Bulletin_September_2013
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   বিশেষ রচনা
   তথ্যানুসন্ধান
   আইন আদালত
   ফলোআপ
   মত-অভিমত
   আন্তর্জাতিক
   সংগঠন-বার্তা
   
   

 


যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

মত-অভিমত

তত্ত্বাবধাযক সরকার সাংবিধানিক নয় নৈতিক সঙ্কট

 

- মুহাম্মাদ আমিরুল হক

আরও বেশি ভালো এবং আরও বেশি মজবুত, টেকসই ও উন্নত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে তৎপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো। দেশের সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে এমন ইতিবাচক ও উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এর আগে প্রত্যক্ষ করেনি ৪২ বছর বয়সী বাংলাদেশ। ইতিপূর্বে বাংলাদেশে স্বৈরাচার নিপাত ও গণতন্ত্র মুক্তির জন্য রাজনীতি ও আন্দোলন হয়েছে, ‘ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করার’ রাজনীতি হয়েছে। এরশাদ সরকারের পতনের মাধ্যমে সফল হয়েছিল কথিত ‘স্বৈরাচার নিপাত ও গণতন্ত্র মুক্তি’র আন্দোলন। আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সমঝোতার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংঘটিত নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা পেয়েছিলাম একজন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। সেই গণতান্ত্রিক সরকারের ওপর গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্ব দিতে আমরা ভরসা পেলাম না। শুরু হলো সাংবিধানিক আইনি কাঠামোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করে তার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোটের অধিকার নিশ্চিত হতেই ‘ভাতের অধিকার’ প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে কেউ আর কোনো কথা তুললেন না। এতো কিছুর পরেও গণতান্ত্রিক উত্তরণে আমাদের সন্তুষ্টি এলো না। পারস্পরিক অনাস্থা ও অবিশ্বাস এবং ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা নির্বাচন প্রকৌশল বিদ্যার বহুমাত্রিক বিকাশের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ত্রুটি ধরা পড়লো। অতঃপর ঘটনাক্রমে একটি রিট আবেদনের সূত্র ধরে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। সামপ্রতিককালে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর পরস্পরবিরোধী কঠোর অবস্থান পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বারবার তত্ত্বাবধায়ক নামক অসাংবিধানিক সরকার আবার ক্ষমতায় এলে কী হতে পারে তার আশঙ্কা বিরোধী দলকে মনে করিয়ে দিচ্ছে আর বিরোধী দলের সাফ জবাব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন নয়। একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্র রক্ষায় কেবল নির্বাচন হওয়াই যথেষ্ট নয় এমন দাবি করছেন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক। দুই নেত্রীর গদি বদলের নির্বাচনে কী লাভ- এ প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।

সঙ্কট খুব শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে- এ আশঙ্কা অনেকেরই। সর্বশেষ জাতিসংঘের মহাসচিব কর্তৃক একই দিনে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর ফোনালাপ ও জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশের পরিসি'তি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করার তথ্য বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিশ্বের দরবারে একটি মহাসঙ্কট হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশের পরবর্তী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিরোধী রাজনৈতিক জোটের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য সংবিধান সংশোধনের আন্দোলনের ডাক দিচ্ছে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সংবিধান থেকে এক চুলও না সরার অবস্থান নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী-পরবর্তী সাংবিধানিক আয়োজন কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে কিনা?

