কোথায় শেষ এ নৃশংসতার?

প্রতিদিন সকালের শুরু হয় কতজন শিশু বা মহিলা ধর্ষণের শিকার হয়েছে বা কতজন এর ফলে মারা গিয়েছে এ ধরনের নির্মম খবর নিয়ে। যে সময়টিতে একটি শিশুর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা, নির্মল পরিবেশে খেলাধুলা করার কথা, ঠিক সেই সময়টাতেই একটি শিশুর প্রতি অমানবিক এ আচরণ তার মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। ভয়াবহতার কবলে পড়া শিশুরা সামাজিকভাবেই হেয় হতে থাকে এবং নিজের পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারে না। পরিবারের এত সাবধানতার পরও এই শিশুরা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। এমনও ঘটনা ইদানীং খুব স্বাভাবিক যেখানে শিশু পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের হাতে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটছে। দিনে দিনে সংখ্যাটিও ক্রমশ হারে বেড়েই চলেছে। এ রকম সমাজব্যবস্থায় শিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

পবিত্র কোরআনে নারীকে মর্যাদা দিয়ে ঘোষণা করা হয়েছে—‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত’। অথচ দেশের এই অবস্থায় একটি মেয়ে শিশু হয়ে জন্ম নেওয়াটাই তার জন্য অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেখানে একটি শিশু বা পূর্ণবয়স্কা নারী কেউই নিরাপদ নয়, যেখানে তার জীবন সর্বদা শঙ্কায় থাকে সেখানে নারী হয়ে জন্মানোটাই অপমান আর অসম্মানের। এমনকি তার জন্মের পর তার পরিবার তার সুরক্ষা নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তায় থাকে।

বিশ্বজনসংখ্যা রিপোর্ট ২০২০-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৬৪, ৬৮৯, ৩৮৩ জনের মধ্যে ধর্ষণের শিকারের হার শতকরা ৯.৮২। এর দিকে তাকালে বোঝা যায় আনুপাতিক হারে সংখ্যাটি বেড়েই চলেছে। জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র একটি রিপোর্ট প্রদান করে যেখানে দেখানো হয়েছে—৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার যার মধ্যে ৪৩ জন ধর্ষণের ফলে মৃত্যুবরণ করেছে, ১২ জন পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যা করেছে এবং ২০৪ জনকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। দৈনিক একটি সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, এই করোনা মহামারিকালীন সময়েও বিগত মার্চ-সেপ্টেম্বর সাত মাসে গড়ে প্রতিদিন চার জন নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সামাজিক, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণে এ সংক্রান্ত অনেক তথ্য আমরা জানতেও পারি না।

একটি সমাজে ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধের পরও যখন পর্যাপ্ত সাজা দেওয়া হয় না, বরং নারীর পোশাককে ধর্ষণের কারণ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয় এবং বিচারব্যবস্থা সময়ে সময়ে ধর্ষক বা নারী লুণ্ঠনকারীদের পক্ষে যায় সেখানে নারী হয়ে বিচার চাইতে যাওয়াটাও নিতান্তই ব্যাঙ্গাত্মক। দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে—আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান বা মৌলিক অধিকারের ন্যায়, নীতি, সাম্যের কথা থাকলেও বাস্তবে তা কতটুকু কার্যকর হছে সেটাই বর্তমান আইনব্যবস্থার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। এ রকম জঘন্য অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করাটাই চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ করে অনায়াসে তারা আইনের সব শিকল ভেঙে সমাজে নিরপরাধের মতো ঘুরে বেড়ায়, আইনব্যবস্থাকে নিতান্তই তুচ্ছ মনে হয় তখন। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা অপরাধীরা তো বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। ২০০৭-এ বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ হওয়া সত্ত্বেও কখনোই বিচার বিভাগ স্বাধীন হতে পারেনি। ফলে আইন প্রণয়ন করলেও তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত হয় না, বরং বিভিন্ন দিক থেকে হুমকি বিচারব্যবস্থাকে স্তিমিত করে দেয়। আমরা এমন এক সমাজে অবস্থান করছি যেখানে প্রতিটি বিষয় চোখের সম্মুখে সংঘটিত হওয়ার পরও অবলীলায় আমরা সেটাকে এড়িয়ে যাই এবং নতুন একটি অপরাধের জন্ম দেই।


তামান্না-ই-নূর (তনু)
শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ইত্তেফাক লিংক