সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   মুক্তিযুদ্ধ
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   আন্তর্জাতিক
   তথ্যানুসন্ধান

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

আইন-আদালত

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না

সরকারের প্রতি হাইকোর্টের রুল

সারোয়ার হোসাইন


আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (ক্রসফায়ার) কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণের আদেশ দেয়া হবে না মর্মে গত ২৯ জুন ২০০৯ তারিখে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।

র‌্যাব মূলত ১৯৭৯ সালের The Armed Police Battalions Ordinance-এর সংশোধনীর মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। গঠনের পরপরই তারা তাদের উদ্দেশ্যের জানান দিয়েছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডে যুক্ত করিয়েছে ক্রসফায়ার নামের একটি নতুন শব্দের। এই শব্দের শুরু আগস্ট ২০০৪ সালে পিচ্চি হান্নান নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর হত্যার মাধ্যমে। ২০০৪ সাল থেকে ক্রসফায়ারে মৃতের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের বিকল্প হিসেবে এ হত্যাযজ্ঞ কখনও সন্ত্রাস দমনের পথ হতে পারে না। সংবিধান কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের কোনো বিধানই ক্রসফায়ারের মাধ্যমে সন্ত্রাস নির্মূলের পথকে সমর্থন প্রদান করেনি।

দেশের সচেতন মহল থেকে বারবার র‌্যাব-পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা হলেও অতীতের সরকার তাতে কোনো কর্ণপাত করেনি। এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ক্রসফায়ারের সমালোচনা করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই ক্রসফায়ার বন্ধের অঙ্গীকার করে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও ক্রসফায়ার বন্ধের উল্লেখ ছিল। যথারীতি তা বন্ধ করা হয়নি। অবশেষে ২৯ জুন ২০০৯ তিনটি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও কর্মজীবী নারী মানবাধিকার পরিপন্থী এই কার্যক্রম বন্ধে জনস্বার্থে একটি রিট মামলা দায়ের করে। মামলার আবেদনে র‌্যাব গঠন পরবর্তীকালে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটি তালিকা প্রদান করা হয়। আবেদনকারী সংগঠন আসক-এর তথ্য মোতাবেক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা র‌্যাব কর্তৃক বিচারবহির্ভূত উপায়ে হত্যার সংখ্যা ২০০৪ সালে ছিল ৬০ জন, ২০০৫ সালে ১০৪ জন, ২০০৬-এ ১৭৪, ২০০৭ সালে ৯৫ জন, ২০০৮ সালে ৭৯ জন এবং ২০০৯ সালের ২ জুন পর্যন্ত ১৫ জনসহ সর্বমোট ৫২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরূপ কর্মকাণ্ড থেকে পুলিশ বাহিনীও পিছিয়ে থাকেনি। ২০০৪ সালে তাদের হাতে ৫৪, ২০০৫ সালে ২১৬ জন, ২০০৬ সালে ৭২ জন, ২০০৭ সালে ৩৩ জন, ২০০৮ সালে ৬০ জন এবং ২০০৯ সালের ২ জুন পর্যন্ত ৭ জনসহ সর্বমোট ৪৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মামলা দায়েরের পূর্ব পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর গুলিতে বিচার ও আইনবহির্ভূতভাবে সর্বমোট ৯৬৯ (র‌্যাব ৫২৭ এবং পুলিশ ৪৪২) জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

মামলার আবেদনে বলা হয় যে, সন্ত্রাস নির্মূলের নামে এইরূপ হত্যাকাণ্ড প্রচলিত আইন ও সংবিধান কর্তৃক নিশ্চিতকৃত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ মোতাবেক বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল নাগরিক ও সাময়িকভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী অপরাপর ব্যক্তি আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভের অধিকারী হবে। এই অনুচ্ছেদে আরও নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে যে, আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না যাতে উক্ত ব্যক্তির দেহ, সম্পদ ও সুনামের কোনো ক্ষতি হয়। অনুরূপভাবে ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হতে কোনো ব্যক্তিতে বঞ্চিত করা যাবে না। এই অধিকারের পূনঃনিশ্চয়তার প্রকাশ পায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)এ। এই অনুচ্ছেদ মোতাবেক ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হবেন। অথচ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব আইনি বিধানের তোয়াক্কা না করে বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত উপায়ে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যা সুস্পষ্টভাবে সংবিধানের নিশ্চিতকৃত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন তথা ফৌজদারি আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য।

আদালতের আদেশ
মামলাটির প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হুসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ পূর্ববর্তী সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না মর্মে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি রুল জারি করেছে। সামপ্রতিককালে সরকারও পুনরায় ক্রসফায়ার বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছে। আবেদনকারীদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ব্যারিস্টার সাইফুর রশীদ, ড. নাঈম আহমেদ ও আবু ওবায়দুর রহমান।

 

সালিশের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান হাইকোর্টের অবৈধ ঘোষণা

সারোয়ার হোসাইন

 

সালিশের নামে আইন ও বিচারবহির্ভূত শাস্তি, দোররা মারা, প্রহার করা এবং বেত্রাঘাত করা বন্ধকরণে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেছে হাইকোর্ট। পাশাপাশি সালিশের নামে বিচারবহির্ভূত শাস্তি, দোররা মারা, বেত্রাঘাত করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করা হয়েছে। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ গত ২২ আগস্ট ২০০৯ সরকারের প্রতি এই রুল জারি করে।

গ্রামীণ সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ উজ্জীবিত রাখার উদ্দেশ্যে সুদীর্ঘকাল থেকেই সালিশের ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। এতে করে ছোটখাটো ঘটনার জন্য আদালতে যেতে হয় না। ফলে সমস্যার সমাধান পেতে অর্থব্যয় ও সময়ের দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো সম্ভব হয়। ক্ষুদ্র প্রকৃতির কলহ বা বিবাদ-মীমাংসাকরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সালিশের প্রচলন রয়েছে। সামাজিক জীবনে এমন কিছু সমস্যা থাকে যা এতই ছোট যে সেগুলো নিয়ে আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সালিশের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষ কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বিবদমান পক্ষের বিবাদের সমাধান দিতে চেষ্টা করেন। প্রায়োগিক দিক থেকে এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই বরং এটি ছোটখাটো সমস্যা-সমাধানের সামাজিক রেওয়াজ হিসেবে চলে আসছে। এই প্রক্রিয়ায় বিবদমান উভয়পক্ষের সম্মতি ও সমঝোতার মানসিকতাই মুখ্য। সালিশের মাধ্যমে কোনো শাস্তি প্রদান বা কোনো সিদ্ধান্ত কোনো পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। বাংলাদেশের প্রচলিত কোনো আইনে সালিশের মাধ্যমে কোনো শাস্তি প্রদানের বিধান নেই। ১৮০৯ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯(ক) ও ৮৯(খ) ধারায় সালিশ বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। এই ধারাগুলোর মধ্যেও সালিশ বিষয়ে পক্ষগুলোর সম্মতির কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায়ও সুনির্দিষ্ট প্রকৃতির কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের আপোস নিষ্পত্তির উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আইনেও সালিশ বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। সমপ্রতি সালিশভিত্তিক কয়েকটি খবর সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা বা বিবেচনায় চলে আসে। কেননা সালিশে ইদানীং এমন সব সিদ্ধান্ত ও শাস্তি নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল। আমাদের সমাজে মাতবর বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সালিশ প্রক্রিয়ায় ধর্মের দোহাই দিয়ে দোররা মারা, বেত্রাঘাত করা এমনকি পাথর ছোড়ার মতো শাস্তির প্রয়োগ করছেন, যা সম্পূর্ণ রূপে বেআইনি।

