সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়ন

শীপা হাফিজা

আজ ১৪ মে। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে সার্বজনীন পুনর্বীক্ষণ পদ্ধতি বা ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউয়ের (ইউপিআর) আওতায় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচিত হতে যাচ্ছে। প্রতি সাড়ে চার বছর পরপর মানবাধিকার পরিষদ এ পর্যালোচনা করে থাকে। আলোচনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল দেশের বিদ্যমান মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপ এবং ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পর্যায়ের ইউপিআরের আওতায় প্রদত্ত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরবে, যার ভিত্তিতে অন্য রাষ্ট্রগুলো তাদের মতামত, প্রশ্ন ও সুপারিশ প্রদান করবে। প্রদত্ত সুপারিশগুলো বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার প্রদান করতে পারবে, আর যদি কোনো বিশেষ সুপারিশ গ্রহণ করতে প্রস্তুত না থাকে, তবে সে বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য বা অবস্থান তুলে ধরবে।

তৃতীয় পর্যায়ের এই পর্যালোচনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে সর্বমোট ২৯টি স্টেকহোল্ডার প্রতিবেদন মানবাধিকার পরিষদে জমা দেওয়া হয়েছে।

গত দুই পর্যায়ের মতো এবারও ফোরাম নিজস্ব ও অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে প্রতিবেদন প্রদান করেছে, যেখানে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে পরিস্থিতি উন্নয়নে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে।

এবারকার মূল অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ ১৪ মে। বিদ্যমান মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বোঝা যায়, এবারকার অধিবেশনে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে তা হচ্ছে- রোহিঙ্গা ইস্যু, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচারবহিভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গুম, সভা ও সমাবেশ করার অধিকার, বিচার বিভাগ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা, বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান বিলুপ্তি ও দ্রুততার সঙ্গে বিধিমালা অনুমোদন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ইত্যাদি। এ মূল অধিবেশনের আগেই যারা এই প্রক্রিয়ার আওতায় প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, তারা জেনেভায় উপস্থিত হয়ে সেখানে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সভা করে তাদের ইস্যুগুলো তুলে ধরবেন এবং তারা কী ধরনের সুপারিশ বাংলাদেশকে করতে পারেন, সে সম্পর্কে অবহিত করবেন। এবারকার অধিবেশনের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারকে গত অধিবেশনে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল এবং সরকার যেগুলো গ্রহণ করেছিল, সেগুলোর অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে সে বিষয়ে অন্যান্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন উত্থাপন করবেন। এই অধিবেশনের সার্বিক আলোচনার ভিত্তিতে আগামী ১৭ মে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হবে মানবাধিকার পরিষদে।

ফোরাম অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার রক্ষায় সুপারিশ করেছে- স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন অংশীদারদের সমন্বয়ে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো বিচার-বিশ্নেষণ করে জরুরি ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ১৩ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করে অতিদ্রুত একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা এবং নাগরিকদের বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে ভূমিদস্যুদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যাবর্তন সম্পর্কিত মামলাগুলো দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করা। অন্যদিকে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় যেসব সুপারিশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো- গুম বা বলপূর্বক অন্তর্ধানকে আইনগতভাবে চিহ্নিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রাসঙ্গিক আইনগুলো সংস্কার করা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন কমিশন স্থাপন করা এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু প্রতিরোধ আইন ২০১৩-এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ আইনে কোনো ধরনের পরিবর্তন না আনা এবং এ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইনের দমনমূলক ও নিয়ন্ত্রণমূলক সব ধারা বাতিল করা। সংশ্নিষ্ট উন্নয়ন সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে দ্রুত এ আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করা। নাগরিকের মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০১৩-এর ৫৭ ধারা সম্পূর্ণরূপে বাতিল এবং এ ধরনের ধারা সংবলিত যে কোনো আইন প্রণয়ন থেকে বিরত থাকা। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণভাবে পৃথক করা এবং বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের প্রভাবমুক্ত রাখা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনকে শক্তিশালী করে তোলার লক্ষ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা ও পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভিত্তি আইন ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে বিদ্যমান অস্পষ্টতা দূর করা।

পরিস্থিতি বিবেচনায় এবারকার অধিবেশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার আছে, তারা তাদের অঙ্গীকার পূরণে যথেষ্ট সময় পেয়েছে। সে ক্ষেত্রে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে তাদের অঙ্গীকার পূরণে তারা কতটুকু সফল হয়েছেন, তা মূল্যায়ন করা হবে; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে রয়েছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ অর্জনের জন্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় যেসব মৌলিক দিকের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে, তার মধ্যে সামাজিক ন্যায়বিচার অন্যতম। এ জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া বাংলাদেশের এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। উন্নয়নের এ ধারায় সরকার কীভাবে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত করছে, অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো সরকারের কাছে তা জানতে আগ্রহী হবে; তৃতীয়ত, জঙ্গিবাদ দমন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া, অর্থনৈতিক উন্নয়ন- বাংলাদেশ সরকার এসব ক্ষেত্রের সাফল্যের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করতে পারে। ফলে অন্য মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো সেভাবে উঠে নাও আসতে পারে; চতুর্থত, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সরকার হয়তোবা এবারের অধিবেশনে সামনে নির্বাচন বিধায় অনেক সুপারিশের ক্ষেত্রে নিজেদের সুস্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরবে না, যা এ প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে আমাদের ধারণা। আমরা সরকারের কাছে দাবি রাখব, যাতে করে সরকার প্রাপ্ত সুপারিশের বিপরীতে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রদান করে এবং আগামী নির্বাচনে যে নতুন সরকার গঠিত হবে তারা সুপারিশ বাস্তবায়নে আন্তরিক হবে।

আহ্বায়ক, হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি), ২০টি মানবাধিকার সংস্থার জোট

সমকাল লিংক