সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   তদন্ত
   বিশেষ রচনা
   মত-অভিমত
   পরিবেশ
   কর্মশালা

   যোগাযোগ
    সম্পাদক, বুলেটিন
    আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
      ২৬/৩ পুরানা পল্টন লাইন
      ঢাকা-১০০০
      ইমেইল- ask@citechco.net,
            publication@askbd.org

আইন-আদালত

আইন-আদালত অধ্যায়টিতে সন্নিবেশিত হয়েছে আইন-পর্যালোচনা, সর্বোচ্চ বিচারালয়ের রায় ও ভারতের মুসলমানদের জন্য প্রণীত নতুন নিকাহনামাসহ সর্বমোট নয়টি রচনা। প্রথম পাঁচটি লিখেছেন এ টি এম মোরশেদ আলম। ট্রুথ কমিশন সর্ম্পকে লিখেছেন তাপস বন্ধু দাস আর সর্বশেষ তিনটির লেখক মিল্লাত হোসাইন।

জরুরি ক্ষমতা বিধিমালায় জামিন সংক্রান্ত- রায়
অপরাধ যদি জামিনযোগ্য হয় তাহলে জামিন লাভ করা হলো অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার। আর অপরাধ জামিনযোগ্য না হলে জামিন দেয়া অথবা না দেয়া হলো আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা। তবে জামিনের আবেদন করা হতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিরত করা যাবে না, এমনটাই হলো ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ও ৪৯৮ ধারার বিধান। কিন্ত্বু জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা ২০০৭-এর ১৯(ঘ) ধারার বিধান হলো, এ আইনে দায়ের করা মামলার অনুসন্ধান ও তদন- চলাকালে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে জামিনের আবেদন করতে পারবে না।

জরুরি ক্ষমতা বিধিমালায় ‘কোনো আদালত’ বলতে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগকেও অন-র্ভুক্ত করা হয়েছে কিনা মূল বিতর্ক গিয়ে দাঁড়ায় সেই জায়গাতে। ২৩ এপ্রিল ২০০৮ প্রধান বিচারপতি মোঃ রুহুল আমিনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রায় দেয় যে, জরুরি বিধিমালায় দায়ের করা মামলায় হাইকোর্টও জামিন দিতে পারবে না। অর্থাৎ ‘কোনো আদালত’ বলতে এখানে হাইকোর্টকেও অন-র্ভুক্ত করা হয়েছে বলে আপিল বিভাগের রায়ে প্রতিফলন ঘটেছে।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, সরকার ২১ মার্চ ২০০৭ জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধনী এনে জামিনের বিষয়ে কঠোর বিধান আরোপ করে। এরপর ভেজাল তেল সরবরাহের অভিযোগে আটক খুলনার ব্যবসায়ী মাইজউদ্দীন শিকদার হাইকোর্টে জামিনের আবেদন জানান। এর প্রেক্ষিতে জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশ কার্যকর থাকলে কেউ জামিনের আবেদন করতে পারবে কিনা সে বিষয়টি সামনে আসে। ৮ এপ্রিল ২০০৭ সরকার তৃতীয়বারের মতো জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশ সংশোধন করে জামিনের বিষয়টি কিছুটা শিথিল করে। এই শিথিলতার কারণেই ২২ এপ্রিল ২০০৭ বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী এবং বিচারপতি এস এম এমদাদুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন যে, সংশোধিত জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশের বিধানের আলোকে হাইকোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ও ৪৯৮ ধারায় জামিন আবেদন গ্রহণ করতে পারবে। তবে কাকে জামিন দেয়া হবে এ বিষয়ে বিবেচনা করার এখতিয়ার সম্পূর্ণ আদালতের। রায় ঘোষণার পূর্বে ‘কোনো আদালত’ বলতে কোন আদালতকে বোঝানো হয়েছে তা জানার জন্য বিশিষ্ট ৬ জন আইনজীবীকে আদালত অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) নিয়োগ দেন। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শুনানিতে অংশ নিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতাকে খর্ব করতে হলে আইনে তা স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তিনি আরও বলেন, সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে প্রদত্ত। এই ক্ষমতা খর্ব করা উচিত নয়। তাছাড়া, কোনো আদালত জামিন দিতে পারবে কিনা তাতে আদালতের এখতিয়ার থাকা উচিত, এক্ষেত্রে কোনো বাধানিষেধ থাকা উচিত নয়। সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এবং খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদও মত প্রকাশ করেন যে, জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশে মামলা হলেও আদালত জামিন আবেদন গ্রহণ ও বিবেচনা করতে পারবে। ‘কোনো আদালত’ প্রশ্নে আইনজীবীদের মত হলো, আদালত বলতে এখানে যে আদালতে মামলা বিচারাধীন, সেই আদালত বা তার ধারাবাহিক উচ্চতর আদালতকে বুঝানো হয়েছে। সুপ্রিমকোর্ট যেহেতু ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে গঠিত কোনো আদালত নয়, বরং এটা সংবিধানের মাধ্যমে সৃষ্ট, তাই আদালত বলতে সুপ্রিমকোর্টকে বুঝাবে না। জামিন আবেদন বিবেচনা করতে পারবে মর্মে হাইকোর্ট যে রায় ঘোষণা করে তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে সরকার তা স'গিত করার জন্য আপিল বিভাগে আবেদন জানায়। ২৪ মে ২০০৭ আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স'গিত করে সরকারকে লিভ টু আপিল দায়ের করতে বলে। এরপর সরকারের লিভ টু আপিল আবেদনের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ লিভ মঞ্জুর করে তা নিয়মিত আপিল হিসেবে গ্রহণ করেন। এই নিয়মিত আপিলই মঞ্জুরপূর্বক আপিল বিভাগ চূড়ান- রায় ঘোষণা করেন যে, জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশে মামলা হলে হাইকোর্টও জামিন দিতে পারবে না।

পূর্বে ৬ মার্চ ২০০৮ অনুরূপ একটি মামলায় আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করেছিল যে, জরুরি ক্ষমতা আইনের আওতায় দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে জামিন দেয়ার ক্ষমতা হাইকোর্ট বিভাগের নেই। দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার স্ত্রী অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা ও মীর মোঃ নাসির উদ্দিনের ছেলে মীর হেলাল উদ্দিনকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন আদেশের বিরুদ্ধে সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন আপিল করলে প্রধান বিচারপতি মোঃ রুহুল আমিনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই রায় দেন।