গত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সালিশের মাধ্যমে ফতোয়াবাজি ও দোররা মারার ঘটনা অব্যাহতভাবে ঘটার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, ফতোয়ার শিকার হচ্ছে নারীরা। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বিটেশ্বর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে সন্তানের পিতৃপরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করলে মেয়েটিকে ফতোয়ার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৩৯টি দোররা মারা হয় (প্রথম আলো, ২৪/৫/০৯)। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ করার অভিযোগে স্থানীয় মাতবররা এক নারী ও পুরুষকে প্রকাশ্যে ১০১ ঘা দোররা মারে (প্রথম আলো ৩১/৫/০৯)। শ্রীমঙ্গলের শাসন গ্রামে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুরুষের সাথে কথা বলায় একজন গৃহবধূকে সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে ১০১ ঘা দোররা মারা হয় (প্রথম আলো ৭/৬/০৯)। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধুবিল মেহমানসাহী গ্রামের একজন ধর্ষিতা কর্তৃক আদালতে মামলা করার অপরাধে ওই মেয়েটিকে ১০০ ঘা বেত্রাঘাত এবং দশ হাজার টাকা জরিমানার ফতোয়া কার্যকর করা হয় (প্রথম আলো ৮/৬/০৯)। মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলার সদর জায়ফরনগর ইউনিয়নের জায়ফরনগর গ্রামে দুইপক্ষের বিরোধ-নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ডাকা গ্রাম্য সালিশে জরিমানাকৃত টাকা পরিশোধ করতে না পারায় গ্রামের পঞ্চায়েতের মুরব্বি ও ধর্মীয় নেতাদের নির্দেশে এক পক্ষকে গ্রামে একঘরে করা হয় এবং তার দুই শিশুসন্তানের শিক্ষা কেন্দ্রে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয় (প্রথম আলো ৩১/৫/০৯)। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অপরাধে স্থানীয় সমাজপতিরা সালিশ বৈঠকে জনৈক নারী এবং তার বৃদ্ধ মাকে যথাক্রমে ১০১ ও ৫০টি দোররা মারে (প্রথম আলো ১৩/৬/০৯)। কুমিল্লার দেবীদ্বারে শুদ্ধির নামে বিধবা পেয়ারা বেগমকে ২০২ দোররা মেরে ক্ষতবিক্ষত করে ফতোয়া প্রদানকারীরা (জনকণ্ঠ ২৬/৬/২০০৯)।

সালিশ বিচারে এসব ঘটনা দেশের আইন ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। কেননা সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা, নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না বা অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। তাছাড়া ফতোয়া সংক্রান্ত একটি মামলায় ২০০১ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ফতোয়া প্রদানের ঘটনাকে দণ্ডবিধির ৫০৮ ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে মতামত দেয়।
সালিশের নামে এমন মৌলিক মানবাধিকার পরিপন্থী কার্যক্রম বন্ধে নির্দেশনা প্রণয়ন ও এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করতে সরকারকে নির্দেশ দেয়ার জন্য ৫টি মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ব্র্যাক, নিজেরা করি এবং মহিলা পরিষদ হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি রিট মামলা দায়ের করে। রিট আবেদনটিতে বলা হয়, দেশে সমপ্রতি (জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০০৯) সালিশের নামে ১৬টি দোররা মারার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের শাস্তি প্রদান আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(২) ও ৪৩ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

আবেদনকারীদের পক্ষে ব্যারিস্টার সারা হোসেন, রারেয়া ভূঁইয়া ও তৌফিকুর ইসলাম এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাজিক-আল জলিল মামলাটি পরিচালনা করেন।

 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯

সাঈদ আহমেদ

 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা এ দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশনের দাবিতে সোচ্চার। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৩ ডিসেম্বর ২০০৭ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০০৭ জারি করে। এর প্রায় এক বছর পর ২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে মানবাধিকার কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। নভেম্বর মাসে একজন চেয়ারম্যান এবং দু’জন কমিশনারকে নিয়োগ দেয়া হয়, যারা ১ ডিসেম্বর ২০০৮ থেকে কাজ শুরু করেন। মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি এবং তার মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠাকে সাধুবাদ জানালেও মানবাধিকার কর্মীরা অধ্যাদেশের বিভিন্ন দুর্বলতা নিয়ে সরব হন।

২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক সংখাগরিষ্ঠতা পেয়ে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মানবাধিকার কর্মীরা মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর বিষয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠেন। সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি উত্থাপিত না হওয়ায় প্রাথমিকভাবে এক ধরনের ধোঁয়াশা অবস্থা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে সরকারের তরফে একটি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয় ৭ জুলাই এবং ৯ জুলাই তা সংসদে পাস হয়। ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের যে বিষয়গুলো সংশোধনে সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে দাবি ছিল, তার অনেকগুলোই নতুন আইনে স্থান পায়। নতুন আইনের নামকরণ হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯। একে ১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ থেকে কার্যকর বলে গণ্য করা হয়েছে। ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাজকর্ম এবং গৃহীত ব্যবস্থাকে এই আইনে বৈধতা দেয়া হয়েছে।

নতুন আইনের মাধ্যমে কমিশনের আকার তিন সদস্য থেকে বাড়িয়ে সাত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- চেয়ারম্যান এবং অনধিক ছয় সদস্য নিয়ে কমিশন গঠন হবে। আগে চেয়ারম্যান এবং দু’জন সদস্য নিয়ে কমিশন গঠনের বিধান ছিল। নতুন আইনে নিউজিল্যান্ডের মানবাধিকার কমিশনের অনুসরণে সার্বক্ষণিক এবং অবৈতনিক দুই ধরনের সদস্য রাখার বিধান করা হয়েছে। চেয়ারম্যান এবং একজন সদস্য হবেন সার্বক্ষণিক এবং বেতনভোগী। অপর সদস্যরা কমিশনের বৈঠকে উপস্থিতির জন্য ভাতা পাবেন। নিউজিল্যান্ডে প্রধান কমিশনার এবং অন্য দু’জন কমিশনার সার্বক্ষণিক, আরো পাঁচজন কমিশনার খণ্ডকালীন। নতুন আইনে সদস্যদের মধ্যে একজন নারী এবং একজন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক, তবে কমিশনের কার্যক্রমে বেতনবিহীন সদস্যদের ভূমিকা কেমন হবে তা দেখার বিষয়। তাছাড়া নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর স্থলে ‘পিছিয়ে পড়া/বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর’ উল্লেখ থাকলে নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীসহ অন্য সব বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি হতো।

পূর্বের ছয় সদস্যের বাছাই কমিটিও পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অ্যাটর্নি জেনারেল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব পূর্বের এই বাছাই কমিটির স্থলে নতুন আইন অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং স্পিকার কর্তৃক মনোনীত দু’জন সংসদ সদস্য যাদের মধ্যে একজন সরকারদলীয় এবং অন্যজন বিরোধীদলীয় সদস্য মিলে সাত সদস্যের বাছাই কমিটি হবে। বাছাই কমিটিতে সংসদের প্রতিনিধিত্বের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা ইতিবাচক। তবে যেহেতু চারজনে কোরাম পূর্ণ হবে তাই দেখা যাচ্ছে স্পিকার, দু’জন মন্ত্রী এবং সরকারদলীয় সাংসদ মিলেই কোরাম হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বাছাই কমিটির নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। দু’জন মন্ত্রীর স্থলে একজন মন্ত্রী রেখে অ্যাটর্নি জেনারেলকে বাছাই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ছিল আমাদের।