একথা অনস্বীকার্য যে, ত্রয়োদশ সংশোধনীর পর ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ নামক যে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা আমরা পেয়েছিলাম তাতে বেশ কিছু ত্রুটি ছিল আর এটি ধরা পড়ে ১৯৯৬ সালেই। এই সংশোধনীর মাধ্যমে পাওয়া সংবিধানের ৬১ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস সেনাপতি এ.এস.এম নাসিমকে ১৯৯৬ সালের ২০ মে অকস্মাৎ পদচ্যুত করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা না করে। এর মাধ্যমে আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষণকালের জন্য কিছুটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার দ্বৈতশাসনের একটি সুযোগ স্পষ্ট হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত এই দুর্বলতা নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলকেই সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানেই সব দলের গ্রহণযোগ্য ও পরম নির্ভরতার সরকার যে নয় তা বোঝা যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে দ্বিতীয় নির্বাচন অর্থাৎ বিচারপতি লতিফুর রহমানের অধীনে পক্ষপাতের অভিযোগদুষ্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০০১ সালে। এরপরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আর যথাযথভাবে কাজ করেনি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আজ্ঞাবহ করার জন্য বিচার বিভাগকে দলীয়করণ, বিচারকদের অবসর গ্রহণের বয়স বৃদ্ধিসহ নানা প্রস্থতি নিয়ে এমন এক অনাস্থার পরিবেশ তৈরি করে যে পদত্যাগী সর্বশেষ প্রধান বিচারপতির আসনটি বিতর্কিত হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ দাবি করে যে, বিএনপি কারচুপি করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বিচারকদের অবসর গ্রহণের বয়স বৃদ্ধি করে, প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে তাদের ‘দলীয় বিচারপতি’ কে.এম. হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন সেই ব্যবস্থা করে রেখেছে। তাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট এটিকে প্রতিহত করার জন্য লগি-বৈঠার আন্দোলনের ডাক দেয়। রাজপথে ব্যাপক সংঘর্ষ ও রক্তপাতের পর বিচারপতি কে.এম. হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মতি জানালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানে প্রদত্ত অন্যান্য বিকল্প কৌশল টপকে নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলেও ভুয়া ভোটার তালিকা, অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এমন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়। প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের পদত্যাগ ও জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর গঠিত হয় বহুল আলোচিত ১/১১’র ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকার প্রায় ২ বছরের কাছাকাছি ক্ষমতায় থাকে এবং সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার বাইরেও তাঁর নানা উদ্যোগ ও তৎপরতার জন্য আলোচিত ও সমালোচিত হয়।

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সবচেয়ে কম বিতর্কিত হয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করেছিল একবারই, ১৯৯৬ সালে। যদিও সেই সরকারকেও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছিল। তারপর থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমে বারবার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সর্বশেষ ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দৃষ্টান্ত দিয়ে এখন তো বিরোধী দল ও দেশবাসীকে রীতিমতো জুজুর ভয় দেখানো হচ্ছে। এতো কিছুর পরেও বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে এখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর মাধ্যমেই কেবল দেশে সরকারের বা ক্ষমতার পরিবর্তন এসেছে- ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকারি দল অদ্যাবধি কখনোই পরাজয় বরণ করেনি।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, সরকারি ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক তৎপরতাকে দেশের নবীন ও প্রবীণ অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও আইন বিশ্লেষক একটি সাংবিধানিক সঙ্কট হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এই সঙ্কট আসলেই সাংবিধানিক সঙ্কট কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কারণ এখন যে ব্যবস্থায় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে, তা আজকের নয় বাঙালি জাতির পরম অর্জন ১৯৭২ সালের সংবিধানেই এই ব্যবস্থা ছিল। এই ব্যবস্থার অধীনে ইতিপূর্বে বাংলাদেশে একবার সংসদ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে সময় এই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আর যাই হোক সাংবিধানিক সঙ্কট বলা হয়নি। দাবি করা যেতে পারে, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় এটি একটি পর্যায়, যা আমরা এতো দিনে পার করছি। এর জন্য আমাদের হতাশ হলে কোনো লাভ হবে না বরং আরও বেশি সতর্ক, অনুসন্ধানী ও দায়িত্বশীল হলে বিদ্যমান সমস্যার কূল-কিনারা পাওয়া যেতে পারে। আর তাই শুধু সংবিধান নয় আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও এর গতিপ্রকৃতি। এই সংস্কৃতির কারণেই সংবিধান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুখ্য কোনো দলিল নয়, সাংবিধানিকতা অপরিহার্য কোনো নীতি নয় এবং আইনের শাসন বোধগম্য কোনো প্রতিশ্রুতি নয়।

