|
|
প্রচ্ছদ-কাহিনী
জৈব জ্বালানি ও খাদ্য সংকট
শাহ মোহাম্মদ মুশফিকুর রহমান
পাঁচ সন্তান নিয়ে এক নিম্নবিত্ত পরিবার আছে মহাবিপদে। তাদের দৈনিক আয় ১৪০ টাকার মতো। এর অর্ধেকটা যায় খাবারের পেছনে। চালের যে দাম তাতে ভাত আর শাকের বেশি কিছু জোটে না। স্বামী-স্ত্রী এ পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে। কিন্তু মাছ-মাংস ছাড়া বাচ্চাদের বাড়ন্ত দেহের পুষ্টির জোগান হবে কোত্থেকে? এদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা বলছে খাদ্য সঙ্কট নিয়ে আশঙ্কা অমূলক। সরকার স্থাপিত বিক্রয় কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সস্তা চালের জোগান নিশ্চিত করা হয়েছে। মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সুতরাং দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। না, যা ভাবছেন তা নয়। বাংলাদেশের সাধারণ চিত্র হলেও ঘটনাটি নেয়া হয়েছে ফিলিপাইন থেকে।
খাদ্য সঙ্কটের চিত্র হিসেবে ফিলিপাইনের এই বোয়েট নাভারোস দম্পতি থেকে আমাদের যে কোনো নিম্নবিত্ত পরিবারের কোনো তফাৎ নেই। এর চেয়ে খারাপ অবস্থাও আছে। আলিয়া বাজারে দোকানদারের কাছ থেকে কয়েক মুঠো রুটির অবশিষ্টাংশ নিচ্ছে। সে কি ভিক্ষা করছে?
না, আফগানিস্তানে এগুলো বাজারে বিক্রি হচ্ছে। আর এটাই গরিবদের টিকে থাকার অবলম্বন । খাদ্যের এই নিদারুণ সঙ্কট এখন আর দেশের সীমায় আটকে নেই, হয়ে গেছে বৈশ্বিক। বিশ্বে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ হয়তো দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে দেয়ার মতো পড়ে যায়নি, তথাপি আকাশচুম্বী দাম আর্থিক দৈন্যে থাকা বিশ্বের লোকের জন্য নিয়ে এসেছে এক বিভীষিকা।
সরকার বিভিন্ন সময় ব্যর্থতা আড়াল করার জন্য বিশ্ববাজারে খাদ্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে ব্যবহার করলেও আমরা সবাই জানি বিশ্ববাজার পরিস্থিতি আসলেও ভালো নয়। এর কারণ কী? এক কথায় এর উত্তর হতে পারে "তেল"। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য হু-হু করে বাড়ছে গত কয়েক বছর ধরে। এর সাথে উৎপাদন খরচের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। আর উৎপাদন খরচ বাড়লে খাদ্যদ্রব্য শুধু নয়, সবকিছুর মূল্যই বাড়বে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, তেলে মজুদ সঙ্কট ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য এখন আকাশছোঁয়া। তবে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির সাথে তেলের এই সরাসরি সম্পর্ক ছাড়াও অন্য যেসব কারণে বিশ্ববাজার এখন উত্তপ্ত, সেই জৈব জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথেও রয়েছে তেলের সম্পর্ক। কিন্তু জলবায়ু কেন পরিবর্তিত হচ্ছে বা জৈব জ্বালানিটাই-বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে এই লেখায়।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আধিক্য
জনসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে খাদ্য উৎপাদনও বাড়াতে হয়। এ বাবদ সভ্যতার অর্জন খারাপ নয়। বিভিন্ন প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমানুপাতিক হারেই। তবে আশির দশক থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত হারে ফলন উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হবে এবং পৃথিবীর বড় একটা জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এই আশঙ্কার বাস্তব চেহারাই এখন আমরা দেখছি। বৈশ্বিক উষ্ণতা কী করে খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করছে তা জানার আগে কীভাবে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ে সেটি বুঝে নেয়া দরকার।
বর্তমান পৃথিবীর ভৌত উন্নয়ন অনেকটাই জ্বালানিনির্ভর। এর প্রায় পুরোটাই আসে আবার জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। প্রধান জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যে রয়েছে পেট্রোলিয়াম, কয়লা ও গ্যাস। এই জ্বালানিগুলোকে জীবাশ্ম বলার কারণ হচ্ছে প্রায় ত্রিশ কোটি বছর আগে প্রাণী ও উদ্ভিদের মৃতদেহ জমে জমে ভূপৃষ্ঠের বহু নিচে এই জ্বালানি গঠিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই জ্বালানিগুলোর সবই কার্বন-বন্ডেড যৌগ। ফলে যখন পোড়ানো হয় এবং কার্বন পরমাণুগুলো অক্সিজেন থেকে পৃথক করা সম্ভব না হয়, তখন কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) বা কার্বন-মনোক্সাইড (CO) উৎপন্ন হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এধরনের গ্যাসীয় যৌগকে গ্রিনহাউজ গ্যাস বলে। মিথেন (CH4), নাইট্রাস-অক্সাইড (NO2) ইত্যাদিও গ্রিনহাউস গ্যাস। তবে পরিমাণগত দিক থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সবচেয়ে বড় ক্ষতিকারক। এগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলার পেছনে কারণ কী? শীতপ্রধান দেশে কাচঘেরা এক ধরনের ঘর তৈরি করা হয়। ঐ ঘরে বিভিন্ন শাক-সবজির আবাদ করা হয়। সূর্যের রশ্মি ঐ ঘরে সহজেই প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু প্রবেশের পর এগুলোর প্রকৃতিগত কিছু পরিবর্তন হয়। ফলে এগুলো দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে না। এ কারণে গ্রিনহাউসের অভ্যন্তর বাহির হতে বেশ উষ্ণ থাকে। গ্রিনহাউস গ্যাসও প্রায় একই প্রক্রিয়ার কাজ করে। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রার স্থিতি বজায় রাখার জন্য গ্রীণহাউস গ্যাস খুবই প্রয়োজন। কেননা এগুলো দিনের বেলা পৃথিবী পৃষ্ঠে আসা সূর্যতাপ সহজে বায়ুমণ্ডলের বাইরে বেরিয়ে যেতে দেয় না। ফলে পৃথিবী অতি দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে না। কিন্তু বাতাসে অতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে বায়ুমণ্ডল অতিরিক্ত সূর্যতাপ ধরে রাখবে। এই অতিরিক্ত তাপের ফলে পৃথিবীর বহু বছরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। আসলে অনেকটাই এর মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। অতিরিক্ত এই তাপ মেরু অঞ্চলে জমে থাকা বরফকে গলিয়ে ফেলছে। এই গলার তালিকায় আরও আছে পর্বতমালাগুলোর হিমবাহ। এই বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দেবে এবং নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ডুবে যাবে। মালদ্বীপের মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো মানচিত্র থেকেই বিলীন হয়ে যাবে। কালক্রমে ব-দ্বীপ বাংলাদেশের উপকূলীয় একটি বড় অংশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে।
বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। আর জলবায়ুর বিভিন্ন পরিবর্তনের একটি হচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোর পরিমাণ ও মাত্রা বেড়ে যাওয়া। বৈশ্বিক উষ্ণতার কী পরিমাণ পরিবর্তন হলে কতোটুকু প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়বে সে সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা থাকে Climate Change Convention-Gi অধীনে গঠিত Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC)-Gi বিভিন্ন প্রতিবেদনে। আশঙ্কার কথা হচ্ছে, প্রকৃত অবস্থা IPCC-Gi সব আশঙ্কাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলো অধিক হারে এবং আরও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। এগুলোর মধ্যে আছে ঝড়, বন্যা, খরা, সাইক্লোন, টর্নেডো ইত্যাদি। এর কোনোটা থেকেই বাংলাদেশের নিস্তার নেই। অবশ্য সে অর্থে কোনো দেশই এগুলোর প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তবে ঘনবসতিপূর্ণ এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোহীন অনুন্নত বিশ্বের দেশগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এই দেশগুলো ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করতে গিয়ে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ছে, ফসলহানি হয়ে পড়েছে ফি বছরের ঘটনা এবং তারা খাদ্য ঘাটতির মুখে ঋণ করে হলেও খাদ্য আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যান্য দেশও যখন একই রকম পরিস্থিতিতে পড়ছে, তখন বৃহৎ রপ্তানিকারক রাষ্ট্রগুলোও তাদের অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে রক্ষণশীল উদ্যোগ নিচ্ছে। এ ব্যাপারে সমপ্রতি চাল রপ্তানির ব্যাপারে ভারত ও থাইল্যান্ডের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কথা প্রণিধানযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের প্রধান রবার্ট জেলিকের ভাষ্য অনুযায়ীই এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার ফলে মজুদের প্রবণতা উৎসাহিত হয়, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি পায় এবং পৃথিবীজুড়ে গরিব লোকজন অনাহারে থাকতে বাধ্য হয়। তবে বাণিজ্য উদারীকরণ নিয়ে কাজ করলেও বিশ্ব অর্থনীতির মোড়ল সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে বচনামৃত উপহার দেয়া ভিন্ন তেমন বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
সমপ্রতি আমরা জোরেশোরে জৈব জ্বালানির প্রসঙ্গ শুনছি। অনেকেই জৈব জ্বালানির এই উত্থানকে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার প্রতি অন্যতম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। জৈব জ্বালানি বা Biofuel সংক্রান্ত এই সমস্যার মূলেও রয়েছে তথাকথিত উন্নয়ন এবং এই উন্নয়নের জন্য জ্বালানি, যা এতোদিন ধরে ছিল প্রায় শুধু জীবাশ্ম জ্বালানি।
জৈব জ্বালানি: গাড়ির খাদ্য বনাম মানুষের খাদ্য
জীবাশ্ম জ্বালানি এতোদিন ধরে আমাদের উন্নয়নের চাহিদা পূরণ করে আসছে। কিন্তু অ-নবায়নযোগ্য এই জ্বালানি উৎসের ওপর অতি নির্ভরশীলতা বেশ বিপজ্জনক। কেননা এর রিজার্ভ সীমিত এবং প্রতিনিয়তই তা কমছে। খনিতে থাকা এই রিজার্ভ আর কতোদিন উত্তোলন করে ব্যবহার করা যাবে- তার নির্ভুল হিসাব দেয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। সবচেয়ে হতাশাজনক পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ১৭ বছরের মধ্যেই এসব খনিজ জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর সবচেয়ে আশাবাদী হিসাব অনুযায়ী এর সময়কাল ৫০ থেকে ৭০ বছর। প্রকৃত অবস্থার অনেকটাই নির্ভর করছে নতুন খনি আবিষ্কার, চাহিদা, উত্তোলন ও ব্যবহারের গতিপ্রকৃতি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উত্তরোত্তর ব্যবহার বৃদ্ধির প্রবণতার ওপর। তার ওপর বিভিন্ন কারণ ও অজুহাতে জীবাশ্ম জ্বালানি বিশেষত পেট্রোলিয়ামের দাম এখন আকাশচুম্বী এবং তা আরও অনেক দিন ঊর্ধ্বমুখী থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। পেট্রোলিয়াম নির্ভরতার বিপদ এবং পেট্রোলিয়াম উৎপাদক রাষ্ট্রগুলোর কাছে জিম্মি অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা উপায় হিসেবে অনেকেই জৈব জ্বালানির কথা ভাবছেন। কিন্তু এই জিনিসটা আসলে কী? জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য যে কোনো জৈব পদার্থকেই সাধারণভাবে জৈব জ্বালানি বলা যেতে পারে। এই অর্থে কাঠ, খড় ও পাতাও জৈব জ্বালানি। তবে খাদ্য সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে জৈব জ্বালানি শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়। গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য খাদ্যশস্যকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত ইথানলকেই জৈব জ্বালানি বলে। আখ, গম, বিভিন্ন তেল বীজ, সয়াবিন, পাম ইত্যাদি তেল বা চিনি সমৃদ্ধ শস্য থেকে ইথানল বা বায়োডিজেল তৈরি করা যায়। এছাড়া খাদ্যশস্য নয় এমন উদ্ভিদ থেকেও জৈব জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব, যেমন- এলগি ও জেক্সটোফা।
গাড়িতে জৈব জ্বালানি ব্যবহারের ধারণাটি নতুন নয়। মোটরগাড়ি আবিষ্কারের সময়ই এই জ্বালানি গাড়িতে ব্যবহৃত হতো। অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাস নতুন করে লেখা ফোর্ড কোম্পানির টি মডেলের গাড়ি চলত এই জৈব জ্বালানির ওপর ভর করে (১৯০৩-১৯২৬)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মধ্য পূর্ব এশিয়ায় বিপুল তেলের মজুদ আবিষকৃত হওয়ায় সস্তা জীবাশ্ম তেল সহজলভ্য হলো এবং তুলনায় ব্যয়বহুল জৈব জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু গত কয়েক দশকে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সঙ্কট, রাজনৈতিক সঙ্কট, যুদ্ধ এবং রিজার্ভের অনিশ্চয়তা শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে আবারও জৈব জ্বালানি নিয়ে আগ্রহ তৈরি করছে।