নতুন আইনে ভারতের মানবাধিকার কমিশনের আদলে শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কেউ মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে কমিশন নিজ উদ্যোগে কিংবা দরখাস্তের ভিত্তিতে সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে বলে বিধান সংযোজন করা হয়েছে। শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকারের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত করা ইতিবাচক। ভারতের আইনে রয়েছে, এ ধরনের ক্ষেত্রে কমিশন সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকারের কাছে তাদের সুপারিশ এবং সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করবে। আমাদের নতুন আইনে রিপোর্ট প্রকাশের বিষয়টি বাদ দিয়ে শুধু প্রতিবেদন চাওয়ার মধ্যে কমিশনের এখতিয়ার সীমাবদ্ধ করায় এ ক্ষেত্রে প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

আদালতে বিচারাধীন মামলার বিষয় কমিশনের কার্যাবলি বা দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হবে না- এ বিধানটি অপরিবর্তিত রেখে নতুন একটি উপদফা সংযোজন করে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলায় বা আইনগত কার্যধারায় পক্ষভুক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার কমিশনের থাকবে। এখানেও ভারতের আইনকে অনুসরণ করা হয়েছে।

তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ বিষয়ে আগের বিধান পরিবর্তন করা হয়নি, যা তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশকে কার্যত নিরুৎসাহিত করবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় স্বার্থে অত্যাবশ্যকীয় না হলে কোনো রিপোর্টই অপ্রকাশিত থাকা উচিত নয়। এক্ষেত্রে বিধান করা উচিত ছিল যে, কমিশন যে যে বিষয়ে তদন্ত করবে তা প্রকাশ করবে। তদন্তে প্রাপ্ত কোনো তথ্য যদি কমিশন রাষ্ট্রীয় স্বার্থে প্রকাশ করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করে তবে সুনির্দিষ্টভাবে কারণ উল্লেখপূর্বক তা রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করবে।

অনেক ইতিবাচক বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নতুন আইনে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- নতুন আইন তৈরির পর প্রায় দু’মাস চলে গেছে। চেয়ারম্যান ছাড়া কমিশনের অন্য দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন। এখনো একজন পূর্ণকালীনসহ অন্য সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়নি। সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে কমিশনের নিজস্ব কার্যবিধি যার ওপরই নির্ভর করবে কমিশনের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা। আমরা আশা করি, সরকারের ভূমিকা শুধু নতুন আইন তৈরিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠনে অন্যান্য উদ্যোগও নেয়া হবে শিগগিরই।

 

সংশোধিত হলো নাগরিকত্ব আইন

মাবরুক মোহাম্মদ

 

সংশোধিত হলো নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১। এর মাধ্যমে ধারা ৫-এ ‘পিতা’ শব্দটির সাথে ‘মাতা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। ফলে নবজাতকের পিতা বা মাতা যে কোনো একজন বাংলাদেশি হলে নবজাতক জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হবে।

সংশোধনের পর নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১-এর ৫ ধারার ভাষ্য হচ্ছে- এই আইন প্রণয়নের পর, পিতা বা মাতা বা কোনো একজন বাংলাদেশের নাগরিক হলেই জন্মগ্রহণকৃত শিশু বাংলাদেশের নাগরিক বলে বিবেচিত হবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত ব্যক্তির পিতা বা মাতা যদি উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশি হয়, তবে উক্ত ব্যক্তি কেবল এই ধারাবলে বাংলাদেশি হবেন না যদি না-

ক. উক্ত ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে কোনো দেশে জন্মগ্রহণ করেছে এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেটে তার জন্ম নিবন্ধিত হয়েছে বা যে দেশে কোনো বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা মিশন নেই তার নিকটবর্তী কোনো দেশের বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা মিশনে তার জন্ম নিবন্ধিত হয়েছে অথবা খ. জন্মের সময় উক্ত ব্যক্তির পিতা বা মাতা বাংলাদেশ সরকারের চাকরিতে নিয়োজিত ছিল।

ধারাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংশোধনের পূর্বে আইনটি কেবল বাংলাদেশি পুরুষ ও বিদেশি নারীর সন্তানকে নাগরিকত্ব প্রদান করত। কিন্তু কোনো বাংলাদেশি নারী বিদেশি পুরুষকে বিয়ে করলে তাদের সন্তান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করত না। এটি নিঃসন্দেহে একটি বৈষম্যমূলক আইন ছিল। এমনকি নবজাতকের কেবল পিতা সরকারি চাকরি করলেই সন্তান নাগরিকত্ব পেত। বর্তমানে ভিনদেশি পিতা বা মাতার যে কোনো একজন সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকলেই সন্তান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাবে। ধারাটি সংশোধনের জন্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা সময়ে দাবি জানিয়ে আসছিল। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে আইনটি ব্যাপক জটিলতা তৈরি করত। কেবল এই ধারার কারণে অনেক বাংলাদেশি নারী যারা বিদেশি পুরুষকে বিয়ে করেছিলেন, তাদের সন্তান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। অনেকেই নানা রকম হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। তাই দীর্ঘদিন থেকে এটি সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছিল। অবশেষে আইনটি সংশোধিত হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নারীদের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। কারণ পছন্দমতো স্বাধীনভাবে বিয়ে করার অধিকার আমাদের সংবিধানে স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রেও এই অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। নাগরিকত্ব লাভের অধিকারও এই ঘোষণাপত্রে স্বীকৃত। ফলে নবজাতকেরও এই অধিকার নিশ্চিত হলো।

সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকত্ব বিষয়ে অনেক জটিলতার অবসান হয়েছে সন্দেহ নেই কিন্তু সব সমস্যার সমাধান এখনও হয়নি। নাগরিকত্ব বিষয়ে বর্তমানে বেশ কয়েকটি আইন প্রচলিত আছে যেমন সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট, ১৯৫১, বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (প্রভিশনাল) অর্ডার, ১৯৭২ এবং বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (টেম্পরারি প্রভিশন) রুলস, ১৯৭৮। এতগুলো আইনের উপস্থিতি নাগরিকত্ব বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়কালীন ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের জন্য বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (প্রভিশনাল) অর্ডার, ১৯৭২, বিদেশি ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের জন্য সিটিজেনশিপ (টেম্পরারি প্রভিশন) রুলস, ১৯৭৮ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট, ১৯৫১-এর ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে বিষয়টি সাধারণ নাগরিকদের জন্য সহজে বোধগম্য নয়। আবার বিদ্যমান আইনে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যও দৃশ্যমান। যেমন- বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (টেম্পরারি প্রভিশন) রুলস, ১৯৭৮-এর রুল ৪(ক)তে বলা হয়েছে, ভিনদেশি নারী বাংলাদেশি কোনো পুরুষকে বিয়ে করলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ঐ নারীকে বাংলাদেশে একাধারে ২ বছর থাকতে হবে। ৪(খ) তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি নারী ভিনদেশি পুরুষকে বিয়ে করলে তাকে এদেশের নাগিরকত্ব পাওয়ার জন্য একাধারে ৫ বছর থাকতে হবে। এখানে বৈষম্য সুস্পষ্ট। এতে যেসব বাংলাদেশি নারীর স্বামী বিদেশি তারা নানা জটিলতা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে সমতা আনা জরুরি।

নাগরিকত্ব বিষয়ে প্রচলিত তিনটি আইনকে একত্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এর ফলে জটিলতাগুলো দূর করা সম্ভব হবে। সবার কাছে এটি সহজ ও বোধগম্য হবে। বিদ্যমান আইনের বৈষম্যগুলোও এই সুযোগে দূর করা যাবে। নাগরিকত্বের মতো মৌলিক মানবাধিকার সবার জন্যই সহজে নিশ্চিত করা যাবে।

 

