করোনা প্রভাবে বাংলাদেশ : ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি

ভূমিকা
করোনা ভাইরাসের প্রকোপে আমাদের সাধারণ জীবনযাপন যেন থমকে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে সামাজিক কর্মকাণ্ডও। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় অন্যতম উপায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম অনুসরণ করার জন্য সীমিত করা হয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বড়বড় শিল্প, কলকারখানা প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণখেলাপি হয়ে গেছে। বিশ্বের বড়বড় শেয়ার বাজারগুলোতে ধস নামছে। জে পি মর্গান বলেছেন, পরপর আগামী দুই প্রান্তিকে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দেবে। Ogranization of Economic Co-operation and Development (OECD) এর মতে ২০২০ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০১৯ সালের প্রবৃদ্ধির অর্ধেক হবে। করোনার এই অভিঘাত থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচকই নিম্নমুখী। আবারও বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের অতিরিক্ত প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে অর্থনীতির গতি আরো ধীর হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ বড় চ্যালেঞ্জ হবে সরকারের জন্য। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবি এরই মধ্যে বলেছে বাংলাদেশের জিডিপি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এক দশমিক এক ভাগ কমে যেতে পারে।

করোনা ভাইরাস ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

মুক্তবাজার অর্থনীতির এই যুগে বাংলাদেশের করোনার অভিঘাত সঞ্চারিত হয়েছে প্রধানত রপ্তানিখাত, প্রবাসী আয়, অভ্যন্তরীণ ও ব্যবসায়ীক যোগাযোগ ব্যবস্থায়। নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটেছে। করোনা সঙ্কটে সরকারের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের পরিমাণ ও ক্ষেত্র বেড়ে গেছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সরকার ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করে ইতোমধ্যে বাজেট ঘোষণা করেছেন। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষের আহারের অনিশ্চয়তার শংকায় সরকার কোনোকোনো করের হার কমিয়ে তাদের জীবনমান অক্ষুণ্ন রাখতে চায়। এক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম অর্জিত হবে। কৃষি, শিল্প, সেবা, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন শ্রমিক, দিনমজুরসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বেকার সংখ্যা বেড়েই চলছে। বেকারত্বজনিত সৃষ্ট সমস্যা এখন তাৎক্ষণিকভাবে সামাল দেয়া সম্ভব না। কর্মসংস্থান হারানো এসব বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা করা।

করোনা বর্তমান পরিস্থিতি ও ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসমূহ
করোনা মহামারীর কারণে সৃষ্ট বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা দশা বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলবে, এমন আশঙ্কা অনেক আগেই প্রকাশ করেছিল বিশ্বব্যাংক। তবে করোনা মহামারীর ধাক্কা সামাল দিতে সরকার এরই মধ্যে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তা সঠিক পথেই আছে বলে মনে করছে তারা। আবার নতুন আশঙ্কার কথাও বলছে সংস্থাটি। তবে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস হচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হলেও সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসতে পারে। আমাদের অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হচ্ছে প্রবাসীদের রেমিটেন্স। সারা বিশ্ব করোনা আক্রান্ত হওয়ায় আমাদের এক কোটি প্রবাসী হুমকির সম্মুখীন। বিশ্বব্যাংকের মতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয় ২৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে আমাদের প্রবাসীর মৃত্যু এবং বিদেশে কর্মচ্যূত হয়েছে প্রায় সকল প্রবাসী। সেখানে প্রবাসীদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ। সকল প্রকার আয় বন্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে ও ইউরোপে কর্মরত প্রবাসীদের একটা বড় অংশ আজ কাজ হারানোর আশংকায়। আর বিশ্বের ১৬০টি দেশে থাকা এক কোটি প্রবাসীর মধ্যে করোনাকালে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন তিন লাখ কর্মী। সেই সঙ্গে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের কর্মীদের আয় কমে আসায় ভোগ ব্যয় বাড়ার সুযোগ থাকবে না। স্বল্প মেয়াদের জন্য হলেও দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যেতে পারে। সংস্থাটি বলছে, কৃষির বাইরে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের যে কর্মীরা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক খাত সংশ্লিষ্ট কয়েক কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছে কিংবা পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে।