ঐ মামলা থেকে জানা যায়, ২০০৭ সালের ৪ জুলাই সংসদ ভবনের বিশেষ জজ আদালত সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে মীর নাসিরকে ১৩ বছর ও তার ছেলে মীর হেলালকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেন। অন্যদিকে ঘুষ নেয়ার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় আদালত ২৭ আগস্ট ২০০৭ নাজমুল হুদাকে ৭ বছর ও তার স্ত্রী সিগমা হুদাকে ৩ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। মীর হেলাল অবৈধ সম্পদ অর্জনে তার বাবাকে এবং সিগমা হুদা ঘুষ গ্রহণে স্বামীকে সহায়তা করেছেন- এই অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় তাদের পৃথক রায়ের মাধ্যমে সাজা দেয়া হয়।

এই রায়ের বিরুদ্ধে নাজমুল হুদা, সিগমা হুদা, মীর নাসির ও মীর হেলাল হাইকোর্টে পৃথক আপিল দায়ের করেন। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৭ সিগমা হুদা ও মীর হেলালের আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এই দু’জনের জামিন মঞ্জুর করেন। হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেন, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জামিন দেয়ার এখতিয়ার হাইকোর্টের আছে।

জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা-২০০৭-এর ১১(৩) বিধিতে বলা হয়েছে, দুর্নীতি সম্পর্কিত অপরাধের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে আপিল আদালত আপিল শুনানি চলাকালীন জামিন দিতে পারবে না। এমনকি দণ্ডাদেশ বা রায়ের কার্যকারিতাও স'গিত করা যাবে না। এই বিধির ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার ও দুদক ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর আপিল দায়ের করে। শুনানিতে দুদকের আইনজীবী আনিসুল হক এবং অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল আদালতকে বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত কেউ জামিন পাবে না বলে আইনে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণাকালে বলেন, জরুরি ক্ষমতা আইনে দণ্ডপ্রাপ্তদের জামিন দেয়ার ক্ষমতা আপিল আদালতের নেই। তবে অল্প দণ্ডের ক্ষেত্রে আসামি গুরুতর অসুস' বলে চিকিৎসা বোর্ডের সনদ থাকলে জামিন বিবেচনা করা যেতে পারে। আপিল বিভাগের উল্লিখিত দুটি রায়ের ফলে এখন উভয় ক্ষেত্রেই জামিন আবেদন করার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল। প্রথমত, জরুরি ক্ষমতায় অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন আবেদন করতে পারবে না এবং দ্বিতীয়ত, এই আইনে সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি আপিল চলাকালে আপিল করতে পারবে না। অর্থাৎ হয়রানিমূলকভাবে অথবা ভুলক্রমে যদি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশে মামলা দায়ের করা হয়, তাহলে যত ছোট অপরাধই হোক আদালতের মাধ্যমে নিরপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন- তার জামিন লাভের কোনো সুযোগ থাকলো না।

সর্বশেষ পরিস্থিতি
আপিল বিভাগের রায়ে সারাদেশে বিশেষতঃ আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এমতাবস'ায় আপিল বিভাগ অবশেষে জরুরি আইনের আওতায় জামিনদানের নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করার উপায় সম্পর্কে একটি নিদের্শনা প্রদান করেছে। প্রধান বিচারপতি মোঃ রুহুল আমিনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রায় ঘোষণা করে যে, জরুরি বিধিমালার ১৯(ঘ) ধারায় মামলা হলে হাইকোর্ট জামিন দিতে পারবে না ঠিকই, কিন্ত্বু যদি ১৬(২) ধারায় সন্দেহভাজন হিসাবে কাউকে আটক করা হয় তাহলে জামিন দিতে পারবেন। রায়ের অনুলিপিতে দেখা যায়, কোনো মামলা যদি উপযুক্ত ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দায়ের না হয় এবং সর্বোপরি আদালত যদি দেখতে পান যে মামলা দায়েরের যথোপযুক্ত কারণ না থাকা সত্ত্বেও অসদুদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে জরুরি বিধিমালা জামিন দানের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আপিল বিভাগ এক্ষেত্রে ‘সন্দেহভাজন’ এবং ‘অভিযুক্ত’ শব্দ দুইটির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে বলেছেন, ১৬(২) ধারায় ‘সন্দেহভাজন’ হিসাবে গ্রেফতার করা হলে জামিন দানের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের সামনে কোনো বাধা নেই।

জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব
১৯৭১ সালের পরে যাদের জন্ম এবং ঐ সময় যারা নাবালক ছিল সেসব আটকেপড়া পাকিস্তানি বাংলাদেশের নাগরিক। বিচারপতি এম এ রশিদ ও বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ১৮ মে ২০০৮ এরূপ রায় ঘোষণা করেন। আটকেপড়া পাকিস্তানিদের সংগঠন ‘স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানি ইয়ুথ রিহ্যাবিলিটেশন মুভমেন্টে’র সভাপতি সাদাকাত খানসহ ১১ জন আটকেপড়া পাকিস্তানির আবেদনের প্রেক্ষিতে এ রায় দেন হাইকোর্ট। ওই সময়ের পরে জন্ম ও ওই সময়ে নাবালক ব্যক্তিরা ভোটার তালিকায় অন-র্ভুক্তিসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলেও অভিমত দেন আদালত। সেই সাথে রিট আবেদনকারী ১১ জন আটকেপড়া পাকিস্তানিকে সরাসরি ভোটার তালিকায় অন-র্ভুক্তির জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

হাইকোর্ট রায়ে বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ২০০৭ সালের ১৪ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে একটি পত্র পাঠান। পত্রে পাকিস্তানি ক্যাম্পে বসবাসরত উর্দু ভাষাভাষীদের ভোটার তালিকায় অন-র্ভুক্ত করার পক্ষে নির্বাচন কমিশন মত দেয়। পত্রে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী ১৬টি ক্যাম্পে বসবাসরত এক লাখ ৬০ হাজার অবাঙালির মধ্যে যাদের জন্ম ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে হয়েছে এবং যারা ওই সময় নাবালক ছিল, তারা বাংলাদেশের নাগরিক। তারা ভোটার তালিকায় অন-র্ভুক্ত হওয়া, ভোটার পরিচয়পত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী।