ফলোআপ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

এটিএম মোরশেদ আলম


মাসদার হোসেন মামলায় [সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয় বনাম মাসদার হোসেন (১৯৯৯), ৫২ ডিএলআর (এডি) ৮২] সুপ্রিম কোর্টের ১২ দফা নির্দেশনার ভিত্তিতে ১ নভেম্বর ২০০৭ থেকে বিচার বিভাগকে নুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করা হয়। এই ১২ দফা নির্দেশনার মধ্যে মূল কয়েকটি নির্দেশনা ছিল বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সার্ভিস কমিশন ও একটি পৃথক বেতন কমিশন থাকবে এবং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, ছুটি, শৃঙ্খলা রক্ষা, বরখাস্ত ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক বিধি প্রণয়ন করতে হবে। সরকার ১৬ জানুয়ারি ২০০৭ গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত চারটি বিধি প্রণয়ন করে।
১. জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন রুলস্
২. বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন রুলস্
৩. বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস কনস্‌টিটিউশন, কম্পোজিশন, রিক্রুটমেন্ট, সাসপেনশন, ডিসমিসাল অ্যান্ড রিমুভ্যাল) রুলস্
৪. বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (পোস্টিং, প্রমোশন, লিভ, কন্ট্রোল, ডিসিপ্লিন অ্যান্ড আদার সার্ভিস কন্ডিশন) রুলস্ ‌।

এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধিতেও সংশোধনী এনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট আলাদা করা হয়। বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়োগসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ বিচার বিভাগের হাতে দেয়া হয়। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়ার জন্য গঠন করা হয় একটি জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন। এই কমিশনের মাধ্যমেই বর্তমানে বিচারকদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মাসদার হোসেন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যেসব নির্দেশনা প্রদান করেছিল তার প্রায় সবগুলোই (অন্তত কাগজে-কলমে) বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে কি বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়েছে? আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীন হওয়ার প্রায় দুই বছর পর বর্তমান সরকারের কিছু কার্যক্রমের ফলে এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে চলে আসছে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনাগুলো ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এসব নির্দেশনার সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করছে মানসিকতার ওপর। আইন প্রণয়ন করে মানসিকতা পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাবে না যা আমাদের আবার উল্টো দিকে নিয়ে যায়। সরকারের কিছু পদক্ষেপে এরূপ উল্টাপথে যাত্রা করার প্রমাণও মেলে। বর্তমান আলোচনায় এর কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারা সংশোধন
ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন ২০০৯-এর মাধ্যমে এই আইনের ১৯০ ধারাকে সংশোধন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, আইন-শৃঙ্খলা সুষ্ঠুভাবে রক্ষার স্বার্থেই এরূপ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এর মাধ্যমে সরকার বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা হলো একটি বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা। কোনো ব্যক্তি আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তাকে তল্লাশি করা, গ্রেফতার করা এবং আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হলো নির্বাহী ক্ষমতার অংশ। কিন্তু অপরাধটি বিচারের জন্য আমলে নেয়া হবে কিনা তা পুরোপুরি বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা।

ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশ ২০০৯
এই অধ্যাদেশের অধীনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তাৎক্ষণিক সংঘটিত কোনো অপরাধ আমলে নিয়ে অর্থদণ্ড প্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের। বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সংসদের মাধ্যমে আইনটি প্রণয়ন না করে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতাকে ব্যবহার করে জারি করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশ ২০০৯। এই আইন প্রণয়নের পেছনে সরকারের যুক্তি হলো, ভ্রাম্যমাণ আদালত না থাকায় স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ন্যূনতম কোনো কর্তৃত্ব নেই। মন্ত্রীদের রাষ্ট্রাচার বা প্রটোকল রক্ষাও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তৎক্ষণাৎ কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে রাষ্ট্রাচার নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন না। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ তাদের নিজ অধিক্ষেত্রে সংঘটিত কোনো অপরাধ আমলে নিয়ে তাৎক্ষণাৎ অর্থদণ্ড প্রদান করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন বিষয়টি অর্থদণ্ড প্রদানের চেয়েও গুরুতর তাহলে তিনি মামলা দায়েরের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, দণ্ড প্রদান হলো একটি বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা। আর বিচার বিভাগ পৃথককরণের চেতনা হলো দণ্ড প্রদানের ক্ষমতা থাকবে বিচার বিভাগের হাতে। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশে এই ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করে আলাদা দুই ধরনের ম্যাজিস্ট্রেট তৈরি করা হলো সেই উদ্দেশ্য থেকে আমরা এখানেও উল্টা দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

দুই বিচারককে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর প্রদান
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল গফুর এবং ঐ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ড. মোঃ শাহজাহানকে সরকার বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে পাঠায়। ২৮ জুলাই এই দুই বিচারকের নেতৃত্বে কিছু বিচারক সচিবালয়ে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করলে সরকার তাদের শাস্তিমূলকভাবে অবসর প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস কনস্‌টিটিউসন, কম্পোজিশন, রিক্রুটমেন্ট, সাসপেনশন, ডিসমিসাল অ্যান্ড রিমুভ্যাল) রুলস্‌-এর বিধি ৬ অনুসারে জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত বা অপসারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত। কিন্তু উল্লিখিত ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সাথে কোনো রকম পরামর্শ ছাড়াই দুই বিচারকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করেছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগ লাভে বিচারকদের আগ্রহ
আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ পৃথক করতে হলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। সুপ্রিম কোর্টের ১২ দফা নির্দেশনাতেও বিষয়টিকে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর কোনো বিচারক আর নির্বাহী বিভাগের কোনো পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের বিধিতেও বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ের চিত্র ভিন্ন কথা বলে। সামপ্রতিক সময়ে জেলা জজ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে যেসব বিচারক প্রেষণে আইন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন তাদের এখনো বিচারক পদে ফেরত পাঠানো হয়নি। তাছাড়া স্বয়ং বিচারকেরাই আইন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে আরো বেশি পরিমাণে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আন্দোলনে লিপ্ত হয়েছেন। এগুলো সবই বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে। এজন্য নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ উভয়েরই মানসকিতা পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ
বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর অধস্তন আদালতগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার সমস্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যদি স্বাধীন না হয়, তাহলে বিচার বিভাগের এই স্বাধীনতা আদৌ কোনো ফল বয়ে আনবে কিনা ভেবে দেখা দরকার। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে এরূপ নিয়োগ দেয়ার নিয়ম থাকলেও তা পালন করা হয় না বলে বিস্তর অভিযোগ শোনা যায়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ দেয়ার বিষয়টিকে নিয়মতান্ত্রিক করার জন্য জারি করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন অধ্যাদেশ ২০০৮। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করার জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে নয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিশন গঠন করা হয়। প্রতিটি শূন্য পদের জন্য আইন মন্ত্রণালয় পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করবে এবং এর মধ্য থেকে দুটি নাম কমিশন সুপারিশ করবে। কমিশন অবশ্য আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত নামগুলোর বাইরে অন্য নামও বিবেচনায় আনতে পারবে। রাষ্ট্রপতি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ দেবেন।

অধ্যাদেশটি জারি হওয়ার সাথে সাথে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। কারণ এটা নির্বাহী বিভাগকে বিচার বিভাগের ওপর প্রাধান্য দিয়ে, বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়কে প্রাথমিক সুপারিশ তৈরির ক্ষমতা প্রদান করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল চেতনাকেই খর্ব করেছে। তাছাড়া নতুন আইনে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়নি। আবার ইচ্ছা করলে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুুডিশিয়াল কমিশনের সুপারিশ পাশও কাটাতে পারবেন।

যা হোক, নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর অধ্যাদেশটি অনুমোদন দেয়া হয়নি। ফলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এখন আগের প্রক্রিয়াতেই চলবে। বিগত কয়েক বছরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে দলীয়করণের যে অভিযোগ উঠেছে বর্তমান সরকার তা থেকে কতখানি মুক্ত থাকতে পারে তার ওপরই নির্ভর করছে সুপ্রিম কোর্টকে দলীয়মুক্তকরণ।

