|
|
তদন্ত
র্যাংগস ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হলো হতভাগ্য শহিদুলের কঙ্কাল
শাহ আলম ফারুক
দীর্ঘি ৫ মাস পর উদ্ধার হলো র্যাংগস ভবনের হতভাগ্য সিকিউরিটি গার্ড শহিদুল ইসলামের কঙ্কাল। বহুল আলোচিত র্যাংগস ভবনের ধ্বংসস-ূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল এ লাশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস-াপুর থানার কাজী গ্রামের শহিদুল দুই বছর আগে র্যাংগস গ্রুপের মালিকানাধীন শিল্ড সিকিউরিটি কোম্পানিতে গার্ডের চাকরি নেন। তার পিতা আবদুল ছাত্তার একজন দিনমজুর। মায়ের নাম আলেমা বেগম। তাদের ৬ সন্তানের মধ্যে শহিদুল একমাত্র ছেলে। গত ৮ ডিসেম্বর ’০৭ রাতে র্যাংগস ভবন ধসে পড়ার সময় তিনি চতুর্থ তলায় সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্বে ছিলেন। তারপর থেকে শহিদুল নিখোঁজ। ঘটনার পরদিন শহিদুলের বাবা র্যাংগস ভবনে এসে তার ছেলের সন্ধান করেন। কিন্ত্বু কেউ তার খোঁজ দিতে পারেনি।
ভবন ধসের পর শহিদুলের বাবা লাশের খোঁজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে খোঁজ নেন। কিন্ত্বু সেখানে তার সন্তানের লাশ মেলেনি। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের মধ্যেও তার সন্তান আছে কিনা সে ব্যাপারে খোঁজ নেন। তাদের মধ্যেও তার ছেলেকে খুঁজে পাননি তিনি। লাশ উদ্ধারের কাজ সমাপ্তি ঘোষণার পর তিনি উদ্ধারকর্মী ও কর্মকর্তাদের কাকুতি-মিনতি করে তার ছেলে নিখোঁজের খবর জানিয়েছিলেন। প্রশাসনের কেউ তার আবেদনের গুরুত্ব দেয়নি। বাধ্য হয়ে তিনি গত ৩০ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় লাশ উদ্ধারের দাবি জানিয়ে একটি জিডি করেন (জিডি নং-২১৫৬, তারিখ-৩০/১২/২০০৭)। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কাছে স্মারকলিপিও দেন।
কিন্ত্বু লাশ উদ্ধারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি কেউ। অবশেষে এপ্রিলের মাঝামাঝি রাজশাহীর দৈনিক সোনালী সংবাদ-এর গোমস-াপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি নূর মোহাম্মদ ১৭ এপ্রিল শহিদুলের বাবা আবদুল ছাত্তারকে নিয়ে আসক তদন- ইউনিটে আসেন। তদন- ইউনিট শহিদুলের বিষয়ে বিস-ারিত তথ্য সংগ্রহ করে এ ব্যাপারে সম্ভাব্য আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি মিডিয়ার সাথে কথা বলার জন্য তাদের পরামর্শ দেয়া হয়। পরামর্শ অনুযায়ী সাংবাদিক নূর মোহাম্মদ তার পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে দৈনিক যুগান-রের এক সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ করেন। তার সূত্র ধরে ৪ মে যুগান-রে ‘র্যাংগস ভবনে চাপা পড়ে আছে শহিদুলের লাশ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। রাজউক ও র্যাংগস কর্তৃপক্ষ শহিদুলের লাশ উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়। ৫ মে সোমবার এ সংক্রান- র্যাংগস গ্রুপের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। র্যাংগস গ্রুপের জনসংযোগ দফতর থেকে জানানো হয়, ৬ মে থেকে রাজউক ও র্যাংগস গ্রুপের শ্রমিকরা ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় লাশের খোঁজে উদ্ধার কাজ শুরু করবে। বুধবার সকালে তৃতীয় ও চতুর্থ তলার ধ্বংসস-ূপ থেকে একটি স্ল্য্লাব সরাতে গিয়ে কিছু হাড় চোখে পড়ে। উদ্ধারকারী এক শ্রমিক জানান, দেহের হাড় ছাড়া শহিদুলের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তার পরনে খাকি পোশাক ছিল। তার নামের নেমপ্ল্লেটটি উদ্ধার করা হয়। বাম হাত বিচ্ছিন্ন ছিল। তেজগাঁও থানার এসআই আবদুস সাইদ সুরতহাল রিপোর্ট করে কঙ্কালটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়ে দেন। শহিদুলের পরিবার পরে এ কঙ্কাল গ্রহণ করে।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট র্যাংগস ভবন ভাঙার কাজ শুরু হয়। সেই বছর ৯ ডিসেম্বর ভবনধসে শ্রমিকদের যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তার সংখ্যা শহিদুলকে নিয়ে দাঁড়ালো ১২।
কর্মক্ষেত্রে স্বাস'্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন-র্জাতিক দিবস পালনের অংশ হিসেবে ২৮ এপ্রিল ২০০৮ শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের একটি প্রতিনিধিদল ফরিদপুরের মধুখালীতে র্যাংগস ভবন ধসের ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। এ সময় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে কিছু খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করা হয়। মধুখালী উপজেলার মুন্সিবাজারে এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের আহ্বায়ক ড. হামিদা হোসেন, সাবেক সাংসদ শাহ মোঃ আবু জাফর, ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক তাসলিমুর রহমান, আসক-এর মোহাম্মদ টিপু সুলতান ও এ লেখার প্রতিবেদক, মধুখালীর থানা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার জহিরুল ইসলাম, ওসি নাফিউর রহমান, স'ানীয় দুই ইউপি চেয়ারম্যানসহ ক্ষতিগ্রস- ও আহত পরিবারের সদস্যরা। সভা পরিচালনা করেন বিলস-এর সহকারী নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন খান।
সভায় বক্তারা আহতদের সুচিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসনে পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলেন। শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের প্রতিনিধি দল পরে মধুখালী প্রেসক্লাব এবং ফরিদপুর সাংবাদিক সমিতি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে মত বিনিময় করেন।
পুলিশ রিমান্ডে ফকির চানের মৃত্যু
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
২০ এপ্রিল ২০০৮ দেশের প্রতিটি সংবাদপত্র ফকির চান নামক এক বাসচালকের মৃত্যু সংবাদ ছাপে। প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে আসক-এর তদন- ইউনিটের দু’জন প্রতিনিধি সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে যান। তথ্যানুসন্ধানের প্রাপ্ত তথ্য থেকে যা জানা যায় তাতে দেখা যায়- পুলিশের বক্তব্য ছিল পরস্পরবিরোধী।
মো. ফকির চানের বয়স ৩৫। নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকার মিজিমিজি পাইনাদী মধ্যপাড়ার মৃত মোহর আলীর দ্বিতীয় সন্তান ফকির চান। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। স্ত্রী, ১ পুত্র, ২ কন্যা সন্তান আর মা গোলে নূরকে নিয়েই চলছিল টানাপোড়েনের সংসার। ঢাকা-সিলেট রুটের মিতালী পরিবহনের গাড়ি চালাতো ফকির চান। ১১ তারিখ মধ্যরাতে ফকির চানের বাড়িতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে পুলিশ আসে। ঘুম থেকে ডেকে তুলে তার স্ত্রী রাহেলা খাতুনকে পুলিশ জিজ্ঞেস করে, ফকির চান কোথায়? রাহেলা খাতুন জানায়, সে বাড়ি নাই, গাড়ি নিয়ে সিলেটে গেছে। পুলিশ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে ফিরে যায় সে রাতে।
১৩ এপ্রিল ২০০৮ তারিখের দুপুরে ফকির চানের পূর্ব পরিচিত একজন জানায়- তাকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছে। থানায় গেলে জানানো হয় ফকির চান নারায়ণগঞ্জ থানায় রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ রাহেলাকে জানায়- ফকির চান থানা-হাজতে রয়েছে। দেখা করার অনুমতি নেই বলে রাহেলা দেখা করতে পারেনি। থানা থেকে জানতে পারে তার স্বামীকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকার সান্টু ফিলিং স্টেশনের ১০ লাখ টাকা ছিনতাই ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে সান্টু ফিলিং স্টেশন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সোহেল রানা বাদি হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামি উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মামলা নং-০৮, তরিখ- ০৬/০৪/০৮।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই বাবুল আক্তার এ মামলার তদন-কারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ফকির চানকে আটক করে। মামলাটি সার্বিক মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিল এএসপি (সার্কেল) জান্নাতুল হাসান।
