রাখা, অগ্নিকাণ্ড বা বিপদের সময় হুঁশিয়ার করার জন্য স্পষ্টভাবে শ্রবণযোগ্য হুঁশিয়ারি সংকেতের ব্যবস্থা এবং পঞ্চাশ বা ততোধিক শ্রমিক/কর্মচারী সম্ব্বলিত কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর অন্তত একবার অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার আয়োজন করার কথা বলা হয়েছে। একই ধারায় আরো বলা হয়, যদি কোনো পরিদর্শকের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, উপধারা (১)-এ উল্লিখিত বিধি অনুযায়ী বহির্গমনের ব্যবস্থা করা হয়নি, তাহলে তিনি মালিকের ওপর লিখিত নির্দেশ জারি করে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে তার মতে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন তা মালিককে অবহিত করবেন। উক্ত আইনের অন্য ধারাতেও কারখানা ভবন ও যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত বিষয়সহ শ্রমিকদের জন্য সুস্থ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন বিধিবিধান সংযোজিত আছে। এছাড়া রয়েছে ইমারত নির্মাণ আইন, দণ্ডবিধিসহ নানা আইনি বিধিব্যবস্থা। এতসব আইনগত বিধিবিধান থাকা সত্ত্বেও থেমে নেই অবহেলাজনিত দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা।
এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর ১৯৯৫ সালের ৭ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় (দেখুন-আসক বুলেটিন সেপ্টেম্বর ১৯৯৭)। তাতে অবস্থার যে পরিবর্তন হয়নি, তা বোঝা যায়, বছর দু’য়ের মধ্যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ‘তালাবদ্ধ ফ্লোরে পুড়ে মারা গেছে ৯ জন, ৭ জনকে চেনা যায় না’ (সংবাদ, ১৭ জুলাই ১৯৯৭) বা ‘মিরপুরে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন জীবন্ত দগ্ধ’ (আজকের কাগজ, ১৭ জুলাই ১৯৯৭) ইত্যাদি শিরোনাম থেকে। এ দুটি পত্রিকার শিরোনামে উল্লিখিত ঘটনার পর আরেকটি জাতীয় দৈনিকে (ভোরের কাগজ, ১৮ জুলাই ১৯৯৭) প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ‘গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে এক আন্তঃ- মন্ত্রণালয় বৈঠকে আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রতিটি গার্মেন্টস কারখানায় জরুরি বহির্গমন পথ তৈরিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’ পরপর কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শ্রমিকদের প্রাণহানির প্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে হাইকোর্টে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পক্ষে এক রিট (রিট আবেদন নাম্বার-৬০৭০/১৯৯৭) দাখিল করা হয়। রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ সরকার, বিজিএমইএ ও কয়েকটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিকসহ অন্যদের প্রতি কারখানা আইন ১৯৬৫, কারখানা বিধিমালা ১৯৭৯ এবং ফায়ার সার্ভিস অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে তাদের স্ব-স্ব ব্যর্থতাকে কেন বেআইনি এবং সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না মর্মে রুল জারি করেন। এরই পরোক্ষ ফলশ্রুতিতে একই বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মোট ৭১ দফাসংবলিত সুপারিশমালা প্রণয়ন করে এবং সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কাজ পর্যবেক্ষণের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের নেতৃত্ব আট সদস্যের একটি কমিটি ও বিজিএমইএর ১৫টি দল কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৭ সালে আসকের দায়ের করা রিটের নিষ্পত্তিতে ২০০১ সালে দেয়া আদালতের রায়ে প্রতিটি কারখানায় আগুন নেভানোর এবং দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকরা যাতে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারেন তার ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করতে বলা হয়। দুর্ঘটনায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের আহত ও নিহত হওয়ার বিষয় এড়ানোর জন্য আদালতের নির্দেশনায় কলকারখানা পরিদর্শক এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালককে সংশ্লিষ্ট আইনানুযায়ী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব দৃঢ়ভাবে সম্পন্ন করতে বলা হয়।