শেষ কথা
বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হওয়ার প্রায় দুই বছর হতে চলেছে। এর মধ্যে আমরা কিছু কিছু সুফলও পেতে শুরু করেছি। যেমন- পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় মামলাগুলো এখন দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বিধি প্রণয়ন করা হলেও এখন পর্যন্ত জুডিশিয়াল পে-কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা হয়নি, জুডিশিয়াল পে-কমিশন সচিবালয় গঠন করা হয়নি, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। এগুলো না হওয়া পর্যন্ত বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। তাছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, যেমন- বিচারকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিয়মিত মনিটরিং ও মূল্যায়ন করা, সর্বোপরি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলেই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিচার বিভাগ পাবো। জনগণ তখন বিচার বিভাগের ওপর আস্থা পুনর্স্থাপন করবে। দেশে সত্যিকারের আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।

 

ধারা ৩৭৭: নয়াদিল্লি হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

বাসবী বড়ুয়া ও মাবরুক মোহাম্মদ

 

গত ২ জুলাই ২০০৯ ভারতের নয়াদিল্লি হাইকোর্ট এক রায়ে উল্লেখ করেন, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্মতিতে সমকামিতা সে দেশে বৈধ। সমকামীদের অধিকার নিয়ে কর্মরত প্রতিষ্ঠান নাজ ফাউন্ডেশনের দায়ের করা এক রিট পিটিশনে হাইকোর্ট এই আদেশ দেন। নাজ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ছিল ভয়েজেস এগেইনস্ট ৩৭৭ গ্রুপের আরও ৭-৮টি সংস্থা। উপমহাদেশের অভিন্ন দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৭৭ ধারায় সমকামিতাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রিট আবেদনকারী মূলত এই ধারার যথাযথ ব্যাখ্যা চেয়ে কোর্টে আবেদন করে। আবেদনকারীর পক্ষ থেকে বলা হয়, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৭৭ ধারার অধীনে অপরাধ সংঘটনের জন্য সমকামিতায় অংশগ্রহণকারী যে কোনো একজনের অসম্মতি থাকতে হবে। কিন্তু যে ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের পূর্ণ সম্মতি থাকবে, সে ক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য হওয়া ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী। ২০০৪ সালে দায়ের করা রিটটির শুনানি শেষে হাইকোর্ট আবেদনকারীর পক্ষে রায় দেন।

দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে, “যে কেউ স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সাথে প্রকৃতি বিরুদ্ধ উপায়ে যৌনাচারে লিপ্ত হয়, সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনা শ্রমে কারাদণ্ড এবং অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।” অর্থাৎ এই আইন অনুযায়ী এমনকি বিসমকামী নারী-পুরুষের যৌন মিলন ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ হলে, তারাও শাস্তির আওতায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নয়াদিল্লি হাইকোর্টের উক্ত রায়ের মাধ্যমে এখন তারাও অবমুক্ত হলেন।

১৮৬০ সালের এই আইন পরবর্তীকালে ‘The Criminal Tribes Act of 1871’ প্রণয়নে ভূমিকা রাখে। এর মধ্য দিয়ে যাযাবরবৃত্তির মানুষেরা যেমন: সার্কাস দলের শারীরিক কসরতে পারঙ্গম ব্যক্তি, গায়ক, হস্তরেখাবিদ ধরনের পেশাজীবীদের স্থির, শান্ত, ভারতীয় সভ্যতার অস্থিতিশীল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী এক সংশোধিত আইনে হিজড়া সমপ্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৮৯৭ সালের সংশোধিত বিধিতে যার নাম 'Act for the Registration of Criminal Tribes and Eunuch’, স্থানীয় সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয় সেসব সন্দেহভাজন হিজড়া ব্যক্তির নাম লিপিবদ্ধ করে রাখতে যারা বাচ্চা চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। পরবর্তীকালে বিলুপ্ত হওয়া এই আইনটি হিজড়া জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের নিষ্পেষণমূলক নজরদারির মধ্যে রাখাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশে ধারা ৩৭৭ একটি ‘আমলযোগ্য’ অপরাধ এবং দায়ী ব্যক্তি এক্ষেত্রে জামিনের আবেদন করতে পারেন না। এ পর্যন্ত এই আইনে মাত্র একটি মামলার সন্ধান পাওয়া গেছে বাংলাদেশে। প্রকৃতপক্ষে এই আইনের ব্যবহার উপমহাদেশেই খুব একটা দেখা যায় না। এ বিষয়টির অজুহাত তুলে রায়ের বিরোধীরা যুক্তি দেখান যেটির কোনো প্রয়োগ নেই, সেটিকে নিয়ে কেন এতো হইচই। এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ৩৭৭ বিরোধী পক্ষের আইনজীবী শ্যাম দিভান বলেন, ‘যৌনতা একজন ব্যক্তির জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয়। একজন বিসমকামী (heterosexual) ব্যক্তির জন্য যৌনসঙ্গীর বিষয় গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। কিন্তু একজন সমপ্রেমী ব্যক্তির কাছে এটি তার ব্যক্তিসত্তার সবচেয়ে মুখ্য অংশ।’ কারণ সমাজের চোখে এই সম্পর্ক অগ্রহণযোগ্য। সুতরাং নৈতিকতার অথবা ধর্মীয় বিধিনিষেধের ঝাণ্ডা তুলে যারা এর বিরোধিতায় নেমে পড়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে শ্যাম দিভান বলেন, ‘এমন একটি বিষয়কে পশ্চাৎমুখী, নৈতিকতার চশমা দিয়ে পাঠ করা মানে একজন ব্যক্তির ঘুম থেকে উঠা থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত তার জীবনের সমস্ত অংশকে প্রভাবিত করা, সেই বিষয়কে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা।’ তিনি উক্ত বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি রায়ের কথা উল্লেখ করেন (Lawrence vs Texas), যেখানে বিচারক বলছেন, ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মূল বিষয় হলো, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক পালনের এবং তা শ্রীবৃদ্ধির অধিকার।’ আইনজীবী দিভান সমকামিতা বিষয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের আইন, সামপ্রতিক রায় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সংজ্ঞার ধারণায় সামপ্রতিক সংযোজন Yogakarta নীতিমালার ওপর আলোকপাত করেন। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার Yogakarta নামক স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিষয়ক এক সম্মেলনে বিকল্প যৌনসত্তার জনগোষ্ঠীর অধিকারগুলোর আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনামূলক প্রস্তাবনা এটি। এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন জাতিসংঘের প্রাক্তন মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের আরও ২৮ জন শিক্ষাবিদ, মানবাধিকার সংগঠক এবং তাত্ত্বিকবৃন্দ। সামপ্রতিক রায়ের মধ্যে আইনজীবী দিভান দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক আদালত, ফিজি ও হংকংয়ের হাইকোর্ট, ইউরোপিয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটস, নেপালের সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কমিটির দেয়া কিছু যুগান্তকারী নির্দেশনার উল্লেখ করেন।