রিট আবেদনে বলা হয়, সারাদেশের ৭৪টি বিহারি ক্যাম্পে প্রায় ৩ লাখ উর্দুভাষী বিহারি বাস করছে। এদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ বিহারি ভোটার হওয়ার যোগ্য। ভোটার হওয়ার যোগ্য বিহারিদের মধ্যে অধিকাংশের জন্ম হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। ১৯৭২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যারা বাংলাদেশে স'ায়ীভাবে বসবাস করছিল তারা এবং তাদের উত্তরসূরিরা বাংলাদেশের নাগরিক। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, তাদের বাংলাদেশের আনুগত্য স্বীকার করতে হবে।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, কোনো শিশু যে ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করে জন্মসূত্রে সে ঐ দেশেরই নাগরিক হয়। সুতরাং ১৯৭১ সালের পরে যাদের জন্ম তারা জন্মসূত্রেই এই দেশের নাগরিক। আর যাদের জন্ম ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পূর্বে তারাও এই দেশের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। তাই তারাও এই দেশের নাগরিক। তাছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদে এটা স্বীকৃত যে, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রহীন থাকতে পারে না। অথচ আটকেপড়া পাকিস্তানিরা রাষ্ট্রহীন। পাকিস-ান তাদের ফেরত নেয়ার কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করে না, আবার বাংলাদেশও তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। এমতাবস'ায় আদালতের কাছে তাদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করার আবেদন জানানো হয়। শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণা করেন যে, ‘৭১ সালের পরে জন্ম এবং ঐ সময় নাবালক ছিল তারা বাংলাদেশের নাগরিক। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া।

কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানের মামলা পর্যালোচনা
১৭ সপ্টেম্বর ২০০৭ দৈনিক প্রথম ালোর বিশেষ ক্রোড়পত্র আলপিনের ৪৩১তম সংখ্যায় মোঃ আরিফুর রহমানের একটি কার্টুন ছাপা হয়। অভিযোগ করা হয়, এর মাধ্যমে মহানবী মুহাম্মদ (সঃ)-কে বিড়াল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং হাঁটুর নিচ পর্যন- লম্বা জামা ও টুপি পরিহিত কল্পমূর্তির সামনে বিড়াল কোলে নিয়ে চারটি স-রে যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে তাতে মুহাম্মদ (সঃ)-কে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এবং এতে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা হয়েছে। এই অভিযোগে আরিফকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭ আটক করা হয়। এর আগে অবশ্য তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৭ আরিফকে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করা হয় এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩(১) ধারার অধীনে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীকালে আরো দু’দফা আটকাদেশের মেয়াদ বর্ধিত করা হয়। কার্টুন প্রকাশের ঘটনায় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭ বাদ জুমা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স'ানে কয়েকটি ইসলামি সংগঠন জরুরি অবস'ায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে (ভোরের কাগজ, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭)। তৌহিদী জনতা নামক একটি সংগঠন প্রথম আলো ও সাপ্তাহিক ২০০০-এর প্রকাশনা বাতিল এবং প্রকাশক-সম্পাদকদের শাস্তি-র দাবিতে ৯ নভেম্বর ২০০৭ বাদ জুমা প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে (ইনকিলাব, ১০ নভেম্বর, ২০০৭)।

মামলা দায়ের
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরিফের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা দায়ের হয় ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ কুমিল্লায়। জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট এস এম আলী আজাদ বাদি হয়ে ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, প্রকাশক মাহফুজ আনাম ও কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে। ম্যাজিস্ট্রেট শাহীন আক্তার বাদির অভিযোগ আমলে নিয়ে কুমিল্লার কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন-পূর্বক আইনানুগ ব্যবস'া গ্রহণের নির্দেশ দেন।

একই দিন আরো একটি মামলা হয় চট্টগ্রাম আদালতে। পটিয়া আল-জামেয়া আল-ইসলাম মাদ্রাসার প্রশাসনিক কমকর্তা মোহাম্মদ রেজা প্রথম আলোর সম্পাদক, প্রকাশক ও কার্টুনিস্টের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী ও মানহানির অভিযোগ আনা হয়। এক্ষেত্রেও মহানগর হাকিম আমিনুল আহসান মামলাটি গ্রহণ করে প্রথম আলোর প্রকাশককে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন এবং ‘আলপিন’ প্রকাশনা সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেন।

যশোর কালেকটরেট জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা এ টি এম শোবাইব অপর একটি মামলা দায়ের করেন ২৩ অক্টোবর ২০০৭। যশোরের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয় এই অভিযোগে যে, প্রথম আলোর রম্য ম্যাগাজিন আলপিনে মহানবীকে (সাঃ) বিড়াল বলে আখ্যায়িত করা ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিপ্রায়ে হাঁটুর নিচ পর্যন- লম্বা জামা ও টুপি পরিহিত কল্পমূর্তির সামনে বিড়াল কোলে নিয়ে চারটি স-রে যে ছবি প্রকাশিত হয়, তাতে একজন মুসলমান হিসেবে বাদি ব্যথা পায়।

ঢাকায় মামলা দায়ের হয় ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৭। তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দণ্ডবিধির ২৯৫ক ধারার অধীনে সি আর মামলা নং ২২৯৮/২০০৭ দায়ের করে আরিফের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ আনে। সংশ্লিষ্ট ধারার ভাষ্য দণ্ডবিধির ২৯৫ক ধারায় বলা হয়েছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিপ্রায়ে কোনো কথা বলা বা কোনো কিছু শব্দ বা চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা এই ধারার অধীনে দণ্ডনীয়। তবে উক্ত ব্যক্তির অভিপ্রায় ইচ্ছাকৃত এবং বিদ্বেষপূর্ণ হওয়া চাই। এই ধারার উপাদান তখনই পূর্ণ হয় যখন এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, পরিকল্পিতভাবে এবং বিদ্বেষাত্মকভাবে কোনো ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে [পিএলডি ১৯৬২ লাহোর ৮৫০ (এফবি)]। গ্রেফতারের পর আরিফ ব্যাখা করে বোঝান যে, প্রকাশিত কার্টুনটি আসলে তার গ্রামে বহুল প্রচলিত একটি কৌতুকের পুনরাবৃত্তি এবং এর মাধ্যমে কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। তবে কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি তার জন্য ক্ষমাও প্রার্থনা করেন। তাছাড়া, প্রথম আলোর সম্পাদক নিজেও একাধিকবার ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সম্পাদক মতিউর রহমান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব উবায়দুল হকের হাত ধরে মাফ চান এবং তওবা করেন যে, ভবিষ্যতে আর এ ধরনের ভুল করবেন না (প্রথম আলো, সমকাল, ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৭)।

দেশের ২৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক আরিফুর রহমানের মুক্তি দাবি করে গত ২৪ জানুয়ারি ২০০৮ প্রধান উপদেষ্টা, ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে একটি আবেদন পাঠান। এছাড়া ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক ২২ জানুয়ারি ২০০৮ দেশের পত্রিকাগুলোতে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠান, যেখানে আরিফুর রহমানের মুক্তি দাবি করা হয়।

