সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   মুক্তিযুদ্ধ
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   আন্তর্জাতিক
   তথ্যানুসন্ধান

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

মুক্তিযুদ্ধ

নীলিমা ইব্রাহিমের সাক্ষাৎকার
’৭১ -এর মুক্তিযুদ্ধ ও নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র

সুরাইয়া বেগম

 

আসক পরিচালিত ‘মুক্তিযুদ্ধের কথ্য ইতিহাস প্রকল্প’-এর (১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত) অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সে সময়কার নারীর অভিজ্ঞতার বয়ান লিপিবদ্ধ করা এবং প্রাপ্ত তথ্যগুলোকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে হাজির করা। তা থেকে ২০০১-এর অমর একুশে বইমেলায় উনিশ জন ক্ষতিগ্রস্ত নারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘নারীর ’৭১ ও যুদ্ধপরবর্তী কথ্যকাহিনী’ বইটি প্রকাশিত হয়। সে সময় প্রকল্পের গবেষকগণ তথ্য সংগ্রহের জন্য কয়েকজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় কর্মী, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. নীলিমা ইব্রাহিমের সাক্ষাৎকারটি। ১৯৯৭ সালের ৯-১০ জানুয়ারি প্রকল্পের সমন্বয়ক ও গবেষক সুরাইয়া বেগমের গ্রহণ করা সাক্ষাৎকারটি প্রথমবারের মতো আসক বুলেটিনে মুদ্রিত হলো।