প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে দেয়া নেপালের সুপ্রিম কোর্টের দেয়া রায় সমকামীদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনকে বহুদূর নিয়ে গেছে। পরবর্তীকালে নির্বাচিত সরকারের আমলে একটি ক্ষুদ্‌্র কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় এই আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ নেপালের ব্লু ডায়মন্ড সোসাইটির প্রধান ব্যক্তিকে। তিনি নির্বাচনে না জিতলেও দলটি পায় পাঁচটি আসন। নির্বাচনী ইশতেহারে প্রায় সব দলই এলজিবিটি (লেসবিয়ান-গে-বাইসেক্সুয়াল-ট্রান্সজেন্ডার) গোষ্ঠীর অধিকার অন্তর্ভুক্ত করেন।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখের দাবি রাখে, যেটা এই মামলায়ও উঠে এসেছে, তা হলো- সমকামীদের ওপর এ যাবৎ যারা কাজ করেছেন তারা মূলত এইচআইভি, এইডস্‌ প্রতিরোধের অংশ এই জনগোষ্ঠীকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে অগ্রসর হয়েছেন। কিন্তু যৌনতার প্রশ্নগুলোকে অস্পষ্ট রেখে শুধু কিছু মানুষকে ‘ভিন্ন’ বলে আখ্যা দেয়ার মাধ্যমে তাদের মানবাধিকার যে লঙ্ঘিত হচ্ছে, সে বিষয়ে ইদানীং কথাবার্তা শুরু হয়েছে এবং এটা সম্ভব হয়েছে এলজিবিটি জনগোষ্ঠীর এবং সমাজের কিছু সচেতন, সংবেদনশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিরলস কর্মকাণ্ডে।

দিল্লির হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে অনেক প্রচারণাও শুরু হয়েছে যেটা অনেক ক্ষেত্রে সমকামী ও বিসমকামী এই দুই গোত্রের বচসা হিসেবে পর্যবসিত হচ্ছে। কিন্তু এলজিবিটি ব্যক্তি ও সংগঠকরা বলে আসছেন এই বিতর্ককে প্রসারিত করতে হবে যৌনতার সংজ্ঞার বিসতৃতির মাধ্যমে। যৌনতা অর্থাৎ যৌন পরিচয় আদৌ কি একটি স্থির, অনড় বিষয়, নাকি এর চরিত্র গতিশীল, কোনো দ্বিকোটিক (Binary) বিভাজনে যাকে বাধা ভুল ধারণামাত্র।

বলাবাহুল্য, এই রায়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয় ৭ জুলাই। ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত শুনানিতে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্ট। পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ১৪ সেপ্টেম্বর। উল্লেখ্য, ভারতের প্রতিটি রাজ্যে একটি করে হাইকোর্ট আছে। এক রাজ্যের হাইকোর্ট প্রদত্ত রায় কেবল সেই রাজ্যে বাধ্যতামূলক, অন্য রাজ্যগুলোতে নয়। সমগ্র দেশে এই রায়ের কার্যকারিতার জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রয়োজন। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকার এ রায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং অন্যান্য বিরোধী শিবিরের তোপের মুখে আইনের নানা দিক খতিয়ে দেখার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।


নাগরিকের চিকিৎসার অধিকার
বনাম
ইন্টার্নি ডাক্তার ধর্মঘট

অবন্তী নুরুল

 

বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী নাগরিকের চিকিৎসাপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দয়িত্ব। যদিও বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন রোগীর যে সুচিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে সে ধারণাটি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখানে মানুষের সুচিকিৎসার বিষয়টি অনেকাংশে চিকিৎসকের বদান্যতা, মেজাজ-মর্জি কিংবা দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে। এর সাথে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার অভাব যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। চিকিৎসা অবহেলা ও অনিয়ম নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে আসছে এবং বিভিন্ন সময় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসক নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন সময় ঘটনার তদন্ত করেছে, চিকিৎসা সেবা প্রদানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়েরসহ অন্যান্য মামলা দায়ের করেছে, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সিভিল সার্জনকে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে আসছে। এ ছাড়াও চিকিৎসা অবহেলা ও অনিয়মের ওপর আসকের রয়েছে দুটি বিশেষ প্রকাশনা।

বেশ কিছুদিন ধরেই আসক লক্ষ্য করছে যে, বিভিন্ন হাসপাতালে ইন্টার্নি ডাক্তাররা নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ে অথবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মঘটের ডাক দিয়ে রোগীদের সবধরনের চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে প্রতিবারই বেশ কিছু রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছে শত শত সাধারণ রোগী। কিন্তু এতো কিছুর পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা বাংলাদেশ ডেন্টাল ও মেডিকেল কাউন্সিল (বিএমডিসি) হাত-পা গুটিয়ে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো বসে রয়েছে। যেন ডাক্তারদের ধর্মঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামের সহকারী পরিচালক ডা. জিনাত সুলতানা ২০০৮ সালে আসককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘অনেক সময় দাবি আদায়ের জন্য ধর্মঘটের বিকল্প থাকে না। কিন্তু অনেক পেশাই আছে যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় মানবিকতাই বড়। ডাক্তারি পেশাও তেমন একটি মানবিক পেশা। রোগী এলে একজন ডাক্তার কখনোই বলতে পারেন না যে, উনি সেবা দেবেন না।’

কোড অব মেডিকেল এথিকস অনুযায়ী মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার, রোগীর স্বাস্থ্যকেই প্রথম বিবেচনায় রাখার, মর্যাদা ও বিবেকের সাথে কাজ করার যে প্রতিজ্ঞা করেন, ইন্টার্নি ডাক্তাররা ডাক্তার হয়ে ওঠার শুরুতেই তা বেমালুম ভুলে গিয়ে ধর্মঘট নামের প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে মোটেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না। কুণ্ঠাবোধ করছেন না চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়ে মানুষের জীবনের সমাপ্তি টেনে দিতে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা বিএমডিসি এরকম ঘটনায় জড়িত দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণে আশ্চর্যজনকভাবে বিরত থাকছে। গত ২৩ মার্চ ২০০৯ তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত হয় ‘১২ রোগীর মৃত্যু- ঢামেক হাসপাতালে ইন্টার্নি ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে তুলকালাম’ শীর্ষক একটি সংবাদ। জানা যায়, মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত যুবক শাহ ইমরানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হলে সেসময় ডিউটিরত ইন্টার্নি ডাক্তার তানিয়া জনৈক মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের সাথে গল্প করতে থাকেন এবং নিজে না এসে ওয়ার্ডবয়কে দিয়ে অক্সিজেন সাপোর্ট ও এনেসথেসিয়া ছাড়াই ইমরানের মাথায় ড্রেসিং করান। ওয়ার্ডবয় ড্রেসিং করানোর পরপরই ইমরান মারা যায়। এতে ডা. তানিয়ার সাথে মৃতের আত্মীয়দের বিরোধের সৃষ্টি হলে ঢামেক হাসপাতালের ইন্টার্নি ডাক্তাররা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করে সব ধরনের চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। নতুন রোগী ভর্তিও বন্ধ রাখা হয়। এভাবে দশ ঘণ্টা ধর্মঘট চললে বিনা চিকিৎসায় ১২ জন রোগী মারা যান। আর শত শত রোগী হাসপাতাল ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। তার ঠিক অল্প কিছুদিন পর অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় ‘ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের ধর্মঘট চলছেই, রোগীরা চলে যাচ্ছেন’ শীর্ষক আরেকটি সংবাদ। জানা যায়, হাফিজুর নামের জনৈক রোগীকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করাকে কেন্দ্র করে রোগীর আত্মীয়দের সাথে ‘ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্নি ডাক্তারদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে তারা হাসপাতালে ধর্মঘটের ডাক দেয়। চিকিৎসা না পেয়ে রোগীরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। আর ইন্টার্নি ডাক্তাররা ঐ রাতে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে হাফিজুরের আত্মীয়দের মারধর করেন। এই ঘটনা দুটি জানার পর আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) কোড অব মেডিকেল এথিকস ভঙ্গ করে ধর্মঘটের নামে রোগীদের জরুরি চিকিৎসা বন্ধ রাখার ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ২৪ মার্চ ২০০৯ ও ২৮ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে বিএমডিসির চেয়ারম্যান বরাবরে দুটি চিঠি পাঠায়। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই গৃহীত হয়নি। অথচ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯৮০-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী বিএমডিসি তদন্তসাপেক্ষে ইনফেমাস কন্ডাক্ট বা অসদাচরণের যে কোনো চিকিৎসকের নিবন্ধন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অথবা চিরতরে বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।