১৪ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন- রাহেলা ও তার সন্তানরা বারবার থানা-পুলিশের দুয়ারে ধরনা দিয়েও দেখা করতে পারেনি ফকির চানের সাথে। ১৮ তারিখ দিবাগত রাত অর্থাৎ ১৯ এপ্রিলের ভোররাতে নারায়ণগঞ্জের দু’জন টেলিভিশন সাংবাদিক ফকির চানের বাড়িতে আসেন; তাদের কাছে জানতে পারে ফকির চান রাতে মারা গেছে। নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে মৃতদেহ রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ থানা কর্তৃপক্ষ জানায়- ফকির চান মারা গেছে জেলা গোয়েন্দা কার্যালয়ে (ডিবি অফিসে)। ডিবি কার্যালয়ের দায়িত্বরত ইন্সপেক্টর এহসান উদ্দিন চৌধুরী জানায়- ফকির চান দুর্ধর্ষ আসামি। ফকির চানসহ আরও ৪ আসামিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে আসে। ১৮/৪/০৮ তারিখে এএসপি (সার্কেল) জান্নাতুল হাসানের নির্দেশক্রমে মামলার তদন-কারী কর্মকর্তা এসআই বাবুল আক্তার ডিবি কার্যালয়ে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে। আমি কার্যালয়ে ছিলাম না। আনুমানিক রাত ১২টায় আমি জানতে পারি একজন আসামি অসুস'বোধ করায় হাসপাতালে নেয়া হয়েছে এবং সেখানে সে মারা গেছে। আমি সংবাদ জানার পরই হাসপাতালে যাই এবং দেখি, আসামি ফকির চান মারা গেছে। আসামিদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসার কারণ জানাতে গিয়ে বলেন- আসলে এখানে ডিবির কোনো ভূমিকা ছিল না। এএসপি জান্নাতুল হাসান আসামিদের অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়টি ব্যবহার করেছিল, এটা জাস্ট ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আসামিরা খুবই দুধর্ষ প্রকৃতির ছিল। তাদের কাছ থেকে ১টা দেশী রিভলবার ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছিল। এছাড়া ছিনতাইয়ের ১ লাখ ৪০ হাজার টাকাও উদ্ধার করা হয়েছিল।
মামলার তদন-কারী কর্মকর্তা এসআই বাবুল আক্তার জানান- ১৬ এপ্রিল ২০০৮ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চন্দ্র বাজার নামের জায়গা থেকে ফকির চানকে গ্রেফতার করা হয়। ছিনতাই ঘটনায় ফকির চান জড়িত ছিল আমাদের কাছে এ তথ্য ছিল। তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয় এবং আটকের পরপরই ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং ১টি দেশী রিভলবারসহ ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। ছিনতাই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৪ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এ মামলাটি এএসপি (সার্কেল) জান্নাতুল হাসানের মনিটরিংয়ে হচ্ছিল। থানার গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো তিনি নিজে তদারকি করে থাকেন। স্যারের নির্দেশনায় আসামি ফকির চানসহ আরও ৪ আসামিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা শাখা কার্যালয়ে নিয়ে যাই ১৮/০৪/০৮ তারিখে। সেখানে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার কনস্টেবল আব্দুল আলী, কনস্টেবল হেলাল ও কনস্টেবল আলমগীর ছিল। আমি ডিবি ইন্সপেক্টর স্যারের কক্ষে বসে মামলা সংক্রান- কাজ করতে ছিলাম। এ সময় ডিবির সাব-ইন্সপেক্টর সাইফুল ও সাব-ইন্সপেক্টর মামুন আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যায়। ডিবি সাব-ইন্সপেক্টরদ্বয় আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে ডিবি কার্যালয় ত্যাগ করার পরপরই কনস্টেবল আলী এসে আমাকে জানায়- আসামি ফকির চান অসুস' হয়ে পড়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে দেখি- আসামি ফকির চান গুরুতর অসুস'। হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস'া করি। কনস্টেবল আব্দুল আলী ও কনস্টেবল হেলাল ফকির চানকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে যায়। সেখানে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক আসামি ফকির চানকে মৃত ঘোষণা করে। ফকির চানের মৃত্যুর সংবাদ জানার সঙ্গে সঙ্গে আমি হাসপাতালে যাই এবং উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানাই। এ ঘটনার সময় ডিবি ইন্সপেক্টর এহসান উদ্দিন চৌধুরী ডিবি কার্যালয়ে উপসি'ত ছিল। আসামি ফকির চানকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআই বাবুল আক্তার আসক প্রতিনিধিদের জানান- ‘এএসপি (সার্কেল) জান্নাতুল হাসান স্যার শুরু থেকেই মামলাটি তত্ত্বাবধান করে আসছিল। ওনার নির্দেশেই আসামিদের ওখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’
আসামি ফকির চানকে রিমান্ডে নির্যাতন করা হয়েছে এবং সে কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই বাবুল আক্তার জানান- ‘আমি নির্যাতন করি নাই।’ ডিবি উপ-পরিদর্শকদ্বয় কেন জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই বাবুল আক্তার জানান- ‘তারা কেন ফকির চানকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিল আমি জানি না। তবে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করে যাওয়ার পরপরই ফকির চান গুরুতর অসুস' হয়ে পড়ে।’
ফকির চানের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা ছিল কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই বাবুল আক্তার জানান- ‘বেশ কয়টা মামলা রয়েছে। ৫-৬টি হবে হয়তো। এ মুহূর্তে সঠিক বলতে পারব না। নথিপত্র দেখে বলতে হবে।’
পুলিশ রিমান্ডে ফকির চানের মৃত্যু বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় ১৯/০৫/০৮ তারিখে। বিজ্ঞপ্তিটি নিম্নরূপ:
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
গত ইংরেজি ০৬/০৪/০৮ তারিখ নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন সিদ্ধিরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক গোদনাইল শাখার সম্মুখে হইতে পেট্রোল পাম্প ব্যবসায়ী মোঃ সোহেল রানার নিকট হইতে আগ্নেয়াস্ত্র হইতে গুলি বর্ষণ এবং ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটাইয়া কতিপয় সন্ত্রাসী প্রায় ১০,০০,০০০/- (দশ লক্ষ) টাকা লুণ্ঠন করে। এই সংক্রানে- সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মামলা নং ০৮, তারিখ- ০৬/০৪/০৮, ধারা- ৩৯৪ দঃবিঃ রুজু করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উক্ত এলাকার ফকির চান, পিতা মোঃ মোহর আলী, সাং- সানারপাড়, থানা- সিদ্ধিরগঞ্জ, জেলা- নারায়ণগঞ্জসহ আরও ৫ জনকে গ্রেফতার করিয়া তাহাদের নিকট হইতে লুণ্ঠিত টাকার মধ্যে ১,৪০,০০০/- টাকা উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ঘটনার সময় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উক্ত থানাধীন সানারপাড়াস' জনৈক জসিমের বাড়িতে লুকাইয়া রাখে বলিয়া পুলিশের নিকট স্বীকার করে। সে মতে গত ইংরেজি ১৮/০৪/০৮ তারিখ রাত্রি বেলা পুলিশ আসামির দেখানোমতে তথা হইতে একটি ৩২ রিভলবার ২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। অতঃপর হাতকড়া পরিহিত অবস'ায় আসামিকে নিয়া থানার উদ্দেশ্য রওনা হইলে সে তৎক্ষণাৎ পুলিশ হেফাজত হইতে দৌড় মারিয়া পালাইয়া যাইতে থাকে। পুলিশ তাহাকে পিছু ধাওয়া করলে আসামি কিছুদূর গিয়া অন্ধকারে রাস-ায় পড়িয়া গিয়া পায়ে এবং শরীরে আঘাতপ্রাপ্ত হইলে