সংবিধান বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক সঙ্কটেরই সাংবিধানিক সমাধান দিতে পারেনি। বাংলাদেশে সংবিধান সামরিক আইনের অধীন হয়েছে, স্থগিত হয়েছে। সংবিধানের অভিভাবক বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সেই সামরিক আইনের প্রশাসকও হয়েছেন। সংবিধান ব্যবহৃত হয়েছে এসব অসাংবিধানিকতাকে অসাংবিধানিকভাবে জায়েজ করার কাজে। ১৯৯০ সালে কেন আমরা সংবিধানের মধ্য থেকে রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করতে পারলাম না? কেন সংবিধানের চেয়ে তৎকালীন তিন রাজনৈতিক জোটের সমঝোতাই বড় হলো? কেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ সংবিধানকে অগ্রাহ্য করে প্রধান বিচারপতি থাকা অবস্থায় দেশের উপ-রাষ্ট্রপতি হলেন আবার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পরবর্তী সময়ে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে গেলেন? সংবিধানকে আমরা এতো খেলো কেন করলাম? তিন জোটের সমঝোতা কি এমন দৃঢ়, পবিত্র, গণতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক ও আইনানুগ ছিল যে তার ওপর ভিত্তি করে দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করে সংবিধানের অভিভাবক দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব নেবেন? সংবিধানকে মাথার উপর থেকে নামিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণ করতে গিয়ে সেই যে আমরা পথভ্রষ্ট হয়েছি তারপর থেকে সংবিধান আর আমাদের রাজমুকুট নয়। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সাংবিধানিক উপায়ে সঙ্কটের সমাধান খোঁজেন না আর যে সমাধান তারা দেন তাও কোনো টেকসই ও আইনসম্মত হয় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাংবিধানিক নাকি অসাংবিধানিক এ বিতর্ক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারপতিরা বিজ্ঞ আইনজীবীদের সহায়তায় গলদঘর্ম হয়ে সর্বশেষ রায় দিয়েছেন যে, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রণীত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ। এদিকে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় না থেকে জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। জাতীয় সংসদের যেমন ক্ষমতা আছে সংবিধানসম্মতভাবে সংবিধানের সংশোধন করার, আবার সুপ্রিম কোর্টেরও ক্ষমতা আছে জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত কোনো আইন সংবিধানসম্মত না হলে তা অবৈধ ঘোষণা করার। সংসদ সংসদের মতো পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস করেছে আবার সুপ্রিম কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের মতো সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন অবৈধ ঘোষণা করেছে। দুটি ঘটনাই পৃথক পৃথকভাবে সাংবিধানিক ও আইনসম্মত। রাষ্ট্রের এই দুটি অংশেরই নিজ নিজ ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও সীমা রয়েছে। জাতীয় সংসদ ২০১০ সালের ২১ জুলাই সংসদ সংশোধনের লক্ষ্যে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ ঘোষণা সংক্ষিপ্ত আদেশ প্রদান করে এই কমিটি গঠনের প্রায় ১০ মাস পরে ২০১১ সালের ১০ মে তারিখে।

এবারে আসল প্রশ্নে আসা যাক, যদি সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল না করতেন আবার আদালতও একে অবৈধ ঘোষণা না করতো, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা বর্তমানে কেমন থাকতো? তেমনটাই থাকতো যেমনটা ছিল ২০০৬ সালে যখন তৎকালীন বিরোধী দল বিচারপতি কে. এম. হাসানকে দলীয় আবরণ দিয়ে তার অধীনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয় দাবি তুলে রাজপথে ‘লগি-বৈঠা’র সংঘাত বাধিয়ে দিয়েছিল। বিচারপতি কে. এম. হাসানের মতো আরও কোনো বিচারপতি নাজেহাল হতো দেশবাসীর সামনে দলীয় আনুগত্যের অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর কারণ এই নয় যে, এখানে অনেক সমস্যা আছে। আমাদের সমস্যার কারণ আমরা সমস্যার সমাধানে আগ্রহী না বা আন্তরিক নই। সাংবিধানিকভাবে আমরা বর্তমানে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চের পূর্বে অবস্থান করছি যেদিন ষষ্ঠ সংসদ কর্তৃক পাসকৃত সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন বিলে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে আশার কথা এই যে, ১৯৯৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। বাঙালির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যোগ হয়েছে বিচারপতি হাবিবুর রহমান, বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি কে. এম. হাসান, আবদুর রহমান বিশ্বাস, জেনারেল নাসিম, বিচারপতি আবদুল আজিজ ও উপদেষ্টা ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ, জেনারেল মইন উদ্দীন, জেনারেল মাসউদ, বিচার বিভাগে দলীয়করণ, ভুয়া ভোটের তালিকা, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ১/১১ জরুরি অবস্থা, ইলেকশন প্লাসতত্ত্ব ইত্যাদি।

