- ASK Bulletin 2009
   সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   মুক্তিযুদ্ধ
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   আন্তর্জাতিক
   তথ্যানুসন্ধান

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

প্রচ্ছদ-কাহিনী

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার

এটিএম মোরশেদ আলম

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার সেনা আইনে সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ বিডিআরের সদর দপ্তর পিলখানায় যে হত্যাকাণ্ড ঘটে তার বিচার কোন্‌ আইনে হবে- এর উত্তরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৯ এরূপ মত দেয়। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে গত কয়েক মাস যাবৎ বিভিন্ন মহলে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। কারো মতে, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সেনা আইনে হওয়া উচিত, কেউ কেউ বলছেন বিচার হওয়া উচিত বিডিআর আইনে। আবার কারো কারো মতে, হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া উচিত সাধারণ আইনে। এই অবস্থায় সরকার সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের কাছে পরামর্শ চাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান ১৭ আগস্ট বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার সেনা আইনে করা যাবে কিনা জানতে চেয়ে একটি রেফারেন্স সুপ্রিম কোর্টে পাঠান। ওই রেফারেন্সে জানতে চাওয়া হয়, সেনা আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে সেনা আইন প্রয়োগ করা যায় কিনা।

রেফারেন্স শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি ১৯ আগস্ট দশজন সিনিয়র আইনজীবীকে এমিকাস কিউরি (আদালতের সহায়তাকারী) হিসেবে নিয়োগ দেন। এঁরা হলেন- ড. কামাল হোসেন, টিএইচ খান, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ, মাহমুদুল ইসলাম, আজমালুল হোসেন কিউসি, এএফ হাসান আরিফ ও এএফএম মেসবাহ উদ্দিন। ২৫ আগস্ট রেফারেন্সের শুনানি শুরু হয় এবং ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এমিকাস কিউরিগণ তাদের মতামত উপস্থাপন করেন। এছাড়া সরকারের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহাবুবে আলম।

সরকারের বক্তব্য
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে রেফারেন্সটি উপস্থানের সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলেন, ‘সেনা আইনে কারা অন্তর্ভুক্ত হবে এবং সেনাবাহিনীর সদস্য না হলেও কাদের সেনা আইনের অধীনে আনা যায়- এটা সেনা আইনের বিভিন্ন ধারায় উল্লেখ রয়েছে।’ তিনি বলেন, যারা সেনাবাহিনীর সদস্য নন, তাদেরও প্রজ্ঞাপন দিয়ে সেনা আইনের আওতায় আনা যাবে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৩ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ঢাকায় দায়ের করা একটি মামলায় ১ হাজার ৭৭৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে দায়ের করা ৪০টি মামলায় ১ হাজার ৭২১ জন বিডিআর জওয়ানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তি এ ঘটনায় বিচারের আওতায় রয়েছে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এর মধ্যে বিডিআরের ২৬ জন সহকারী পরিচালক ও উপসহকারী পরিচালক রয়েছে। আরো রয়েছে ৯১ জন বিডিআরের বেসামরিক কর্মচারী এবং ২৬ বেসামরিক ব্যক্তি।

অ্যাটর্নি জেনারেল রেফারেন্সটি উপস্থাপনের পর এমিকাস কিউরিগণ শুনানিতে অংশ নেন। আলোচনার সুবিধার্থে এমিকাস কিউরিদের বক্তব্যকে এখানে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে, প্রথমত, সেনা আইনে বিচারের পক্ষে বক্তব্য; দ্বিতীয়ত, সেনা আইনের বিচারের বিপক্ষে বক্তব্য এবং সর্বশেষে অন্যান্য মতামত।

সেনা আইনে বিচারের পক্ষে বক্তব্য
দশজন এমিকাস কিউরির মধ্যে দু’জন (ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ) সেনা আইনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার সেনা আইনে করা সম্ভব।

এমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, কেবল আইন সম্পর্কে প্রশ্ন রেফারেন্স হতে পারে। অর্থাৎ সেনা আইন অথবা বিডিআর আইন সম্পর্কে প্রশ্ন থাকলে তা রেফারেন্স হতে পারত। কিন্তু এখানে সে প্রশ্নের মীমাংসার জন্য মতামত চাওয়া হয়নি। প্রশ্ন তোলা হয়েছে সেনা আইনে কীভাবে বিচার করা হবে- সে সম্পর্কে। মোটকথা, আইন সম্পর্কিত প্রশ্নে মতামত চাওয়ার পরিবর্তে ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে যা আদৌ সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনো রেফারেন্স না। এ রেফারেন্সের মাধ্যমে বিষয়টির ব্যাপারে সরকার সুপ্রিম কোর্টের সিল মারতে চাচ্ছে। আপিল বিভাগকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এ রেফারেন্সের মতামত দেয়া উচিত হবে কিনা।

বিভিন্ন সময় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পাঠানো বিভিন্ন রেফারেন্সের নজির তুলে ধরে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, রেফারেন্সের ওপর আপিল বিভাগ যে মতামত দেয়, তা কোনো আদালত মানতে বাধ্য নন। তবে ইদানীং প্রথা দাঁড়িয়েছে, এ মতামত নিম্ন আদালত মানতে বাধ্য থাকেন। হাইকোর্টও এ মতামত উপেক্ষা করেন না। সুতরাং রেফারেন্সে আপিল বিভাগ যে সিদ্ধান্ত দেবে তা ভবিষ্যতে ন্যায়বিচারের পথ বন্ধ করে দেবে কিনা তা বিবেচনায় আনতে হবে। কারণ, বিচার শেষে বিষয়টি যখন আবার উচ্চ আদালতে আপিল বা অন্য কোনো কারণে আসবে তখন উচ্চ আদালত রেফারেন্সে মীমাংসিত বিষয় শুনানি করতে বিব্রতবোধ করতে পারেন। এটাও দেখা উচিত।

সেনা আইনের ২(সি), বি(১), (৪), ৩১(ডি)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, সেনা আইনে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করা সম্ভব। বিডিআর আইনে বলা আছে, বিডিআর পরিচালিত হবে সেনাবাহিনীর কমান্ডের অধীনে। বিডিআর থেকে কোনো মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয় না, হয় সেনাবাহিনী থেকে। এ কারণে সেনা আইনে বিডিআর জওয়ানদের বিচার করা সম্ভব। তাছাড়া সেনা আইনের ৫ ধারায় প্রজ্ঞাপন জারি করে বিডিআরে কর্মরত সবার বিচার করা যায়।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আরও বলেন, সরকার নিউমার্কেট থানায় বিডিআরের ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করেছে। এ মামলা হয়েছে দণ্ডবিধি অনুযায়ী। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল কাহ্‌হার আকন্দ টিভি এবং পত্র পত্রিকায় বলেছেন, অক্টোবরে এ মামলার চার্জশিট দেয়া হবে। এ চার্জশিটও দেয়া হবে দণ্ডবিধি অনুযায়ী। তাই তিনটি আইনেই বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করা সম্ভব।

অপর এমিকাস কিউরি খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ বলেন, বিডিআর বিদ্রোহে অনেক অফিসার নিহত হয়েছে। কিন্তু বিডিআর আইন অনুযায়ী খুনের বিচার করা যায় না। এখানে সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর। তাই সেনা আইনের ৫ ধারায় প্রজ্ঞাপন দিয়ে বিডিআর বিদ্রোহের বিচার করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিডিআর আইন স্থগিত করতে হবে এবং সেনা আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন দিতে হবে। এভাবে প্রজ্ঞাপন দিয়ে সেনা আইনে বিচার করলে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ কোনো বাধা হবে না। তবে তিনি আরও বলেন, দণ্ডবিধিতেও বিডিআর বিদ্রোহের বিচার করা সম্ভব।

