যে উন্নয়ন মুক্তির নয়: আবাসন সংকট বিষয়ে

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার গতি এবং উন্নয়নের ধারণা প্রায়শই ব্যক্তি জীবনের পরিস্ফুটনের সাথে দ্বন্দ্বে অবস্থান নেয়। শ্রম বিভাগের এই সময়ে, নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছ থেকে রাষ্ট্র বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেবা সস্তায় আদায় করে নেয়; অথচ সেই সকল মানুষদের জীবনধারণের ন্যূনতম চাহিদাগুলো মেটানোর ক্ষেত্রে প্রায়শই থেকে যায় উদাসীন। উন্নয়নের সাথে সাথে জীবনধারণের ব্যয় বৃদ্ধি পায় আর নিম্ন আয়ের মানুষেরা হয়ে পড়েন আরো নিরুপায়। এই সমস্যার চরমতম উদাহরণ সম্ভবত হংকং। অর্থনীতির হিসাবে দেশটির সক্ষমতা ঈর্ষণীয়। অথচ দেশটিতে জীবনধারণের ব্যয় এতো বৃদ্ধি পেয়েছে যে, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা যেন হয়ে উঠেছে এক অন্তহীন লড়াই।

বৈশ্বিক মুক্ত অর্থনীতির সূচকে হংকং রয়েছে সবার উপরে। স্বল্প করের নীতি এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি হংকংয়ের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কিন্তু এই লাগামহীন অর্থ ব্যবস্থা হংকংয়ের আবাসন খাতকে নিয়ে গিয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। হংকং তাই লম্বা সময় ধরে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর একটি। দেশটিতে আবাসন খরচ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, মানুষ সংকুচিত সাব-ডিভাইডেড গৃহস্থালী তৈরি করে বসবাস করছেন, যাকে তুলনা করা হচ্ছে খাঁচার সাথে। একটি বহুতল ভবনের স্বাভাবিক অ্যাপার্টমেন্টকে আরও ছোট ছোট ভাগ করা হয়; তার ভেতরে খাঁচার মত আরও অনেকগুলো ধাতব কাঠামো তৈরী করা হয়, যা কোনো রকমে একজনের থাকার মতো একটি স্থান। হংকংয়ের খাঁচা-ঘরের গড় ক্ষেত্রফল ৭৫ বর্গফুট থেকে ১৪০ বর্গফুট পর্যন্ত। অথচ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বাভাবিক পার্কিং স্পেসের ক্ষেত্রফলই ১২০ বর্গ ফুট। অ্যাপার্টমেন্টের একটি সাধারণ রান্নাঘর এবং বাথরুম সকলে একত্রে ব্যবহার করে। এভাবে খাঁচা-ঘরের বাইরেও হংকংয়ে গৃহহীন মানুষ রয়েছেন প্রায় এক হাজারের বেশি। খাঁচা-ঘর পরিবার নিয়ে থাকার উপযোগী নয়। ভেতর বিছানা ছাড়াও জীবন-যাপনের দরকারি, অদরকারি, নিত্যনৈমত্তিক সকল সামগ্রী নিয়ে বসবাস করছেন প্রায় দুইলাখ মানুষ। তাই খাঁচা-ঘরে এমন অনেকের দেখা মেলে যারা বিয়ে না করেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবন। অর্থ সঞ্চয় করার জন্য রাতে কফি শপে ঘুমিয়ে থাকার দৃশ্যও হংকংয়ে সাধারণ ব্যাপার। পরিবার নিয়ে বসবাস করার সামর্থ্য যাদেরও বা হয়, নেহায়েতই উচ্চবিত্ত ছাড়া সকলেই থাকেন অত্যন্ত সীমিত জায়গার গৃহস্থালীতে। দেশটিতে বেকারত্বের হার স্বাভাবিকভাবেই খুব কম। কেননা, যেখানে জীবনধারণের ব্যয় সামলানো এত কঠিন, সেখানে বেকার মানুষের কোনো ঠাঁই থাকবার কথা না। নারী-পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে ছুটতে হয় জীবিকার পেছনে। জীবনধারণ এতোটা দুঃসাধ্য বলে হংকংয়ের জনগণ সন্তান গ্রহণ এবং লালন-পালনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। হংকংয়ের জনশক্তির একটি বড় অংশই এখন মধ্যবয়সী বা প্রবীণ; তারুণ্যের হার খুবই কম।