সর্বশেষ পরিস্থিতি
অন্যান্য জেলায় দায়েরকৃত মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঢাকায় দায়েরকৃত সি.আর. মামলা নং ২২৯৮/২০০৭-এর চার্জ গঠনের জন্য শুনানি হয় ২৯ জানুয়ারি ২০০৮। শুনানির দিন আরিফের পক্ষের আইনজীবীরা বলেন, আরিফ কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য কার্টুনটি আঁকেননি। এর দ্বারা কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগবে জানলে তিনি এ কাজ করতেন না। তাঁরা বলেন, ইতোপূর্বে কিশোর কণ্ঠ নামের একটি ম্যাগাজিনে একই ধরনের একটি কার্টুন ছাপা হয়েছিল [১৯৯৮ সালে কিশোর কণ্ঠ-এর নভেম্বর সংখ্যায়। যিনি কৌতুকটি পাঠিয়েছিলেন তিনি হলেন জামিবাবাদ এম এস ইন সি মাদ্রাসা, ফেনীর ছাত্র মুহাম্মদ মাসুদ], তখন কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ আনা হয়নি। সুতরাং আরিফ ২৯৫ক ধারার অধীনে কোনো অপরাধ করেনি বলে আইনজীবীরা দাবি করেন এজন্য তাকে মামলার দায় হতে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন জানান। এখানে উল্লেখ্য, কিশোর কণ্ঠ হলো জামায়াতে ইসলামীর কিশোর প্রকাশনা। শুনানি শেষে ২০ মার্চ ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত আরিফুর রহমানের উপসি'তিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৭ ধারার আবেদন বিবেচনা করে তাকে মুক্তির আদেশ দেন। আদালতের আদেশ কারাগারে পৌছানোর পর ঐদিনই তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এদিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরিফুর রহমানের আটকাদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি রিট মামলায় বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার ও বিচারপতি মামনুন রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ এই সিদ্ধান- প্রদান করেন।

সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত- হাইকোর্টের রুল
বংলাদেশের সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে যেসব দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার মধ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ হলো একটা দায়িত্ব। সংবিধানের ১১৯(১)(গ) ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন এই সংবিধান ও আইনানুযায়ী সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করবে। সংবিধানে প্রদত্ত এই ক্ষমতার আলোকেই নির্বাচন কমিশন ২৯ এপ্রিল ২০০৮ গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একটি খসড়া প্রকাশ করে জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৩৩টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে এবং ১৬৭টি আসনের সীমানা অপরিবর্তিত রাখে।

সীমানা পুনর্নির্ধারণের এই গেজেট বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে ঢাকা-২ (নবাবগঞ্জ-দোহার) আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ বি এম নুরুল ইসলাম সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পৃথক দুটি রিট আবেদন দাখিল করেন। আবেদন দুটির শুনানি শেষে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ নির্বাচনী আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা সংক্রান্ত- ২৯ এপ্রিলের নির্বাচন কমিশনের গেজেট বিজ্ঞপ্তি কেন সংবিধান পরিপন'ী ও আইনসঙ্গত কর্তৃত্ব-বহির্ভূত হিসেবে ঘোষণা করা হবে না- মর্মে রুল জারি করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ৬ জনকে রুল জারির দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলেন হাইকোর্ট।

মামলার শুনানির সময় রিটকারীর পক্ষে বলা হয়, ২০০১ সালে আদমশুমারি হয়েছে। আদমশুমারির রিপোর্ট ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে। সাত বছর পর পুরনো আদমশুমারি অনুযায়ী নির্বাচনী আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল পরবর্তী আদমশুমারির জন্য অপেক্ষা করা।

ভোটার তালিকা রেজিস্ট্রেশন করার পর সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংবিধান পরিপন'ী। ভোটার তালিকা প্রণয়নের আগেই প্রয়োজন হলে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। কিন্ত্বু বর্তমানে নির্বাচন কমিশন শতকরা ৮০ ভাগ ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছে বলে রিটকারীর পক্ষে দাবি করা হয়।

আদালতে যুক্তি উত্থাপন করা হয় যে, সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদের ভাষ্য অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধু একটি নির্বাচনী এলাকার ভোটার হবেন এবং সেই অনুযায়ী তিনি ওই এলাকায় ভোট দিতে পারবেন। সুতরাং ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ অসাংবিধানিক।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ সালাউদ্দিন আহমেদ সীমানা পুনর্নির্ধারণের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সংবিধান অনুযায়ী কমিশনকে এই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সীমানা পুনর্নির্ধারণ অধ্যাদেশ-১৯৭৬ অনুযায়ীই সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশে বলা আছে, নির্বাচন কমিশন সীমানা পুনরায় বিন্যাস করলে এ নিয়ে আপত্তি উত্থাপন করা যাবে। তবে এ নিয়ে কেউ মামলা করলে অতিদ্রুত তা খারিজ হয়ে যাবে।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে ২৯ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এ ব্যাপারে আপত্তি দেয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। যে কেউ নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণের ব্যাপারে আপত্তি জানাতে পারে। নির্বাচন কমিশন শুনানির পর এই আপত্তিগুলোর নিষ্পত্তি করবে। কিন্ত্বু সেই সুযোগ না নিয়ে সরাসরি আদালতের কাছে আসা হয়েছে। রিটকারী আব্দুল মান্নানের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, অ্যাডভোকেট তৌফিক এনাম টিপু, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং ব্যারিস্টার মেহনাজ মান্নান।

হাইকোর্টের রায়
৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন না করে
সংবিধান লঙ্ঘন করেছে ইসি

বাংলাদেশ সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদের বিধান হলো, “মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।” জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার সাংবিধানিক এই বিধানকে বাধ্যতামূলক বলে অভিমত দিয়ে হাইকোর্টের একটি রায়ে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন না করে নির্বাচন কমিশন সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। এই লঙ্ঘনের প্রতিকার সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা না দিয়ে রায়ে বলা হয়, নির্বাচন বিলম্বিত করে সংবিধান লঙ্ঘনের বিষয়ে পরবর্তী সংসদই সিদ্ধান- গ্রহণ করবে। রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বর ’০৮-এর মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করাকে আদালত ‘যুক্তিসঙ্গত’ সময় বলে ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন হলফনামা দিয়ে বলেছে, রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বর ২০০৮-এর মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন হবে। এটা গ্রহণ করা ছাড়া আদালতের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।

বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ ও বিচারপতি মোঃ আশফাকুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ২২ মে ২০০৮ এরূপ রায় ঘোষণা করেন। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মাসুদ রেজা সোবহানের দায়েরকৃত একটি জনস্বার্থ রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ২৭ জানুয়ারি ২০০৮ হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন [রুলের বিস-ারিত দেখুন, বুলেটিন- মার্চ ২০০৮ সংখ্যা]। এই রুলেরই শুনানি শেষে আদালত উক্তরূপ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত বলেন, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বর ২০০৮-এ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা হবে যৌক্তিক। সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক। সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর ৯০ দিন অতিক্রম করা যাবে এমন ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া হয়নি। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনের মেয়াদ বাড়ানোর কোনো ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে যথাসময়ে নির্বাচন শেষ করে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

বিচারপতিদ্বয় রায়ে অভিমত ব্যক্ত করেন, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ নামের এ প্রজাতন্ত্রকে হতে হবে গণতান্ত্রিক। যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে। প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নির্দেশ রয়েছে এ অনুচ্ছেদে। নির্বাচন সম্পন্ন করতে ১২৩(৩) অনুচ্ছেদের বিধানটিকে ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদের আলোকেই বিবেচনা করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল যথাসময়ে নির্বাচন সম্পন্ন করা, যাতে করে জনগণের প্রতিনিধিরা দেশ চালাতে পারে। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব ছিল নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা। কিন্ত্বু তারা এসব কিছুই না করে সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। রায় প্রদানকালে আদালত বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ১২ মে ২০০৮ জাতির উদ্দেশে ভাষণে ডিসেম্বরে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেন। সংবিধানের কোথাও প্রধান উপদেষ্টাকে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার ক্ষমতা দেয়া হয়নি। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার জন্য নির্বাহী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদিও তিনি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এরপরও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে আলাদা করা দরকার বলে আদালত অভিমত দেন।য়

ট্রুথ কমিশন
উপদেষ্টা পরিষদ স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ অধ্যাদেশ ২০০৮ (ট্রুথ কমিশন) চূড়ান-ভাবে অনুমোদন করেছে। দুর্নীতির অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে এই ট্রুথ কমিশন গঠিত হচ্ছে। দুর্নীতি করেছেন এমন ব্যক্তি এই কমিশনের কাছে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে এবং দুর্নীতিলব্ধ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে শাস্তি- থেকে রেহাই পেতে পারেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদিত এ আইন সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে জানা যায়, এই আইনের অধীনে একটি আধা বিচারিক (ছঁধংর ঔঁফরপরধষ) কমিশন গঠিত হবে।

কমিশন একজন চেয়ারম্যান ও দু’জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। তাঁদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। এ কমিশন আবার সরকারের কাছে সর্বোচ্চ ছয়টি সাব-কমিশন গঠনের সুপারিশ করতে পারবে। কমিশনে চেয়ারম্যান বা সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে-
  • একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি
  • সচিব পর্যায়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
  • মেজর জেনারেল পদমর্যাদার নিচে নন এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
  • একজন প্রথিতযশা নাগরিক, যিনি নিজ পেশায় অর্থবহ অবদান রেখেছেন এই চার ধরনের ব্যক্তিকে বিবেচনা করা হবে। কমিশনের সুপারিশে গঠিত সাব-কমিশনগুলো হবে দু’জন করে সদস্য নিয়ে। তাঁদের পদমর্যাদা হবে কমিশনের সদস্যদের এক ধাপ নিচে।

  • সাব-কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে-
  • সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি
  • ন্যূনতম অতিরিক্ত সচিব ছিলেন এমন একজন সরকারি কর্মকর্তা
  • ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার নিচে নন এমন একজন সামরিক কর্মকর্তা
  • নিজ পেশায় সফল একজন প্রথিতযশা নাগরিক।
এই চার ধরনের ব্যক্তিদের বিবেচনা করা হবে। কমিশনে আবেদন প্রেরিত হতে পারে তিনভাবে: দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আবেদন করতে পারবেন; গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত- জাতীয় সমন্বয় কমিটির অধীন টাস্কফোর্স, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছায় তাঁর দুর্নীতির বিষয় ট্রুথ কমিশনে পাঠাতে পারবে;

আইন অনুযায়ী তদন-কারী প্রতিষ্ঠানের কাছে কেউ স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের আবেদন করলে তদন-কারী প্রতিষ্ঠান তা কমিশনে পাঠাবে। আবেদন বিবেচনা করে কমিশন দুই ধরনের আদেশ দিতে পারবে। স্বেচ্ছায় তথ্য প্রকাশকারী ব্যক্তি দুর্নীতি করে যে পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন তার সমপরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা দেয়া বা যে অর্থ, স'াবর-অস'াবর সম্পত্তি, সম্পদ ও ব্যবসার মালিক হয়েছেন তা রাষ্ট্রের কাছে জমা দেয়া। এই ট্রুথ কমিশন গঠনের প্রসঙ্গ এর আগে কয়েকবার আলোচনায় এলেও এবারই প্রথম এ খসড়া উপদেষ্টা পরিষদের কাছে পেশ করা হয় এবং অনুমোদিত হয়। এ আইনের পক্ষে-বিপক্ষে দু’দিকেই জোরালো যুক্তি দেয়া হচ্ছে। অনেকে আবার এ উদ্যোগকে দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজ দমনে সরকারের ‘আপোষহীন’ অবস'ান থেকে পিছু হটা হিসেবে দেখছেন। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যে ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে তাতে বিনিয়োগ কমে দেশের অর্থনীতির যে রুগ্ন দশা হয়েছে তা থেকে উত্তরণের জন্য এবং একইসাথে দুর্নীতি সংক্রান্ত- মামলার চাপ কমানোর উদ্দেশ্যেই মূলত এই আইন। কিন্ত্বু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এর ন্যায়সঙ্গত ভিত্তি নিয়ে। একই অপরাধ করার জন্য কেউ শাস্তি- ভোগ করবে আর কেউ অর্থ ফেরত দিয়ে ক্ষমা পাবে এটি সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের পরিপন'ী। আইনে দুর্নীতির দায়ে ইতোমধ্যেই যাদের বিচার শুরু হয়েছে বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়েছে তারা এ স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ আইনের কোনো সুবিধা পাবেন না। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, অপরাধ বা উদ্দেশ্যের দিক থেকে তাদের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? যাদেরকে এ আইনের সুযোগ থেকে বারিত করা হচ্ছে এ আইন আগে থাকলে বা অভিযান শুরুর সময় করা হলে তারা যে স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্য প্রকাশ করত না সে কথা নিশ্চিত করে কে বলতে পারে? কাজেই এ সন্দেহ তো থেকেই যাচ্ছে সরকার তার পছন্দসই লোকজন যাদের দুর্নীতি আর চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব না তাদেরকে বাঁচানোর একটা পথ করে দিতেই এ ব্যবস'া করছে। যখন এ ধরনের ট্রুথ কমিশন হয় তখন মূলত অপরাধের ধরন এবং মাত্রার দিকটি বিবেচনা করা হয়। সাধারণত লঘুতর অপরাধের ক্ষেত্রেই ন্যূনতম শাস্তি-র ব্যবস'া করে অপরাধীদের একটা অংশকে ছাড় দেয়া হয়। বলা হচ্ছে অস্ত্র, মাদকদ্রব্য, পতিতাবৃত্তি, সন্ত্রাস, হত্যা, ধর্ষণ ও মানুষ পাচারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কমিশন কাজ করবে না। কিন্ত্বু এ অপরাধগুলো তো এমনিতেও দুর্নীতি থেকে আলাদা করে দেখা হয়। এতে দুর্নীতির তো কোনো শ্রেণীকরণ হচ্ছে না। যদিও এখনও গেজেট প্রকাশিত হয়নি, তবু প্রকাশিত কোনো খবরেই আইনটিতে দুর্নীতির মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী দুর্নীতির একটি শ্রেণী বিভেদ করার কোনো মাপকাঠি নির্দেশিত হয়েছে বলে উল্লেখ নেই। সেক্ষেত্রে এসব কিছুই কমিশন বিবেচনা করবে এবং এখানেও সেই আগের সন্দেহই ঘনীভূত হচ্ছে। এ কমিশনকে আধা-বিচারিক বলা হলেও এর সিদ্ধানে-র বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। তাই সব মিলিয়ে আসন্ন এ আইনের অপপ্রয়োগের সম্ভাবনাই প্রবলতর হচ্ছে। আইন পাসের আগে আইনের খসড়া প্রকাশ করে নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়ার প্রয়োজনও সরকার অনুভব করেনি।য়

সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, ২০০৮
গত ১৯ মে ২০০৮ উপদেষ্টা পরিষদে পাস হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, ২০০৮। অনেকদিন ধরেই এরকম একটি আইন প্রণয়ন করা হবে এমন কথা শোনা যাচ্ছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশে জঙ্গিবাদ যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে, তখন থেকেই এ আইনটি প্রণয়নের তোড়জোড় চলছিল। ২০০৬ সালে সন্ত্রাসবিরোধী একটি বিল মন্ত্রিসভায়ও উত্থাপিত হয়। সেখানে বিলটির খসড়া পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্ত্বু এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদেও ইতোপূর্বে তিন-তিনবার বিলটির খসড়া উত্থাপিত হয়। কিন্ত্বু তিনবারই ফেরত পাঠানো হয়।

এই আইনে সন্ত্রাসের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা হলো- কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য জনসাধারণের কোনো অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে কোনো কাজ করতে বা করা হতে বিরত রাখতে বাধ্য করতে পারবে না। এসব উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ করলে বা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করলে তা সন্ত্রাসী কাজ বলে বিবেচিত হবে। এধরনের সন্ত্রাসের উদ্দেশ্যে কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য, দাহ্য বস', আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য কোনো প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করলে বা নিজ দখলে রাখলে ওই ব্যক্তি সন্ত্রাসী কাজ করেছে বলে বিবেচিত হবে। এটা ফৌজদারি কার্যবিধির সন্ত্রাসের সংজ্ঞার অনুরূপ। তবে এতে যে নতুন বিষয়গুলো যোগ করা হয়েছে সেগুলো হলো, নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়া বা এ ধরনের সংগঠনের পক্ষে প্রচার বা সমপ্রচার, সন্ত্রাসী কাজে অর্থ জোগান দেয়া, সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেয়া ইত্যাদিকেও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এই আইনের অপরাধগুলোর বিচারের জন্য এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে। তবে ট্রাইব্যুনাল গঠনের আগে পর্যন- জেলা বা অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচার করা যাবে। ট্রাইব্যুনাল ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করবে। রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা যাবে হাইকোর্ট বিভাগে।

এই আইন অনুযায়ী সন্ত্রাসী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি- হবে মৃত্যুদণ্ড। সন্ত্রাসী কাজে অর্থ জোগানদাতার জন্য সর্বোচ্চ ২০ বছর থেকে সর্বনিম্ন তিন বছর পর্যন- সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ব্যবস'া রাখা হয়েছে। এবং সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহৃত অর্থের লেনদেন চিহ্নিত করা ও তা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস'া নেয়ার ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে।

নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়ার জন্য ছয় মাস পর্যন- জেল, জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এ ধরনের সংগঠনের পক্ষে প্রচার বা সমপ্রচার চালানোর শাস্তি- হচ্ছে সাত বছর পর্যন- সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধের আসামিকে আশ্রয় দিলে আশ্রয়দাতার অনধিক পাঁচ বছর পর্যন- সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে। যাবজ্জীবনের ক্ষেত্রে তার পরিমাণ তিন বছর জেল ও জরিমানা।

সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশন নিয়ে আইনি লড়াই তুঙ্গে
চারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৮ এপ্রিল ২০০৮ এক আদেশে তিন মাসের জন্য স'গিত ঘোষণা করেছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য গঠিত সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশনের কার্যক্রম। একই সঙ্গে ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশন অধ্যাদেশ-২০০৮’ কেন অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে তার কারণ দর্শাতে সরকারের ওপর রুলনিশি জারি করা হয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে সরকার আপিল বিভাগের দ্বারস' হলে আপিল বিভাগ গত ২০ মে হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের ওপর স'গিতাদেশ দেন। ফলে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশনের কার্যক্রম চালাতে আইনি কোনো বাধা থাকলো না। আপিল বিভাগ এক মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির জন্যও হাইকোর্ট বিভাগকে নির্দেশ দেন।

সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশনের গঠন প্রক্রিয়া, কার্যক্রম ও সুপারিশ অগ্রাহ্য করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এই রিট আবেদন দাখিল করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান জনস্বার্থে এ রিটটি দায়ের করেন।

