সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   মুক্তিযুদ্ধ
   আইন-আদালত
   মত-অভিমত
   আন্তর্জাতিক
   তথ্যানুসন্ধান

 

যোগাযোগ

সম্পাদক, বুলেটিন
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৭/১৭ ব্লক-বি, লালমাটিয়া
ঢাকা-১২০৭
ইমেইল-
ask@citechco.net,
publication@askbd.org

   
   
   
   

... .      
           

তথ্যানুসন্ধান

বিচারের নামে গাছে ঝুলিয়ে পেটানো
ইউপি চেয়ারম্যানের বর্বরতার শিকার তাবারক

শাহ আলম ফারুক

‘হাত বেঁধে আমাকে আধা কিলোমিটার দূরে বালিকা বিদ্যালয়ে নিয়ে আসে। ও সময় ওখানে প্রায় ৭-৮শ’ লোক ছিল। বিচার শুরু করা হবে বলে সাদা কাগজে আমার একটা এবং আরো ৫-৬ জনের সই নিল। একজনকে চেয়ারম্যান জিজ্ঞাসা করলো, কী সন্দেহ। সে বলে, আমার উনার ওপর সন্দেহ আমার জিনিসটা ইনি সরিয়েছেন। তখন চেয়ারম্যান বলে, আমার একশ’ ভাগ সন্দেহ ইনি সব জানেন ইনি সব সরিয়েছেন। এর বাইরে যে বলবে বা এর পক্ষে যে বলবে আমি জানি তিনি এর সাথে জড়িত আছেন। সবাই চুপ হয়ে থাকলো। এনাকে মারলেই সব বাইর হয়ে যাবে। তারপর নজরুল মেম্বার প্রথমে ২০-২৫ বাড়ি মারে। তারপর চেয়ারম্যান লালু মারতে শুরু করে। ও সময় আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। চেয়ারম্যান মারার আগে আমাকে গাছে ঝুলিয়ে দেয়। চারজন চৌকিদার ওপর দিকে তুলে ধরে। গাছের সাথে বাঁধে। প্রায় হাতখানেক উপরে পা মাটি থেকে ওঠে। তারপর চেয়ারম্যান মারতে থাকলে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। একটু জ্ঞান ফিরতেই দেখি নজরুল মেম্বার আবার মারছে। ওসময় আমি পানি খেতে চাইলে নজরুল মেম্বার বলে, পানি খেতে দেয়া যাবে না। একবারে ওপরে যাইয়া পানি খাইস। নজরুল ফের মারতেই থাকে। সাড়ে দশটা থেকে আনুমানিক ঘণ্টা তিনেক এরকম মারধর করে। মাঝে মাঝে নিচে নামায়, লাথি মারে। বুকের ওপর বসে নজরুল মেম্বার, পায়ের তলায়ও বাড়ি মারে। ওসময় তারা তাদের পূর্বনির্ধারিত ফারুক নামের এক ছেলের দেয়া তথ্য আমাকে দিয়ে জোরপূর্বক বলিয়ে নেয়। তারপর বৃষ্টি আসলে স্কুলের অফিস ঘরে নিয়ে যায়। চেয়ারম্যান জনগণকে বললো, আজকের মতো বিচার শেষ। পরে আবার হলে ডাকবো।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর থানার বোয়ালিয়া গ্রামের সাবেক মেম্বার মোঃ আবদুল কাইউম আলীর পুত্র মোঃ তাবারক হোসেন (৩৫) মানবাধিকার কর্মীদের কাছে তার নির্যাতনের বিষয়ে বর্ণনা দিচ্ছিলেন। দৈনিক যুগান্তর ১৪ জুলাই ২০০৯-এ প্রকাশিত ‘আওয়ামী লীগ নেতা লালু চেয়ারম্যানের বর্বরতার শিকার তাবারক’ শীর্ষক সংবাদের প্রেক্ষিতে আসকের দুই সদস্যের একটি তথ্যানুসন্ধান দল ২১ জুলাই ২০০৯ ঘটনাস্থলে গেলে তাবারক হোসেন আরো জানান- একটা চুরি সংক্রান্ত ব্যাপারে চেয়ারম্যান তাকে সন্দেহ করে। চেয়ারম্যান দশজন নিয়ে বসবে বলে নিজেই একটা ডেট দেয় সোমবারে। পরে ডেট দেয় বুধবারে অর্থাৎ জুলাই মাসের ৮ তারিখ। তাবারক বলেন- আমি চেয়েছিলাম তাদের তো অনেক লোকজন, আমিও আমার পক্ষের কিছু লোক রাখি। বিশেষত চাঁপাইয়ের সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যানকে আমি আমার পক্ষে রাখার জন্য চিন্তা করছিলাম। উনি ৫ জুলাই একটা প্রোগ্রামে ঢাকায় যান এবং ৯ জুলাই ঢাকা থেকে ফিরবেন বলে আমাকে জানালে আমি সে অনুযায়ী ১১ জুলাই বা এরপর বসার তারিখ করতে চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানাই। সে বলে, দিন দেয়া যাবে না। পরে ৮ জুলাই সে ঘোষণা দেয়, ‘তাকে যেখানে পাও ধরে নিয়ে আসো। ধরে নিয়ে এসে বিচার করবো।’
