সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   তদন্ত
   বিশেষ রচনা
   মত-অভিমত
   পরিবেশ
   কর্মশালা

   যোগাযোগ
    সম্পাদক, বুলেটিন
    আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
      ২৬/৩ পুরানা পল্টন লাইন
      ঢাকা-১০০০
      ইমেইল- ask@citechco.net,
            publication@askbd.org

মত-অভিমত

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে উত্তরাধিকার সংক্রান- বিধান, মুসলিম আইনে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য ও নারী উন্নয়ন নীতি, ২০০৮ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত আইন বিভাগের ক’জন ছাত্রছাত্রীর মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ সবক’টি বিষয়ে মতামত জানিয়েছেন, কয়েকজন আবার শুধু একটি প্রসঙ্গে বলেছেন। মত-অভিমতের এ অংশে তা পত্রস্থ হয়েছে।

সৈয়দা নাসরীন লিমা
তৃতীয় বর্ষ, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মুসলমানদের উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ নামে যে আইনটি প্রণীত সেটি মূলত শরিয়া আইনকে অনুসরণ করে। ১৯৬১ সালের এই আইনটির মাধ্যমে মুসলিম আইনে উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১৯৬১ সালের আগে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে তার পূর্বে মৃত সন্তানের ছেলে বা মেয়েরা কোনো সম্পত্তি পেত না। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি হতে তার মৃত ছেলে-মেয়ের সন্তানরা সরাসরি বঞ্চিত হতো। কিন্ত্বু মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি হতে তার পূর্বে মৃত সন্তাননের মধ্যে সম্পত্তি দেয়ার বিধান রাখা হয়। প্রতিনিধিত্বের আইন (Hindu Widow Rights to Property Act 1937) অনুসারে এর মাধ্যমে পূর্বে মৃত ব্যক্তির সন্তানরা মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি পাবে এবং সেই পরিমাণ সম্পত্তি পাবে যা তার পিতা/মাতা (অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির ছেলে/মেয়ে) পেত।

মিসর ও সুদানে প্রথম এই সমস্যাটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব দেশে প্রতিনিধিত্বের আইন অনুসারে পূর্বে মৃত ব্যক্তির সন্তানদের মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি হতে ১/৩ অংশ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এই আইনানুসারে পূর্ব মৃত ব্যক্তির সন্তানরা মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি হতে যে কোনো অবস্থায় ১/৩ পাবে এবং সম্পত্তি বিভাজনের সময় সর্বপ্রথম তাদেরকে দিয়ে দেয়ার বিধান রাখা হয়। কিন্ত্বু আমাদের দেশে উপর্যুক্ত আইনটিকে সরাসরি অনুসরণ করা হয়নি। আমাদের দেশে যখন প্রতিনিধিত্বের আইনটি প্রথম প্রচলন করা হয় তখন মুসলিম অনুসারীদের অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিসহ সাধারণ মানুষও এর সমালোচনা করে। এবং এই সমালোচনা এখন পর্যন- বিদ্যমান। তাদের যুক্তি হলো, এটি মূল শরিয়া আইনের বিরোধী। তাদের আরও যুক্তি হলো, এক্ষেত্রে যদি পূর্বে মৃত সন্তানের মাত্র ১ জন সন্তান থাকে তবে সে একই সাথে তার চাচার সম্পত্তির বেশি বা সমান পাচ্ছে। যদিও আত্মীয় হিসেবে তারা মৃত ব্যক্তি হতে চাচার থেকে বেশি দূরে অবস'ান করছে। যেখানে মুসলিম আইনে কাছের আত্মীয় দূরের আত্মীয়কে বঞ্চিত করে। শুধু তাই নয়, পূর্বে মৃত সন্তানদের সম্পত্তি দেয়ার কারণে অনেক সময় বর্তমান কোরানিক অংশীদারদের অনেকই অবশিষ্টাংশভোগীতে পরিণত হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেউ কেউ বাদও পড়ে যায়। কিন্ত্বু আমার মনে হয় উপর্যুক্ত নিয়মে অর্থাৎ বর্তমান নিয়মে কোনো ভুল ধরার কথা নয়। কারণ এক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি হতে তার পূর্বে মৃত সন্তানেরা বেশি সম্পত্তি পাচ্ছে না বরং সেটাই পাচ্ছে যেটা তার বাবা/মা জীবিত অবস্থায় পেত। তাই এখানে সমস্যাটি কোথায়, সেটা আমার বোধগম্য নয়?