সুরাইয়া বেগম: কথা বলছি ড. নীলিমা ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর সেগুনবাগিচার ফ্ল্যাট বাড়িতে। আপা, আমি যতদূর শুনেছি ১৯৭১ সালে আপনারা দেশের ভেতরে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। নওশাবা আপা (নওশাবা শরাফী) বলেছেন যে, সেটা কিছু কাপড়-চোপড় সংগ্রহ করার মাধ্যমে। এ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।
ড. নীলিমা ইব্রাহিম: নওশাবার সাথে আমার সেরকম কোনো কাজের সম্পর্ক ছিল না। আমি তো প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য একেবারেই ইন্টেরিয়রে চলে গিয়েছিলাম। আমি ঢাকা শহরে ছিলাম না। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। আমি স্লিপ পেতাম ‘আমরা শীতে মরে যাচ্ছি। আমাদের পঞ্চাশটা কার্ডিগান পাঠাবেন কালো রঙের।’ তখন সেই কালো রঙের উল খুূুঁজে কিনে যারা বানায় তাদের দিয়ে বানিয়ে তারপর দিতাম ওদেরকে। আর মুক্তিযোদ্ধারা অনেকে খুব ডেয়ারিং ছিল, অনেকে ঢাকায়ও আসত যখন আমি ঢাকায় থাকতাম।
সু. বে: সেই সময় মেয়েদের কোনোরকম রেজিস্ট্যান্স কি ছিল? মানে, আমরা রেজিস্ট্যান্সের বিভিন্ন রূপকে বুঝতে চাচ্ছি।
নী. ই: মেয়েদের রেজিস্ট্যান্স। আমার একটা মেয়ে আর নওশাবার একটা মেয়ে, যে জন্য সম্পর্কটা হলো, ওরা দু’জন আমাদের হয়ে কাজ করতো। দু’জনই সালোয়ার-কামিজ পরতো, দু’জনেই উর্দু আর ইংরেজি বলতো ভালো, যার ফলে ওদেরকে আর্মিরা কখনও বাঙালি বলে সন্দেহ করেনি। কোথাও ম্যাসেজ পাঠাতে হলে বা কোনো কিছু করতে হলে এরা দু’জন সবসময় করেছে। দু’জনেই ওই বয়সে খুব ভালো ড্রাইভ করতে পারত, অসুবিধা ছিল না। আমি, আমার হাজব্যান্ড গ্রামে ছিলাম, মেয়েজামাই চলে গিয়েছিল কলকাতায়, ছোটরা ছিল আমার সঙ্গে। আমরা গ্রামে প্রথম যে কাজটা করি সেটা হচ্ছে একটা রিক্রুটিং সেন্টারের মতো। ওখান থেকে তারা ফ্রন্টে চলে যেত, বর্ডার খুব বেশি দূরে ছিল না। হঠাৎ খবর পেলাম যে, অমুককে মেরে ফেলেছে, তখন তার বাচ্চার জন্য জামা কাপড় পাঠানো- এগুলো সবসময় করতাম। আর আমার যেখানে বড় ভূমিকা ছিল তা হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন তো সবসময় পেছনে লোক লেগেই থাকতো। রাতে মুক্তিযোদ্ধারা আমার এখানে থাকত। একবেলার খাবার সংস্থান রাখতে হতো। এই কার্পেটটার ওপর চাদর বিছিয়ে কুশন মাথায় দিয়ে ঘুমাতো।
সু. বে: আপনি এ বাড়িতে ছিলেন তখন?
নী. ই: না, ইউনিভার্সিটিতে থাকতাম। একদম ইকবাল হলের সঙ্গেই ছিলাম। আমার বাড়ি আর প্রফেসর রফিকুল ইসলামের বাড়িতে ওরা জায়গা পেত, আর তো সবাই ওদের দেখলে ভয় পেত। এর ফলে ওদের সঙ্গে আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ি। টিক্কা খান যে আমাকে লিখিত ওয়ার্নিং দিয়েছিলেন সেটা এখানকার ন্যাশনাল মিউজিয়ামের ডিসপ্লেতে আছে। তখন মাঝে মধ্যে ঢাকায় আসতাম কোনো কাজে, আবার চলে যেতাম। কিন্তু অসুবিধে হতো এই যে, ব্যাংক লেনদেন করতে পারতাম না, যদি ট্রেস আউট করে। এ অবস্থায় একটা সুবিধা হলো, অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে অ্যানাউন্স করলো যে, আমাকে মেরে ফেলেছে। তার ফলে বেশ কিছুদিন আমি নিরাপদে ছিলাম। বোরখা পরেছি যদিও, বোরখা পরে নিরাপদে কাজ করে বেড়িয়েছি। কিন্তু এরপরে কী করে ওরা জানতে পারলো যে আমি মরিনি।
সু. বে: কেউ হয়তো বলে দিয়েছে।
নী. ই: হ্যাঁ। তখন বলার লোকের তো অভাব ছিল না। ডা. ইব্রাহিম একদিন আমার ওখানে এলেন। পাকিস্তান আর্মির একজনের কাছ থেকে ইনফরমেশন নিয়ে এসেছিলেন। এলাহাবাদের লোক, আগে ইব্রাহিমের সঙ্গে আর্মিতে ছিলেন, ব্রিটিশ আর্মিতে। আমি জানি না, জানলে হয়তো তাঁকে যেতে দিতাম না ওখানে। বলল, ‘আমার পুরনো বন্ধু, এলাহাবাদের লোক, ও খুব ভালো।’ তারা ডা. ইব্রাহিমকে বলল, দেখো, উই হ্যাড ফিফটি ওয়ান কোয়ারিজ এবাউট ইয়োর ওয়াইফ ফ্রম ফরেন কান্ট্রিজ। তোমাকে তো জবাব দিতে হবে, জানাতে তো হবে। আমরা জেনেছি শি হ্যাজ সারভাইভড্‌, শি ইজ লিভিং।’ তবে যখন দেশের খুব সিরিয়াস অবস্থা তখন ঐ ভদ্রলোক ডা. ইব্রাহিমকে বললেন, ‘এবার ঢাকায় আসতে বলো, কারণ মরলে সবার সামনে মরা ভালো। অপরিচিত অবস্থায় আর্মি আরও কী ধরনের হ্যারাস করবে, আমরা জানি না। এখানে আমাদের কন্ট্রোল আছে।’ আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে আমি ঢাকায় আসি। তখন তো ইউনিভার্সিটিতে পটাপট দু’চারটি সে বোমাই বল আর পটকাই বল, ফুটছে। ডিপার্টমেন্টে আমি, মুনীর, রফিককে তো নিয়ে গেল আগেই অ্যারেস্ট করে, মুনিরুজ্জামান পালিয়ে গেল; আনোয়ার পাশা আমরা- এক সঙ্গে সারাদিন গল্প করা, আড্ডা মারা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
সু. বে: আপনি যখন ঢাকার বাইরে ছিলেন যে সময়ে দেশের ভেতরে মেয়েদের কোনোরকম রেজিস্ট্যান্স আপনি দেখেছিলেন কিনা?
নী. ই: আমি যে স্যাক্রিফাইস মেয়েদের করতে দেখেছি রেজিস্ট্যান্সের জন্য, কল্পনাতীত। পথ দিয়ে যারাই গেছে ভারতে তাদের ডেকে ডেকে খাইয়েছে, অসুস্থ ইপিআর সৈন্যরা এখানে-ওখানে পড়ে আছে, তাদের সেবাযত্ন করেছে। কাপড় পরিয়ে দিয়েছে, যাতে আইডেন্টিফাই করা না যায়।
সু. বে: এটা আপনি দেখেছেন কোন এলাকাতে?
নী. ই: আমি তো ছিলাম নরসিংদী এলাকার আদিয়াবাদ নামে একটা গ্রামে। নরসিংদী থেকে দূরে, নদীপথে যেতে হয়। ইপিআররা সব রেজিস্ট্যান্স দেয়ার জন্য ওখানে ছিল।
সু. বে: নরসিংদী থেকে কি ইন্ডিয়ার বর্ডারে যাওয়া যায়?
নী. ই: হ্যাঁ। এনি হাউ, দে হ্যাড টু ম্যানেজ। তখন সব বন্ধ হয়ে গেছে, শুধু হাঁটাপথ।
সু. বে: এটা কখন? ঢাকা যখন খুব উত্তাল? ২৫ মার্চের পরপরই?
নী. ই: তখন তো রীতিমতো লঞ্চে করে অনেকে পালিয়েছে, অসুবিধা হয়নি। আমাদের এখানে যারা বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ফিরে এসেছে তারা পলিটিক্যাল পার্সন। তারা সবাই আরামেই গেছেন, সেভাবেই ফিরে এসেছেন। কিন্তু সাধারণ এক মহিলা তার চৌদ্দ বছরের ছেলেকে নিয়ে আমার কাছে এলেন। বললেন, ‘ওর নামটা লিখে দেন। ওতো বাচ্চা, আমার ওখানে তো পাকিস্তানি আর্মির গুলিতে মরবে, তার চেয়ে দেশের জন্য মরুক।’ এটা যদি মেয়েদের মহিমা না হয়, এই মহিলা যদি মুক্তিযোদ্ধা না হন, তাহলে আর মুক্তিযোদ্ধা কে?
সু. বে: অবশ্যই। আমরা তো সেটাই খুঁজে বেড়াচ্ছি।
নী. ই: আমি যেটা লিখেছি যে, এ পর্যন্ত কত বীরবিক্রম, বীরশ্রেষ্ঠ, বীরপ্রতীক আমরা পেলাম পুরুষ হিসেবে, আর আমাদের কপালে জয়টীকা পেলাম বীরাঙ্গনা, পরবর্তীকালে যা বারাঙ্গনা হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু কথা হচ্ছে কোন মহিলা, কোন মা, কোন স্ত্রী, কোন কন্যা এই মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেনি?