সেনা আইনে বিচারের বিপক্ষে বক্তব্য
দশজন এমিকাস কিউরির মধ্যে সাতজনই সেনা আইনে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করা সম্ভব নয় বলে মত দেন। তাঁরা হচ্ছেন- প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, টিএইচ খান, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, আজমালুল হোসেন কিউসি, এএফ হাসান আরিফ ও এএফএম মেসবাহ উদ্দিন।
প্রথম এমিকাস কিউরি হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন টিএইচ খান। তিনি বলেন, সেনা আইনে বিডিআর জওয়ানদের বিচার করা যায় না, কারণ বিডিআরের জন্য বিডিআর আইন রয়েছে। তাছাড়া বিডিআর সুশৃঙ্খল বাহিনীর আওতাতেও পড়ে না। তাই সুশৃঙ্খল বাহিনীর দোহাই দিয়ে সেনা আইনে বিচার করার প্রশ্নই ওঠে না। উল্লেখ্য, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে সুশৃঙ্খল বা শৃঙ্খলা বাহিনী সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘শৃঙ্খলা বাহিনী অর্থ, ক. স্থল, নৌ বা বিমান বাহিনী; খ. পুলিশ বাহিনী; গ. আইনের দ্বারা এই সংজ্ঞার অর্থের অন্তর্গত বলিয়া ঘোষিত যে কোনো বাহিনী।’ সংবিধান প্রণয়নের সময় বিডিআর বাহিনীর অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও এই বাহিনীকে সুশৃঙ্খল বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

টিএইচ খান প্রচলিত আইনে অথবা বিডিআর আইন সংশোধন করে বিদ্রোহী বিডিআরদের বিচার করার সুপারিশ জানান। টিএইচ খান আরও বলেন, প্রত্যেক বাহিনী তার নিজস্ব আইন দিয়ে চলে। সেনা আইন হলো সেনাবাহিনীর নিজস্ব আইন। এই আইনে সেনাবাহিনীর বিচার হয়। সুশৃঙ্খল বাহিনীর দোহাই দিয়ে বিডিআরের বিচার সেনা আইনে করা সম্ভব নয়। সেনা আইনে বলা আছে, কোন্‌ কোন্‌ অপরাধের জন্য এ আইনে বিচার করা যাবে। সেনাবাহিনীর বিচার কোর্ট মার্শালে হয়। কোর্ট মার্শাল হচ্ছে জুডিশিয়াল কিলিং। বিডিআরের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। বিডিআরের বিচার কোর্ট মার্শালে করা যায় না।

এমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ দেশ, জাতি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এ বিদ্রোহে সেনা অফিসাররা নিহত হয়েছেন, তাদের ছেলেমেয়ে, স্ত্রী অত্যাচারিত হয়েছেন। নিহত অফিসারদের ছেলেমেয়েরা তাদের বাবার হত্যার বিচার চায়, তারা বিদ্রোহের বিচার চায় না। তিনি বলেন, জিয়ার আমলে এক ডজন সেনা বিদ্রোহ হয়েছে। বিদ্রোহে রাষ্ট্রপতিকেও হত্যা করা হয়েছে। এ বিদ্রোহী সেনাদের সেনা আইনে বিচার করা হয়েছে। এসব বিচারে অনেককে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। বিদ্রোহের মূল কারণ উদঘাটন না করেই বিদ্রোহীদের বিচার করে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। কিন্তু যে কোনো বিচারের মূল লক্ষ্য হলো আসল সত্য বের করা। কিন্তু জিয়ার আমলে কোনো বিদ্রোহেরই সত্য উদ্ঘাটিত হয়নি। সত্য উদ্ঘাটিত না হলে সুষ্ঠু বিচার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ব্যারিস্টার আমীর বলেন, বিডিআর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। আর সেনাবাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন। বিডিআর বেসামরিক বাহিনী। লক্ষ্য ও প্রকৃতিগতভাবেই বিডিআর সেনাবাহিনী থেকে আলাদা। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের স্বপক্ষে উচ্চতর আদালতে আপিল মামলার বর্ণনা দিয়ে ব্যারিস্টার আমীর বলেন, সেনা আইনে তাদের বিচার হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আসা হয়েছিল। কিন্তু আদালত ওই সময় আপিল গ্রহণ করেননি। তাই সামরিক আদালতের বিচার হচ্ছে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের নামান্তর। তবে ব্যারিস্টার আমীর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্ভব বলে মত দেন।

এমিকাস কিউরি ড. কামাল হোসেন বলেন, রাষ্ট্র ও জনগণ বিডিআরের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। এ ঘটনায় পুরো রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা জাতি এ ঘটনার বিচার চায়। এটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সবার মতামত নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। ঘটনার তদন্ত করে কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বিচারের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারকে যেন প্রাধান্য না দেয়া হয়, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। যা করা হোক না কেন সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে হবে।

