জামিন পাওয়ার অধিকার

সাধারণত কোনো ব্যক্তিকে আটকের পর আদালত আইন ও বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে আটককৃত ব্যক্তিকে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে এবং নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হওয়ার শর্তে সাময়িক মুক্তির ব্যবস্থা করাকে জামিন বলা হয়। শর্তসাপেক্ষে মামলার যে-কোনো পর্যায়ে জামিন মঞ্জুর করা যায়। এটি একটি পদ্ধতি, যা মানবিক মূল্যবোধের দুটি প্রাথমিক ধারণার মধ্যে সমন্বয় রক্ষার জন্য বিবর্তিত হয়েছে। মূল্যবোধ দুটি হলো অভিযুক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও জনস্বার্থ, যার ওপর একজন ব্যক্তির মুক্তি বা দণ্ড নির্ভর করে। সংবিধানের আওতায় যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে, তা অবশ্যই সাধারণ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, যেখানে সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিরও অধিকার রয়েছে। নির্দোষত্ব অনুমানের নীতির ওপর ভিত্তি করে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দেয়া হয় যুক্তিসংগত সন্দেহের বাইরে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত। জামিনের উদ্দেশ্য হলো নিরপরাধ ব্যক্তিকে শাসিত্ম প্রদান করা থেকে রক্ষা করা এবং তার আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য উত্সাহিত করা। বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৩৯তম অধ্যায়ে জামিন সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও কার্যবিধির বিভিন্ন ধারা এবং অন্যান্য আইনে জামিন সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের State of Rajasthan, Jaipur vs Balchand 1977 AIR 2447 মামলার রায়ে বিচারপতি কৃষ্ণা আইয়ার উল্লেখ করেন— প্রাথমিক নিয়ম হলো জামিন, কারাদণ্ড নয়। কিন্তু যেখানে পরিস্থিতি ন্যায়বিচার থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়, সেখানে এই নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে। এ নীতি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় নজির হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯৭৩-এর সঙ্গে আমাদের কার্যবিধির জামিনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিধান একই রকম রয়েছে। তাই আমাদের দেশে জামিনের ক্ষেত্রেও এ নীতি অনুসরণ করা সম্ভব বিচারিক সক্রিয়তা ব্যবহার করার মাধ্যমে।

জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৬ অনুযায়ী জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে যখন কাউকে গ্রেপ্তার অথবা আটক করা হয়, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি অধিকার বলে জামিন চাইতে পারেন। এক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা অদালত সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দিতে আইনত বাধ্য থাকেন। Mia Nuruddin Vs. State and Ors. 68 DLR(AD) (2016) 290 মামলার রায়ে বলা হয় যে, জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত কোনো ধরনের বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। এটি একটি বিধিবদ্ধ অধিকার এবং আদালত এ জাতীয় অধিকারকে হ্রাস করতে পারে না।

ধারা ৪৯৬ অনুযায়ী কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জামিন চান, তাহলে সেই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দিতে বাধ্য থাকবেন। Dharmu Naik vs Rabindranath Acharya 1978 CriLJ 864 মামলায় একজন ব্যক্তি জামিনযোগ্য অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ছিলেন, যার জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে হেফাজতে নিয়ে নেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে জামিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট আবেদন করলেও তিনি জামিন প্রদান না করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করেন। রায়ে বলা হয়, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দিতে বাধ্য ছিলেন, কারণ জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে একজন পুলিশ কর্মকর্তা কোনো ধরনের বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না এবং উক্ত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অন্যায়ভাবে হেফাজতে রাখার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং জরিমানাও করা হয়। সুতরাং কোনো জামিনযোগ্য অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি জামিন চাওয়ার পরেও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে জামিন প্রদান না করেন, তাহলে উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি অন্যায়ভাবে হেফাজতে রাখার জন্য মামলা করতে পারবেন।

অজামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৭ (১) অনুযায়ী কোনো অজামিনযোগ্য অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত যে-কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই আটক করা হলে, বা সে নিজে হাজির হলে বা তাকে আদালতে হাজির করা হলে, তাকে জামিনে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধে দোষী হয়েছেন বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ উপস্থিত থাকে, তাহলে উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দেয়া যাবে না। তবে শর্ত থাকে যে, আদালত কোনো ১৬ বছরের কম বয়সি যে-কোনো ব্যক্তি বা এই জাতীয় অপরাধে অভিযুক্ত যে কোনো মহিলা বা অসুস্থ ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। অজামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি অধিকার বলে জামিন চাইতে পারেন না।