কোড অব মেডিকেল ইথিকস অনুযায়ী যদি কোনো মেডিকেল বা ডেন্টাল প্র্যাকটিশনার এমন কোনো কাজ করেন যা তার পেশাগত সুনাম আর দক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করে তাহলে তাকে Infamous Conduct বা অসদাচরণের দায়ে দোষী করা যাবে। এক্ষেত্রে প্রাপ্ত আপত সাক্ষ্য-প্রমাণ ইন্টার্নি ডাক্তারদের পেশাগত অসদাচরণের নির্দেশ করলেও তার বিরুদ্ধে বিএমডিসির পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যর্থতা বা অনীহা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা কোনো অজুহাতে ধর্মঘটের নামে চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়ে ডাক্তাররা একদিকে যেমন মানুষের বাঁচার অধিকার ও চিকিৎসাপ্রাপ্তির অধিকারকে ক্ষুন্ন করতে পারেন না তেমনি এরূপ নীতিগর্হিত কাজের সাথে জড়িতদের শাস্তি প্রদান ও পরবর্তীকালে এরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে বিএমডিসিও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। এটা একদিকে যেমন নাগরিকের চিকিৎসা প্রাপ্তির অধিকারের লঙ্ঘন, অন্যদিকে তা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯৮০-এরও লঙ্ঘন।

এ বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে আসক লক্ষ্য করেছে শুধু এ দুটি বিষয় নয় বিগত বছরগুলোতেও এধরনের ঘটনা ঘটেছে। যেমন ২০০৮-এ পত্রিকায় প্রকাশ ‘ওসমানী হাসপাতালে ইন্টার্নি ধর্মঘট: চিকিৎসা না পেয়ে ২৩ রোগীর মৃত্যু, ফিরে গেছে সাড়ে ৫শ’। ২০০৭-এ পত্রিকায় প্রকাশ- ‘রাজশাহী মেডিকেলে তুলকালাম, বিনা চিকিৎসায় ৫ জনের মৃত্যু’। একই বছর পত্রিকায় প্রকাশ- ‘বিনা চিকিৎসায় ৭ জনের মৃত্যু, রংপুর মেডিকেলে ইন্টার্নি ধর্মঘট চলছে।’ এসব ঘটনার কোনোটিতে বিএমডিসি তো কোনো আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেইনি, উপরন্তু ক্ষমতা থাকার পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অফিস নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের যে কোনো হাসপাতাল যে কোনো ক্লিনিকের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করতে পারেন এবং যে কোনো হাসপাতাল, ডাক্তার, ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই না করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শুধু দায়িত্ব পালনেই ব্যর্থ হয়নি বরং ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধেও ব্যর্থ হয়ে বারবার এসব ঘটনা সৃষ্টির সুযোগ দিয়েছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নি ধর্মঘটের বিষয়ে পাঠানো চিঠির প্রেক্ষিতে কোনো পদক্ষেপ গৃহীত না হলে আইন ও সালিশ কেন্দ্র ২৭ মে ২০০৯ তারিখে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মহাপরিচালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, চেয়ারম্যান বিএমডিসি, চেয়ারম্যান বিএমডিসির শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি, পরিচালক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরিচালক ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বরাবর ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের ঘটনায় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য লিগ্যাল নোটিশ পাঠায়। তবে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র মনে করে, নাগরিকের চিকিৎসাপ্রাপ্তির অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা প্রয়োজন। সেই সাথে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার ও জীবনের অধিকারও নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। আর এর জন্য প্রয়োজন ডাক্তারদের পেশাগত দায়িত্ব, জবাবদিহিতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা। নাগরিকের স্বার্থে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এসব বিষয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মামলা দায়ের করার যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

তথ্যসূত্র
১. চিকিৎসায় অবহেলা, আসক, ডিসেম্বর ২০০৮।

 

নিরাপদ রাখুন আপনার সঞ্চয়

মাবরুক মোহাম্মদ

 

সাধারণভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান জনসাধারণের কাছে থেকে আমানত হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করে এবং অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সুদের বিনিময়ে তা ঋণ হিসেবে প্রদান করে তাকে ব্যাংক বলে। আরও নানা ধরনের কাজ করলেও এই আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদানকেই একটি ব্যাংকের সাধারণ ব্যাংকিং কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো গঠিত ও পরিচালিত হয় ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১, কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এবং সময়ে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত বিধি দ্বারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন এই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দেখাশোনা করা। দেশে ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি প্রয়োজন। আমাদের দেশে অনুমোদিত ব্যাংক ছাড়াও এমন অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করছে। তারা অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর চেয়ে অধিক হার সুদে আমানত সংগ্রহ করে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৩১(১) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রদত্ত লাইসেন্স ব্যতীত বাংলাদেশে কোনো ব্যাংক ব্যবসা করতে পারবে না। সুতরাং অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অবৈধ। লাইসেন্সবিহীন এসব প্রতিষ্ঠানের দখলে বা জিম্মায় থাকা কোনো তথ্য, দলিল বা নথিপত্র দাখিল বা আটক করার আদেশ ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৫১ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক দিতে পারে। লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করছে মর্মে বাংলাদেশ ব্যাংক দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ৫৩ ধারার অধীনে ওই প্রতিষ্ঠানের সব লেনদেন বন্ধ ঘোষণা করতে পারে।

লাইসেন্সবিহীন এসব প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- এদের জবাবদিহিতা, তদারক ও নিয়ন্ত্রকের অনুপস্থিতি। যথাযথভাবে নিবন্ধিত ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৩৬ ধারা অনুসারে ব্যাংকগুলোর ষান্মাসিক বিবরণী বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হয়। ৩৯ ধারা অনুসারে তাদের হিসাব ও ব্যালেন্সশিট চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট দ্বারা নিরীক্ষিত হতে হয়। এমনকি নিরীক্ষার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে ব্যর্থ বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পেলে উক্ত চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টকে বাংলাদেশ ব্যাংক ৩৯খ ধারার অধীনে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারে।

ধারা ৪০ অনুসারে ব্যাংকগুলোর হিসাব বিবরণী, ব্যালেন্সশিট ও প্রতিবেদন যে সময়ের জন্য প্রস্তুত তা শেষ হওয়ার ৩ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করতে হয়। এছাড়াও ধারা ৪৪ অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংক তার কোনো কর্মকর্তার মাধ্যমে কোনো ব্যাংক কোম্পানির খাতাপত্র ও হিসাব পরিদর্শন করতে পারে। এতে কোনো অনিয়ম ও অসঙ্গতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে। অনিয়মের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংককে ‘প্রবলেম ব্যাংক’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে এবং ঐ ব্যাংকে নিজস্ব কোনো কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে। এসব আইনি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো আমানতকারীদের সঞ্চিত অর্থ নিরাপদ রাখা। ব্যাংক ব্যবসা একটি সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর ব্যবসা। কারণ এতে সাধারণত জনগণের সঞ্চিত অর্থ নিয়ে ব্যবসা করা হয়। তাদের সেই অর্থ যেন নিরাপদ থাকে, এই অর্থ নিয়ে যেন কোনো রকম জালিয়াতি না হয় সে জন্যই এই আইনি ব্যবস্থা। কিন্তু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এসব রক্ষাকবচ অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নেই। অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন কিছুই করার থাকে না। ক্ষেত্র অনুযায়ী এদের বিরুদ্ধে কেবল দন্ডবিধির অধীনে মামলা করা যায় কিন্তু আমানতকারীরা এ ব্যবস্থায় তাদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পান না।