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের বিস্তার যত বাড়ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগও ততটাই ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিটি লাভজনক বা অর্থনীতি নির্ভর করে এমন প্রতিটি খাতই হুমকির মুখে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে এরই মধ্যে সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানী আয়ের ৮৩ শতাংশ আসে গার্মেন্টস শিল্প থেকে। বাংলাদেশে এই শিল্প টিকে আছে ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারের উপর নির্ভর করে। কিন্তু সেসব দেশে করোনা ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের ফলে বহু পশ্চিমা ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে তাদের অর্ডার বাতিল কিংবা স্থগিত করছেন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে এখন ইউরোপ-আমেরিকা বিপর্যস্ত। প্রতিদিনই হাজার-হাজার মানুষ এই ভাইরাস সংক্রমণে মারা যাচ্ছে। আক্রান্তের হারও বাড়ছে বেশ অবিশ্বাস্য গতিতে। এমন অবস্থায় সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপ আর আমেরিকা। স্বভাবতই এটি পুরো বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করবে।

বিজিএমই জানিয়েছে ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ১৫০টি বা তারও বেশি ফ্যাক্টরির কয়েক মিলিয়ন পিস পণ্যের অর্ডার বাতিল কিংবা স্থগিত করেছে সেসব দেশ, যার বাজার মূল্য প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। প্রায় ২.২৮ মিলিয়ন শ্রমিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই করোনাকালীন সময়ে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের এই সময়ে দীর্ঘদিন সকল সেক্টর বন্ধ থাকায় ব্যাংকিং খাতেও একটি বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস, বাংলাদেশ (এবিবি) এর আশংকা অনুসারে, প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বাৎসরিক আয় গড়ে ১৫০ কোটি টাকার মতো করে কমে যাবে। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মতো আয় কমে যাবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে কর্মীদের বেতন দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বেতন ভাতা কমানো, কর্মী ছাটাই, নতুন জনবল নিয়োগ না দেয়া, বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণের মতো অনেক সিদ্ধান্তও নেয়া হচ্ছে অনেক ব্যাংকে।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঘনবসতিপূর্ণ কৃষি নির্ভর দেশ। এ দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষই প্রত্যক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। কিন্তু করোনার প্রকোপ থেকে এই খাতটিও রক্ষা পায়নি। প্রথম দিকে লকডাউনে, পচনশীল দ্রব্য গণপরিবহনের অভাবে বাজারজাত করা হয়নি। ফলে ক্ষতি হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কৃষি পণ্যগুলো ক্ষেতেই নষ্ট হয়েছে। ধান কাটার মৌসুমে ধান কাটার শ্রমিকের তীব্র সঙ্কট মোকাবিলা করতে হয়েছে মালিকদের। কৃষির প্রধান উপখাতগুলো হলো শস্য উৎপাদন, প্রাণী সম্পদ এবং মৎস সম্পদ। স্বল্প মেয়াদে এই সকল উপখাতে উৎপাদন না কমলেও দেশি এবং বিদেশী অর্থনীতিসমূহ অবরুদ্ধ থাকার কারণে এসকল উপখাতের উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্যের উপর নিম্নমুখী প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