পুলিশ তাহাকে গ্রেফতার করিতে সক্ষম হয়। অতঃপর আসামীর দখলে আরো লুণ্ঠিত টাকা রহিয়াছে মর্মে তাহাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জেলা গোয়েন্দা শাখা অফিসে নিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আসামি বুকে ব্যথা অনুভব করার কথা বলিয়া অসুস' বোধ করিলে তাহাকে তৎক্ষণাৎ নিকটস' খানপুর ২০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়া গেলে পরীক্ষানে- তথাকার কর্তব্যরত চিকিৎসক আসামী ফকির চানকে (৩৫) মৃত বলিয়া ঘোষণা করেন। এই ব্যাপারে আইনগত ব্যবস'া গ্রহণ করা হইতেছে।
হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ফকির চানের মৃত্যু বিষয়ে জানান- ফকির চানকে পুলিশ মৃত অবস'ায় হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। হাসপাতালের রেজিঃ নং- ৩২৬৮০/৬, তারিখ- ১৯/০৩/০৮, সময় রাত ১২.১০ মিনিট। রোগীর নাম- অজ্ঞাত, রোগী বহনকারী ১. কনস্টেবল নং- ৩১০ আব্দুল আলী, ২. কনস্টেবল নং- ৮৭১ হেলাল, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা, নারায়ণগঞ্জ। হাসপাতালে ফকির চানকে এ দু’জন কনস্টেবল অজ্ঞাত হিসেবে এন্ট্রি করায়। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. ইকবাল বাহার চৌধুরী রোগীকে মৃত ঘোষণা করলে কনস্টেবলরা দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করার উদ্যোগ নিলে ডা. বাহার ও হাসপাতালের কর্মচারীরা বাধা দেয়। এক পর্যায়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই বাবুল আক্তার রাত ৩টা ২৮ মিনিটে তথ্য দেয় মৃত ব্যক্তির নাম ফকির চান। পিতা- মৃত মোহর আলী, সাং- মিজিমিজি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা, জেলা- নারায়ণগঞ্জ। সুরহতাল প্রতিবেদনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ারুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন- ‘নাকে ছোলা দাগ, দুই হাতের কবজিতে জখমের চিহ্ন, ডান হাতের কনুইতে সামান্য ছোলা দাগ, দুই পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন- বিভিন্ন স'ানে জখমের চিহ্ন এবং ছোলা দাগ। প্রস্রাবের রাস-ায় বীর্য দেখা যায়।’
ফকির চানের পোস্টমর্টেম করার জন্য ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের জগঙ ডা. নাজিম খানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করা হয়। পোস্টমর্টেম নং- ৯৩/২০০৮ তারিখ ১৯/০৪/০৮। ডা. নাজিম খান মৃতদেহের বাহ্যিক অবস'া সম্পর্কে আসক প্রতিনিধিদ্বয়কে জানান- ডেডবডির দু’পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল লক্ষণীয়। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।
আব্দুল আলী (৬৫), পিতা- কেয়ামত আলী, সাং- মিজিমিজি পাইনদী মধ্যপাড়া, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ জানায়- আমি নিজে লাশ গোসল করিয়েছি। আমি দেখেছি ফকির চানের হাতের দশটা আঙ্গুলের মাথা চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল। কবজির গোড়ায় কালো দাগ, তার একটু ওপরে রক্ত জমাট দাগ ছিল। তাছাড়া হাঁটুর নিচে পুরো জায়গাটা কালসিটে হয়ে ছিল। নাক দিয়ে রক্ত পড়তে ছিল।’
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার এ ঘটনা তদনে- একটি ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করে ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পুলিশ সুপারের প্রেস রিলিজ, ডিবি ইন্সপেক্টরের বক্তব্য আর তদন-কারী কর্মকর্তার বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। পুলিশের নির্যাতনে ফকির চানের মৃত্যু হয়েছে পরিবারের এমন দাবি যে অমূলক নয় সেটা পুলিশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।য়
র্যাব পরিচয়দানকারীদের হাতে নির্যাতিত জয়পুরহাট বারের সহ-সভাপতি
শাহ আলম ফারুক ও অনির্বান সাহা