সু. বে: অবশ্যই করেছে।
নী. ই: কোনোরকম এসেসমেন্ট নেই। আমি বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিবকে নিয়ে লিখেছি। আমি মনে করি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তিনি।
সু. বে: তাঁর স্যাক্রিফাইস তো সারা জীবনের।
নী. ই: তা না হলে আপনারা শেখ মুজিবকে পেতেন না। ’৭১-এ মুজিবকে যখন ধরে নিয়ে গেছে তখন এখানে ওরা প্রিজ্‌নার হিসেবে ছিল। তখন শেখ কামাল, শেখ জামাল চলে গেছে, হাসিনা এক্সপেক্টিং অ্যাট এনি মোমেন্ট। তারপর হাসিনার লেবার পেইন উঠলো, তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ওঁকে সেখানে (বেগম মুজিব) যেতে দিল না। বলল, তুমি ডাক্তার না, তুমি যেতে পারবে না। তখন রীতিমতো তাদের খাওয়ার কষ্ট। চব্বিশ ঘণ্টায় একবার বা সারাদিন না খাওয়া। ওদের চোখের সামনে যেসব আর্মি ডিউটি দিচ্ছে, তাঁরা সব খাচ্ছে আর পাঁচ বছরের রাসেল তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বেগম মুজিব বলেছিলেন, ‘পরদিন সকালবেলা আমার উল্টাদিকের একটা বাড়ি থেকে একটা ট্রের উপরে এক পট চা, আর টোস্ট বিস্কুট- তাদের হয়তো করুণা হয়েছে, তারা দিয়েছে।’ এরকমভাবে তিনি নির্যাতিত হয়েছেন। এর মধ্যে হাসিনার দাদা এবং দাদি অসুস্থ ছিলেন, এদের দু’জনকে পিজি হসপিটালের একটা কেবিনে রেখেছিল। দেশে বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, তারা শক্‌ড। তাঁদের দেখতে যেতেন বেগম মুজিব এবং ঐখানে ফ্রিডম ফাইটারদের সাথে কাগজের টুকরো বিনিময় করতেন। অসম্ভব সাহসী মহিলা ছিলেন। কিন্তু একজনও সে কথাটা উচ্চারণ করে না। ওরা ১৫ আগস্ট আয়োজন করে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতিথি পালন করে, কিন্তু এই মহিলার কি কোনো অবদান ছিল না?
সু. বে: এবার আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। একাত্তরের শেষে ১৬ ডিসেম্বরের পরপরই বা ১৯৭২-এ যখন নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলো তখন তার সঙ্গে আপনি কীভাবে সম্পৃক্ত হলেন?
নী. ই: একদম ফরম্যালি। একটা সেটআপ করলেন প্রাইম মিনিস্টার শেখ মুজিব। তার চেয়ারম্যান হলেন আমাদের বিচারপতি কে. এম. সোবহান আর মেম্বার করলেন বাসন্তী গুহঠাকুরতা, মমতাজ বেগম নামে তখন একজন এমপি ছিলেন আর আমাকে। ঐখানে ট্রিমেন্ডাস কাজ হয়েছে।
সু. বে: নারী পুনর্বাসন ফাউন্ডেশনের স্ট্রাকচারটা কীভাবে গঠন করা হয়েছিল?
নী. ই: এটা একেবারেই প্রয়োজনের খাতিরে যেমন করে গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু একেবারে নিজেই অর্ডার দিয়ে করলেন। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পর মেয়েরা যখন জানতে পারলো যে, এখানে একটা ব্যবস্থা আছে, তার পরপরই আসতে শুরু করলো।
সু. বে: ফাউন্ডেশনটা হয়েছিল কোন সময়?
নী. ই: বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পর জানুয়ারিতে না হলেও ফেব্রুয়ারির ফার্স্ট উইকে হয়েছে। কারণ তখন তো জনস্রোতের মতো মেয়েরা আসছে। তার আগে অনেকেই সুইসাইড করেছে, অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, অনেক কিছু হয়েছে।
সু. বে: দেশ ছেড়ে পালিয়েছে মানে কোথায় গেছে?
নী. ই: দেশ ছেড়ে পালিয়েছে মানে বিক্রি হয়েছে। দালালেরা তো তখন সক্রিয়, তারা যেখানে পেরেছে সেখানে বিক্রি করেছে।
সু. বে: পাকিস্তানি আর্মিরা যখন দেশ ছেড়ে চলে যায় সেই সময় ৩০-৪০ জন মেয়ে চলে গেছে তাদের সঙ্গে। এটা কি নারী পুনর্বাসন ফাউন্ডেশন গঠন হওয়ার আগের ঘটনা?
নী. ই: আমি তারিখটা ঠিক বলতে পারব না। তখন পুনর্বাসন কেন্দ্র হয়নি। বঙ্গবন্ধু আসার পর অর্ডার দিয়েছিলেন প্রিজনারদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য। আমার ঠিক তারিখ মনে নেই তবে বঙ্গবন্ধু আসার অল্প কয়েকদিন পরে ঘটনাটা ঘটে। উনি ওয়ার প্রিজনারদের যেতে দিলেন ইন্ডিয়াতে তখন আমি হঠাৎ করে খবর পেলাম যে, তাদের সাথে ৩০-৪০ জন মেয়ে যাচ্ছে।
সু. বে: আপনি এ বিষয়ে ডিটেলস্‌ লিখেছেন কোথাও?
নী. ই: না, লিখিনি। আমার লিখবার সুযোগ ছিল না, আজও নেই। তার কারণ যাদের নাম জড়িয়ে আমি লিখব তাদের তো সমূহ সর্বনাশ। যে জন্য ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইতে আমি যা লিখেছি তা কারো প্রকৃত নাম নয়।
সু. বে: সেটা উচিতও না। কিন্তু যারা চলে গেল তারা কি একেবারেই চলে গেল, নাকি আবার ফিরে এসেছে?
নী. ই: ঐ যে একজনের কথা আমি বলেছি। একজনকে আমি জানি, আর কে ফিরেছে না ফিরেছে আমি জানি না। সেই দিন, মেয়েদের চলে যাওয়ার দিন আমি, নওশাবা এবং এডুকেশনের আরেকজন মহিলা শরীফা খাতুনকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি প্রথমে ভারতীয় দূতাবাসের সামরিক অফিসার ব্রিগেডিয়ার অশোক ভোরার কাছে গেলাম। আমি বলেছি, অশোক, আমাদের মেয়েরা নাকি চলে যাবে? বলল, হ্যাঁ। আমি বলেছি, আমি ওদের সাথে দেখা করবো কী করে? বলেছে, ‘ওটা তো আমাদের হাতে নেই, বাংলাদেশ আর্মি জানে।’ তারপর ওদের কাছে গেলাম, বলেছে কালকে দশটায় আসেন, অ্যারেঞ্জ করে দেব। মেয়েদের সঙ্গে ইন্টারভিউ করতে গিয়ে সব টর্চার চেম্বার দেখেছি, বিভীষিকা। ছোট ছোট ঘরের মধ্যে এই রকম গোল পাকানো দড়ি।
সু. বে: এটা কি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিল?
নী. ই: ক্যান্টনমেন্টে ছিল। আমি বললাম, এই দড়িগুলো কিসের? তখন একজন ইন্ডিয়ান সেপাই একটা দড়ি নাড়া দিল। অসংখ্য বড় বড় মাছি। মেয়েরা বলেছে, এখানে সব পিটিয়েছে, তারের ওপরে সেই রক্ত, সেই রক্তের গায়ে সমস্ত মাছি এইভাবে লেগে আছে। বীভৎস! স্বাভাবিক হতে পারিনি। তারপর ঐ মেয়েদের জিজ্ঞাসাবাদ করবো কি তারাই উল্টো আমাদের ইন্টারোগেট করে এবং আমারও একটাই অনুযোগ-অভিযোগ এই দেশের পুরুষের প্রতি, তোমরা প্রাণভয়ে পালালে, যাদের রেখে গেলে তাদের কথা তো একবারও চিন্তা করোনি। কিন্তু শাস্তিটা ঠিকই দিয়েছো। একদিন এক মেজর তাঁর স্ত্রীর জন্য শাড়ি নিয়ে এসেছিলেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। আমি বললাম, শাড়ি নিয়ে এসেছেন কেন, সঙ্গে করে নিয়েই যান। বলে, কী করে নেব? আমার বোনের বিয়ে। আমি বলেছি, দ্যাখেন, এই মেয়েটিও তো কারো না কারো বোন। তিনি মিষ্টি কথা বলে সেই যে চলে গেলেন, আর এলেন না। দেখেছি বাবা, যারা খবর পেয়েছেন, তারা ছুটে এসেছেন, অনেকে মেয়ে নিয়ে গেছেন। যারা পারেননি, তারা কান্নাকাটি করে গেছেন। আর কোনো আত্মীয় না। বড়ভাই না। ছোটভাইরা অনেক সময় এসেছে কিন্তু তারা সবাই তাদের নিজস্ব সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন।
