সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   মুক্তিযুদ্ধ
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   আন্তর্জাতিক
   তথ্যানুসন্ধান

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

আন্তর্জাতিক

মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা
সু চি আবারও গৃহবন্দি

প্রশান্ত কুমার রায়

 

কারাভোগ ও গৃহবন্দি থাকাই যেন সু চির নিয়তি। সমপ্রতি প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে মায়ানমারের সামরিক জান্তা নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেছে। কিন্তু জান্তা প্রধান থান শোয়ে তাঁর বিশেষ ক্ষমতাবলে সু চির সাজার মেয়াদ দেড় বছর কমিয়ে দেন এবং কারাদণ্ডের স্থলে গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। সু চির অপরাধ তার বাড়িতে মার্কিন নাগরিক জন মাইকেল ইয়েত্তোকে অনুপ্রবেশ করতে দেয়া। সামরিক জান্তার বিভিন্ন অপ-কৌশলের কারণে গত ২০ বছরের মধ্যে ১৪ বছরই সু চি ছিলেন গৃহবন্দি।
সু চির পিতা অং সান ছিলেন মায়ানমারের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক লড়াকু সৈনিক। তিনি শুধু একজন নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাপানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন সেনা কমান্ডার। ব্রিটিশ ওপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ফ্যাসিবাদবিরোধী পিপলস ফ্রিডম লীগ (এন.এল.ডি) জয়লাভ করে। এই পার্টির কর্ণধার ছিলেন জেনারেল অং সান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৩ মাসের মাথায় ১৯ জুলাই ১৯৪৭ সালে এক সহিংস গ্রুপের হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বার্মিজ জাতির জনক জেনারেল অং সান এবং তিনি রেখে যান স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যা।
সু চির বয়স তখন ২ বছর, তাঁর মা ইতিমধ্যে সামাজিক পরিকল্পনা ও সামাজিক নীতি বিষয়ক জনব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। ১৯৬০ সালে মা যখন ভারতে মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তখন থেকেই সু চি তাঁর সাথে দিল্লিতে চলে আসেন এবং বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় পর্যায়ের পড়ালেখা সেখানেই করেন। পরবর্তীকালে ১৯৬৪ সালে দর্শন, রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সা্নতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে নিউইয়র্ক গমন করেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি তারিখে মাইকেল এরিসকে সু চি বিয়ে করেন। একই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর এন.এল.ডির সাধারণ সম্পাদক পদে তাঁকে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮৯ সালের ২০ জুলাই পিতার ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রথমবার গৃহে অন্তরীণ করার মাধ্যমে তাঁর গৃহবন্দিত্বের উপাখ্যানের সূচনা হয়। এতে তিনি নির্বাচন প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় ১৯৯০ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাঁর দল অংশ নেয়া সত্ত্বেও তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ১৯৯১-এর ১৪ অক্টোবর অং সান সু চি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৫-এর ১০ জুলাই দীর্ঘ চার বছর পর তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। ২০০০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি পুনরায় গৃহবন্দি হন এবং ২০০২ সালের মে মাসে মুক্তি লাভ করেন। গৃহবন্দিত্বের ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো গৃহবন্দি হন। ২০০৮ সালের মে মাসে সামরিক জান্তা সরকার তাঁর গৃহবন্দিত্বের মেয়াদ আরও এক বছর বৃদ্ধি করে। পরবর্তীকালে ৬ জুন ২০০৮ নির্দেশ দেয় যে, ২৭ নভেম্বর ২০০৯-এর পূর্বে তাঁকে মুক্তি দেয়া সম্ভব নয়। সর্বশেষ ১১ আগস্ট ইনসেইন কারাগারে স্থাপিত এক বিশেষ আদালত সু চিকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
গাণিতিক হিসেবে, মায়ানমারের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। এক্ষেত্রে সামরিক জান্তা থান শোয়ের প্রস্তাবিত দণ্ড বিবেচনা করলে সু চি মুক্তি পাবেন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ২ মাস পরে। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর ১৮ মাসের সাজা বাড়ানো হয় যাতে ২০১০ সালে জান্তা সরকারের প্রতিশ্রুত নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করতে না পারেন।
সু চির বিরুদ্ধে এই রায় ঘোষণার পর আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক মহল ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা জ্ঞাপন অব্যাহত রেখেছে। জাতিসংঘ ও আসিয়ান উভয় সংস্থাই গত কয়েক মাস ধরে সু চির মুক্তির ব্যাপারে জোরালো আহ্বান জানিয়ে আসছে। এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, সু চিসহ রাজবন্দিদের মুক্তি এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়া রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা সু চির পাশাপাশি মার্কিন নাগরিক জন ইয়াত্তার ৭ বছরের কারাদণ্ডের রায়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁদের মুক্তি দাবি করেন। উদ্বেগ প্রকাশ করে মুক্তি দাবি করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন। মায়ানমারের ওপর আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার চিন্তা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অস্ত্র বিক্রি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য আহ্বান জানায় ফ্রান্স ও ব্রিটেন। বিশ্ব নেতারা অবিলম্বে সু চির নিঃশর্ত দাবি করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল আইরিন খান এক বার্তায় বলেছেন, ‘অং সান সু চির শাস্তি নীতিবিবর্জিত ও ন্যক্কারজনক। এটা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের মুখে একটি চপেটাঘাত।’
এত কিছুর পরও সু চি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জান্তা সরকারের প্রতি ধন্যবাদ প্রকাশ করেছেন, তবে নিয়মমাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এ বিশ্বনেতা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন সু চির আইনজীবী দলের সদস্য নিয়ান উইন।