তাবারক জানান, ১০ জুলাই বিকেল সাড়ে ৪টা বা ৫টার দিকে রহনপুরের ভাগলপুর গ্রামে টিপু নামের এক বন্ধুর বাড়িতে তার অবস্থানের খবর পেয়ে বোয়ালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান লালু রহনপুরের দুই সন্ত্রাসীসহ টিপুর বাড়িতে আসে। ওখান থেকে বোয়ালিয়া ইউপি অফিসে এনে তাকে একটি ঘরে ভরে তালা মেরে দেয়। রাত যখন ১২ সাড়ে ১২টার দিকে তাবারককে উদ্ধার করতে থানা থেকে পুলিশ আসে। খবর পেয়ে চেয়ারম্যান ইউপি অফিসে এসে পুলিশদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুল আমিন বর্তমান চেয়ারম্যানকে বলে, পুলিশের হাড়গোড় ভেঙে দে। নজরুলের (দারোগা) ঘাড় ধরে বের করে দে। নইলে এখানে রক্তপাত হবে, আরেকটা কানসাট হবে। ও সময় ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের আশপাশে চেয়ারম্যানের অনেক লোকজন ছিল। চেয়ারম্যানের লোকেরা পুলিশের গাড়ির ওপর ইটপাটকেল মারে। মিছিল করে। এক পর্যায়ে পুলিশ সেখান থেকে চলে আসে। সকালে হাত বেঁধে আমাকে আধা কিলোমিটার দূরে বালিকা বিদ্যালয়ে নিয়ে আসে। পরে সেখানে সালিশের নামে চলে গাছে ঝুলিয়ে বর্বর নির্যাতন।
ঘটনার কারণ সম্পর্কে তাবারক বলেন- আমার ভগ্নিপতি নৌবাহিনীতে চাকরি করে। উনার ছোট ভাইয়ের ব্যাপারে একটি পারিবারিক সালিশ ছিল। ঐ সালিশের অনিয়মের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে চেয়ারম্যান ওকে অপমান করে এবং ওর বিরুদ্ধে একটা মিথ্যা মামলা করে। পরে আমার ভগ্নিপতি চট্টগ্রাম থেকে ছুটি নিয়ে রাজশাহীতে এসে র‌্যাবের কর্মকর্তা মেজর মোহাম্মদকে জানালে তিনি তদন্ত করতে র‌্যাব পাঠান। র‌্যাব তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে মোস্তফা মেম্বার ও লালু চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে নানা কথা বলে। এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ঘটনা। এ নিয়ে লালু চেয়ারম্যানের একটা ক্ষোভ ছিল আমাদের ওপর।
আসক তদন্ত টিম আসছে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল বোয়ালিয়া গার্লস স্কুল মাঠে চেয়ারম্যান প্রায় পাঁচ-ছয় শত লোক জমায়েত করেন। এ জমায়েতের মধ্যেই বক্তৃতার মতো করে ঘটনা প্রসঙ্গে বোয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান লালু জানান- ১১ জুলাই ২০০৯ সকাল ১০-১১টায় সালিশ শুরু হয়। সালিশে উপস্থিত লোকজনকে শান্ত করে এবং তাবারকের কাছ থেকে কথা আদায় করার জন্য গাছের ডাল দিয়ে আমি তার শরীরে ৪-৫টি আঘাত করি। কিন্তু উত্তেজিত কিছু লোক দড়ি এনে তার (তাবারকের) হাত পেছন দিকে বেঁধে গাছে ঝোলানোর চেষ্টা করে এবং তখনই তাবারক ছয়টি শ্যালো মেশিনের বিষয়ে মুখ খোলে। তিনি তাবারককে গাছে ঝোলানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন।
তাবারকের ছোট ভাই মোঃ তালেবুল ইসলাম বলেন- সালিশের ঘটনার পরে গত ১৭.৭.০৯ গোমস্তাপুর থানার ওসির ফোনের পর ফোনের কারণে আমি এবং আমার বাবা থানায় যাই এবং আমার ভাইয়ের ওপর অত্যাচারের বিষয়ে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করি। অভিযোগপত্রে আমরা আসামির নাম উল্লেখ করতে চাইলে ওসি আমাদের আসামির নাম উল্লেখ ব্যতিরেকে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করতে বলেন। পরে ওসির চাপের মুখে স্বাক্ষর দিয়ে আমার বাবা ফিরে আসেন। গোমস্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবর হোসেন জানান- তাবারকের বিরুদ্ধে চুরি বা এ ধরনের কোনো মামলা তাদের থানায় নেই। প্রসঙ্গত তিনি জানান, তাবারকের বাবার মামলা দায়েরের পর থানায় চেয়ারম্যানের পক্ষের লোকেরা শ্যালো মেশিন চুরির অভিযোগ এনে পরদিন আর একটি মামলা করেন। ঐ মামলায় তাবারকসহ আরো দু’জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

পর্যবেক্ষণ
তাবারককে ধরার পর এসপির নির্দেশে স্থানীয় থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এসপির নির্দেশে উদ্যোগী হয়ে উঠলেও ঘটনার আগে-পরে স্থানীয় থানা পুলিশের যে ভূমিকা, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তাবারকের বাবা ঘটনার ব্যাপারে দায়েরকৃত এজাহারে তার ছেলেকে সালিশের নামে প্রকাশ্য নির্যাতনের সাথে সংশ্লিষ্টদের নাম উল্লেখ করতে চাইলেও গোমস্তাপুর থানার ওসি অভিযুক্তদের নাম বাদ দিতে চাপ সৃষ্টি করেন। তাবারকের বিরুদ্ধে প্রবল জনমতের ধোঁয়া তুলে পুলিশ প্রশাসন আসামিদের সুরে একইভাবে বলছেন তাবারককে উদ্ধার বা এ ব্যাপারে অন্য কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে আরেকটি কানসাট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। পরবর্তীকালে এডিশনাল ডিআইজি ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে গেলে চেয়ারম্যান তার পক্ষীয় লোকজন সমবেত করে তাদেরকে তাবারকের বাবার (স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা) সাথে কথা বলতে বাধা দেন। আসক তথ্যানুসন্ধানকারীদের সাথে কথা বলার সময়ও প্রায় ৫-৬শ’ মানুষ একত্র করে চেয়ারম্যান বলতে চেয়েছেন, তিনি যা করেছেন তা জনমতের চাপে করেছেন। একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। উপরন্তু তথ্যানুসন্ধানের সময় উল্টো চেয়ারম্যানের অতি উদ্যোগী ভূমিকার ব্যাপারেই তথ্য পাওয়া যায়।
ঘটনার প্রায় দু’মাস পর এখনো অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ দলীয় ইউপি চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান লালুসহ তার সহযোগীদের বিরদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পারিনি।