বিয়ের কাজী হতে পারবে না নারী উচ্চ আদালতের রায়ের একটি পর্যালোচনা

মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফেশনে (শারীরিকভাবে অসামর্থ্য) থাকেন, এমন পর্যবেক্ষণ এবং দেশের ‘সামাজিক ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে’ নারীরা বিয়ের কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবে না মর্মে নির্দেশনা দিয়ে রায় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট ডিভিশন)। আয়েশা সিদ্দিকা নামের দিনাজপুরের এক নারী রেজিস্ট্রার প্রার্থীর রিট খারিজ করে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন। গত ৯ জানুয়ারি, ২০২১ এই রায় প্রকাশিত হলে দেশের নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নারী অধিকার, নারীদের কাজের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুদীর্ঘ লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট অতিক্রম করেও দেশের অধিকাংশ নারী এখনও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এ রকম বাস্তবতায় এ ধরনের রায় নারীদের ঊনমানস হিসেবে দমিয়ে রাখার কুসংস্কারাচ্ছান্ন, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও সামাজিক অপচেষ্টাকেই আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

২০১২ সালে সরকারিভাবে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনের প্রেক্ষিতে, মামলার বাদী আয়েশা সিদ্দিকা দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি পৌরসভার এবং উপজেলার বিয়ের কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার প্রার্থী হিসেবে আবেদন করেন। প্রার্থীদের যাচাই প্রক্রিয়ায় আয়েশা সিদ্দিকা প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন। এমনকি স্থানীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক তিনি নিয়োগের সুপারিশপত্র গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে নিয়োগের অনুমোদনের জন্য তার নাম আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে তারা তা নাকচ করে দেন। এ বিষয়টি মীমাংসা হওয়ার আগেই, আইন মন্ত্রণালয় ২০১৪ সালের ১৬ জুন ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়’ মর্মে চিঠি দিয়ে পূর্বের তিন সদস্যের প্যানেল বাতিল করেন। একই সঙ্গে, নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়ার লক্ষ্যে নতুন প্যানেল গঠনের সরকারি নির্দেশনাও প্রদান করেন। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে আয়েশা সিদ্দিকা বাদী হয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন (রিট পিটিশন নং ৬৪৬৬/২০১৪) করেন। ইতোমধ্যে, বিষয়টি অমীমাংসিত থাকা অবস্থায় ২০১৬ সালে একজন কাজী নিয়োগ দেয়া হয়, যাকে পরবর্তীতে মামলার পক্ষভুক্ত করা হয়।

বিচার প্রার্থীর যোগ্যতার প্রেক্ষিতে এবং যথোপযুক্ত যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করার পরই তাকে নিয়োগ দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। শুধু নারী-পুরুষ বা লৈঙ্গিক পরিচয়ের ভিত্তিতে যে কোন ব্যক্তিকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে অস্বীকৃতি বাংলাদেশের সংবিধানসহ অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন প্রদত্ত অধিকারের পরিপন্থি। আয়েশা সিদ্দিকা একজন সুশিক্ষিত এবং সাহসী নারী। তিনি এ অন্যায় নীরবে মেনে নেননি। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে তিনি এর বিরুদ্ধে রিট দায়ের করেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন। রায়ে বাংলাদেশের সামাজিক ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবে না আইন মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন আদালত। ৯ জানুয়ারি, ২০২১ এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।

এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, নারীরা মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় তাদের ‘বিশেষ শারীরিক অবস্থার’ কারণে ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফেশন বা শারীরিকভাবে অসামর্থ্য থাকেন। মুসলিম বিবাহ হচ্ছে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং আমাদের দেশে বেশিরভাগ বিয়ের অনুষ্ঠান হয় মসজিদে। ওই সময়ে নারীরা মসজিদে প্রবেশ করতে পারে না এবং নামাজ থেকেও তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। রাত-বিরাতে বিয়ের অনুষ্ঠান হতে পারে। সেখানে যেতে পারবেন না। সুতরাং বিয়ে যেহেতু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং গ্রামীণ যাতায়াত ব্যবস্থা ও সামাজিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় বাংলাদেশে নারীদের দিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। এছাড়াও আদালত রায়ে বলেছেন, অন্যান্য পাবলিক অফিসে নারীরা যে কাজ করেন, আর নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে কার্যক্রম আলাদা। এই সব পর্যবেক্ষণ দিয়ে আদালত রুল খারিজ করে দিয়েছেন।