তবে এই আইনের একটি আপত্তিকর দিক রয়েছে। এই আইনটি শুধু পূর্বেমৃত সন্তানের সন্তানদের সম্পত্তি দেয়ার ব্যবস'া করেছে কিন্ত্বু পূর্বেমৃত সন্তানের স্ত্রী/ বিধবাকে সম্পত্তিতে কোনো অংশীদারিত্ব দেয়নি। আমাদের দেশেHindu Widow Rights to Property Act 1937 এই আইনটির মাধ্যমে পূর্বে মৃত সন্তাননের বিধবাকে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে অংশীদারিত্বের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অথচ মুসলিম অধ্যুষিত এবং মুসলিম দেশ হিসেবে নিজেদের স্বীকৃতি দানের পরও এত বড় একটা অসামঞ্জস্যতা নিয়ে আমরা কেউ সচেতন নই।

বৈষম্য আমাদের দেশে বিদ্যমান মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে নারী-পুরুষের মধ্যে বিশেষ কিছু বৈষম্য বেশ লক্ষণীয়। যেমন-

  • ১. প্রথমেই বলা হয় সমমানের (Collateral) নারী-পুরুষের মধ্যে সর্বদাই ছেলে ২ ভাগ ও মেয়ে ১ ভাগ পাবে। অর্থাৎ ছেলে পাবে মেয়ের দ্বিগুণ। এই বিধানের যৌক্তিকতা কী সেটা আমার বোঝার বাইরে।


  • ২. ২. আবার যখন কেবল মৃত ব্যক্তির স্ত্রী, মা ও বাবা উত্তরাধিকার হিসেবে থাকে তখন মা-বাবার কারণে অবশিষ্টাংশভোগী হয়ে যায়। অর্থাৎ সে তখন আর কোরানিক উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তি না পেয়ে অবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে পায়।


  • ৩. ৩. মুসলিম আইনে সম্পত্তির এক বড় অংশ মৃত ব্যক্তির অবশিষ্টাংশভোগীরা পায়। এক্ষেত্রে এদের একটি তালিকা রয়েছে। দুঃখের বিষয়, এই তালিকায় কোনো নারী নেই।


  • ৪. যদিও মুসলিম পণ্ডিতরা বলেন পুরুষের তুলনায় বেশি জন নারীকে মুসলিম আইনে কোরানিক উত্তরাধিকার হিসেবে স্বীকৃত দেয়া হয়েছে। তাদের এই যুক্তি সত্যি, কিন্ত্বু দুঃখের বিষয় হলো এই নারী উত্তরাধিকারে অনেকেই তার সমমানের পুরুষের কারণে অবশিষ্টাংশভোগী হয়ে যায়। যেমন- পুত্রের উপস্থিতিতে কন্যা, বৈমাত্রেয় ভাইয়ের উপস্থিতিতে বৈমাত্রেয় বোন, আপন ভাইয়ের উপসি'তিতে আপন বোন ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় কথা, সব ক্ষেত্রেই পুরুষেরা নারীর তুলনায় বেশি পায়। পুরুষের দোহাই দেয়, মেয়েরা মোহরানা পায়। তাই দুই মিলিয়ে সম্পত্তি পুরুষের সমান হয়। এই খোঁড়া যুক্তি মোটেও ঠিক নয়। কেননা মোহরানা স্ত্রীর কাছে পুরুষের ব্যক্তিগত দায়। এটার সাথে উত্তরাধিকার সম্পত্তির কোনো সম্পর্ক নেই। আর বর্তমান মেয়েরা আর পুরুষের ওপর অর্থনৈতিকভাবে আগের মতো নির্ভরশীল নেই। যখন আইনটি করা হয়েছিল তখনকার সমাজব্যবস্থা আর বর্তমান সমাজব্যবস্থা অবশ্যই এক নয়। এখন মেয়েরা নিজেরাও তার পরিবারের ব্যয়ভার বহন করে। তাই এ বৈষম্যের আইন অবশ্যই পরিবর্তন করা উচিত।