বিএনপি বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির আগে তারা এর বিরোধিতা করেছে। ১৫ ফেব্রুয়ারির পরে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে বাধ্য হওয়ার পর ত্রয়োদশ সশোধনী আইন পাস করে নিজেরাই নিজেদের ‘স্ব-উদ্যোগে’ এই ঐতিহাসিক কাজটি করার জন্য বাহবা দিয়েছে। আবার বিএনপিই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দিয়ে ১/১১ ডেকে এনেছে। এখন আদালত ও সংসদ কর্তৃক পৃথক পৃথকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়ার পর তারা আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাচ্ছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে সংসদের বিশেষ কমিটি তাদের আমন্ত্রণ জানালেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি। দু’দিন আগেও বিএনপি নেতা ড. মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, তাদের তরফ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে কোনো প্রস্তাব নেই। তবে তারা ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল তা গ্রহণ করতে রাজি আছেন। সুপ্রিম কোর্টের রায় ভঙ্গ করে আগামীকালই যদি তাদের দাবি মেনে নেয়া হয়, তখনই তাদের বোধোদয় হবে যে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার জন্য সংবিধান অনুযায়ী প্রথম ব্যক্তিটি হচ্ছেন বিচারপতি এ.বি.এম খায়রুল হক। এক মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে তারা ২০০৬ সালের আওয়ামী লীগের মতো দাবি করবেন এ. বি. এম খায়রুল হক আওয়ামী লীগের অনুগত। সুতরাং তাঁর অধীনে নির্বাচন নয়। তখন কি আবারও কোনো ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বা ফখরুদ্দীন আহমেদকে পাবে বাংলাদেশ?

অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের অনেক সাধারণ কর্মী তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন দিয়েছেন। নাম না জানা অনেকের মায়ের বুক খালি হয়েছিল তাঁর ডাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে। আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক সরকার বলছেন। এখন তাদের মায়েদের তিনি কী জবাব দেবেন? যদি তারা প্রশ্ন করেন কেন এক অসাংবিধানিক সরকারের জন্য তাদের সন্তানদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল সেদিন। আর বিএনপিই-বা কী উত্তর দেবে যদি প্রশ্ন করা হয়, তাদের তত্ত্বাবধায়কবিরোধী আন্দোলনে যারা মারা গিয়েছিল, তারা সেদিন কী দোষ করেছিল?

তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেন্দ্রিক এই ভিন্ন ভিন্ন বিপরীতমুখী আন্দোলনে জীবন দেয়া রাজনৈতিক কর্মীদের মা, বাবা, ভাই, বোন তথা বাংলাদেশের জনগণ কখনোই তাদের প্রশ্নের জবাব পাবে না। ঐ জবাবদিহিতার গণতন্ত্র বাংলাদেশে নেই। বাংলাদেশে গণতন্ত্র মানে নির্বাচন, তাও আবার শুধু এবারের নির্বাচন, এর পরবর্তীটা নয়। কারণ পরবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন কর্মীরা প্রাণ দেবে। তখনকারটা তখন বোঝা যাবে- আপাতত এবারের নির্বাচনটা উতরে কোনোভাবে পার পাওয়া যাক।

নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশে সাংবিধানিক কোনো সঙ্কট নেই। সঙ্কট আমাদের নেতা-নেত্রীদের নৈতিকতার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ইতিমধ্যেই অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশের বিচার বিভাগে দলীয়করণের যে মহোৎসব ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে তার মাশুল বাংলাদেশকে আরও কতো বছর গুনতে হবে কে জানে!

* * *