ড. কামাল হোসেন বলেন, বিডিআর আইনের আওতাধীন কোনো বিডিআর সদস্যকে সেনা আইনে নিয়ে বিচারের সুযোগ নেই, তেমনি পরবর্তী সময়ে আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়েও ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার করা সম্ভব না। সেনা আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করার বিপক্ষে বক্তব্য দিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, প্রজ্ঞাপন জারি করে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এই বিদ্রোহের ফলে যারা সরাসরি যুক্ত অথবা যারা এ ঘটনার সঙ্গে তেমনভাবে যুক্ত ছিল না- এ ঘটনা তদন্তের সময় এদের পৃথক করতে হবে। দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে। আর যারা নির্দোষ তারা যাতে শাস্তি না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এএফ হাসান আরিফ বিডিআরকে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী উল্লেখ করে বলেন, সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকার বিডিআরের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে তিনি সেনা আইনে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করা যায় না বলে মত দিয়ে বলেন, এক্ষেত্রে প্রধান বাধা হবে সেনা আইন নিজেই। তিনি বলেন, সেনা আইনের ৫ ধারায় প্রজ্ঞাপন জারির যে বিধান আছে, তা কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্য প্রযোজ্য নয়। এটা সামগ্রিকভাবে পুরো বাহিনীর জন্য হতে পারে। তাছাড়া প্রজ্ঞাপন জারি করে এই ধারা অনুযায়ী ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যায় না, দেয়া যায় ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএফএম মেসবাহউদ্দিন বলেন, সেনা আইনে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করা সম্ভব নয়। এমনকি প্রজ্ঞাপন জারি করেও বিচার করা যায় না। বিচার হতে হবে সংবিধান সৃষ্ট আদালতে। অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না। ন্যায়বিচার যাতে লঙ্ঘিত না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকার কোনোভাবেই খর্ব করা যাবে না। আদালতে সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং জেরার মাধ্যমে সত্য ঘটনা বের হয়ে আসবে। জেরাই হলো লিগ্যাল ইঞ্জিন। একে বাদ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, বিডিআর সুশৃঙ্খল বাহিনী, সুতরাং সেনা আইনের ৫ ধারা অনুসারে প্রজ্ঞাপন দিয়ে তাদের সেনা আইনের আওতায় আনা যায়। কিন্তু ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা যায় না। এই ঘটনা প্রজ্ঞাপন জারি করে বিচার করা সম্ভব নয়। তাই সেনা আইন অনুযায়ী বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করা সম্ভব নয়।

আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন, বিডিআরের জন্য সেনা আইন প্রযোজ্য নয়। কেননা বিডিআরের জন্য বিডিআর আইন আর সেনাবাহিনীর জন্য সেনা আইন রয়েছে। তাই বিডিআর জওয়ানদের সেনা আইনে বিচার করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সেনা আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করা যায় না। কারণ, কোনো শৃঙ্খলামূলক আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতাও দেয়া যায় না। দেয়া যায় ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে শৃঙ্খলামূলক আইন হলো সুশৃঙ্খল বাহিনীর শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী কোনো আইন। সেনা আইনও এরূপ শৃঙ্খলামূলক আইন।

আজমালুল হোসেন কিউসি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যায় না। বাংলাদেশ ২০০০ সালে ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ’ স্বাক্ষর করেছে। ওই সনদের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যাবে না। এই কনভেনশনের বিধান মানা বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক। তাছাড়া ‘প্রিন্সিপাল আব ন্যাচেরাল জাস্টিস’ অনুযায়ী, অপরাধের শিকার হওয়া কোনো পক্ষের হাতে বিচারের দায়িত্ব তুলে দেয়া যায় না। এখানে সেনাবাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন এবং বিচারের জন্য তাদের হাতে আসামিদের ছেড়ে দেয়া ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