সু. বে. আমরা আবার একটু ফিরে যাই আগের আলোচনায়- সেটা হচ্ছে নারী পুনর্বাসন ফাউন্ডেশন যে হলো তার পলিসি কী ছিল?
নী. ই. ফার্স্ট পলিসি ছিল মেডিকেল ট্রিটমেন্ট- এবরশন। ভ্রূণের বয়স চার মাস পর্যন্ত এবরশন করা যেত। দু’জন পোলিশ ডাক্তার ছিলেন, প্রতিদিন যতগুলো করে পেরেছেন তারা এবরশন করেছেন।
সু. বে. পোলিশ ডাক্তারদের নাম কি মনে আছে?
নী. ই. আমার এখন নাম মনে নেই। ডাক্তারদের সাথে রোজই দেখা হতো।
সু. বে. সে সময়ে কি আপনাকে রেগুলার যেতে হতো?
নী. ই. রেগুলার যেতাম আমি এবং বাসন্তী গুহঠাকুরতা। বাসন্তী খুব বেশি সময় থাকতো; আমি অতটা পারতাম না কারণ আমার চাকরি, ইউনিভার্সিটি, বাংলা একাডেমী ইত্যাদি ছিল। তবু আমি প্রতিদিন যেতাম।
সু. বে. পলিসির মধ্যে মেডিকেল ট্রিটমেন্ট, এবরশন, আর?
নী. ই. আরেকটা ছিল যে, ঐসব যুদ্ধ শিশুদের কী করা হবে। এটা ছিল বড় সমস্যা।
সু. বে. সেখানে কী ডিসিশন নেওয়া হয়েছিল?
নী. ই. সেখানে ডিসিশন নেয়া হয়েছিল যে, যদি কোনো ফরেন কান্ট্রি অফার করে তাহলে আমরা বাচ্চা দিয়ে দেব, ফর এডাপশন।
সু. বে. দেশের ভেতরে কেউ এগিয়ে আসেনি বাচ্চা নেয়ার জন্য?
নী. ই. স্টেট পলিসি বলে কিছু ছিল না। বঙ্গবন্ধুর পারমিশন ছিল যে, কেউ বাচ্চা এডাপ্ট করতে চাইলে, বাচ্চা দিয়ে দেবে।
সু. বে. সেখানে বাচ্চার মা যদি না চায় তাহলেও দিয়ে দিতে হয়েছে?
নী. ই. একটু যারা বয়স্ক তারা কেউ বাচ্চা রাখতে চায়নি। তারা বুঝেছে, বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই। কিন্তু টিন এজার যারা, তারা ইমোশনাল হয়েছিল খুব বেশি। প্রথম সন্তান, এই জন্য তারা বাচ্চা দিতে চায়নি। আমার মনে হয় বেশিরভাগ বাচ্চাই কানাডা, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কান্ট্রিতে আছে।
সু. বে. আনুমানিক ধারণা দিতে পারবেন যে কতজন বাচ্চা পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে দেয়া হয়েছে? এ ব্যাপারে কোনো ডকুমেন্ট আছে কিনা?
নী. ই. কতজন বাচ্চা দেয়া হয়েছে সেটা আমি বলতে পারবো না। সমস্ত ডকুমেন্ট থাকার কথা, কিন্তু এখন আমরা চাইলে পাই না। মহিলা অধিদপ্তরে গেলে পাওয়া যেতে পারে। তারা কোনো রেকর্ড রেখেছে কিনা আমি জানি না। কিন্তু পাওয়া উচিত, কারণ বিভিন্ন দেশ থেকে সিস্টাররা আসতেন, এসে বাচ্চাদের নিয়ে যেতেন। ওখান থেকে তারা বাচ্চা এডাপ্ট করবে কিনা ডিসিশন নিত।
সু. বে. এবরশন, মেডিকেল ট্রিটমেন্ট, বাচ্চাদের দত্তক দেয়া ইত্যাদি পলিসি তৈরির ক্ষেত্রে কারা ছিল?
নী. ই. ইট ওয়াজ আওয়ার প্রাইমমিনিস্টারস ডিসিশন। বঙ্গবন্ধু। তার কারণ তখন আমরা এত প্রবলেম ফেস করছিলাম যে, আমাদের কারো ডিসিশন নেয়ার ক্ষমতা ছিল না, ঐ এক জায়গায় ছাড়া।
সু. বে. কী ধরনের প্রবলেম?
নী. ই. স্থানীয় মসজিদের মৌলভীরা বলল যে, বাচ্চা দিতে পারবেন না, সব খ্রিষ্টান করে দেবে। আমি তখন বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি একটা সত্য বুঝি, মানুষের সন্তান, মানুষ হিসেবে বড় হোক, তারপর তারা তাদের ধর্ম বেছে নেবে।
সু. বে. সে তো অবশ্যই, মানুষের বাঁচার অধিকারটা হচ্ছে প্রধান বিষয়।
নী. ই. হ্যাঁ। আরও কিছু চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ’৭৫-এর পরপরই এই চ্যাপ্টার ক্লোজড হয়ে গেল। উনি চেয়েছিলেন যে এদের কিছু লেখাপড়া শিখিয়ে দিতে, যাতে কোনো কাজে দেয়া যায়। পুনর্বাসন কেন্দ্রে টাইপিং শেখানো হতো, সেলাইয়ের ট্রেনিং কোর্স করানো হতো। তাতে কিছু মেয়েকে চাকরি দেয়া হলো। আমি একদিন রেডক্রস বিল্ডিংয়ে গেছি, অফিসে দেখলাম অনেক লোক দাঁড়ানো। আমি বললাম, কী ব্যাপার, কী চান আপনারা? তারা বলল, আমরা বীরাঙ্গনা দেখতে আইছি। সেই আনফরচুনেট মেয়েগুলো আর তো কিছুতেই অফিসে যাবে না, এরকমও হয়েছে। এরপর বলা হলো যে, যারা লেখাপড়া কিছু জানে না, তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়া যেতে পারে। দশজনকে আমার যতদূর মনে পড়ে দশ হাজার করে টাকা দেয়া হলো আর বঙ্গবন্ধুর ওয়াইফ যাবতীয় সাংসারিক জিনিসপত্র, সেলাই মেশিন দিলেন। তবে যারা টাকা নিয়ে বিয়ে করলেন, তারা টাকাটাই নিলেন, বউ আর নিলেন না।
সু. বে. আমরাও জেনেছি যে, অনেকে টাকাপয়সাসহ বিভিন্ন যৌতুক নিয়ে বিয়ে করেছিল।
নী. ই. অনেক রকমে চেষ্টা করেছেন বেগম মুজিব। ডাইনে-বাঁয়ে এ কাজে তাঁকে কেউ সাহায্য করেনি। তাদের যারা মহিলা নেত্রী ছিলেন, তাদেরও আমি দেখিনি। নূরজাহান মোর্শেদকে আমি এক-আধদিন দেখেছি আর ঐ মমতাজ বেগম নামে একজন এমপিকে দেখেছি। আর কারো কথা মনে পড়ে না।
সু. বে. নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র সম্পর্কে আরেকটু ভালোভাবে জানতে চাচ্ছিলাম, এটি কীভাবে পরিচালিত হতো।
নী. ই. জাস্টিস সোবহান ছিলেন একজন ডিরেক্টর, একজন জেনারেল সেক্রেটারি এবং নার্স ছিল।
সু. বে. একটা তথ্যের বিষয়ে জানতে চাচ্ছিলাম; আমরা জেনেছি যে, নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে যেসব মেয়ে আসত তাদের নাম-ঠিকানাসহ কেসহিস্ট্রি লিখে রাখা হয়েছিল। কিন্তু যখন তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দেয়া হয় তখন সমাজে এমন বিরূপ আবহ তৈরি হলো যে, সেই প্রেক্ষাপটে নাকি পুনর্বাসন ফাউন্ডেশনের যারা কর্মকর্তা ছিলেন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়েদের নাম-ঠিকানা লেখা অংশটুকু কেটে পুড়িয়ে ফেলা হবে।
নী. ই: সত্যি নয়। আমিও তো ইনভলভ্‌ ছিলাম, তাহলে আমিও তো জানতে পারতাম বিষয়টা। এগুলো অল মেইড আপ স্টোরি। এখন এই ইতিহাস তুমি লিখবে কী করে? একেকজন একেক রকম বানোয়াট কথা বলবে। চেষ্টা করতে হবে, তথ্য উদ্ধার করতে হবে কিন্তু এটা একেবারেই মিথ্যা কথা, আর বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পরপরই বীরাঙ্গনা উপাধি দেয়া যায়। আর এটা সত্যি যে, ‘নোবডি কেয়ার ফর বীরাঙ্গনা।’ সমাজ তো দূরের কথা, আত্মীয়রা পর্যন্ত কেউ ফিরেও তাকায়নি কিছু হয়েছে কিনা। যারা এ ধরনের কথা বলেছেন, এরা চাকরি পেয়েছেন এবং নিজের স্বার্থরক্ষা করেছেন। প্রত্যেক মেয়ের কেসহিস্ট্রি আছে।
সু. বে: সেইগুলো তাহলে কোথায় আছে?
নী. ই: এরাই জানে কোথায় পুড়িয়ে ফেলেছে। যেমন অনেকে বলত, বঙ্গবন্ধু হত্যার নাকি ডকুমেন্ট কিছু নেই, সব পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এখন তো সব পাওয়া যাচ্ছে। পুড়িয়ে ফেলেনি, কোথাও হয়তো আছে।
সু. বে: নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ নিয়ম ছিল কিনা।