অবৈধ ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ আমানতকারীরা। প্রায়ই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমানত-কারীদের অর্থ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উধাও হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব প্রতিষ্ঠান অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে থেকে আমানত সংগ্রহ করে। সাধারণ মানুষ সরল বিশ্বাসে তাদের কাছে আমানত রাখে। কিন্তু নিবন্ধিত ব্যাংকের ক্ষেত্রে উল্লিখিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এসব অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে থাকে না বলে সহজেই তারা আমানত-কারীদের অর্থ আত্মসাৎ করতে পারে। ফলে অনেকেই হারাচ্ছে তার জীবনের কষ্টার্জিত সর্বস্ব সঞ্চয়। অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে তারা ব্যক্তি সঞ্চয় হাতিয়ে নিয়ে প্রতারিত করছে সাধারণ মানুষকে। তাই অধিক মুনাফার লোভের ফাঁদে পা দেবেন না। মুনাফা কম হোক তবু নিরাপদ থাকুক আপনার সঞ্চয়।

 

পারিবারিক নির্যাতন (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন- পাকিস্তান

এটিএম মোরশেদ আলম

 

৪ আগস্ট ২০০৯ পাকিস্তানের দুই স্ত রবিশিষ্ট জাতীয় সংসদের প্রথমস্তর ন্যাশনাল এসেম্বলি পারিবারিক নির্যাতন (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিল নামে একটি আইন অনুমোদন করেছে। এখন সিনেটে পাস হলেই বিলটি আইনে রূপ নেবে। গত বছরের আগস্ট মাসে বিলটি নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রেরণ করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে বিলটি ন্যাশনাল এসেম্বলিতে উপস্থাপন করা হলে তারা বিলটি অনুমোদন করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আইন কমিশন ২০০৬ সালে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে। আমরা এ লেখায় পাকিস্তানের উক্ত বিল এবং আমাদের খসড়া আইনটি পাশাপাশি আলোচনা করবো। এ ধরনের তুলনামূলক আলোচনা বিসতৃতভাবে আসক বুলেটিনেও অতীতে করা হয়েছে (দ্রষ্টব্য ডিসেম্বর ২০০৭, পৃ. ১২)।

পাকিস্তানের এই আইনে পারিবারিক নির্যাতন বলতে নারী, শিশু ও গৃহকর্মীদের বিরুদ্ধে একই পরিবারের সদস্য দ্বারা যে কোনো প্রকার শারীরিক, মানসিক অথবা যৌন নির্যাতনকে বোঝানো হয়েছে। বাংলাদেশের খসড়া আইনের সাথে এই আইনের সংজ্ঞার কিছু পার্থক্য আছে। যেমন- বাংলাদেশের আইনে পারিবারিক নির্যাতন বলতে পরিবারের যে কোনো সদস্য দ্বারা অন্য যে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতনকে বোঝানো হয়েছে অর্থাৎ এখানে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ করা হয়নি। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হলে বাংলাদেশের আইনে একজন পুরুষও প্রতিকার পেতে পারে কিন্তু পাকিস্তানের আইনে শুধু নারী, শিশু ও গৃহকর্মীরা প্রতিকার পাবে। তাছাড়া বাংলাদেশের আইনে প্রতিকার পেতে হলে নির্যাতনকারী ও ভিকটিমকে একই ছাদের নিচে বাস করতে হবে। দু’জন যদি একই ছাদের নিচে বাস না করে তাহলে বাংলাদেশের আইন অনুসারে তা পারিবারিক নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু পাকিস্তানের আইনে একই ছাদের নিচে বাস করার কোনো শর্ত আরোপ করা হয়নি।

সংজ্ঞার ক্ষেত্রে দুই দেশের আইনের মধ্যে কিছু মিলও আছে; যেমন, কোনো আইনেই অর্থনৈতিক নির্যাতনকে অন্তর্র্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ বিশেষ করে, নারীদের ক্ষেত্রে অর্থসংক্রান্ত নানামুখী নির্যাতন বর্তমানে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠন ও সচেতন নাগরিক মহল অবশ্য এই নির্যাতনকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের আরেকটা দাবি হলো, পারিবারিক নির্যাতনের সংজ্ঞা থেকে একই ছাদের নিচে বাস করার শর্ত তুলে দেয়া এবং গৃহকর্মীদের এই আইনের আওতা থেকে বাদ দেয়। এর পেছনে তাদের যুক্তি হলো, পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় একই ছাদের নিচে বাস না করেও নির্যাতন করতে পারে এবং এরকম ঘটনা বাংলাদেশে হরহামেশাই ঘটছে। আবার বাংলাদেশের শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের জন্য প্রতিকারের বিধান আছে। সুতরাং তাদের পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের আওতাভুক্ত করা হলে আমরা হয়তো এই আইনের আসল উদ্দেশ্য থেকেই সরে যাবো।

পাকিস্তানের পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে পারিবারিক সম্পর্ক বলতে রক্তের সম্পর্ক, দত্তক, যৌথ পরিবার এবং নিয়োগকারী ও গৃহকর্মীর মধ্যে সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে। বাংলাদেশের আইনেও প্রায় একইরূপ কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো দেশের আইনেই বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে নারী-পুরুষ একত্রে বসবাস করলে তাদের সম্পর্ককে আওতাভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ এ দু’দেশের আইনে এরূপ সম্পর্কের অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়নি। কিন্তু এরকম সম্পর্ক যে সমাজে বর্তমান আছে এবং এক্ষেত্রে নারীরা যে নির্যাতন এবং প্রতারণার শিকারও হচ্ছে তা পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে।

পাকিস্তানের আইনে পারিবারিক নির্যাতন বলতে যেসব আচরণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মারধর করা, সম্পত্তির অপব্যবহার করা, যৌন নির্যাতন করা ইত্যাদি। যদি এসব আচরণ ভিকটিমের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে স্থায়ী ও গুরুতর ক্ষতির সৃষ্টি করে, তাহলে পারিবারিক নির্যাতন আইনের পাশাপাশি ফৌজদারি আইনেও এ ব্যাপারে মামলা করা যাবে। অর্থাৎ একই আচরণ পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ আইন ও পাকিস্তানের দণ্ডবিধির অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে পারিবারিক নির্যাতন আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের খসড়া আইনে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি। অর্থাৎ কোনো কাজ যদি দুই বা ততোধিক আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয় সেক্ষেত্রে কী হবে- তা বাংলাদেশের আইনে স্পষ্ট করা হয়নি।

যা হোক, পাকিস্তান হলো একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র, সেখানে প্রায় একযুগ ধরে সামরিক শাসন জারি থাকার পর ২০০৮ সালে সংসদ কার্যকর হয়েছে। অন্যদিকে সেখানে যুদ্ধ, সংঘাত ও হানাহানি লেগেই আছে। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও তারা পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে একটি বিশেষ আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তাকে ভুলে যায়নি। তারা এরকম একটি আইন প্রণয়নে প্রথম ধাপকেও অতিক্রম করেছে। এজন্য অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। কিন্তু প্রায় একই সময়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ এখনো আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই থমকে আছে। আইন প্রণয়নে সরকারের সদিচ্ছা না থাকাটাই এর জন্য প্রধানত দায়ী। তবে আইনের কিছু বিধান নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিক সমাজের মধ্যে যে মতবিরোধ তা সরকারের বিলম্বের পেছনে একটি অজুহাত হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই আমাদের উচিত অতিসত্বর সবাই একমত হয়ে সরকারকে আইনটি প্রণয়নে সম্মিলিত চাপ প্রয়োগ করা।