  • ৫.২০০৮ সালের জাতীয় নারী নীতিমালা
    ৮ মার্চ যখন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নারী নীতির ঘোষণা দিলেন শুনে খুব ভালোই লেগেছিল। ভেবেছিলাম এত বড় কঠিন কাজ এই সরকার কি সত্যি করতে পারবে? অবশেষে যা ভয় পেলাম তাই হলো। নারী-পুরুষের সঠিক সমতায়ন যে আমাদের দেশে সত্যি কতটা কঠিন তা বোধহয় আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্পত্তিতে বা জাতীয় সবক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও অবস'ান সমান হলে পুরুষের সমস্যা কোথায়? নারীদের সমান হতে না দিয়ে তারা কি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়, নাকি নারীদের শোষণ-শাসন করতে চায়? নাকি তারা ভয় পান- পাছে অদূর ভবিষ্যতে নারীরা পুরুষের থেকে বেশি এগিয়ে গিয়ে যদি তাদের অধস-ন করে রাখে! যেরকমটি তারা করে চলছে আমাদের সাথে। তবে একটি ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি আমি বিশেষভাবে আকর্ষণ করতে চাই। এদেশের সরকার যদি সত্যিই নারীর অবস্থান সবক্ষেত্রে সমান করতে চান, তবে তার এরকম আলাদা নীতি করে তথাকথিত মৌলবাদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া নারীর সমানাধিকার ও সমতায়ন নিশ্চিত করার দায়ভার শুধু সরকারেরই নয়, এ দায়িত্ব সবার। নারীদের সমতায়ন নিশ্চিতের পথে যদি ছেলেরা বাধা হয়ে আসতে পারে, তারা ধর্মের খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে যদি পথে নামতে পারে, তখন আমরা নারীরা কেন পিছিয়ে থাকবো? নারীরা কেন বেরিয়ে আসবে না? তারা কেন প্রতিবাদের ঝড় তুলে সরকারকে বাধ্য করবে না তাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য? আমাদের দেশের নারীরা আধুনিক হতে পেরেছে কিন্ত্বু ঐক্যবদ্ধ হয়ে বের হতে পারেনি।

জহিরুল আলম
৩য় বর্ষ, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে একটি যুগান-কারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এই আইনের ধারা ৪-এ বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার আরম্ভ হওয়ার আগে মৃত ব্যক্তির কোনো পুত্র বা কন্যার মৃত্যু ঘটলে সেই উত্তরাধিকার আরম্ভ হওয়ার ফলে উক্ত পুত্র বা কন্যার জীবিত সন্তানগণ যদি কেউ থাকে সেক্ষেত্রে, উক্ত মৃত পুত্র বা কন্যা জীবিত থাকলে যা পেত তার সন্তানগনও ততটুকুই পাবে।