খবরের কাগজের সূত্রে জানা গেছে, ইতোপূর্বে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার ইকতেদার আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশন অধ্যাদেশ জারি করার আগে প্রধান বিচারপতির সাথে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা যায়, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ৯ জন অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। প্রধান বিচারপতি এই পদে নিয়োগের জন্য ১০ জনের নাম সুপারিশ করেছেন। ২৭ এপ্রিল রিটটি উত্থাপিত হলে সরকার পক্ষের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে উপসি'ত না থাকায় পরদিন শুনানির তারিখ ধার্য করা হয়। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত এ নির্দেশ দেয়। রিট আবেদনে বলা হয়, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি নিয়োগের কমিশনে ৬ জনের পদমর্যাদা হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির নিচে। হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগের কমিশনে বিচারপতির অধস-ন কেউ সদস্য হতে পারেন না। এ যেন সচিব পদে পদোন্নতিতে যুগ্ম সচিব, উপ-সচিব ও সহকারী সচিব সমন্বয়ে পদোন্নতি কমিটি গঠনের মতো।

আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে শুনানিকালে জানানো হয়, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কমিশন অধ্যাদেশ-২০০৮ গত ১৬ মার্চ জারি করা হয়। এতে ৯ জনের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠনের কথা বলা হয়। তাদের কাজ হবে হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ, স'ায়ীকরণ ও আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা। কিন্ত্বু যে প্রক্রিয়ায় কমিশন গঠন করা হয়েছে তা এবং কমিশনের কর্মপদ্ধতি ও সুপারিশ পদ্ধতি অসাংবিধানিক। এটা সংবিধানের ৭ (সংবিধানের প্রাধান্য), ২২ (নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ), ৯৪ (সুপ্রিম কোর্টের গঠন), ১১১ (সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বাধ্যতামূলক কার্যকারিতা) ও ১১২ (রাষ্ট্রের সব অঙ্গের সুপ্রিম কোর্টের সহায়তা) সংক্রান্ত- অনুচ্ছেদগুলোর পরিপন'ী। এটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতারও পরিপন'ী।

আবেদনকারীর পক্ষে আরো জানানো হয় যে, কমিশনের ৯ সদস্যের মধ্যে প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের দু’জন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছাড়া বাকি ৬ জন নির্বাহী ও আইন বিভাগের লোক। এরা হলেন-আইনমন্ত্রী, আইন সচিব, অ্যাটর্নি জেনারেল, সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি। এতে তাই বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কোনো প্রাধান্য থাকবে না। অন্যদিকে কমিশনের সিদ্ধান- গৃহীত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। ফলে এখানে নির্বাহী বিভাগের সদস্যদের মতামতই প্রাধান্য পাবে। এদের মধ্যে আবার পদমর্যাদায় ৫ জন হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিচে অবসি'ত। পৃথিবীর কোনো দেশে এমন কোনো বিধান নেই যে, যে পদে নিয়োগ দেয়া হবে তার নিম্নপদস' ব্যক্তিকে নিয়োগ কমিটিতে রাখা হয়। এছাড়া কমিশনের অনেক ধারা সংবিধান পরিপন'ী। তারপরও কমিশনের সুপারিশ অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়েছে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয়কে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বিচারপতি নিয়োগের জন্য আইন মন্ত্রণালয় থেকে যেসব নাম উপস'াপন করা হবে তার বাইরে কোনো নাম বিবেচনা করার ক্ষমতা প্রধান বিচারপতিকে দেয়া হয়নি। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, রায় দেয়ার স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা রক্ষার স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। আবেদনকারীর পক্ষে আরো বলা হয়- বিচারকরা বিচারপতি নিয়োগ করবেন, আর সংসদই সংসদ নেতা নির্বাচন করবে। কিন্ত্বু নির্বাহী বিভাগের লোকজনকে বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা প্রদান অসাংবিধানিক। তাছাড়া সাংবিধানিক পদে মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার বিধান নেই। কিন্ত্বু এ অধ্যাদেশে এই বিধান রাখা হয়েছে। রিটে আইন সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে মামলায় বিবাদি করা হয়েছে। উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত কমিশনের কার্যক্রম স'গিত করে রুল জারি করেছিলেন। পরবর্তী
কালে গত ১২ মে সরকার হাইকোর্ট বিভাগের আদেশের ওপর স'গিতাদেশ চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন জানালে চেম্বার জজ বিচারপতি এমএ মতিন আবেদনটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। রিট আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে মামলা পরিচালনা করেন ড. শাহদীন মালিক। সরকারপক্ষে এই স'গিতাদেশের ওপর বিরোধিতা করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল সালাউদ্দিন আহমেদ। সর্বশেষ: বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচনার মুখে গত ১ জুন উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে কমিশনের সদস্যপদে রদবদল করে অধ্যাদেশটি সংশোধন করা হয়। এতে আইন সচিব ও সরকার ও বিরোধীদলীয় দুই জন সংসদ সদস্যের অন-র্ভুক্তি বাতিল করা হয়। তার বদলে আপিল বিভাগের ৩য় জ্যেষ্ঠ বিচারক এবং হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দু’জন বিচারককে কমিটিতে অন-র্ভুক্ত করা হয়।

ভারত
মুসলমানদের জন্য নতুন নিকাহ্‌নামা
অল ইন্ডিয়া মুসলিম উইমেন পারসোনাল ল’ বোর্ড (সংক্ষেপে উইমেন বোর্ড) সেখানকার মুসলিমদের জন্য একটি নতুন নিকাহ্‌নামা (কাবিননামা) প্রণয়ন করেছে। ২০০৮ সালের ১৬ মার্চ লক্ষ্ণৌতে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। একে তারা ‘শরিয়ত নিকাহ্‌নামা’ নামে অভিহিত করেছেন, যার অর্থ হলো- এটা সম্পূর্ণরূপে কোরআন, হাদিস ও শরিয়ত অর্থাৎ ইসলামি আইনকানুন মেনেই তৈরি করা হয়েছে। তাদের মতে, এই নতুন কাবিননামা মুসলিম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করবে।