ধারা ৪৯৭(১)-এর অধীনে জামিন নেয়ার জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হেফাজতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। Muhammad Ayub Vs. Muhammad Yaqub 19 DLR (1967) 38 মামলায় বলা হয়, আদালত কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধারা ৪৯৭ (১)-এর অধীনে জামিন দিতে পারবেন শুধু যদি উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকৃত হেফাজতে থাকেন বা আদালত বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারিকৃত কোনো প্রক্রিয়ার জবাব দেয়ার জন্য আদালতে হাজির হন। কিন্তু কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় আদালতে উপস্থিত হলে ধারা ৪৯৭(১)-এর অধীনে আদালত উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দিতে পারবেন না, এমনকি গ্রেফতারের গুরুতর আশঙ্কা থাকলেও। পাশাপাশি Mrs. Laila Jerin Vs. The State 2002 22 BLD 478 মামলায় বলা হয়, ধারা ৪৯৭ (১)-এর অধীনে জামিন নেয়ার জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হেফাজতে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং আদালতে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে এবং এই ধারার অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের জামিন দেয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। সুতরাং ধারা ৪৯৭(১)-এর অধীনে জামিন পেতে অভিযুক্ত ব্যক্তি হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করতে পারবেন না।

ধারা ৪৯৭(২) অনুযায়ী যদি তদন্ত, অনুসন্ধান বা বিচারের যে-কোনো পর্যায়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা আদালত বিশ্বাস করেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির দোষের বিষয়ে আরো তদন্তের পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেয়া হবে।

ধারা ৪৯৭(৪) অনুযায়ী যদি কোনো অজামিনযোগ্য অপরাধের অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচারের সমাপ্তির পরে এবং রায় দেয়ার আগে আদালত মনে করেন যে, আসামি কোনো অপরাধের জন্য দোষী নন এবং এর জন্য যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেয়া হবে।

ধারা ১৬৭(৫) অনুযায়ী যদি অপরাধ সংঘটনের তথ্যপ্রাপ্তির তারিখ থেকে অথবা ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্ত করার জন্য আদেশের ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ না হয়, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট অথবা দায়রা আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দিতে পারেন।

ধারা ৩৩৯ গ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষেত্রে ১৮০ দিন এবং দায়রা জজ, অতিরিক্ত দায়রা জজ বা সহকারী দায়রা জজের ক্ষেত্রে ৩৬০ দিন, যদি কোনো বিচার শেষ করা না যায়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেয়া যেতে পারে।

অভিযুক্ত ব্যক্তি তার জামিন মঞ্জুরের জন্য একাধিক বার আবেদন করতে পারেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি যখন জামিন মঞ্জুরের জন্য দ্বিতীয় আবেদন করেন, যেখানে একই আদালত প্রথম আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন, তখন সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী আদালত দ্বিতীয় আবেদন গ্রহণ করবেন না। এ নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। Harsha Nath Pal Vs. The State 10 DLR (1958) 452 মামলার রায়ে বলা হয়, জামিন মঞ্জুরের জন্য দ্বিতীয় আবেদনে কোনো নতুন বা অতিরিক্ত কারণ দেখানো হলে দ্বিতীয় আবেদনটি আদালত গ্রহণ করতে পারেন। MA Malik vs. State 48 DLR (1996) 18 মামলায় বলা হয়, পূর্বের জামিন আবেদনগুলি যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করা না হলে, তাহলে পরবর্তী আবেদনে নতুন কোনো কারণ সংযুক্ত করার প্রয়োজন নেই।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৮-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগ বা দায়রা আদালত যে-কোনো ক্ষেত্রে, কোনো ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরে যদি আপিল করেন বা না করেন, তাকে জামিন প্রদানের জন্য নির্দেশ দিতে পারে। Taslima Nasrin Vs. Md. Nurul Islam and Ors. 1994(2) BLT (HC D)164 মামলায় তাসলিমা নাসরিনের পক্ষে নিজের জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আত্মসমর্পণ করা সম্ভব ছিল না, যার কারণে তিনি হাইকোর্ট বিভাগে জামিনের জন্য সরাসরি আবেদন করেন এবং হাইকোর্ট বিভাগ তাকে আগাম জামিন প্রদান করেন। আবার The State Vs. Md. Nurul Islam Babul 2004 24 BLD (AD) 168 মামালায় বলা হয়, ধারা ৪৯৮-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগ এবং দায়রা আদালতের একযোগে এক্তিয়ার থাকলেও আমাদের দেশের প্রচলিত প্রথা হলো প্রথমে নিম্ন আদালতে আবেদন করা। কিন্তু একযোগে এক্তিয়ারের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতে প্রথমে আবেদন করা উচিত হলেও এটি কোনো অলঙ্ঘনীয় বাইবেলীয় বিধি নয়। ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালতেও সরাসরি আবেদন করা যেতে পারে।