পেট্রোলিয়াম উৎপাদক রাষ্ট্রগুলোর তেলের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে বিকল্প উৎস তৈরি করার এ যাত্রায় এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই দেশগুলো জৈব জ্বালানি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ উপায়ে ভর্তুকি দিচ্ছে। গাড়ির প্রচলিত জ্বালানির সাথে নির্দিষ্ট হারে জৈব জ্বালানি মেশানোর নিয়ম করা হয়েছে কোথাও। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে ইথানল বা বায়োডিজেল উৎপাদকদের প্রতি লিটারে ০.০৫ ডলার বা তারও বেশি ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারও ডিজেলের সাথে বায়োডিজেল মিশ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লিটার প্রতি ০.১৩ ডলার ট্যাক্স ক্রেডিট প্রদান করছে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে জৈবজ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ভর্তুকির পরিমাণ বছরওয়ারি দাঁড়াবে ৮ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার। একই পদ্ধতিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোও জৈব জ্বালানিতে বিভিন্ন ভর্তুকি প্রদান করছে।
সমস্যা হচ্ছে- ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, ভারত ও চীনের মতো বৃহৎ ফসল রপ্তানিকারক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোও এ যাত্রায় শামিল হচ্ছে। তাদের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের চাহিদা মেটাতে তারা এদিকে ঝুঁকছে। ফলে ফসলের জমি কমে আসছে, উৎপাদনও কম হচ্ছে। এই দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের মতো জৈব জ্বালানি উৎপাদকদের বিভিন্ন আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে।
ইউরোপের দেশগুলোর কথা বাদ দিলে, উল্লিখিত বাকি দেশগুলো বৃহৎ শস্য রপ্তানিকারক। তারা অধিক হারে শস্য থেকে ইথানল তৈরিতে মনোযোগী হওয়া মানে বিশ্ববাজারে তৈরি হওয়া খাদ্য সঙ্কট আরও ঘনীভূত হওয়া এবং ইথানল উৎপাদনে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য ব্যবহৃত হবে বলে আগে ধারণা করা হচ্ছিল, প্রকৃত পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দেয়া যাক। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি অধিদপ্তরের হিসাবে ২০০৮ সালে উৎপাদিত শস্যের কেবল ৬ কোটি টন ইথানল কারখানায় ব্যবহৃত হবে। Earth Policy Institute (EPI) নামক একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাবে এই পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি টন। এই সংস্থার মতে ইথানল ইন্ডাস্ট্রি যে হারে বাড়ছে, তাতে করে সরকারি হিসাবও তার সাথে তাল মেলাতে পারছে না। এটাই তাদের তথ্যগত ত্রুটির কারণ। তার ওপর প্রেসিডেন্ট বুশ গত বছর ডিসেম্বর মাসে The Energy Industries and Security Act ২০০৭- এ করেছেন। এই আইনে ২০২২ সাল নাগাদ জৈব জ্বালানির উৎপাদন বর্তমান পরিমাণ থেকে পাঁচগুণ বাড়ানোর সুযোগ থাকছে। ফলে শস্য রপ্তানিকারক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাবে।
এমনিতেই বিশ্ব চাহিদার সাথে খাদ্য উৎপাদন তাল মেলাতে পারছে না। গত সাত বছরের ছয় বছরই উৎপাদন হয়েছে চাহিদার চেয়ে কম। এমন অবস্থায় বিশ্বের দুইশ' কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যের অধিকারকে মাত্র ৮০ কোটি গাড়িওয়ালা লোকের বিরুদ্ধে এক অনৈতিক প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
কিন্তু জ্বালানি হিসেবে এটি কতোটা কার্যকর? তেমনটা মোটেই নয় যেমনটা এর পক্ষগোষ্ঠী দাবি করে থাকে। প্রধানত গাড়িতে জ্বালানি হিসেবেই এখন পর্যন্ত এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। একটা ২৫ গ্যালন ধারণক্ষম গাড়ির ট্যাঙ্ক কেবল একবার ভরানোর মতো তেল উৎপাদনে যতোটুকু শস্য দরকার তা দিয়ে একজন ব্যক্তি পুরো এক বছরের খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সব উৎপন্ন ফসল থেকে জৈব জ্বালানি উৎপাদন করে তবে তা কেবল তাদের ১৬ শতাংশ গাড়িকে সচল রাখতে পারবে।
অনেকে দাবি করেন জৈব জ্বালানি কার্বন নিরপেক্ষ। অর্থাৎ এ জ্বালানি পুড়িয়ে যতটুকু কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে নির্গমন করা হয়, তা পরবর্তী ফসল দ্বারা শোষিত হয়ে যায়। তবে এই শূন্য ফলাফলের একটা ফাঁকি রয়েছে। শস্য উৎপাদনের জন্য ধ্বংস করা বনাঞ্চল, সার ও কীটনাশক উৎপাদনে বা জৈব জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উদ্ভূত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে এ হিসাব থেকে বাইরে রাখা হয়।
সব মিলিয়ে জৈব জ্বালানি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই ঝুঁকির আরও ক্ষতিকর দিকটি হয়তো আমরা এখনও দেখিনি। জ্বালানি বুভুক্ষু শিল্পোন্নত রাষ্ট্র ও নতুন শিল্পায়িত রাষ্ট্রের চাহিদা মেটাতে হয়তো সেসব দেশে উৎপাদিত শস্যই আর যথেষ্ট বলে মনে হবে না। ফলে বড় বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জমিগুলো এ কাজে ব্যবহার করার পাঁয়তারা করবে, যেমনটা ঘটেছে আফ্রিকার অনেক দেশে ক্যাশক্রপ উৎপাদনের ক্ষেত্রে।
এখন যে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে খুব শিগগিরই তার সমাধান হবে না
-ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ
বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও খাদ্য সঙ্কটে। এ থেকে নিস্তারের লক্ষে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা তেমন ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এহেন পরিস্থিতিকে কেউ বলছেন ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’ কেউবা ‘িডেন হাঙ্গার‘। অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলছেন ‘নীরব সুনামি‘। এই বিষয়গুলো নিয়ে গত ১৮ মে ০৮ আমরা কথা বলেছি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ-এর সাথে। সাক্ষাতকারের নির্বাচিত অংশ এখানে পত্রস্থ করা হলো। সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন- মিল্লাত হোসাইন ও শাহ্ মোহাম্মদ মুশফিকুর রহমান।
আসক: বাংলাদেশের এখনকার খাদ্য সংকটের সাধারণ চিত্রটি কি?