নী. ই: তখন কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্টের সিস্টেম ছিল না। যেমন আমাকে বাংলা একাডেমীর ডিজি করা হলো। জাস্ট একটা গভর্নমেন্ট লেটার এলো, ব্যস। কোনো ইন্টারভিউ না, কোনো কিছু না। নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে একটা কাঠামো দাঁড় করানো হলো, এর প্রেসিডেন্ট করা হলো জাস্টিস সোবহানকে, উনি এগ্রি করলেন, আর কয়েকজন মেম্বার।
সু. বে. যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন তখন এই ক’জন মিলে নিতেন?
নী. ই. না না। সত্যিই কথা বলতে কি কোনো কিছু কাজের জন্য জাস্টিস সোবহান বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন, তিনি ওকে করলেই হতো আর কি। আমাদের এখানে আলাপ-আলোচনা করে মিরপুরে একটি পোলট্রি ফার্ম করা হলো এবং ওটা এখনো আছে। সেখানে মেয়েরা কাজ করত। তারপর টাইপিং, শর্টহ্যান্ডের ক্লাস করানো হতো। যাতে এরা কোনো কিছুতে ব্যস্ত থাকে। শুধু ব্যস্ত থাকা না, সো দে ক্যান আর্ন সামথিং, নিজেদের যাতে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
সু. বে: নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে কতজন মেয়ে এসেছিল, কতজন চলে গেছে, কতজনের এবরশন হয়েছে এসব তথ্য কি আপনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে রাখতেন?
নী. ই: না ঐভাবে রাখিনি, শুধু ইন্টারেস্টিং কেসগুলো আমার ডায়েরিতে লেখা ছিল। রেকর্ড আছে কারণ রেকর্ড ক্লিপিং করার দায়িত্ব তো সেক্রেটারির ছিল।
সু. বে: কেন্দ্রে যেসব মেয়ে এসেছিল পরবর্তীকালে তাদের চলে যাওয়ার পর কি কোনো ফলোআপ করা হয়েছিল?
নী. ই: আমার যতদূর মনে পড়ে কোনো ফলোআপ করা হয়নি। যারা মারা গেছে, গেছে, যারা প্রস কোয়ার্টারে আশ্রয় নেয়ার নিয়েছে, অনেকে টানবাজারে উঠেছে।
সু. বে: প্রস কোয়ার্টারে চলে গিয়েছিল এটা কি প্রমাণিত নাকি অনুমান থেকে বলছেন? জানার জন্য জিজ্ঞেস করছি।
নী. ই: নিশ্চয় জিজ্ঞেস করতে পারো। তবে আমি তোমাকে কোনো লিখিত প্রমাণ দিতে পারবো না, কিন্তু আমি অনেকের মুখে বলতে শুনেছি যে, একটা জায়গা পেলাম। তখন আমি নিজেও এত বেশি ব্যস্ত যে এত খুঁটিনাটি নিয়ে আমার কিছু করার ছিল না বা আমি তো মেয়েদের নিয়ে সেরকম কাজ কখনো করিনি। আমি তো ওভারঅল ন্যাশনাল পলিসি অ্যান্ড পলিটিক্‌সের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমি একজন মহিলা বলে বঙ্গবন্ধুর খুব বেশি ইচ্ছা ছিল যে নির্যাতিত মেয়েদের জন্য কাজ করি। কিছু মেয়ে দালালের হাতে পড়ে বিদেশে চলে গেছে- ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, মিডলইস্টেও চলে গেছে। কাউকে বলেছে ভালো বিয়ে দেব, কাউকে বলেছে চাকরি দেব, এভাবে পাচার হয়ে গেছে।
সু. বে: শুনেছি কিছু টানবাজারে, কিছু ইংলিশ রোডের পতিতাপল্লীতে চলে গেছে।
নী. ই: টানবাজারে খোঁজ করলে যাদের পাবে তারা এখন সিক্সটি আপ, তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই, তবু খোঁজ করলে পাওয়া যেতে পারে। একবার আয়শারা (মহিলা পরিষদের সভানেত্রী) চেষ্টা করেছিল স্টাডি করার জন্য। আমি ঠিক জানি না কাজটা হয়েছিল কিনা।
সু. বে: এই মেয়েরা কি পরবর্তীকালে আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে কোনোভাবে যোগাযোগ রেখেছিল?
নী. ই: আমার সঙ্গে রাখেনি। বঙ্গবন্ধুর কাছে তারা গেছে। ওরা দেখা করতে গেলেই উনি দেখা করতেন এবং একটি কথা সবাইকে বলতেন যে, ‘তোরা আমার মা।’ সাহায্য চাইলে নিঃসন্দেহে সাহায্য করতেন, কিন্তু সে সাহায্য কে নিয়েছে বলতে পারবো না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আমি সবকিছু থেকে অ্যালুফ হয়ে আছি। আমরা তখন কোন সময় জেলে ঢুকব, কীভাবে টর্চারড্‌ হবো এইটাই চিন্তা করতাম। সুতরাং নারী পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিষয়ে আর কিছু জানতে পারিনি।
সু. বে: আপনার নিজেরও কখনও ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা মনে হয়নি? ওদের কারো নাম-ঠিকানা কোনো কিছু আপনার কাছে ছিল না?
নী. ই: থাকলেও আমি যেতাম না। নাম-ঠিকানা কিছুই ছিল না তা নয়, কিন্তু তাদের খূুঁজে বের করার মতো মানসিকতা সেই সময় আমার ছিল না। কারণ আমার নিজের স্বামী-সন্তান বাঁচাতেই আমি তখন ব্যস্ত।
সু. বে: সেসব মেয়ে পরবর্তীকালে কেমন আছে এ বিষয়ে জানার আগ্রহ তখন আপনাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল কি না?
নী. ই: আমার নিজের ব্যক্তিগতভাবে প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। সেজন্য আমি বিদেশেও কয়েকজনকে পেয়েছি, এখানেও আছে।
সু. বে: কয়েকজনের কথা আপনার লেখা ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইতে পড়েছিলাম।
নী. ই: তারা এখন লাইফে ওয়েল সেট্‌লড। সেরকম মেয়ে যে এখানে একেবারে নেই তা না, তবে বেশিরভাগই হারিয়ে গেছে। যাদের একটু লেখাপড়া জানা ছিল, রেজিস্ট করতে পেরেছে, চাকরি-বাকরি নিয়েছে। তারা বেঁচে আছে। আর বেশিরভাগই নেই, শেষ হয়ে গেছে।
সু. বে: যখন পুনর্বাসন কেন্দ্র মহিলা অধিদপ্তরের সঙ্গে একীভূত হলো সেই সময়ে আপনাদের থেকে কি কোনো পরামর্শ নিয়েছিল?
নী. ই: তখন উই আর অ্যাট নো হোয়ার। এটা অটোমেটিক্যালি জিয়াউর রহমান যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবে হয়েছে।
সু. বে: মহিলা অধিদপ্তর তো এখন একটা বড় প্রতিষ্ঠান। প্রথম দিকে চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে কি ঐসব বীরাঙ্গনাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল? আপনি কি এ সম্পর্কে কিছু জানেন?
নী. ই: না, আমি জানি না। এখানে দেয়া হবে না এতো জানা কথা। তাদেরকে একটা এনিমি ফোর্স হিসেবে ধরা হতো, তাদেরকে তো রিকগনাইজই করেনি। কয়েকদিন আগে পাকিস্তান থেকে উচ্চপদস্থ লোকজনের একটি ডেলিগেশন এসেছিল। লাহোর শাহী মসজিদের খতিব বললেন, ‘আমি জোর নিন্দা করছি যে বাংলাদেশের ওপর এই অত্যাচার করা হয়েছে। তোমরা বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমরা জানতামই না যে, এখানে এসব হচ্ছে।’ আর একজন ডেলিগেট বললেন যে, মিস্টার মালেক কোরাইশি ছিলেন আমাদের কাগজের সম্পাদক। তিনি কাগজে লিখেছিলেন যে, ইস্ট পাকিস্তানে ম্যাসাকার হচ্ছে, তাকে তখুনি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। জার্নালিস্ট মাজহার আলীর স্ত্রী ছিলেন সোশ্যাল ওয়ার্কার তিনি বলেছেন, করজোড়ে মাফ চাই বাঙালিদের কাছে যে, তাদের ওপর এই অত্যাচার করা হয়েছে। তো আমি মাওলানা সাহেবকে বললাম যে, তোমাদের থ্যাংক্‌স। তোমাদের মধ্যে একজন মহিলাই একথা বলেছিল, তোমরা কেউ বলোনি।