হংকং কেন ক্রমেই এতোটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে এ প্রশ্ন তুললেই দ্বীপ দেশটির সীমিত আয়তনের অজুহাত দেয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা এতে একমত পোষণ করেন না। ভূমি ব্যবস্থাপনার চরম অদূরদর্শীতা এর আসল কারণ। হংকংয়ের সমস্ত ভূমি মালিকানাই রাষ্ট্রের অধীনে। ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো ভূমি নেই। রাষ্ট্র নিলামের মাধ্যমে লম্বা সময়ের জন্য ভূমি ইজারা দিয়ে থাকে। নিলামে আন্তর্জাতিক বিনোয়োগকারীরা চড়া দামে ভূমি ব্যবহারের সত্ত্ব কিনে নেয়। মুক্ত অর্থনীতির কারণে ব্যবসা পরিচালনার জন্য হংকং ভীষণ সুবিধাজনক। ফলে বিনিয়োগকারীরা নিলামে দাম তুলতে পিছপা হন না, যেমনটা ব্যর্থ হন না লাভসহ বিনিয়োগ তুলে নিতেও। এর ফলে হংকংয়ে ভূমির চাহিদা যেমন ক্রমেই বেড়ে চলেছে, তেমনি বেড়ে চলেছে ভূমির দামও। এর প্রভাবে আবাসনখাতও ক্রমেই চলে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া তাই নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

খাঁচা-ঘর আসলে নতুন কোনো গল্প নয়। অসহায় মানুষের জীবনধারণের লড়াইয়ের গল্পগুলো একই। হংকংয়ের ৭ কোটি মানুষের দুই লাখ মানুষ খাঁচা ঘরে জীবনযাপন করেন। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ২২ লাখ মানুষ বস্তিতে বসবাস করেন। বরং, খাঁচা-ঘরের তুলনায় বস্তির জীবনযাপন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সুযোগ-সুবিধার বিবেবেচনায় আরো কঠিন বৈকি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে বর্তমান সময়টি উন্নয়নের বিবেচনায় অন্য যেকোনো সময় থেকে এগিয়ে। তবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিভিন্ন জটিলতায় কিছু মানুষ ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ে। শিল্পের বিকাশ ও নগরায়ণের ফলে বিভিন্ন এলাকার জীবনধারণের ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে বর্ধিষ্ণু ব্যয়ের সাথে তাল মেলাতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হন স্থানান্তরিত হতে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় জেন্ট্রিফিকেশন। রাষ্ট্র ছাড়াও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বৈষম্যের কারণেও নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন সময় প্রান্তিকীকরণের শিকার হয়ে থাকেন। পুনশ্চ রাষ্ট্র তার স¤পূর্ণ জনশক্তিকে এমনিতেও সমানভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে না।

তাই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিক নাগরিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করার মাধ্যমে সমতা বিধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে মেপেছেন মানুষের মুক্তির বিচারে; যে উন্নয়ন মৌলিক চাহিদাগুলোই মেটানোর সীমাবদ্ধতা তৈরী করে মানুষকে অসহায় করে তোলে, তাকে আসলে উন্নয়ন হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক নয়। প্রত্যেক মানুষের যদি তার ব্যক্তি জীবনের প্রয়োজনগুলো নিজের সুযোগ-সুবিধা মতো মেটানোর সামর্থ্য তৈরী হয় তবেই উন্নয়নের সঠিক অর্থ ফুটে ওঠে। গৃহহীনতাকে কেবল আবাসন চাহিদার অপ্রাপ্তি হিসেবে দেখলে চলবে না, এর মাঝে প্রতিফলিত হয় ন্যূনতম খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সর্বোপরি জীবনধারণের মৌলিক চাহিদাগুলোর অপ্রাপ্তি। এই সীমাবদ্ধতা যাদেরকে আঁকড়ে ধরে তাদেরকে আর বের হবার সুযোগ দেয় না। এটি একটি চক্র হয়ে মানুষকে আবদ্ধ করে ফেলে; আবদ্ধ করে ফেলে বস্তির জীবনযাপনে অথবা আবদ্ধ করে ফেলে খাঁচা-ঘরে। যে উন্নয়ন মুক্তির নয়, সেটি আদৌ উন্নয়ন হচ্ছে কিনা তা নিয়ে আমাদের বিস্তর ভাবনার অবকাশ রয়েছে।


জাহিদ অয়ন: শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বনিক বার্তা লিঙ্ক