৪ ধারাটি সংযোজিত হয়েছে এতিমদের স্বার্থ রক্ষার্থে। কারণ, পূর্বে তারা মুসলিম আইনে কিছুই পেত না। তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, সাধারণত পুরুষরা, নারীদের থেকে বেশি অংশ পেয়ে থাকে কিন্ত্বু এখানে মৃত পিতা বা মাতার সন্তান ছেলে বা মেয়ে যা-ই হোক না কেন সমান সমান অংশ পাবে। কিন্তূ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে যেমন, মিসরে উইলের মাধ্যমে এই এতিমদের দিয়ে দেয়ার জন্য বলা হয়েছে; যেহেতু ইসলাম উইলকে উৎসাহিত করে।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ও বৈষম্য
বাংলাদেশের মুসলিম উত্তরাধিকার আইনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, সম্পত্তির অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের চেয়ে কম সম্পত্তি পেয়ে থাকে। যেমন- মৃত ব্যক্তির এক কন্যা এবং এক পুত্র আছে, এক্ষেত্রে পুত্র কন্যার দ্বিগুণ সম্পত্তি পাবে। আবার নারী-পুরুষ অনেক ক্ষেত্রে সমান সমান সম্পত্তিও পায়। যেমন- মৃত ব্যক্তির দুই কন্যা, মা, বাবা থাকে। তাহলে মা এবং বাবা উভয়ই ১/৬ অংশ করে পাবে এবং কন্যা পাবে ১/৩ অংশ করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম পারিবারিক আইন কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করছে, যা কি না আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ এবং ২৮(২)-এর সাথে সাংঘর্ষিক। অনুচ্ছেদ ২৭ বলছে দেশের সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং ২৮(২) বলছে, রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারীপুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন।

নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০০৮
অনেকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০০৮ মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০০৮ পড়ার পর দেখা যায় নীতিমালার কোথাও উত্তরাধিকার শব্দটি নেই। তবে ১৯৯৭ সালের নারী উন্নয়ন নীতিমালার অনুচ্ছেদ ৭.২-এ উত্তরাধিকার শব্দটি ছিল। পরে ২০০৪ এবং ২০০৮ সালের দুই নীতিমালাই এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। তাহলে এই ব্যাপারটি থেকে বোঝা যায় সরকারের উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করার কোনো ইচ্ছা নেই। তবে তিনটি নারী উন্নয়ন নীতিমালাতেই সিডও বাস-বায়নের কথা বলা হয়েছে।

সিডও- এর অনুচ্ছেদ (তিন) ৩-এ বলা হয়েছে, পুরুষের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারসমূহ প্রয়োগ ও ভোগে নারীকে নিশ্চয়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে এবং নারীর পূর্ণ উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, রাষ্ট্রসমূহ সকল ক্ষেত্রে বিশেষ করে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নসহ সকল উপযুক্ত ব্যবস'া গ্রহণ করবে।

এখানে যেহেতু, অর্থনৈতিক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তাই এর মধ্যে পরিবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি লাভের ক্ষেত্রেও সমান অধিকার দিতে হবে, এই ব্যাপারটিকেও ইঙ্গিত করে। যদিও নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০০৮- এ উত্তরাধিকার শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছে তারপরও সিডও বাস-বায়নের জন্য উত্তরাধিকার আইনকে পরিবর্তন করতে হবে।

মুঃ মাহদী হাসান খান
৩য় বর্ষ, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৬১ সালের এই আইন মুসলিম উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন এনেছে। এই আইনের ধারা-৪-এর মাধ্যমে মুসলিম পারিবারিক আইনে প্রতিনিধিত্বের মতবাদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম শরিয়া আইনের একটি সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, নিকটবর্তী আত্মীয়রা দূরবর্তীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে থাকে। অর্থাৎ যদি কোনো একজন পূর্বপুরুষের মৃত্যুর সময় তার সন্তান বেঁচে থাকেন তবে ঐ পূর্বপুরুষের নাতি-নাতনিরা সম্পদ পাবে না। এই সাধারণ নিয়মটি থেকে একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়। দেখা গেল একটি পরিবারে পিতার মৃত্যুর আগেই তার ছেলে মারা গেছেন। আর মৃত্যুকালে তিনি সন্তান(ছেলে/মেয়ে) রেখে গেছেন। কিন্ত্বু যেহেতু পূর্বে মৃত ছেলের সন্তানরা দূরবর্তী-অবস'ানে(আত্মীয়তার ধারায়) রয়েছেন সে কারণে। তারা উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হবেন, কেবল ব্যক্তির জীবিত সন্তানরাই উত্তরাধিকারী হবেন। কিন্তূ প্রতিনিধিত্বের মতবাদ-এর মাধ্যমে মৃত ছেলের সন্তানদের মৃত সন্তানের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করে তার প্রাপ্য অংশ তাদের দেয়া হয়।

এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মৃত সন্তানের সন্তানদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূরীভূত হয় এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে নারী-পুরুষ বৈষম্য মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের কিছু ক্ষেত্রে নারী পুরুষের অর্ধেক পাচ্ছে। একজন মৃত ব্যক্তির ১ ছেলে ও ২ মেয়ে থাকলে ছেলে একাই দুই মেয়ের সমান সম্পত্তি পাচ্ছে। এটি শুধু ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রেই নয় অন্য আত্মীয়দের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন মৃত ব্যক্তির বাবা-মা তার সম্পত্তি থেকে সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে। একইভাবে মৃত স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর প্রাপ্য অংশ আর মৃত স্ত্রীর সম্পদ থেকে স্বামীর প্রাপ্য অংশেও বৈষম্য বিদ্যমান।

নারী উন্নয়ন নীতি, ২০০৮

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষ সমতার কথা বলে। ২০০৮ সালের নারী উন্নয়ন নীতির ভূমিকা অংশে সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯ ও ৬৫ নং অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের বিষয়টি বলা হয়েছে। ১৯৯৭ ও ২০০৪-এর নারী উন্নয়ন নীতিকে অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রেখেই ২০০৮ সালের নারী দিবসে নারী উন্নয়ন নীতি, ২০০৮ ঘোষিত হয়। এই নীতির প্রথমদিকে বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে জেন্ডার সংবেদনশীলতা ও বিশেষত নারীর আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে রাষ্ট্র কর্তৃক এ যাবৎ সময়ে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখনো বাংলাদেশে জেন্ডার বৈষম্যের যে উপসর্গগুলো বিদ্যমান তার পেছনে সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রচণ্ডভাবে ক্রিয়াশীল। তার একটি উদাহরণ আমরা ২০০৮-এর নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণার পরবর্তী সময়ে এই বিষয়ে দৃশ্যমান উগ্র প্রতিক্রিয়া থেকে পাই। এ ধরনের মনোভাবের কারণেই অনেক ক্ষেত্রে প্রণীত আইনের প্রয়োগ ব্যাহত হয় অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জিত হয় না।

যদিও ২০০৮ সালের নারী উন্নয়ন নীতির ১ম থেকে ৫ম অধ্যায় অর্থাৎ ১ থেকে ২৩ নং ধারায় কোথাও উত্তরাধিকার কথাটির উল্লেখ নেই তথাপি এই নীতির মাধ্যমে এই নীতির ভাষ্যমতে সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সিডও-তে নারী অধিকারের যে বিষয়গুলো স্বীকৃত, ২০০৮ সালের এই নীতিতে তার বাস-বায়নের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, এই নীতিতে সকল বৈষম্য শব্দদ্বয় ব্যবহার মাধ্যমে মূলত সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য দূরীকরণের কথা বলা হয়েছে।

সরকার যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে পারিবারিক আইনসমূহে বিদ্যমান বৈষম্যসমূহ নিরসন ও নারী অধিকারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। সে ক্ষেত্রে উগ্র ধর্মীয় গোঁড়ামি অথবা ধর্মের ছদ্মাবরণে কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে এটি বাস-বায়নে পিছপা হলে সেটি হবে অবহেলিত নারী সমাজের প্রতি আরো একটি প্রহসন।

মাবরুক মোহাম্মদ
২য় বর্ষ, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারায় প্রতিনিধিত্বের মতবাদ অন-র্ভুক্ত হয়েছে যা পূর্ববর্তী আইনে ছিল না। প্রতিনিধিত্বের মতবাদ অনুযায়ী কোনো মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান উত্তরাধিকার শুরুর পূর্বে মৃত্যুবরণ করলে এবং মৃত্যুর সময় কোনো সন্তান রেখে গেলে ঐ সন্তান মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ততটুকু অংশ পাবে যা তার পিতা-মাতা জীবিত থাকলে পেতেন।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে নারী-পুরুষের বৈষম্য