অন্যান্য মতামত
একমাত্র এমিকাস কিউরি হিসেবে ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ রেফারেন্সটি ফেরত পাঠানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রতি সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে রেফারেন্সের জবাব দিলে তদন্তের হাত বেঁধে দেয়া হবে। অর্থাৎ নিরপেক্ষ তদন্তে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাই রাষ্ট্রপতির পাঠানো রেফারেন্সের উত্তর দেয়া উচিত হবে না। তবে তিনি সেনা আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করার বিপক্ষে অভিমত রাখেন। তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত চলছে এই আইন অনুসারেই। অনেক অভিযুক্তকে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। চার্জশিটও দেয়া হবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী। সেশন জজ এই চার্জশিট আমলে নিলেই বিচার করা সম্ভব। এ অবস্থায় সেনা আইনে বিচার করার প্রশ্নই আসে না। তিনি বলেন, সেনা আইন প্রয়োগ করে বিডিআর বিদ্রোহীদের বিচার করা যায় কিনা- এ প্রশ্ন অবাস্তব। রেফারেন্সটি অপরিণত অবস্থায় আনা হয়েছে।

ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন বলেন, সেনা আইনের ৯৪ ও ৯৫ ধারায় বলা আছে, পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর সোনাবাহিনীর কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি মনে করেন, এতে এমন কোনো উপাদান আছে যার বিচার সেনা আইনে হওয়া প্রয়োজন, সে ক্ষেত্রে তিনি মামলা সেনা আইনে স্থানান্তরের জন্য আদালতে আবেদন করবেন। আদালত আবেদনটি বিবেচনা করে সরাসরি মামলাটি সেনা আইনে স্থানান্তর করতে পারেন বা নিজে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সরকারের কাছে সিদ্ধান্তের জন্য পাঠাবেন। এ পর্যায়ে সরকার জাতীয় সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবে। অর্থাৎ এটা কোনো রেফারেন্সের বিষয় না। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে সরকার সেনা আইনকে বিবেচনায় এনে নিজেই উপলব্ধি করছে এই আইনে বিচার করা যায় না। রেফারেন্স পাঠিয়ে প্রকারান্তরে সেটা স্বীকারও করে নিয়েছে। এখন শুধু সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায়। কোনো প্রশ্নের সমাধান পাওয়ার উদ্দেশ্য এতে নিহিত আছে বলে মনে হয় না। এই রেফারেন্স একটি অনুমোদন নেয়ার প্রক্রিয়া মাত্র।

ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন বলেন, রেফারেন্স চাওয়া হয়েছে সেনা আইন অনুযায়ী বিচার করা যায় কিনা? রাষ্ট্রপতির জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল, সেনা আইনটি বিডিআরের জন্য প্রযোজ্য কিনা। রাষ্ট্রপতির মনে কী আছে জানি না, তবে রেফারেন্স চাওয়া হয়েছে একটি আইনকে মাথায় রেখে। রেফারেন্সে বলা হয়নি, আটক ৩ হাজার ৭শ’ বিডিআর সদস্য সেনাবাহিনীর হেফাজতে নাকি পুলিশের হেফাজতে আটক আছে? বিডিআর আইন অন্য বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, প্রজ্ঞাপন দিয়ে সেনা আইনে বিচার করা সম্ভব নয়। আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়াও সম্ভব নয়। তিনি বলেন, পাকিস্তান সরকার ১৯৭৩ সালে সুপ্রিম কোর্টে বাংলাদেশের স্বীকৃতি বিষয়ে একটা রেফারেন্স চেয়ে পাঠিয়েছিল। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ওই রেফারেন্সের জবাব দেয়নি। ভারতে বাবরি মসজিদ নিয়ে পাঠানো রেফারেন্সের কোনো জবাব দেয়া হয়নি। তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পাঠানো রেফারেন্সের কোনো জবাব দেয়া, তার মতে উচিত হবে না।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে আসক-এর বক্তব্য
এমিকাস কিউরিদের মধ্যে সাতজনই সেনা আইনে বিডিআরের বিচার সম্ভব নয় বলে সরাসরি মতামত দেন। অপর একজন রেফারেন্সটি ফেরত পাঠানোর মতামত দিলেও তিনি সেনা আইনে বিডিআরের বিচার সম্ভব নয় উল্লেখ করেন। বাকি দু’জন সেনা আইনে বিচার সম্ভব বলে মত দেন। তবে তারা প্রচলিত আইনেও বিচার সম্ভব বলে উল্লেখ করেন। প্রায় সব এমিকাস কিউরিই বিডিআর সুশৃঙ্খল বাহিনী কিনা- এ বিষয়ে তাদের মতামত দেন। অধিকাংশ এমিকাস কিউরির মতেই ১৫২ ধারার অধীনে বিডিআর সুশৃঙ্খল বাহিনী। কিন্তু বিডিআর সুশৃঙ্খল বাহিনী হলেও তাদের বিচার সেনা আইনে করা সম্ভব নয়। কারণ, ৫ ধারা অনুসারে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে তার ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যায় না। সেনা আইনে বিচারের ক্ষেত্রে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) আরো কিছু বাস্তব অসুবিধা তুলে ধরেছে যা প্রাসঙ্গিতভাবে নিচে আলোচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রচলিত ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা অনুসারে, যখন কতিপয় ব্যক্তি একই উদ্দেশ্যে কোনো অপরাধ করে তখন ঐ অপরাধের দায় সব ব্যক্তির ওপর সমানভাবে অর্পিত হয়। তবে অপরাধের মাত্রা অনুসারে একেক ব্যক্তির শাস্তি একেক রকম হতে পারে। ধরা যাক, কয়েকজন ব্যক্তি মিলে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এক্ষেত্রে সরাসরি যে ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত তার শাস্তির মাত্রা বেশি হবে এবং যে ব্যক্তি পরোক্ষভাবে হত্যার সাথে যুক্ত তার শাস্তির মাত্রা কম হবে। কিন্তু সব ব্যক্তিই যৌথভাবে ঐ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী হবে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এখানে অভিযুক্ত সবাই একই অপরাধের জন্য দায়ী। অপরাধের মাত্রা অনুসারে সবার শাস্তি এক হবে না। কিন্তু কার অপরাধের মাত্রা কতখানি তা নির্ধারিত হবে আদালতে বিচারের সময় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। সুতরাং আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অভিযুক্তদের আলাদা করে কারো কারো বিচার সেনা আইনে করার কোনো অবকাশ নেই।

