অভিভাবকত্ব এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ

মুসলিম পারিবারিক আইনে প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী ও পুরুষ তাদের মতামত ও সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের দিনই রেজিস্ট্রেশন করা জরুরি; কিন্তু বিয়ের দিন যদি কোনো কারণে রেজিস্ট্রেশন করা না হয় সেক্ষেত্রে বিয়ের ৩০ দিনের মধ্যে অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে। বিয়ে রেজিস্ট্রি করার দায়িত্ব বর পক্ষের। বর পক্ষ যদি ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন না করে তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দুই বছর বা তদূর্ধ্ব মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৩ হাজার টাকা বা তদূর্ধ্ব জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

তালাক: একজন স্বামী যে কোনো কারণ দেখিয়ে বা বনিবনা না হলে তার খেয়ালখুশিমতো স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে; কিন্তু একজন স্ত্রীকে কাবিনের ১৮ নম্বর কলামে তালাক-ই-তৌফিজের ক্ষমতা দেওয়া থাকলেই কেবল সে স্বামীকে তালাক দিতে পারে। নিকাহ্নামায় তালাক-ই-তৌফিজের ক্ষমতা স্বামী না দিয়ে থাকলে সেই স্ত্রী যদি তার স্বামীকে তালাক দিতে চায় সেই ক্ষেত্রে স্ত্রীকে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় স্বামী বা স্ত্রী যেই তালাকের পদক্ষেপ গ্রহণ করুক না কেন তালাকের প্রসেস বা নিয়ম অনুযায়ী ৯০ দিন পর তালাক কার্যকরী হয়ে যাবে। অবশ্যই সিটি করপোরেশনের প্রক্রিয়ার মাধমে তালাকটি সম্পন্ন হবে। তালাক দেওয়াটা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আইনগত অধিকার।

বিপথগামিতার জন্য কি সন্তানরাই দায়ী?

সন্তানের জিম্মাদারিত্ব ও অভিভাবকত্ব: অভিভাবকত্ব বলতে আইনের ভাষায় বোঝায়—নাবালক, নির্বোধ ও উন্মাদ— যারা নিজের দেখাশোনা নিজে করতে অক্ষম, তাদের তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা বা অধিকার। অন্য অনেক আইন ব্যবস্থার মতো মুসলিম আইনেও বাবা হলেন সন্তানের আইনগত অভিভাবক। মা শুধু রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন বা জিম্মাদার হতে পারেন। জিম্মাদারিত্ব বলতে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সন্তানের লালনপালন, রক্ষণাবেক্ষণ, সার্বক্ষণিক দেখাশোনা এবং যত্ন করার অধিকারকে বোঝায়। যে যে কারণে সন্তানের অভিভাবকত্ব বা জিম্মাদারিত্বের উদ্ভব হয়, তা হল—স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ, স্বামীর মৃত্যু বা স্বামীর নিরুদ্দেশ। তখন সন্তান কার জিম্মায় থাকবে এই বিষয়গুলো নিয়ে শুরু হয় টানাহ্যাঁচড়া।

জিম্মার ব্যাপারে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো নাবালকের স্বার্থ ও কল্যাণ। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নাবালক সন্তানের কল্যাণ মায়ের কাছে থাকলেই সম্ভব। পুত্র সন্তান মায়ের জিম্মায় থাকবে সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং কন্যা সন্তান মায়ের জিম্মায় থাকবে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত। যেহেতু পিতা সন্তানের আইনগত অভিভাবক, সেক্ষেত্রে সন্তানের ভালোমন্দ সিদ্ধান্তে পিতার মতামতই অগ্রাধিকার পায়। পুত্রের বয়স সাত বছর এবং কন্যার বয়স বয়ঃসন্ধিকাল বা ১৮ বছর পার হয়ে যাওয়ার পর সন্তান মায়ের জিম্মায় থাকতে পারবে না, এমন ধারণা ঠিক নয়। বাবা সন্তানদের তার জিম্মায় নিতে চাইলে প্রথমে নিজেরা আলোচনা করে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে সন্তানের সঙ্গে দেখা করা বা আসা-যাওয়ার বিষয়টা ঠিক করে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে সমঝোতায় আসতে না পারলে সন্তানের জিম্মার জন্য আদালতের আশ্রয় নিতে হবে।

অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০-এর ১৭(ক) ধারা অনুযায়ী অভিভাবক নিযুক্তির জন্য পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে হয়। বাবার অনুপস্থিতিতে নাবালকের নিকটাত্মীয় বা প্রিয়জনই নয়, নাবালকের যে কোনো আত্মীয় কিংবা বন্ধুও পারিবারিক আদালতে অভিভাবক হওয়ার আবেদন করতে পারেন। আদালত বিবেচনা করে সন্তানের সঠিক ও উপযুক্ত কল্যাণের জন্য মা-ই সবসময়ের জন্য আদালতের আদেশবলে জিম্মাদারিত্বের অধিকার পেতে পারেন। সবক্ষেত্রেই আদালত সন্তানের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, বাবা আইনগত অভিভাবক হলেও সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে না। বা কাজের ক্ষেত্রে তাকে বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতে হয়। সন্তানের সার্বিক দায়িত্ব পালনে অনীহা এবং নিয়মিত ভরণপোষণ করে না; কিন্তু সন্তান মায়ের জিম্মায় থাকলে বাবা ভরণপোষণ প্রদান না করলেও মা শত চেষ্টা করেও সন্তানকে মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে আগলিয়ে রাখেন। কাজেই আদালত সন্তানের সার্বিক কল্যাণ বিবেচনা করে অভিভাবক নির্বাচন করে থাকেন।

মা দ্বিতীয় বিয়ে করার ক্ষেত্রে সন্তানের জিম্মাদারিত্বের অধিকার: এক্ষেত্রে আদালতের বিবেচ্য বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কার কাছে সন্তান বেশি ভালো থাকবে এবং সন্তানের মঙ্গল কার কাছে বেশি। কে সন্তানকে বেশি নিরাপত্তা দিতে পারবে এবং মোটামুটি বুঝতে পারে—এমন বয়সের সন্তান হলে তাদের মতামত কী সেটার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, আইনে তো বলা হয়েছে, মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে তিনি সন্তানের জিম্মাদার হওয়ার অধিকার হারাবেন; কিন্তু এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মোসা. ফাহমিদা বেগম বনাম হাবিব আহমেদ ১৯৬৯ : ডিএলআর (ডব্লিউপি) ২৪৫ মামলায় যা বলা হয়েছে, বা মুসলিম আইনের বইগুলোতে যা বলা হয়েছে আদালত ইচ্ছা করলে প্রয়োজনবোধে ভিন্ন মত পোষণ করতে পারেন। কারণ, এ সম্পর্কিত আইনগুলো কোরআনের আইন নয়। সুতরাং আদালত সন্তানের মঙ্গলের দিকে তাকিয়ে মুসলিম আইনের এই সব নীতিমালা থেকে সরে আসতে পারেন।

দুই সন্তানের মাঝে তিক্ততা, বুঝবেন যেভাবে

পিতা-মাতার করণীয় দিক: সন্তানের বাবা ও মায়ের মধ্যে বিয়ে শুধু একটি চুক্তির সম্পর্ক; কিন্তু সন্তানের সঙ্গে বাবা এবং মায়ের জন্মসূত্রে সম্পর্ক। এই সম্পর্ক থেকে সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বাবা এবং মায়ের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হলে উভয়পক্ষ সন্তানদের জিম্মা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করেন। সন্তান মায়ের কাছে থাকলে বাবার সম্পর্কে ভুল বা মিথ্যা কথা বললে সন্তানের বাবার প্রতি অশ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। ঠিক মা সম্পর্কে বাবা কোনো মিথ্যা কথা বললেও মা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা এবং স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে সন্তান বাধাগ্রস্ত হয়। সন্তানরা বাবা ও মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের ফলে ট্রমাটাইজ হয়ে পড়ে এই টানাহ্যাঁচড়ার কারণে। তাদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাবা ও মাকে খুবই প্রয়োজন। বিবাহবিচ্ছেদের পর বাবা-মা আলাদা থাকলেও কীভাবে সন্তানরা ভালো থাকবে সেই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করা এবং সন্তানের সার্বিক কল্যাণের বিষয়টি তাদের ভাবনার মধ্যে আনতে হবে। বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের প্রভাব যাতে সন্তানের ওপর না পড়ে সেদিকে বাবা-মাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সন্তানের ওপর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া:
সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের পারিবারিক অশান্তি ও মারামারির কারণে সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই শিশুরা অন্যের প্রতি একটুতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। কোথাও কারো সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না। তাদের ভেতর সবসময় ভয় কাজ করে। তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারে। এইসব শিশু বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলতে পারে এবং পরিবার ও সমাজের প্রতি নেতিবাচক ধ্যানধারণা নিয়ে বড় হয়ে উঠবে।


লেখক : সেলিনা আক্তার, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

ইত্তেফাক লিঙ্কঃ অভিভাবকত্ব এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১