সু. বে: আপনি কি মনে করেন, আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম যারা অর্থাৎ আমরা, বীরাঙ্গনাদের জন্য আমাদের কী করা দরকার?
নী. ই: করবার কিছু নেই এখন।
সু. বে: আমরা ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানতে চাচ্ছি।
নী. ই: তোমরা জানতে চাও? এখন একজনও কেউ রেসপন্ড করবে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, এই পরিচয়টা তাদের কাছে অত্যন্ত লজ্জার। বিদেশে যারা সেট্‌ল হয়েছে নোবডি কেয়ার ফর দ্যাট। তিনবার বিয়ে হলে যদি অসুবিধা না হয় তাহলে এটা কি, তারা তো ভিকটিম হয়েছে মাত্র।
সু. বে: আমরা কিছু তথ্য-প্রমাণ স্পষ্ট করতে চাচ্ছি, একাত্তর সম্পর্কিত ডকুমেন্টেশন করতে চাচ্ছি, যদি ভবিষ্যতে কোনোদিন যুদ্ধাপরাধের মামলা করা হয় কিংবা যদি ট্রায়াল উপস্থাপিত হয় সেক্ষেত্রে যদি কিছু করা যায়। না হলে তো আমরা ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছি না। যদি কখনো ভবিষ্যতে এই প্রশ্ন ওঠে যে, বলা হয় দুই লাখ মা-বোন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, প্রমাণ কোথায়?
নী. ই: শুধু তাই না, আমাদের দেশে ক্ষমতায় থাকা লোকজনও বলেছে যে, এ সত্যি না।
সু. বে: আমরা ভিকটিমদের খুঁজে বের করতে চাই যাতে কেস হিসেবে তুলে ধরা যায়। তাদের ট্রমাকে বুঝতে চাই। একইসাথে তাদের বর্তমান জীবনকেও দেখা। সেখানে প্রকৃত নাম, ঠিকানা উল্লেখ করলে তাদের বর্তমান জীবন বিপন্ন হতে পারে, যেমনটি আপনার বইতে দেখেছি।
নী. ই: শোন, আমি ল’ইয়ারের মেয়ে, ল’ইয়ারের গ্রান্ড ডটার, নাম-ঠিকানা বাদ দিয়ে কোনো কিছু করা যায় না, কোনো কেস করা যায় না। আগেই বলতে হবে ভিকটিম কে, কীভাবে ভিকটিমাইজ্‌ড হয়েছে, কারা ভিকটিম করেছে , না হলে কেস টিকতে পারবে না।
সু. বে: কারা ভিকটিম করেছে?
নী. ই: দেশের লোক। আমার কিন্তু পাকিস্তান সোলজারদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এটা আমি ডিফার করি সবার সঙ্গে। কারণ আমি যতগুলো নির্যাতিত মেয়ে পেয়েছি, দে ওয়ার ফার্স্ট ভিকটিমাইজড্‌ বাই আওয়ার ওন পিপ্‌ল। তারপর তারা আর্মিদের গিফট দিয়েছে।
সু. বে: এটা তো একটা ভয়াবহ ব্যাপার। এই বিষয়টাকে কেউ সেভাবে উল্লেখ করে না।
নী. ই: আমি করি। যদি এটা হতো যে, পাকিস্তান আর্মি এসে আমাদের সব মলেস্টেশন করে দিয়ে চলে গেছে- আমি বুঝতাম। তারা যুদ্ধ করতে এসেছে, যে পথ তারা পেয়েছে, তারা সেই পথ নিয়েছে। কিন্তু না, তা তো তারা করেনি। আমার বাড়ি অনেকবার সার্চ হয়েছে এবং একজন অফিসার এসেছে সঙ্গে তিন-চারজন করে জোয়ান, একবারের জন্যও বলতে পারবো না যে, তারা মিসবিহেভ করেছে। দ্যাট অফিসার ওয়াজ মাম্‌, কখনো কিছু বলেনি। সব দেখে যাওয়ার সময় বারবার করে বলেছে, আই অ্যাম রিয়ালি সরি টু ডিস্টার্ব ইউ। আমি কী করে তাদের নিন্দা করবো, তারা যুদ্ধ করতে এসেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে মেরেছিল। কিন্তু এই যে বীরাঙ্গনা সম্পর্কিত অপরাধ, এসব আমাদের। আমাদের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান পাঁচ বছর তো প্রেসিডেন্টগিরিও করে গেলেন। এ বাংলাদেশেই সম্ভব, আর কোথাও না।
সু. বে: আপনি ইতিহাসকে উন্মোচিত করবেন না? ভিকটিমদের সঠিক পরিচয় অন্বেষণ করা দরকার কারণ এইগুলো তো একটা ডকুমেন্ট।
নী. ই: ইতিহাস তো উন্মোচিত। আমি ইতিহাস উন্মোচিত করে যদি একটা পরিবারের সর্বনাশ করি, সে অধিকার আমার নেই, আমি তাই মনে করি। যে ক’টি মেয়ে শান্তিতে একরকম সংসার করছে, তাদের সেই শান্তি ছিনিয়ে নেয়ার অধিকার আমার নেই।
সু. বে: সে অধিকার আমাদেরও নেই আর আমরা সেটা চাইও না।
নী. ই: সেই জন্যই কিছু ছেলে আমাকে ফোন করেছিল, তারা অ্যাড্রেস পেলে যেত ওদের কাছে ফুল নিয়ে। আমি বলেছি, ‘কবরে তো মালা আগেই দিয়ে এসেছ, এখন আর ফুল দেয়ার প্রহসন নাই বা করলে।’ এখন তাদের সন্তানরা বড় হয়েছে, সব আই এ, বি এ পড়ে, যে মুহূর্তে যাবে সেই মুহূর্ত থেকে স্বামী আর সন্তানের ঘৃণা আসবে মায়ের ওপরে। দেখো চেষ্টা করে, এ তো বড় কঠিন কাজ। সরকারি সহায়তা পেলে কিছু করা যাবে, তা না হলে করা যাবে না।
সু. বে: এই সরকারি সহায়তা বলতে কী ধরনের সহায়তার কথা আপনি বলছেন?
নী. ই: ঐ যে বললাম ফাইল চাওয়া। তোমাকে ফাইল যদি নাও দিতে চান অন বিহাফ অফ ইউ, কোনো একজন ল’ইয়ার দিয়ে তুমি ওটা ডিমান্ড কর।
সু. বে: আমাদের তা করা দরকার। আচ্ছা আপনি আর এদের নিয়ে পরবর্তীকালে বই লিখছেন না!
নী. ই: আমি চোখের সমস্যার কারণে মাদ্রাজ যাচ্ছি। দেখি ফিরে এসে আই সাইট ঠিক হলে তখন লিখবো আবার।
সু. বে: চোখের সমস্যা হলে ডিকটেশন দিয়েও কাজ করা যেতে পারে নির্ভরযোগ্য কাউকে দিয়ে।
নী. ই: আমি এই কাজ ডিকটেশন দিয়ে করাব না।
সু. বে: ’৭১-এ আপনি যখন ঢাকার বাইরে ছিলেন সেসময় কি আপনি কখনো ঐরকম খবর পেয়েছিলেন যে, মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে? এই খবরগুলো ’৭১-এ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমরা পাচ্ছিলাম, নাকি এটা পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয়েছে?
নী. ই: এটা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে হয়েছে। আমি তো গ্রামে ছিলাম, খবর পেয়েছি এবং রাজাকাররা এটা করেছে।
সু. বে: আমাদের দেশের লোকজনই এই পদক্ষেপ নিয়েছিল? কেন? আপনার কী মনে হয়?
নী. ই: মেয়েদের ধরে নেয়ার একটা কারণ ছিল যে, আর্মিকে খুশি করা এবং তাদের কাছ থেকে কিছু পাওয়া। কেউ বাড়ি দখল করেছে, কেউ গাড়ি দখল করেছে।
সু. বে: সেটাই যদি হবে তাহলে কেন একটা মেয়ে প্রথম ভিকটিম হয়েছে নিজের লোক দ্বারা? তাহলে তো সে ধরে নিয়ে প্রথমেই আর্মিকে দিতে পারতো। তাতো সে করেনি, সে তো নিজে প্রথমে মেয়েটিকে নির্যাতন করেছে, তারপর আর্মিকে দিয়েছে।
নী. ই: সে নিজের চান্স মিস করেনি। সে তো একটা পক্ষ, তা না হলে কেউ কারো নিজের মা-বোনকে নিয়ে গিয়ে দিয়ে আসতে পারে আর্মির কাছে? এরা সব বাড়ি ভেঙে, ঘর জ্বালিয়ে মেয়েদের নিয়ে গেছে, মাকে মেয়েকে একসঙ্গে রেপ করেছে। আমরা সব পাকিস্তানি আর্মিদের দোষ দেই।
সু. বে: আপনি কি ওদের কাউকে জানেন? যারা এই ধরনের কাণ্ড করেছে?
নী. ই: এটা তো সবাই জানে। কে না জানে, যাকে জিজ্ঞেস করবে, সেই তোমাকে বলে দেবে। যে কোনো এলাকাতেই আমরা ট্রেস করতে পারি যে, এই লোক এই কাণ্ডগুলো করেছিল। এই তো আমাদের প্রেসিডেন্ট সাহেবই কত নাম দিতে পারতেন, যিনি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। দেখো চেষ্টা করে। আমার ব্লেসিংস থাকল।
সু. বে: আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

‘গণহত্যা: সত্য ও ন্যায়বিচার’ শীর্ষক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ২০০৯

তাবাস্‌সুমা মখ্‌দুমা

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গত ৩০-৩১ জুলাই ২০০৯ সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণহত্যা: সত্য ও ন্যায়বিচার’ শীর্ষক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। এমন এক সময়ে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয় যখন বাংলাদেশ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা বিবেচনা করছে। মূলত যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার নানাদিক বিবেচনা করেই এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এবং সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন- ‘স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গ্লানি আমাদের দূর করতেই হবে।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের গ্রন্থাগার, জাদুঘরসহ নানা স্থানে একাত্তরের গণহত্যার অসংখ্য প্রমাণ, তথ্য-উপাত্ত আছে যা বাংলাদেশ সরকারকে দেয়া হলে বিচার প্রক্রিয়া অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য-উপাত্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যথেষ্ট। তবে দেশের বাইরে থাকা প্রমাণগুলো জড়ো করতে পারলে বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’ অনুষ্ঠানে তিনি জানান, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বিচার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি সরকার নিচ্ছে।

দেশি-বিদেশি অতিথিদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে না। ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। সেই অপরাধী ব্যক্তি যদি কোনো দলের বা আদর্শের হন, সেক্ষেত্রে সরকারের কিছু করার নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের বিচার হবে, পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের নয়। তাই এ ব্যাপারে পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।’

খুব শিগ্‌গির বিচারের জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে বলে তিনি জানান। স্বাধীনতার এত বছর পরে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সামরিক সরকারগুলো এ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে। তাছাড়া পূর্ববর্তী কোনো নির্বাচিত সরকারও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়নি।