এ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই আমরা গণমাধ্যমে এর বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক ও সমালোচনা দেখতে পাচ্ছি। উল্লেখ্য যে, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ বিয়ে পারিবারিক আবহে পড়ানো হয়। বিবাহ নিবন্ধন হচ্ছে সেই বিয়ে সম্পর্কিত বিষয়াবলী লিপিবদ্ধ করা। এখানে লিপিবদ্ধকারীর লিঙ্গ প্রাসঙ্গিক হতে পারে না। আদালত নারীর ‘বিশেষ শারীরিক অবস্থার’ কথা বলে তাদের স্বাভাবিক ঋতুচক্র প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। আমাদের দেশের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এ-সংক্রান্ত যে বাধা বা অমর্যাদার সম্মুখীন নারীদের হতে হয়, তা রীতিমতো অবৈজ্ঞানিক এবং অমানবিক। একজন মানুষকে তার লৈঙ্গিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোন কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা সুস্পষ্টভাবে তার মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে শুরু করে ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে আমাদের দেশের নারীরা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারবিভাগ সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেখানে বিবাহ নিবন্ধনের কাজ একজন নারীর জন্য বিশেষ কঠিন হওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।

নারী অধিকার, নারীদের কাজের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুদীর্ঘ লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট অতিক্রম করেও দেশের অধিকাংশ নারী এখনও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি

উচ্চ আদালত সাধারণ মানুষের সুবিচার প্রাপ্তির শেষ আশ্রয়স্থল। সেখান থেকে এমন অবিবেচনা প্রসূত এবং ধর্মীয় গোঁড়ামিকেই বরং উৎসাহিত করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আয়েশা সিদ্দিকা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন যে, তিনি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। আশা করছি তিনি সেখানে ন্যায়বিচার পাবেন। এক্ষেত্রে তার ধৈর্যশীল ভূমিকা ও সাহসী পদক্ষেপ ভবিষ্যতে এ দেশের নারীদের সব ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে অংশগ্রহণের পথ সুগম করবে।

ঋতুচক্র একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, একে ‘শরীর খারাপ’ বা ‘অসুস্থতা’ নাম দিয়ে নারীকে অপবিত্র, অশুচি এবং কোন কাজের জন্য অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া অধিকাংশ নারীর জন্যই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিভিন্ন কুসংস্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত নারীবান্ধব পরিবেশ বা টয়লেট না থাকা তাকে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখে। এমনকি তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ রায় নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে আরও সংকুচিত করেছে। আদালতের রায়ের প্রভাব বা এর ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা রাখা যে কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে নিশ্চুপভাবে এসব পর্যবেক্ষণ মেনে নেয়া কঠিন হবে। এ ধরনের রায় অত্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে এবং সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।

প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম ধর্মে সুস্পষ্টভাবে মুসলিম নারী-পুরুষের মধ্যকার বিবাহকে একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একজন কাজী বা বিবাহ রেজিস্ট্রারের কাজ হচ্ছে বিয়ে নিবন্ধন করা। বিবাহ নিবন্ধন কোন ধর্মীয় আচার নয় বরং একটি রাষ্ট্রীয় রীতি মাত্র। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালনার শুরু থেকেই এর রাজনৈতিক-আইনি কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ ঘটেছে। নারীরা বিচারক হিসেবে, আইনজীবী হিসেবে বিবাহের বৈধতা নির্ধারণ, বৈবাহিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, সম্পদের বণ্টনসহ অন্যান্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। সেখানে বিবাহ নিবন্ধনের কাজ করায় নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের বিষয়টি নিতান্তই অমূলক। পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো যখন পেইড মেন্সট্রুয়াল লিভ (পিরিয়ড বা ঋতুচক্রকালীন পরিশোধিত ছুটি), বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন, ট্যাম্পুনসহ মাসিক-সংক্রান্ত দ্রব্যাদি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে পাবার সুবিধা করে দিচ্ছে (যেমন-ফিনল্যান্ড) তখন কোন সুনির্দিষ্ট পেশা থেকে নারীকে সরিয়ে রাখার প্রচেষ্টা একজন স্বাভাবিক মানুষকে সংক্ষুব্ধ করবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা সাধুবাদ জানাই আয়েশা সিদ্দিকাকে, যিনি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে প্রত্যাশা করছি যে আপিল বিভাগ সংবিধান প্রদত্ত নারী-পুরুষ সমঅধিকারের বিষয়টি বিবেচনার ভিত্তিতে রায় প্রদান করবেন।


লেখক : শান্তা ইসলাম, মানবাধিকার ও উন্নয়নকর্মী
link: বিয়ের কাজী হতে পারবে না নারী উচ্চ আদালতের রায়ের একটি পর্যালোচনা