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে নারী সব ক্ষেত্রেই পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। আবার একাধিক বোন এবং একজন ভাইয়ের উপসি'তিতে যে ১ঃ২ অনুপাতে সম্পত্তি ভাগ হয়। সে অনুযায়ী বোনদের সম্মিলিত অংশ যখন প্রত্যেকের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয় তা খুবই নগণ্য। কিন্ত্বু এই অংশ যত নগণ্যই হোক, বাস-বে আমাদের সমাজের নারীরা তাও পায় না।

আবার ওমরিয়াতান নীতি অনুযায়ী, যদি মৃত ব্যক্তির স্বামী/স্ত্রীর সাথে পিতা ও মাতা উত্তরাধিকারী হয়। তবে স্বামী/স্ত্রী এর অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ ২ঃ১ অনুপাতে পিতা ও মাতার মধ্যে বণ্টিত হয়, যেখানে পিতা ২ অংশ ও মাতা ১ অংশ পাবে। কিন্ত্বু যদি মূল কোরআনিক উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তি বণ্টন করা হয় তবে স্বামী/স্ত্রী ও মাতার অংশ বণ্টনের পর অবশিষ্টভোগী হিসেবে পিতা সম্পত্তি পাবে। সেই অনুযায়ী পিতার অংশ মাতার চেয়ে কম (স্বামীর বর্তমানে) বা সামান্য বেশি (স্ত্রীর বর্তমানে) হবে। কিন্ত্বু নারী-পুরুষের অনুপাত ২ঃ১ ঠিক রাখতে গিয়ে এই নীতির প্রচলন। ফলে যেক্ষেত্রে এই নীতি প্রয়োগ করা হয় সেখানে নারী আবারও বৈষম্যের শিকার।

২০০৮ সালের জাতীয় নারী নীতি

বাংলাদেশে প্রথম নারী নীতি ঘোষণা করা হয় ১৯৯৭ সালে যা ২০০৪ সালে মন্ত্রিপরিষদে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই পরিবর্তন করা হয়। ১৯৯৭ সালে সব ক্ষেত্রেই নারীর সমঅধিকারের বিষয়টি ২০০৪ সালে এসে পরিবর্তন করা হয়, যা ২০০৮ সালের নীতিতে পুনর্স'াপিত হয়েছে। সার্বিক বিচারে ২০০৮ সালের জাতীয় নারী নীতিকে বলা যায় অত্যন- যুগোপযোগী, আধুনিক, প্রগতিশীল বিচক্ষণ একটি নীতি। যদিও কিছু গোষ্ঠী এটিতে উত্তরাধিকার সংক্রান- বিষয় নিয়ে আপত্তি তুলেছে, আর সরকারও ঘোষণা দিয়েছে যে, এর মাধ্যমে উত্তরাধিকার সংক্রান- কোনো আইন পরিবর্তন করা হয়নি।