নির্দেশনায় কারখানার ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গাসহ সহজে বহির্গমনের পথ রাখতে বলা হয়। এতে আরো বলা হয়- কারখানার প্রতিটি কক্ষে অন্তত দুটি দরজা এবং প্রতিটি কারখানায় অন্তত দুটি সিঁড়ি থাকতে হবে এবং কারখানা আইন, ১৯৬৫ (শ্রম আইন ২০০৬ দ্বারা প্রতিস্থাপিত) এবং ফায়ার সার্ভিসেস অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৯-এ বর্ণিত শর্তাদি পূরণ না করা হলে কোনো কারখানাকে লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না।
কলকারখানা পরিদর্শক ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স/নবায়ন ব্যতীত ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি/শিল্পে চলতি/মূলধনী ঋণ প্রদান করতে পারবে না বলে আদালত নির্দেশনা দেন।
উপরোক্ত নির্দেশনার পাশাপাশি প্রচলিত সংশ্লিষ্ট আইনেও কারখানা চালু থাকার সময় বাইরে থেকে তালা মেরে গেট বা সিঁড়ি বন্ধ করা যাবে না, কারখানার ভেতরে জরুরি বাতির ব্যবস্থা থাকতে হবে, কারখানার ভেতরের প্যাসেজ মালামাল রেখে বন্ধ করা যাবে না, কারখানায় ফায়ার ফাইটিংয়ের তথা আগুন নেভানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে, কারখানায় যথেষ্ট পরিমাণ পানি রিজার্ভ রাখাসহ কারখানায় বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে গাজীপুরে সংঘটিত ঘটনায় ২১ জনের প্রাণহানির পর মন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ছয়টি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল গঠনের। ৪ মার্চ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক নীতিনির্ধারণী সভায় গার্মেন্টস কারখানায় ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে’ বিদ্যমান ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটির কলেবর ও ক্ষমতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ শিল্প এলাকায় নিজ নিজ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও এডিএমকে প্রধান করে ছয়টি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল গঠনের সিদ্ধান্ত হয় (সমকাল ৫.৩.২০১০)।
তদন্ত প্রতিবেদনে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার সুপারিশ
২৫ ফেব্রুয়ারির মর্মান্তিক ঘটনার পর স্থানীয় জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোঃ হাসান সারোয়ার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ও গাজীপুর ফায়ার স্টেশনের উপ-সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম। ২ মার্চ কমিটি জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রাণহানির চারটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রথমত, ছয়তলা কারখানা ভবনে অনুমোদন ছাড়া সপ্তমতলায় স্টিলের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠতলা পর্যন্ত প্রতি তলার জানালা বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বাইরে বেরোতে পারেনি। এ জন্য ফ্লোরগুলো অক্সিজেনশূন্য হয়ে পড়ে এবং আটকেপড়া শ্রমিকরা মৃত্যুবরণ করেন।
দ্বিতীয়ত, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র থাকলেও তা ব্যবহারের জন্য সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলেন না। অগ্নিকাণ্ডের সময় অধিকাংশ বিভাগ বন্ধ ছিল। এ কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা অনুপস্থিত ছিলেন।
তৃতীয়ত, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে কারখানার বিদ্যুৎকর্মী বিদ্যুৎ সংযোগ ও এর বিকল্প উৎস আইপিএস বন্ধ করে দেন। বিদ্যুৎ না থাকায় সপ্তমতলা মালামালে ঠাসা থাকায় সেখানকার শ্রমিকরা বাইরে বের হতে পারেননি।
চতুর্থত. কারখানার দুটি সিঁড়ির বাইরের দিকের অংশ লোহার গ্রিল ও কাচ দিয়ে বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বাইরে বের হতে পারেনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরিচালনা পর্ষদকে দায়ী করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, সপ্তমতলার ইস্পাত কাঠামো অপসারণ, কারখানা দ্রুত চালু, সহজে অপসারণযোগ্য কাচ ও গ্রিল ব্যবহার, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ও দমকলকর্মী নিয়োগ, প্রতি তলায় ফায়ার এস্কেপ স্থাপন, বিল্ডিং কোড অনুযায়ী আগমন-নির্গমন পথ সহজ করা, গাজীপুরে ফায়ার সার্ভিসের স্পেশাল স্কোয়াড স্থাপন করা, অন্তত ৩০ ফুট সামনের রাস্তা ও সুপরিসর প্রবেশপথ ছাড়া তৈরি পোশাক শিল্প স্থাপনের অনুমতি না দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে (প্রথম আলো, ৩.২.২০১০)।