যে কোনো বিচার প্রক্রিয়ার দুটি অংশ থাকে। একটা হলো বিচারপূর্ব এবং আরেকটি হলো বিচারকালীন প্রক্রিয়া। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার অভিযোগ দায়ের করা, তদন্ত করা এবং সেই তদন্তের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগপত্র তৈরি করা- এসব হলো বিচারপূর্ব প্রক্রিয়ার অংশ। কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে চায় তাহলে তার জবানবন্দি গ্রহণ করাও বিচারপূর্ব প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে। এরপর অভিযোগপত্রের ওপর ভিত্তি করে বিচারকালীন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই অংশে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করা হয় এবং সেগুলো বিচার-বিবেচনা করে রায় দেয়া হয়। মামলার রায়ে কোনো ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হলে তখনই সে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়। রায় ঘোষিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী বলা যায় না এবং সেজন্যই তাকে অভিযুক্ত হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বিচার শুরু হওয়ার পূর্বেই কোনো কোনো ব্যক্তিকে বড় ধরনের অপরাধী আবার কোনো কোনো ব্যক্তিকে সাধারণ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। শুধু তদন্তের ওপর ভিত্তি করে অপরাধের মাত্রা নির্ণয় করা যায় না, অপরাধের মাত্রা নিরূপিত হয় সমগ্র বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর। বিচার শেষ হওয়ার আগে অপরাধীদের এমন বিভাজন একদিকে যেমন প্রচলিত আইনি পদ্ধতির স্পষ্ট লঙ্ঘন, তেমনি অন্যদিকে তা সংবিধানের ‘আইনের চোখে সমতা’ বিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অনেক বিডিআর সদস্য ইতোমধ্যে অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। আসক-এর নিজস্ব অনুসন্ধান, আটক বিডিআর সদস্যদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা বলে এবং পত্রিকার বিভিন্ন খবর থেকে জানা যায়, অনেক বিডিআর সদস্যকে আটক করার পর সংবিধানের বিধান অনুসারে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি বরং গ্রেফতার দেখানো হয়েছে অনেক পরে। আটক এবং গ্রেফতার দেখানো সময়ের মধ্যে যে ফারাক সেই সময়েও অনেকের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। এভাবে গৃহীত জবানবন্দি আইন অনুসারে সাক্ষ্য হিসাবে গৃহীত হবে না এবং পরবর্তীকালে এসব জবানবন্দি প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। তাছাড়া মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধু জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে কোনো অভিযুক্তকে শাস্তি দেয়া যায় না। আদালতে বিচারকালীন সময়ে ঐ জবানবন্দি প্রচলিত আইনের বিধান অনুসারে সঠিক পদ্ধতিতে নেয়া হয়েছিল কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা হয়। এরপর জবানবন্দি প্রদানকারী ঐ জবানবন্দি সমর্থন করেন কিনা সেটা জিজ্ঞাসা করা হয়। তাছাড়া একই ঘটনায় অভিযুক্ত একাধিক ব্যক্তি জবানবন্দি প্রদান করলে সাক্ষ্য আইনের বিধান অনুসারে একজনের জবানবন্দি অন্যজনের জবানবন্দিকে সমর্থন করে কিনা সেটাও পরীক্ষা করে দেখা হয়। এসবের পরেই সেই জবানবন্দিকে আমলে নেয়া যায়। কিন্তু সেনা আইনে জবানবন্দিকে পরীক্ষা করার এসব আইনি বিধানও মান্য করা হয় না। ফলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হওয়ার একটা আশঙ্কা থেকেই যায়। যদি কারো জবানবন্দি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নেয়া হয়, প্রচলিত আদালতে তা প্রমাণ করার সুযোগ আছে, কিন্তু সেনা আইনে বাস্তবিক অর্থে তা নেই।

ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেনস্‌ রিয়া (মানসিক সায়) এবং মোটিভ (উদ্দেশ্য)। তদন্তকালে পুলিশ হয়তো কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছে কিনা- সেটা বের করতে পারবে; কিন্তু মেনস্‌ রিয়া ও মোটিভ তদন্তকালে কখনো বের হয়ে আসে না, এটা বের হয় আদালতে। কোনো ব্যক্তি হয়তো হত্যা করেছে কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড স্ব-ইচ্ছায় করেছে নাকি অন্য কেউ তাকে দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড করিয়েছে তার ওপর শাস্তির মাত্রা অনেকাংশে নির্ভরশীল। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সময় এসব বিষয় পরিষ্কার হয়। কিন্তু সেনা আইনে বিচার হলে সেই সুযোগ থাকবে না। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন জড়িত থাকলে সেটা অজানাই থেকে যাবে। এমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামও সেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

কোন্‌ আইনে বিচার হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে লাতিন দুটি প্রবাদের দিকেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। প্রবাদ দুটি হলো, 'Justice delayed, justice denied' এবং 'Justice hurried, justice buried' অর্থাৎ বিচার বিলম্ব হওয়ার অর্থ হলো ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হওয়া। আবার অতিদ্রুত বিচার করার অর্থ হলো ন্যায়বিচারকে কবর দেয়া। সুতরাং এই দুটি বিষয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য বিধান করতে হবে। শুধু দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জন্য যেমন সেনা আইনকে বেছে নেয়া উচিত হবে না, তেমনি এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে বিচার বিলম্বিত না হয়।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেনাবাহিনী। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে কখনও বিচারের দায়িত্ব দেয়া যায় না। যদি দেয়া হয় তাহলে নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা যেমন সবসময়ই থাকে, তেমনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করারও নিশ্চয়তা দেয়া যায় না।

এছাড়া সেনা আইনে বিচার করা হলে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করারও কোনো সুযোগ নেই। সেনা আইনের ১৩৩ ধারায় এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, কোর্ট মার্শালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে না। সেনা আইনের এই বিধান সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।

হেফাজতে বিডিআর সদস্যদের মৃত্যু অব্যাহত
আটক বা গ্রেফতারকৃত বিডিআর সদস্যরা কার হেফাজতে আছে- পুলিশ নাকি সেনাবাহিনীর? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার হয়নি। এমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ রেফারেন্স শুনানির সময় বিষয়টি উল্লেখও করেন। যার হেফাজতেই রাখা হোক, হেফাজতে থাকাকালে বিডিআর সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনা এখনো অব্যাহত আছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪-এ। অথচ এই মৃত্যুগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে যেমন বিচারহীন অবস্থায় থাকতে দেয়া যায় না, তেমনি হেফাজতে থাকাকালীন এসব মৃত্যুকেও কোনোভাবে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। এসব মৃত্যুরও সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।