গণপরিবহনে নারীর ভোগান্তির শেষ কোথায়

ওয়াজিহা তাসনিম

কবিতা আক্তার একজন এনজিও কর্মী; রাজধানীর গুলিস্তান থেকে গাজীপুরে যাচ্ছিলেন। হঠাত্ তার শরীরের পেছনের অংশে কোনো কিছুর খোঁচা অনুভব করেন। খেয়াল করে দেখেন, পেছনের পুরুষ সহযাত্রী পা দিয়ে তার শরীরে ধাক্কা দিচ্ছেন। কবিতা প্রতিবাদ করলে সেই সহযাত্রী বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কী হয়েছে জানি না।’

এমনটা শুধু কবিতার ক্ষেত্রে নয়, রাজধানীতে গণপরিবহনে চলাচল করেন এমন নারী যাত্রীদের কম-বেশি এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ইয়াসমিন রহমান মতিঝিলের একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। থাকেন পল্লবীতে। রোজ তাকে কমপক্ষে চার ঘণ্টা যানজট পেরিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়। ইয়াসমিন রহমান বলেন, ‘এ ভোগান্তির সঙ্গে সঙ্গে সব সময় চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই নানাভাবে নিপীড়িত হতে হয়।’ নতুন ভোগান্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে চালক এবং সহকারীর প্রকাশ্যে ধূমপান। কোনো নারী প্রতিবাদ করলে তাঁকে বাস থেকে নেমে যেতে বলা হয়। এমনকি গাড়িতে বসে এখন তাদের মাদক নিতেও দেখা যায়। বাংলা কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মাস্টার্সের ছাত্রী, তিনি মিরপুর ১০ নম্বর থেকে রোজ যাতায়াত করেন। একদিন তিনি যাত্রাপথে বাসের সহকারীকে গাঁজা বানাতে দেখেন। এ নিয়ে তিনি প্রশ্ন করলে চালক ও সহকারী তাকে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘আপনি ছাত্রী হইয়া গাঁজা চেনেন ক্যামনে?’ এ সময় বাসের পুরুষ সহযাত্রীরা চুপ ছিলেন বলে এই শিক্ষার্থী জানান।

গণপরিবহনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৯টি আসন রয়েছে। ১০টি বাস ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো বাসে ৪টি বা ৫টি আসন নারীদের জন্য রাখা হয়েছে। কোনো বাসে আবার সেই আসনে পুরুষ বসে আছেন। নারী যাত্রী উঠলে তাদের সিট ছেড়ে দিতে বললেও ঝামেলার সৃষ্টি হয়।

নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে পুরুষ যাত্রী বসলে বা বসতে দিলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান যুক্ত করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৭-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। জানা গেছে, আইন কমিশন থেকে বিধানটি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তখন যাত্রী কল্যাণ সমিতির তত্কালীন মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছিলেন, নারী-শিশু-অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষদের জন্য বাসে অবশ্যই পৃথক ব্যবস্থা রেখে আইনটি পাস করা উচিত।

কর্মজীবী নারীদের জন্য রাজধানীর ৮টি রুটে শুক্র ও শনিবার ছাড়া প্রতিদিন বিআরটিসির ১৫টি বাস চলাচল করে। একটি বাদে সবকটির গন্তব্যই মতিঝিল। বাসগুলো সকাল ৭টার দিকে ছাড়ে, ফেরে বিকেল ৫টার দিকে।

অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের ‘নারী সংবেদনশীল নগর-পরিকল্পনা’ শীর্ষক একটি জরিপের তথ্য বলছে, গণপরিবহনে চলাচলকারী ৮৬ শতাংশ নারী যানজট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। পরিবহন ব্যবস্থা ভালো না থাকায় ৫৬ শতাংশ নারী বাইরে যেতে চান না বলে জানান। আবার, ২৩ শতাংশ নারী বলেছেন, বাসের চালক বা সহকারীরা তাদের সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেছেন। ২০১৬ সালে নগরের বিভিন্ন বয়সী ও পেশার ২০০ জন নারীর মধ্যে জরিপটি চালানো হয়।

রাজধানীতে গণপরিবহনে চলাচল করেন এমন বেশ কিছু নারীর সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, রোজ যুদ্ধ করে বাসে চলাচল করতে হয়। সম্প্রতি বাসে গেটলক সার্ভিস চালু করায় তাদের বাসে তুলতেই চায় না। তুললেও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় চালকের সহকারীরা টেনেহিঁচড়ে তোলেন। তারপরও নারীদের আসনগুলো থাকে উত্তপ্ত ইঞ্জিনের পাশে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য গণপরিবহনে বিশেষ ব্যবস্থা রাখারও দাবি জানান অনেকে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি ঢাকা শহরে বাসচালক ও তাঁদের সহযোগীদের নিয়ে একটি জরিপ চালাচ্ছে। তাতে দেখা যায়, ৮৬ শতাংশ চালক এবং তাঁর সহযোগী মাদকের সঙ্গে জড়িত। জরিপটিতে ১ হাজার ৩০টি বাসের চালক ও এর সহকারীদের পর্যবেক্ষণ করা হয়।

গণপরিবহনে যাতায়াত করাটা নারীদের জন্য যে আর নিরাপদ নয়, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংগঠনের পরিসংখ্যানেও বিষয়টি স্পষ্ট। ২০১৭ সালের যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ মাসে গণপরিবহনে ২১ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের মার্চে করা ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির আলোকে নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক শীর্ষক এক গবেষণায় করা এক জরিপে দেখা যায়, দেশে গণপরিবহনগুলোতে ৯৪ ভাগ নারী নিপীড়নের শিকার হন। নিপীড়িতদের অধিকাংশই প্রতিবাদ করেন না আরো হয়রানি হওয়ার ভয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপরিবহনে নারীর সুরক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে নিচে।

দেশে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণা বেড়েছে। তাদের প্রতিদিন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কর্মস্থলে যেতে হয়। এছাড়া সংসারের নানা ধরনের প্রয়োজনে নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে হয়। তাদের অনেকের যাতায়াতের জন্য গণপরিবহনই ভরসা। অথচ গণপরিবহনে যাতায়াত করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত হেনস্তা ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পুরুষ যাত্রীরা তো আছেনই, পাশাপাশি চালক ও সহকারীরাও এ ধরনের অপকর্মে অংশ নিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে কোনো তরুণী বাসে একা হলেই তিনি ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। আমরা রূপার বেলায়ও তা-ই দেখেছি। এ রকম চলতে থাকলে এ দেশের নারীরা গণপরিবহনে কীভাবে যাতায়াত করবেন?

রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চারজনকে ফাঁসির আদেশ ও একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই রায়ের মধ্য দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলেও তা গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করবে এমন কথা হলফ করে বলা যায় না। গণপরিবহনে নারীরা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারেন, সে জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। দেখা যায়, গণপরিবহনে কোনো নারী যৌন হয়রানির শিকার হলেও তিনি কোথায় অভিযোগ করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। অভিযোগ জানানোর বিষয়টি সহজ করতে হবে। এ জন্য নিয়মিত মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু করা যেতে পারে। রুট অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালতের ফোন নম্বর গণপরিবহনের প্রকাশ্য স্থানে লিখে রাখা যেতে পারে।

তবে এ ব্যাপারে সরকারের তরফে করণীয় ঠিক করা জরুরি। গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

ইত্তেফাক লিংক