আগাম জামিন
গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় কোনো ব্যক্তিকে জামিন দেয়া হলে তাকে আগাম জামিন বলা হয়। এমন কোনো ধারা বা বিধান নেই, যা আদালতকে আগাম জামিন মঞ্জুর করার জন্য বিশেষভাবে অনুমোদন দেয়। তবে আগাম জামিনের জন্য ৪৯৮ ধারায় আবেদন করা হয়। ধারা ৪৯৮-এর বিসত্মৃত ব্যাখ্যার কারণে আগাম জামিনের জন্য আবেদন করা যায়।

Hidayet Ullah Khan Vs. Crown PLD 1949 Lah 21 মামলায় আগাম জামিন প্রদানের আগে দুটি শর্ত প–রণের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন প্রদানের জন্য আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসংগত কোনো ভিত্তি থাকবে। দ্বিতীয়ত আবেদনকারীর জামিন যদি নাকচ করে দেয়া হয়, তাহলে তিনি অন্যায়ের শিকার হতে পারেন বলে মনে করা হয়। State Vs. Abdul Wahab Shah Chowdhury 51 DLR(AD) (1999) 242 মামলার রায়ে Hidayet Ullah Khan Vs. Crown PLD 1949 Lah 21 মামলার প্রদত্ত আগাম জামিনের শর্তগুলো পুনরুত্থাপন করে একমত পোষণ করা হয় এবং আদালতের আরো ভালো দিকনির্দেশনার জন্য ব্যবহার করতে বলা হয়। আরো বলা হয়, আগাম জামিন কেবল অসাধারণ এবং ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে মঞ্জুর করা যেতে পারে এবং কোনটি বিশেষ এবং ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি, তা নির্ণয় করা বিচারকদের বিবেচনামূলক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

Mrs. Laila Jerin vs. The State & others 2002 22 BLD 478 মামলায় বলা হয়, গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় আগাম জামিন চাওয়া যেতে পারে, এমনকি যেখানে মামলাটি এখনো পুলিশি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে বা অধস্তন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আরো বলা হয় আগাম জামিন কেবল একটি সীমিত সময়ের জন্য মঞ্জুর করা যেতে পারে।

State Vs. Md Zakaria Pintu and others 62 DLR(AD) (2010) 420 মামলার রায়ে বলা হয়, আগাম জামিন দেয়া সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম এবং এই জাতীয় সিদ্ধান্ত অবশ্যই নির্বিচারে নেয়া উচিত নয়। আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতার ব্যবহার করেই এই জাতীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রথম আইনি দায়িত্ব হলো পুলিশ বা সংশিস্নষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আত্মসমর্পণ করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের আগে, কারণ একই সংবিধানের আওতায় ভুক্তভোগীদেরও বিভিন্ন অধিকার রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, সহিংসতা ইত্যাদির মতো গুরুতর অভিযোগ থাকলে আদালতের পক্ষ থেকে আগাম জামিন নাকচ করা বাধ্যতামূলক।

সমপ্রতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার হাইকোর্ট বিভাগের আগাম জামিন মঞ্জুর করার বিষয়ে ১৬টি নির্দেশনা জারি করে বলেছেন যে, হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযুক্তদের আগাম জামিন মঞ্জুর করা হবে না। নির্দেশনায় আরো বলা হয়, আদালত কর্তৃক প্রদত্ত কোনো আগাম জামিন সাধারণভাবে আট সপ্তাহের বেশি অব্যাহত রাখা উচিত নয় এবং চার্জশিট দাখিলের পরে অব্যাহত রাখা উচিত নয়।

দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরে জামিন
মামলার রায় হয়ে যাওয়ার পরেও জামিন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪২৬, ৪৩৫ ও ৪৯৮-এর অধীনে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও জামিন পাওয়া সম্ভব। ধারা ৪২৬-এর অধীনে আপিল আদালত দণ্ডিত ব্যক্তির যে-কোনো বিচারাধীন আপিল মুলতবি করে, যে আদেশে সাজা কার্যকর করা হয়েছে তা স্থগিত রেখে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে জামিন দিতে পারে। ধারা ৪৩৫-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগ বা যে-কোনো দায়রা জজ কোনো নিম্ন ফৌজদারি আদালতের সামনের কোনো কার্যক্রমের নথি চাইতে এবং পরীক্ষা করতে পারে এবং যে-কোনো সাজা স্থগিত করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দিতে পারে। ধারা ৪৯৮-এর অধীনেও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও জামিন আবেদন করা সম্ভব। ধারা ৪২৬-এর পরিধির তুলনায় ধারা ৪৯৮ অনেক বিস্তৃত, যেহেতু ধারা ৪৯৮-এ যে-কোনো ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগ বা দায়রা জজের নিকট আবেদন করা যায়।

জামিনের শর্তাবলি
জামিনের শর্ত হলো এমন বিধি, যা জামিনে থাকাকালীন একজনকে অবশ্যই মেনে চলতে হয়, যখন আদালত তার মামলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। জামিনে কিছু অন্তর্নিহিত শর্ত রয়েছে। যেমন : অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট তারিখে আদালতে হাজির হতে হবে, মামলার প্রমাণের ক্ষতি সাধন বা মিশ্রণ করতে পারবেন না, পালিয়ে যেতে পারবেন না, সাক্ষীদের হুমকি দিতে পারবেন না ইত্যাদি। এ ছাড়াও আদালত প্রায়শই অতিরিক্ত শর্ত জুড়ে দেয়।

RKM Reza vs. State 33 DLR (1981) 146 মামলায় বলা হয়, জামিনে আসামির মুক্তির জন্য জামিন বন্ড জমা দেয়ার পরিবর্তে আদালত অর্থ জমা দিতে আদেশ করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে প্রদত্ত জামিন বৈধ হলেও জামিনে প্রদত্ত শর্ত বেআইনি বলে বিবেচিত হবে। Keshab Narayan vs. The State AIR (1985) SC 166 মামলার রায়ে বলা হয়, জামিন দেয়ার সময় হাইকোর্টের এমন কোনো শর্ত আরোপ করা উচিত নয়, যেন শর্তটি দ্বারা জামিনকে অস্বীকার করার সমান মনে হয়। পাশাপাশি জামিনের শর্তগুলি কঠোর হওয়া উচিত নয়। AHM Siddique Vs. State 45 DLR (AD) 1993 মামলায় বলা হয়, আদালত জামিনে শর্ত হিসেবে জরিমানা দিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদেশ করতে পারেন না। এই ধরনের শর্তগুলো বেআইনি বলে বিবেচিত হবে।

জামিন অপরাধমূলক বিচারব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয়। জামিন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষাধিকার হলেও এটি অপব্যবহার করার সব সময় সুযোগ থাকে। যদিও জামিন সম্ভাব্য নির্দোষ ব্যক্তির অহেতুক দুর্ভোগ এড়ানো নিশ্চিত করে, এটি বিপরীতভাবে ন্যায়বিচারে প্রশাসনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে— অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে বা ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের হুমকি দেয়ার জন্য সুযোগ করে দিয়ে বা প্রমাণের ক্ষতিসাধন বা মিশ্রণ করার সুবিধা করে দিয়ে। তাই জামিনের অপব্যবহার রোধে আদালতে বিচারকদের জামিন দেয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যেসব বিষয়ে জামিন প্রদান করার ক্ষমতা রাখেন, তা সম্পর্কে তাদের সতর্ক থাকতে হবে। জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের উচিত জামিনে প্রদত্ত শর্তাবলি সমপূর্ণরূপে পালন করা। যেসব মামলায় অভিযুক্তকে জামিন দেয়া যায়, তা দ্রুত শনাক্তকরণ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের জন্য আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা যেতে পারে। মিথ্যা মামলা এবং মানুষকে হয়রানি করার জন্য দায়ের করা মামলার বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।


এম এম তানজিমুল হক
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বনিক বার্তা লিংক