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ: এই মুহূর্তে জাতীয় পর্যায়ে অবস্থা কিছুটা ভালো, বোরো ফসল ভালো হয়েছে। কোনো দুর্যোগ ছাড়াই বোরো ধান কৃষকের ঘরে উঠবে আশা করি। জাতীয়ভাবে সরবরাহ বাড়বে এবং আমি এও আশা করছি ভারত থেকে যে ৪ লাখ টন চাল আমদানি করার কথা সেটাও আসবে। আরও আমদানি করার কথা বলছে সরকার, সেই হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য সরবরাহ আগামী ২/৩ মাসের জন্য মোটামুটি ভালো। তবে সঙ্কট হচ্ছে উচ্চ মূল্য ও ক্রয়ক্ষমতার সমস্যার কারণে পারিবারিক পর্যায়ে অভিগম্যতায়।
আসক: কীভাবে, কোন্ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় বর্তমান খাদ্য সঙ্কট পরিস্থিতিতে উপনীত হলাম আমরা?
ড. আহমদ: আসল সঙ্কটটা দেখা দেয় ২০০৭ সালে দুটো বড় বন্যা ও একটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের ফলে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি হওয়ায়। তখন অনেকেই বলেছিল এবং আমিও বলেছিলাম যে, আমদানি করে মজুদ বাড়ানো হোক এবং আমরা সবাই মনে করেছি যে, অন্তত ১০-১২ লাখ টন খাদ্য সরকারের কাছে মজুদ থাকা উচিত। কিন্তু সেটা করা হয়নি। এর আগে কয়েক বছর ধরে উৎপাদন ভালো হওয়ার জন্য আমাদের উন্নয়ন সহযোগীরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল যে, খুব বেশি মজুদ রাখার প্রয়োজন নেই। যেটা আমি মনে করি সম্পূর্ণ ভুল ছিল। কারণ যেকোনো সময় একটা দুর্যোগ দেখা দিতে পারে, যেমন ২০০৪ সালে দেখা দিয়েছিল। সরকারি হিসেব মত বিগত বছর ১৪ লাখ টন খাদ্যশস্য কম উৎপাদন হয়েছে। অন্যান্য হিসেবে ২০ লাখ টন বা তারও বেশি। তাছাড়া সাধারণত ১৫-২০ লাখ টন ঘাটতি থাকে। তাই গত বছর চাহিদার তুলনায় খাদ্যশস্যের ঘাটতি ছিল ৩৫-৪০ লাখ টন। সরকারের কাছে মজুদ থাকলে ব্যবসায়ীরা দাম হঠাৎ করে বাড়াতে পারতেন না। বেসরকারি খাতেও আমদানি করা হয়েছে কিন্তু কম দামে আমদানি করে বেশি দামে বিক্রি করা হয়েছে। সরকারের কাছে চাল নেই, ফলে বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চাল বাজারে ছাড়তে পারবে না জেনে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে পেরেছেন। এটা নয় যে দেশে একেবারেই খাদ্য নেই। সরকারের হাতে মজুদ না থাকার কারণে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি এবং বাজার নজরদারি করার তেমন কোনো ব্যবস্থাও বাংলাদেশে নেই। হঠাৎ করে নজরদারি করতে গেলে নানান অসুবিধা হয়। ব্যবসায়ীরা চাল ধরে রাখবেনই, যখন দাম বাড়বে তখন বাজারে ছাড়বেন। এটাই সাধারণত ঘটে থাকে। এছাড়া বড় কৃষকরাও যখন মনে করেন সমস্যা আসতে পারে তখন তারাও চাল বাজারে ছাড়বেন না। কিন্তু দেশে যখন মানুষ দুর্গতিতে পড়েন তখন সামাজিক দায়িত্ববোধের মানসিকতা আমাদের মধ্যে থাকা উচিত। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সেই ধরনের মানসিকতা কাজ করলে দেখা যেতো দাম ঐরকম বাড়ছে না। একদিকে বাজারে সমস্যা আছে; অপরদিকে সরকারি পর্যায়ে বিতরণ এবং মজুদের সমস্যা আছে এবং সামাজিক দায়িত্ববোধে বিরাট ঘাটতি রয়েছে। ফলে অবস্থার ঐ রকম অবনতি ঘটেছে।
আমদানির ক্ষেত্রে ২০০৭ সালে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত চালের দাম ছিল ৩০০-৩৫০ ডলার টন প্রতি, সেটা এখন দাঁড়িয়েছে ৮০০ বা ১০০০ ডলারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহও কমে গেছে। বিভিন্ন কারণে সেটা ঘটছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যেসব দেশে খাদ্য উৎপাদন বেশি হয় সেসব দেশেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শস্য জৈব জ্বালানি (Biofuel) উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেজন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রপ্তানিযোগ্য খাদ্যশস্য সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। প্রতি বছর সাধারণত ২৮-২৯ লাখ টন আন্তর্জাতিক বাজারে বেচা কেনা হয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে সংস্থাগুলো কাজ করে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত এক হিসেবে দেখা যায় আগামী বছর এটা নেমে যাবে মাত্র ১২-১৪ লাখ টনে। এখন যে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে খুব শিগগিরই তার সমাধান হবে না। এটা বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে জৈব জ্বালানিতে যে শস্য ব্যবহার করছে সেটা তারা আরও বাড়াবে। ইউরোপও সেই পথে হাঁটছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই যে সঙ্কট দেখা দিয়েছে সেই সঙ্কট থেকেই যাবে।
কাজেই বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকেই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে। এখানে সমস্যা হচ্ছে যে, আমরা দীর্ঘদিন থেকে কৃষিতে বিনিয়োগ তেমন করিনি। ১৯৭৩-৭৪ সালের উন্নয়ন বাজেটে প্রায় ৩১ শতাংশ ছিল কৃষিখাতে বরাদ্দ, সমপ্রতি তা নেমে এসেছে ৫-৬ শতাংশে। অপরদিকে বড় কৃষক কৃষিতে বিনিয়োগ করেন না, আর ছোট কৃষকের বিনিয়োগ করার মতো অর্থ নেই। বাংলাদেশে মনোকালচার সংস্কৃতি অর্থাৎ একই শস্য দীর্ঘদিন ধরে একই জমিতে উৎপাদন করার ফলে উৎপাদনশীলতার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে গবেষণাভিত্তিক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।
আসক: বাংলাদেশে বাজার, বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থাপনা এ জন্য কতোটা দায়ী?
ড. আহমদ: বাংলাদেশে বাজার কাজ করছে না, তার মানে এখানে যোগসাজশ আছে। বাজার তখনই কাজ করে যখন একটা আইনি কাঠামো থাকে এবং সেই আঙ্গিকে সংশ্লিষ্ট সকলে দায়িত্ব পালন করে। আইনি কাঠামোর মধ্যে সরকারের কী করণীয় সেটা নির্ধারিত থাকবে, বেসরকারিখাতে উৎপাদক ও আমদানিকারকরা কী করবে, খুচরা ব্যবসায়ীরা কী করবে, এসবই চিহ্নিত থাকবে।
একজন মজুদদারকে ধরতে গেলে যে আইন থাকা দরকার তা নেই। তাহলে সরকার কী করে মজুদদারকে নিয়ন্ত্রণ করবে? বিভিন্ন কারণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাজারে একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে যথাযথ আইনি কাঠামোয় যদি দুর্নীতি দমনে কার্যক্রম গ্রহণ করা হতো তাহলে এ সমস্যার সৃষ্টি হতো না। তারপরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন এখন পর্যন্ত হয়নি। বিডিআর-এর মাধ্যমে কিছু কম দামে চাল সরবরাহ করার কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তারপরও দাম বেড়েছে। আর বাংলাদেশ তো শুধু ঢাকা নয়। এবার গ্রামেও কিন্তু দাম বেড়েছে এবং অনেক জায়গায় বেশি বেড়েছে। ২০০৭ সালে দুটো বড় বন্যা হলো, একটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় হলো - এগুলোর অভিঘাতে অনেক অতি দরিদ্র মানুষ নিঃস্ব হয়েছে, অনেক মানুষ দরিদ্র ছিল না কিন্তু দরিদ্র হয়েছে, অনেক দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়েছে। অতিদরিদ্রের সংখ্যা ২০০৭-এর আগে সরকারি হিসেব অনুযায়ী জনসংখ্যার ২০ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি ছিল। বর্তমানে আমার ধারণায় তা ৪ থেকে সাড়ে ৪ কোটিতে চলে গেছে। যাদের আয় নেই বা খুব সামান্য আয় তাদের কর্মসংস্থানের সঙ্কট আছে। ফলে তারা খাদ্য ক্রয় করতে পারছেন না। আধাপেটা খেয়ে, না খেয়ে জীবন টেনে চলেছেন অসংখ্য মানুষ। এর ফলে আমি দেখেছি গ্রামাঞ্চলের অনেক স্থানে ছোট ছোট বাচ্চারা স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। কারণ স্কুলে গিয়ে করবেটা কি, খাবেই-বা কি। তার বদলে যদি চেষ্টা করে কিছু পয়সা আনতে পারে সেজন্য অনেকেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। অপুষ্টি বাড়ছে অসংখ্য ছোট ছোট ছেলেমেয়ের মধ্যে। এমনিতেই তো ৫০% শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। শিশুদের ভবিষ্যত সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরকম প্রকটভাবে খাদ্য সংকটাপন্ন অসংখ্য মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্য পৌঁছে দিতে হবে এবং আরও অনেককে কমমূল্যে দিতে হবে। আমি মনে করি না বোরো ওঠার পরে এই মানুষগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে হচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকতে হয় এবং পারিবারিক পর্যায়েও পর্যাপ্ত খাদ্যের অভিগম্যতা থাকতে হয়। যাদের কথা আগে বললাম তারা উৎপাদন করেন না, বা সামান্যই করেন কেননা তারা ভূমিহীন, শ্রম বিক্রিই তাদের আয়ের প্রধান উৎস। আর বিরাজমান বাস্তবতায় তাদের মধ্যে বেকারত্ব প্রকট, কাজেই তাদের হাতে টাকা নেই। কোনো না কোনোভাবে সরকারকে এদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতেই হবে। এবার বোরো ভালো হয়েছে, আউসের অবস্থা আমরা জানি না, আমন তো আরো কিছু পরে। ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস‘ পাশ কাটিয়ে চলে গেছে তবে এবছর আবার ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা হবে না তা বলা যাচ্ছে না। জলবায়ু যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এই বছর আবার বড় বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় হতেই পারে। তখন কি অবস্থা হবে, তার কি প্রস্তুতি রয়েছে? প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বাদ দিলেও কথা থাকে: কৃষকের কাছে ঋণ যদি যথা সময়ে না পৌঁছে, তারা যদি বীজ না পায় এবং সারের সঙ্কট যদি থাকে তবে অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকবে। তাই আমন যাতে ভালো হয় তার প্রচেষ্টা এখন থেকেই চালানো উচিত।
আসক: আপনি বলছেন বিশ্ববাজার থেকে শস্য সহজে পাওয়া যাবে না, অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে হবে। আমাদের জনসংখ্যা ১৫ কোটি বা তারও বেশি, আমাদের অল্প জমির মধ্যে কতটা সম্ভব?
ড. আহমদ: কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। শিল্প হচ্ছে, রাস্তাঘাট হচ্ছে, নতুন নতুন বাড়িঘর হচ্ছে ফলে কৃষি জমি কমছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙন বাড়ছে এবং সমুদ্রস্ফীতির কারণে উপকূলের অনেক এলাকা ডুবে যাবে আর লবণাক্ততা ক্রমশ দেশের অনেক ভেতরে চলে আসছে। এ সব কারণে কৃষিজমি আরো অনেক কমে যাবে। কাজেই একমাত্র পথ হচ্ছে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। শস্য, মৎস্য চাষ, পশু পালন, বনায়ন সব ক্ষেত্রে। সেদিকে যদি আমরা নজর দেই তাহলে আমাদের অনেক গবেষণা করতে হবে। গত বছরের বাজেটে তিনশ‘ কোটি টাকার একটি কৃষি গবেষণা ফান্ড গঠন করা হয়েছে কৃষি গবেষণার জন্য। এর আয় থেকে গবেষণা করা হবে। কিন্তু এ থেকে আয় তো হবে ৩০-৩৫ কোটি টাকা এবং তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। আর এই টাকা এখনও পাওয়া যায়নি। আমরা বলছি যে, কৃষি গবেষণা অনেক জোরদার করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা নয় তখন বৃষ্টি হবে, যখন বন্যা হওয়ার কথা নয় তখন বন্যা হবে, যখন খরা হওয়ার কথা নয় তখন খরা হবে। এসব পরিবর্তিত অবস্থার মধ্যে খাপ খাইয়ে কোন ধরনের ফসল ফলানো যায় বা ভালো ফলন পাওয়া যায় সেগুলো গবেষণা করে বের করতে হবে অথবা যদি কোথাও থাকে সেগুলো গবেষণার মাধ্যমে আমাদের এখানে কোনটা খাপ খাবে তা নির্ধারণ করে এগুলো সমপ্রসারিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। কাজেই অনেক জোর দিতে হবে গবেষণার ওপর।
অনেক ক্ষেত্রে দোফসলা বা তিনফসলা চাষের সুযোগ আছে। অনেক জায়গায় সেচব্যবস্থা সমপ্রসারণ করার সুযোগ আছে। বর্তমানে যে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো ঘটছে তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য যথাযথ গবেষণা করে, যথাযথ নীতি গ্রহণ করে এবং যথাযথ অঙ্গীকারসহ যদি আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করি তাহলে আগামী বছরগুলোতে সমস্যা তেমন ভয়াবহ না হওয়ারই কথা। আর যেমন চলছে তেমন চলতে থাকলে ৩০-৪০ বছরের মধ্যে এদেশ ভয়াবহ এক অবস্থার মুখোমুখি হবে। উপর্যুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আর যাতে সময় নষ্ট না হয় এদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। শুধু সরকারকেই নয়, আমাদের সবাইকে যে যার অবস্থান থেকে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে এক্ষেত্রে যোগাযোগ দরকার। আঞ্চলিক সহযোগিতারও প্রয়োজন রয়েছে।
আসক: এখন খাদ্যভ্যাস পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে - ভাতের বদলে আলু বা ভুট্টা, এটা কতটা কাজে আসবে?
ড. আহমদ: এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন রুটি নিয়ে একটা উন্নাসিকতা ছিল। কিন্তু এখন আমরা অনেকেই রুটি খাচ্ছি, শুধু যে অসুস্থ লোকজন রুটি খান তাই নয়, অন্যরাও খান। দীর্ঘমেয়াদে এরকম পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এ বছর আলু বেশি হয়েছে বলে আলু খাও তা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব প্রস্তাব নয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে খাদ্য ঘাটতির শিকার এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে যাবার সুযোগ আমার হয়েছিল। দেখেছি, যখন প্রধান (staple) খাদ্য পাওয়া যায় না তখন একজন যা পান তাই খান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চাল না পাওয়া গেলে একজন যে আলু খাবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে যখন খাদ্য সাহায্য দিতে হয় তখন কিন্তু প্রধান খাদ্যের বিকল্প কেউ গ্রহণ করতে চায় না। যেমন যেখানে কাচকলা প্রধান খাদ্য সেখানে গম বা অন্য কিছু দেয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না।
বাংলাদেশে আলু তো আমরা এমনিতেই খাই। এর জন্য প্রচারণার প্রয়োজন নেই। প্রচারণার ফল উল্টোটাও হতে পারে। আগামী বছর আলুর ভালো ফলন না হলে কি হবে? এবার আলুর দাম কম তাই আগামী বছর আলুর ফলন ভালো হবে না বলে ধরে নেয়া যায়। বাংলাদেশের কৃষকরা কোনো এক বছর বিভিন্ন ফসলের কেমন মূল্য পাওয়া গেল তার ওপর অনেকটা নির্ভর করে আগামী বছরের উৎপাদন বিন্যাস করে থাকেন। অতীতে দেখা গেছে টমেটো বেশি হলো এবং দাম কমে গেল বা বেগুন বেশি হলো দাম কমে গেল। পরের বছর ফলন ভালো হয়নি। তাই ঐগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থার প্রতি নজর দিতে হবে। এতে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং কৃষকও এরকম কোনো কৃষিপণ্য উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবেন না।
আসক: এক্ষেত্রে সরকারের কি করার আছে?
ড. আহমদ: অনেক কিছুই করার আছে। প্রথমত সঠিক নীতি গ্রহণ করা যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সমপ্রসারণযোগ্য পণ্য উৎপাদনে এবং এগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণের দিকে যায়। অবকাঠামো অর্থাৎ রাস্তাঘাট, টেলিফোন, পানি, গ্যাস ইত্যাদি তৈরি ও সমপ্রসারণে সরকারের ভূমিকাই মুখ্য। এছাড়া বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধা করে দেয়া, যেমন- মেশিনারি করমুক্ত করে দেয়া, তথ্য দেয়া, ট্রেনিয়ের ব্যবস্থা করা। এগুলো সরকার বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়েও করতে পারে, তবে সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হবে। আরেকটা সমস্যা এই যে, এ ধরনের পণ্য যখন উৎপাদিত হবে ওগুলো তো বিক্রি করতে হবে। কোথায় বিক্রি করা হবে? কৃষির যদি উন্নয়ন হয় গ্রামের লোকজন ক্রয় করতে পারেন, না হলে শহরের লোকজনের কাছে বিক্রি করতে হবে, না হলে রপ্তানি করতে হবে। তিনটি বাজারই লক্ষ্য হতে পারে। তবে তিনটি ক্ষেত্রেই নানা সমস্যা রয়েছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আসক: কেউ কেউ বলেন যে, বিশ্ববাজারের বর্তমান দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে এটা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা। এটা আসলে কতোটা ঠিক?
ড. আহমদ: বিরাজমান বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটকে এক দিকে বানানোও বলা যেতে পারে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র এখন জৈব জ্বালানি উৎপাদনে শস্য ব্যবহার করছে প্রচুর পরিমাণে। তারা নিজেদের স্বার্থেই তা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে, কাজেই নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তারা তা করছে। নিজেরা শস্য উৎপাদন করে নিজেরাই জ্বালানি বানাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ শতাংশের মতো উৎপাদিত শস্য জৈব জ্বালানিতে ইতিমধ্যেই ব্যবহার করা হচ্ছে, ইউরোপও ঐ পথে হাঁটছে। এটাকে আমি বলবো অনৈতিক, অযৌক্তিক। খাদ্য জরুরি। ওরা প্রচুর ভর্তুকি দেয় কৃষিতে। যুক্তরাষ্ট্র দেয় গড়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার প্রতিদিন। ইউরোপে একটা গরুর পেছনে দৈনিক ২-৩ ডলার ভর্তুকি দেয়া হয়। তারপরও তারা প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে। আবার এও হতে পারে যে, সরবরাহ আছে কিন্তু বাজারে ছাড়া হচ্ছে না।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন একেবারে বাস্তব। গত বছর ইউরোপে ‘heat wave‘ এবং অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ খরায় খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী দেশসমূহে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরা হয়েছে । ফলে বিশ্ব-খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আগামীতে সবদেশেই কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরো বেশি সমস্যা সৃষ্টি করবে অব্যাহত জলবায়ু পরিবর্তন।
আসক: ইদানীং জর্জ বুশ, কন্ডোলিজা রাইসসহ অনেকেই বলছে ভারত এবং চীনের বিশাল মধ্যবিত্তই নাকি খাদ্য সংকটের জন্য মূলত দায়ী। আপনি বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?
ড. আহমদ: একথা তো বুশই বলেছেন। এটা স্রেফ ফালতু কথা। নিজেদের দুর্বলতাগুলো অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার জন্যই এসব বাগাড়ম্বর।
অর্থনৈতিকভাবে যারা উন্নতি করছে তারা স্বাভাবিকভাবে খাবারে ভাতের পরিমাণ কমিয়ে দেন। অর্থাৎ আয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবে ভাত বেশি না খেয়ে অন্য খাদ্য খাবেন মানুষ। কাজেই বুশ যেটা বলেছেন তার পুরোটাই ভুল। চালের সংকট যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করেছে। একজন মার্কিনি কত কেজি খাবার খায় আর একজন ভারতীয় বা চীনা কত কেজি খায় তা হিসেব করলেই পার্থক্যটা বোঝা যাবে। ওরা যতো মাংস খায় তার পেছনে যে শস্য যায় সেটা অনেক অনেক বেশি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বায়োফুয়েলে ৩০ শতাংশ খাদ্যশস্য ব্যবহার করছে।
আসক: চালের দাম বাড়াটা এক অর্থে খারাপ নয়, কারণ তা কৃষকের জন্য ভালো এবং আমরা যদি এটা চিন্তা করি যে অনেক সংখ্যক কৃষক এখানে নিয়োজিত এবং সম্পৃক্ত, কৃষিপণ্যের দাম বাড়া মানে তারাও উপকৃত হওয়া। এক্ষেত্রে আপনার মন্তব্য কি?
ড. আহমদ: এখানে একটা দ্বন্দ্ব আছে। কৃষকরা কম দাম পেলে তারা নিরুৎসাহিত হবেন, এটা আমরা অতীতে দেখেছিও। আবার অসংখ্য মানুষ আছেন যারা দরিদ্র, তাদের ক্রয়ক্ষমতা নেই। দাম বাড়লে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু অনেক সময় কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। দাম বাড়লে মধ্যস্বত্বভোগীরা তার অধিকাংশ নিয়ে নেন। সরকার এবার ধানের একটা উপযুক্ত দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে কিন্তু সেটা কৃষক পাচ্ছেন কিনা তা নিশ্চিত নয়। আমরা জেনেছি যে, অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক সেই মূল্য পাচ্ছেন না। আবার তারা অনেক কম দামে আগাম বিক্রি করে দিচ্ছেন তাদের ফসল অথবা ধরে রাখতে পারছেন না বলে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাই কৃষকের কাছে যথাযথ দাম পৌঁছানো জরুরি। উৎপাদন খরচ ২০-২২ টাকা ধরে প্রতি কেজি চালের দাম ২৮ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার যেটাকে আমি সমর্থন করছি। ২৮ টাকা কৃষক যদি পান তবে তার একটা মুনাফা থাকে এবং তা থাকলে কৃষকরা উৎসাহিত হবেন। কিন্ত একদিক দেখলে হবে না। যেমন কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে, তেমনি যে সকল দরিদ্র ও কম আয়ের মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্য ক্রয় করতে পারছেন না তাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আসক: অর্থ উপদেষ্টা কিছুদিন আগে একটা মনিটরিং সেল গঠনের কথা বলেছিলেন যা তথ্য সংগ্রহ এবং সে অনুযায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করবে। তার অবস্থা কি?
ড. আহমদ: এ বিষয় আমার জানা নেই। অনেক কিছুই তো বলা হয় কিন্তু বাস্তবে কতদূর! চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ইত্যাদি কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে যদি আমরা দেশের এবং আন্তর্জাতিক বাজারের হালচাল নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকি তাহলে তো আমরা পরিকল্পনা করতে পারবো। গত এক বছরের তথ্য যদি আমাদের সামনে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে তার আভাস পাওয়া যেতে পারে। এ কাজটি করার কথা বহুবার বলা হয়েছে। সরকারের কার্যক্রমে সেরকম কোনো ব্যবস্থা দেখি না।
আসক: এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এসবের ফল কী দাঁড়ালো?
ড. আহমদ: বিচ্ছিন্নভাবে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যেমন- চাল এবং ডালের ওপর থেকে শুল্ক কমিয়ে দেয়া হলো, উঠিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু বাজারে তার প্রতিফলন দেখা গেল না কারণ ঐ যে বাজার কাজ করছে না। এর সুফল পাওয়ার কথা ভোক্তার কিন্তু পেয়ে গেল মাঝখানে যারা আছে তারা - ব্যবসায়ীরা। তারপরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি করা হলো। ইন্টারেস্ট বাড়ানো হলো, যাতে ঋণ প্রবাহ কমে যায়। এরকম বিভিন্ন পদক্ষেপ বিচ্ছিন্নভাবে নেয়া হয়েছে। সুফল আসতে পারে বিচ্ছিন্ন নয়, সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থাৎ আমদানি নীতি, রপ্তানি নীতি, মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, উন্নয়ন কার্যক্রম এসবগুলোর সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে, যা করা হয়নি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যেও সমন্বয় দরকার। ব্যবস্থাপনা ও নীতি উভয় পর্যায়ে সমন্বয়ের প্রকট ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিভিন্ন পদক্ষেপ বস্তুত সঠিক হলেও সমন্বয়ের অভাবে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
আসক: শোনা যায় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জবাবদিহিতা নেই জনগণের কাছে, তাই তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আমার ধারণা পলিটিক্যাল সরকার হলে এতোটা খারাপ অবস্থা হতো না। আপনি কি এর সাথে একমত?
ড. আহমদ: রাজনৈতিক সরকার একটি জিনিস বুঝে যে, মানুষের পেটে ভাত থাকতে হবে; না হলে আগামীতে ভোট পাওয়া যাবে না। এমনও ঘটেছে বলে শুনেছি যে, একজন বাংলাদেশের এক রাজনৈতিক সরকার প্রধানের কাছে প্রস্তাব গিয়েছিল, দেশে তো ভালো ফসল হয়েছে আমদানি করার দরকার নেই, মজুদ মোটামুটি আছে। তিনি বললেন যে, তোমাদের এসব যুক্তি আমার বোঝার দরকার নেই। তিনি নির্দেশ দিলেন চাল আমদানি করা হোক এবং মজুদ যথাযথ পর্যায়ে উন্নীত করা হোক। ‘দরকার পড়লে চাল কোথায় পাওয়া যাবে? ভোটের জন্য তো জনগণের কাছে যেতে হবে।‘ মানুষের জন্য দরদের কারণে না হলেও নিজেদের স্বার্থে হলেও একটি রাজনৈতিক সরকার সাধারণত খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।
আসক: এবার বাজেটে কী কী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে?
ড. আহমদ: এক নম্বর হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সরাসরি কর্মসংস্থান। গত বছর এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা আমরা বলেছিলাম, কিন্তু আমাদের পাত্তা দেয়া হয়নি। ৫০ হাজার মহিলার কর্মসংস্থান করার লক্ষ্যে এ বছর সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি ৯৪৩ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ একটা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এরকম অনেক গোষ্ঠী আছে যাদের কোনো কাজ নেই। তাদের জন্য এরকম কর্মসংস্থান সৃষ্টিমূলক প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রকল্পগুলো অবকাঠামো তৈরির জন্য হতে পারে, উৎপাদনশীল কিছু কাজের ক্ষেত্রেও হতে পারে। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, কৃষি। সরকার অবশ্য বলেছে যে কৃষির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কৃষি গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। সেদিকেও নজর দেয়া হবে বলা হচ্ছে। এছাড়া যারা কোনোভাবেই অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারছেন না তারা যেন একটা ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখতে পারেন, সে জন্য নিরাপত্তা বেষ্টনীকে আরো জোরদার এবং সমপ্রসারিত করতে হবে। আর বাংলাদেশে একটা বড় সমস্যা প্রকট বিদ্যুৎ ঘাটতি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার আগের বছর এ খাতে বাজেটে যত টাকা বরাদ্দ ছিল সব খরচ হয়েছে কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো উন্নতি হয়নি। পুরো টাকা খাম্বা খেয়ে ফেলেছে। উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে স্বল্প সময়ে এ খাতে তেমন কিছু করা সম্ভব নয়। তাই সরকার যা করতে পারে এবং করা উচিত তা হচ্ছে রক্ষণাবেক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি। আরেকটা কাজ করা খুবই দরকার সেটা হলো-দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য তহবিল গঠন। দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পরই অর্থ সংগ্রহে বের না হয়ে একটা তহবিল থাকলে তা থেকে প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এটি ৫,০০০ কোটি বা ১০,০০০ কোটি টাকা হতে পারে। সরকার এতে টাকা দিয়ে শুরু করবে আর জনগণকে এতে টাকা দেয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, এবার এই তহবিল গঠন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থার দিকে আমাদের জোরালোভাবে নজর দিতে হবে। এটা যতোটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমরা কিন্তু ততোটা গুরুত্বপূর্ণভাবে নেইনি। সরকারের ভেতরেও না, বাইরেও না। এখানে শুধু সরকারের একার নয়, আমাদের সবার উচিত দেশে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রয়াস নেয়া এবং কীভাবে এর অভিঘাত-ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে করা যায় সে বিষয়ে সবাইকে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে।
|
|