যে কোনো দেশের জনসংখ্যার অর্ধাংশই হচ্ছে নারী। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অর্ধাংশকে ঠকিয়ে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। একটি সমৃদ্ধশালী দেশ ও জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন সমগ্র কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস। আমাদের সংবিধানে সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলা আছে। আর আমাদের নারীরা ইতোমধ্যে তাদের কর্মক্ষমতা প্রমাণ করেছে। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস গার্মেন্টস মূলত পরিচালিত হচ্ছে নারী শ্রমিক দ্বারা। মেয়েদের শিক্ষার ও পাসের হার বেড়েছে। নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা প্রমাণ করেছে। তাদের এই মেধার স্বীকৃতি আমাদের অবশ্যই দিতে হবে। বর্তমানে সব পেশায় সফল নারীর দৃষ্টান- রয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে- সুযোগ পেলে তারা পুরুষের সাথে সমানভাবে কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে সমর্থ। দেশের সমৃদ্ধির জন্য তাদের মেধাকে আমাদের কাজে লাগানো উচিত এবং এটি সম্ভব তাদের যথাযথ প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়ে। আমাদের দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র অত্যন- ভয়াবহ। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের উপায় নারীর ক্ষমতায়ন। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নারী কখনোই পুরুষের ওপর নির্ভরশীল নয়, সে নিতে পারে নিজের সিদ্ধান-। তাই নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সব ক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষভাবে নিশ্চিত করতে হবে সম্পত্তিতে তার অধিকার - সেটা যত সামান্যই হোক। একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন- ইসলাম সর্বদা নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে। কিন্ত্বু বর্তমানে যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে এই নীতির বিরোধিতা করছে তারা কখনোই এটি উল্লেখ করে না। যখন কোনো মেয়ে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়, ধর্ষিত হয় কিংবা বখাটেদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়, তখন এই গোষ্ঠী একটিবারের জন্য প্রতিবাদ করে না। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে ধর্মের যে অবস'ান তা তুলে ধরে না। তাদের এই এক পেশে নীতি অবশ্যই নিন্দনীয়, তাই এই নীতি প্রণয়নে যারা ধর্ম গেল রব তুলছে তাদের উপেক্ষা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

নূসরাৎ আশরাফী মিম
৪র্থ বর্ষ, আইন বিভাগ, স্ট্যাম্পফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের মাধ্যমে উত্তরাধিকার নীতির ক্ষেত্রে যুগান-কারী পরিবর্তন এসেছে। এ আইনের ৪ ধারায় প্রতিনিধিত্বের নীতির বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। এই ধারা অনুসারে দাদা জীবিত থাকাকালে পিতার মৃত্যু হলেও মৃত পিতার সন্তানাদি দাদার মৃত্যুর পর পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় যে পরিমাণ সম্পত্তির অংশীদার হতেন তার পিতার প্রতিনিধিত্বের হারে ঐ সম্পত্তির অংশ পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে পাবে। শরিয়া আইনে দাদার জীবিতকালে কোনো সন্তানের পিতার মৃত্যু হলে সে পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে দাদার মৃত্যুর পর দাদার সম্পত্তির কোনো অংশ পায় না।- প্রয়োজনের তাগিদেই শরিয়া আইনের এই অংশটির পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে কেন ছেলে ও মেয়ের সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে নয়?

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কিন্ত্বু সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেখানে সমান অংশ পাবে একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। প্রয়োজনের তাগিদেই তারা তাদের আইনের এই অংশটি পরিবর্তন করেছে। তবে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?

মুসলিম শরিয়া আইন অনুসারে একজন ছেলে তিন ভাগের দুই অংশ, আর একজন মেয়ে তিন ভাগের এক অংশ পায় তার পিতার কাছ থেকে। কিন্ত্বু কেন? দুজনেই তো ঐ একই পিতার সন্তান। তাহলে কেন এই বৈষম্য? জন্মের পর থেকেই একজন কন্যা শিশু তার মা-বাবার কাছ থেকে সর্ব প্রথম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। অনেকেই হয়তো বলবেন যে- একজন মেয়ে তো তার স্বামীর কাছ থেকে ১/৮ অংশ পাচ্ছেই তবে কেন সমান অংশ চাওয়া হচ্ছে পিতার সম্পত্তি থেকে? আমার প্রশ্ন- মেয়েরা কি আসলেই সত্যিকার অর্থে কোনো সম্পত্তি তার স্বামীর কাছ থেকে পায়, না পাচ্ছে? ন্যূনতম দেনমোহরের অর্থটুকুও বিয়ে বা তালাকের পর তাদের কপালে জোটে না। আর যদি সে বিধবা হয় তাহলে স্বামীর পক্ষের আত্মীয়স্বজনের কথার বাণে জর্জরিত হয়ে সব ছাড়তে বাধ্য হয়, তখন তো প্রশ্নই আসে না সম্পত্তি চাওয়ার। মা-বাবার সংসারে গিয়েও মুক্তি মেলে না তার। উঠতে-বসতে সেখানেও লাঞ্ছিত হয় প্রতিনিয়ত। এটা আমরা দরিদ্র বা মাধ্যবিত্ত পরিবারেই দেখি না, অনেক শিক্ষিত ও ধনী পরিবারেও এমনটি ঘটছে।