জয়পুরহাট আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি ও মানবাধিকার আইনজীবী পরিষদ জয়পুরহাট শাখার সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট বিমান চন্দ্র বসাককে সমপ্রতি র্যাব পোশাকধারী লোকেরা ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে আসক -এর পক্ষ থেকে তথ্যানুসন্ধান করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এখনও পর্যন- ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের পরিচয় প্রশাসন উদ্ঘাটন করতে পারেনি বলে জানা যায়।
জয়পুরহাট জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিমান চন্দ্র বসাকের সাথে ৪ এপ্রিল’ ০৮ সন্ধ্যায় কথা হলে তিনি জানান- জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার মামুদপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের বসাকপাড়ায় নিজ বাড়িতে তিনি সপরিবারে বসবাস করেন। আইন পেশার পাশাপাশি তিনি মৎস্যচাষ, কৃষি কাজের সাথে জড়িত। বসতবাড়ির কাছাকাছি আনুমানিক দুই/আড়াইশ’ গজ দূরবর্তী এক পুকুরে তিনি মাছ চাষ করেন। ২ এপ্রিল’ ০৮ তারিখে দিবাগত রাত ৩টার আগে তিনি বসতঘর থেকে ঐ পুকুরের মাচানে (পুকুরের ভেতরে পাহারা দেয়ার জন্য নির্মিত টং ঘর) গিয়ে বসেন। রাত আনুমানিক তিনটার দিকে র্যাবের পোশাকে ২ জন এবং বেসামরিক পোশাকে ৬-৭ জন পুকুরের পাড়ে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করে- বিমান উকিলের বাসা চেনেন? প্রত্যুত্তরে তিনি তাদের বলেন- আমিই বিমান উকিল। এরপর তারা তাকে ধরে মারতে শুরু করে। তার কাছে তারা ২টি মূর্তি চায়।
অ্যাডভোকেট বিমান তাদের বলেন- ‘আমি আইনজীবী মানুষ, আমি ওসবের মধ্যে নেই। আমার কাছে কোনো মূর্তি নেই।’ প্রসঙ্গত বলে রাখা যায় যে, প্রাচীন দুর্লভ মূর্তি দেশের বাইরে পাচার করার জন্য জয়পুরহাটের মতো সীমান-বর্তী জেলা- গুলোতে বিভিন্ন সিন্ডিকেট আছে বলে প্রকাশ। মাঝে মাঝে এসব সিন্ডিকেটের লোক-জনকে সরকারি সংস'ার লোকেরা আটক করে। বর্তমান ক্ষেত্রে অ্যাডভোকেট বিমানকে স্রেফ হয়রানি করার জন্য এরূপ করা হয়েছে বলে তিনিসহ সবার ধারণা।
র্যাব এবং সাধারণ পোশাকধারী লোকেরা কোনো কথা না শুনে তাকে তাদের বহনকারী মাইক্রো যেখানে রাখা ছিল সেখানে নিয়ে যেতে থাকে। ইতোমধ্যে তার দু’হাতে হ্যান্ডকাপ লাগানো হয়। এ অবস'ায় কিল, ঘুষি, লাথি মারতে মারতে মাইক্রোর দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় এক পর্যায়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তিনি তাদের বলেন- আপনারা জয়পুরহাট র্যাবের বড় কর্মকর্তাসহ এসপি, ডিসি, ডিবি, সিআইডি সবার কাছ থেকে খবর নেন, আমি এরকম কাজের সাথে জড়িত কি না? তখন তারা তাকে ল্যাংটির বাচ্চা, মালুর বাচ্চা, মিথ্যা কথা বলছো- বলে পেটাতে পেটাতে মাইক্রোতে তোলে। সেখান থেকে ২০০-২৫০ গজ দূরে মামুদপুর দ্বিমুখী হাইস্কুলের মাঠে নিয়ে গাড়ি থেকে তাকে নামানো হয়।
গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে তারা বলে, আবার বলছি (মূর্তি) দ্যান, আপনার বাড়িতে আছে না ভারতে পাঠায় দিছেন। বলতে বলতে তারা নানাভাবে তাকে নির্যাতন করছিল। পেটানোর সময় তাদের ২-৩টি লাঠি ভেঙে যায়। এক পর্যায়ে হ্যান্ডকাপও ভেঙে যায়। তারা বারবার বলছিল- দ্যাও, নইলে আরো টর্চারিং করা হবে।
অ্যাডভোকেট বিমান জানান- স্কুল ফিল্ডের এক পাশে নাইট গার্ড সোলায়মান আলীর বাসা। ঐ বাসা থেকে তারা বদনা, বালতি ও গামছা নিয়ে আসে। তারপর তাকে মাটিতে ফেলে চোখ-মুখ গামছা দিয়ে ঢেকে দু’দিক থেকে দু’জন গামছা চেপে ধরে রাখে। বুকের ওপর একজন বসে। এরপর একদিকে নাকের ওপর পানি ঢালতে থাকে, অন্যদিকে পায়ের পাতায় লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করে। ‘এক পর্যায়ে আমি মনে করলাম, জীবনটাই বুঝি চলে গেল’- বিমান উকিল আমাদের জানান। এমন মারপিটের পর তারা মাইক্রো নিয়ে চলে যাওয়ার প্রস'তি নিতে থাকলে তিনি মাথা উঁচিয়ে গাড়ির নাম্বার দেখার চেষ্টা করেন। এ সময় র্যাব পোশাক পরিহিত দাঁড়িওয়ালা এক লোক বলে, শালা (গাড়ি) নাম্বার নিতে চায়। এরপর তাকে আবার মাটিতে শুইয়ে, নাকে-মুখে পানি ঢালাসহ পায়ের তলায় লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এরই মধ্যে চারদিকে লোক জড়ো হতে শুরু করেছে। কাউকে ওরা কাছে ভিড়তে দিচ্ছিল না। এক সময় ওরা বলছিল- একটা হিন্দুরে মাইরা ফালাইলে কী হবে? এ পর্যায়ে ১৫-২০ মিনিট টর্চার করে তারা তাকে ব্রাশফায়ার করবে বলে হুমকি দেয়। ওদের মধ্যে কে যেন বললো- বেচারা তো মুমূর্ষু খামাখাই টর্চারিং করলেন। এমনিতে মরে যাচ্ছে আবার ব্রাশফায়ার করবেন? এরপর তারা তাকে মাঠে ফেলে মাইক্রো নিয়ে স্কুল মাঠ ত্যাগ করে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অ্যাডভোকেট বিমান চন্দ্র বসাকের মাথা, গলা ও মুখে আঘাতের চিহ্ন, ছোট ছোট ক্ষত, ডান পায়ের হাঁটুর নিচের হাড় ভেঙে গেছে, বাম বাহুতে আঘাতের চিহ্নসহ পায়ের তলা থেকে শুরু করে সারা শরীরে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। ডান হাত ফোলা, বাম হাতের কনুইয়ে কালো দাগ, মুখে, ঠোঁটের নিচে ছোট ফাটার দাগ, মাথায় ছোট ছোট ফোলা ফোলা আঘাত।
বিমান উকিল জানান- র্যাবের পোশাক পরা ড্রাইভার তার কাছ থেকে মুখ লুকোনোর চেষ্টা করছিল। তাকে যখন গাড়িতে করে আনা হচ্ছিল তখন সে একবারও ‘মাথা উঁচু’ করেনি, স্কুল ফিল্ডে সে গাড়ি থেকে নামেনি। তিনি অন-ত দু’জন নির্যাতনকারীকে শনাক্ত করতে পারবেন বলে আসক তদন- টিমকে জানান। র্যাবের জয়পুরহাট ক্যাম্পের মেজর শাহ আলী ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় হাসপাতালে তাকে দেখতে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমার এখান থেকে কোনো টিম ওখানে যায় নাই।’
প্রসঙ্গত অ্যাডভোকেট বিমান বলেন- তার ব্যক্তিগত কোনো শত্রু নেই। কোনো সন্ত্রাসীও এগুলো করে নাই। যে পুকুর পাড় থেকে তাকে ধরা হয় তার সন্নিকটে অবসি'ত ৩৫ শতক দেবোত্তর সম্পত্তি নিজের বলে দাবি করে জনৈক দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী তা দখল করার চেষ্টা করছেন। ঐ ব্যক্তি ওখানে হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকদের পূজা-পার্বণ করতে দেবে না বলে হুমকি দেন। এ নিয়ে অ্যাডভোকেট বিমানসহ ৬ জন ক্ষেতলাল সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা করেন। মামলা নাম্বার ৬২/২০০৭। এ মামলায় গত তারিখে কমিশনের মাধ্যমে সরেজমিন তদনে-র জন্য আবেদন করা হয়েছিল। ৩ এপ্রিল এ আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা ছিল। ঐ দিন ভোর রাতেই বিমান বাবুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। অ্যাডভোকেট বিমানের ভাগনে সুজিত ও ভাই বিনয় চন্দ্র বসাক জানান- উক্ত দেবোত্তর সম্পত্তির বিরোধের সূত্র ধরে উক্ত দেলোয়ার চৌধুরী থানা, যৌথ বাহিনী, র্যাবসহ নানা দফতরে দরখাস্ত দিয়ে তাদের হয়রানি করার চেষ্টা করে আসছিল। সাক্ষাতে, অসাক্ষাতে সে বলে আসছিল, উকিলের এত টাকাপয়সা হয়েছে...। উকিলকে শেষ করে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন জায়গায় সে (দেলোয়ার) এ রকম হুমকি দিয়ে আসছিল।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নার্গিস (মামুদপুর দ্বিমুখী হাইস্কুলের নৈশপ্রহরী সোলায়মান মণ্ডলের স্ত্রী) জানান- রাত আনুমানিক ৩টার পর কিছু লোক তাদের বাড়ির গেটে এসে দরজা ধাক্কাতে থাকে। নার্গিস বলেন- আমাদের দুইটা গাভী অসুস্থ। গাভীদের ওখানে আমি কয়েল জ্বালাতে গেছি। এ সময় ওরা এসে দরজা ধাক্কা দেয়। ওরা বলে, আমরা থানার লোক। নার্গিস আরো জানান- প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর ওদের এরকম ডাকাডাকির মুখে তার ছেলে সুমন দরজা খুলে দিলে ওরা বলে- আমরা র্যাবের লোক। তারপর তারা আমাদের ঘর থেকে বালতি, বদনা, গামছা চেয়ে নেয়। বাড়ির কল থেকে পানি নেয়। নার্গিস আরো বলেন- আমি বাড়ির দরজা খুলে দেখি উনাকে মারপিট করা হচ্ছে। জোরে জোরে বাড়ি মারার শব্দ আমাদের কানে আসছিল।
নৈশপ্রহরী সোলায়মান মণ্ডল জানান-তিনি তখন স্কুলে পাহারা দিচ্ছিলেন। মাঠে শব্দ শুনে মাঠের উত্তর দিক দিয়ে ঘরে এসে শুনলাম, তারা আমার ঘর থেকে বালতি, বদনা, গামছা নিয়েছে। আমি ঘর থেকে উকিলের আর্তচিৎকার শুনেছি। একপর্যায়ে তিনি বলছিলেন, আমার দুইটা বাচ্চা আছে আমাকে ছেড়ে দেন। কিন্ত্বু তবুও ওরা উনাকে মারছিল।
জয়পুরহাট বারের জয়েন্ট সেক্রেটারি আবু নাসিম মো: শামীমুল ইমাম শামীম এবং অ্যাডভোকেট গোলাম মোকাররম চৌধুরী জুয়েল জানান- ঘটনার পর সকালে (৪ এপ্রিল ০৮) আইনজীবীদের পক্ষে জয়পুরহাট র্যাব ক্যাম্পে যোগাযোগ করা হলে মেজর শাহ আলী বলেন- এ ক্যাম্পের কেউ এ কাজ করেনি। তবে বগুড়া থেকে আসতে পারে। পরে আইনজীবীরা বগুড়া ক্যাম্পে যোগাযোগ করলে তারা জানান- তাদের ওখান থেকে এরকম অভিযান চালানো হয়নি। এরপর জয়পুরহাট ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর শাহ আলী উল্টা বলতে শুরু করেন- র্যাবের কেউই এ ঘটনার সাথে জড়িত নয়।
র্যাব-৫-এর অধীন জয়পুরহাটে কর্মরত ক্রাইমস প্রিভেনশন কোম্পানি-৩-এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মোঃ শাহ আলীর সাথে কথা হয় জয়পুরহাট র্যাব ক্যাম্পে তার অফিসে। তিনি জানান- তার টিমের কেউ এ ঘটনার সাথে জড়িত নয়। এরপরও তিনি অ্যাডভোকেট বিমানকে বলেছেন, তার কোম্পানির সব সদস্যকে তিনি দেখে যদি কেউ ঘটনার সাথে জড়িত থাকে তাকে শনাক্ত করতে পারবেন কিনা? অ্যাডভোকেট বিমান বাবু অন-ত ২ জনকে শনাক্ত করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি যথাযথ সহায়তা করবেন বলে আসক তদন- টিমকে জানান।
প্রসঙ্গত তাকে প্রশ্ন করা হয়- নির্যাতনের ধরন দেখে ধারণা হয় প্রশিক্ষিত লোক (যে কোনো বাহিনী) ঘটনা ঘটিয়েছে। এ প্রশ্নে মেজর আলী জানান- আসলে বিভিন্ন বাহিনী বিশেষত র্যাব কীভাবে কাজ করে এটা তো এখন সবাই জানে। সে অনুযায়ী কেউ একই রকমভাবে ঘটনা ঘটাতে পারে। সন্ত্রাসীরা অপরাধের ক্ষেত্রে নতুন নতুন ফর্ম ব্যবহার করছে। তিনি কিছুদিন আগে মাইক্রোতে কফিন রেখে, আতর, গোলাপজল দিয়ে অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করে ফেনসিডিল বহন করার ঘটনার কথা বলেন।
তিনি জানান- তারা বিমান চন্দ্র বসাকের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছেন, তিনি একজন ভদ্রলোক। তার এলাকায় তার সুনাম আছে। মানুষের বিপদে-আপদে তিনি পাশে থাকেন বলে জেনেছি। এরকম একজন মানুষের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনায় মেজর আলী দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন- আমরা এ বিষয়ে তদন- করছি। আমরা চিহ্নিত করতে চাই কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রথমে বগুড়া থেকে আসতে পারে, পরে বগুড়া থেকে না বললে তিনি বলতে থাকেন র্যাবের কেউ এ কাজ করেনি- কেন দু’ধরনের কথা বলছেন, এ প্রশ্নে তিনি জানান- তার পক্ষ থেকে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। কারণ তিনি জানেন তার ক্যাম্পের কেউ যায়নি। তাই যখন তিনি জানতে পারেন বগুড়ার কেউও অভিযানে আসেনি, তখন নিশ্চিত হন র্যাবের কেউ জড়িত নয়।
এ ব্যাপারে অ্যাডভোকেট বিমান চন্দ্র বসাক বাদি হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ৭-৮ জনকে অভিযুক্ত করে ক্ষেতলাল থানায় মামলা করেছেন। তদন-কারী কর্মকর্তা এস আই ছিদ্দিকুর রহমান জানান- সংশ্লিষ্ট মামলা নাম্বার ৪ তারিখ ১০/৪/২০০৮ ইং। ধারা ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬ ও ৩০৭ দণ্ডবিধি। মামলার তদন- অব্যাহত আছে।
|
|