অনুষ্ঠানে আসা দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা গণহত্যার দায়ে অভিযুক্তদের বিচার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁরা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শিক্ষক ড. সুজানাহ লিনটন বলেন, ‘একাত্তরে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পর ৩৮ বছর অনেক সময়। তবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে এই সময় কোনো বাধা নয়।’ এক্ষেত্রে তিনি লাইবেরিয়া ও সিয়েরালিয়নের উদাহরণ টেনে বলেন, এসব দেশে অনেক পরে অভিযুক্তদের বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পার্লামেন্ট সদস্য হেলমুট স্কোল্‌জ বলেন, ‘এই গণহত্যা কেবল বাংলাদেশের বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারেরও প্রশ্ন। তাই বিচার করতেই হবে।’ তাছাড়া এ কাজে সহায়তা দেয়া ইইউর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে তিনি জানান। কানাডার আইনজীবী ড. ডেভিড মাতাস বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়া শুরু করাটা যেমন জরুরি, তেমনি তা যথাযথভাবে শেষ করাও গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন- ‘গণহত্যা একটি অপরাধ এবং তাই এর বিচার হতেই হবে।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রথম অধিবেশনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংক্রান্ত তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। উপস্থাপকবৃন্দ হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবিএম আবু নোমান এবং কানাডার এক আইনজীবী ডেভিড মাতাস।

দ্বিতীয় অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, একাত্তরে বাংলাদেশের গণহত্যার পরিকল্পনা পাকিস্তানি জেনারেলরা কেন্দ্রীয়ভাবে করেছিলেন। কিন্তু এ জন্য তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। তিনি সে সময়কার বিভিন্ন দেশের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, ওই গণহত্যার কথা জেনেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানকে যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করে। মুসলিম দেশগুলো পাকিস্তানকে সমর্থন করে।

ইইউ পার্লামেন্ট সদস্য হেলমুট স্কোল্‌জ তাঁর প্রবন্ধে মূলত জোর দেন আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তিরক্ষার নানাদিকের ওপর। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে যেসব দায়িত্ব রয়েছে তার ওপর আলোকপাত করেন।

এই অধিবেশনে পাকিস্তানের আহমেদ সেলিমের প্রবন্ধ পাঠ করেন মফিদুল হক। প্রবন্ধে লেখক পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামীর নেতারা উর্দুতে লেখা প্রকাশনায় বাংলাদেশবিরোধী যে প্রচার চালিয়েছিলেন, তার বিবরণ তুলে ধরেন। আলবদর নামে সে দেশে একটি প্রকাশনা সংস্থাও সে সময় গড়ে ওঠে। এই অধিবেশনের সঞ্চালক কোরিয়ার অধ্যাপক চানওয়ান কিম বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তর্জাতিক সহায়তার আগে দেশের ভেতরে এ বিষয়ে ঐক্য দরকার।

তৃতীয় অধিবেশনে কোরিয়ার অধ্যাপক চানওয়ান কিম বলেন, ভারত যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছিল, তাই এক্ষেত্রে তাদের অনেক ভূমিকা রাখার অবকাশ আছে। তাদের কাছে নিশ্চয়ই যুদ্ধ সংক্রান্ত অনেক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, যা বিচার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

তৃতীয় অধিবেশনে গবেষক বিনা ডি কস্টার প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি তারিক আলী। বাংলাদেশে বিনা ডি কস্টার মাঠ পর্যায়ের গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং জেন্ডার সংবেদনশীল বিচার ব্যবস্থার জন্য করণীয় পদক্ষেপই এই প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য। বিভিন্ন দেশের যুদ্ধাপরাধের উদাহরণ টেনে বিনা ডি কস্টা এই প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, কীভাবে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন একাত্তরের নারীদের প্রতি সহিংসতার দিকটি তুলে ধরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রথম দিনের শেষ অধিবেশনের সর্বশেষ প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন যৌথভাবে কম্বোডিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি নাফিয়া তাসমিন দীন এবং জার্মানির কনস্টেন্‌জ ওয়েলরিচ, যাঁরা কম্বোডিয়ার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।

দ্বিতীয় দিন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের লে. জে. (অব.) হারুন-উর রশীদ বীরপ্রতীক বাংলাদেশের গণহত্যা ও বিচারের জন্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তাঁর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এই অধিবেশনের অপর প্রবন্ধটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ও নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস এস মাসুম বিল্লাহর। একই অধিবেশনে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম তার প্রবন্ধে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সম্মেলনের পঞ্চম অধিবেশনে গবেষক রুবাইয়াত হোসেন তাঁর প্রবন্ধে একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের অভিজ্ঞতা ও ত্যাগ তুলে ধরেন। যুক্তরাজ্যের ল্যাংকেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়নিকা মুখার্জীর প্রবন্ধ উপস্থাপন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলএমের ছাত্রী তাবাস্‌সুম মখদুমা (লেখক)। এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য ছিল একাত্তরে বাংলাদেশের নারীদের ওপর যৌন অত্যাচার। পঞ্চম অধিবেশনের অপর প্রবন্ধটি ছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাসিমা সেলিমের যেখানে তিনি একাত্তরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরল ত্যাগের কথা উল্লেখ করেন। সম্মেলনের ষষ্ঠ অধিবেশনে আনসার আহমেদ উল্লাহর প্রবন্ধে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া এবং তাতে সুশীল সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক হয়। এতে বক্তারা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সব দিক থেকে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করার আগে কাজ শুরু করা ঠিক হবে না। যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যা সংক্রান্ত বিচারের জন্য তদন্তকাজ করাটা অত্যন্ত কঠিন। অভিজ্ঞতা না থাকলে এতে সফল হওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশে যারা এ নিয়ে কাজ করবেন, তাদের প্রশিক্ষণ দরকার।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা আরও বলেন, আইনে সাক্ষী ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। এ সংক্রান্ত তথ্য জোগাড় করার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা দরকার বলে অনেকে মত দেন। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে যারা সহায়তা করতে চায়, তাদের জন্য কোনো কার্যালয় খোলা হয়নি। এ বিষয়ে কোনো কূটনৈতিক তৎপরতাও চালানো হয়নি। বিদেশি তথ্য পাওয়ার জন্য একটি স্থান থাকা দরকার বলে বিদেশি একজন বিশেষজ্ঞ মত দেন।

গোলটেবিল বৈঠকের সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, ‘বিচারের জন্য কি পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ আমাদের কাছে আছে? যখন জনগণ ও সরকার বুঝতে পারবে আমরা প্রস্তুত, তখন কাজ শুরু করা যাবে। জনগণ চায় তা যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়। তবে একে অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে।’

গোলটেবিল ও সমাপনী অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি আলী যাকের, মফিদুল হক, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান।

দু’দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষ হয় সম্মেলনের ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে। সর্বমোট ১৮টি প্রবন্ধের উপস্থাপনা ও গোলটেবিল বৈঠক শেষে গৃহীত ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি তারিক আলী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি তাদের দোসররা বাঙালিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাকে আজও গণহত্যা হিসেবে ঘোষণা দেয়নি জাতিসংঘ। সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে এই স্বীকৃতির প্রতি জোর দেয়া হয়।

যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সত্য, ন্যায়বিচার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই সম্মেলন একটি মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে বলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দৃঢ় বিশ্বাস। এই সম্মেলন বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা যারা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে, নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে যোগাযোগের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।