তাপস বন্ধু দাস
চতুর্থ বর্ষ, আইনবিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জাতীয় পর্যায়ে একটা হুলস'ূল কাণ্ড হয়ে গেল (যদিও এখন শেষ হয়ে গেছে বলা যায় না) জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০০৮ নিয়ে। ৮ মার্চ ২০০৮ আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরদিনই জাতীয় দৈনিকে ছাপা হলো- এবার বাস-বায়ন হবে নারী উন্নয়ন নীতি, সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার দেয়া হবে। সাংবাদিকরা জেঁকে ধরলেন উপদেষ্টাকে, উপদেষ্টা আবার বললেন, এটা তো নীতি, আইন না, তাই এটা বাধ্যকরী কিছু নয়। যারা নারীর সমঅধিকারের জন্য কাজ করে আসছেন, তারা উপদেষ্টার বক্তব্য শুনে হতবাক। যদি বাস-বায়নের সদিচ্ছা না-ই থাকবে, তাহলে ঘটা করে নীতি ঘোষণার দরকারটাই-বা কি ছিল? কিন্ত্বু এই কথা বলেও সরকারের শেষ রক্ষা হলো না। জরুরি শাসনের পুলিশ বাহিনীও অসহায় হয়ে পড়ল মৌলবাদীদের ইটপাটকেলে। দৃশ্য দেখে অনেক অ-মৌলবাদী পুরুষও নীরবে সন'ষ্টির হাসি হাসলেন। যাক ইটপাটকেল ছোঁড়ার পরিশ্রমটা মৌলবাদীদের ওপর দিয়েই গেল। ঘরের মেয়েদের সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে না। অন্যদিকে পোশাকি প্রগতিও রক্ষা পেল। মৌলবাদীদের ধন্যবাদ!

১৯৯৭ থেকে ২০০৮ পর্যন- মোট তিনটি নারী নীতি প্রণীত হয়েছে। নারীর প্রতি সব রকমের বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস-বায়ন থেকে বাংলাদেশ আসলে কতটা দূরে আছে তা সমাজের ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা খুব একটা হয় না। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া একটা নীতি (যে কোনো নীতিই হোক) বাস-বে কতটা কার্যকর হবে তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার তাগিদ কোনো নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রেই এদেশে দেখা যায় না।

আন্তর্জাতিক সনদের (CEDAW) বাস-বায়ন নিয়ে এত কাজ হচ্ছে কিন্ত্বু সমাজে, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে জেন্ডার সংবেদনশীলতা কতটুকু? সংবেদনশীলতা যে শুধুই আন্তর্জাতিক চুক্তি আর সনদ থেকে আসবে, কিংবা পশ্চিমা অগ্রগতির অবদান তা তো নয়। আমাদের আবহমান সংস্কৃতিতে নারীর মর্যাদা ও নারীসত্তার প্রতি শ্রদ্ধার যে মূল্যবোধ সেটাকে উপেক্ষা করলেও চলবে না। সমাজের এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। নারীর সমঅধিকার নিশ্চয়ই চাই। কিন্ত্বু এর চূড়ান- লক্ষ্য শুধু সম্পত্তির সমান অংশ পাওয়াতে নয় বরং আরও দূরে। তাই নতুন করে ভাবতে হবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে এবং আসল কাজ শুরু করতে হবে সমাজের ভেতর থেকে। আইন বা নীতি একটা উপরিকাঠামো প্রস'ত করে দিতে পারে মাত্র।