শিল্পে খাতে বিশেষ করে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে ক্ষতির মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ খাতে প্রতি দিনের অনুমিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রকট আকার ধারণ করেছে সেবা খাতে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী বেচা-কেনা এবং জরুরি সেবা ব্যতীত এই খাত দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। সব ধরনের যোগাযোগ (সড়ক, রেল, নৌ এবং আকাশ পথ), পর্যটন, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, রিয়েল ইস্টেটসহ সকল প্রকার সেবা একেবারেই বন্ধ ছিল। স্বাস্থ্য খাতের বেসরকারি অংশটিতেও এক প্রকার অচল অবস্থা বিরাজ করেছে। সব মিলিয়ে সেবা খাতে প্রতিদিনের অনুমিত চলতি ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ২ হাজার কোটি টাকা। তাই প্রতিদিন কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাতে গড়ে মোট অনুমিত চলতি ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ৩ হাজার ৩’শ কোটি টাকা। প্রতিদিনের এই  চলতি ক্ষতির পরিমাণ করোনা পরিস্থিতির খারাপ হওয়ার সাথে সাথে  অবস্থার  ঊর্ধমুখী হতে পারে যা এই মুহূর্তে হিসাব করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ প্রতিবছর যে আমদানি করে তার প্রায় ৩৫ শতাংশ চীনের সাথে এবং বাকিটা অন্যান্য দেশ থেকে। শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক দ্রব্য, ইলেকট্রিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট, ইলেকট্রনিক্সসহ সকল ধরনের তৈরি পণ্যই বিভিন্ন দেশ থেকে  আমদানি করা হয়ে থাকে। উৎপাদনশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেমন- স্টিল, সিমেন্ট, প্লাস্টিক, ইলেক্ট্রনিক্স, ফুড, ওষুধ ইত্যাদির যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালও  আমদানি করা হয়। এমতাবস্থায়, পর্যাপ্ত কাঁচামাল সরবরাহের অভাবে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পোৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশংকা করছে। আমদানি হ্রাস পাওয়ার প্রভাবে অভ্যন্তরীণ বাজার অনেক পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন কেমিক্যাল, রং ইত্যাদি শিল্পে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মজুদকৃত কাঁচামালের মূল্য ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে আমদানিকারকরা। ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু ক্রেতার সাথে পূর্বনির্ধারিত মূল্যে পণ্য সরবরাহের চুক্তি বিদ্যমান থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একই সাথে আদা, রসুন, পেঁয়াজ ইত্যাদি ভোগ্যপণ্যের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অর্থনীতি রক্ষার চেষ্টায় আমাদের করণীয়
অনেক অর্থনীতিবিদ এবং সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, এই মুহূর্তে অর্থনেতিক ক্ষতির হিসাব নিকাশের চেয়ে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য করোনা মোকাবেলায় বেশি জোর দেয়া উচিৎ। অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে করোনা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে দুই-এক বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকারও বড় অঙ্কের (প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা) প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এই প্যাকেজ অর্থনীতিতে কতটুকু গতি ফিরিয়ে আনতে পারবে তা একদিকে নির্ভর করবে স্বল্প মেয়াদি, মধ্য মেয়াদি এবং দীর্ঘ মেয়াদি মোট ক্ষতির পরিমাণের উপর। অন্যদিকে, তা নির্ভর করবে প্রণোদনা প্যাকেজের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের উপর।বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ভাবতে হবে। কারখানাগুলোর অর্থের সরবরাহ সচল রাখতে হবে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ক্রেতাপক্ষ বা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের  কাছেও সহায়তা চাইতে হবে। করোনার প্রভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এ অবস্থায় সরকারি বিনিয়োগের গুণগত মান বাড়াতে পারলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে। কম অগ্রাধিকারের প্রকল্পের কাজ স্থগিত রেখে জনগুরুত্বপূর্ণ বড় প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ করতে পারলে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়বে। বাংলাদেশের অর্থনীতি করোনার  মধ্যে  কিছুটা তুলনামূলকভাবে কিছুটা টিকে থাকার বড় কারণ গ্রামীণ অর্থনীতি। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বিপণন ব্যবস্থা যাতে মার না খায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রায় তিন কোটি লোক জড়িত। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। শ্রমঘন উপখাতগুলোত বাড়তি প্রণোদনার ব্যবস্থা করা, যা থেকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ ও বাড়তি পণ্য রফতানি করতে পারে। শ্রমঘন অবকাঠামো প্রকল্পসমূহের কাজ যত দ্রুত সম্ভব শুরু। এমএসএমই এর মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যাদের ব্যাংক ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই, তাদের অর্থায়নের জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ। সরকার ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি পিকেএসএফ এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায় সহায়তা দিতে পারে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি। চাকুরিবিহীন প্রবৃদ্ধি গত দশকের অর্জনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তদুপরি, যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল আমরা ভোঁগ করছি তা ডেমোগ্রাফিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। বৈষম্যের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক দূরত্ব যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ, নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই তরুণ, কম দক্ষ ও সীমিত সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার আওতায় থাকা জনগোষ্ঠীকে বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।

শেষকথা
করোনার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি আজ অবরুদ্ধ। ধেয়ে আসছে মহামন্দা। আশঙ্কা করা হচ্ছে এই মহামন্দার মাত্রা ১৯২০ সালের মহামন্দা থেকেও ভয়াবহ হতে পারে। করোনা ভাইরাসকে ঘিরে সংকটের ফলে প্রায় সব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রই লোকসানের মুখ দেখছে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, গোটা বিশ্বে করোনা ভাইরাসের প্রসার রুখতে পদক্ষেপের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণেও পুঁজিবাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনীতির সহায়তা করতে সরকারি পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপের ফলে কিছু সুবিধা হলেও বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার জন্য তা সহায়ক হচ্ছে না। এখনো পর্যন্ত অর্থনীতি চাঙ্গা করতে প্রায় ১৫,০০০ কোটি ডলার মূল্যের সরকারি সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান সংকটের মেয়াদ সম্পর্কেও এই মুহূর্তে কোনো ধারণা না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে পূর্বাভাষ পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিশেষে, বিংশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ৩০’র দশকে তীব্র আর্থিক মন্দার কারণে বিশ্বজুড়ে তৈরী হয়া ‘গ্রেট ডিপ্রেশন অথবা ৮০’র দশকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতনে আন্তর্জাতিক, রাজনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার যে পরিবর্তন এসেছিল একবিংশ শতাব্দীতে করোনা মহামারি তার চেয়েও বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারে। তাই সেভাবেই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।


সুমাইয়া ইসলাম, নিবন্ধকার
বণিক বার্তা লিঙ্ক