ভারতে বর্তমানে আরো দুটি নিকাহ্‌নামা চালু আছে। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসোনাল ল’ বোর্ড (সংক্ষেপে পারসোনাল বোর্ড) ও অল ইন্ডিয়া শিয়া মুসলিম পারসোনাল ল’ বোর্ড ইতোমধ্যেই তাদের ‘মডেল নিকাহ্‌নামা’ প্রকাশ করেছে। নতুন নিকাহ্‌নামা শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহে আবদ্ধ হতে বর-কনের জন্য ১৭ দফা হেদায়েতনামা এবং তালাকের জন্য ৮টি দফার বিধান করা হয়েছে। হেদায়েতনামায় জোরপূর্বক বিবাহ এবং বিবাহে যৌতুক নেয়াকে অগ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিকাহ্‌নামার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-এতে বিবাহের নিবন্ধন এবং বিবাহকালে তিনটি ফরম পূরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর একটি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, একটি বর-কনে এবং অপরটি যিনি বিবাহ পড়ান তিনি পূরণ করবেন; এসএমএস, ইমেইল, টেলিফোন ও ভিডিও কনফারেনসিংয়ের মাধ্যমে প্রদত্ত তালাককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; প্ররোচনার বশে দেয়া তালাককে বাতিল করা হয়েছে; একজন মুসলিম নারী নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ‘খুলা’ (নারীর স্বউদ্যোগে তালাক দেয়ার অধিকার, সাধারণত কোনো কিছুর বিনিময়ে হয়ে থাকে) তালাক দেয়ার অধিকারী হবেন যদি- তার স্বামী অন্য কোনো নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক থাকে; যদি তাকে অসঙ্গত যৌনতায় লিপ্ত হতে বাধ্য করে এবং যদি স্বামী এইডসে আক্রান- হয় বা বিবাহের পূর্বে ও পরে এইচআইভি স্ট্যাটাস প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায়; যেক্ষেত্রে তালাক সম্ভব নয় সেসব ক্ষেত্রে একজন নারী নিম্নলিখিত অবস'াগুলোতে পৃথকভাবে বসবাসের অধিকারী হবেন-যদি স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থাকে; এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শারীরিক সম্পর্কের অনুপসি'তি; স্বামী যদি ৪ বছরেরও বেশি কাল ধরে স্ত্রীর খোঁজখবর না নেন; যদি স্বামী তার স্ত্রী ও সন-ানদের দেখাশোনা করতে ব্যর্থ হন; যদি স্বামী স্ত্রীর প্রতি খারাপ আচরণ বা নির্যাতন করেন। খাদ্য, বস্ত্র ও জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য অন্যান্য বিষয় যোগাতে ব্যর্থতা এমনকি স্বামী যদি তালাক মঞ্জুর করতে না চায় তবে তাও পৃথকাবাসের জন্য বৈধ কারণ বলে বিবেচিত হবে। পৃথকাবাসের ক্ষেত্রে স্ত্রী দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী হবেন। খুলা তালাক কার্যকর করার জন্য নারীদের দারুল কাযা বা শরিয়ত আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে। তালাক কার্যকর হলে বিবাহকালে এবং পরবর্তীকালে প্রাপ্ত যাবতীয় উপহার সামগ্রী কনের সম্পত্তি বলে গণ্য হবে। তালাককে বৈধ হতে হলে তা উচ্চারণের তিন মাস সময় পর কার্যকর হবে। স্বামী-স্ত্রীকে বিষয়টি নিয়ে পুনর্বার ভাবার অবকাশ দিতেই এই সময় প্রয়োজন বলে মন-ব্য করা হয়েছে। মুসলিম নারীরা ২০০৫ সালে পারসোনাল ল’ বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত ‘আদর্শ নিকাহ্‌নামা’র এই বলে সমালোচনা করেন যে, এতে নারীদের কোরআনসম্মত অধিকারগুলোকে খুব একটা গুরুত্বের চোখে দেখা হয়নি। এটা ‘তিন তালাক’- এর মতো বিতর্কিত বিষয়টির সুরাহা যথাযথভাবে করতে পারেনি। যেসব পুরুষ তাদের স্ত্রী ও সন-ানদের প্রয়োজনীয় ভরণপোষণের ব্যবস'া না করে পরিত্যাগ করে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকারের ব্যবস'া রাখেনি। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের মতো বিষয়গুলোকেও এতে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। যদিও এই ‘আদর্শ নিকাহ্‌নামা’য় কিছু গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে কিন্ত্বু বাধ্যকরী শক্তি না থাকার কারণে বাস-বে এগুলোর তেমন কার্যকারিতা নেই। নতুন নিকাহ্‌নামা হিন্দি ও উর্দু উভয় ভাষায় প্রকাশের ব্যবস'া রাখা হয়েছে। যাতে সাধারণ নারী-পুরুষ তাদের বৈবাহিক অধিকার ও দায় দায়িত্বগুলোকে সহজে অনুধাবন করতে পারে। অন্যদিকে পারসোনাল ল’ বোর্ড নতুন নিকাহ্‌নামাটিকে ‘আবর্জনা’, ‘অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক’ ইত্যাদি বলে প্রত্যাখ্যান করতে বেশি সময় নেয়নি। এআইএমপিএলবি-এর একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং মুখপাত্র মওলানা খালিদ রশিদ ফিরাঙ্গীমহলী ( Maulana Khalid Rasheed Firangimahali ) বলেন যে, আমাদের প্রকাশিত নিকাহ্‌নামা যেখানে আছে, সেখানে অন্য একটির স'ান কোথায়? আমাদেরটি সম্পূর্ণভাবে কোরআন ও শরিয়তসম্মত এবং ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে সেখানকার ইসলামি আইনবিশারদরা ‘শরিয়ত নিকাহ্‌নামা’কেই সমর্থন করছেন। মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞ এবং ভারতের আইন কমিশনের সদস্য ড. তাহির মাহমুদ এর দুটি বিশিষ্ট দিক- ফোন, এসএমএস বা ইমেইলের মাধ্যমে প্রদত্ত তালাক এবং নারীদের খুলা তালাক দেয়ার অধিকারকে নির্দেশ করে বলেন যে, এ দুটোই আক্ষরিক ও অন-র্নিহিত তাৎপর্য উভয় দিক থেকেই সম্পূর্ণরূপে শরিয়তসম্মত। কারো কারো চোখে এটা প্রচলিত আইনের বিপরীত বলে মনে হলেও মুসলিম আইনে পক্ষদের স্বাধীনভাবে বিবাহ চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার সুস্পষ্ট অধিকার দেয়া হয়েছে এবং শরিয়তের বাধ্যকরী বিধানগুলোকে লঙ্ঘন না করে পক্ষরা বিবাহের সময় তাদের পছন্দ-অপছন্দগুলোকে সীমাবদ্ধ করতে ক্ষমতাসম্পন্ন। নতুন নিকাহ্‌নামায় সেরকম কোনো বিধানকে লঙ্ঘন করে না এবং চুক্তিভুক্ত পক্ষদের নিজেদের চুক্তি থেকে উদ্ভূত দায়দায়িত্ব সীমাবদ্ধ করতে পারার আইনি বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণরূপে বৈধ। তাছাড়া নতুন নিকাহ্‌নামার বিধানাবলি বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশে প্রচলিত মুসলিম আইন ব্যবস'া এবং ‘তালাক আইন’-এর ক্ষেত্রে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের দেয়া ব্যাখ্যার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।য়

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট